অস্তরাগের রঙ পর্ব ২২
তেজরিন উম্মীদ
মাতৃহীনা হওয়ার তপ্ত স্মৃতি নিয়ে যখন রুশদীর বয়স মাত্র ১১, তখন থেকেই তার আশ্রয় নানাবাড়ি। শেখ বাড়ির আদরের নাতনি হয়ে বড় হওয়া রুশদী যেন আগলে রাখা এক রূপকথার রাজকুমারী। বাবার দিকের ভাগ্যটা অমাবস্যার মতো অন্ধকার হলেও, নানাবাড়িতে সে পেয়েছে পূর্ণিমার জোছনার মতো অঢেল ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার ভিড়ে উজানের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ছিল একটু অন্যরকম। বয়সের ব্যবধান কম হওয়ায় তারা ছিল একে অপরের প্রাণের বন্ধু। উজানের সেই সযত্ন খেয়াল রাখা থেকেই হয়তো হৃদয়ের কোনো এক কোণে অঙ্কুরিত হয়েছিল এক গভীর অনুরাগ। শরীরকে শিকলে বাঁধা যায়, কিন্তু অবাধ্য মন কি আর শাসন মানে? তাই শত শাসনেও উজানের মনটা পড়ে আছে রুশদীর কাছে।
আজ রুশদীর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। মিলাদ আর দোয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষে রুশদীর আবদারেই তাদের আসতে হলো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। বিষণ্ণতাগুলো নীল জলরাশির কাছে জমা দিতে চায় সে।
আকাশে তখন দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাওয়ার আয়োজন চলছে। অস্তরাগের রক্তিম আভা মেঘের গায়ে মেখে সূর্যটা যেন অতল সাগরে অবগাহন করতে নামছে। আকাশের সেই সিঁদুরে রঙের ছটা আছড়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরের নীল বুকে। চারদিকে এক মায়াবী গোধূলি বেলার রাজত্ব। সমুদ্রের পাড়ে একা দাঁড়িয়ে আছে রুশদী। তার পরনে ধবধবে সাদা থ্রিপিস।শেষ বিকেলের দামাল বাতাস তার ওড়না আর অবাধ্য চুলগুলো নিয়ে মেতেছে এক লুকোচুরি খেলায়। বাতাসের তোড়ে চুলগুলো যখন বারবার তার চোখের ওপর আছড়ে পড়ছে, তখন তাকে অপার্থিব কোনো জলপরীর মতো লাগছে। শুভ্র বসনা সেই তরুণী যেন শোক আর সৌন্দর্যের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
ফারাজ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট, হাতে দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি—তার আভিজাত্য যেন ব্যক্তিত্বকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। দুহাত পকেটে গুঁজে সে মুগ্ধ নয়নে রুশদীকে দেখছিল, সুযোগ দিচ্ছিল তাকে নিজের মতো করে সময় কাটানোর। হঠাৎ রুশদী বালির ওপর বসে পড়ল। উত্তাল ঢেউগুলো এসে বারবার ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে তার নগ্ন পা জোড়া।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, এবার ফেরার পালা। ফারাজ ধীর পায়ে এসে রুশদীর গা ঘেঁষে বসলো। মুহূর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটলো। রুশদী যেন পরম নির্ভরতায় এক নুয়ে পড়া কচি লতার মতো নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল ফারাজের শক্ত কাঁধে। ফারাজের মেরুদণ্ড মুহূর্তেই শরতের আকাশের মতো শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলেও সে সমুদ্রের দিক থেকে দৃষ্টি সরালো না। বরফ শীতল কণ্ঠে কেবল শুধালো, “এই রুশদী!”
“বলুন!” রুশদীর কণ্ঠস্বর সমুদ্রের গর্জনের মাঝেও স্পষ্ট শোনাল।
“তুমি কি কখনো আমার কাছে কিছু লুকাতে চাও?”
রুশদী খানিক অবাক হয়ে ফারাজের দিকে তাকালো, “হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “তুমি চাইলে উজানের ব্যাপারটা আমার থেকে গোপন করতে পারতে। তুমি নিজে না বললে আমি কোনোদিনও জানতাম না।”
রুশদী এবার শান্ত স্বরে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিল,
“আমি আপনার কাছে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখতে চাই না,সেটা যতটাই তিক্ত সত্য হোক না কেন।তাই যা সত্যি, তাই বলেছি।”
ফারাজ আবারও প্রশ্ন করল, “কেন লুকাতে চাও না?”
রুশদী সাগরের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কথা লুকালে সম্পর্কে ফাটল ধরে ফারাজ সাহেব। সন্দেহ বাড়ে। আজ আমার কাছ থেকে না জানলে হয়তো কোনো একদিন অন্যভাবে জানতেন। তখন আপনার মনে হতো, কেন আমি গোপন করলাম? বিষয়গুলো তখন গোলমেলে ঠেকত। যদিও সত্যিটা বলে আমি হয়তো এখনই একটা গোলমাল পাকিয়ে ফেলেছি, আপনিও বেশ সিরিয়াস হয়ে গেলেন। যাক গে, যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। এসব নিয়ে এখন ভেবে ভেবে মাথার চুল পাকিয়ে কোনো লাভ নেই।”
ফারাজ অবাক হয়ে রুশদীকেদেখল। মেয়েটার চিন্তাধারা তাকে বিস্মিত করে।গত কালকের ব্যবহার বাদ দেওয়ার মতন কি ছিল আদৌও?সে শুধালো, “তুমি কি সব বিষয়েই এমন পজিটিভ থাকো?”
