আবির ভাই পর্ব ১৫
উর্মিলা মজুমদার
আবির ভাই গাড়ি চালাচ্ছেন অত্যন্ত ধীরে সুস্থে। আবির ভাইকে আজ একটু বেশি সুদর্শন লাগছে। ধবধবে সাদা শার্টের ওপর কালো প্যান্ট, তার ওপর একটা নেভি ব্লু ব্লেজার। কবজিতে জাপানিজদের বিখ্যাত ঘড়ি ক্যাসিও জি-শক। মানুষটা টাই বেঁধেছেও একদম নিখুঁতভাবে।
মেঘ আড়চোখে একবার তাকে দেখল। দেখার পর তার ভেতরে হঠাৎ করে ‘টুপ’ করে একটা শব্দ হলো। মনে হলো বুকের ভেতর কেউ যেন এক বালতি ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছে। মেঘের হার্টবিট বাড়ছে। হৃৎপিণ্ডের এই অস্বাভাবিক দ্রুত চলাচলকে বিজ্ঞানের ভাষায় ট্যাকিকার্ডিয়া বলে। তবে মেঘের কাছে মনে হচ্ছে তার ফুসফুস থেকে অক্সিজেন উধাও হয়ে যাচ্ছে। সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো বাইরের রাস্তার দিকে।
একটু পরেই মেঘ এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। খুব সন্তর্পণে নিজের ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল। তারপর অতি ধীরগতিতে ফোনটা ছেড়ে দিল গাড়ির সিটের তলায়। কাজটি করার সময় তার হাত সামান্যও কাঁপল না। অরু বা আবির ভাই কেউই টের পেল না। কিন্তু মেঘ এমনটা কেন করল? তার মাথার ভেতর নিশ্চয়ই কোনো জটিল জ্যামিতি কাজ করছে। জগতের সব মেয়েরাই কি একটু আধটু জাদুকর হয়? যারা কোনো কারণ ছাড়াই সমস্যা তৈরি করে আনন্দ পায়?
শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে গাড়ি এসে থামল।
অরু হাত নেড়ে বলল, “বাই আবির ভাই!”
মেঘ একবারও ফিরে তাকাল না। সে হনহন করে ভেতরে ঢুকে গেল। আবির ভাই মেঘের চলে যাওয়া দেখলেন। কলেজের ভেতরে গিয়ে মেঘ যেন পাথর হয়ে গেল। মমো আর নাবিলা নামের মেয়ে দুটো অরুর সাথে বেশ জমে উঠেছে। হাসাহাসি করছে। শুধু মেঘ চুপচাপ। তার চোখজোড়া কোনো ঘোরে আটকে আছে। মমো ওকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, “কীরে মেঘ, তোর কী হয়েছে? ভূতে ধরেছে নাকি?”
মেঘ চমকে উঠল। যেন অনেক দূর থেকে কেউ তাকে ডেকেছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “উহুম, কিছু হয়নি তো!”
সবাই মেনে নিল, কিন্তু অরু মানল না। সে মেঘকে খুব ভালো করেই চেনে। এক বাদর যেমন অন্য বাদরের লেজ চেনে, অরুও তেমন মেঘের চোখের মেঘ চেনে। ততক্ষণে ক্লাসের ঘণ্টা বেজে উঠেছে। প্রফেসর ভেতরে ঢুকলেন। মেঘ ডায়েরির পাতা খুলে কলমটা হাতে নিল।
বেলা এগারোটা পনেরো। কলেজের করিডোরে এখন যুদ্ধের দামামা। টিফিনের ঘণ্টা পড়া মাত্রই ক্লাসের ভেতর থেকে ছাত্রছাত্রীরা এমনভাবে বের হতে শুরু করেছে যেন খাঁচা খুলে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে হুড়োহুড়ি, হট্টগোল আর তারুণ্যের চিৎকার। অরু ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দরজার কাছে গিয়ে একবার থমকে দাঁড়াল। পেছনে তাকিয়ে দেখল মেঘ এখনো বসে আছে। অরু গলা চড়িয়ে ডাকল, “মেঘ, চল!”
