Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৩৮

আমার আলাদিন পর্ব ৩৮

আমার আলাদিন পর্ব ৩৮
জাবিন ফোরকান

সারারাত লঞ্চের দুলুনির পর কুসুম গরম পানিতে গোসল সেরে বেশ আরাম বোধ করছে ইরাম। চুলগুলো তোয়ালেতে পেঁচিয়ে বাথরুমের বাইরে বেরোতেই বিছানায় উপুড় হয়ে দুটো খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলতে থাকা ইযানকে চোখে পড়ল তার। মুচকি হাসল সে ছেলেকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে গাড়ি দুটোকে ঘষাঘষি করতে দেখে। নতুন গাড়ির থেকে বেশি গাড়ি ভেঙে ভেতর থেকে বেরোনো যান্ত্রিক পার্টস আর ব্যাটারির দিকে বেশি নজর তার। এর মধ্যে কয়েকটি আছাড় দিয়ে ফেলেছে। আরও কয়েকটা আছাড় জায়গামত দিতে পারলে কেল্লা ফতে!
বরিশালে ঘাট থেকে নামার পরে সোজাসুজি সাইবানদের পৈতৃক ভিটায় এসেছে তারা। এটা ঠিক গ্রাম অঞ্চল নয়। মফস্বল শহর। বাড়িটাও সাধারণ মধ্যবিত্তের পারিবারিক বাড়ির মতন। কাঠ এবং সিমেন্টের মিশেলে তৈরি। উপরে নাকি আগে টিনের চাল ছিল, পরে আহমদ কাজ করিয়ে সিমেন্টের ছাদ ঢালাই দিয়েছেন। সাইবান সারিকার দাদা, দাদীর কেউই বেঁচে নেই। আহমদের দুজন ভাইবোন আছে, তারা সবাই বিদেশে সেটেলড। পৈতৃক বাড়িতে থাকার জন্য মানুষ নেই। আগে সুগন্ধার বাবা এই জায়গার দেখাশোনা করতেন। তার মৃত্যুর পর সুগন্ধাকে নিয়ে চলে যাওয়ায় বাড়িটা ফাঁকাই ছিল এতদিন। সাইবানরা আসবে বলে কয়েকদিন আগে লোক ডেকে পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। সাইবান বাড়ি পর্যন্ত এসেই আবার চলে গিয়েছে ভেন্যুতে। সেখানে নাকি তার সাউন্ড ঠিকঠাক করার কাজ আছে। আজ রাতেই শো। কালকে গায়ে হলুদ এবং পরশুদিন বিয়ে।
ইরাম পায়ে পায়ে বিছানায় গিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল।

“আমার কুচুপু! ক্ষুধা লাগেনি তোমার? হুম?”
“আই!”
মায়ের মুখে ক্ষুধার কথা শুনেই বোধ হয় বাচ্চাটার মনে পড়ল, তার এখন খাওয়া দরকার। তৎক্ষণাৎ খেলনা ফেলে ইরামের বুকে মুখ ঘষাঘষি করতে লাগল সে। আলতো হেসে ইরাম ছেলেকে বালিশের উপর কায়দা করে শুইয়ে খাওয়াতে শুরু করল। অপর হাতে ব্যাগ থেকে বের করে রাখা ম্যাকবুকটা খুলল। ওয়াইফাই সিগন্যাল পেতেই একটি নোটিফিকেশন এলো ই মেইলে,
—পেমেন্ট রিসিভড।
ইরামের চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ সে ঘেঁটে দেখল। সত্যিই তার অ্যাকাউন্টে ৮ ডলার জমা হয়েছে। প্রথম যে কাজটি সে পেয়েছিল, সেটি ফাঁকে ফাঁকে করে কিছুদিন আগেই জমা দিয়েছে। ক্লায়েন্ট আজকে তাকে পুরো পেমেন্ট করেছে। সঙ্গে কাজের কিছু ভালো রিভিউও দিয়েছে। ইরামের চোখজোড়া চকচক করে উঠল। সাফল্য, হোক তা ছোট, কিন্তু এটা তার উপার্জন! প্রথম উপার্জন হয়ত নয়, কিন্তু বিয়ের পরে, সব কষ্ট পেরিয়ে, যে যাত্রায় তার সামিল হওয়া, সেই যাত্রার জন্য এটুকুই অনেক।

