অস্তরাগের রঙ পর্ব ২১
তেজরিন উম্মীদ
শের পকেটে হাত দিয়ে বীরদর্পণে পুরো শেখ বাড়ি চষে বেড়াচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—রুশদী মমকে খুঁজে বের করা। এই বাড়ি আসার পর থেকে মম যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। সকালে আর দুপুরে খাবার টেবিলে একপলক দেখা হয়েছিল, তারপর আর হদিস নেই। একবার সাহস করে পাপাকে (ফারাজ) বলেছিল মমকে ডেকে দিতে, কিন্তু পাপা এমন একখানা অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো যে, শেরের ছোট্ট কলিজাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। তারপর আর দ্বিতীয়বার উচ্চবাচ্য করার সাহস পায়নি সে।
বাধ্য হয়ে নিজেই অভিযানে নেমেছে শের। বাড়িটা বেশ খোলামেলা আর সুন্দর।বাড়িটা শের এর বেশ পছন্দ হলেও একটা জায়গায় শেরের চরম আপত্তি—এই বাড়ির এক পাল বাচ্চা-কাচ্চা! এরা সারাক্ষণ যেভাবে হৈ-হুল্লোড় আর কিচিরমিচির করে, তাতে শেরের ভীষণ বিরক্ত লাগে। বিশেষ করে কারণে-অকারণে এদের কান্নাকাটি করাটা শেরের কাছে রীতিমতো বিরক্তিকর। অথচ মজার ব্যাপার হলো, এই ক্ষুদে পন্ডিত নিজেও কিন্তু একটা বাচ্চাই! তবে তার বাচ্চাদের সঙ্গে থাকার চেয়ে বেশি পছন্দ বড়দের সান্নিধ্য। শান, সিফাত কিংবা তার প্রিয় মম-এর সাথে থাকতেই সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে মমকে খুঁজছিল শের, এমন সময় সামনে পড়ল সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রাট—এক পাল বাচ্চার দল! বিভিন্ন বয়সের একঝাঁক ছেলেমেয়ে মিলে কী একটা খেলায় মেতেছে। তাদের ভেতর থেকে এক পুচকি মেয়ে কৌতূহলী চোখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “এই বাবু, তোমার নাম কী? তুমি কি আমাদের সাথে খেলবে?”
শের থামল। তারপর পকেট থেকে হাত না বের করেই বড়দের মতো গম্ভীর গলায় জবরদস্ত এক জবাব দিল, “My name is Sheer, Shehran Khan Sheer. And I’m not ‘বাবু’, বুঝতে পেরেছ খুকি? আমি তোমাদের মতো ছোট বাচ্চা নই, দ্যাটস হোয়াই আমি এসব বাচ্চাদের গেমস খেলি না। তাছাড়া বাচ্চাদের সাথে খেলা আমার একদম পছন্দ না। সো, তোমরা খেলো, আমি আসি।”
বাচ্চাদের দলটা হা করে তাকিয়ে রইল। একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল তারা; এইটুকু এক ছেলের মুখে এমন বিজ্ঞের মতো কথা শুনে তাদের পিলে চমকে যাওয়ার দশা। এক সাহসী ছেলে এবার আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল, “তুমি রুশদী আপুর সাথে ঢাকা থেকে এসেছ না? তুমি কি ঢাকা থাকো?”
শের মাথা উঁচু করে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ইয়েস, আই’ম ফ্রম ঢাকা!”
“তুমি কি সবসময় ইংলিশেই কথা বলো?” বাচ্চার দলের পরবর্তী কৌতূহলী প্রশ্ন।
শের এবার একটু দয়া করে উত্তর দিল, “নোপ!”
শের পকেটে হাত দিয়ে গটগট করে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় বাচ্চাগুলোর একজন
জিজ্ঞেস করল, “তুমি কিসে পড়ো?”
শের ভ্রু কুঁচকে একদম বড়দের মতো গম্ভীর গলায় জবাব দিল, “Why should I tell you? It’s none of your business!”
বাচ্চাগুলো একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী দেখছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে এক জোড়া নরম হাত শেরের কাঁধে এসে পড়ল। পরিচিত ঘ্রাণে শেরের মনটা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। ফিরে তাকিয়ে দেখল রুশদী দাঁড়িয়ে আছে।
রুশদী মুচকি হেসে বলল, “কী হয়েছে শের? নতুন বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করছ কেন?”
শের মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল, “মম, এরা বড্ড বেশি কথা বলে। আই ডোন্ট লাইক ইট।”
রুশদী শেরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার দুহাত ধরল। খুব শান্ত গলায় বলল, “শোনো শের, বুদ্ধিমান হওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে তুমি অন্যদের ছোট করে দেখবে। তুমি বড়দের মত বুঝো, কথা বলতে পারো, সেটা ভালো। কিন্তু মনে রেখো, বিনয় হলো সবচাইতে বড় শিক্ষা। যে মানুষ নিজের জ্ঞান নিয়ে অহংকার করে, সে আসলে প্রকৃত জ্ঞানী হতে পারে না।”
শের চুপ করে থাকল। রুশদী আবার বলল, “মানুষের সাথে মেশা শিখতে হয় শের। তুমি আজ যাদের ‘বাচ্চা’ বলে অবহেলা করছ, তাদের সাথেই হয়তো তোমার সবচাইতে সুন্দর সময় কাটতে পারত। একাকীত্ব সঠিক নয়, বরং সবার সাথে মিলেমিশে থাকাটাই হলো আসল বুদ্ধিমত্তা। বুঝতে পেরেছ?”
