অস্তরাগের রঙ পর্ব ২০ (২)
তেজরিন উম্মীদ
ফারাজ তখন আক্ষরিক অর্থেই এক গোলকধাঁধায়। একদিকে এক ডজন শালা-শালীর সীমাহীন আবদার আর কিচিরমিচিরে তার মস্তিষ্কের কোষগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করছে, অন্যদিকে মনের গহীনে রুশদী আর উজানের স্মৃতিগুলো বিষাক্ত ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ত্রাতা হয়ে রুশদী আবির্ভূত হলো। ভিড় ঠেলে নিপুণ কৌশলে সে ফারাজকে উদ্ধার করে দোতলার সেই শান্ত নিরিবিলি ঘরটিতে নিয়ে এলো, যা এই বিশাল নানাবাড়িতে রুশদীর একান্ত নিজস্ব এলাকা। বিছানায় ক্লান্ত শের অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
রুশদী আলমারির ওপর সাজানো তার ছোটবেলার পুরনো স্মারকগুলোর ওপর আঙুল বুলাচ্ছিল। ফারাজকে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ঘাড় না ঘুরিয়েই নির্লিপ্ত গলায় শুধাল, “আপনি এখনো ঘুমাননি?এক কাপ চা বা কফি দেব বানিয়ে?”
ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ ততক্ষণে ভেঙে চুরমার। সে পাল্টা কোনো সৌজন্য না দেখিয়ে তপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল, “এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি?”
“জান-এর সাথে,” রুশদী উত্তরটা দিল যেন ভোরের বাতাসের মতোই স্বাভাবিক।
ফারাজের কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল।তার সামনে তার বউ অন্য কাউকে জান ডাকছে, হুইস!দাঁতে দাঁত চেপে সে জিজ্ঞেস করল, “জান-এর সাথে মানে? এই জানটা আবার কে?”
রুশদী এবার একটু ফিরে তাকাল, চোখের কোণে দুষ্টুমির ঝিলিক।
“আরেহ, উজান-এর কথা বলছি। ওকে তো আমরা জান বলেই ডাকি।”
কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা বোধহয় একেই বলে! ফারাজ এমনিতেই উজান আর রুশদীর সখ্যতা দেখে ভেতরে ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলছিল, তার ওপর এই ‘জান’ সম্বোধনটা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। সে কয়েক পা এগিয়ে রুশদীর একদম সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি ওকে জান বলে ডাকছ কেন? আজ থেকে আর ডাকবে না!”
রুশদী বিস্ময় মাখানো গলায় বলল, “কেন? জান আপনার কী ক্ষতি করল শুনি?ওকে বাড়ির সবাই ছোট করে জান বলে ডাকে।আমিও জানকে জান ডাকি”
“উফ! বলছি তো জান বলে ডাকবে না, বিশেষ করে আমার সামনে তো একদমই না!” ফারাজের কণ্ঠস্বর এবার গম্ভীর আর কর্তৃত্বপূর্ণ।
“আজব তো! একটা ছোট ডাকনাম নিয়ে আপনি এত আদিখ্যেতা করছেন কেন?”
ফারাজ যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক উদ্ভট সমাধান দিল, “উজানকে বেশি সংক্ষিপ্ত নামে ডাকার ইচ্ছা হলে ‘উ’ বলে ডাকবে।তবুও জান ডাকতে পারবে না। উ ‘জান’ এর থেকেও ছোটো।”
রুশদী এবার শব্দ করে হেসে উঠল, তবে সে হাসিতে তাচ্ছিল্য মেশানো।
“আমি উজানকে শুধু ‘উ’ বলে ডাকব? আপনার ঘিলু কি সব আলমারিতে তুলে রেখেছেন নাকি? এমন মিনিংলেস কথা বলছেন কেন?”
“আমি মিনিংলেস কথা বলছি?” ফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
“হ্যা!”
“তোমার কাছে আমার কথা অর্থহীন মনে হতে পারে, কিন্তু সাফ জানিয়ে দিচ্ছি—ওকে জান বলে ডাকবে না তো ডাকবে না!”
“পাগল নাকি! ”
“পাগল বলো আর ছাগল বল,তুমি ওকে জান ডাকতে পারবে না। ”
“এতে আপনার সমস্যাটা কোথায়?” রুশদী এবার জেদ ধরল। “আপনাকে নির্ঘাত পাগলে কামড়েছে, তাই অযথা ফাউল কথা বলছেন। আমি উজানকে হাজার বার জান বলব। ও ছোটবেলা থেকেই আমার জান, আর আমি এই অভ্যাস বদলাতে পারব না। জান মানে জান-ই!”