“দেখো, কুচুপু। আম্মু কি করেছে! দেখেছ? ক্যান ইউ বি প্রাউড অব ইওর মাদার, মাই সুইটি?”
ইযান ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কি বুঝল, সেই জানে। খিলখিল করে মাড়ি দেখিয়ে অহেতুক হেসে উঠল সে।
“আআ…কাআ!”
“উম্মাহ, উম্মাহ, মাই লাকি চার্ম, আমার আদর আদর রসগোল্লা।”
ছেলের গালে অসংখ্য চুমু খেতে লাগল ইরাম। থামার কোনো নাম নেই। ইযানও মায়ের আদর খেতে খেতে পুনরায় নিজের আসল খাবারে মনোযোগ দিল। এমন সময়ে রুমে এলো সুগন্ধা।
“ভাবীজান, সবজিতে কি মিষ্টি কুমড়া খাইবেন, নাকি লাউ? দুইটাই পিছনের বাগানে হইয়া আছে।”
“তোমার কি পছন্দ?”
“আমার তো লাউ চিংড়ি ভাল্লাগে।”
“তাহলে সেটাই।”

সুগন্ধা বেণী দুলিয়ে নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু ইরাম হঠাৎ তাকিয়ে দেখল মেয়েটার হাতে একটা ফোন। কিছু দেখতে দেখতে মুখ টিপে হাসছে সে। ইরাম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি দেখে হাসির ফোয়ারা ছুটছে? এবার কোরিয়ান, চাইনিজ, নাকি থাই?”
“আপনিও!”
ঠোঁট ফোলালো সুগন্ধা। ইরাম মুচকি হাসল।
“ওইসব কিছু না। আপনি দেখবেন?”
বলতে বলতে ভেতরে চলে এলো সে। বিছানার কিনারে বসে নিজের ফোন দেখাল,
“এইটা সারিকা আফাজানের বিয়ার সময়ের ভিডিও। আপনি যদি থাকতেন ভাবীজান! শুধু নাটকটা দেখতেন ভাইজানের!”
ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগল ইরাম,
“কেন? আলাদিন কি করেছে?”

“কি করেনাই সেটা বলেন। এইটা আমার ব্ল্যাকমেইল ম্যাটারিয়াল। মেইন অ্যালবামে কিন্তু নাই! শুধু আমার ফোনে আছে, ভাইজানরে আবার বইলেন না। আমাকে দুইটা মাজা দিয়া ঝুলাই রাখবে!”
ইরাম স্ক্রিনের দিকে তাকাল। যেখানে নববধূর সাজে সারিকাকে দেখা যাচ্ছে। একটা খয়েরী রঙের বেনারসি আর সোনালী চোলির ওড়না মাথায়। মেয়েটাকে অসাধারণ দেখতে লাগছে। সুগন্ধা লুকিয়ে ভিডিও করেছে। হালকা চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। বেশকিছু মানুষের পিঠ পেরিয়ে এরপর দেখা মিলল কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের। দরজার চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে সাইবান, আফনান এবং নীরব। সাইবান হেলতে দুলতে অদ্ভুত সুরে সুরে কিছু গাইছে, হাততালি দিতে দিতে কাওয়ালির ভঙ্গিতে পিছন থেকে আফনান এবং নীরব সঙ্গ দিচ্ছে,

“এক বোন চম্পা জাগো রে জাগো রে
ভাইয়ের কপালে শান্তি লেখো রে লেখো রে~
একটি পারুল ভাই আমি তোমার
তুমি সকাল সাঁঝে তারে লাত্থি মারো
দুলাভাইকে ডেকে ডেকে সাড়া
ও দুলাভাই দাও গো সাড়া~”
সাইবানের কর্কশ কণ্ঠের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিলিয়ে আফনান আর নীরব বলে উঠছে,
“ও দুলাভাই দাও গো সাড়া!”
কোমরে দুহাত রেখে সারিকা খেঁকিয়ে উঠল,
“সকাল সাঁঝে না, চাইলে এক্ষুণি একটা লাথি দিতে পারি। দাঁড়া তুই!”
আশেপাশের মানুষজন খিলখিল করে হাসতে লাগল। সামিয়া এবং দূরে আহমদকেও চোখে পড়ছে। তবে সারিকার পক্ষে বেশি কিছু করা সম্ভব হলোনা, এর আগেই সাইবান হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে পা জড়িয়ে ধরল। এরপর মরাকান্নার ভঙ্গিতে কেঁদে উঠল,

