অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৩
তেজরিন উম্মীদ
ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও পুরনো বন্ধুর ফেয়ারওয়েল পার্টি উপলক্ষে ক্লাবেআসতে হলো তার।পুরনো বন্ধু, দেশের বাইরে চলে যাবে, পার্টিতে না আসলেও সে মাইন্ড করতে পারে। তাই বাধ্য হয়ে আসতে হলো তাকে,কিন্তু ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করতেই এক অকল্পনীয় দৃশ্য তাকে থমকে দিল। চারপাশে মদের উগ্র গন্ধ আর আবছা আলো-আঁধারির মাঝে সে যা দেখল, তার জন্য ফারাজ মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
সামনের কাউন্টারের এক কোণায় বসে তার ছোটো দুই ভাই—সিফাত আর শান। তাদের সামনে সাজানো মদের গ্লাস আর বোতল।সিফাতের অবাধ্যতা নতুন নয়, কিন্তু শান!শানও যে এই অন্ধকার জগতে পা ডুবিয়েছে, তা দেখে ফারাজের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। এক মূহূর্তের জন্য সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কোনো ভালো পরিবারের ছেলে মেয়ে অবশ্যই এসব ক্লাবে আসবে না!
ফারাজ যখন ঝড়ের বেগে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সিফাত তখন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা বড় ভাইয়ের এক প্রচণ্ড চড় এসে পড়ল সিফাতের গালে। থাপ্পরের বেগ সামলাতে না পেরে ভারসাম্য হারিয়ে চেয়ার থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল সে।
বড় ভাইয়কে নিজের সামনে দেখে শানের নেশা যেন এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে বুঝতে পারল, আজ আর কোনো নিস্তার নেই। ফারাজ রাগে অন্ধ হয়ে শানের দিকে এগোতেই, শান তড়িৎ গতিতে চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার দুচোখে তখন জল আর অসীম আতঙ্ক।
“ভাইয়া, সরি! কসম ভাইয়া, আর কোনোদিন না! এবারের মতো মাফ করে দাও!” শানের কণ্ঠস্বরে মিনতি আর কান্নার করুণ সুর মিশে ছিল।
কিন্তু ফারাজের বুকের ভেতর তখন আগ্নেয়গিরি ফুটছে। শানের গালেও বসিয়ে দিল এক কড়া চড়। শান এবার কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলল; লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে ফারাজের পা জড়িয়ে ধরল সে। ক্লাবের কানফাটানো মিউজিক ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। ভিড়ের গুঞ্জন থেমে গিয়ে সবার কৌতূহলী চোখের মণি এখন তাদের ওপর নিবদ্ধ।এখানে সিন ক্রিয়েট করা ঠিক হবে না। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলে সে হিসহিসিয়ে বলল, “পা ছাড় শান! বাসায় চল, সেখানে বুঝাব মজা।”
বিপর্যস্ত সিফাত মেঝেতে পড়ে তখনও মাথায় হাত দিয়ে বসে।তার পৃথিবীটা এখন বনবন করে ঘুরছে।পেট উল্টে বমি আসছে।ফারাজ ধমকে উঠল, “সিফাত, উঠে দাঁড়া! এখানে নাটক করিস না।”
সিফাত টলমল পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অবশ শরীরটা তাকে সঙ্গ দিল না। শান তাকে সাহায্য করতে হাত বাড়াতেই দুই ভাই একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন দুই ভাইয়ের এই করুণ দশা দেখে ফারাজের ভেতরটা ঘেন্নায় আর অপমানে রি রি করে উঠল। এই সেই দুই ভাই, যাদের আগলে রাখার জন্য সে বাবার মতো কড়া মানুষের বিরুদ্ধেও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল!
চোখ দুটো খিচে বন্ধ করে রাগ ঘুমানোর চেষ্টা করল সে। বারের ওয়েটারের সাহায্য নিল। দুই ভাইয়ের প্রায় নিথর দেহ কোনোমতে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলল সে। স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরল ফারাজ। রাতের শুনশান রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটল খান বাড়ির দিকে।
রুশদী তখনও ঘুমায়নি, অপেক্ষা করছিল ফারাজ এর জন্য।পানি খেতে নিচে নামলে দেখল,শান ও সিফাতকে কয়েকজন গার্ড ধরাধরি করে শান এর রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।তাদের দেখে স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ মনে হচ্ছে না।রুশদী এ নিয়ে ফারাজকে প্রশ্ন করলে, ফারাজ উত্তর না দিয়ে হনহনিয়ে রুমে চলে গেল।
ফারাজ নিজের ঘরে ঢুকে গায়ের দামি ব্লেজারটা এক ঝটকায় খুলে বিছানায় ছুড়ে দিল। রুশদী ছায়ার মতো পিছু নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজায় লক করল।ফারাজকে রাগান্বিত দেখাচ্ছে।
“এত রাত অবধি কোথায় ছিলেন আপনি? আর ভাইয়াদের অমন অবস্থা কেন?কোত্থেকে নিয়ে আসলেন আমাদের?”
ফারাজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের কলারটা আলগা করল। আয়নায় প্রতিফলিত তার রাগান্বিত মুখখানা।গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, “বারে গিয়েছিল ওরা। সেখান থেকে ধরে নিয়ে এসেছি বেয়াদব দুটোকে।”
রুশদী কথাটায় তেমন রিয়াক্ট করলো না, বড়লোক ঘরের ছেলেদের একটু-আধটু উচ্ছৃঙ্খলতা তার কাছে নতুন নয়। তবে তার খটকা লাগল অন্য জায়গায়। ফারাজ জানল কী করে ওরা বারে গিয়েছিল?মান ওরা বারে গেলে তো আর ঢাক ঢোল পিটিয়ে যাবে না!
“আপনি কীভাবে জানলেন ওনারা ওখানেই আছেন?”
ফারাজ বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। “আমিও ক্লাবে গিয়েছিলাম। নিজের চোখে দেখলাম বসে বসে গিলছে!”
রুশদীর কপালে ভাঁজ পড়ল। সে ফারাজের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। “আপনি ক্লাবে কী করতে গিয়েছিলেন?”
ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। ফারাজ এমনিতে ভাইদের কাণ্ডে চটে আছে, তার ওপর রুশদীর এই জেরা জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালল। সে কপাল কুঁচকে বলল, “আমি সেখানে কী করতে গিয়েছিলাম সেটা তোমার না জানলেও চলবে রুশদী।”
“না, আমার কাছে এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি,” রুশদী হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁধল।ব “ কী করতে গিয়েছিলেন সেখানে?”
“ কাজে!” ফারাজ এড়িয়ে যেতে চাইল।
রুশদী বাঁকা হাসল, “রাত তিনটা বাজে কি তবে আপনি নাইট ক্লাবে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন?”
“রুশদী!” ফারাজের কণ্ঠে সতর্কবাণী।
কিন্তু রুশদী থামল না। সে এক পা এগিয়ে এল। “আসলে আমার জানামতে ওই সময়ে নাইট ক্লাবে কোনো ইবাদত হয় না। সেখানে চলে অশ্লীলতা, মদ আর স্বল্পবসনা নারীদের উদ্দাম নাচ। এর ভেতর আপনি কোন ফরজ কাজটা পালন করতে গিয়েছিলেন, সেটা জানলে আমার মনের খটকাটা কাটত।”
ফারাজ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। রুশদীর চোখের মণি যেন তার ভেতরের সত্যটা টেনে বের করতে চাইছে। সে ধীর স্বরে প্রশ্ন করল, “তোমার কি আমাকে তেমন লোক মনে হয়?”
রুশদী মাথা নাড়াল। “না, আমি জানি আপনি খুব নীতিবান মানুষ। কিন্তু সাধুরা তো অসাধু জায়গায় যায় না। আপনি কাজের নামটা গোপন করছেন দেখেই সন্দেহটা বাড়ছে। নামটা বলেই দিন না, আমার সন্দেহ এক লহমায় ধুলোয় মিশে যাবে!”
“একজন বন্ধুর ফেয়ারওয়েল পার্টি ছিল। দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে তো, তাই বাধ্য হয়ে যেতে হলো।”
রুশদী এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “ওহ!মদ খাওয়ার পার্টি?”
“রুশদী, একটা ক্লাবে বার সেকশন আর সাধারণ রেস্টুরেন্ট সেকশন আলাদা থাকে, বুঝতে পেরেছ?”
“হুম! বেশ বুঝতে পারছি আপনি আমায় নুলা বুঝ দিচ্ছেন,” রুশদী হাতছানি দিয়ে ফারাজকে নিজের কাছে ডাকল, “এদিকে আসুন, চেক করব!”
ফারাজ অবাক হয়ে বলল, “কী চেক করবে?”
“মদ খেয়েছেন কি না?”
ফারাজ এবার হেসেই ফেলল। রুশদীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে দুষ্টুমি করে প্রশ্ন করল, “আমি যদি মদ খেয়েও থাকি, তুমি সেটা টের পাবে কীভাবে?”
