আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭ (২)
অরাত্রিকা রহমান
রাত~১.৩০ এর পর~
-“আচ্ছা, তুই কি চাইছিস বল তো? বিয়ে পাগলা হয়ে বিয়েটা সারলি। আর এখন নতুন বউকে ঘরে রেখে আমাদের নিয়ে ছাদের উপর পা ঝুলিয়ে বসে নখ কামড়াচ্ছিস। হয়েছে কি তোর?”
রায়ান বিরক্তি ভাব দেখিয়ে মাহিরের উদ্দেশ্যে এমন উদ্ভট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে মাহির নিজের নখ কামড়ানো বন্ধ করে হাত টা মুখ থেকে নামিয়ে নিল। এবার দুই হাত এক করে কেবল মুচড়ে যাচ্ছে। রায়ান মাহিরের অবস্থা দেখে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে খোলা আকাশের দিকে তাকালো। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের নিচে টিমটিমাটি আলোয় রহমান বাড়ির ছাদটা বেশ আলোকিত। আর সেখানেই ছাদের রেলিং এর উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে রায়ান, রুদ্র আর মাহির।
খাওয়া শেষে মিরা রিমি সোরায়া কে ঘরে দিয়ে নিজেরাও নিজেদের ঘরে চলে গেছে, আর এদিকে ১৫ মিনিট হয়ে গেছে মাহির রায়ান আর রুদ্রকে নিয়ে জোর করে ছাদে তার সাথে বসিয়ে রেখেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় সে নিজে কিছু বলছেও না, অন্যের কোনো কথা শুনছেও না। কেবলই মনের উদ্বিগ্নতায় নিজের নখ কামড়ে যাচ্ছে। রায়ান হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠে ছাদের ধার থেকে নেমতে নিল-
“ধুর, বসে থাক তোরা। আমি আমার বউয়ের কাছে গেলাম। একলা ঘরে কি করছে কে জানে। তখন সবার সামনে বোকলাম ওকে তোর জন্য। তোদের সাথে বসে থেকে রাতের বেলার এই মূল্যবান সময় আমি নষ্ট করতে পারবো না।”
মাহির সঙ্গে সঙ্গে রায়ান হাত আঁকড়ে ধরে রায়ান কে টেনে আবার নিজের পাশে বসিয়ে অসহায় গলায় বলল-
“আজকের রাতের মূল্য আমার থেকে তোর কাছে বেশি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং, আপাতত আমাকে সঙ্গ দে।”
রায়ান ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে রেলিং ধরে ওখানেই বসে পড়লো। মাহির আবারো করুন স্বরে বলে উঠলো-
“আমি আমার বউ কে বাসর ঘরে রেখে এখানে বসে আছি। এই স্যাক্রিফাইস এর কি কোনো মূল্য নেই তোর কাছে?”
রায়ান মাহিরের কথায় রাগে তেতে উঠলো-
“ওই শালা, আমি তোকে বলেছি তোর বউকে বাসর ঘরে রেখে এখানে বসে থাকতে। তখন থেকে ঠেলছি তোকে তোর তো বাসর করার কোনো ইচ্ছেই দেখছি না।”
মাহির রায়ানের দিকে বাঁকা চাহনিতে তাকালো। রায়ান সেটা খেয়াল করে উল্টো দিকে নজর ঘুরিয়ে নিল। রুদ্র মাহিরের কাঁধে হাত রেখে কৌতুহলে জিজ্ঞেস করলো-
“মাহির ভাই, একটা কথা বলো তো, একটা বছর ধরে বিয়ে বিয়ে করে মাথা খারাপ করার পর আজ বাসর রাতে ঘরে যাচ্ছো না কেন?”
মাহিরের চোখে মুখে অস্থিরতা স্পষ্ট। দীর্ঘশ্বাসের ধারা অব্যাহত রইল তার। মাহির রুদ্রর প্রশ্নের জবাবে প্রশ্নই করলো-
“আমি কি করবো তুই বল। বাসর ঘরে গিয়ে করবো টা কি? কি বলবো ওকে? মাথায় তো কিছু আসছে না। কিভাবে কি হবে ভাবলে আমার কলিজা শুকিয়ে আসছে।”
রুদ্র মাহিরের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে বুঝতে না পেরে সোজাসাপ্টা বলল-
“তুমি নিজের মাথায় কি সব আকাশ কুসুম ভাবছো কে জানে। বিয়ে হয়ে গেছে তোমার সোরার সাথে। এখন ও শুধু তোমার স্টুডেন্ট না, বউ হয়ে গেছে তোমার। এসব কি চিন্তা করছো তুমি?”
রায়ানের মুখশ্রীতে বিরক্তি স্পষ্ট। মাহির রুদ্রর দিকে ফিরে তাকে মিনতির স্বরে জিজ্ঞাসা করলো-
“রুদ্র.. ভাই তুই আমাকে কিছু শিখিয়ে দে। কি বলবো আমি ঘরে গিয়ে সোরাকে? বয়সে ছোট হলেও তোর অভিজ্ঞতা বেশি।”
রুদ্র মাহিরের দেওয়া এই সম্মানে নিজের মনের আকাশে উড়তে লাগলো রুদ্র। রায়ান বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“সিরিয়াসলি? জ্ঞান নেওয়ার জন্য আর কোনো মানুষ পেলো না?!”
রুদ্র খুব অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী ভাব নিয়ে মাহির কে উপদেশ দিতে শুরু করলো-
“আচ্ছা শোনো। একটু প্রেমালাপ দিয়ে শুরু করবা। লাইক তুমি ওকে কতটা ভালোবাসো। এমন আর কি।”
মাহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-“যেমন..!?”
-“যেমন.. কিছু আবেগী লাইন বলতে পারো। লাইক- ঘরে ওর সামনে গিয়ে বলবে- আমি তোমাকে ঠিক ততক্ষন পর্যন্ত ভালোবাসবো..!
-“যতক্ষণ না সকাল হবে..!”
রুদ্রর কথা শেষ হওয়ার আগে রায়ান নিজের মতো করে রুদ্রর বলা অর্ধ লাইনের পূর্ণতা দিল। আর তার পর নিজেই তীব্র হাসিতে ফেটে পড়লো মাহির আর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে। মাহির রুদ্র বিরক্ত মুখে রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মাহির রায়ান কে ধাক্কা দিয়ে ছাদের রেলিং থেকে ফেলে দিতে চেয়ে বলল-
“শালি তুই যা তো, তোর বউয়ের কাছে যা। মাথায় এমনিতেই প্রেশার হাই হয়ে আছে সে এখন সার্কাজম মারায়।”
রায়ান নিজের ব্যালেন্স ধরে রাখলো। নিজের হাসি থামিয়ে মাহিরের দিকে গম্ভীর ভাব নিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
“ও কে?” (রুদ্রর দিকে আঙুল তাক করে)
মাহির অবাক চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে জবাব দিল-
“কে আবার? রুদ্র..!”
-“রুদ্র বিয়ে করেছে কাকে?”
-“রিমিকে..!”
-“গুড এবার বল, তুই কে?”
-“কি আজব, আমি মাহির।”
-“বিয়ে করেছিস কাকে?”
-“সোরায়া কে। কিন্তু তুই এসব প্রশ্ন করছিস কেন আমাকে?”