“আপু রে! এত খুশি! তোকে ছাড়া এত খুশিতে আমি বাঁচব কেমন করে? খুশিতে মোরে সিনিমিনি করতেয়াসে! তুই চলে গেলে আমার ডিম খাবে কোন ডাইনিটা? আমার গেঞ্জি চুরি করবে কোন চুন্নিটা? সিস্টার রে, যাস না তুই! দোহাই লাগে, এত শান্তিতে আমি থাকতে পারবনা! তোর গলার কাকীস্বর না শুনলে আমার পেটের ভেতরে ভাতের দানাগুলো টর্নেডো খেলবে কীভাবে? এত সুখে মানুষ বাঁচতে পারে? তুই বিয়ে করে বিদায় হলে আমি তো সুখে মরে যাব রে পাগলী!”
“সাআআইইইইই!”
সাইবানের মাথার চুল টেনে ধরে কয়েকটা পাক দিল সারিকা। এরপর আর দেখতে পারলনা ইরাম। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, মোবাইলটা তার হাত গলে বিছানায় পড়ে গেল। উভয় রমণী যখন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিতে ব্যস্ত তখন কাকতালীয়ভাবে উদয় ঘটল স্বয়ং সারিকার।
“কি এত দানবিক হাসি হাসা হচ্ছে যে পাশের রুমে থাকলে মরা মানুষ পর্যন্ত জেগে যাবে?”
বিছানার উপর সুগন্ধার ফোনটায় চোখ গেল তার। তুলে দেখল, ঠোঁটে ফুটল একটি সূক্ষ্ম হাসি।
“তার ছেঁড়া সাই। মানুষের বোনের বিয়ে হলে তারা কেঁদেকেটে বিদায় দেয়, আর এই ছেলে ব্যান্ড ভাড়া করে নাচতে নাচতে আমাকে মিসিরের বাড়িতে দিয়ে এসেছিল। গাড়িতে পোস্টার টাঙ্গিয়েছিল—আপদ বিদায়।”
স্মৃতিগুলো স্মরণ করল সারিকা। ইরাম হাসি থামিয়ে কোনমতে বলল,
“তোমার বিয়েতে অনেক মজা হয়েছে দেখছি। মিস করে গেলাম।”
“হ্যাঁ, আমি আপনারে বলি শুনেন আর কি কি হইসে। ঐযে আফনান আর নীরব ভাইজান আছে না…?”
সুগন্ধা সত্যি সত্যি ইরামকে অনেককিছু বলতে লাগল। কিন্তু দুই রমণীর উপরে বিশেষ আগ্রহ নেই সারিকার। সে একদৃষ্টে চেয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনের দিকে। তাকে কত হাসিখুশি দেখাচ্ছে। কি সুন্দর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে নববধূ খুনসুঁটি করে চলেছে। অথচ, সেই দিনের শুরুটা কি এতটা চমৎকার ছিল? সারিকা কি সেদিন আদৌ মন থেকে হাসছিল? নাকি নিজের সঙ্গেই নিজে অভিনয় করছিল?

পিছনের বাগানের পথ বেয়ে দৌঁড়াচ্ছে সারিকা। ভারী শাড়ি এবং গহনাগুলো চুরমুর শব্দ করছে। কিন্তু থামছেনা সে। বহু কষ্টে বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সে বেরিয়েছে। হাতে হয়ত মিনিট কয়েক আছে শুধু। এর মধ্যেই তাকে দেখতে হবে। একবার, শুধু একবার।
এই শেষবার।
অবশেষে বাগানের একদম কোণায়, ইটের দেয়ালের কাছে দেখা মিলল অবয়বটির। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। সারিকা এসে থামতেই ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল সে। স্নিগ্ধ রোদের আলোয় ভেসে উঠল অনুরাগের সদা শান্ত মুখটা। বধূরূপী সারিকার অবয়বে স্থির হলো দৃষ্টি, জ্বলজ্বল করে উঠল গভীরতায়। থেমে গেল রমণী, অপলক চেয়ে রইল। হালকা বাতাস খেলে গেল চারিপাশে। কাপড় উড়ল, চোখের পাতা কাঁপল, অশ্রুফোঁটা জমলো। নীরব, নিস্তব্ধ, থেমে যাওয়া সময়। অশ্রুসজল নয়নে সারিকা মৃদু হাসল, শুধাল,