শের মাথা নিচু করে ছোট করে বলল, “ওকে মম।”
রুশদী হাসল। “গুড বয়। এবার চলো, পাপা তোমাকে খুঁজছে।”
গ্রামের সেই মায়াভরা গোধূলি তখন কেবল মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। আকাশের এক কোণে সিঁদুরে মেঘের আভা ম্লান হয়ে আসছে, আর ঝিঁঝিঁ পোকারা সমস্বরে ঘোষণা করছে সন্ধ্যার আগমন। দিগন্তের বাঁশঝাড় আর তেঁতুল গাছের মাথায় জাঁকিয়ে বসছে একরাশ অন্ধকার। ঠিক সেই মুহূর্তে, বাড়ির ছাদে জমে উঠেছে এক রঙিন আসর।
সন্ধ্যার হিমেল হাওয়ায় ওরা সবাই ছাদে এসে জুটল। ছাদের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাদুর আর মোড়াগুলোতে গোল হয়ে বসেছে সবাই। নীলিমার মতো শান্ত পরিবেশে চলছে হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটি। আড্ডার মধ্যমণি হয়ে আছে রুশদী, পুচকি শের, শান, মিতা, মিতু আর লীনা। যদিও সিফাত সেখানে শরীরী উপস্থিতিতে আছে, কিন্তু তার মনটা পড়ে আছে অন্য কোথাও। কানে দামি হেডফোন গুঁজে সে নিজের মুঠোফোনে বুঁদ হয়ে আছে, যেন জগতের কোলাহল তাকে স্পর্শ করছে না।
আড্ডায় ছিল উজানও। কিন্তু একটু আগেই জরুরি এক কাজে সে গঞ্জে গিয়েছে। আর ফারাজ? সে তো আভিজাত্যের খোলস ছেড়ে বেরোতেই রাজি নয়। রুশদী যখন তাকে ডাকতে গিয়েছিল, ফারাজ এক ঝটকায় তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিয়ে বলেছে, “এসব বাচ্চাদের খেলায় যোগ দেওয়ার মতো সময় আমার নেই।” রুশদীও আর বাড়াবাড়ি করেনি, তার তো আর ঠেকা পড়েনি তাকে সাধার! তবে ফারাজ এর না আাসার আসল করনটা হলে যেখানে উজান আছে, সেখানে ফারাজ এক মুহূর্তও টিকতে পারে না। উজান যেন তার দু’চোখের বিষ।
গোল হয়ে বসা সবাই তখন খেলায় মেতেছে—’ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার’। কাঁচের বোতলটা ঘুরতে ঘুরতে এসে থামল সিফাতের দিকে। সিফাত তখনও গার্লফ্রেন্ড এর সঙ্গে মেসেজ আদান-প্রদানে মহাব্যস্ত। সবার মিলিত চিৎকারে সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখ তুলে তাকাল। প্রশ্ন এলো—”ট্রুথ না কি ডেয়ার?”
সিফাত একটু ভাব নিয়ে অবহেলার সুরে বলল, “ডেয়ার…”
সেই সময় মিতু নিচে গিয়েছিল জল আনতে। মিতা সুযোগ বুঝে মোক্ষম চালটা চালল। মুচকি হেসে বলল, “পারলে মিতু আপুকে পটিয়ে দেখান!”
কথাটা শোনামাত্রই সিফাত আর শান হো হো করে হেসে উঠল। যেন পৃথিবীর সবথেকে সহজ কোনো আবদার শুনেছে তারা। সিফাত তার অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে একবার ঠিক করে নিয়ে বলল, “এত সোজা ডেয়ার? এখনো সময় আছে, চাইলে পাল্টে নিতে পারো।”
মিতা চ্যালেঞ্জের সুরে জবাব দিল, “উমম! কাজটা সোজা না কি বাঁকা, সেটা হাতে-কলমে করলেই বুঝতে পারবেন। পটিয়ে দেখান দেখি, দৌড় কতদূর!”
শান পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, “আরে, মেয়ে পটানো তো সিফাতের বাঁ হাতের খেল! ও তো রীতিমতো লেডি কিলার।”
কিন্তু রুশদী থামিয়ে দিল তাকে। গভীর গম্ভীর স্বরে বলল, “অত সোজা না ভাইয়া। মিতু অন্য ধাতুতে গড়া। ওর পৃথিবীটা আলাদা, খুবই ইনোসেন্ট আর শান্ত। ওর ডিকশনারিতে প্রেম-টেম বলে কিছু নেই। সিফাত ভাইয়া হাজার চেষ্টা করলেও ওকে টলাতে পারবে না। এটা আমার চ্যালেঞ্জ!”
চ্যালেঞ্জ শব্দটা সিফাতের পৌরুষে গিয়ে বিঁধল। সে মেরুদণ্ড সোজা করে বসল। নিজের ওপর অগাধ আত্মবিশ্বাস নিয়ে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, “চ্যালেঞ্জ?”
রুশদীও দৃঢ় স্বরে পাল্টাল, “হ্যাঁ, চ্যালেঞ্জ!”
সিফাতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “যদি আমি ওকে পটাতে পারি, তবে প্রতিদানে আমি কী পাব?”
