Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৫

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৫

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৫
তেজরিন উম্মীদ

ফারাজের ওপর আজ শেরের পাহাড় সমান অভিমান। রোজ যে ছেলেটি বাবার প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা না রাখলে ঘুমোতে পারে না, আজ সে নিয়মের বড় ব্যতিক্রম ঘটেছে। ফারাজের ওপর রাগ করে সে আজ পাপার সাথে ঘুমুই নি।সে রুশদীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন রুশদীই তার একমাত্র আশ্রয়। ফারাজ আর শেরের মাঝখানে আজ দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে শুয়ে আছে রুশদী।

ফারাজ ঘুমায়নি। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে সে অন্ধকারের মাঝেও ছেলের অভিমানের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছে। রুমের আলো নেভানো, কেবল নীলচে জিরো বাল্বের ম্লান আলোয় চারপাশটা আবছা দেখাচ্ছে। ফারাজ এক পলক ডানপাশে তাকাল। দেখল, শের এখনো জেগে আছে। সে রুশদীর সাথে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। কিন্তু ফারাজের দৃষ্টির আভাস পেতেই শের তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল। যেন বাবার দিকে তাকালেই তার কঠিন অভিমানটা গলে জল হয়ে যাবে।
ফারাজ গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় ডাকল,

“শের, আমার কাছে আসো।”
বাবার সেই রাশভারী কণ্ঠ শুনে শেরের ছোট শরীরটা কেঁপে উঠল। এক অজানা ভয়ে সে রুশদীকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, মুখটা লুকাল রুশদীর বুকের ভেতর। যেন সেখানে লুকিয়ে সে বাবার শাসন থেকে বাঁচতে পারবে। রুশদী আলতো করে শেরের মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,”যাও, পাপা ডাকছে তো।”
শের কোনো কথা বলল না, শুধু মাথা ডানে-বাঁয়ে নাড়িয়ে তার নীরব অসম্মতি প্রকাশ করল। তার এই ছোট ছোট জেদ ফারাজের নজর এড়াল না।শের তো অভিমান করে তার থেকে দূরে সরে আছে, কিন্তু তার যে সয় না।শেরকে বুকের উপর নিয়ে না ঘুমালে তার ঘুম আসে না।সে আবার গম্ভীর স্বরে বলল,”আসবে তুমি?”
শের আরও কুঁকড়ে গেল। কিন্তু ফারাজের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া অত সহজ নয়। ফারাজ উঠে এসে রুশদীর কোল থেকে এক প্রকার জোর করেই শেরকে তুলে নিল। নিজের বুকের ওপর শুইয়ে দিতেই শের ছটফট করে উঠল। তার ছোট্ট হাত-পা ছুড়ে সে আবার মম এর কাছে ফিরে যেতে চাইল। ফারাজ শক্ত হাতে তাকে আগলে ধরে ধমকের সুরে বলল,”চুপচাপ ঘুমাও শের। একদম নড়বে না।”
শেরের ঠোঁট উল্টে এলো অভিমানে। ধরা গলায় আধো-আধো স্বরে বলল,”না! আমি মম-এর সাথে ঘুমাবো। তোমার কাছে থাকব না।”

“কেন? আমার সাথে কেন ঘুমাবে না?” ফারাজের গলায় এবার একটু কৌতূহল।
শের কান্নার সুরে নালিশ জানাল, “তুমি… তুমি বকেছ। তুমি পচা!”
“বকেছি তো কী হয়েছে? পাপা তো বকতেই পারে।”
“আমি ঘুমাবো না তোমার সাথে। তুমি যাও!” বলেই সে আবারও ফারাজের বুক থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করল।
ফারাজ বুঝতে পারল, রুমের ভেতর এই মান-অভিমান মিটবে না। সে শেরকে কোলে তুলে নিয়ে ধীর পায়ে বারান্দায় চলে এল। বারান্দার ভারী পর্দাগুলো টেনে দিল সে, থাই গ্লাসের দরজাটা আটকে দিল যাতে ভেতর থেকে কেউ তাদের কথোপকথন শুনতে না পায় বা দেখতে না পায়।
বারান্দার কোণে রাখা গোলাপি রঙের দোলনাটার ওপর শেরকে বসাল ফারাজ। তারপর নিজে হাঁটু গেড়ে বসল ছেলের সামনে। শেরের নরম, তুলতুলে হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম গলায় বলল,

“এবার বলো,কী বলছিলে তখন?”
ফারাজের কণ্ঠ এখন তুষারের মতো শীতল আর শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত মেজাজ দেখে শের আরও ভয় পেয়ে গেল। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে, টলটল করছে নোনা জল। কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল,”না… তুমি আবার বকুনি দিবে।”
ফারাজ ঈষৎ হেসে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলল, “দিব না বকুনি। তুমি বলো কেন তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?”
শের এবার কান্নার তোড়ে ফুঁপিয়ে উঠল। ভেজা গলায় বলল,”তুমি অনেক পচা পাপা! তুমি আমাকে অনেক অনেক বকেছ। তুমি বলেছ আমি যেন তোমার কাছে কিছু না চাই। আমাকে চকলেট খেতেও মানা করে দিয়েছ।তুমি আমাকে ভালোবাস না!!”