“আমায় কেমন লাগছে?”
অনুরাগ একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টানল, বুক কাঁপল তার। পরক্ষণে ঠোঁটে সূক্ষ্ম একটি হাসি ফোটালো সে, জোরপূর্বক।
“রাঁধার মতন লাগছে।”
সারিকার চোখ বেয়ে এবার একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অনুরাগ কয়েক পা এগিয়ে এলো,
“কাঁদবেন না, আপনার সাজ নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে কথা দিয়েছিলেন, আপনি আর কাঁদবেন না।”
“কই? কাঁদছি না তো!”
সারিকা দ্রুত মুছে ফেলল নিজের গাল। হাসি নিয়েই তাকাল সামনে। এগিয়ে এলো বেশ কয়েক পা। অনুরাগ এবং সে এখন একে অপরের খুব কাছাকাছি, মুখোমুখি। পুরুষটির শরীর থেকে মৃদু চন্দনের সুবাস ভেসে আসছে। সারিকা প্রাণভরে সেই ঘ্রাণটুকু গ্রহণ করল। দুজনের কেউই একে অপরকে কিছুই বলতে পারছেনা। শুধু চেয়ে আছে। তাদের কখনোই কিছু বলার প্রয়োজন হয়নি। অনুভূতির বিনিময় হয়েছে তাদের চোখের ভাষায়। কারো বলার প্রয়োজন হয়নি, ভালোবাসি। শুধু অনুভব করেছে দুটি হৃদয়। এখানে শব্দেরা বিলীন, শুধু অনুভবেরা জয়ী। ঠিক যেমন চোখের ভাষায় পরিণয়, তেমন করেই চোখের ভাষাতেই বিচ্ছেদ।

“নিজের যত্ন নেবেন। অতিরিক্ত টেনশন করার অভ্যাসটা কমাবেন। আর হ্যাঁ, কাজের চাপে খাবার খেতে ভুলে যাবেন না।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে অনুরাগের গলা খানিক কাঁপল। সারিকা মাথা দোলালো সঙ্গে সঙ্গে, বলল,
“তুমিও। বেশি রাত জাগবে না। প্রেশারের ওষুধটা নেবে, বাহানা দেবে না। ডাক্তার চশমা লাগবে বললে চশমাটা পড়বে, স্টাইল নষ্ট হয়না এতে। আর, প্রমোশন পরেও পাওয়া যাবে, আগে নিজের শরীরটা বাঁচাবে, কাজের চাপে গা ভাসানোর প্রয়োজন নেই।”
“আচ্ছা।”
অনুরাগ মাথা নিচু করে ফেলল নিজের অশ্রু টলটলে দৃষ্টি লোকাতে। সারিকা ফুঁপিয়ে উঠল। পরক্ষণেই আবার মুখে হাত চাপল। ফিসফিস করে জানাল,
“এবার তাহলে যাই।”
“যান।”
সারিকা উল্টো ঘুরে গেল, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে সে নির্ঘাত হাউমাউ করে কেঁদে ফেলবে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলনা সে।
“দাঁড়ান!”
থমকে গেল রমণী। ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। অনুরাগ লম্বা কয়েক পা হেঁটে এলো তার সামনে। নিজের একটি হাত বাড়িয়ে দিল,