লীনা উৎসুক হয়ে বলল,
“আমি বাজি ধরলাম, সিফাত ভাইয়া জিতলে আমি আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্পিড খাওয়াব!”
মিতা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, সেও তাল মিলিয়ে বলল, “আমিও তাই দেব!”
সিফাত একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। যেন কোনো ছোটখাটো আবদার শুনেছে সে। কাঁধ নাচিয়ে বলল, “ছ্যাঃ! একটা সামান্য স্পিড ড্রিংকসের জন্য আমি এখন মেয়ে পটাতে যাব? ইজ্জত বলে তো একটা কথা আছে!”
রুশদী এবার গম্ভীর হলো। আসরটা বেশ জম্পেশ করার জন্য সে মোক্ষম এক টোপ ফেলল। সিফাতের চোখে চোখ রেখে বলল, “ঠিক আছে ভাইয়া, যদি আপনি সত্যি ওকে পটাতে পারেন, তবে আপনাকে আমি আইফোন বা লেটেস্ট স্যামসাং গ্যালাক্সি গিফট করব।”
সিফাতের চোখের মণি চিকচিক করে উঠল। সে বেশ আয়েশ করে জানতে চাইল, “এস ২৫ আল্ট্রা লাগবে কিন্তু, তবেই ডিল ডান। রাজি?”
রুশদী তিলমাত্র দেরি না করে হাত বাড়িয়ে দিল। “রাজি! একদম ডান!”
ঠিক সেই মুহূর্তে মিতু ছাদে ফিরে এল। হাতে পানি গ্লাস। সিফাত শিকারি চোখে পরখ করে নিতে লাগল তার লক্ষ্যকে। মিতুর পরনে একদম সাদা ধবধবে একটা সালোয়ার কামিজ। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, কপালে লেপ্টে থাকা কয়েকটা অবাধ্য চুল। মেয়েটা বড্ড বেশি সাদামাটা, যেন এক চিলতে পবিত্র রোদ। ওর হাঁটাচলা আর চোখের চাউনিতে অদ্ভুত এক সারল্য মাখানো, যে কেউ এক নজর দেখলে তাকে বোকা বলে ভুল করবে না। কণ্ঠস্বরটাও বড্ড নরম, যেন বাতাসে ভেসে আসা কোনো মিহি সুর।
সিফাত মনে মনে একটা বাকা হাসি হাসল। ওর ধারণা হলো, এই মেয়ে তো ফু দিলেই নড়ে যাবে! একে পটাতে আর এমন কী কসরত করতে হবে? এটা তো ছেলেখেলা।
রুশদীর দিকে তাকিয়ে সিফাত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “রুশদী, তুমি এস ২৫ আল্ট্রা কেন, এস ২৬-এর অর্ডার দিয়ে রাখো। কারণ, উইনার আমিই হচ্ছি!”
গাড়িগুলো যখন চট্টগ্রাম শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে ছুটছিল, তখন বিকেলের নরম রোদ জানলার কাঁচ চুইয়ে ভেতরে আসছিল। রুশদীদের নানা বাড়ি থেকে সমুদ্রের এই নীল জলরাশি খুব একটা দূরে নয়। বড় বড় গাড়ির বহর নিয়ে শেখ ফ্যামিলির সবাই মিলে আজ এক বিশাল কাফেলা। ফারাজ এর আগে কখনও এত বড় একান্নবর্তী পরিবার দেখেনি। এদের ফ্যামিলি মেম্বার্স এর সংখ্যা দেখে মনে হয়, এই শহরে এমপি কে হবে—সেটা হয়তো এই এই ফ্যামিলি ঠিক করে। চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগণমন হয় এই ফ্যামিলিতে। আর সাথে সেই ল্যাদা বাচ্চাগুলোর চিৎকার-চেঁচামেচি তো আছেই, যা ফারাজের বিরক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিকেলের শেষ ভাগ। সূর্যটা তখন আকাশ আর সমুদ্রের মোহনায় হেলে পড়েছে। সমুদ্রের নোনা বাতাসে এক অদ্ভুত মাদকতা, আছড়ে পড়া ঢেউগুলো ফেনা তুলে বেলাভূমিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। বালুচরে ঝাউবনের শনশন শব্দ আর পর্যটকদের কোলাহল মিলেমিশে একাকার। সবাই যখন ছবি তোলায় মত্ত, সেলফি আর হাসিতে মেতে আছে—ফারাজ তখন অনেক দূরে নিজের গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে একা দাঁড়িয়ে। তার কাছে এই সমুদ্র, এই হাওয়া—সবই বিষাদময়। চট্টগ্রামের এই পরিবেশ তার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। মনে মনে সে পণ করে ফেলেছে, আজ রাতেই যেভাবেই হোক সে ঢাকা ফিরে যাবে।
ফারাজের স্থির দৃষ্টি শুধু একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে—রুশদী। সে তার পরিবারের সবার সাথে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে, ছবি তুলছে। আর ঠিক তখনই দৃশ্যপটে উদয় হলো ফারাজের দু’চোখের বিষ—উজান। ওদের গ্রুপ ফটো তোলা হবে, তাই উজান পটু ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো ফারাজের দিকে। বেশ অমায়িক স্বরে ডাকল, “দুলাভাই, চলেন! সবাই ডাকছে, একটা গ্রুপ ফটো তুলব।”
ফারাজ এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। ‘দুলাভাই’ শব্দটা এখন ওর কানে তপ্ত সিসার মতো লাগে। বিশেষ করে যখন এই সম্বোধনটা উজানের মুখ থেকে বের হয়, তখন ফারাজের সমস্ত শরীর ঘৃণায় আর বিরক্তিতে রি রি করে ওঠে। সে কিছুতেই মেলাতে পারে না—একটা মানুষ তার পছন্দের নারীর স্বামীকে এত সহজে দুলাভাই বলে ডাকতে পারে কী করে? অবিশ্বাস্য!