ফারাজ স্থির দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট একটা মানুষের মনে কতশত অভিমান জমে আছে। সে শান্ত স্বরে আবারও প্রশ্ন করল,”আর কী বলেছি আমি? সব মনে আছে তোমার?”
শেরের কণ্ঠস্বর অভিমানে বুজে এলো। টলটলে চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে সে একরাশ অভিযোগ উগরে দিল, “তুমি ধমক দিয়ে কথা বলেছ। তুমি কত বড় একটা মানুষ, আর আমি কত ছোট! তুমি যখন ওত্ত জোরে ধমক দাও, আমি কি ভয় পাই না? আমার মনটা তখন একদম ছোট হয়ে গিয়েছিল। অনেক কান্না পাচ্ছিল আমার, ইচ্ছে করছিল জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদি।”
ছেলের এমন অকাট্য যুক্তির সামনে ফারাজ মুহূর্তেই নিরুপায় হয়ে পড়ল। তার শান্ত শীতল চোখে এক চিলতে অপরাধবোধ খেলে গেল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে আবার সুধালো, “আর? আর কিচ্ছু বলিনি?”
শের মাথা নুইয়ে ফেলল। ছোট্ট মাথাটা দুপাশে দুলিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “নাহ।”
ফারাজ তার খুদে রাজপুত্তুরের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। জিজ্ঞেস করল, “এখনো রাগ করে আছো পাপার ওপর?”

শের কোনো উত্তর দিল না, শুধু ওপর-নিচ মাথা নেড়ে তার মৌন সম্মতি জানাল। বড় বড় অশ্রুবিন্দু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
“রাগ কমানোর উপায় কী শুনি?”
শের নিরুত্তর। তার মৌনতা যেন ফারাজের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। ফারাজ নুইয়ে পড়ে শেরের ছোট্ট দুটো হাতের পাতায় পরম মমতায় চুমু খেল। কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল,
“সরি পাপা! তোমাকে বকার জন্য আমি অনেক অনেক সরি। আর কখনো বকব না, প্রমিস।”
এতটুকুতে কাজ হলো না দেখে ফারাজ কিছুটা অসহায় বোধ করল। সে আবারও অনুনয় করে বলল, “পাপা তো সরি বলেছে। এই যে তুমি সারাদিন আমার সাথে কথা বললে না, আমার থেকে দূরে দূরে থাকলে—আমার কি খুব খারাপ লাগেনি? আমি কি এর জন্য তোমাকে বকেছি? বলো, বকেছি?”
শের মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু।”

“তবে আর রাগ করে কেন? এবার একটু হাসো। পাপা তো সরি বলেছে, এই দেখো কান ধরেও সরি বলছি। প্লিজ মাফ করে দাও পাপাকে। প্লিজ…”
ফারাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই শেরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। তার জেদ, তার আড়াল করার চেষ্টা—সব ধূলিসাৎ হয়ে গেল এক নিমেষে। সে ঝাপটে ধরে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। রাগ করে দূরে থাকলেও ওর ছোট্ট বুকটা সারাদিন ব্যথায় টনটন করেছে। মনে হচ্ছিল কেউ যেন তার মনটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টানছে। বাবার সান্নিধ্য ছাড়া তার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বিষাদময়।
বাবার স্নেহের পরশ পেতেই শের হু হু করে কেঁদে ফেলল। বাবার কাঁধে মুখ লুকিয়ে আর্তনাদ করে বলল, “লাভ ইউ পাপা! ওত্ত ওত্ত লাভ ইউ!”

ফারাজও নিজের অজান্তেই শিউরে উঠল। সে শেরকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের পাঁজরে পিষে নিল। তখন রাগের মাথায় হয়তো একটু বকেছিল, কিন্তু এই ছোট্ট মুখটার দিকে তাকালে তার কলিজা ছিঁড়ে যায়। এই ছেলেটা ছাড়া তার জীবনে আর আছেই বা কী? ফারাজের দু’চোখ উপচে কয়েক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল ছেলের চুলে। সে চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, “আই লাভ ইউ টু, মাই পাপা।”
শের কান্নাভেজা গলায় আদুরে আবদার করল, “প্রমিস করো আর কখনো ধমক দিবে না।”
ফারাজ কান্নার মাঝেও হাসল, “প্রমিস।”

“সব সময় শুধু আদর করবে?”
“হ্যাঁ পাপা, সারাজীবন শুধু আদরই করব।”
রাতের স্তব্ধ বারান্দায় তখন এক বাবা আর তার ছোট্ট প্রিন্সের দীর্ঘক্ষণ না বলা কথার পাহাড়গুলো এক নিমিষেই ভালোবাসার ঝরনা হয়ে বয়ে গেল।
রুমে বিছানায় বসে বাবা আর ছেলের মান-অভিমানের পালা আর তার পরবর্তী মধুর সন্ধি—সবটাই আড়ি পেতে শুনছিল রুশদী। যদিও কাঁচের ওপারটা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু নিস্তব্ধ রাতে প্রতিটি শব্দই তার কানে স্পষ্ট পৌঁছাচ্ছিল। সে ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে উঠে দাঁড়াল। গুটিগুটি পায়ে বারান্দার থাই গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে টোকা দিল। তারপর আলতো করে মুখ বাড়িয়ে বলল,
“টুকি! আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”
ফারাজ ছেলেরর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতেই ফিরে তাকাল। কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, “কাবাব মে হাড্ডি হতে এসেছ?”