মেঘ কোনো জবাব দিল না। সে নিবিষ্ট মনে নিজের ব্যাগের ভেতর হাতড়োচ্ছে। যেন ব্যাগের অতল গহ্বরে কোনো হারানো সাম্রাজ্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে সে। অরু ভুরু কুঁচকে এগিয়ে গেল তার দিকে। মেঘের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখে দুশ্চিন্তা। অরু নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী খুঁজছিস রে মেঘ? গুপ্তধনের ম্যাপ? সেটা খুঁজে পাবি না।”
মেঘ মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে বলল, “ফোনটা খুঁজে পাচ্ছি না রে অরু।”
অরুর চোখ জোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল। এই মেয়ে বলে কী! ফিসফিস করে বলল, “তুই কলেজে ফোন নিয়ে এসেছিস? সাহস তো কম না!”
”এনেছিলাম তো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ফোনটা আমায় ত্যাগ করেছে।”
অরু কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল। আবির ভাইয়ের কথা তার মনে পড়ে গেল। আবির ভাই মানেই একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার পাহাড়। অরু বলল, “আবির ভাই তোকে এতো শখ করে দামি একটা ফোন কিনে দিল, আর তুই সেটা প্রথম দিনই কলেজ এনে হারিয়ে ফেললি? এ কী তোর মামার বাড়ির আবদার!”
অরুর কথা শেষ হওয়ার আগেই মেঘ একটা চিৎকার দিল। যেন হঠাৎ করে তার মাথায় নিউটনের আপেল পড়েছে। মেঘ চেঁচিয়ে উঠল, “আবির ভাই! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস অরু, আবির ভাই!”
অরু ভড়কে গিয়ে বলল, “আবির ভাই আবার কী করল?”
মেঘ এবার কপালে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “অরু, ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। ফোনটা আমি আবির ভাইয়ের গাড়িতে ফেলে এসেছি। এখন সে ফোন নিশ্চয়ই আবির ভাইয়ের পকেটে কিংবা সিটের নিচে দিব্যি ঘুমাচ্ছে।”
অরুর কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে চিৎকার দিয়ে বলল, “কী! এখন উপায়? আবির ভাই যদি জানতে পারে তুই ফোনটা ফেলে এসেছিস, তবে তো নির্ঘাত তোর কপালে শনি আছে।”
মেঘ তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকাল। কিছুক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে থেকে ভাবল। যেন খুব কঠিন কোনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান করছে। তারপর শান্ত গলায় বলল, “কী আর হবে? ফোন উদ্ধার অভিযানে নামতে হবে। জীবনের প্রথম ফোন বলে কথা, তাও আবার স্যামসাং! এই ফোন যদি একবার হাতছাড়া হয়, তবে এই জনমে আর আমার কপালে ফোন জুটবে না। আবির ভাই আমাকে দিয়ে বড়জোর একটা খেলনা ফোন কেনাবে।”
অরু বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল। মেঘের এই নির্লিপ্ততা মাঝে মাঝে সহ্য করা কঠিন। সে ঝামটা দিয়ে বলল, “উফ মেঘ! তুই এখন ফোনের দাম আর ব্র্যান্ডের কথা রাখ তো। ফোনটা কীভাবে উদ্ধার করবি সেই চিন্তা কর।”
মেঘ জানালার বাইরের আকাশটার দিকে তাকাল। রোদটা বেশ কড়া। আজ আকাশটা নীল, তবে সেই নীলের মধ্যে কেমন জানি একটা বিষণ্নতা মাখানো। সে রহস্যময় হাসল। মেঘ বিড়বিড় করে বলল, “উদ্ধার হবে অরু, উদ্ধার হবে। ফোন আমার কাছে ফিরে আসবে।”
” কিন্তু কীভাবে? ”
মেঘ গলায় কিছুটা নাটকীয়তা মিশিয়ে মনেমনে বলল, “অরু, চালটা আমি ঠিকঠাকই চেলেছি। দাবারু হলে এই চালে কিস্তিমাত হয়ে যেত।”
অরু বিরক্ত হয়ে বলল, “তোর এই হেঁয়ালি মার্কা কথা বন্ধ করবি? কী বলতে চাস সোজা বল।”
মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সোজা কথা হলো, আবির ভাই এখন অফিসে। আর উনার সেই সাদা মার্সেডিজ গাড়িটা যেটাতে চড়ে আজ আমরা কলেজে এলাম সেটাও এখন অফিসের পার্কিং লটে। আমাদের গন্তব্য এখন ওটাই।”
অরু চোখ কপালে তুলে বলল, “মানে? তুই আবির ভাইয়ের অফিসে যাবি? ধরা পড়লে আবির ভাই যে তোর কান টেনে টমেটো বানিয়ে দেবে, সেটা কি জানিস?”