“হুম! কারণ যেকোনো বিষয়কে ইতিবাচকভাবে নিলে সেটা জীবনে খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না। তাই মাঝে মাঝে খারাপ পরিস্থিতিকেও পজিটিভলি নেওয়া উত্তম।”
ফারাজ এতদিন রুশদীকে যতটা অপরিপক্ব মনে করেছিল, রুশদী ঠিক তার উল্টো। মানুষের বাইরের খোলস দেখে ভেতরটা চেনা যে কতটা দায়, তা ফারাজ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।ছোটবেলা থেকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রুশদী বড় হয়েছে, তা তাকে সময়ের আগেই পরিপক্ক করে তুলেছে। সে অতিশয় বুঝদার এক মেয়ে; নিজের দায়িত্বগুলো হাসিমুখে কাঁধে তুলে নিতে জানে। তাই তো বিয়ের পর অতীতের সব পিছুটান ভুলে সে বর্তমানে মন দিয়েছে। এই ফারাজই এখন তার বর্তমান, এই ফারাজই তার ভবিষ্যৎ। নিয়তি যাকে পাশে বসিয়ে দিয়েছে, তাকে মেনে না নিয়ে আর উপায় কী?
কিছুক্ষণ দুজনের মাঝে নীরবতা খেলা করল। কেবল সাগরের গর্জন সেই নিস্তব্ধতা ভাঙছে। ফারাজ ধীরস্বরে বলল, “রুশদী, একটা প্রশ্ন করি?”
“করে ফেলুন!”
“তুমি আমাকে স্বামী হিসেবে সত্যিই মানো তো?”
রুশদী একটু হেসে বলল, “না মানার কোনো কারণ আছে? সাক্ষী মেনে কবুল বলেছি, নিজ হাতে রেজিস্ট্রি খাতায় সই করেছি। একই ছাদের নিচে আপনার সাথে থাকছি। তবে মানব না কেন?”
“তার মানে মেনে নিয়েছ?”
রুশদী ফারাজের কাঁধে নিজের মাথার ভারটা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আপনার কাঁধে মাথাটা এমনি এমনি রাখিনি। না মানলে রাখতাম না!”
ফারাজ একটু ইতস্তত করে বলল, “আমাদের বিয়ের তো বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল। তোমার কি মনে হয় আমরা এই কয়েক মাসে একদিনও সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করেছি?”
রুশদী ছোট করে উত্তর দিল, “নাহ্!”
“তবে আমাদের কি নতুন করে সংসার যাত্রা শুরু করা উচিত নয়?”
রুশদী এবার ফারাজের চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসিতে বলল, “আমরা অলরেডি লেট ক্যাপ্টেন সাহেব!”
জোয়ারের জল এসে বারবার ভিজিয়ে দিচ্ছে তাদের চারখানি পা। একটু আগের বৃষ্টিতে পরিবেশটা এখন হিমশীতল, কিন্তু সেই শীতলতার মাঝেও দুজনের হৃদয়ে এক উষ্ণ অনুভূতির ছোঁয়া। সমুদ্রের সেই বালুকাময় তট থেকেই শুরু হলো এই যুগলের এক নতুন পথচলা, এক নতুন যাত্রা। যে যাত্রার গন্তব্য অজানা হলেও বিশ্বাসটা অটুট। এ এক এমন বন্ধন, যা হয়তো কেবল মৃত্যুর কাছেই হার মানবে, তার আগে নয়।ফারাজের গলার স্বরে এক অদ্ভুত জড়তা, অপরাধবোধে যেন নুইয়ে আসছে তার পৌরুষ। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল, “আমি তোমাকে যদি একটা সরি বলতে চাই, তবে কীভাবে বলব?”
গত রাতের সেই তিক্ত ঝগড়াটা ফারাজের মনে কাঁটার মতো বিঁধছে। উজানের কথা শুনে একজন স্বামী হিসেবে তার রক্ত মাথায় চড়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রুশদীর ওপর ওভাবে চিৎকার করাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। রুশদী হয়তো কিছুটা অবাধ্য, কিছুটা চঞ্চল; কিন্তু সে এমন কোনো আচরণ কখনো করেনি যাতে তাকে সন্দেহ করা যায়। নিজের ভুলের ভারে ন্যুব্জ ফারাজ আজ তাই ক্ষমাপ্রার্থী।
রুশদী তার শান্ত শীতল চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, “আপনি সরি কেন বলতে চান?”