রুশদী ভ্রু কুঁচকে ভেতরে ঢুকে এল।
“মোটেই না! আপনাকে জরুরি একটা কথা বলতে এসেছি। সেটা বলেই আমি ভোঁ-দৌড় দেব, আপনারা আপনাদের মতো গল্প করুন।”
ফারাজ হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “ঠিক দুই মিনিট সময়। যা বলার বলে জলদি ফটো।”
“কাল আমায় নিয়ে মার্কেটে যাবেন, মনে থাকে যেন।” রুশদী আদেশের সুরে বলল।
ফারাজ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “কী কেনা হবে শুনি?”
“বোরকা। একদম নিকাবসহ, যাতে শুধু চোখ দুটো দেখা যায়।”
ফারাজের বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে কিছুটা বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “হঠাৎ এমন বোরকা দিয়ে কী হবে? তুমি না বলেছিলে এসব পরবে না?”
রুশদী একটু আমতা-আমতা করে বলল, “কেন? আপনিই তো সেদিন বললেন কলেজে যাওয়ার সময় ওসব পরে যেতে।”

“এই কদিন কিভাবে গিয়েছো কলেজে? ”
“পরশু থেকে আমার HSC পরীক্ষা। তাই একদিন বন্ধ ছিল কলেজ। এখন কালকে আপনি মার্কেটে যাচ্ছেন ওকে? ”
ফারাজ মুচকি হেসে বলল, “ওখে ম্যাডাম! ”
‘ম্যাডাম’ সম্বোধনটা রুশদীর কানে বেশ খটকা লাগল। শের সামনে বসে আছে, তার সামনে এসব ডকাবাকি করাটা কেমন যেন দৃষ্টিকটু। সে চোখ রাঙিয়ে বলল, “সুন্দর করে কথা বলতে পারেন না? ম্যাডাম আবার কেমন শব্দ?ভালো নামে ডাকবেন। ”

ফারাজ এবার নির্দ্বিধায়, বেশ আয়েশ করে বলল, “ওকে ডার্লিং!”
রুশদীর চোখ তো এবার কপালে! আগের ডাকটাই অন্তত সহনীয় ছিল, এটা তো আরও ভয়ানক। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কথার ধরন ঠিক করুন! বাচ্চার সামনে এসব কী আবল-তাবল বলছেন? নেক্সট টাইম আর ওসব নামে ডাকবেন না।”
ফারাজ খুব বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে বলল, “ওকে জানু!”
“জানু? আমি আপনার জানু লাগি?” রুশদী প্রায় চিৎকার করে উঠল।
“হ্যাঁ, জানু।” ফারাজ বেশ নির্বিকার।
“কবে থেকে?”

“মাত্রই তো তুমিই তো বললে ‘আমি আপনার জানু লাগি!”
“আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম!” রুশদী রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল।
“আর আমি সেটাকে উত্তর ধরে নিয়েছি,” ফারাজ হাসতে হাসতে জবাব দিল।
দোলনায় বসে শের এতক্ষণ মুখ চেপে ধরে পাপা আর মম-এর এই খুনসুটি মার্কা ঝগড়া উপভোগ করছিল। সে হয়তো সব বুঝছে না, কিন্তু মম-এর অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে তার খুব মজা লাগছে। তার খিলখিল হাসি দেখে রুশদী এবার লজ্জা আর রাগে মিলে মিশে তাকে ধমক দিল, “এই শের! হাসি বন্ধ একদম!”
শের চট করে হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। বড়
বড় চোখে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, “ওকে মম! একদম হাসি বের হবে না।”
ফারাজ উঠে দাড়ায়। এবার রুশদীর আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, “এখন তো জানু ডাকলাম, কাল যদি মার্কেটে যেতে এক সেকেন্ড দেরি করো, তবে কিন্তু সবার সামনে ‘সুইটহার্ট’ বলে ডাকব।রাজি?”
রুশদী আর দাঁড়াল না। ফারাজের এমন বেহায়া মার্কা রোমান্টিকতা থেকে বাঁচতে সে দ্রুতপায়ে রুমের দিকে হাঁটা দিল। পেছনে পড়ে রইল ফারাজের তৃপ্তির হাসি আর শেরের চাপা হাসির শব্দ।