কথায় আছে, ‘ম্যান উইল বি ম্যান’। উজান যে এখনো রুশদীকে মনে মনে কতটা ভালোবাসে, সেটা ফারাজের জহুরি চোখ ঠিকই ধরে ফেলেছে। রুশদীর দিকে উজানের তাকানোর ধরন, ওর প্রতি যত্নশীল আচরণ আর কথা বলার সুর—সবকিছুই চিৎকার করে উজানের অপ্রকাশিত অনুভূতির জানান দেয়। শেখ ফ্যামিলি বা রুশদী হয়তো এটাকে গভীর বন্ধুত্ব বলে চালিয়ে দেয়; কারণ ওরা ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে। রুশদীর মনে হয়তো উজানের জন্য ভাই বা বন্ধুর বাইরে অন্য কোনো জায়গা নেই, কিন্তু উজানের মনে যে গভীর ক্ষত আর টান আছে, সেটা ফারাজ স্পষ্ট বুঝতে পারে।
ঠিক এই কারণেই উজানের রুশদীর ছায়া মাড়ানোও ফারাজের সহ্য হয় না। কোনো স্বামীই হয়তো তার স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিক বা একপাক্ষিক প্রেমিকের এমন কেয়ারিং আচরণ মেনে নিতে পারে না। উজান যেন ফারাজের জীবনের সেই অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, যাকে সে ঘৃণা করতে চাইলেও অবজ্ঞা করতে পারছে না।ফারাজ সামনের বিশাল নীল জলরাশির দিকে একপলক তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখ সরালো। তার দৃষ্টি গিয়ে থমকাল উজানের ওপর। ছেলেটার মুখে সেই পরিচিত, অমায়িক হাসি। ফারাজ তার চোয়াল শক্ত করে, অন্ধকার মুখে অত্যন্ত তিক্ততার সাথে বলল, “তোমার মতো শালা দুনিয়ার আর কাউকে না দিক আল্লাহ!”
কথাটা যেন উজানের কাছে এক বিরাট প্রাপ্তি! সে মুহূর্তেই দারুণ কৃতজ্ঞ হওয়ার ভান করে বুকে হাত রাখল। কণ্ঠে বিনয় ঢেলে দিয়ে বলল, “ধন্যবাদ দুলাভাই! শালা হিসেবে আমি হয়তো ১০০-তে ১০০, কিন্তু দুলাভাই হিসেবে আপনি তো ১০০-তে ৫০০! আপনার মতো দুলাভাই প্রত্যেকটা শালার হোক। ”
উজানের ঠোঁটে আবারও সেই অমলিন হাসির ঝিলিক। ফারাজ মনে মনে কিঞ্চিৎ বাঁকা হাসল। সে জানে, এই ছেলেটা অস্বাভাবিক ধূর্ত আর বুদ্ধিমান। ফারাজের সাথে কথা বলার সময় প্রতিটা সেকেন্ড সে নিজেকে অসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখে, যেন কোনোভাবেই ভেতরের আসল মানুষটা বেরিয়ে না আসে। কিন্তু ফারাজও কম ধুরন্ধর নয়; উজানের এই স্বাভাবিক ব্যবহারের আড়ালে যে নিপুণ অভিনয় চলছে, তা ধরতে তার এক মুহূর্ত সময় লাগে না।
আসলে ফারাজের মুখোমুখি দাঁড়ালে উজান হয়তো অবচেতনেই নিজের হারানো শৈশব আর পছন্দের মানুষটাকে হারানোর আফসোস করে। অথবা হয়তো তীব্র হিংসা হয় তার। সেই আদিম হিংসা—ইশ, সে যদি আজ ফারাজের জায়গায় থাকতে পারত! রুশদী যদি তার হতো! নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষটা আজ অন্য কারো পরিচয়ে পরিচিত, এটা মেনে নেওয়া কতটা দহনকাল তা কেবল উজানই জানে। তার চেয়েও বেশি কষ্টকর হলো, সকলের সামনে স্বাভাবিক থাকার নাটক করা। এই যে সে দাঁত বের করে হাসছে, এই হাসির আড়ালে যে কত সহস্র অব্যক্ত যন্ত্রণার হাহাকার লুকিয়ে আছে, তা আর কেউ না বুঝলেও ফারাজ ঠিকই পড়ছে। ওই চওড়া হাসিতেও মিশে আছে বিষাদ।
ফারাজ একবার আড়চোখে উজানের দিকে তাকিয়ে পুনরায় দৃষ্টি ফেরালো সমুদ্রের বেলাভূমির দিকে। সেখানে সব কাজিনদের নিয়ে আনন্দে মেতে আছে রুশদী। ফারাজের দৃষ্টি অনুসরণ করে উজানও তাকালো। রুশদীরা তখন সমুদ্রের নোনা জলে পা ভিজিয়ে বরফ-পানি টাইপের কোনো এক খেলায় মত্ত। বালুচরে ছোট বাচ্চাদের মতো চঞ্চল পায়ে দৌড়াচ্ছে রুশদী। মেয়েটা বরাবরই এমন—একটু আনন্দ পেলেই সব ভুলে চঞ্চল হয়ে ওঠে, বাচ্চাদের সাথে মিশলে সে নিজেই এক মস্ত বড় বাচ্চা হয়ে যায়।
রুশদীর সেই নিষ্পাপ আনন্দমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে উজানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন কোনো এক অজানা ভারে টনটন করে উঠল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সেই মেকি হাসির প্রলেপ ঠোঁটে মেখে উজান শান্ত স্বরে বলল, “দুলাভাই, আপনি কিন্তু জিতছেন। ”
ফারাজের কণ্ঠস্বরে তখন পাথুরে কাঠিন্য। সে দৃষ্টি না সরিয়েই সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “হোয়াই…?”