“গতকাল তোমার সাথে করা ঝগড়ার জন্য।”
রুশদী খানিকটা রসিকতার সুরেই বলল, “তবে তো আপনার কয়েক শ’ বার আমাকে সরি বলা উচিত! প্রতিদিন তো কিছু না কিছু নিয়ে আপনি আমার সাথে ঝগড়া করেন।”
“কালকের বিষয়টা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল রুশদী।”
“আপনি কি ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে ভুগছেন?” রুশদীর সোজাসাপ্টা প্রশ্ন।
ফারাজ স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতো করে বলল, “হ্যাঁ।”
রুশদী মনে মনে খুশি হলো ফারাজ এর উত্তরে। তবে প্রকাশ করল না।
“তাহলে আর সরি বলার দরকার নেই।”
“কেন?”
রুশদী সমুদ্রের নোনা বাতাসের দিকে মুখ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কারণ আপনি বুঝতে পেরেছেন যে আপনি একটা ভুল করেছেন, আর আপনি তার জন্য অনুতপ্ত। এখানে সরি বলার আর কিছু বাকি নেই। সরি তো কেবল একটা শব্দ মাত্র, অনেক সময় এটি বড় সস্তা আর অর্থহীন মনে হয়। বিশেষ করে যখন আঘাতটা গভীর হয়, তখন শব্দ দিয়ে কি আর সেই ক্ষত পূরণ করা যায়? অনুতাপ যখন ভেতর থেকে আসে, তখন তা প্রকাশের জন্য শব্দের চেয়ে আচরণের পরিবর্তন বেশি জরুরি।”
সে একটু থেমে আবারও বলতে শুরু করল, “তাছাড়া আপনার সরিটা আমি তখন গ্রহণ করতাম, যদি আপনার কথায় আমি কষ্ট পেতাম। সত্যি বলছি, আমি আপনার কথায় বিন্দুমাত্র কষ্ট পাইনি। আপনার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো আমার আচরণ আরও বেশি উগ্র হতো। আপনি নিজেকে সামলে নিয়েছেন,আল্লাহ ভালো জানপ। তাই ওসব গিল্টি ফিলিং আর সরি—দুটোরই এখন আর কোনো দরকার নেই।”
ফারাজ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চাইল, “তুমি বলতে চাইছ তুমি সত্যিই কষ্ট পাওনি আমার ওপর?”
রুশদী এবার ফারাজের কাঁধ থেকে মাথাটা তুলে সোজা হয়ে বসল। বিশাল বঙ্গোপসাগরের দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে বুকভরা এক নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে হালকা করল সে। তারপর ফারাজের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বলল, “আমি বলতে চাচ্ছি না ফারাজ সাহেব, আমি বলছিই যে আমি বিন্দুমাত্র রাগ করিনি। একটু আগেই তো বললাম, আমি সবকিছু ইতিবাচকভাবে নিই। আমার ওপর ওই কথাগুলো বলার অধিকার আপনার ছিল, তাই বলেছেন। জীবনের সব বিষয়ে কষ্ট পেলে চলে না, কিছু কিছু জায়গায় নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখতে হয়। আপনি আমার স্বামী, আপনার অধিকারের জায়গাটা তো আমি অস্বীকার করতে পারি না।”
রুশদী বলল সে কষ্ট পায়নি তবে আসলে একটু হলেও কষ্ট পেয়েছিল,তবে ফারাজ যখন নিজপই গিলটি ফিল করছে। এভাবে সরি চাইতে চাচ্ছে, এটাই তার কাছে তার কষ্ট চেয়ে বেশি মূল্যবান।
সিরিয়াস মুহূর্তটা নিমিষেই হালকা হয়ে গেল ফারাজের এক চিলতে দুষ্টুমিতে। সে বাঁকা হেসে রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাহ্! আপনি তো দেখছি দারুণ জ্ঞানী এক মহীয়সী হয়ে গিয়েছেন, মিসেস শারফারাজ খান! কী সব ভারি ভারি কথা বলছেন!”
“জ্ঞানী ব্যক্তিরা আসলে নিজেকে হুটহাট প্রকাশ করে না। সময় বুঝে করে, যেমনটা আমি এখন করছি।”
ফারাজ এবার আসল জায়গায় খোঁচা দিল, “তা এই খাটো পটলের মাথায় এত জ্ঞান এল কোত্থেকে শুনি?”
‘খাটো পটল’ ডাকটা কানে যেতেই রুশদীর মেজাজের পারদ চট করে চড়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের সেই স্নিগ্ধ আবেশটা যেন এক ফুৎকারে উড়ে গেল। সুন্দর একটা রোমান্টিক সময়কেও এই লোকটা ঝগড়ায় পরিণত না করলে শান্তি পায় না! রুশদী একটা কৃত্রিম হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল, “আপনার কি ঝগড়া না করলে ভাত হজম হয় না, মিস্টার ম্যানারলেস খাম্বা?”
ফারাজ হো হো করে হেসে উঠল, “জানো রুশদী, আমার কানে আজও সেই বাসর রাতের কথা ভাসে। সাদা পাঞ্জাবিতে আমাকে দেখে তুমি ‘কাকতাড়ুয়া’ বলেছিলে!”