গত কাল থেকে সিফাত বাড়িতে আস্তানা গেড়েছে। ফারাজ লক্ষ্য করেছে, কাল থেকে শান আর সিফাত যেন তার রুমের সামনে ছায়ার মতো ঘুরঘুর করছে। কয়েকবার দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়েই আবার তড়িঘড়ি করে সরে গেছে ওরা। ফারাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারেনি যে, দুই নমুনার মতলব মোটেই সুবিধার নয়। হয়তো কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু ফারাজের ব্যক্তিত্বের ইস্পাতকঠিন দেয়াল ভেদ করে সেই সাহসটুকু সঞ্চয় করে উঠতে পারছে না।

আজ যখন আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো, ফারাজ আর ধৈর্যের বাঁধ ধরে রাখতে পারল না। পা বাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে দুই ভাইয়ের ঘাড় ধরে এক প্রকার হিড়হিড় করে নিজের ঘরে নিয়ে এল।
ফারাজ এখন তার বিছানায় আয়েশ করে বসে আছে। এক পা মেঝেতে, অন্য পা বিছানার ওপর ভাঁজ করা। দু-হাত বগলদাবা করে সে এমনভাবে ভাইদের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কোনো দুর্ধর্ষ অপরাধীকে জেরা করার জন্য প্রস্তুত এক গোয়েন্দা। আর তার সামনে সিফাত আর শান চোরের মতো কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফারাজ জানে, ভাইদের জীবনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাকে কতটা কঠোর হতে হয়। আবেগ দিয়ে দুনিয়া চললে না।, ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যতের ব্যাপারে একটুও ছাড় দেওয়ার পাত্র সে নয়। সে এও বুঝতে পারছে, ওরা তার কাছ থেকে কোনো বড় আবদার মঞ্জুর করিয়ে নিতে চায়।
কণ্ঠস্বরে একরাশ কঠোরতা ঢেলে ফারাজ প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “সমস্যা কী তোদের? আমার রুমের সামনে এভাবে টহল দিচ্ছিস কেন? কী চাস?”

শান একটু আমতা-আমতা করে অজুহাত দেওয়ার চেষ্টা করল, “না মানে ভাইয়া… আসলে আমরা আর কী…”
তাকে বাক্য শেষ করতে দিল না ফারাজ। হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল, “যা বলবি সরাসরি বলবি। ন্যাকামি আমার একদম সহ্য হয় না। শান, তুই কি মেয়ে যে এভাবে ন্যাকামি করছিস? সোজা কথা সোজাভাবে বল। কী দরকার?”
শান এবার ঢোক গিলল।
“ভাইয়া আসলে… আসলে…”
ফারাজের ধৈর্য চ্যুত হওয়ার উপক্রম। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “হ্যাঁ, ‘আসলে’ টা কী? এর পরেও কি কোনো শব্দ বের হবে মুখ দিয়ে? না কি আজ সারারাত আসলে বলেই কাটিয়ে দিবি?”

বড় ভাইকে বিশেষ কিছু মুহূর্তে যমের মতো ভয় পায় শান। বিশেষ করে ফুটবলের প্রসঙ্গটা তোলা এখন তার কাছে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেওয়ার মতো। তাদের জীবনে এই ফুটবল নিয়ে কত যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তবুও সেই একই নেশা নিয়ে আবার বড় ভাইয়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস সঞ্চয় করা যেন অসম্ভব। ফারাজ যদি রেগে গিয়ে সব পণ্ড করে দেয়, সেই আতঙ্ক তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। শান কথা বলতে না পেরে অপরাধীর মতো মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।

ভাইদের নিশ্চুপ দণ্ডায়মান ভঙ্গি দেখে ফারাজ মনে মনে নিশ্চিত হলো, ঘটনা বেশ গুরুতর। এরা এমন কিছু বলতে এসেছে যা তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, আবার ফারাজের কাছে সেটা বিরক্তির কারণ হতে পারে। ফারাজ কিন্তু তার গলার স্বর এক চুলও নরম করল না। কারণ সে জানে, একবার যদি শাসনের রাশ আলগা করে, তবে এই দুই বাটপার তাকে মাথায় তুলে নাচতে শুরু করবে।
সে স্থির চোখে সিফাতের দিকে তাকাল। যেন বিনাবাক্যে আদেশ দিল,
‘এবার তুই বল, আসল কেসটা কী?”
শান সিফাত একে অপরের দিকে তাকিয়ে খোঁচাখুঁচি করলো যেন অপরজন বলে। তবে কেউই কিছু বলল না। এবার ফারাজ বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেল। চোয়াল শক্ত করে সে আবারও ধমকে উঠল,
“যদি কোনো কথা না-ই থাকে, তবে আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ। অকারণে মেজাজটা বিগড়ে দিলি। যাতো এখান থেকে!”