মেঘ হাসল। বলল, “কান লাল হওয়া তো স্রেফ একদিনের ব্যাপার। কিন্তু ফোনটা উদ্ধার না করতে পারলে আমার বাকি জীবনটা হবে লবনামুক্ত তরকারির মতো পানশে। তার চেয়ে একদিনের জন্য টমেটো হওয়া ঢের ভালো। তুই কি চাস আমার জীবনটা সমুদ্রের নোনা জলে ভেসে যাক?”
অরু দমে গেল। মেঘের ফোনের অর্ধেক ভাগীদার সে-ও। ফোন হারানো মানে তার জীবনেরও একটা বড় অংশ হারিয়ে যাওয়া। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “ঠিক আছে, যাব। কিন্তু কলেজ থেকে বের হব কী করে? গেট দিয়ে তো আমাদের এমনি এমনি ছাড়বে না।”
মেঘের চোখে তখন ধূর্তামি। ফিসফিস করে শুধাল, “সহজ বুদ্ধি। আমি পেটে হাত দিয়ে বমির ভান করব। মুখটা এমন করব যেন এখনই নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসবে। তুই প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে গিয়ে বলবি। তোর কাজিন গুরুতর অসুস্থ, এখনই বাসায় নিয়ে যাওয়া দরকার। কলেজ থেকে যখন বাসায় ফোন দিতে চাইবে, তখন তুই চালাকি করে ফোনটা ধরিয়ে দিবি আমার হাতে। ব্যস, ইজি!”
অরু মেঘের মাথায় হালকা একটা গাঁট্টা মেরে বলল, “তুই তো দেখি দিন দিন খবিস হয়ে যাচ্ছিস! আমার সাথে মিশে বুদ্ধি বাড়ছে তোর।”
মেঘ নাক কুঁচকে বলল, “ভুল বললি অরু। আমি জন্মগতভাবেই জিনিয়াস। তুই আমার থেকে কেবল তার ছোঁয়া পাচ্ছিস।”
অতঃপর দুই ‘বাঁদর’ বিশেষ দক্ষতায় মিথ্যা অজুহাতের জাল বুনল। অসুস্থতার নাটকটা মেঘ এমন নিখুঁতভাবে করল যে খোদ ডাক্তার ডাকলে তিনিও হয়তো বিভ্রান্ত হয়ে যেতেন। তারা কলেজের গেট দিয়ে বেরোল। মেঘ বারবার তার কবজিতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। ঠিক একটা বাজার আগেই পৌঁছাতে হবে।
আকাশের মতিগতি বোঝা বড় দায়। কিছুক্ষণ আগে দপুরের রোদটা ছিল বেশ কড়া, যেন চৈত্র মাসের খরতাপ। হুট করে সেই রোদের তেজ ঝিমিয়ে পড়ল। কোত্থেকে এক গুচ্ছ মেঘ উড়ে এসে আসর জমিয়ে বসল আকাশের ঠিক মাঝখানটায়। আধঘণ্টা আগের দৃশ্য যে দেখেছে, সে বাজি ধরে বলবে এটা খাঁটি গ্রীষ্মকাল। আর এখন যে দেখছে, সে হলপ করে বলবে ঘোর বর্ষা। অথচ মাসটা অক্টোবর। হিম হিম একটা ভাব চারদিকে। শীতের আগাম বার্তা নিয়ে আসা ছন্নছাড়া বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝিমঝিম বৃষ্টি।
প্রকৃতি বড় বিচিত্র সব খেলা খেলে, তবে এই স্বাভাবিক খেলার ভেতরেও কিছু অস্বাভাবিক নিয়ম থাকে। মানুষ সেই নিয়মগুলো ধরতে পারে না। অরু আর মেঘ পৌঁছে গেছে আবির ভাইয়ের অফিসের নিচে। ঘড়িতে তখনো একটা বাজেনি। অরু মেয়েটা চটপটে, কিন্তু মেঘের মধ্যে একটা শান্ত স্থির ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিছু সময় যাবত। সাদিফের কল্যাণে অফিসের লোকজনের কাছে অরু পরিচিত মুখ, সেই খাতিরেই ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলল। পরিচয় দেওয়া হলো তারা আবির ভাইয়ের কাজিন।