উজান সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “কারণ রুশদীর মতো একটা মেয়েকে আপনি লাইফ পার্টনার হিসেবে পেয়েছেন। দিনশেষে জীবনটা তো আপনারই হলো।”
“আর তুমি যে হেরে গেছ, তার জন্য বুঝি খুব কষ্টে আছো?” ফারাজের স্বরে তীক্ষ্ণ শ্লেষ।
উজান মুহূর্তেই আত্মরক্ষার ঢাল তুলে ধরল। অবহেলার সুরে বলল, “হেরেছি মানে? আর কিসের কষ্ট! আমার মতো ছেলে কি কখনও কষ্টে থাকে? আমি তো সবসময় চিল মুডে থাকি, দুলাভাই।”
আবারও সেই নিখুঁত অভিনয়ের চেষ্টা। ফারাজ এবার সরাসরি আক্রমণ করল। শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টিতে উজানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি রুশদীকে পছন্দ করতে। আজ তাকে হারিয়ে একটুও কষ্ট পাচ্ছ না—এটাই কি বিশ্বাস করতে হবে?”
উজান এবার একটু থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই হেসেই উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “আমি? রুশদীকে? এই গাধাটাকে আমি পছন্দ করতাম—এই সব ফালতু কথা আপনাকে কে বলেছে দুলাভাই? এই মেন্টাল মেয়েটাকে কে পছন্দ করবে! ওর মতো মেয়ে আমার একদম পছন্দ না। এসব গুজবে কান দেবেন না তো।”
ফারাজ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। বিরক্তির স্বরে বলল, “অভিনয় করার বেশি শখ থাকলে এফডিসিতে যাও, আমার সামনে এসে এসব করতে যেও না। আমি ওসব সহ্য করতে পারি না। আমি সোজাসুজি উত্তর চাই—তুমি কি এখনও ওকে পছন্দ করো?”
মুহূর্তেই যেন সমুদ্রের গর্জন ছাড়া বাকি সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল। উজান নিশ্চুপ। সে বুঝতেই পারেনি ফারাজ সবকিছু এতটা নিশ্চিতভাবে জেনে বসে আছে। তীব্র অস্বস্তি দানা বাঁধল তার চোখেমুখে। এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “আরে না না, এমন কিছু না দুলাভাই। চলেন, সবাই ডাকছে, ছবি তুলি গিয়ে।”
ফারাজ নিজের জায়গায় অনড় থেকে গর্জে উঠল, “Answer my question!”
উজান এবার আর লুকাতে পারল না। দৃষ্টি মাটির দিকে নামিয়ে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করল, “তেমন কি আর…”
“হ্যাঁ না কি না?” ফারাজের কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ়।
উজান দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে একটা গভীর শ্বাস নিল। বুক চিরে আসা সবটুকু সত্য উজাড় করে দিয়ে কেবল একটি শব্দ বলল, “হ্যাঁ!”
ফারাজ তখন ক্ষিপ্র হাতে আলমারি থেকে কাপড়গুলো বের করে লাগেজে ভরছে। তার চোয়াল শক্ত, নড়াচড়া যেন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস। রুশদী ঘরে ঢুকেই অবাক চোখে দৃশ্যটা দেখল। বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, “ব্যাগ গোছাচ্ছেন কেন?”
ফারাজ একবারও মুখ না তুলে গম্ভীর গলায় জবাব দিল, “আমরা ঢাকা যাচ্ছি।”
“আমরা মানে কে কে?”
“আমরা সবাই।”
“কেন হঠাৎ?” রুশদীর কণ্ঠে বিরক্তি।
“ইচ্ছা!” ফারাজের সংক্ষিপ্ত ও রূঢ় উত্তর।
রুশদী এবার দরজার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জেদি স্বরে বলল, “আমি যাচ্ছি না।”
ফারাজ এবার হাত থামিয়ে রুশদীর চোখের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানল। “কেন?”
“আমার ইচ্ছা!” রুশদীও সমানে সমান জবাব দিল।
ফারাজ এবার লাগেজ গোছানো ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বিছানায় বসে শের গভীর মনোযোগে ট্যাবে গেমস খেলছিল। ফারাজ হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে গর্জে উঠল, “শের!”
বাবার এমন কর্কশ আর অতর্কিত চিৎকারে ছোট্ট শের কেঁপে উঠল। হাত থেকে ট্যাবটা বিছানায় পড়ে গেল। সে ভীতু চোখে বাবার দিকে তাকাল; পুচকিটার মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।সে এসল দাঁড়াল রুশদীর পাশে। রুশদী সাথে সাথে আগলে ধরল শেরকে। ক্ষোভ নিয়ে বলল, “অযথা বাচ্চাটার ওপর ওভাবে চিল্লাচ্ছেন কেন?”