ফারাজ এবার রুশদীর খুব কাছে গিয়ে থমথমে গলায় এক চরম হুমকি দিল, “রুশদী, আরেকবার ওকে জান ডাকলে—তোমার জান দিব আমি ”
রুশদী এক মুহূর্ত ফারাজের রাঙা চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা অবজ্ঞার ঝামটা মারল।
“আচ্ছা তাই? আমি কি আপনাকে ভয় পাই নাকি? আপনার এসব সস্তা হুমকিতে রুশদী দমে যাওয়ার মেয়ে নয়।”
বলেই রুশদী ঘর থেকে গটগট করে বেরিয়ে যেতে লাগল। তার মেজাজটা যেমন তিরিক্ষি হয়ে আছে, তেমনি মনের গহীনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি কাজ করছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে ফারাজ প্রচণ্ড জেলাস। আর হিংসে যখন হচ্ছে, তখন হিংসে আরও বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
ফারাজ পেছনে থেকে আবারও হুঙ্কার ছাড়ল, “রুশদী! তুমি কিন্তু ওকে আর জান বলে ডাকবা না!”
রুশদী না থেমে, দরজার ওপাশ থেকে চিল চিৎকার করে জানিয়ে দিল, “ডাকবই! জান… জান… জান!”
ফারাজ রাগে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। তার সাজানো পৃথিবীতে রুশদী যেন এক অবাধ্য ঘূর্ণিঝড়, যে বারবার তার ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করে যাচ্ছে।
সিফাত তখনো উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, ঘুমের অতল গহ্বরে সে তলিয়ে গেলেও পাশের শান তখনো সজাগ। গায়ে হালকা ব্ল্যাঙ্কেট টেনে নিয়ে সে ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে আছে। তিথির সঙ্গে চ্যাটিং চলছে তার। ক্লাবে যাওয়ার পর থেকেই তাদের এই ভার্চুয়াল আলাপচারিতা বেশ জমে উঠেছে, যদিও তিথির স্বভাবটা শানের কাছে আজও এক বড় রহস্য। মেয়েটা কখনো প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে কথা বলে, আবার কখনো এমনভাবে ইগনোর করে যেন শান তার চেনা জগতের কেউ নয়। এই রোদ, এই বৃষ্টির মতো তার মেজাজ পাল্টানো শানকে যেমন বিভ্রান্ত করে, তেমনি এক অদ্ভুত মায়ায় আচ্ছন্ন করে রাখে।
তিথির নীরব সম্মতি পেয়ে শান সাহস করে তাকে কল করল। সিফাত পাশে শুয়ে থাকা অবস্থায় তিথির সঙ্গে কথা বলা মানেই বিপদের মুখে পা দেওয়া; তার বাঁকা কথা আর রসিকতা সামলানো দায় হবে। তাই শান চুপিচুপি উঠে বারান্দায় চলে এলো। দুপুর বারোটার কড়া রোদ তখন, আকাশে হালকা মেঘের আনাগোনা—সব মিলিয়ে চমৎকার একটা আবহাওয়া।
শান ফোনের স্পিকারে কান ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “হ্যালো!”
ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না। শান একটু নড়েচড়ে বসে আবার ডাকল, “হ্যালো মিস তিথি! শুনতে পাচ্ছেন?”
তিথি যে ওপাশে আছে এবং সব শুনছে, সেটা শান বেশ বুঝতে পারছে। হয়তো মেয়েটা লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে আছে অথবা স্রেফ দুষ্টুমি করছে। শানের ঠোঁটে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও নিচু গলায় বলল, “আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন তিথি? হ্যালো!”
এবার ওপাশ থেকে এক নমনীয় এবং স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “জ্বি!”
মাত্র একটি শব্দ, কিন্তু তাতেই যেন শানের হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওই কণ্ঠের মায়াবী রেশ শানকে মুহূর্তেই মাতাল করে দিল। সে অবচেতনেই নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “কথা বলছেন না কেন?”
“কী বলব?” ওপাশের উত্তরটা একদম সংক্ষিপ্ত।
“কিছুই বলার নেই আপনার?”
“নাহ্!”
শান এবার এক বুক সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল, “আই লাভ ইউ!”
পরক্ষণেই ওপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শান কল্পনা করতে পারল, তিথি হয়তো এখন ফোনের ওপাশে মুখ লুকিয়ে মুচকি হাসছে। শান একটু অস্থির হয়ে বলল, “কী হলো, উত্তর দিন! একটু আগেই তো বললেন বলার কিছু নেই, এখন তো আমি বলার মতো একটা টপিক দিলাম, এবার জবাব দিন।”
তিথি তবুও চুপ। শান হাল না ছেড়ে আবার বলল, “ম্যাডাম, কিছু কি বলবেন?”