সিফাত তড়াক করে ঘুরে দাঁড়াল। তার স্বভাবজাত একগুঁয়েমি তাকে আর সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারল না, সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু শান নাছোড়বান্দা; সে সিফাতের হাত চেপে ধরে তাকে পুনরায় দাঁড় করাল। বুকে একরাশ সাহস সঞ্চয় করে শেষমেশ শান মুখ খুলল, “ভাইয়া, আর কয়েকদিন পরই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ (SAFF Championship)…”
‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ’ নামটা কানে যেতেই ফারাজের কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল। ওদের এই দু-দিনের লুকোচুরি আর ভীরু টহলের পেছনের আসল রহস্য তবে এই ফুটবল! ফারাজ এক মুহূর্তের জন্য শানকে আপাদমস্তক মেপে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “তা দিয়ে এখন আমার কাজ কি?”
“ভাইয়া, আমরা খেলতে চাই…” শানের গলার স্বরটা কিছুটা কাঁপল, কিন্তু সে থামল না।
ফারাজ এবার বিছানা থেকে নেমে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ শান আর সিফাতের মনে ভয়ের ঢোল বাজাচ্ছে। ফারাজ বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “বাড়িতে ড্যাড আছে,জানিস তো? তোর এই কথা শুনলে তিনি তোকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবেন। তিনি অলরেডি তোর ফ্লাইট টিকিট বুক করে রেখেছেন। আর তুই এখন ফুটবল নিয়ে ন্যাকামি করছিস? হেহ!”

“ভাইয়া আমি যাব না, আমি খেলব! এটা আমার স্বপ্ন ভাইয়া,” শানের গলায় এবার আকুতি ঝরে পড়ল।
ফারাজ কোনো সহমর্মিতা দেখাল না। সে অত্যন্ত রূঢ় কণ্ঠে বলল, “তোর যদি এতই স্বপ্ন থাকে, তবে গিয়ে ড্যাডকে বল। আমার কাছে কী চাস? যদি ভেবে থাকিস আমি তোদের কোনো সাহায্য করব, তবে ভুল ভাবছিস। একদম ভুল! আমি কেন তোদের সাহায্য করব জানিস? তোদের মাথায় ঘিলু বলতে কিচ্ছু নেই। যদি থাকত, তবে ট্রেনিং না নিয়ে এতদিন বাড়িতে বসে আঙুল চুষতিস না। তোদের দ্বারা ওই মাঠের লড়াই সম্ভব না। তোরা বাড়িতে বসে থাকারই যোগ্য। যখন কিছু করার সময় ছিল, তখন তো লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিলি। এখন আর কারো…”
ফারাজ একটু থামল। কথাটি বলতে অস্বস্তি লাগলেও ভাইদের সামনে নির্মম সত্যটা উচ্চারণ করে ফেলল সে, “কারো চুলও ছিঁড়তে পারবি না তোরা!”

রাগে ফারাজ চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। আসলে তার ভেতরেও একটা গোপন ক্ষত আছে। সে মনে মনে চেয়েছিল তার ভাইয়েরা নিজেদের ভালোবাসার ফুটবল নিয়েই এগিয়ে যাক। কিন্তু যখন বাধা এল, তখন তারা লড়াই না করে পিছু হটে গিয়েছিল। আজ হুট করে আবার নাটক করতে এসেছে দেখে ফারাজের গা জ্বলে যাচ্ছে।
শান সহজে হার মানল না। সে জানে, এই বাড়িতে ফারাজ রাজি হওয়া মানেই সব বাধা কেটে যাওয়া। সে গলার স্বর আরও নিচু করে বলল, “ভাইয়া, প্লিজ এভাবে বোলো না। আমি না খেললে মরে যাব ভাইয়া। আমি সইতে পারব না।”

ফারাজ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল।
“নাটক করছিস? আমার সামনে ন্যাকামি করছিস? মনে রাখিস, আমার কাছ থেকে বিন্দুমাত্র সাহায্য তোরা পাবি না। অন্য যা চাস—টাকা, গাড়ি, বিলাসিতা—সব এনে দেব। কিন্তু ফুটবল নিয়ে কোনো দাবি আমার কাছে রাখবি না। কখনোই না!”
সিফাত আর সহ্য করতে পারল না। সে শানের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ধীরলয়ে বলল, “শান, চল এখান থেকে। এখানে বলে লাভ নেই।”
সিফাত তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলেও সে শক্ত করে পা আটকে দাঁড়িয়ে রইল। সিফাতের হাতটা আবার টেনে ছাড়িয়ে নিল।কিন্তু সিফাত চলে যেতে চাইলো। শান বলল,
“আরে দাঁড়া না।”

সিফাত বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল। শানের হাতটা ঝাপটা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তিতা গলায় বলল,
“দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে? ভাইয়া তো পরিষ্কার বলেই দিল আমাদের জন্য কিছু করবে না। চল এখান থেকে”
ফারাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে সিফাতের দিকে তাকাল। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা রুমের ভেতর জেঁকে বসল। ফারাজ ধীরস্থির কিন্তু গম্ভীর গলায় আদেশ করল, “সিফাত, আমার দিকে তাকা তো!”
সিফাত এক পলক তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই দৃষ্টি নামিয়ে নিল। তার এই চোখাচোখি এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গি ফারাজের মনে সন্দেহের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিল। ফারাজ জেরা করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“তোর চোখ এমন লাগছে কেন? লাল হয়ে আছে কেন রে?”
ফারাজের প্রশ্নে শানের বুকটা ধক করে উঠল। গত কয়েকদিন সে সিফাতের সাথে ছায়ার মত লেগেছিল,এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেয়নি—যাতে সিফাত ওই মরণনেশা ড্রাগের ধারেকাছেও যেতে না পারে। এত নজরদারির ফাঁক গলে সিফাত আবার ওটা নিল কখন? শান আতঙ্কে সিফাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই কি আবার ড্রাগ নিয়েছিস?”
সিফাত কোনো অনুশোচনা ছাড়াই অবলীলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