রুশদী নাক সিঁটকে বলল, “সেদিন তো কাকতাড়ুয়াই লাগছিল। আর আজ এই সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টে আপনাকে ঠিক একটা ‘বকে’র মতো লাগছে।”
ফারাজ এবার এক ধাপ এগিয়ে বলল, “আর তোমাকে কেমন লাগছে জানো? এই যে তোমার পাখির বাসার মতো উসকোখুসকো চুল, আর এই সাদা থ্রিপিস—সব মিলিয়ে তোমাকে ঠিক কবরস্থানের ‘হাড়চাবানো পেত্নী’র মতো লাগছে!”
রুশদী এবার চরম রেগে গেল। গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে বলল, “আপনি আসলেই একটা ম্যানারলেস! কোথায় কী বলতে হয় তার নূন্যতম জ্ঞান আপনার নেই। এত সুন্দর একটা মুহূর্ত আপনি নষ্ট করে দিলেন। ধ্যাত! থাকুন আপনি আপনার বকবানি নিয়ে, আমি গেলাম।”
রুশদী হনহনিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। রাগে তার পা কাঁপছে। ফারাজ বালির ওপর বসে থেকে রুশদীর বিরক্তি উপভোগ করতে লাগল এবং একসময় শব্দ করে হেসে ফেলল। মেয়েটাকে রাগিয়ে দেওয়ার মাঝে যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আছে, তা ফারাজ আগে জানত না। রুশদী কিছুটা দূরে যেতেই সমুদ্রের বাতাসের তোড় আরও বাড়ল। রুশদীর থ্রিপিস আর চুলগুলো অবাধ্যের মতো উড়ছে, যেন নীল জলরাশির পটভূমিতে এক অপার্থিব দৃশ্য। ফারাজ চট করে ফোন বের করে এই মায়াবী মুহূর্তটা ফ্রেমবন্দি করে নিল।
পরক্ষণেই ফারাজ দৌড়ে গিয়ে রাগী আর মুখে মুখে তর্ক করা তার সেই ‘বেয়াদব’ বউটাকে পাজা করে কোলে তুলে নিল। ফারাজের এই আকস্মিক কাণ্ডে রুশদী থতমত খেয়ে গেল। বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই সে দেখল সে ফারাজের বলিষ্ঠ দুই বাহুর ভেতর বন্দি। ভয়ে এবং অবাক হয়ে সে ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরল।
ফারাজের ঠোঁটের কোণে তখন বিজয়ী এক দুষ্টুমিভরা হাসি।
ফারাজ যখন রুশদীকে পাজা করে কোলে তুলে নিল, তখন সাগরের বাতাস যেন আরও উন্মাতাল হয়ে উঠল। গোধূলির সেই রক্তিম আকাশ নিমেষেই কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। হঠাৎ করেই টুপটুপ করে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করল তাদের ওপর। বৃষ্টির ছাঁটে চারদিকের পরিবেশটা এক লহমায় ধোঁয়াটে আর মায়াবী হয়ে উঠেছে। ফারাজের সাদা শার্ট আর রুশদীর সাদা থ্রিপিস—দুজনের পোশাকই বৃষ্টির জলে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে। ফারাজ সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই রুশদীকে নিয়ে এগোতে লাগল। শব্দ আর সমুদ্রের গর্জনের মাঝে এক অদ্ভুত রোমান্টিক আবহ তৈরি হলো।ফারাজ রুশদীর বুকের ধুকপুকুনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।ফারাজের এমন কাণ্ডে রুশদী মস্তিষ্ক তখন শূন্য।তা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত সেটা বুঝতে পারছে না।সে শুধু তাকিয়ে লোকটির কান্ড দেখছে।
এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, সমুদ্রের নির্জন তীরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তারা যেন এক নতুন কাব্যের সূচনা করল। ফারাজ তার ঠোঁটের কোণে সেই অমলিন হাসিটা ধরে রেখে গুনগুনিয়ে উঠল,
❝গান আপাতত মনে পড়ছে না পড়ে লিখে দিব!”🐸
চট্টগ্রাম থেকে ফেরা হয়েছে ২ দিন হলো। হঠাৎ ফারাজের ট্রিপ পড়ে যাওয়ায় সেদিন রাতেই ঢাকা ফিরতে হয়েছিল তাদের। এক দিনের ট্রিপ শেষ করে আজ দুপুরে বাড়ি ফিরেছে ফারাজ। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি কাটিয়ে ফ্রেশ হয়েই ফারাজ তার চিরচেনা অভ্যাসে ফিরে গেছে। শখের ম্যাকাও পাখি ‘ট্যাটো’র সঙ্গে দেখা করে এখন ব্যস্ত নতুন আনা একজোড়া বিদেশি কবুতর নিয়ে।
এদিকে রুশদীর ওপর বর্তেছে এক কঠিন গুরুদায়িত্ব—শেরকে পড়াতে হবে। সামনেই পরীক্ষা। ফারাজের কড়া শাসন, হয় সে নিজে পড়াবে নয়তো রুশদীকে পড়াতে হবে। শের সানন্দে তার রুশদী মমকেই বেছে নিয়েছে। তবে ফারাজ এক হুমকি দিয়েছে, শেরের রেজাল্ট খারাপ হলে এর কড়া মাশুল কিন্তু রুশদীকেই গুনতে হবে।
পড়ার টেবিলে রুশদী তখন শেরকে ইংরেজি গ্রামার বোঝাচ্ছিল। হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে শের ভারি অদ্ভুত এক প্রশ্ন করে বসল, “আচ্ছা মম, ‘আই ডোন্ট নো’ (I don’t know)-এর বাংলা কী?”
