Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৫

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৫

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৫
তেজরিন উম্মীদ

রুশদীর সেই মৃদু কিলের জবাবে ফারাজ তার বাহুবন্ধন আরও কিছুটা শক্ত করল। তপ্ত এক নিশ্বাস তখন ফারাজের প্রশস্ত বুকে আছড়ে পড়ছে অবাধ্য ঢেউয়ের মতো। লজ্জার তীব্রতায় রুশদী চোখ দুটো শক্ত করে বুজে রইল; যেন চোখ মেললেই ফারাজের ওই দুষ্টুমিভরা চতুর চাহনির মুখোমুখি হতে হবে, যা এই মুহূর্তে সহ্য করার মতো সাহস তার নেই। ফারাজ আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল রুশদীর মসৃণ কপালে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার ওপর থেকে রাগটা এবার কমেছে তো? নাকি অভিমানী বউয়ের রাগ ভাঙাতে ক্যাপ্টেন খানকে আরও কিছুটা পরিশ্রম করতে হবে, হুম?”

রুশদী কোনো উত্তর দিল না। কেবল একরাশ লজ্জা নিয়ে ফারাজের বুকে মুখটা আরও গভীরভাবে লুকাল। ফারাজ বুক চিরে এক তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল। রুশদীকে নিজের অস্তিত্বের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়েই একসময় বুজে এলো তার চোখের পাতা। গত তিন দিনের অবিরাম ক্লান্তি আর রাতের এই মধুর শ্রান্তি মিলে তাকে এক গভীর, শান্ত ঘুমের দেশে নিয়ে গেল।
ভোরের ম্লান আলো যখন জানালার সুক্ষ্ম পর্দা গলে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, তখন ফারাজের প্রথম ঘুম ভাঙল। ভোরের সেই আলো-আঁধারিতে রুশদীর ঘুমন্ত, শান্ত মুখখানা দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত সাবধানে, যাতে রুশদীর নিদ্রায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত না ঘটে, নিজেকে আলগোছে সরিয়ে নিল। এরপর বিছানা ছেড়ে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল ফরজ গোসল সারার উদ্দেশ্যে।
ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার মৃদু শব্দে রুশদীর চোখের পাতা নড়ে উঠল। সে চোখ মেলল। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে গতরাতের সেই ভালোবাসার গভীর স্পর্শের রেশ তখনও জ্যান্ত, তীব্র। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের এলোমেলো রূপ আর গলার কাছে ফারাজের দেওয়া ভালোবাসার গাঢ় দাগ নজরে এল। মুহূর্তেই রুশদীর পুরো মুখাবয়ব লজ্জার রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে উঠল। সে এক মুহূর্তও আর ওদিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। এক অদ্ভুত জড়তা আর লজ্জার চাদর যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।

হুট করেই ওয়াশরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো। রুশদী চমকে উঠল—তার মানে ফারাজ এখনই বের হবে! এই এলোমেলো অবস্থায়,ফারাজের মুখোমুখি হওয়ার কথা ভাবতেই তার বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। বিছানার সেই মস্ত বড় ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে একদম পা থেকে মাথা পর্যন্ত মুড়ি দিয়ে একাকার হয়ে রইল।কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে ফারাজ বাইরে বের হয়ে এল। তার পরনে তখন শুধু একটা কালো ট্রাউজার। ভেজা চুলগুলো থেকে দু-এক ফোঁটা পানি টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে তার চওড়া উন্মুক্ত বুকে। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ফারাজ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিছানার দিকে তাকাতেই আচমকা থমকে গেল।
পুরো বিছানাটা ফাঁকা, জনমানবহীন। শুধু এক কোণে একটা বিশাল ব্ল্যাঙ্কেট পুটুলির মতো হয়ে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। ফারাজ মুহূর্তেই পুরো বিষয়টা ধরে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চতুর হাসি ফুটে উঠল। হাতের তোয়ালেটা পাশে রেখে সে ধীর, শব্দহীন পায়ে বিছানার কিনারায় এসে বসল। ব্ল্যাঙ্কেটের পুটুলিটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা ঝুঁকে বেশ রসিকতার সুরে বলল, “কী ব্যাপার রুশদী? সকাল সকাল একদম শীতকালের মতো মুড়ি দিয়ে বসে আছ যে? রাতের বায়োলজির প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের পর কি এখন সোজা হাইবারনেশনে চলে গেলে?”
ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর থেকে রুশদীর কোনো শব্দ এল না। নিথর নীরবতা। তবে ফারাজ স্পষ্ট বুঝতে পারল, ভেতরের মানুষটা লজ্জার তীব্রতায় মনে মনে কাঁপছে। তার দ্রুতগতির হৃদস্পন্দন যেন ব্ল্যাঙ্কেটের ওপর থেকেও টের পাওয়া যাচ্ছে।