রুশদী নিজের নাকে আঙুল ঠেকিয়ে গলার স্বরে কিছুটা তেজ মিশিয়ে বলল, “এই যে আমার ডিটেকটিভ নাক আছে, কী করতে? গন্ধ শুঁকেই সব বুঝে ফেলব!”
ফারাজ মুচকি হেসে টিপ্পনী কাটল, “তোমার
কুকুরের নাক নাকি?”
রুশদী তৎক্ষণাৎ চোখ পাকিয়ে তাকাল। তার সেই ‘
ভয়ংকর চাউনি দেখে ফারাজ নিজের হাসি আর চাপতে পারল না। ভাইদের কান্ড দেখেছে যতটা রাগান্বিত হয়ে গেছিল,তা নিমিষেই পানি হয়ে গেল রুশদীর এমন কথা বার্তা শুনে।ফারাজ দুই হাত দুপাশে মেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করার মতো করে বলল, “ঠিক আছে, কুল! নাও চেক করো।”
রুশদী তার খুব কাছে এগিয়ে এল। ফারাজের বুকের ওপর হালকা ঝুঁকে পড়ে নাক দিয়ে শুঁকে দেখল কোনো উগ্র পানীয়ের ঘ্রাণ আসছে কি না। না, দামী পারফিউমের ঘ্রাণ ছাড়া আর কিছুই নেই। রুশদী কিছুটা হতাশ হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল, “এবারের মতো বেঁচে গেলেন!”
ফারাজ দুষ্টুমির ছলে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কেন? মদ খেয়ে এলে কি আমায় মারতে?”
“নাহ! বড় একটা চুমু দিতাম!” রুশদী খুব সাবলীলভাবে কথাটা বলে ফেলল।
আহ!কি বড়ো লস হয়ে গেল?এটা কোনো কথা? মদ না খাওয়ায় সে একটা চুমু মিস করে গেল? কপট আফসোস নিয়ে কপালে হাত দিয়ে ফারাজ বলল, “শিট! বিশাল লস হয়ে গেল আমার।আগক জানলে একটু লাল পানি খেয়েই আসতাম! তোমার ইয়াম্মি চুমুটা মিস হয়ে গেল,শিট!!”
রুশদী লজ্জা পেলেও তা আড়াল করে চেঁচিয়ে উঠল, “ইস্! ফালতু কথা কম বলবেন। আমার তরফ থেকে এটাই আপনার জন্য ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং—এইসব ড্রিঙ্কস-ফ্রিঙ্কস আমি একদম পছন্দ করি না। যে কারণেই হোক, ভুলেও কখনো এসবের ধারেকাছে যাবেন না।”
ফারাজ এবার এক পা এগিয়ে এল। রুশদীর খুব কাছে গিয়ে নীচু গলায় প্রশ্ন করল, “ইদানীং খুব শাসন করছ আমায়! তা, বউয়ের অধিকার খাটাচ্ছ বুঝি?”
রুশদী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বুক চিতিয়ে জবাব দিল, “বউ যখন, অধিকার তো খাটাবই!”
ফারাজ এবার রুশদীর কোমরের কাছে হাত রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বর এখন গভীর এবং নেশাতুর। “তবে কি আমিও স্বামীর অধিকার খাটাই? কী বলো?”
হঠাৎ এই ঘনিষ্ঠতায় রুশদীর শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক বিদ্যুৎতরঙ্গ বয়ে গেল। সে মৃদু কেঁপে উঠল। ফারাজের চোখের গভীরে থাকা সেই অন্যরকম চাহনি তাকে দিশেহারা করে দিল। কথা গুছিয়ে উঠতে পারল না রুশদী। নিজের ভেতরের প্রবল অস্বস্তি আর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি লুকিয়ে বলল,”স্বামী যখন, তখন অধিকারতো খাটাবেনই! ”
“আচ্ছা তাই!”
“ইয়েস ক্যাপ্টেন!”
” l love you রুমাইসা!”
“উম!এভাবে ভালো লাগছে না অন্য ভাবে বলুন।”
“তুমি আমার জান
হাঁপানি রোগের টান
আজ তো মুরগির রান
বাংলা ছবির গান
আই লাভ ইউ জান!
নাও এবার লাভইউ টু বলো! ”
“হেট ইউ টু!”
ফারাজ কান চুলকে বলল,
“ইদানীং বোধহয় আমি কানে কম শুনি, তুমি লাভ ইউ বলছো।আমি হেট ইউ শুনছি!”