ফারাজ রুশদীর প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। শেরকে হুকুমের সুরে বলল, “তোমার চাচুদের রুমে যাও এখনই। দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে যাবে।”
শের আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। বাবার মেজাজ এখন সপ্তম আকাশে,তাই শানদের জন্য বরাদ্দ পাশের গেস্ট রুমেই সে দ্রুত চলে গেল। শের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রুশদী রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “সমস্যা কী আপনার?”
ফারাজ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল, “তোমার প্রবলেমটা কী, রুশদী?”
“সমস্যা তো আপনার! আপনি ঢাকা ফেরার জন্য এত উতলা হয়ে উঠেছেন কেন? কিসের এত তাড়া আপনার?”
“কারণ আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকব না!” ফারাজের কণ্ঠে পাথুরে কাঠিন্য।
“কেন থাকবেন না? কারণটা কী?”
“সেটা তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করি না। চুপচাপ রেডি হও।”
রুশদী এবার ফেটে পড়ল। “অযথা আমার সাথে এই রুড বিহেভিয়ার কেন করছেন আপনি?”
“আমি কোনো রুড বিহেভিয়ার করছি না রুশদী, জাস্ট কথা শোনো।”
“যদি ঢাকা ব্যাক করা আপনার কথা হয়ে থাকে, তবে সেই কথা আমি শুনব না। আমি এখন ঢাকা যাব না, ব্যস!”
ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “অযথা ত্যারামু করছ কেন?”
“এটা আমার অভ্যাস, তাই করছি!” রুশদীও তেরছা জবাব দিল।
ফারাজ আবারও ব্যাগে কাপড় গুঁজতে গুঁজতে বলল, “আমি বারবার এক কথা বলতে পারব না। রেডি হও তাড়াতাড়ি। এক ঘণ্টার ভেতর আমরা বের হব।”
“যাব না আমি!”
“রেডি হতে বলছি!”
“বললাম তো যাব না! এক কথা আপনাকে কতবার বলতে হয়? আমার যাওয়ার ইচ্ছা নেই। আপনার এত যাওয়ার শখ থাকলে আপনি চলে যান, আমি যাব না।”
ফারাজ এবার হাতের কাপড়টা সজোরে বিছানায় আছাড় মারল। দ্রুত পায়ে রুশদীর একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন বিষাক্ত জ্বালা। শীতল গলায় বলল, “আমি চলে যাব আর তুমি এখানে থাকবে? কেন? আমি থাকলে কি তোমার আর উজানের ডিস্টার্ব হচ্ছে? দুজনের তো একে অপরকে খুব পছন্দ! আমি বোধহয় মাঝখানে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছি, তাই না?”
রুশদী স্তম্ভিত হয়ে গেল। অপমানে তার শরীর কাঁপছে।ফারাজ এমন একটা কথা বলতে পারল। ফারাজ এর সন্দেহের কোন জায়গায় তো সে রাখেনি।নিজে থেকে অতীত বলেছে তাকে, সে না বললে তো ফারাজ জানতেও পারতো না কোনদিন। অথচ তাকে এমন কথা শুনতে হলো?ঘৃণাভরে বলল, “ফালতু কথা কম বলবেন!”
“ফালতু কথা না কি ধ্রুব সত্য? সত্যটা গায়ে লাগছে বুঝি?” ফারাজের কণ্ঠে শ্লেষের হাসি।
“উজান আমার ভাই!” রুশদী চিৎকার করে উঠল।
“কিন্তু ও তোমাকে স্টিল পছন্দ করে! ও তোমাকে ভালোবাসে!” ফারাজ এবার সত্যটা সপাটে ওর মুখের ওপর ছুড়ে দিল।
রুশদী এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে আর্তনাদ করে বলল, “তো এখন আমি কী করব? আমি তো ওকে ভালোবাসি না! আমি ওকে ভাই মনে করি, ব্যাস!”
ফারাজ কোনো তর্কে গেল না। আবারও সেই হুকুমের সুরে বলল, “ঢাকা চলো রুশদী!”
রুশদী এবার পাহাড়সম জেদ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখেমুখেও আগুনের আভা। চিৎকার করে বলল, “আমি যাব না, একবার তো বললাম! আপনার যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে আপনি চলে যান, কিন্তু আমাকে বাধ্য করবেন না। আপনি আজ কিছুতেই আমাকে চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যেতে পারবেন না!”
ফারাজের ধৈর্যের শেষ বিন্দুটিও যেন বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। সে পাথুরে গলায় চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করল, “রুশদী, আজ যদি তুমি আমার সঙ্গে ঢাকা ব্যাক না করো, তবে আমার কাছে আর কোনোদিন ফিরতে পারবে না।”
কথাটা তীরের মতো রুশদীর বুক চিরে দিয়ে গেল। রুশদী সহজে কাঁদে না, তার চোখে সচরাচর জল আসে না—কিন্তু আজ বাঁধ ভাঙল। সে স্থির দৃষ্টিতে ফারাজের চোখের দিকে তাকালো; সেখানে দেখল শুধু অন্ধ আক্রোশ আর সন্দেহের লেলিহান শিখা। রুশদীর কণ্ঠস্বর বুজে এল। যে কথাটি সে গোপন রাখতে চেয়েছিল, আজ তা আর চাপা থাকল না।
“আমি যেতে পারব না, কারণ… কাল… কাল…”
কথাটা শেষ করতে পারল না রুশদী। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, যেন ফুসফুসে বাতাস ঢুকছে না। ফারাজ তখনো জিজ্ঞাসু ও কুটিল চোখে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। রুশদী কাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “কাল আমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী! আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন, কিন্তু দয়া করে আমাকে বাধ্য করবেন না। আমি যেতে পারব না!”