ফারাজ এবার ব্ল্যাঙ্কেটের ওপর নিজের হাতটা রাখল। দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, “উঁহু, এভাবে লুকিয়ে থাকলে কিন্তু চলবে না । স্বামী হিসেবে তোমার এই লজ্জাটুকু দেখার পূর্ণ অধিকার তো আমার আছে। নাকি অধিকার খাটিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা আমি নিজেই টেনে সরিয়ে নেব?”
“খবরদার ফারাজ! একদম ব্ল্যাঙ্কেটে হাত দেবেন না!” ভেতর থেকে রুশদীর চেপে রাখা, লজ্জামাখা অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। “আপনি দয়া করে ওখান থেকে সরুন। নিচে যান, নয়তো অন্য ঘরে যান!”
ফারাজ এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। এক চোট শব্দ করে হেসে উঠল সে।এই মেয়ের এত লজ্জা আছে জানা ছিলো না ওর, ফারাজ তো জানত এই মেয়ে তর্কের রানী। না এখন দেখছে লজ্জার রানী

“আজব তো! নিজের ঘরে, নিজের বউয়ের পাশে বসতেও পারব না এখন ? আর এতো লজ্জারই বা কী আছে শুনি? যা হয়েছে তা তো আমাদের ভালোবাসার এক পবিত্র পূর্ণতা। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো মুখটা বের করো তো। ভীষণ খিদে পেয়েছে, একসাথে নিচে গিয়ে নাস্তা করব। তুমি দ্রুত গোসলটা সেরে এসো।”
“আমি যাব না, আমার বিন্দুমাত্র ক্ষুধা নেই! আপনি একাই যান! আপনি ঘর থেকে বের হলে তবেই আমি গোসল করতে যাব।” রুশদী ভেতর থেকেই একদমে জবাব দিল।
রুশদীর এই লজ্জামাখা অস্থিরতা ফারাজের ভেতরের দুষ্টুমিটাকে আরও উসকে দিল। সে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “ও আচ্ছা! তার মানে তুমি চাইছ, ক্যাপ্টেন এখন তার মিষ্টি বউকে কোলে করে ওয়াশরুমে নিয়ে নিজ দায়িত্বে গোসল করিয়ে আনুক? বাহ! সকাল সকাল বউয়ের মুখে এমন রোমান্টিক প্রস্তাব তো মোটেও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যদিও আমি এইমাত্র গোসল করলাম, তবুও প্রিয়তমা স্ত্রীর এমন আবদার কি আর ফেলা যায়?”
“আরেহ্ না! আমি কখন বললাম এসব ফালতু কথা?”
রুশদী ভেতরে বসেই রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ল।সে আবার এসব কখনও বলল?এসব কথা তো সে মাথাতেও আনেনি।