-“তোকে বোঝাতে রে বোকা**। রুদ্র রিমি আলাদা, আমি মিরা আলাদা আর তুই সোরা আলাদা। আমাদের সবার বিয়ে করার পরিবেশ পরিস্থিতি ও আলাদা। আর তুই ওর কাছে কি উপদেশ চাইছিস? এসব লাইন টাইন মুখস্থ করে লাভ নেই। আমি তোকে ভালো বুদ্ধি দেই শোন, আগে ঘরে যা। বউকে দেখে এমন নেশা ধরবে, দেখবি মুখ, হাত, পা, শরীর অটোমেটিক ফরফর করে চলবে।”
মাহির রায়ানের কথার সারমর্ম বুঝে রুদ্রর দিকে অনুমোদনের জন্য তাকাতে চাইলে রায়ান মাহিরের ঘাড়ে চেপে ধরে রেলিং থেকে নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“আর এদিক ওদিক না দেখে সোজা ঘরে গিয়ে দরজা লক করবি এখন। তোর জন্য আমিও আমার বউয়ের কাছে যেতে পারছি না বালের মাথা।”
রায়ান ঘাড় কাত করে উপরে রেলিং এ বসে থাকা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বলল-
“তোকে কি দাওয়াত দিতে হবে ওখানে থেকে নামার জন্য? তোর ঘরে বউ নাই? আর এক সেকেন্ড ওখানে বসে থাকলে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দিবো। নাম..!”
রুদ্র রায়ানের ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে নামলো উপর থেকে। রায়ান পুনরায় মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিরের দুই কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে তাঁকে সাহস দিয়ে বলল-
“আর ভুজুং ভাজুং চিন্তা করিস না। তোর তো সোনায় বাঁধানো কপাল, এক কালে নিজে ডার্ক রোমান্স পড়তি, এখন বউ ও পয়েছিস ডার্ক রোমান্স পড়া। কোথায় এক্সাইটেড থাকবি তা না আধমরা হয়ে আছিস।”
মাহির মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“ওটাই তো সমস্যা ভাই, যদি সামলাতে না পারি? যদি বেশি বেশি করে ফেলি? যদি ওর কিছু হয়ে যায়? যতই বুঝুক, বয়স তো কম। একবার ওকে পেয়ে গেলে, ছাড় দেবো এমন উদারতা আমার মধ্যে আছে কিনা সন্দেহ। আর আমি ওকে কষ্ট ও দিতে চাই না।”
বেচারা মনের কথা আর রায়ানের সম্মুখে প্রকাশ করতে পারলো না। রায়ান মাহির কে উৎসাহ দিলো-
“মাহির, মেয়েটা অপেক্ষা করছে হয়তো ঘরে। তোর যাওয়া উচিত এখন। কাম অন..বাক্যালাপ! জেগে উঠ বাঘের বাচ্চা..!”
মাহির রায়ানের হাত নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলল-
“ধুর বাল, চুপ করবি তুই? কবুল বলার পর থেকেই জেগেই আছে বাঘের বাচ্চা। এখন বউটা কে একেবারে খেয়ে না নিলেই হয়। আমি কি জ্বালার মধ্যে আছি তুই এখন বুঝবি না!”
রায়ান ভাব নিয়ে বলল-
“এই জ্বালায় বহুবার জ্বলেছি আমি। জ্বলতে জ্বলতে আজ এই পর্যন্ত। এখনো জ্বলছি । So, don’t teach father how to make babies.. ok?”
-“হ্যাঁ সেটাই তো, জ্বলতে জ্বলতে এখন আবার এক বাচ্চার বাপও হয়ে যাচ্ছিস!”
রুদ্র রায়ান আর মাহিরের কথা বুঝে উঠলো না। সে হাঁ হয়ে কেবল শুনে যাচ্ছে। তখনই রুদ্রর ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো। সেটা দেখতেই রুদ্র তাড়াহুড়ো করে ফোনটা পকেটে রেখে রায়ান আর মাহিরের পাশ কাটিয়ে ছাদ থেকে নেমে যেতে যেতে বলল-
“আমার ঘুম পেয়েছে। আমি ঘরে গেলাম। গুড নাইট।”
রায়ান অবাক হলো-“হঠাৎ ঘুম পেয়ে গেল?”
রুদ্র হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
“ওহ, মাহির ভাই…অল দ্যা বেস্ট ফর টু নাইট।”
রুদ্র আর দাঁড়ালো না। রায়ান নিজের নাক ঘষে আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“আমিও যাই। আমারও কেমন যেন বউ বউ পাচ্ছে। না, আই মিন, ঘুম ঘুম পাচ্ছে।”
মাহির বাঁকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“বুঝেছি ভাই তোদের ঠিক কেমন ঘুম পেয়েছে। যা যা।”
রায়ান লাজুক হেঁসে মাথা চুলকে মাহিরের সাথে কোলাকুলি করে মাহির কে সতর্ক বার্তা দিল-
“যা করবি বুঝে শুনে করিস, সোরা আমার বোনের মতো মাহির। ওর সমস্যা হলে তোর অনেক সমস্যা হবে। সো, একটু সাবধানে।”
কথাটা বলে রায়ান সোজা হয়ে মাহিরের কাঁধে চাপড় দিয়ে নিচে নেমে গেল। মাহির এবার আর একা একা ছাদে বসে থাকার সাহস পেল না। তার মনটা যতই সোরায়াকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে ব্যাকুল তার দেহের প্রতিক্রিয়া যেন তাকে ঠিক ততটাই ভয় দেখাচ্ছে। মাহির চাইছে না নিজের অধিকারের বোঝা সোরায়ার উপর চাপিয়ে দিতে আবার তা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখার ইচ্ছা ও তার নেই। তবুও এমন দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে সে নিচে নেমে সোরায়ার ঘরের দিকে গেল। দরজার ঠিক সামনে গিয়ে দাড়াতেই তার গলা শুকিয়ে এলো হঠাৎ। সে দরজায় কড়া নাড়তে কয়েকবার নিজের হাত উঠালো কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না তার। মাহির নিজের মনকে বুঝ দিল-
“সারা রাত কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবি গাধা? ধাক্কা দে দরজায়। ঘরের ভেতরের মেয়েটা আর তোর স্টুডেন্ট বা প্রেমিকা নেই, বউ হয় তোর।”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে শরীর ঝাকুনি দিয়ে দরজায় হাত রাখল। তখনি তার অনুভব হলো দরজাটা খোলাই শুধু চাপিয়ে রাখা হয়েছে। মাহির সামান্য অবাক হলো- তার মাথায় এক মূহুর্তের জন্য সে চিন্তা করলো-
সোরায়া হয়তো ঘুমিয়ে গেছে যেহেতু তখন বলছিল তার ঘুম পেয়েছে। মাহির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তবে তার কপাল কুঁচকে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“কি পরিমান কেয়ারলেস! ঘুমাবে ভালো কথা তাই বলে দরজা লক করবে না?”
পর মূহুর্তেই আবার নিজের জিভ কেটে বলল-
“আমি তো বাইরে। বিয়ে করে বর কে বাইরে থেকে রেখে কিভাবেই বা দরজা লক করে ঘুমাবে!? আমার লক্ষ্মী বউটার কত বুদ্ধি। এখন ঘুমিয়ে গিয়ে থাকলে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে নেবো।”
নিজের মতো কথা বলা শেষ হলে মাহির দরজা ঠেলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে যাবে তখনি পিছন থেকে কেউ একজন মাহিরের কাঁধে হাত রাখলো। ঘটনার আকস্মিকতায় মাহির চমকে মৃদু চিৎকার দিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখলো তার মা- ঠিক তার পেছনে দাঁড়ানো। সে অবাক হলো-“আম্মু, তুমি? এখন.. এখানে?”