রুশদী খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল, “আমি জানি না!”
শেরের ঠোঁটের কোণে তখন দুষ্টু হাসি। সে মাথা নেড়ে ইশ করে বলল, “ইশ মম! তুমি এত বড় হয়ে গেছো, অথচ সামান্য আই ডোন্ট নো-এর বাংলা জানো না?”
রুশদী একটু অবাক হয়ে আবারও বলল, “শের, আই ডোন্ট নো-এর বাংলা অর্থই হচ্ছে—আমি জানি না!”
শের দুষ্টুমিভরা চোখে তাকিয়ে বলল, “তুমি তো আসলেই দেখছি কিচ্ছু জানো না মম!”
রুশদীর এবার শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, “শের! তুমি কি আমার সাথে মজা করছো? চুপচাপ পড়ো তো। রেজাল্ট খারাপ হলে তোমার বাবা যখন বকা দেবে, তখন আর ওই কাঁদো কাঁদো মুখ করে থেকো না, বলে দিলাম।”
কিন্তু শের নাছোড়বান্দা। সে আদুরে গলায় আবদার করল, “মম প্লিজ বলো না, আই ডোন্ট নো-এর বাংলা কী?”
রুশদী এবার হাল ছেড়ে দিয়ে বিরক্তির সুরে বলল, “বললাম তো আমি জানি না! এখন পড়ো।”
“কেন জানো না? তুমি বড় হয়েও এটা পারো না?” শেরের কণ্ঠে রাজ্যের বিস্ময়।
রুশদী এবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, “আচ্ছা বাবা, আমি তো পারি না। তুমি পারো? পারলে বলো তো দেখি কী?”
শের এবার সগৌরবে দাঁত বের করে হেসে দিল। তারপর রুশদীর দিকে ঝুঁকে এসে বলল, “আই ডোন্ট নো-এর বাংলা হচ্ছে—আই লাভ ইউ মম! তোমাকে ইত্তগুলা ভালোবাসা!”
পুঁচকে ছেলেটার এমন অভাবনীয় উত্তরে রুশদী হোহো করে হেসে ফেলল। এই ছোট্ট ছেলেটা যে তাকে কতটা নিবিড়ভাবে ভালোবেসে ফেলেছে, তা ভেবে তার বুকটা ভরে উঠল। তার মনে হলো, অন্যের সন্তান যদি তাকে এতটা ভালোবাসতে পারে, তবে নিজের সন্তানের আর কী বা প্রয়োজন?
রুশদী হাসিমুখে শেরের পাশে বসে তার তুলতুলে গাল দুটো আলতো করে টেনে দিয়ে বলল, “তোমাকেও এত্তগুলা ভালোবাসা শের সোনা, আমার প্রিয় ‘অ্যাংরি বার্ড’! এবার দুষ্টুমি তোলা থাক, পড়ায় মন দাও।”
শেরের পড়ায় মন বসছে না কিছুতেই। বইয়ের পাতা উল্টে সে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “উফ মম, এত পড়তে ভালো লাগে না!”
রুশদী এবার একটু ভয় দেখানোর সুরে বলল, “না পড়লে কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করবে। আর ফেলটুস ছেলের সাথে কোনোদিন কেউ নিজের মেয়ের বিয়ে দেবে না। তাই ঠিকঠাক পড়ো, নাহলে কিন্তু কপালে বিয়ে নেই!”
বিয়ের কথা শুনে শের লজ্জা পেল, বলল, “উফ মম! তুমি এসব কী বলছো? আমার কি এখন বিয়ে করার বয়স হয়েছে?”
রুশদী হেসে ফেলে বলল, “এখন হয়নি তো কী হয়েছে, একদিন তো হবে। সেদিন তো একটা বউ লাগবে তোমার, তাই না?”
“না, আমি কখনো বিয়ে করব না!”
“কেন করবে না?”
শের মুখটা কুঁচকে বলল, “বিয়ে করতে হয় মেয়েদের, আর মেয়েদের আমার একদম পছন্দ না। এরা উফ—এত কথা বলে! আর কথায় কথায় ভ্যা ভ্যা করে কাঁদে। এজন্যই আমার মেয়েদের একটুও ভালো লাগে না।”
রুশদী এবার একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “তার মানে কি তোমার আমাকেও পছন্দ নয়?”