ঠিক তখনই ফারাজ ব্ল্যাঙ্কেটটা এক ঝটকায় সরাতে উদ্যত হলো। রুশদী ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার ফারাজ! একদম আমার ব্ল্যাঙ্কেট সরাবেন না বলছি, আর কোনো ফাজলামো করবেন না!”
“সরি বউ তোমার এই কথাটা রাখতে পরলাম না।”
কথাটা শেষ করেই ফারাজ আর কোনো সুযোগ দিল না। সে এক ঝটকায় রুশদীর চেপে ধরে রাখা ব্ল্যাঙ্কেটটা সরিয়ে দিল। রুশদী কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চোখের পলকে তাকে বিছানা থেকে এক টানে নিজের শক্ত পাঁজাকোলে তুলে নিল।
“আরেহ্! ফারাজ, ছাড়ুন! কী করছেন কী? নামান আমাকে!” রুশদী চরম হকচকিয়ে গিয়ে হাত-পা ছুড়তে লাগল। তার শরীরটা তখন লজ্জায় আর হুট করে ঘটে যাওয়া ঘটনায় কাঁপছিল।
“আমি তো কেবল তোমার ইচ্ছাই পূরণ করছি, জান। একা একা গোসল করতে বড্ড অলসতা লাগছিল তো তোমার, তাই ভাবলাম দুজনে একসাথেই সেরে আসি।”

ফারাজ রুশদীর কোনো প্রকার আপত্তি বা অনুনয় না শুনেই সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
“ফারাজ, প্লিজ! আমার খুব লজ্জা লাগছে, ছাড়ুন না আমাকে!” রুশদী নিরুপায় হয়ে দুই হাত দিয়ে ফারাজের শক্ত গলাটা জড়িয়ে ধরল।কিন্তু ফারাজ ততক্ষণে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে পা দিয়ে ঠেলে দরজাটা লক করে দিয়েছে।
গোসল শেষে ফারাজ নিজে তোয়ালে দিয়ে রুশদীর ভেজা চুলগুলো আলতো করে মুছে দিল। রুশদী তখনও মৃদু কাঁপছে—খানিকটা পানির ঠান্ডায়, আর বাকিটা গত রাতের পর এই সকালের তীব্র লজ্জার আতিশয্যে। ফারাজ তাকে একটা শুকনো জামা পরিয়ে আবার রুমে এনে বিছানায় বসিয়ে দিল।
রুশদী রুমে আসামাত্রই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত ব্ল্যাঙ্কেট টেনে,আবারো নিজেকে মুড়িয়ে নিল।
ফারাজ এসে আবারও এই অবস্থা দেখে বলল, “কী রে বাবা! নিজ দায়িত্বে গোসল করিয়ে রুমে নিয়ে আসলাম, এখনো সেই একই লজ্জা? এখন তো মনে হচ্ছে লজ্জার চোটে পুরো চাদরটাই গিলে খাবে!”

রুশদী চাদরের ভেতর থেকে মুখটা সামান্য বের করল।সে একটু কড়া গলায় বলল, “আপনি একটা অসভ্য, একটা আস্ত নির্লজ্জ! মানুষের কোনো প্রাইভেসি রাখতে দেন না আপনি। তখন আমার কেমন লাগছিল, আপনি জানেন?”
ফারাজ হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ঘর জুড়ে এক লহমায় যেন আনন্দের হাওয়া বয়ে গেল। সে বিছানার কাছে এসে রুশদীর ওপর কিছুটা ঝুঁকে পড়ে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “বউয়ের সাথে নিজের ভালোবাসার অধিকার খাটানো যদি নির্লজ্জ হওয়া হয়, তবে আমি প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এমন নির্লজ্জ হতে রাজি। আর শোনো রুশদী, কাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত যা যা হলো, তারপরও যদি তোমার এত লজ্জা থাকে, তবে তো আমার পুরো জীবনটাই তোমার এই লজ্জা ভাঙাতে ভাঙাতেই কেটে যাবে! সো, নিজে থেকেই এবার লজ্জাটা ভাঙো।”
“আপনি যাবেন এখান থেকে!” রুশদী চাদরটা আরও টেনে নাকমুখ কুঁচকে বলল।
“এসব মিষ্টি নাটক এবার বাদ দাও তো সোনা, আর চলো নিচে- ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে।” ফারাজ তার হাত ধরে টানল।