সীমা খান ছেলের প্রশ্নে কিছুটা মাথা ঝুঁকিয়ে নিলেন। সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত চাহুনিতে আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাহিরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমতা আমতা করে জবাব দিলেন-
“তেমন কিছু না। তোকে কিছু বলার ছিল এই আর কি।”
-“আমাকে?” মাহির নিজের দিকে আঙুল তাক করে মায়ের মুখমুখি হয়ে দাঁড়ালো-
“আমাকে কি বলার আছে?”
সীমা খান মাহির দিকে এক পা এগিয়ে মাহিরের দিকে ঝুঁকে বেশ গোপনীয়তা বজায় রেখে নরম কণ্ঠে তাকে সাবধান করতে বললেন-
“মাহির, সোরা কিন্তু এখনো অনেক ছোট। বুঝিসই তো কি বলতে চাইছি। বাচ্চা মেয়ে, একটু বুঝে শুনে যা করার করিস কেমন?”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে মাহিরের লজ্জায় মনে হলো তার পায়ের নিচের জমিন ফাঁকা হয়ে গেলে যদি সে এখন সেটাই বিলিন হয়ে যেতে পারতো হয়তো সেটাই ভালো হতো। মাহির সীমা খানের কথা বুঝে নিজের
বিচক্ষণতা দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সামান্য দূরে সরে বুঝদার ভাব ধরে বলল-
“আরে, কি সব বলছো? তোমার কি আমাকে ওমন মনে হয় নাকি? আমি সামলে নেব। I can control…!”
সীমা খান ছেলের আত্মবিশ্বাস দেখে জোরপূর্বক বানোয়াট হেঁসে নিজের মনে বিড়বিড় করলেন-
“কি যে সামাল দিতে পারবি তুই সেটা তো আমার জানা আছে। খাবার সামনে থাকলে ক্ষুধার্ত পেটে কেউ বসে থাকে না।”
তিনি তবু মাহিরের কথায় তার প্রতি বিশ্বাস দেখালেন। সীমা খান আরো কিছু বলতে চেয়েও বলার সাহস করে উঠতে পারলেন না। কিছু টা অস্বস্তি তেই মাহির কে দরজার সামনে রেখে প্রস্থান করলেন। মাহির মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো। বেচারা এবার দরজার দিকে ঘুরে নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে এক প্রকার জিকির করতে করতে বাসর ঘরে প্রবেশ করলো-
“Yes, I can control myself..! I definitely can..”
মাহির নিজের দুচোখ বন্ধ করে হুট করেই বাসর ঘরে ঢুকে তাড়াতাড়ি দরজা লক করে দিল যেন এতো টুকু করেই সে বেঁচে গেছে।
-“স্যার, আপনি এসে গেছেন? এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন? দেরি হলো যে।”
পেছন থেকে পরিচিত মেয়েলি কন্ঠ কানে ভেসে আসতেই মাহির সেদিকে ঘুরে দাঁড়ালো। ভেজা চুলে বাঁধা পড়ে থাকা তোয়ালেটা নরম হাতে নিজের চুলের ভাঁজে থেকে মুক্ত করে চুল হতে টপটপ করে পড়তে থাকা অবশিষ্ট জলরাশি গুলো মুছতে মুছতে সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রশ্ন করলো। মাহির হতবাক। চোখের অবস্থা ছানাবড়া। মাহির নজর সরিয়ে সোরায়া কে সম্পূর্ণ একবার দেখলো-পাতলা লাল জামদানি শাড়িতে আবৃত সাধারণ একটা মেয়ে দেহ। ভেজা চোখ মুখ, মাথা থেকে শুরু করে গলার আর ঘাড়ের কাছে বিন্দু বিন্দু পানি কণা জমে আছে তার। অদ্ভুত রকম চিকচিক করছে সেগুলো যেন সাজানো মুক্তা। ভেজা এলোমেলো চুল ছন্নছাড়া হয়ে লুটিয়ে আছে পিঠ, ঘাড় ও বক্ষ জুড়ে। এখনো সেখান থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। মাহিরের ভেতরকার পুরুষ সত্তা আজ সৌন্দর্যের এক অনন্য রূপ নিজের চোখের সামনে থেকে অবলোকন করছে। মাহিরের চাহুনি ধীরে ধীরে শীতল ও তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠলো। সদ্য ফোটা পদ্ম ফুলের মাঝেও এতোটা স্নিগ্ধতা থাকে কিনা তার জানা নেই। চার পাশের সব কিছু ছেলেটার চোখে ঘোলাটে হয়ে গেল কেবল মধ্যমণি রূপে অবস্থান করছে সোরায়া। ঠিক যেন একটা লাল জলপরী। মাহির কয়েকবার পলক ফেলল এটা তার কল্পনা হতে পারে এমনটা ভেবে। তবে যখনই চোখের পাতা উঠিয়ে সোরায়ার দিকে দেখছে তার চোখে নতুন নতুন সব আকর্ষণ ধরা পড়ছে। মাহির নিজের বুকের বা পাশে হাত চেপে মৃদু আর্তনাদ করলো- “আউচ..?” মাহির দ্বিধান্বিত কণ্ঠে নিজেকে প্রশ্ন করে-“Can I really control…?”
আবার নিজেই নিজের মাথা ডানে বামে নাসূচক নেড়ে উত্তর করলো-“I don’t think so..!”
সময়টা থেমে রইল কয়েক মিনিট। মাহিরের হৃদস্পন্দন এখন কেমন গতিতে চলছে তার পরিমাপ করা কঠিন। সোরায়া নিজের ভেজা চুলের গুচ্ছ মুছতে মুছতে মাহিরের দিকে গিয়ে এলো। মাহির নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কেবল মনে মনে বিলাপ পারছে-
“ও বাচ্চা মেয়ে মাহির। কুল ডাউন। ও একটা বাচ্চা মেয়ে।”
মাহির ঠিক খেয়াল করে উঠার আগেই সোরায়া তার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাহিরকে এমন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সোরায়া মাহিরের মুষ্টিমেয় হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“স্যার…কি হলো? কথা বলছেন না কেন?”
মাহির হকচকিয়ে উঠলো, তার হাতের মুঠো মুক্ত হলো-
“হ্যাঁ হ্যাঁ, কি?”
-“কি আবার কি? কত রাত হয়েছে জানেন? এত দেরি হলো কেন আপনার ঘরে আসতে?”
মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার এতো গুলো প্রশ্ন তার গা স্পর্শ করলো না। মাহির সোরায়ার চুল থেকে টপটপ করে পড়া পানি যে মেয়েটার কলার বোনের খাজে জমা হচ্ছে সেই দৃশ্য দেখে যাচ্ছে যেন কোনো মুভির ক্লাইম্যাক্স পয়েন্ট। মাহির ধীর গতিতে নিজের হাত উঠিয়ে সোরায়ার কলার বোনে জমা হওয়া পানির কণা গুলো নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে নিজে উল্টো প্রশ্ন করলো-
“এত রাতে শাওয়ার নিয়েছ কেন?”
সোরায়া শরীর মাহিরের এমন স্পর্শে মৃদু ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। সে সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গিয়ে হাতের টাওয়াল টা শক্ত করে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে বলল-
“আপু বলেছে আপনি এলে যেন আপনার সাথে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ি। কিন্তু আমার তো ঘুম পাচ্ছিল আর আপনিও আসছিলেন না। তাই ভাবলাম শাওয়ার নিলে হয়তো ঘুম কেটে যাবে আর রাত টুকু জাগতে পারবো।”
মাহির সোরায়ার দিকে দু পা এগিয়ে এসে মেয়েটার চিবুক ধরে মুখখানি নিজের দিকে উঁচু করে ধরে পুনরায় প্রশ্ন করলো-
“তো.. ঘুম কি কেটেছে?”