শানের চোখ কপালে উঠল।
“কখন নিলি? আমি তো সারাক্ষণ তোর সাথেই ছিলাম!”
“বাথরুমে গিয়ে নিয়েছি।”—সিফাতের গলায় একধরণের নির্লিপ্ততা।
শান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “বাথরুমে গিয়ে কেউ ড্রাগ নেয়? তুই যে আস্ত একটা নেশাখোর হয়ে গেছিস, সেটা তোর কথাতেই বোঝা যাচ্ছে।”
ফারাজ বাঘের মতো ধীরপায়ে সে সিফাতের দিকে এগিয়ে এল। সিফাতের থুতনিটা শক্ত করে ধরে মুখটা নিজের দিকে উঁচিয়ে ধরল সে। সিফাতের চোখের মণি আর চেহারার ফ্যাকাসে ভাব দেখে ফারাজের বুঝতে আর বাকি রইল না যে কী ঘটেছে। সে দাঁত চিবিয়ে প্রশ্ন করল, “ড্রাগ নিয়েছিস?”
নেশার ঘোরে সিফাতের ভেতর এখন আর কোনো ভয় নেই। সে বড় ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে জবাব দিল, “হ্যাঁ নিয়েছি, তো কী হয়েছে?”

মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপরেই রুমের ভেতর চড়ের একটা প্রচণ্ড শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। ফারাজের হাতের শক্ত চড়টা সিফাতের গালে গিয়ে পড়ল। অপ্রস্তুত সিফাত টাল সামলাতে না পেরে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। শান পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝখানে দাঁড়াতে চাইলে ফারাজ তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল।
ফারাজ এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ছোট ভাইয়ের এমন অধঃপতন সে সহ্য করতে পারছে না। সে সিফাতের শার্টের কলার চেপে ধরে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “আমার সামনে ড্রাগ নিয়ে আসিস, আবার সেটা অনায়াসে স্বীকার করিস! সাহস তো কম দেখাসনি তোরা! বেশি বেড়ে গেছিস, তাই না? বেয়াদবের দল, থাপ্পড় দিয়ে গালের সবকটা দাঁত ফেলে দেব আজ।”

ফারাজ এবার রক্তচক্ষু নিয়ে শানের দিকে ফিরল। “শান! সত্যি করে বল, তুইও কি এসব শুরু করেছিস? তুইও কি ওর সাথে ড্রাগ নিস?”
রুমের আবহাওয়া এখন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো তপ্ত। শান ভয়ে কাঁপছে, আর সিফাতের গালে ফারাজের হাতের আঙুলের ছাপগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।শান ভয়ে নীল হয়ে গেল। হাত-পা কাঁপছে তার। দ্রুত মাথা নেড়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“না ভাইয়া, না ভাইয়া! খোদার কসম, আমি ওসব ছুঁয়েও দেখি না।”

ফারাজ এক মুহূর্ত স্থির হয়ে তার দিকে তাকাল, তারপর সিফাতের দিকে ফিরে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “গুড! তো সিফাত, তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস, তাই না? ড্রাগ নিস! মানুষ জীবনে কতটা চোট পেলে নেশার অন্ধকার গলিতে পা বাড়ায়, তা কি জানিস? কিসের কষ্টে পড়েছিস তোরা? নাটক দেখে দেখে ড্রাগ নিচ্ছিস আর নিজের জীবনটা ছারখার করছিস। সাথে তোর বাবা-মায়ের জীবনটাও যে পুড়ছে, সে খবর রাখিস? তোর মা বাবার তুই ছাড়া আর কেউ আছে? হাহ্! আমার সামনে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জের মতো স্বীকার করছিস—তোর সাহস দেখে আমি থমকে গেছি। তুই কি ভুলেই গেছিস আমি তোর বড় ভাই?”

সিফাতের ভেতর তখন নেশা আর জেদ মিলেমিশে একাকার। সে গর্জে উঠে বলল, “ভুলিনি! মনে আছে তুমি আমার বড় ভাই। কিন্তু ড্রাগ আমি নিচ্ছি, তাতে তোমার সমস্যা কী? যদি কিছু হয় আমার হবে, তোমার তো কিছু যাচ্ছে না! কিসের অধিকার নিয়ে আজ শাসন করতে আসছ তুমি?”
ফারাজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।আবার সিফাত কে মারতে নিলে, শান বাধা দিয়ে তাকে জাপটে ধরল, কিন্তু ফারাজের মুখ থামল না। সে চিৎকার করে বলল, “আবার আমার সাথে মুখে মুখে তর্ক করছিস? তোর হাড়গোড় ভেঙে দেব আজ। তর্ক করা একদম ভুলিয়ে দেব আমি!”