“আপনি কি পাগল হয়েছেন? মাথা ঠিক আছে আপনার? আমি এই অবস্থায় নিচে সবার সামনে যাব কী করে, হ্যাঁ?”
“হোয়াট হ্যাপেনড এগেইন?”
রুশদী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এবার চাদরটা শরীর থেকে কিছুটা সরিয়ে নিজের ফর্সা ঘাড় আর গলার একপাশ ফারাজের চোখের সামনে তুলে ধরল। সেখানে গতরাতের ভালোবাসার গাঢ়, রক্তিম গভীর কিছু চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে রাজত্ব করছে। রুশদী বলল, “এই দেখুন! এসব স্পষ্ট দাগ নিয়ে আমি বাড়ির সবার সামনে কীভাবে মুখ দেখাব, হ্যাঁ? কী ভাববে তারা?”
ফারাজ এবার রুশদীর গলার সেই দাগগুলোর দিকে তাকাল। তার নিজেরই তৈরি করা সেই ভালোবাসার গভীর চিহ্নগুলো দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। সে কিছুটা অপ্রস্তুত হওয়ার ভান করে নিজের ঘাড় চুলকাল। তারপর আমতা আমতা করে বলল, “উঁম!ওই কনসিলার না ফাউন্ডেশন কি বলে ওইগুলো গিয়ে নাও,নয়ত ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে রাখো।শেষ সমস্যার সমাধান! ”

শান আর সিফাত কাউকে কিছু না বলে আবারও ক্লাব থেকে বাসায় এসেছে। সিফাত অবশ্য ক্লাবে না থেকে সরাসরি নিজের বাড়ির পথ ধরেছে। মন্ত্রীপুত্রের তকমা থাকায় ক্লাবে ওদের খাতিরটাই আলাদা। শুধু প্রভাব খাটানোই নয়, প্রয়োজনে মোটা অঙ্কের টাকাও ঢালতে হয় ওদের ক্লাবে। বিনিময়ে ক্লাবে অন্যদের তুলনায় ওদের সুযোগ-সুবিধা আকাশছোঁয়া। নিজেদের মতো থাকা, আলাদা সুযোগ-সুবিধার আড়ালে সব অনিয়ম ঢাকা পড়ে যায়। এই যেমন মাদকাসক্ত সিফাত—মেডিকেল টেস্টেই যার বাদ পড়ার কথা ছিল, সে আজ অনায়াসে জাতীয় দলের খেলোয়াড়! একেই বলে টাকার জোর।অথচ কত ভালো ভালো প্লেয়ার হারিয়ে যাচ্ছে,এসব টাকার জোরওয়ালা মানুষদের জন্য।সিফাতদের মতন ওদের তো আর বড়লোক মামা খালু নেই,যারা ওই ভালো প্লেয়ারদের জন্য সুপারিশ করবে।এই দুর্নীতির জন্যই আমাদের দেশের স্পোর্টসগুলো আজও এতটা পিছিয়ে।আমরা আসলে গুণীদের মূল্যায়ন করি না। অবশ্য ওরা (শান +সিফাত)যে ভালো খেলে না, তা নয়। তবে আজ যে উচ্চতায় ওরা দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে আসল খুঁটি হলো টাকা। যখনই কোনো কারনে ওরা আটকে গেছে, ফারাজ টাকার বস্তা ঢেলে ওদের টেনে তুলেছে।যদিও এটা অনৈতিক, তবুও ভাইদের স্বপ্ন পূরণে সে এটাও করেছে। আপাতত সেসব তোলা থাক।
এদিকে বেশ কয়েকদিন ধরে খান বাড়িতে আস্তানা গেড়েছে মিতু। এখানে আসার মূল উদ্দেশ্যটাই ছিল সিফাত। কিন্তু সিফাতই যখন বাড়িতে নেই, আর কবে ফিরবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই—তখন মিতু ঠিক করেছিল চলেই যাবে। কিন্তু আজ আচমকা সিফাতকে ফিরতে দেখে মিতুর ভেতরের সব মেঘ কেটে গেল। সিফাত এখন চলে গেলেও, আজ হোক বা কাল, চোখের সামনে তো আসবে! মিতুর মনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল, বাড়ি ফেরার ভূতটা মাথা থেকে এক ঝটকায় নেমে গেল।