“আপনার হাতটা একবার ছুঁতে দেবেন?”
সারিকার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল। কোনোদিন এইটুকু সীমাও তারা লঙ্ঘন করেনি। অথচ আজ অনুরাগ নিজের সব বিশ্বাস ভেঙে তার কাছে এই আবদারটুকু করেছে। সারিকা ঝাপসা চোখে সামনে চেয়ে আস্তে করে নিজের হাতটা তুলল, রাখল অনুরাগের হাতে। প্রথমটায় সেই হাতের দিকে শুধু তাকিয়েই রইল। অতঃপর নিজের আঙুলগুলো পেঁচিয়ে তুলে ধরল উপরে। ঠেকাল নিজের কপালে। আরেক দফায় উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে নামল সারিকার চোখ থেকে।
“পরের জন্মে আমগাছটার তলে, অনুভূতির ঝড়ে ডুবিয়ে বুক, আমার আপনার আর দেখা না হোক।”
ফিসফিস করল অনুরাগ। সারিকার আঙুলগুলো কপালে ছুঁয়ে অতঃপর নামিয়ে রাখল। পিছিয়ে গেল বেশ কয়েক পা। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলনা রমণী। উল্টো ঘুরে গেল। চোখ সম্পূর্ণ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে এবার। আর একবারও পিছন ফিরে তাকালনা সে। যেমন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসেছিল, তেমন করেই দৌঁড়ে আড়াল হয়ে গেল। অনুরাগ তাকে আর থামালনা, শুধু নিশ্চল দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল সুদূরপানে।
সেদিন সারিকা যে দৃশ্যটি দেখতে পায়নি, সেটি পরবর্তীতে দেখেছিল অনুরাগ। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছতেই সে অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল চোখের সামনে। বাগানের গাছের বেড়ি পেরিয়ে হেঁটে হেঁটে এসে দাঁড়াল সাইবান। একদম নির্লিপ্ত, শান্ত, গম্ভীর। পকেটে দুহাত ভরে সে সরাসরি দেখল অনুরাগকে। অনুরাগ কোনোপ্রকার প্রতিক্রিয়া করলনা, নিঃশব্দে তাকিয়ে দেখল বন্ধুকে। সাইবান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তার চোখে জ্বলে উঠল নিভু নিভু অগ্নিশিখা। পরক্ষণে সে গুরুগম্ভীর গলায় আদেশ করল,
“আজকের পর থেকে তোর চোখজোড়া আমার বোনের উপরে শুধুমাত্র শ্রদ্ধার দৃষ্টি ফেলবে, অনুভূতির নয়।”

বর্তমান~
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে অনুরাগ। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সে এই বাড়িটার ছাদে গিয়ে আশপাশটা দেখবে বলে ঠিক করেছে। এখানের সিঁড়িগুলো কাঠের। উঠলে মচমচ করে শব্দ হয়। সে মাঝপথ পর্যন্ত পৌঁছেছে এমন সময়ে উপর থেকে নামতে দেখল সুগন্ধাকে। বেণী দুলিয়ে কিছু একটা গুণগুণ করতে করতে নেমে আসছে মেয়েটা। অনুরাগ থেমে একপাশে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার নামার জায়গা করে দিল। সুগন্ধা হেলেদুলে তার সামনে এসেই থামল। এরপর হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে বসল,
“দাদার মিষ্টিকুমড়ার তরকারি ভালো লাগে নাকি লাউয়ের?”
অনুরাগ খানিক ভড়কে গেল। ভ্রু তুলে সুগন্ধাকে দেখে প্রশ্ন করল,
“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
“আহহা! জবাব দিতে সমস্যা কই?”
অনুরাগ ঘাড় চুলকে জানাল,
“লাউ ভালো লাগে। কিন্তু, মিষ্টিকুমড়ায় সামান্য চিনি আর কুচো চিংড়ি মিশিয়ে রান্না করলে আরও বেশি মজা লাগে।”