শের তড়িঘড়ি করে সামাল দিল, “উঁহু! তা বলিনি। তোমাকে আমি সবথেকে বেশি ভালোবাসি। তোমাকে আর পাপা-কে আমি একদম সমান সমান ভালোবাসি। কিন্তু আমার ওই প্রিমরোজকে একটুও পছন্দ না। ও কিছু হলেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে। কথায় কথায় শুধু—ভাইয়া কোলে নাও, ভাইয়া ওটা দাও! জানো মম, ও না ‘চকলেট’কে ‘চলকেট’ বলে! উফ, কী যে বিরক্তিকর! ওকে আমার একটুও ভালো লাগে না। তার ওপর পাপা ওকে এত আদর করে যে আমার হিংসে হয়। ও পাপা-র আদরের ভাগ বসায়, এজন্যই ওই রোজের বাচ্চাটাকে আমার একটু পছন্দ না!”
রুশদী এবার দুষ্টুমি করে বলল, “তাই নাকি? তাহলে তোমার বিয়েটা ওই প্রিমরোজের সাথেই দিয়ে দেওয়া যাক! কী বলো শের? প্রিমা আপুকে আজই বলব নাকি?”
শের মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে বলল, “ইশ মম! তুমি আমার সাথে মজা করছো? ওই পেত্নীটার সাথে আমার বিয়ে!”
শেরের সেই রাগী রাগী আর অসহায় চেহারা দেখে রুশদী আর হাসি চেপে রাখতে পারল না।সশব্দে হেসে উঠল।
রমনা পার্কের কাঠফাটা রোদ আর ঘামঝরানো গরমের মাঝেও চারদিকে এক নিস্তব্ধতা। একটি সিমেন্টের বেঞ্চিতে দুপাশে দূরত্ব বজায় রেখে বসে আছে তিথি আর শান। শান তার মুখে মাস্ক আর মাথায় ক্যাপটা ভালো করে চেপে রেখেছে, কেউ চিনে না ফেলে এই ভয়ে। বেঞ্চের ওপর আয়েশ করে হাত রেখে সে উদাস গলায় বলল, “আমি হয়তো দুই-তিন দিনের ভেতর আবার চলে যাব।”
তিথি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল, ছোট করে
জবাব দিল, “হুম! কবে আসবেন আবার?”
“দেরি হবে।”
“ওহ্!” তিথির কণ্ঠে একরাশ বিষণ্ণতা।
শান এবার তিথির দিকে ফিরে বলল, “এবার ফিরে এসে আপনাকে সরাসরি খান বাড়ির ছোট পুত্রবধূ করে নিয়ে যাব।”
তিথি একটু তেতো হাসল, “মিথ্যা আশা দেওয়া দয়া করে বন্ধ করুন।”
“আমি মিথ্যা আশা দিচ্ছি না তিথি,” শানের স্বরে দৃঢ়তা।
তিথি এবার তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “রুশদীকে কি আমাদের সম্পর্কের কথা বলেছেন?”
“বলা হয়নি। আপনি কি বলেছেন?”
তিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “না! সাহস করতে পারিনি। রুশদী বিষয়টাকে কীভাবে নেবে, ঠিক বুঝতে পারছি না।”
শান অভয় দিয়ে বলল, “আমি বলে দিব, সমস্যা নেই।”
“আপনার ফ্যামিলি কি আমাদের এই সম্পর্ক মানবে?”
“ভাইয়া মানলেই পুরো ফ্যামিলি মেনে যাবে।”
“আর যদি ভাইয়া না মানে?”
শান মৃদু হেসে বলল, “ভাইয়া আজ পর্যন্ত আমার কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখেনি। নিজের দিকটা অপূর্ণ রেখেও সে সবসময় আমাকে পূর্ণ করার চেষ্টা করেছে। আমার একটা আবদার সে রাখবে না—এমনটা হতেই পারে না।”
তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আর্দ্র কণ্ঠে বলল, “আপনি কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবেন তো?”
শান কথা বাড়াল না। শুধু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আপনার হাতটা দিন তো!”
“কেন?”
“আরে দিন না!”
তিথি একটু ইতস্তত করে নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিল। শান তার প্যান্টের পকেট থেকে ছোট একখানা মখমলের বক্স বের করল। সেখান থেকে ঝকঝকে একটি আংটি বের করে সযত্নে পরিয়ে দিল তিথির অনামিকায়। তিথি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই আংটির দিকে।
শান শান্ত স্বরে বলল, “একে বোধহয় বাগদান বা এনগেজমেন্ট বলে। আপনাকে নিজের বলে দাবি করে রাখলাম। ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি শান—একবার যখন কোনো মেয়েকে মন দিয়েছি, তাকেই ভালোবেসেছি। বিয়ে করলে তাকেই করব। আমার এই মন দ্বিতীয় কাউকে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। আপনার প্রতি যে ভালোবাসাটা জন্মেছে, তা অন্য কারো জন্য আসবে না।”
তিথির চোখ দুটো নোনা জলে টলমল করে উঠল। ধরা গলায় বলল, “যদি কখনো এমন সময় আসে যে আপনি নিজেই পিছিয়ে গেলেন?”