বিকেলে মিতু খান বাড়ির করিডোর দিয়ে অলস পায়ে হাঁটছিল। হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল।পরনে ঢিলেঢালা ব্যাগি প্যান্ট আর টি-শার্ট, কানে হেডফোন গুঁজে সিফাত হনহন করে এগিয়ে আসছে। মিতুর পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। কাঙ্ক্ষিত মানুষটির চেনা মুখখানা এত কাছ থেকে দেখে তার হার্টবিট দ্বিগুণ বেগে আছড়ে পড়তে লাগল। মিতু মনে মনে ভাবল, সিফাত নিশ্চয়ই তাকে এখানে দেখে ভীষণ অবাক হবে! আগের মতো দুষ্টুমিভরা হেসে আবার হয়তো ‘মিস ফুল’ বলে ডেকে উঠবে। সিফাত একদম কাছাকাছি আসতেই মিতু চরম উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে হাত নাড়িয়ে চওড়া হাসিতে বলতে গেল, “হা….!”
কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই মিতুর ভেতরের সমস্ত উচ্ছ্বাস এক নিমিষে জমাট বেঁধে গেল। সিফাত তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, চোখের পলকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। যেন মিতু নামের রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ সেখানে দাঁড়িয়েই নেই! মিতুর বুকের ভেতরটা তীব্র এক অভিমানে মুচড়ে উঠল। ছেলেটা কি সত্যিই তাকে দেখতে পায়নি? এত বড় একটা মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে, তাকে কীভাবে এড়িয়ে গেল ও? চট্টগ্রামে থাকার দিনগুলোয় তো দেখা হলেই সিফাত নিজে থেকে হেসে কথা বলত, খুনসুটি করত। তবে আজ কেন এই উদাসীনতা? মিতুর মনটা এক লহমায় একরাশ বিষাদে ছেয়ে গেল।