দুই কিশোরীর পরনেই কলেজের সাদা ইউনিফর্ম। টান টান করে বাঁধা দুটো বেণী। মেঘের নাকের ডগাটা বৃষ্টির ছাঁটে কিঞ্চিৎ লাল হয়ে আছে। এমনিতেই মেঘ মেয়েটা অসম্ভব রূপবতী, তার ওপর নাকের এই লালচে রঙে নিদারুণ সুন্দর লাগছে। এক জোড়া চোখ নিয়ে সে তাকিয়ে আছে চারদিকে। পার্কিং লটের অন্ধকারে আবির ভাইয়ের গাড়িটা খুঁজে বের করতে অরুর খুব একটা সময় লাগল না। সে একরকম দৌড়েই গেল গাড়ির কাছে। কিন্তু মেঘের মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে হাঁটছে মন্থর পায়ে। অরু জানালার কাঁচ দিয়ে উঁকি দিল। উত্তেজনায় তার গলা চিরে চিৎকার বেরোল, “মেঘ! এই তো তোর ফোন! আবির ভাইয়ের গাড়ির পেছনের সিটের নিচে পড়ে আছে।”
মেঘ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আসলে ফোন উদ্ধার করা তার মূল উদ্দেশ্য নয়, তার উদ্দেশ্য ছিল কোনোমতে এই অফিস পর্যন্ত আসা। সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এখন তার মাথায় ঘুরছে অন্য কোনো এক গূঢ় পরিকল্পনা। তাকে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অরু রীতিমতো বিরক্ত হয়ে তাকে একটা ঝাঁকুনি দিল।
“এই মেঘ! কোথায় হারিয়ে গেলি? ওই তো তোর ফোন দেখা যাচ্ছে, জলজ্যান্ত পড়ে আছে।”
মেঘ সংবিত ফিরে পেয়ে খানিকটা আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ রে, দেখেছি। কিন্তু ফোনটা নেব কীভাবে? গাড়ি তো লক করা।”
অরু কোমরে হাত দিয়ে বিজ্ঞের মতো বলল, “তুই এখানে দাঁড়া। আমি দারোয়ান চাচ্চুর কাছে গিয়ে দেখি চাবিটা পাওয়া যায় কি না।”
মেঘ উত্তর দিল না। সে নির্লিপ্ত চোখে জানালার কাঁচের ওপাশে পড়ে থাকা ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির শব্দ ক্রমশ বাড়ছে। এই অবস্থায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা যায়, ‘মানুষের জীবনটা ওই লক করা গাড়ির ভেতরে পড়ে থাকা ফোনের মতো। অরু হন্তদন্ত হয়ে দারোয়ানের কাছে গেল। লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে পান চিবোচ্ছে। অরু জিজ্ঞেস করল, “চাবিটা কি আপনার কাছে?”
দারোয়ান হতাশাজনকভাবে মাথা নেড়ে বলল, “না আম্মা, স্যারের গাড়ির চাবি তো আমার কাছে নাই।”
“তাহলে কার কাছে?”
“স্যারের কাছেই পাবেন।”
কথাটা শুনেই অরু নিজের জিভে কামড় দিল। তার ইচ্ছা ছিল অতি সংগোপনে, আবির ভাইকে বিন্দুমাত্র টের পেতে না দিয়ে ফোনটা উদ্ধার করে চম্পট দেওয়া। কিন্তু বিধি বাম। এর মধ্যেই মেঘ তার সহজাত চড়া গলায় বলে উঠল, “আচ্ছা, আবির ভাইকে এখন কোথায় পাব?”