সোরায়ার একটু ইতস্তত বোধ করে মাথা উপর নিচ নেড়ে হ্যাঁ বলতেই মাহির আবারো প্রশ্ন করলো-
“রাত টুকু জাগতে পারবে?”
সোরায়া এবারও মাথা নাড়লো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার গাল স্পর্শ করে তার ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“চুলটা শুকিয়ে নাও। ঠান্ডা লেগে যাবে নয়তো। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।”
সোরায়া আবারো বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়লো। মাহির সোরায়াকে রেখে ওয়াশ রুমে ঢুকে যেতেই সোরায়া নিজের মুখ দুই হাতে ঢেকে বিছানার উপর বসে পড়লো-
“আল্লাহ, আমার এমন লাগছে কেন? উনি ওভাবে কেন প্রশ্ন করলো?”
একই সময়ে রায়ান মিরার ঘরের পরিবেশ কিছু টা ভিন্ন। মিরা সোরায়াকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরে এসে ঘরটাকেই সম্পূর্ণ অন্ধকার করে রেখে ছিল কিছু টা সময়। রায়ানের উপর রাগ করে মুখ ফুলিয়ে বসে ছিল বিছানায়। কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছু হলো না, কারণ রায়ান তো আর ঘরেই আসে নি। মিরার রাগ বাড়লো। সে সময় নিয়ে নিজের পড়িহিত ভারী লেহেঙ্গাটা গা থেকে আলাদা করতে করতে রায়ান কে বেশ বকাঝকা করলো মনে মনে। লেহেঙ্গা টা খুলে রেখে একটু ঝাড়া হাত পা হয়ে মিরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসলো গয়না গুলো খুলতে। আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে চোখ ছোট ছোট করে নিজেকে ধমকের সুরে বলল-
“এবার ওই অসভ্য লোক রাগ ভাঙাতে এলে যাচ্ছেতাই বলে দিবি। ইচ্ছে মতো মারবিও, বুঝেছিস? বেশি পিরিতি দেখালে এই হয়। সবার সামনে কেমন অর্ডার করলো। তুই কি কারো অর্ডারের ধার ধারিশ? কি সাহস ভাবা যায়!”
মিরা নিজের উদরের উপর হাত রেখে তার ভেতরের ছোট্ট রুহুটাকেও ধমক দিয়ে সাবধান করলো-
“এই যে পাপার প্রিন্সেস, পাপার সাথে আজ মাম্মাম অনেক বড়সড় একটা ফাইট করবো, ভুলেও আমার মন ভোলানোর চেষ্টা করবে না পাপার হয়ে। মাথায় রাখবে তুমি আমার ভেতর থাকো, আমার থেকে খাবার খাও। আমি বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। তোমার জন্য আমি বেশিক্ষণ তোমার পাপার উপর রাগ ধরে রাখতে পারি না। এটা তোমার মাম্মামের অওরা ড্যামেজ করছে বুঝেছ?”
হঠাৎ করেই ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ এলো। মিরার হাত তার পেটের উপর থেকে সরে গেল। চমকিত চাহুনিতে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো রায়ানকে। রায়ানের সাথে চোখাচোখি হতেই সে মুখ ফুলিয়ে রায়ানের থেকে মুখ ঘুরিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের গায়ের গহনা খুলতে উদ্যত হলো। লেহেঙ্গার নিচের ভারী অংশটা ফ্লোরে লুটুপুটি খেতে দেখে রায়ান মিরা দিকে খেয়াল করলো- মিরা লেহেঙ্গার উপরের ব্লাউজ আর নিচের অংশে জিন্সের প্যান্ট পরিহিত। রায়ান মৃদু হাসলো মিরার এমন রূপ দেখে। আজকাল একটা ট্রেন্ডিং শব্দ- তথাকথিত ব্যাডি ভাইব পাচ্ছে এখন সে মিরা কে দেখে। রায়ান নিচের ঠোঁট কামড়ে হাসলো আর মনে মনে বিড়বিড় করলো-“How can she always make me loss my control whenever I see her.. it’s getting more terribly terrifying day by day..!”
রায়ানের মনের অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশ করার সুযোগ নেই। সে মিরার গরম ফুলকো লুচির মতো মুখটা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে এখন মিরার রাগ ভাঙাতে তার রাত পোহাবে। রায়ান ফ্লোর থেকে লেহেঙ্গাটা তুলে পাশের কাউচের উপর রাখলো। তারপর, মিরার হাবভাব পর্যবেক্ষণ করে ঠোঁটে কোণে একটা দুষ্টু হাসি নিয়ে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। মিরার আড় চোখের রায়ানের প্রতিটা পদক্ষেপ খেয়াল করছে। রায়ান স্বাভাবিক ভাবে মিরার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার কানের দুল খুলতে তাকে সাহায্য করতে তার কানে হাত দিতেই মিরা রায়ানের হাত শক্ত হাতে সরিয়ে দিতে গেল, কিন্তু এতে করে নিজের কানের ঝুমকা তেই টান লাগলো তার। মিরা মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো-“আহহ্..!”
রায়ান হকচকিয়ে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে মিরাকে শান্ত গলায় বলল-
“Ok ok, fine, do it yourself..আমি আর ধরছি না। সাবধানে খুলো। লাগে না যেন।”
মিরার রাগ যেন তিরতির করে বেড়েই যাচ্ছে। সে অগ্নিদগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো রায়ানের দিকে। রায়ান যে মিরার রাগকে ভয় পায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে শুকনো ঢোক গিলে মিরার থেকে দূরে সরে গেল। সে গায়ের কোর্ট খুলে পড়নের শার্ট আনবাটন করতে থাকলো। মিরা আয়নার দিকে মুখ করতেই আয়নার মাঝে রায়ান কে দেখলো। রায়ান উল্টো দিকে ফিরে তার শার্টটা খুলতেই আয়নার প্রতিবিম্বে তার সুঠাম প্রসস্থ পিঠ ধরা পড়লো। রায়ান শার্টটা খুলে কয়েকবার কাঁধ স্ট্রেচ করতেই পিঠের মাংসপেশীতে একটা প্রজাপতির অবয়ব সৃষ্টি হলো যা মিরার চোখকে বিন্দু মাত্র এড়ালো না। মিরার আয়নার মাঝে রায়ানের দিকে চোখ রেখে শুকনো ঢোক গিলল। তার হৃদস্পন্দনের গতি এই মূহুর্তে স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য বেশি। মিরা নিজের মনোযোগ ঘোরাতে দুচোখের পাতা বন্ধ করে নিল। পর মূহুর্তেই আবারো রাগ দেখিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর সজোরে আওয়াজ করে রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে চেঁচিয়ে উঠলো-
“সমস্যা কি? ম্যানারস নেই আপনার?”
রায়ান আচমকা পিছন ফিরে মিরার দিকে অবাক হয়ে তাকালো- “হুয়াট?”
-“এখানে এতো ভাব নিয়ে উলঙ্গ হওয়ার মানে কি? এটা বেডরুম, চেঞ্জ করার জন্য ওয়াশ রুম আছে। নাকি এতো টুকুও জানেন না কোথায় কি করতে হয়?”