মুহূর্তেই যেন চারদিকের সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল। ফারাজের ভেতরের সেই রাগী মানুষটা এক নিমেষে মিইয়ে গেল। নিজের ওপর এক তীব্র ঘৃণা আর ধিক্কার এলো তার। না জেনে রুশদীকে সে কত বড় অপবাদ দিল! এই বাড়িতে কোনো শোকের ছায়া নেই, কোনো বিশেষ আয়োজন নেই; রুশদীও তাকে আগে কোনোদিন বলেনি—ফারাজ জানবে কী করে? তবুও এক অজানা অপরাধবোধে তার মনটা বিষিয়ে উঠল।
রুশদীর দু’গাল বেয়ে তখন তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এই চোখের পানি ফারাজের রূঢ় আচরণের জন্য নয়; বরং মায়ের স্মৃতি মনে পড়তেই তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। সেই অভিশপ্ত দিনটির কথা মনে পড়লে সে আজও নিঃস্ব বোধ করে। যে দিনটিতে সে তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হারিয়েছিল, সেই দিনেই সে তার মার সাথে সাথে বাবা কেউ হারিয়েছিল।বাবার ভালোবাসা থেকেও বঞ্চিত হয়েছিল। মায়ের সেই মমতা মাখা মুখ, শাসনমাখা আদর আর চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়ার দিনগুলো আজও তার স্মৃতিতে সজীব। মায়ের মৃত্যুর পর তার জীবনটা যেন তাসের ঘরের মতো এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
ফারাজ অপরাধীর মতো ধীর পায়ে রুশদীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কী বলে সান্ত্বনা দেবে, তা তার জানা নেই। এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর মায়া নিয়ে সে দুই হাতে রুশদীর কাঁধ ধরল। নরম স্বরে প্রশ্ন করল, “তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন যে আগামীকাল তোমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী?”
রুশদী পরনের থ্রি পিস এর ওড়না টা মুচড়ে ধরে ধরা গলায় বলল, “আমি এই দিনটা মনে রাখতে চাই না … একদম চাই না। তবুও দিনটা অভিশপ্ত হয়ে পঞ্জিকার পাতায় ফিরে আসে। নানু বাড়ির মানুষগুলো আমাকে খুব ভালোবাসে, তারা এই দিনটাতে আমার সামনে টু শব্দটি করে না। কেউ আম্মুর কথা তোলে না এই ভয়ে—পাছে আমি কষ্ট পাই। কিন্তু দিনশেষে তো তিনি আমার মা ছিলেন! তাকে কি ভোলা যায়? ভোলা সম্ভব? ঠিকই কালচক্রের মতো দিনটা ঘুরে ফিরে আমার মগজে বিঁধতে থাকে।”
রুশদীর গলার স্বর কান্নায় বুজে এল। সে আরও গভীর আর্তনাদে বলে চলল, “আমি কাউকে জানতে দিতে চাই না যে আমার মনে আছে।কেউ যখন করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়, কিংবা আম্মুর কথা জিজ্ঞেস করে, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় আর নিঃস্ব মনে হয়। মনে হয় আমার পায়ের তলার মাটি নেই, মাথার ওপর আকাশ নেই। বুক চিরে এক তীব্র হাহাকার আর চাপা কষ্টগুলো সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। মা নেই—এই এক শব্দে আমার পুরো জীবনটা একটা বিশাল শূন্যস্থান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৈশব থেকেই এই শূন্যতা বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।”
রুশদীর চোখের নোনা জলে গাল দুটো ভিজে একাকার। ফারাজ এর আগে কখনো রুশদীকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেনি। যে মেয়েটা সারাক্ষণ ত্যাড়ামি করে, মুখে মুখে তর্ক করে, সে আজ মায়ের স্মৃতিতে একদম ছোট বাচ্চার মতো হাপুস নয়নে কাঁদছে। ফারাজ নিজের ভেতরের সব কাঠিন্য বিসর্জন দিল। সে দুই হাতে রুশদীর গাল দুটো ধরে ওর মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। নিজের আঙুল দিয়ে চোখের লোনা জল মুছে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“বাচ্চাদের মতো কান্না করো না রুশদী, শান্ত হও। এভাবে কান্না করলে কি মানুষটা ফিরে আসবেন? নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো। তার চেয়ে বরং জায়নামাজে দাঁড়িয়ে তোমার মায়ের জন্য মন ভরে দোয়া করো, যেন আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। তুমি তো সবসময় নিজেকে খুব শক্ত মানুষ হিসেবে দাবি করো, তাহলে এখন এই অবুঝ বালিকার মতো কান্না কেন? এটা কি কোনো স্ট্রং পার্সনের লক্ষণ?”