“কী বলব?” তিথির সেই একই প্রশ্ন।
“সব কি শিখিয়ে দিতে হবে?”
তিথি এবার একটু দুষ্টুমির সুরে বলল, “শিখিয়ে দিলে কি আপনার খুব অসুবিধা হবে?”
“নাহ্! অসুবিধা হবে না। তবে তাহলে বলুন—আই লাভ
ইউ টু!” শানের কণ্ঠে তখন জয়ের সুর।
“নাহ্!”
“কী নাহ্?” শান অবাক।
“কিছু না।”
“বলবেন না?” শান একটু আদুরে গলায় জেদ ধরল।
“নাহ্!”
“কেন?”
“কারণ… আমি বাসি না!” তিথির কথায় একটা গোপন হাসি লুকিয়ে ছিল।
শানের মনটা কিঞ্চিৎ দমে গেল। সে একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যিই বাসেন না?”
“না!”
“ঠিক আছে!” শানের গলায় অভিমানের ছোঁয়া।
তিথি এবার একটু নড়েচড়ে বসল, “কী ঠিক আছে?”
“কিছু না।”
কথার মাঝপথেই হঠাৎ এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর শানের কানে এল— “ভেতরে আসব?”
শান চমকে দরজার দিকে তাকাল। দেখল তার বিয়াইনের দলবল অর্থাৎ রুশদীর কাজিনরা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তিথির সঙ্গে প্রেমের এই নিভৃত আলাপচারিতায় ছেদ পড়ায় শান একটু বিরক্ত হলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আসুন!”
ওদিকে ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে তিথির মনের ভেতর যেন আশঙ্কার একটা চোরাবালি জেগে উঠল। তার কণ্ঠে মুহূর্তেই ফুটে উঠল তীব্র উৎকণ্ঠা। সে কিছুটা হন্তদন্ত হয়েই জিজ্ঞেস করল, “কে এসেছে? কার সাথে কথা বলছ?”
শানের কানে তিথির সেই ব্যাকুল প্রশ্নটা পৌঁছাতেই তার ঠোঁটে এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। মেয়েরা মুখে যতবারই ‘বাসি না’ বলুক, আগলে রাখার সহজাত আকাঙ্ক্ষাটা ঠিকই কোনো না কোনো সময় বেরিয়ে পড়ে। তিথির এই ঈর্ষামিশ্রিত উৎকণ্ঠাই যেন তার হাজারো না-বলা কথাকে আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার করে দিল। শান দরজায় দাঁড়ানো মেয়েগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে ফোনের ওপাশ লক্ষ্য করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আপনার মতোই আমার আরও কিছু সুন্দরী বিয়াইনের দল এসেছে! আপনি তো ধরা দিচ্ছেন না, দেখি এদের কাউকে পটানো যায় কিনা। রাখি, পরে কথা হবে।”
তিথিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শান কলটা কেটে দিল। মনে মনে সে এক পৈশাচিক আনন্দ পেল। মেয়েটা তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে দিনের পর দিন, এবার সুযোগ এসেছে তাকে একটু অস্থির করার। শান জানে, আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে জ্বলতে ঠিক একদিন তিথি নিজেই এসে ধরা দেবে।
ফোনটা পকেটে পুরে শান রুমের ভেতরে এল। সেখানে লীনা, মিতু আর মিতা দাঁড়িয়ে আছে। সকালে দেখা, এবং তাদের পরিচয় হয়েছে। শান এবার তাদের দেখে এক চিলতে অমায়িক হাসি দিল। সে সহজভাবে জিজ্ঞেস করল, “আরে বিয়াইনের দল যে! অধমের রুমে কী প্রয়োজনে আগমন?”