“আসবে না!” শানের উত্তর ছিল পাহাড়ের মতো অটল।
তিথি আবারও সতর্ক করল, “আপনি কিন্তু এখনো আমার পরিচয় জানেন না। যদি জানার পর মনে হয় যে এই মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, তখন? আমার পরিচয় কিন্তু খুব একটা সম্মানজনক না শান।”
“আমি আপনাকে ভালোবেসেছি তিথি, আপনার পরিচয়কে নয়। আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।”
❝If you hard, you gotta get
on the floor…if you are a party freak,
then step on the floor
if you are an animal,
Tear on the floor
break a sweet on the floor
yeah! We work in the flower ❞
রাত একটা।গুলশান ২-এর সেই নামী নাইট ক্লাবটির স্পিকারগুলো থেকে তখন বিকট শব্দে গান ফেটে পড়ছে। চারদিকের নীল-লাল আলো আর কড়া পারফিউমের গন্ধে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ। ক্লাবের ভেতরটা তখন আধুনিকতার নামে এক চরম উচ্ছৃঙ্খলতায় মত্ত। ডান্স ফ্লোরে আধো-অন্ধকারে যে যার মতো উদ্দাম নাচানাচিতে ব্যস্ত। তরুণীদের পরনের পোশাকগুলো এতটাই সংক্ষিপ্ত যে সেগুলোকে ঠিক পোশাক বলা চলে কি না, তা নিয়ে সংশয় জাগে। হাতে মদের বোতল আর ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি নিয়ে তারা মিশে যাচ্ছে ভিড়ের মাঝে।
সিফাতের সাথে আজ শানও এখানে এসেছে। সিফাতের মতো রোজ রোজ এই নেশার নরকে আসার অভ্যাস শানের নেই, কিন্তু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আর মনের অবাধ্য টানে আজ সে নিজেকে আটকাতে পারেনি।এই বয়সে ছেলেদের উড়ু উড়ু মন কতক্ষণ আর আটকে রাখা যায়? তাদের টেবিলের ওপর সাজানো দামী মদের বোতল। সিফাত একের পর এক গ্লাস সে খালি করে চলেছে যান্ত্রিকভাবে। ড্রাগ আর অ্যালকোহলে তার শরীর এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, সহজে এখন আর নেশাই চড়তে চায় না।
শান সেখানে বসে আছে বেশ সতর্ক হয়ে। সে জানে, সীমানা পার করলেই বিপদ। যদি কোনোভাবে টলমলে পায়ে বাড়ি ফেরে আর ফারাজের সামনে পড়ে যায়, তবে তার কপালে যে কী দুর্ভোগ আছে—তা ভেবেই শানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সিফাতকে আবার বোতল টানতে দেখে শান হাত বাড়িয়ে বাধা দিল, “সিফাত, অনেক হয়েছে রে। আর খাস না। বাসায় ফিরতে হবে, রাত অনেক হয়েছে।”
নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন সিফাত ঝট করে শানের হাত সরিয়ে দিল। রক্তিম চোখে তাকিয়ে মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল, “শাট আপ! ফাক আ বিচ…”
মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ ব্যাধি, যা মানুষের বিবেক আর মস্তিষ্ককে পঙ্গু করে দেয়। সিফাতের মস্তিষ্ক এখন আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই; সেখানে রাজত্ব করছে কেবল তীব্র নেশার চাহিদা। শান বুঝল, এই অবস্থায় একে বাধা দেওয়া মানেই অকারণে কিছু গালি শোনা। কিন্তু এই অবস্থায় ফেলে রেখে চলেও যাওয়া যায় না। কখন কোন অঘটন ঘটিয়ে বসে ঠিক নেই।
সিফাত গ্লাসের পর গ্লাস শেষ করে একসময় চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে হেলান দিয়ে বসল। ঝাপসা চোখে সে ডান্স ফ্লোরের দিকে তাকাল। সেই আলো-আঁধারির ভিড়ের মাঝে হঠাতই তার দৃষ্টি আটকে গেল এক তরুণীর ওপর। লাল রঙের একটি বডিকন ড্রেস পরা মেয়েটি তখন সুরের তালে শরীর দোলাচ্ছে। মেয়েটির সেই পরিচিত আদল আর আগুনের মতো লাল পোশাকটি দেখে সিফাতের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্কে এক ঝটকায় বিদ্যুৎ খেলে গেল।সেই উগ্র গানের তালে মাতাল ক্লাবের ডান্স ফ্লোরে লাল রঙের বডিকন পরা মেয়েটি যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকাণ্ড। হাঁটু পর্যন্ত ঝুল, ঘাড়ের কাছে সরু ফিতার সেই ড্রেসটি তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে নির্লজ্জভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ঠোঁটে রক্তবর্ণের লিপস্টিক আর মুখের ভারি মেকআপে তাকে কোনো এক পৌরাণিক মায়াবিনীর মতো লাগছে। সোনালী রঙের চুলে কৃত্রিম আলোর ছটা পড়ে এক অদ্ভুত বিভ্রম তৈরি করছে। সুন্দরী সে সন্দেহ নেই, তবে সেই সৌন্দর্য যেন এক বিষাক্ত তৃষ্ণার মতো।