দারোয়ান লোকটা আকাশ পানে চেয়ে যেন বৃষ্টির ফোটা গুনছে। সে নির্লিপ্ত মুখে বলল, “গাড়ি যখন এখানে, স্যার তখন অফিসেই আছেন। আপনারা রিসিপশনে গিয়ে খবর লন।”
অরু মেঘের কানে ফিসফিস করে বলল, “মেঘ, এখন কি আবির ভাইয়ের কাছে যাওয়াটা খুব জরুরি? চল কেটে পড়ি।”
মেঘ গম্ভীর হয়ে বলল, “অবশ্যই জরুরি। এতদূর এসে ফিরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। তুই চল তো আমার সাথে।”
মেঘের হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। অরু ভালো করেই জানে, মেঘ যখন জেদ ধরে, তখন হিমালয় পর্বতকেও সে নড়ানোর ক্ষমতা রাখে। রিসিপশনে গিয়ে মেঘ যা করল, তাতে অরুর আক্কেলগুড়ুম হওয়ার দশা। মেঘ খুব স্মার্ট ভঙ্গিতে বলল, “আমরা এই অফিসের সিইও (CEO) এর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
রিসিপশনিস্ট মেয়েটা এমনভাবে তাকাল যেন মেঘ ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী। অফিসের অন্য কর্মচারীরাও কাজ থামিয়ে একবার চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে নিল। আবির ভাইকে এ পর্যন্ত কেউ এভাবে সম্বোধন করে ডাকেনি। অরু মেঘের জামা টেনে ফিসফিসাল, “মেঘ, আস্তে! কী করছিস এসব?”
মেঘ কোনো উত্তর দিল না। তার লক্ষ্য স্থির। রিসিপশনিস্ট মেয়েটা কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল, “সরি ম্যাম, আপনারা এভাবে হুট করে তার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।”
মেঘ ভুরু কুঁচকে বলল, “কেন? আমরা তার কাজিন হই।”
“দেখুন ম্যাম, আপনি যেই হোন না কেন, এখন অফিস আওয়ার চলছে। আমাদের নিয়ম খুব কড়া। ওনার সঙ্গে দেখা করতে হলে আপনাকে আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। আর আগামী ছয় মাসের আগে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট খালি নেই।”
অরুর মুখ হাঁ হয়ে গেল। “ছয় মাস! আবির ভাইয়ের সাথে দেখা করতে ছয় মাস লাগবে?”
কিন্তু মেঘ দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ওনার অফিস কেবিনটা ঠিক কোনটা, সেটা কি জানতে পারি?”
রিসিপশনিস্ট মেয়েটা এবার একটু নমনীয় হলো। সে বলল, “জি, টুয়েলভ ফ্লোর, এ-সিক্সটিন।”
“ধন্যবাদ।”
মেঘ এক মুহূর্ত দেরি না করে অরুর হাত ধরে টানতে টানতে লিফটের সামনে নিয়ে এল। লিফটের বোতাম টিপে সে সরাসরি ‘১২’ সিলেক্ট করল। অরু এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। সে গলা উঁচিয়ে বলল, “মেঘ, তুই এসব কী করছিস বল তো? এটা আমাদের নিজেদের অফিস। তুই যেভাবে ওখানে রিয়েক্ট করলি, সবাই আড়চোখে তাকাচ্ছিল। কী বিশ্রী কাণ্ড!”
আবির ভাই পর্ব ১৪
মেঘ লিফটের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “সো হোয়াট?”
অরু থতমত খেয়ে বলল, “হোয়াট মানে? মানেটা তুই বুঝতে পারছিস না?”
মেঘ হাসল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “নাথিং। কাম অন, এনজয় দ্য রাইড।”
লিফট ওপরের দিকে উঠতে লাগল। মেঘের চোখের অন্দরে যুক্তির চেয়ে খামখেয়ালিপনার দামিয়ে বেড়াচ্ছে। কিছু একটা হতে চলেছে।