ফারাজ যখন আবারও তাকে মারার জন্য হাত তুলল, তখনই এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসল সিফাত। সে হুট করে বাচ্চার মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। ঝরঝর করে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। নেশার ঘোর আর কান্নার তোড়ে চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। সে কথাগুলো জড়িয়ে জড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলতে লাগল,
“হ্যাঁ, মারো! মারবে তো! তোমাদের সবার মার খাওয়ার জন্যই তো আমার জন্ম হয়েছে। তুমি মারবে, আব্বু মারবে, মামা মারবে—সবাই মারবে! এতবার না মেরে আমাকে একদিনেই কেন মেরে ফেলো না? কেন বাঁচিয়ে রেখেছ? তোমাদের কাছে কী চেয়েছিলাম আমি? শুধু একটা স্বপ্ন? চেয়েছিলাম নিজের মতো করে বাঁচতে, কিন্তু তোমরা সেই স্বপ্নটাকে শ্বাসরোধ করে খুন করেছ। এখন আর শাসন করে কী হবে ভাইয়া? যে মানুষের স্বপ্ন মরে গেছে, সে তো অনেক আগেই লাশ হয়ে গেছে। আমাকে নতুন করে মারার আর কিছু অবশিষ্ট নেই।”

একদমে কথাগুলো বলে সিফাত আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। জামার হাতায় চোখ মুছতে মুছতে টলমল পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।
ফারাজ পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সিফাতের আর্তনাদ তার বুকের বাম পাশটায় সজোরে আঘাত করেছে। শানও তাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়াল। পুরো ঘরে এক অসহ্য স্তব্ধতা। ফারাজ নিষ্পলক চোখে সিফাতের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন শাসনের রুদ্রমূর্তির বদলে এক ধরণের অপরাধবোধের ছায়া।
সে শানের দিকে না তাকিয়েই ধরা গলায় বলল,

“ওকে বল ড্রাগ না নিতে। মেডিকেলে সমস্যা হবে। ”
ফারাজের গলার স্বরে তখন আর আগের সেই তেজ নেই, বরং এক পরাজিত ভাইয়ের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে।ভাইয়ের কথার গুঢ় অর্থটা বুঝতে পেরেই শানের হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। মুহূর্তেই তার উজ্জ্বল চোখদুটো খুশিতে ঝিকমিক করে উঠল। বাঁধভাঙা সেই উত্তেজনা সামলাতে না পেরে সে আবেগপ্রবণ হয়ে ফারাজকে জাপটে ধরল। কম্পিত ও উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল—
“থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ ভাইয়া! লাভ ইউ সো মাচ। এই জন্যই তোমায় আমি এত ভালোবাসি। থ্যাংক ইউ সো মাচ!”

ফারাজ আলতো করে শানকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর কিন্তু আশ্বস্ত স্বরে বলল, “আজ ফুপাকে নিয়ে ফুপিকে আমাদের বাড়িতে আসতে বলেছি। তুই শুধু খেয়াল রাখিস, ওরা যেন আজ চলে না যায়। আমি সব সামলে নেব।”
বড় ভাইদের ওই একটা বাক্য,’আমি সামলে নেব’—এর আড়ালে যে কতখানি বিশাল পাহাড়সম দায়িত্ব লুকানো থাকে, তা কি আমরা জানি? ছোট ভাইয়ের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো আর সব ঝড়ঝাপটা নিজের বুকে টেনে নেওয়ার ওই দৃঢ় অঙ্গীকারই তো একজন প্রকৃত বড় ভাইয়ের পরিচয়।
শান নিজের আনন্দ আর ধরে রাখতে পারল না। পুনরায় ফারাজকে একবার জড়িয়ে ধরে ঝড়ের বেগে সিফাতের খোঁজে দৌড় দিল।

খান বাড়ির ড্রয়িং রুমের বিশাল সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন শেহজাদ খান ও রাইমা খান। ঠিক উল্টো পাশে সিফাতের বাবা সাজিদ সিকদার ও মা শানজানা খান। ফারাজ একদিকে বসে সবটা পর্যবেক্ষণ করছে।শান আর সিফাত পাশের একটি সিঙ্গেল সোফায় একে অপরের গা ঘেঁষে জড়সড় হয়ে বসে আছে, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস টের পাচ্ছে তারা।
নিস্তব্ধতা ভেঙে শেহজাদ খানের কর্কশ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো, “শান, তোমার বিদেশের ফ্লাইটের টিকিট অলরেডি কাটা হয়ে গিয়েছে। অহেতুক সময় নষ্ট না করে গোছগাছ শুরু করো।”
শান এবার আর গতবারের মতো মাথা নত করল না। অতীতে বহুবার সে বাবার শাসনের কাছে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে, যার খেসারত সে আজও দিচ্ছে নিজের ভেতরে গুমরে মরে। আজ তার চোখে পরাজয়ের গ্লানি নেই, আছে এক অদম্য জেদ। সে সাহসে বুক বেঁধে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “ড্যাড, আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি দেশেই থাকব, আমি ফুটবল খেলব।”