সিফাত এই অসময়ে খান বাড়িতে এসেছিল মূলত —শান আর শেরকে নিজের ডেরায় উড়িয়ে নিয়ে যেতে। সিফাতের একমাত্র বন্ধু শান, শানেরও তাই।একদম ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হওয়া ওদের।বন্ধুত্বটা তাই আর দশটা সাধারণ বন্ধুত্বের মতো নয়, একটু অন্যরকম, তারপর আবার ভাইও হয়। সিফাত ছেলেটা বড্ড এলোমেলো, ছন্নছাড়া। ওর ভেতরএা শুধু শানই বুঝতে পারে। তাই মুখে শানকে ও যত গালমন্দই করুক না কেন,ভিতরে ভিতরে কলিজা দিয়ে শানকে ভালোবাসে সিফাত।
তবে এই দুই বাটপারের কিন্তু আরেকজন বন্ধু আছে, চিনতে পেরেছেন তাকে? সে আর কেউ নয়, আমাদের পুংটা—ছোট্ট শের! আসলে এই তিনজনই যেন পুংটামির একেকটানকারখানা। আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পুংটা হলো স্বয়ং শের। বলতে গেলে শের হলো ওদের ‘গুরু’, আর শান ও সিফাত হলো তার সুযোগ্য ‘শিষ্য’।
খান বাড়ি থেকে শান আর শেরকে ভাগিয়ে এনে সিফাত তার বিশ্ববিখ্যাত ডাস্টবিন মার্কা রুমটাকে আরও বড় ডাস্টবিনে পরিণত করেছে। হইহুল্লোড়, চিত্কার-চেঁচামেচি আর জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলার চোটে পুরো ঘরের অবস্থা একদম টাইট! চারদিকে চিপসের খালি প্যাকেট আর কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার মাঝেই ঘরের বড় টিভি স্ক্রিনের সামনে একটা মাত্র বিন ব্যাগের ওপর তিনজন একসাথে গাদাগাদি করে বসে কার রেসিং গেম খেলছে। রেসিংটা যেন শুধু টিভির পর্দায় নয়, বাস্তবেই এই ঘরে চলছে! স্ক্রিনের গাড়ি ওভারটেক করার চক্করে ওরা বাস্তবেও একে অপরকে কনুই দিয়ে গুঁতো মারছে, ঠেলাঠেলি করছে। দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখতে বড্ড হাস্যকর লাগছিল।
বিন ব্যাগের ঠিক মাঝখানে বসে আছে শের, আর তার দুই পাশে দুই বডিগার্ডের মতো চেপে বসেছে শান আর সিফাত। হঠাত্ সিফাত একটু জোরে ঠেলা মারতেই নিজের গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্ক্রিনে হেরে গেল শের। ব্যস, ওমনি চটে লাল হয়ে গেল সে! হাতের গেমিং রিমোটটা ধপাস করে ছুড়ে ফেলে, দুম করে কোমরে হাত দিয়ে টিভির স্ক্রিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শান আর সিফাতকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,

“এটা হবে না সিফু! তুমি চিটিং করেছ!”
সিফাত বরাবরের মতোই ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“তুই হেরেছিস মানেই আমি চিটিং করেছি?”
“সিফু ডিলার, তুমি চিটিং করেছ!” শেরের গলায় জেনুইন রাগ।
“প্রুফ আছে? প্রমাণ ছাড়া কথা বলবি না!” সিফাত মুখ বাঁকাল।
কোনো উপায় না পেয়ে শের এবার তার প্রিয় শান চাচুকে সাক্ষী মানতে চাইল,
“চাচু, তুমি তো দেখেছ, সিফু ডিলার কীভাবে চিটিং করেছে?”
শান চিপসের প্যাকেটে হাত ঢোকাতে ঢোকাতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“কই, আমি তো তেমন কিছু দেখিনি!”
নিজের প্রিয় চাচুকেও এই পচা সিফুর দলে যোগ দিতে দেখে শেরের অভিমান এবার আকাশ ছুঁল। সে ঠোঁট ফুলিয়ে, মুখটা কালো করে বলল,

“তুমিও ওর দলে? যাও, আমি আর থাকবই না তোমাদের এই পচা দলে!”
শের এবার রাগে গড়গড় করতে করতে বীরদর্পে ঘর থেকে চলে যেতে চাইল। কিন্তু সিফাত কি তা হতে দেয়? সে এক ঝটকায় শেরের হাত ধরে টেনে এনে সপাটে নিজের কোলে বসিয়ে দিল।
“এই পুচকু! এত রাগ করিস কেন? যাহ্, তোকে একটা ইয়াম্মি চুমু দিয়ে দিলাম… উম্মাহ্!”
বলেই শেরের নরম গালে জোর করে কষে একটা চুমু বসিয়ে দিল সিফাত। শের তো রেগেমেগে আগুন! সে সিফাতের কোল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ছিটকে দূরে গিয়ে দাঁড়াল। গালে হাত দিয়ে ও এমনভাবে ঘষতে লাগল যেন পচা সিফুর চুমুটা ওর গালে ট্যাটু হয়ে বসে গেছে। ঘেন্নায় মুখ-চোখ কুঁচকে ও বলল,
“ছি! সিফু তুমি এত লুচু! ছেলেদেরও চুমু দাও? ওয়াক থু! কী ইঁদুর পচা গন্ধ তোমার মুখে, তুমি কি ব্রাশ করো না? ছি ছি, কী বিশ্রী গন্ধ!”
শেরের এমন ঘেন্না পাওয়ার ভঙ্গি দেখে শান আর সিফাতের হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার অবস্থা। ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা হলো ওদের। সিফাত শেরকে আরেকটু ক্ষেপানোর জন্য দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বল,
“আয়, তোকে আরেকটা ফ্রেশ চুমু খাই!”