মিরার মুখে এতো গুলো অপমানজনক কথা শুনেও রায়ান চুপ থাকলো। সে মাথা নিচু করে নিজের উন্মুক্ত শরীরটা একনজর দেখে পুনরায় মিরার চোখের দিকে তাকালো। মেয়েটার চোখে রাগ সঙ্গে দূর্বলতা উভয়ই পরিলক্ষিত। রায়ান একগাল বাঁকা হাসলো। মিরা রায়ান কে হাসতে দেখে আবারো যা মুখে এলো বলতে লাগলো-
“কি পরিমান নির্লজ্জ, এতো গুলো কথা শুনানোর পরও হাসছে।”
রায়ান মিরার কথা বলার মাঝেই দ্রুত পায়ে মিরার দিকে এগিয়ে এসে মিরার কোমর জড়িয়ে তাকে শূন্যে তুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর বসিয়ে দিল। তাড়াহুড়ো তে মিরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তার চোখ জোড়া বন্ধ হলো তার ঠোঁট জোড়ায় রায়ানের অবাধ্য আক্রমণে। রায়ান নিজের একহাত মিরার কোমরে অন্যহাতে মিরার ঘাড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের মাঝে মিরাকে বিলিন করে নিতে চাইলো। মিরার দুহাত শক্ত হলো ড্রেসিং টেবিলের ধারের উপর। রায়ান মিরার কোমরে নিজের হাতের স্পর্শ তীব্র করে মিরাকে নিজের আরো কাছে টানতেই মিরার হাত ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে গিয়ে রায়ানের পেশিবহুল উন্মুক্ত বক্ষে গিয়ে ঠেকলো। মিরা ছটফট করতে শুরু করলে রায়ান কয়েক সেকেন্ডের বিরতি তে মিরার ঠোঁটের উপর মৃদু স্বরে আওড়ালো-
“আ’ম সরি হৃদপাখি, আমার ওভাবে কথা বলা উচিত হয় নি।”
মিরা নিজের চোখ খুলতেই রায়ান পুনরায় একই ভাবে মিরার ঠোঁটের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করলো। মিরা আবারো নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। কিছুক্ষণ পরেই রায়ান মিরার ঠোঁট জোড়া মুক্ত করে দিয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে দিল। দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস এতোটাই ভারী হয়ে আছে যে নিঃশ্বাস নিতেও হাপাচ্ছে দুজন। মিরা হঠাৎ করেই খেয়াল করলো আজ রায়ানের আচরণ আগের থেকে ভীষণ অশান্ত ও অধৈর্য। সে কোনো বারেই রায়ানের সাথে এই খেলায় পরে ওঠে না আজ যেন আরো বেশি দূর্বল লাগছে তার। মিরার চোখে অশ্রু কণা জমা হলো। রায়ান স্থির হয়ে রইল মিরার কাঁধে কপাল ঠেকিয়ে। তার নিঃশ্বাসের বেগ এখন তুঙ্গে। কিছু টা সময় ওভাবেই থাকলো দুজন। মিরা আলতোভাবে রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার কাঁধে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে মিরার কানে কানে বলল-
“আ’ম সরি।”
মিরা একটু সরে গেলে রায়ান মিরার সম্মুখে এসে তার চোখে চোখ রেখে বলল- “বললাম তো সরি, এতো গুলো কথা শুনালে আমায়, আর আমি এতোটা আদর করলাম। এখনো রাগ কমে নি?”
মিরা তার সদ্য লাল হয়ে ওঠা ঠোঁটজোড়ায় ভেংচি কেটে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“সরি বলার ওয়ে একটু বেশিই ক্যাসুয়াল হয়ে গেছে।”
রায়ান মিরার ফুলে উঠা ঠোঁটের উপর নিজের নজর স্থির করলো। মিরার গালে হাত রেখে তার ঠোঁটের উপর বুড়ো আঙুল টা স্লাইড করতে করতে এগিয়ে আসতেই মিরা ধাক্কা দিয়ে রায়ানের মনোযোগ নষ্ট করলো-
“আবার কি চাই হ্যাঁ? একটু আগেই কামড়েছেন। জ্বলছে এখন। দূরে থাকুন।”
রায়ান অধৈর্য হয়ে আবার মিরার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
“একটু রাগ কমালে কি হয়? এখন কি তোমার পা কাঁধে তুলে সরি বলবো?”
মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের গালে সামান্য শক্তি প্রয়োগ করে চর বসালে রায়ান নিজের গালে হাত দিয়ে বাচ্চা দের মতো মুখ ফুলিয়ে বলল-
“সারাটা দিন আমার সাথে খ্যাচর খ্যাচর করো। তোমার মুখে দুটো ভালো কথা শুনলেও তো আমার মনে একটু মনে শান্তি লাগে। হ্যান্ডসাম বলে জ্বীন পরীরাও ভর করতে চায় আমার উপর মাঝে মাঝে। কিন্তু তোমার মন গলে না।”
রায়ানের কথায় মিরা আড় চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো। রায়ান আরো গলা উঁচু করে বলল-
“আমার সাথে সবাই ভালো ব্যবহার করে। তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। তুমি আমাকে একটু ভালো বাসলে আমিও তো তোমাকে একটু ভালোবেসে আদর করতে পারি।”
মিরা রায়ানের মুখে এসব কথা শুনে না চাইতেও হেঁসে ফেলল। মুখ টিপে হাসতে যেন মেয়েটার পেট ফেটে যাওয়ার পর্যায়ে। তার রাগ পালিয়ে দূর দেশে চলে গেল এক নিমিষে। সে তুচ্ছার্থে হেঁসে রায়ানের চোয়াল ধরে একটু উলটে পালটে দেখে মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“ইস, হ্যান্ডসাম না ছাই। এতো করে আমাকে চেয়েছেন তাই দয়া মায়া দেখিয়ে বিয়েটা করেছি.. নয় তো আপনার জীবনেও বিয়ে হতো না। নেহাতই ছোট বেলায় কিছু বুঝতাম না তাই আমার মতো সুন্দরী একটা বউ পেয়ে গেছেন। ”
রায়ান মিরার হাতটা ধরে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। মিরা হাঁসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে রায়ানের চোখে চোখ রাখলো। রায়ান মিরাকে আলতো ভাবে টেনে নিজের উন্মুক্ত বুকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে শান্ত গলায় বলল-
“থ্যাংক ইউ, আমাকে দয়া মায়া দেখানোর জন্য। ভাগ্যিস তুমি তখন ছোট ছিলে, আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া তুমি তখন কিছু বুঝতে না।”
মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের খোলা পিঠে হাত রাখলো তাকে জড়িয়ে ধরতে। মিরা হাতের চুড়িতে রায়ানের পিঠে আচড়া লাগতেই রায়ান সামান্য আর্তনাদ করে মিরার থেকে একটু সরে দাঁড়ালো। মিরা চিন্তিত হয়ে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“কোথায় লাগলো দেখি.. বেশি লেগেছে?”
রায়ান মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-
“ঠিক আছি, এসব তাড়াতাড়ি খুলো। বিরক্তি কর..!”