মিতা মেয়েটা বরাবরই চঞ্চল আর ঠোঁটকাটা। সে চটপটে গলায় উত্তর দিল, “প্রয়োজন আমাদের নয়, আপনাদের! দুপুরে কি না খেয়ে থাকার ইচ্ছা আছে? রুশদী আপু আপনাদের ডাকতে পাঠিয়েছে। খেতে চাইলে জলদি চলুন, নইলে পেটে গামছা বেঁধে থাকতে হবে। আমাদের বাড়ির জনসংখ্যা কত জানেন তো? আপনাদের ভাগের খাবারটা অন্য কারো পেটে যেতে বেশিক্ষণ লাগবে না। তাই তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন। আর এই যে আমেরিকানদের মতো দেখতে আপনার ওই ‘বিদেশি’ বেয়াই সাহেবকে ঘুম থেকে তুলুন।”
শেষ কথাটা সে সিফাতের দিকে আঙুল তুলে বলল। সিফাত গায়ের রঙে আর চালচলনে সত্যিই কিছুটা পশ্চিমা ধাঁচের, আর তার পোশাকের ফ্যাশনও বিদেশি ফুটবলারদের মতো। মিতার মুখে সিফাতকে বিদেশি সম্বোধন শুনে ঘরের বাকি মেয়েগুলোও মৃদু হাসল।
মিতু মেয়েটা স্বভাবে বেশ শান্ত আর নম্র। সে শানের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মনে করিয়ে দিল, “ভাইয়া, আপনারা একটু দ্রুত গোসল সেরে নিচে চলে আসুন। খাবার টেবিলে অলরেডি সব সাজানো হচ্ছে।”
শান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “আচ্ছা, আমরা আসছি।”
মেয়ের দল চলে যেতেই শান ধড়ফড় করে সিফাতকে ডেকে তুলল। এরপর দুজনে দ্রুত গোসল সেরে পরিপাটি হয়ে নিচে নেমে গেল।
বিকেলের আলো তখন মরে এসেছে। আকাশের এক কোণে সিঁদুরে মেঘের আনাগোনা, আর চারদিকের গ্রাম্য পরিবেশে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা। সীতাকুণ্ডের পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া শেখ বাড়ির চারপাশটাকে যেন এক শান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে। দূরের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে বুনো হাঁসের দল উড়ে যাচ্ছে দিগন্তের পানে। পুকুরের জলে সূর্যের শেষ রশ্মিটা চিকচিক করছে, আর গাছগাছালির ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক জানান দিচ্ছে সন্ধ্যা সমাগত। প্রকৃতির এই অবারিত মুগ্ধতা যখন চারপাশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, ফারাজ তখন শেখ বাড়ির ছাদে একা দাঁড়িয়ে নিজের মনের ভেতরের অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করছিল।
দুপুরের খাবারের টেবিলে রুশদী আর উজানের সেই অবাধ হাসি আর খুনসুটি ফারাজের চোখে বিষের মতো বিঁধেছে। ওরা শৈশবে একসঙ্গে বড় হয়েছে কি না, উজান রুশদীর ভাই হয় কি না—এসব যুক্তিতর্ক তার তপ্ত হৃদয়ে কোনো কাজ দিচ্ছে না। তার ওপর রুশদীর সেই দুঃসাহসিক ‘জান’ ডাক তো আছেই, যা ফারাজকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো একঝাঁক শালা-শালীর সীমাহীন জ্বালাতন তো আছেই। ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবছিল, ‘সবই ডিসকাস্টিং! কবে যে এই শ্বশুরবাড়ি থেকে পালানো যাবে!’ সবে একদিন হয়েছে, তাতেই ফারাজের বিরক্তির সীমা নেই।
“আরেহ দুলাভাই! আপনি এখানে!”
হঠাৎ পরিচিত এক কণ্ঠে ‘দুলাভাই’ ডাক শুনে ফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। আবার কোন আপদ এলো ভেবে বিরক্তি নিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখল উজান হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। উজানের মুখ দেখামাত্র ফারাজের শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। এই মুহূর্তে উজানের চেয়ে বড় এন্টি বা শত্রু ফারাজের অভিধানে আর কেউ নেই। তবে ফারাজকে অবাক করে দিল উজানের ডাকটা।
উজান সপ্রতিভ গলায় বলল, “দুলাভাই, নিচে চলুন যাওয়া যাক। আব্বু আর চাচুরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
ফারাজ নিজেকে বড্ড শক্তিশালী এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইল। পকেটে হাত গুঁজে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি উজানের মুখে স্থির রেখে সে ভারী গলায় বলল, “আপনি আমাকে দুলাভাই ডাকছেন কেন? আপনি তো রুশদীর চেয়ে বড়!”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২০
উজান বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হালকা চালে জবাব দিল, “কই বাত নেহি… চালতা হ্যায়!”
ফারাজ সরু চোখে উজানকে মেপে নিল। যতটুকু সে জানে, এই ছেলেটা দীর্ঘদিন ইউরোপে ছিল। এমনকি একসময় পরিবারের বড়দের ইচ্ছা ছিল রুশদীর সঙ্গে যেন উজানেরই বিয়ে হয়। সে তাকে দুলাভাই ডাকছে—বিষয়টা ফারাজকে অবাক করল।ফারাজ আর কথা না বাড়িয়ে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।

পরের পার্ঠ দেন প্লিজ 😫