সিফাত ওকে নিজের দিকে টানতে গেলেই শের উল্টো এক ঝাড়ি মেরে নিজের হাত সরিয়ে নিল।
“ডোন্ট টাচ মি সিফু! তোমার মুখে অনেক গন্ধ, ওয়াক থু!”
“তোর মুখে গন্ধ, চেংটা বাঁদর কোথাকার…!” সিফাতও ছাড়ার পাত্র নয়।
“তুমি চেংটা বাঁদর!” শের পালটা চেঁচাল।
“তুই!”
“তুমি…!”
এদের দুজনের কানফাটানো চেঁচামেচিতে শানের মাথার পোকা নড়ে উঠল। সে কানে হাত দিয়ে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলল
“স্টপ ইট! থামবি তোরা? একদম বাচ্চাদের মতো ঝগড়া শুরু করে দিয়েছিস!”
সিফাত শানের দিকে তাকিয়ে শেরকে দেখিয়ে বলল,
“এই এই শান, এই দুই ফুটের ক্যাসেটটাকে তোর কোন দিক থেকে বড় মনে হয় শুনি? এটা একটা বাচ্চা…!”
শেরকে কেউ ‘বাচ্চা’ বললে ওর আত্মসম্মানে চরম আঘাত লাগে। ও কি বাচ্চা নাকি? ও কি এখনো ফিডার খায়? শের বুক ফুলিয়ে কড়া গলায় বলল,

“সিফুর বাচ্চা সিফু! তুমি বাচ্চা, আমি অনেক বড়…!”
“উমম… তাই নাকি রে?দুই দিন আগেও যে আমার চোখের সামনে ল্যাংটো হয়ে ঘুরতি, সেটা মনে নেই? প্যান্টের ভেতরেই মুতু করে দিতিস, হাগু করে দিতিস! একবার তো হাগু করে সেটা আবার বসে বসে খাচ্ছিলি তুই!”
সিফাতের মুখে নিজের এমন গোপন ও লজ্জাজনক কীর্তির কথা শুনে শের তো রাগে-ক্ষোভে একদম অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। ছোটবেলায় সে হাগু খেয়েছিল—এমন অপবাদ ও কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। শের কি আর দমে যাওয়ার পাত্র? সেও কোমরে হাত দিয়ে বলল,
“আমি তোমার ছোটবেলার ল্যাংটো ছবি দেখেছি, বুঝলে? দাদু আমাকে দেখিয়েছে। তুমি তো ছোটবেলায় এই শান চাচুর মুখে মুতু করে দিয়েছিলে! আমি সব জানি…!”
এই হাগু-মুতুর মহাযুদ্ধের মাঝে শান কোত্থেকে ফেঁসে গেল, ও নিজেও বুঝতে পারল না। সিফাত ওর মুখে মুতু করে দিয়েছিল—এটা আবার কবের ইতিহাস? শান বিষম খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“এই! এইসবে আমার নাম আসল কোত্থেকে শুনি? তোরা হাগু-মুতু খাচ্ছিস খা, কিন্তু এর মধ্যে আমার নাম জড়াচ্ছিস কেন?”
সিফাত সুযোগ বুঝে শানকে আরেকটু উসকানোর জন্য ঠোঁট টিপে দুষ্টু হেসে বলল,