“ওহ। আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তাইলে যাই।”
সুগন্ধা চলে যাচ্ছিল কিন্তু অনুরাগ হুট করে বলে বসল,
“তুমি কি সবসময় এমন করেই কথা বলো?”
“কেমন কইরা কথা বলি?”
মাথা কাত করে জানতে চাইল সুগন্ধা।
“আঞ্চলিক ভাষায়। সাইবান তো বলল, তুমি নাকি অনার্সে পড়ছ, তাও বাংলা নিয়ে।”
“শুনুন দাদা, বাংলাটা হলো পাঁচমিশালী ভাষা। আমরা যদি আঞ্চলিক ভাষাগুলোর ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পারি এবং কথায় কথায় ইংরেজি শব্দ ঝেড়ে নিজেদের চালাক ভাবা শুরু করি, তবে তো মুশকিল হয়ে যায়, বলুন?”
অনুরাগ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সুগন্ধার মুখপানে। যদিও সে নিজেই এই মেয়েটাকে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে বলেছে, তবে তার মুখে শুদ্ধ ভাষাটা অন্যরকম লাগল। ঠিক কেমন ধরণের অন্যরকম অনুরাগ জানেনা। ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল তার, স্থির চেয়ে রইল মেয়েটার দিকে। সুগন্ধা মুচকি হাসল,
“মুখটা বন্ধ করুন। এখানে মাছির বড্ড উৎপাত। গুয়ে বসা মাছি মুখে ঢুকে গেলে সমস্যা।”
সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল সুগন্ধা। অনুরাগ নিস্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক লহমা। তারপরই হঠাৎ ডেকে উঠল,

“সুগন্ধা?”
বেশ অনেকটা দূরে চলে যাওয়া মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। বাড়ির ভেতরের হালকা আলোয় তার শ্যামবর্ণ মুখটা বুঝি চিকচিক করে উঠল। অনুরাগ বুকে দুবাহু বেঁধে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বলল,
“তোমার কন্ঠে শুদ্ধ ভাষাটা চিনির মতন, আর আঞ্চলিক ভাষাটা হাজার ফুলে ঘুরে মৌমাছির খুঁজে আনা একফোঁটা দুর্লভ মধু।”
আর দাঁড়ালনা অনুরাগ, উল্টো ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ছাদে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর।
ঘণ্টা তিনেক বাদেই নিচতলার টেবিলে দুপুরের খাবার দেয়া হলো। সাইবান এখনো ফেরেনি। ঘুমন্ত ইযানকে স্ট্রলারে রেখে চেয়ারে বসল ইরাম। অনুরাগ এবং সারিকাও এসে পড়েছে। সুগন্ধা সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। এই মেয়েটাই সকলের জন্য আজ রান্নাবান্না করেছে। ইরাম একদফা নিজের ফোন চেক করল। সাইবানকে মেসেজ পাঠিয়েছিল সে।
—কখন ফিরছ?
—Idk.
—আচ্ছা। কি বলেছ জানিনা কিন্তু তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করো।
—Will try. Save up the tea for me till then.
হুট করে চায়ের কথা কোথা থেকে এসেছে ইরাম বুঝতে পারেনি। কিন্তু এই গেঞ্জির সাথে থাকতে থাকতে সেও গেঞ্জিদের চাল বুঝতে শিখেছি। এ আই ওয়েবসাইটের বদৌলতে সে বুঝে গিয়েছে এই টি চা নয়, বরং গল্প বা কাহিনীকে বোঝানো হয়েছে। টি শব্দটার সঙ্গে গল্প/ গসিপ জিনিসটা কীভাবে যায় কে জানে? নাকি সত্যিই চায়ের কথাই বলেছে ওই বান্দা? এসে চা খাবে? ধুরু! এত ভাববে কে? গোল্লায় যাক ওই গেঞ্জি!

আমার আলাদিন পর্ব ৩৭

“আপনারে আরেকটু ভাত দেই?”
সুগন্ধার কথায় ভাবনা থেকে বেরোল ইরাম। ফোন রেখে তাকাল।
“হ্যাঁ। একটুখানি।”
সুগন্ধা এক চামচ ভাত তার প্লেটে তুলে মাখা মাখা মিষ্টিকুমড়া এবং চিংড়ির তরকারি দিল। ইরাম ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“তুমি না বললে লাউয়ের কথা?”
“হ্যাঁ। লাউ এখনো পাকেনাই। কুমড়া বেশি পাইকা গেছে দেখলাম তাই কুমড়াই করলাম। কালকে লাউ করবনে।”
ইরাম কাঁধ তুলে খাওয়ায় মনোযোগ দিল।

আমার আলাদিন পর্ব ৩৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here