সিফাতের নেশাতুর চোখ সেই লাল রঙের মরণফাঁদে আটকে গেল। মেয়েটিও বোধহয় সিফাতের সুঠাম দেহ দেখে প্রলুব্ধ হয়েছিল। সে চোখ দিয়ে সিফাতকে এক অদ্ভুত ইশারায় কাছে ডাকল। সিফাতের অবচেতন মন তখন একজন সঙ্গিনীর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মরিয়া। শান আবারও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নেশার ঘোরে থাকা সিফাত তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে শানের হাত ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল সেই আগুনের দিকে।
মেয়েদের স্বভাবজাত লাজুকতার কোনো চিহ্ন এই মেয়ের মাঝে নেই। সিফাত কাছে যেতেই এলিসা তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। সিফাতও দেরি না করে মেয়েটির কোমরে হাত রেখে নিজের দিকে টেনে নিল। তার অভিজ্ঞ চোখ এক পলকেই চিনে নিল এই চঞ্চলা হরিণীকে। সে কোনো ভূমিকা না করেই এলিসার গলায় উষ্ণ এক চুম্বন একে দিল। এলিসার চোখেমুখে তখন সম্মতির ঝিলিক।
সিফাত নেশা জড়ানো গলায় ইংরেজিতে শুধালো, “What’s up, darling? And what’s your name?”
মেয়েটি মোহময়ী হাসি দিয়ে উত্তর দিল, “My name is Elisa. What’s yours?”
“Lady Killer!”
“Nice name with a nice body!”
“But your figure is more stunning than your name, babes!”
“Thank you, darling!”
সিফাত আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। সরাসরি প্রস্তাব দিল, “Can I check the flavor of your lipstick?”
এলিসার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সিফাত তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এই কলুষিত পরিবেশে এমন নষ্টামি দেখার মতো সময় কারো নেই; আশপাশের শত শত মানুষ তখন যে যার মতো আদিম খেলায় মত্ত। এলিসা বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা, বরং আরও বেশি আহ্লাদে গলে গিয়ে বলল, “I like your personality, babes! I prefer men who are this direct!”
সিফাত তার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “Do you want to enjoy something more directly, darling Elisa?”
“Why not?”
“Then let’s go!”
এলিসা ক্লাবের একজন নিয়মিত এবং প্রভাবশালী সদস্য। সে সিফাতের হাত ধরে ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত একটি বিশেষ কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।–
রাত তখন আড়াইটা। শান ঠায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, শরীরে রাজ্যের অবসাদ। এমন সময় টলমলে পায়ে ফিরে এল সিফাত। তাকে দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়সমান কোনো পরিশ্রম করে এসেছে, হাঁপাচ্ছে আর ঘামছে। শান বিরক্তি আর উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করল, “কী অবস্থা তোর? ড্রাগ নিয়েছিস নাকি? তোকে খুঁজতে খুঁজতে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, কোথায় গিয়েছিলি তুই?”
সিফাত ধপাস করে চেয়ারে বসে আবার গ্লাসে মদ ঢালতে শুরু করল। নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “ডেটে গিয়েছিলাম!”
“হোয়াট দ্য ফাক! তুই ওই মেয়েটার সাথে ডেটে গিয়েছিলি? তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস জানতাম না!” শানের কণ্ঠে ঘৃণা ঝরে পড়ল।
সিফাত অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, “এনজয় ইওর লাইফ ব্রো! জাস্ট চিল। আমাকে জ্ঞান না দিয়ে তোর যদি কাউকে ভালো লাগে, তুইও যা!”
“আমার রুচি তোর মতো এত জঘন্য না,” বলেই শান রাগে এক নিশ্বাসে কয়েক গ্লাস পান করে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নেশার নীল বিষ দুজনের রক্তে মিশে গেল। শান আর সিফাত—দুজনই এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, পুরোপুরি মাতাল। ক্লাবের ঝাপসা আলো আর কড়া মিউজিকের মাঝে শান হঠাৎ থমকে গেল।
শানের গলার স্বর আতঙ্কে বুজে এল, সে ফিসফিস করে বলল, “ভাইয়া…!”
সিফাত চোখ পিটপিট করে তাকাল, “কীহ?”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২১
“ভা..ভা..ভাইয়া…!” শানের চোখেমুখে তখন জমাট বাঁধা আতঙ্ক। সে হাত দিয়ে পেছনের অন্ধকারের দিকে ইশারা করল। সিফাত টলতে টলতে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির অবয়ব আর রাগী চাউনি দেখে শান বিড়বিড় করল, “দেখতে ঠিক ফারাজ ভাইয়ার মতো লাগছে না?দে..!”
ফারাজ বজ্রকঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে।সিফাত কথা শেষ হওয়ার আগেই সে সজোরে এক বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় কষিয়ে দিল সিফাতের গালে।