“কীরে শান, আমার মুতুর ফ্লেভার কেমন ছিল রে বন্ধু?”
“সিফাত…!” শান রাগে দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠল।
শানকে পচানোর এমন মোক্ষম সুযোগ পেয়ে শের-ও কেন বাদ যাবে? সে সিফাতের কথায় তাল মিলিয়ে বলল,
“অনেক গন্ধ ছিল, তাই না চাচু?”
শান এবার শেরের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল:
“শের… তুই আবার সিফুর দলে চলে গেলি? এই সিফু না মাত্রই তোকে নিয়ে এতগুলো পচা কথা বলল!”
কথাটা শুনে শেরের হঠাৎ হুঁশ ফিরল। তাই তো! সে কীভাবে তার প্রিয় চাচুর বিপক্ষে যায়? সে তক্ষুনি ডিগবাজি খেয়ে শানের পাশে এসে দাঁড়াল। কোমরে হাত দিয়ে, শানের পক্ষ নিয়ে বেশ ভাব ধরে সিফাতকে হুমকি দিল,
“সিফু! তুমি যদি আমার চাচুকে নিয়ে আর একটাও পচা কথা বলো… তোমার খবর আছে বলে দিলাম!”
“চেংটা বাঁদর কোথাকার! তোর হুমকিতে আমি ভয় পাই নাকি? বেশি বাড়াবাড়ি করলে একদম কমোডে ঢুকিয়ে ফ্লাশ করে দেব!” সিফাত মুখ ভ্যাঙাল।

“দাঁড়াও, দেখাচ্ছি তোমাকে মজা…!”
বলেই শের সিফাতকে শায়েস্তা করার জন্য হন্যে হয়ে আশেপাশে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। ভারী কিছু না পেয়ে হাতের কাছে পেল অর্ধেক খালি একটা কোকাকোলার বোতল।বোতলের ছিপিটা খুলে চোখের পলকে পুরো কোকটা ঢেলে দিল সিফাতের গায়ের ওপর!
সিফাত আর শান দুজনই আঁতকে উঠে বিন ব্যাগ থেকে লাফিয়ে উঠল। সিফাত এবার শেরকে মজা দেখানোর জন্য ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। হাতের কাছে পাওয়া একটা কুশন ও সপাটে ছুড়ে মারল শেরের মুখ লক্ষ্য করে। শের সিফাতের বিছানার ওপর উঠে পড়ল। সেখান থেকে ও আরেকটি কুশন তুলে নিয়ে পুরোপুরি গায়ের জোরে ছুড়ে মারল সিফাতের দিকে। সিফাতও দমে না গিয়ে পাল্টা কুশন ছুড়ল, কিন্তু এবার নিশানা ভুল হয়ে সেই কুশন সোজাসুজি গিয়ে লাগল শানের মুখে!

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৪

শানের মুখের চিপস ছিটকে পড়ল মেঝেতে।সে তো চুপচাপ চিপস খেতে খেতে এদের যুদ্ধ দেখছিল। ব্যস, যুদ্ধের তৃতীয় পক্ষ এবার ময়দানে নেমে পড়ল! শান প্রতিশোধ নিতে আরেকটা বড় বালিশ টেনে নিয়ে সিফাতের দিকে ছুড়ে মারল। এভাবেই দেখতে দেখতে চিপসের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান, কুশন আর বালিশ ছোঁড়াছুঁড়ির চোটে পুরো রুমটা একটা আস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সিফাতের রুমের বাতাসে বালিশের সাদা তুলো পেঁজাতুলোর মতো উড়তে লাগল। একেকজনের নাকে, মুখে, কানে ঢুকে যেতে লাগল সেই তুলো। কিন্তু এদের খামার লক্ষণই নেই।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৬