মিরারও খুব বিরক্ত বোধ হলো তার চুরিতে রায়ান ব্যাথা পেয়েছে বলে। সে তাড়াহুড়ো করে হাত থেকে চুরি গুলো খুলতে শুরু করলো।
-“আরে, ধীরে খুলো না। লেগে যাবে।”
রায়ানের সাবধান করাতে মিরা ধীরে সুস্থে চুরি গুলো খুলতে খুলতে ঘাড় কাত করে রায়ান কে বলল-
“আমি এগুলো খুলতে খুলতে আপনি গলার হার টা খুলুন তো। দমবন্ধ লাগছে।”
রায়ান মিরা কথায় এগিয়ে গিয়ে হারটা খুলতে উদ্যত হলো। রায়ান হারের ফিতে টুকু ঢিলে করতে গেলে তার চোখ স্থির হলো মিরার ঘাড়ের উপর। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে সে। মিরা সেটা খেয়াল করে প্রশ্নাত্মক চাহুনিতে রায়ানের দিকে মুখ উঁচু করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এমন ভাবে কি দেখছেন?”
রায়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাস্তবে পদার্পণ করলো। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাসূচক নাড়লো ছেলেটা। মিরা আর সেদিকে পাত্তা দিল না। রায়ান পুনরায় মিরার ঘাড়ের দিকে করুন চাহুনিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-
“কতদিন নিজের করা চিহ্ন দেখি না এখানটায়! মন চাইছে এখনি নিজের ট্যাগ লাগিয়ে দিই। অসহ্যকর যন্ত্রণা যত.. ! একটু আগেই ঠোঁট কামড়েছি, এখন ঘাড়ে কামড়ালে আমাকেই জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে। না না বাবা থাক।”
মিরা গয়না গুলো খুলে উঠে দাঁড়ালে রায়ান মুচকি হেসে অসমাপ্ত আলিঙ্গন টুকু সম্পূর্ণ করতে মিরার দিকে এগিয়ে গেলে মিরা রায়ান কে বাঁধা দিল-
“আমার শাওয়ার নিতে হবে। শরীরটা কেমন যেন লাগছে।”
রায়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা বিষন্ন হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছু হটে গেল। মিরা রায়ানের মনমরা মুখটা দেখে মুচকি হাসলো। সে ওয়াশ রুমে ঢুকার আগে আবারো জানান দিল-
“আমি শাওয়ার নিতে গেলাম।”
রায়ানের কোনো হেলদোল নেই। মিরা আশা করছিল রায়ান হয়তো প্রতিবারের মতোই তার পিছু নেবে কিন্তু ছেলেটার মনই ভেঙে গেছে। মিরা পুনরায় চেঁচিয়ে বলল-
“আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি..!”
-“হ্যাঁ তো যাও, আমি কি করবো? আমি কি তোমাকে ধরে রেখেছি?”
রায়ান বিরক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ এমনটা বলে ফেলায় মিরার বেশ অভিমান হলো। মিরা রেগে খটমট করে ওয়াশ রুমের ভেতরে গিয়ে দরজা লক করার আগে রায়ানের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল-
“আপনাকে কিছু করতে বলি নি। আর এটা ইনফরমেশন ছিল না। ইনভিটেশন ছিল।”
এই বলে সজোরে ওয়াশ রুমের দরজা বন্ধ করে দিল সে। রায়ান হতবাক। তার কয়েক সেকেন্ড লাগলো বুঝতে মিরার কথার উদ্দেশ্য। রায়ান বুঝতে পেরে সাথে সাথে ওয়াশ রুমের দরজায় গিয়ে হাত দিয়ে আঘাত করলো-
“হৃদপাখি..প্লিজ দরজা খোলো। খোদার কসম, আমি একটুও বুঝিনি। আস্তো একটা গাধা আমি। বেইবি প্লিজ..! আমার শরীরে আগুন জ্বলছে, আমিও শাওয়ার নেব। দরজা টা খুলো না একটু। ওই…আমার সোনা বউ..প্লিজ দরজাটা একবার খুলো। এই মিরাআআ..! জান বেরিয়ে গেল আমার দরজা টা খুলো না একবার।”
মিরা রায়ানের এমন তৃষ্ণার্ত আর্তনাদ শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে শাওয়ার অন করে দিয়ে হাত পা ছুড়ে নাচতে থাকলো। তার অন্তরে যেন এখন শান্তি লাগছে। মিরা দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো-
“একবার কেন অর্ধেকবার খোলা গেলে তাও খুলবো না। জ্বলুন এবার। বেয়াদব অসভ্য লোক। আমাকে ধমক দেওয়া তাই না? আগে একটু জ্বলে পুড়ে নিন পরে ভালোবাসবো।”
মিরা আর দরজা খুলার উদারতা দেখালো না। রায়ান ও এক পর্যায়ে অনুনয় করা বন্ধ করে দিল। নিজের উপর অসম্ভব রাগ হলো তার। নিজেই নিজের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবে এমন অবস্থা।
অন্যদিকে~
রুদ্র হনহনিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলো অন্ধকার ঘর কেবল মোমবাতির আলোয় জ্বলজ্বল করছে। একটু অবাক হয়ে সে আশে পাশে তাকাল তবে রিমিকে দেখতে পেল না। রুদ্র এক পা দু পা এগিয়ে গিয়ে রিমিকে ডাকলো-
“রিমি..এটা তোমার সারপ্রাইজ? তোমাকে ছাড়া এই সারপ্রাইজ দিয়ে কি করবো আমি?”
হঠাৎ তখন কেউ রুদ্র কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে। রুদ্রর পা থমকে গেল। সে তার কোমর জড়িয়ে ধরা হাত জোড়ার উপর আলতো করে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে হুম? আমার সামনে আসছো না কেন?”
রুদ্র ভালো করেই জানে তাকে জড়িয়ে ধরা ব্যক্তি রিমি। রিমি অভিমানী কণ্ঠে বলল –
“এখন ঘরে আসার সময় হলো বুঝি? মেসেজ টা না দিলে তো ঘরেও আসতেন ন। আমার মুড অফ এখন তাই সামনে আসছি না।”
রুদ্র মুচকি হেঁসে পিছন দিকে মাথা কাত করে বলল-
“আমি মুড অন করতে জানি। সামনে এসো।”
রিমি লজ্জায় রুদ্রর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে মুখ লুকিয়ে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল-
“উঁহু, আপনি আমাকে দেখবেন না প্লিজ। বেশি বুঝে, কি না কি পড়ে ফেলেছি আপনি একটু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি চেঞ্জ করে আসছি।”
রিমি ফটাফট কথাগুলো বলে রুদ্র কে বাঁধন মুক্ত করে দৌড়ে পালাতে চাইলো। কিন্তু তা আর নাড়লো না। রিমি পিছন থেকে পালিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে যেতে চাইলে রুদ্র তখনি রিমির হাত আঁকড়ে ধরে তাকে থামিয়ে দিল-
“আরে আরে, পালাচ্ছো কেন! দেখতে তো দাও কি পড়েছো।”
-“প্লিজ প্লিজ, ভুল হয়ে গেছে। হুজুগে পড়ে ফেলেছি। ছেড়ে দিন না।”
-“অদ্ভুত তো..কি এমন পড়েছ যে দেখতে পারবো না? এখন তো দেখতেই হবে আমার। দেখি সামনে আসো।”
-“না না… রুদ্র প্লিজ!”