ছেলের মুখে এমন সপাটে উত্তর শুনে শেহজাদ খান যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি গর্জে উঠে বললেন, “কী বললে? এখনো ওই থার্ড ক্লাস চিন্তাভাবনা নিয়ে পড়ে আছ তুমি? এই ফুটবল খেলে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কার ফিউচার গড়েছে? বাংলাদেশের ফুটবলের জঘন্য অবস্থা জানো তুমি? এসবের পেছনে সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নেই। চুপচাপ আমার কথা মানো, বড় হয়ে আমার রাজনৈতিক গদিতে বসবে। কিন্তু এরকম ফালতু জেদ ধরে আমি তোমার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে দেব না। দুদিন পর পর ইনজুরি নিয়ে বাড়িতে পড়ে থাকবে আর আমার টাকা নষ্ট করবে—এসব আমি সইব না!”
তিনি সিফাতের দিকে ফিরেও তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “সিফাত, তুমিও ওর কথায় প্রভাবিত হবে না। নিজের ফিউচারে মন দাও। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কোনো বড় ফুটবলার বের হতে পারেনি। আগে ন্যাশনাল টিমের অবস্থা দেখো, তারপর স্বপ্ন দেখো। সাজিদ, তুমি তোমার ছেলেকে ভালো করে বোঝাও।”
সাজিদ সিকদার কেবল মাথা নাড়লেন, কিন্তু তার নির্লিপ্ত ভঙ্গি বলে দিচ্ছিল তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।

বাবার এমন কঠোর তিরস্কারেও শান দমে গেল না। সে আবারও সজোরে নিজের অবস্থান জানান দিল, “আমি এবার তোমার কোনো কথাই শুনছি না ড্যাড। আমি খেলব, বাংলাদেশ টিমের হয়েই খেলব। ইন ফিউচার একজন সফল ফুটবলার হয়ে আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব যে তোমার ধারণা ভুল ছিল।”
ড্রয়িংরুমের উত্তপ্ত বাতাস তখন যেন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। শেহজাদ খান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে শানের জেদকে উড়িয়ে দিতে চাইলেন,

“জোকস করছ?বাংলাদেশ টিম থেকে খেলে ভালো ফুটবলার? হা হা হা। ”
বাবার এই ক্রমাগত অপমান শানের ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় কিন্তু বুকভরা আবেগ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ওটা কেবল ফুটবল না ড্যাড! ওটা আমার স্বপ্ন, ওটা আমার নিশ্বাস নেওয়ার একমাত্র মাধ্যম। ওটাকে যদি আবারও আমার থেকে আলাদা করার চেষ্টা করো, তবে আমি মরে যাব! ফুটবল ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না ড্যাড, কিচ্ছুতেই না!”
শেহজাদ খান ভ্রু কুঁচকে কর্কশ স্বরে বললেন, “এখন আমাকে মরার হুমকি দিচ্ছ তুমি?”
“না ড্যাড, হুমকি দিচ্ছি না। শুধু আগাম জানিয়ে রাখছি—ফুটবল থেকে আমাকে আলাদা করার চেষ্টা করলে আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে থাকবো। ”

শানের চোখ দিয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।
শেহজাদ খান এবার যুক্তির চালে আঘাত করলেন, “আর ওই যে দুদিন পর পর ইনজুরি হয়ে পঙ্গুর মতো ঘরে পড়ে থাকবে, তখন কে চালাবে তোমাকে? সারাজীবন কি আমার ঘাড়ে বসে খাবে? আমি তোমাকে সারাজীবন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারব না, জেনে রেখো।”

এতক্ষণ আগ্নেয়গিরির মতো চেপে থাকা ফারাজ এবার আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। সে সজোরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, দুচোখ আগুনের মতো জ্বলছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল, “আপনি না খাওয়ান ড্যাড, আমি ওকে সারাজীবন বসিয়ে খাওয়াব! আমার সারাজীবনের উপার্জনে ও তিনবেলা পেট ভরে খেলে আমার খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে না। তবুও ও ওর ইচ্ছেটা পূরণ করুক। দয়া করে ওর স্বপ্নে আর বাধা দেবেন না!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৪

ছেলের এমন অভাবনীয় বিদ্রোহী রূপ দেখে শেহজাদ খান কিছুটা থতমত খেলেন। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে প্রশ্ন ছুড়লেন, “আর সিফাত? ওকেও কি তোমার ঘাড়েই বসাবে? ওকেও কে খাওয়াবে?”
ফারাজ এবার বাবার ওপর চরম বিরক্তি নিয়ে ফেটে পড়ল। সে স্পষ্ট আর জেদি গলায় জানিয়ে দিল, “হ্যাঁ, ওকেও খাওয়াব আমি! দরকার হলে সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আমি ওদের দু’জনকে রাজকীয় হালে খাওয়াব। তবুও ওদের স্বপ্নটা আমি আর নষ্ট হতে দেব না!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৬