রুশদী ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
“হেট ইউ’ই বলেছি আমি।”
বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে সিফাত। শরীরটা যেন বিষের মতো ভার হয়ে আছে, গতরাতের হ্যাংওভার এখনো কাটেনি। প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র দুর্বলতা; মনে হচ্ছে হাড়ের ভেতর থেকে কেউ সব শক্তি শুষে নিয়েছে। পাশের বাথরুম থেকে শানের ওয়াক ওয়াক শব্দটা তীরের মতো কানে এসে বিঁধছে ওর। ঘুম ভাঙার পর থেকে এই নিয়ে শান কয়েক দফা বমি করল।
বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে সিফাত চেঁচিয়ে উঠল, “এই চুপ করবি? তুই কি প্রেগন্যান্ট নাকি যে এভাবে বমি করছিস? যা চুল গিলতে পারিস না, তা গিলতে গিয়েছিলি কেন? শালা, মেজাজটাই নষ্ট করে দিলি! আর একবার যদি বমির শব্দ পাই, তবে তোকে কোমডে ঢুকিয়ে ফ্লাশ করে দেব!”
বাথরুমের ভেতর শানের নাভিশ্বাস দশা। পেটে কিছু নেই, অথচ পিত্তি জ্বলে যাওয়া বমি দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখ-চোখ ধুয়ে টলমল পায়ে বেরিয়ে এসে বিছানায় ধপ করে বসল সে। মনের ভেতর অপরাধবোধ আর আতঙ্ক সাপ হয়ে দংশন করছে—না জানি গতকাল রাতের কাণ্ডের জন্য ভাইয়া কী শাস্তি তুলে রেখেছেন!
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সাদা খাম ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। শান মাথা তুলে দেখল, ফারাজ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। শানের মুখে কোনো কথা সরল না, কিন্তু ফারাজ বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “তোমার টিকিট। আগামীকালই ফ্লাইট। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ভেবেছিলাম ফুটবলের প্রতি তোমার এই টান, একদিন ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে, কিন্তু তোমার মাঝে আমি সেই জেদ বা শৃঙ্খলা দেখছি না। বিদেশে চলে যাও, মন দিয়ে পড়াশোনা করো। ড্যাডও অন্তত খুশি হবেন।”
শানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। এক মুহূর্তের সামান্য উত্তেজনায় করা ভুলটা যে এতটা প্রকাণ্ড রূপ নেবে, তা ও ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। নিজের স্বপ্ন, নিজের ভালোবাসার ফুটবল—সবই আজ এই ভুলের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। বাড়িতে একমাত্র ভাইয়াই ওর পাশে ছিল, অথচ সেই ভাইয়া আজ নিজ হাতে ওর স্বপ্নের পথ আগলে দাঁড়াল। কক্ষজুড়ে তখন এক ভারী নীরবতা।সিফাত অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে, তবে তার চোখের কোণে লেগে আছে এক চিলতে আশা। যদি ফারাজ ভাই একবার ফিরে তাকান!
ফারাজের-“তোমাদের দুজনের আসলে লজ্জা থাকা উচিত। বড় বড় বুলি আওড়াও, ফুটবল না থাকলে নাকি মরে যাবে! অথচ কয়েকদিন পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ,তোমরা তো মেডিকেল টেস্টেই বাদ পড়ে যাবে। সবটুকু স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিলে! হাহ্! আমিই আসলে ভুল করেছিলাম। তোমদের মতো মেরুদণ্ডহীনদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”
ফারাজ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে চাইলেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই শান আর্তনাদ করে উঠল, “ভাইয়া…!”
বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়ালেন ফারাজ। তার বজ্রকঠিন কণ্ঠে চেচিয়ে উঠল শান এর উপর, “খবরদার! আর একটা বার যদি ভাইয়া বলে ডেকেছিস, তবে থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেব। লজ্জা লাগে না এই মুখে আমাকে বড় ভাই ডাকতে? তোদের জন্য তোদের ড্যাড এর বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি, আর তোরা আমার মুখটা এমনভাবে ডোবালি? তোদের প্রতি বলার মতো কোনো ভাষা আমার অবশিষ্ট নেই।”
শান ডুকরে কেঁদে উঠল, “ভাইয়া প্লিজ, একটা সুযোগ! আমি কসম করছি, এমনটা আর কখনো হবে না। দোহাই তোমার ভাইয়া, এমন কঠোর হয়ো না।”
ফারাজ শীতল গলায় বললেন, “সুযোগ শেষ। তোদের শেষ সুযোগটা তোরা নিজেরাই ড্রেনের নর্দমায় ছুড়ে ফেলেছিস।”
শানের চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে টলটলায়মান পায়ে সিফাত এসে ফারাজকে জাপটে ধরল। নেশার ঘোর এখনো পুরোপুরি কাটেনি, মস্তিষ্ক যেন অবুঝ শিশুর মতো আচরণ করছে। ফারাজের বুকে মাথা রেখে সিফাত হু হু করে কেঁদে ফেলল।
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সে ভাঙা গলায় বলতে লাগল, “আমার নিজের কোনো ভাই নেই ভাইয়া। কিন্তু বাবার পরে তুমিই ছিলে আমার মাথার ওপর সেই বিশাল বটগাছের ছায়া। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান ভাবতাম। ছোটবেলা থেকে আজ অবধি তুমি আমাদের জন্য যা করেছ, নিজের আপন ভাইও বোধহয় এতটা করে না। শানের জন্য যা করেছ, আমার জন্য তার চেয়ে তিল পরিমাণ কম করোনি, বরং বেশিই করেছ। কিন্তু আমি মানুষটা পচে গেছি ভাইয়া! আমি অনেক খারাপ হয়ে গেছি। এই বিষাক্ত নেশা আমাকে গিলে খেয়েছে। কেন যে এমন হয়ে গেলাম জানি না, ভালো-মন্দের বোধশক্তি সব হারিয়ে ফেলেছি আমি…”সিফাতের কণ্ঠ তখন কান্নায় বুজে আসছে, সে ফারাজের শার্ট খামচে ধরে হাহাকার করে উঠল, “বিশ্বাস করো ভাইয়া, কাল শানকে জোর করে আমিই নিয়ে গিয়েছিলাম। ও যেতে চায়নি, ওর কোনো দোষ নেই। সব অপরাধ আমার, সব ভুল আমার! আমি জানি আমার জন্য তোমাকে সবার সামনে ছোট হতে হয়েছে, তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। কিন্তু আমি কী করব ভাইয়া? নেশাটা না করলে আমার মাথা আর কাজ করে না, সব ওলটপালট হয়ে যায়। ওভারডোজ মেডিসিনের ঘোরে আমি পাগল হয়ে যাই, নিজেকে সামলাতে পারি না। তবুও আমি সব ছেড়ে দেব ভাইয়া, তুমি যদি বলো আমি আজই সব ছুড়ে ফেলে দেব। দরকার হলে ফুটবল খেলাও ছেড়ে দেব, কিন্তু প্লিজ তুমি মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমার মতো বখে যাওয়া ছেলেদের জন্য তোমার মতো একটা বটগাছ খুব দরকার। আমার কোনো আপন ভাই নেই ভাইয়া, তুমিই তো আমার সব!”
সিফাতের এই আর্তনাদ আর বুকফাটা স্বীকারোক্তি ফারাজের কঠিন হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল। যে পাথরপ্রতিম কাঠিন্য নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। রাগ বড্ড অভিমানী জিনিস, কিন্তু ভালোবাসার কাছে তা বরাবরই হার মানে।দুই ভাইয়ের এই অসহায়ত্ব দেখে ফারাজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
ফারাজ লম্বা একটা শ্বাস ফেলে সিফাতের মাথায় হাত রাখল।গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বললেন, “তোদের আমি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দেখতে চাই। এবার যেন ট্রফিটা আমাদের দেশেই আসে, মনে থাকে যেন!”
ফারাজের মুখ থেকে এই অভয়বাণী শোনা মাত্রই ঘরের গুমোট পরিবেশ এক নিমেষে জাদুকরীভাবে বদলে গেল। যেন গাঢ় মেঘ কেটে গিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়ল ঘরের ভেতর। শান আর সিফাত মুহূর্তকাল একে অপরের দিকে স্থবির হয়ে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই আনন্দের এক প্রবল জোয়ার আছড়ে পড়ল তাদের ওপর।
“ইয়েসসস! ভাইয়া থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ!” চিৎকার করে উঠল শান।
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২২
এতক্ষণ যে শরীরে একবিন্দু শক্তি ছিল না, সেই শরীরে যেন হাজার ওয়াটের বিদ্যুৎ খেলে গেল। সিফাত খুশিতে আত্মহারা হয়ে ফারাজকে জড়িয়ে ধরে। শানও যোগ দিল তাতে। দুজনের নাচানাচি আর পাগলামি দেখে মনেই হচ্ছিল না কিছুক্ষণ আগে এখানে শোকের ছায়া নেমেছিল। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ঘুরতে লাগল, বিছানার চাদর এলমেলো হয়ে গেল, বালিশগুলো ছিটকে পড়ল মেঝেতে।
তাদের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখে ফারাজের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