রুদ্র রিমির কোনো বাড়োন শুনতে রাজি ছিল না। মনের কৌতুহল যেনো আরো জেকে বসলো তার উপর। রুদ্র রিমির হাত টেনে মেয়েটাকে নিজের সামনে নিয়ে এলো।
রিমির গায়ে ছিল গাঢ় লাল রঙের একটি নাইট ড্রেস। নরম সিল্ক কাপড়ের মসৃণ ছোঁয়ায় পোশাকটা যেন তার দেহের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। ঘরের মৃদু আলোয় লাল রঙটা আরও গভীর ও উজ্জ্বল দেখালো রুদ্রর দৃষ্টতে, রুদ্রর হাতের বাঁধন রিমির কব্জির থেকে ছুটলো। রুদ্র স্তব্ধতার শিখরে। তার পুরুষ সত্তা হৃদয়ে ঝংকার তুললো, চক্ষু জোড়া নিজের স্থান ত্যাগ করে তার হাতে চলে আসার উপক্রম। রিমি দুই হাতে নাইট ড্রেসের সামান্য কাপড় খামচে ধরে মাথা লজ্জায় নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পা এমনিতেই কাঁপছে মৃদু গতিতে। ঘরটায় মোমবাতির উষ্ণতা বৃদ্ধি পেল। রিমি রুদ্র কে চুপ থাকতে দেখে কৌতূহলী মনে মাথা উঠিয়ে রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো। সম্পূর্ণ ব্লেংক একটা মুখশ্রী দেখে রিমি আরো ঘাবড়ে গেল। মেয়েটা ভয়ে বোধহয় এবার কেঁদেই ফেলবে। রিমি লজ্জায় নিজের মুখ দুহাতে ঢেকে ছোট ছোট পদক্ষেপে রুদ্রর দিকে এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর বুকে মুখ লুকিয়ে নিল যা রুদ্রর সুঠামদেহ ঝাঁকিয়ে তুলতে সক্ষম। রিমি রুদ্রর অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদস্পন্দন শুনতে পেল শুধু যে শুনলো তার নয়। সেই তীব্র শব্দ তার হৃদস্পন্দনও অস্বাভাবিক করে তুললো হয়তো। রিমি মিনমিনে গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“রুদ্র, আপনার হার্ট বিট এতো ফাস্ট চলছে কেন?”
রুদ্র হঠাৎ নিজের বুকে ভার অনুভব করলো। রিমি কে নিজের বুকে মুখ লুকাতে দেখে সে সামান্য গৌরবময় হাসি হাসলো। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমি মাথায় হাত রাখলো। রিমি একটু চমকে মিটিমিটি চোখ খুলে রুদ্রর দিকে তাকালে রুদ্র চট করে রিমির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে গলায় বলল-
“এমন রূপের দর্শন করিয়ে যদি আশা রাখো এই নির্লজ্জ পুরুষ হৃদয় শান্ত থাকবে তাহলে তো এটা ঘোর অপরাধ।”
রিমি আবারো মুখ নিচু করে নিল। রুদ্র রিমির দু গালে হাত রেখে তার চোখে চোখ রাখতে মেয়েটাকে বাধ্য করলো-
“এতো গুলো মাস সংসার করে এতো লজ্জা?! তুমি এতো লজ্জায় ডুবে থাকলে আমি কিভাবে বাঁচবো বলো তো? আমাকে ভালোবেসে কি একটা দিন এই লাজ সরিয়ে রাখা যায় না?”
রিমি জবাব না দিয়ে নিজের চোখ বন্ধ করে নিল। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমির গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল-
“তোমার অনুমতি ছাড়া কখনো তোমার উপর জোর খাটাই নি। আজও জোর করবো না।”
রুদ্রর কথায় রিমি বিষন্ন চাহুনিতে তার দিকে তাকালো। রুদ্র রিমির কপালে আবারো চুমু খেয়ে তার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে রিমি রুদ্র কে পিছন থেকে জাপটে ধরে মৃদু লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে গাইলো-
“এই হৃদয় চিরে দেখ,
তোমারই ছবি..! বড় ভালোবাসি,
তবু লাজে মরি।।”
রুদ্র তার কাঙ্খিত জবাব পেল। রিমির দিকে ঘুরে সে সঙ্গে সঙ্গে রিমির ওষ্ঠযুগলে কব্জা করলো। রিমি আবেশে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। আজ প্রথমবার রুদ্র রিমিকে এতোটা অ্যাক্টিভ দেখছে। মাঝের ছোট্ট বিরতির জন্য রিমি রুদ্রর বুকে মৃদু ধাক্কা দিল। রুদ্র রিমির ওষ্ঠযুগল ছেঁড়ে মেয়েটার কানের কাছে মুখে নিয়ে গিয়ে তার ছোট্ট আবদার টুকু রাখলো-
“আমার ছোট্ট একটা আদুরে প্রাণ চাই রিমি। দেবে না আমায়?”
রিমি নিঃশ্বাসের গতি সামলে নিল। রুদ্রর চোখে চোখ রাখে সে হাসি মুখে মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে সম্মতি দিল। রুদ্র মুচকি হেঁসে রিমিকে জড়িয়ে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়ে চললো বিছানার দিকে।
অপর দিকে, শাওয়ার শেষে মিরা আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ বিছানার এক দিকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। বেচারা রায়ান ও এরপর একা একা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। তবে মনে এখনই হাল ছেড়ে দেওয়ার ছেলে সে নয় এটা মিরা আর সে নিজেও জানে। যা তার চাই বরাবরই তা আদায় করে নিয়েছে কোনো না কোনো ভাবে। মিরা ঘুমের ভাব ধরে থেকে হালকা চোখ খুলে সবটা খেয়াল করছে। রায়ান ও জানে মিরা এখনো ঘুমায় নি। তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসে পরিলক্ষিত হলো। রায়ান বিছানায় উঠতে উঠতে নিজের মনে বিড়বিড় করলো-
“আমাকে জ্বালিয়ে এমনি এমনি নিস্তার আপনি পাবেন না মিসেস।”
রায়ান গিয়ে সোজা মিরাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। মিরা রায়ানের স্পর্শ গায়ে ফোস্কা পড়ার মতো চেঁচিয়ে উঠলো-
“আমার ঘুম পাচ্ছে। গালি শুনার ইচ্ছে না থাকলে, আমার কাছ থেকে দূরে যান বলছি।”
রায় নিজের একরোখামি বজায় রেখে খুশি মনে বলল-
“Go ahead..তুমি শুনালে গালিও শুনে নেব। শুনাও শুনাও..!”
রায়ানের কথা কানে যেতেই মিরার হাঁসি বাঁধ ভাঙলো। যতটা সম্ভব হাসি নিয়ন্ত্রণ করে মুখ টিপে হাসলো সে। এই পরিস্থিতি বুঝতে রায়ানের সময় লাগলো না। সেও ঠোঁটের কোণায় দুষ্টু হাসির রেখা টেনে মিরার কানে কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার হৃদপাখি কি হাসছে?”
মিরার অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো। সে বিরোধীতা করে খুব চট জলদি উত্তর দিল-
“কই না তো? আমি কেন হাসবো?”
রায়ান মিরার চুলের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরার কোমল উদরে হাত বুলিয়ে বলল-
“তাহলে কি আমার প্রিন্সেস হাসছে তার পাপার কথা শুনে?”
মিরা রায়ানের দিকে ঘুরলো। মনে এতোক্ষণ যাবত যেই অভিযোগ ছিল তা রায়ানের মুখের উপর বলল-
“আপনি আমাকে ঘরে চলে আসতে বললেন কেন?”