রুশদী তখন আবেগের এক অতল সাগরে নিমজ্জিত। সে তার কান্নারত অবস্থাতেই ফারাজের হাতের কবজি দুটো আঁকড়ে ধরল। ছলছল চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মতো প্রশ্ন করল, “আম্মু কি আমাকে সত্যি ভালোবাসত?”
ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলল, “হুম, বাসত। জগতের সব মা-ই তার সন্তানকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তোমাকেও বাসত, খুব ভালোবাসত।”
“মিথ্যা বলছেন আপনি!” রুশদী হঠাৎ ছটফট করে উঠল, যেন তার ভেতরের কোনো পুরনো ক্ষত আবারও রক্তক্ষরণ শুরু করেছে।
“আমি সত্যি বলছি রুশদী।”
রুশদী এবার কান্নার তোড়ে ভেঙে পড়ে বলল, “তাহলে আম্মু কেন আমাকে একা রেখে চলে গেল? আমার বয়স তখন কতই বা ছিল, বড়জোর ১১ কি ১২! ওই টুকু বয়সে একজন মেয়ের তো তার মাকে সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয়। ঠিক যখন আমার মাথার ওপর ছায়া দরকার ছিল, তখনই তিনি কেন হারিয়ে গেলেন? আম্মু আমাকে ভালোবাসত না, তাই এভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে চলে গেছে!”
ফারাজ রুশদীর কথা শুনে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর অত্যন্ত মায়াভরা কণ্ঠে বলল, “তুমি ভুল বুঝছো রুশদী। মৃত্যু তো মানুষের হাতে থাকে না। তোমার মায়ের হাতে যদি নিজের প্রাণ রক্ষা করার সামান্যতম উপায় থাকত, তবে তিনি কখনোই তোমাকে এই আগুনের মোহনায় ফেলে একা চলে যেতেন না। বিশ্বাস করো, মালাকুল মউতের সঙ্গে যুদ্ধ করে হলেও তিনি তোমার সঙ্গে থেকে যেতেন।”
রুশদী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার সমস্ত শক্তি যেন নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মেঝের ওপর বসে পড়ল। মানুষের জীবনে কোনো না কোনো একটি দুর্বল বিন্দু থাকে, আর রুশদীর ক্ষেত্রে সেই বিন্দুটি হলো তার মা। পৃথিবীর কাছে সে যতই শক্ত আর বেপরোয়া হোক না কেন, মায়ের স্মৃতি স্পর্শ করলেই সে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। তার চোখের পানি আজ কোনো বাধা মানছে না, বুকের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর বিষাদ আজ নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে।
ফারাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে যুক্তি বা উপদেশের চেয়ে রুশদীর জন্য একটা আশ্রয় খুব বেশি প্রয়োজন। যে চলে গেছে সে তো আর ফিরবে না, কিন্তু যে বেঁচে থেকে প্রতিদিন তিলে তিলে মরছে, তাকে তো টেনে তোলা দরকার।
ফারাজ দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে রুশদীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। রুশদী তখন দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কাঁদছে। ফারাজ ধীরস্থিরভাবে রুশদীর হাত দুটো সরালো এবং এক হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের প্রশস্ত বক্ষপিঞ্জরের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার অর্ধাঙ্গিনীকে। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব আর মাতৃহীনতার দহন সইতে সইতে ক্লান্ত রুশদী যেন মরুভূমির বুকে এক চিলতে শীতল ছায়া খুঁজে পেল। সে ফারাজকে দুই হাতে খামচে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
সেই মুহূর্তে রুশদীর মনের অবস্থা কেমন ছিল তা জানা না থাকলেও, ফারাজের ভেতরটা প্রবলভাবে কাঁপছিল। তার দৃঢ়চিত্তের মানুষটা আজ যেন প্রথমবার টালমাটাল হয়ে গেল। ফারাজের ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, এক অজানা আবেগে তার কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এটি ছিল তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম নিবিড় সান্নিধ্য, এক অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ পবিত্র মুহূর্ত।
রুশদী তখনো আক্ষেপ করে বিলাপ করে যাচ্ছিল, “মা কেন আমাকে ছেড়ে গেল ? কেন?”
ফারাজ এবার আর তাকে থামাল না। বরং রুশদীর অবিন্যস্ত চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। আলতো করে তার কপালে একে দিল এক দীর্ঘ ও গাঢ় ভালোবাসার চিহ্ন—একটি চুম্বন। আবারও তাকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে পিষে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২০
“কাঁদো রুশদী! যতটা ইচ্ছে কাঁদো, যতক্ষণ মন চায় নিজেকে উজাড় করে দাও। তোমার ভেতরের সবটুকু আক্ষেপ, সবটুকু হাহাকার আর বছরের জমাট বাঁধা বিষাদ আজ এই নোনা জলের সঙ্গে ধুয়ে মুছে যাক। আজ নিজেকে একদম হালকা করো। আমি চাই না কালকের সূর্য ওঠার পর তোমার মনে আর কোনো মেঘ জমে থাকুক।”
ফারাজ রুশদীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আরও গভীর স্বরে উচ্চারণ করল, “আজ প্রাণভরে কেঁদে নাও, কারণ আমি দ্বিতীয়বার আমার অর্ধাঙ্গিনীর চোখে পানি সহ্য করতে পারব না—আমার রুমাইসা!”

Porer part plz 🙏
পরের পার্ঠ তাড়াতাড়ি দেন প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ 🥲