রায়ান মিরার হাত টা নিয়ে নিজের মুখের উপর রেখে লাজুক ভাব নিয়ে বলল-
“আমি কমু না। আমার শরম করে।”
মিরা বিরক্ত ভঙ্গিতে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করলো-“ড্রামাকিং.,!”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে বুঝিয়ে বলল-
“কত রাত হয়েগেছিল খেয়াল আছে তোমার? মাহির সোরায়ার কথাটা ভেবেছো একবার? ওরা কত ক্লান্ত ছিল। তাছাড়া তুমি নিজের অবস্থা দেখেছো? তোমার মধ্যে যে একজন আছে সেই খেয়াল তো তোমার থাকেই না হৃদপাখি। লেহেঙ্গা পড়ে যে বাইক রাইড করেছ আর ঠিক কতটা স্পিডে চালিয়েছে সেটা আমার বুঝতে বাকি নেই। ওটার জন্য তো এখনো বোকা খাওনি। আমি তো সবার দিকে থেকে যেটা ভালো হবে শুধু সেটাই সাজেস্টে করেছি। তুমি জেদ করতে তাই জোর গলায় বলেছি এটা কি বোকা দেওয়া হলো?”
মিরার রায়ানের এতো জ্ঞানের কথা পছন্দ হলো না। সে সুযোগ বুঝে রায়ানের মুখ বন্ধ করতে নিজের ঠোঁট এগিয়ে রায়ানের ঠোঁটের উপর রাখলো। মিরা কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপ্তিতে নিজের ঠোঁট জোড়া রায়ানের থেকে আলাদা করে নিল। রায়ান মিরার চোখে চোখ রাখতেই মিরার চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ দেখতে পেল স্পষ্ট। রায়ান মিরাকে সাবধান করে বলল-
“এমন উল্টো পাল্টা গেইম আমার সাথে খেলো না হৃদপাখি। তুমি জানো আমি সামলাতে পারবো না পরে।”
মিরা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল –
“আমি কোনো গেইম খেলছি না। আমি আমার হাবিকে আদর করছি। আপনার তাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে মিরার কথা মেনে নিয়ে ঘোর লাগানো কণ্ঠে বলল-
“আমার কোনো সমস্যা নেই তাতে পাখি। কিন্তু তোমার হাবি যদি এখন তোমাকে বিপরীতে যাবৎ আদর করতে শুরু করে তাহলে তোমার ঠিকই সমস্যা হবে।”
মিরার চোখের আকার বড় বড় হয়ে উঠলো। রায়ান অধৈর্য হয়ে মিরা দিকে অগ্রসর হলো। মিরা রায়ানের কাঁধে হাত রেখে তাঁকে থামাতে চেয়েও ব্যর্থ। রায়ান মূহুর্তের মধ্যে মিরার ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিল। এতো অশান্ত ছোঁয়ায় মিরা নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করলো। বুকের ধুকপুকানি বাড়লো। রায়ান মিরার ঠোঁট দুটো মুক্ত করতেই মিরা লজ্জায় রায়ান কে জাড়িয়ে ধরতেই রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল –
“এখন কেন লজ্জা পাচ্ছো? শুরু তো তুমিই করলে।”
মিরা শুধু ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে। রায়ান মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“আই নিড টু পাখি..!”
মিরার গালের লাল বর্ণ সম্পূর্ণ চেহারায় ছড়িয়ে পড়লো। সে দ্বিধায় চোখ তুলে বলল-
“সে ইট এগেইন…!”
রায়ান এবার বড্ড অসহায় গলায় বললে উঠলো-
“ইউর হাবি নিডস ইউ হার্ট বার্ড…হি ইজ ডাইং ইনসাইড। হি ফাক** নিডস ইউ..!”
এমন অসহায়ত্ব উপেক্ষা করার ক্ষমতা হয়তো মিরার নেই। সে পুনরায় নিজের ঠোঁটে রায়ানের রাজত্বের আহ্বান করলো তবে সেই রাজত্ব মোটেও ঠোঁট অব্দি সীমাবদ্ধ হলো না বর্ধিত হলো সর্বোচ্চ পরিসরে।
রাত ২টা~
মাহির ফ্রেশ হয়ে এলে সোরায়া আর সে একসঙ্গে নামাজ পড়ে সৃষ্টি কর্তার কাছে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখের জন্য দোয়া ও শুকরিয়া আদায় করেছে। এখন প্রায় ১০ মিনিট যাবত জায়নামাজের উপরেই বসে আছে দুজনে। সোরায়া এমন চুপচাপ থাকতে তেমন অভ্যস্ত নয় বরাবরই খুব চঞ্চল। অথচ এখন চুপচাপ হয়েই বসে আছে। সোরায়া একনজর মাহিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মাহির ও সেটা খেয়াল করে সোরায়ার দিকে তাকালে সোরায়া একটু ইতস্তত বোধ করে চোখ নামিয়ে নিল। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থেকেই সোরায়ার কোলে জায়গা করে নিজের মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। সোরায়া হতভম্ব হয়ে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির সোরায়ার দিকে চোখ টিপে ইশারা করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল-
“কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার জানবাচ্চা টু আমার বাচ্চাবউ।”
সোরায়ার দ্বিধা অনেকটা কেটে গেল সাথে সাথে। এতক্ষণ ধরে সে চুপচাপ ছিল শুধু মাহিরের তরফ থেকে একটু ফ্রি সিগন্যালের আশায়। মাহিরের কথার ধাচ ধরে সেও একই ভাবে উৎসাহিত কণ্ঠে বলল-
“কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার স্যার টু আমার স্বামী জান।”
মাহির সোরায়ার মুখেও একই কথা শুনে মৃদু হেসে সোরায়ার নাকটা টেনে দিল। সোরায়া মাহিরের হাত সরিয়ে দিয়ে মাহির কে ঠেলে নিজের কোলে থেকেও উঠিয়ে দিল। মাহির প্রশ্ন করলো-
“কি হলো বউজান? কোনো সমস্যা?”
-“সমস্যা তো অবশ্যই। আপনি দেরি করে এলেন বলে আমি আগে আগেই শাওয়ার নিয়ে নিয়েছি। আপনি আমার ঘোমটাও তুলেন নি। এটা কোনো বাসর রাত হলো?”
সোরায়া মুখ ফুলিয়ে নালিশ করলো মাহিরের কাছে। সোরায়া নিজের থেকেই কিছু একটা ভেবে বলল-
“অতীত তো আর পাল্টানো সম্ভব নয়। আমি বরং শাড়ির আঁচল দিয়ে আবার ঘোমটা দিই আপনি তুলবেন কেমন? মাহির মুচকি হেসে সোরায়ার বাচ্চামিতে সায় দিল। সোরায়া শাড়ির আঁচল দিয়ে লম্বা করে একটা ঘোমটা টেনে দিল নিজের মুখের উপর। দুজনের একজনের মুখ থেকেও হাসি সরছে না। সোরায়া ঠিকঠাক হয়ে বসলে মাহিরের তার ঘোমটা উঠালো। সোরায়া মায়াবী ভঙ্গিতে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির নিজের বুকের বা পাশে হাত রেখে ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে যেতে যেতে বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭
“হায়য়, মাশাআল্লাহ, মারহাবা।”
সোরায়া মাহিরের প্রতিক্রিয়া দেখে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। মাহির সোরায়ার খুশি দেখে ফ্লোর থেকে উঠে সোরায়ার দুগালে হাত রেখে মেয়েটার মুখ কাছে নিয়ে তার কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলল-
“কি মিষ্টি বাচ্চা বউটা..!”
দুজনেই বাঁধাহীন হেঁসে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই মাহিরের খেয়াল হলো আজ সোরায তার বড্ড কাছে। মাহিরের হাসি বেগ কমলো। তার নজর পড়লো সোরায়ার গোলাপ রাঙা ঠোঁটে। কি অসম্ভব চমৎকার লাগছে তার ঠোঁটের কোণে প্রাণবন্ত হাসির রেখা।
