আমার আলাদিন পর্ব ৪৭
জাবিন ফোরকান
সাইবান একজন ভাগ্যবান ছেলে। চরম লাকি! এই কারণেই তো স্কুল – কলেজ থেকে কোচিং পর্যন্ত সব জায়গাতেই ভালো ফলাফল করত। আসলে ওর ব্রেইন ভালো, সেই কারণে অল্প পড়লেও পেরে যেত। হরহামেশাই পরীক্ষার জন্য না পড়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়েও ঠিকই এ প্লাস পেত। এগুলো কি ভাগ্য ছাড়া হয়? ভাগ্যের কারণেই সে এত ভালো স্টুডেন্ট ছিল। কিন্ত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় তো আর শুধু ভাগ্য দিয়ে হয়না! ট্যালেন্ট লাগে। পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় লাগে। তাই সাইবান মেডিকেলে টেকেনি। ওর দৌঁড় ওই স্কুল কলেজের রোল এক পর্যন্তই। দিনশেষে সফলতা তো পেশা দিয়েই হিসাব করা হয়, রোল নাম্বার দিয়ে নয়——
এসবই মানুষ আজকাল বলে বেড়ায়। কত কত গল্প, কাহিনী আর গুজব। মানুষ পরীক্ষার আগের দিন রাতে সাইবানের আড্ডা দেয়াটা দেখেছে।
অথচ সারা রাত জেগে বই নিয়ে হেঁটে হেঁটে রিভিশন করাটা দেখেনি। মানুষ তাকে বরাবর ভালো ফল করতে দেখেছে, কিন্তু প্রতিটা ভালো ফলের পিছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ায় থাকার কারণে চোখ ব্যথা, মাথা ব্যাথা, কোমর ব্যথা হতে দেখেনি। তারা সাইবানের রুমে জমা হওয়া বইয়ের স্তূপ দেখেনি। একশো ক্রস করা হ্যান্ডনোটের খাতাগুলো দেখেনি। স্কুল কলেজে রেড ক্রিসেন্টের লিডার ছিল সাইবান। মানুষ মনে করে, সে অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে, স্যারদের মাঝে জনপ্রিয়ও, তাই এমন একটা দায়িত্ব কাঁধে নেয়া। অথচ, বরাবরই যে চিকিৎসাসেবার প্রতি সাইবানের অগাধ টান, সেটা অগ্রাহ্য হয়েছে সর্বদা। মেডিকেলের প্রতি সে এতটাই আসক্ত ছিল যে তার ফোন ঘাঁটলে শুধু মেডিকেল থিওরির ভিডিওই পাওয়া যেত একটা সময়। চিকিৎসাসেবা সাইবানের স্বপ্ন ছিল না, ছিল অন্তরাত্মা, তার অস্তিত্বের পরিপূরক। অ্যাপ্রোন গায়ে জড়িয়ে যখন সে একজনের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখবে, তখন পরিবারের মুখে কৃতজ্ঞতার যে হাসিটুকু ফুটবে, সেইটুকু দেখার আশায় সে বছরের পর বছর সাধনা করেছে। অথচ, মানুষ তার সাধনার নাম দিয়ে দিল—ভাগ্য!
আজকাল সাইবানের মনে হয়, বোধ হয় স্টুডেন্ট হিসাবে পিছনের দিকে থাকলেই ভালো হত। কারো কোনো এক্সপেক্টেশন থাকত না তার প্রতি। অন্তত জীবনটাকে আরেকটু উপভোগ করা যেত। ডিসেম্বর মাসের শীতল বিকালে যখন সব বন্ধুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখনো সে আগেভাগে পরবর্তী নতুন ক্লাসের বইয়ের পড়া পড়ে রাখত। গ্রীষ্মের ছুটিতে আম কাঁঠালের দিনে যখন সবাই গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে যেত, তখন সে সামিয়ার কেটে দেয়া আম খেতে খেতে বাগানে হাঁটত আর আসন্ন পরীক্ষার পড়াশোনা করত। ঈদের দিনেও পড়ার রেকর্ড আছে তার! এমন নয় যে, সে সারাদিন শুধু পড়াশোনাই করত, একটুও আনন্দ করতনা। সত্যিকার অর্থে, সাইবান সময়টাকে খুব সুন্দরভাবে ব্যালেন্স করতে জানত। সকালে স্কুল, বিকালে প্রাইভেট কোচিং, কোচিং শেষে বন্ধুদের সাথে সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডা। বাসায় ফিরে তার মাঝে আলস্য দেখা যায়নি। সে ঠিকই হাতমুখ ধুয়ে বাড়িরকাজ শেষ করতে বসেছে।
হ্যাঁ, যেদিন বেশি খেলাধূলা হত, বা কোনো টুর্নামেন্ট থাকত, সেদিন দুই ঘণ্টার বদলে টিভি আধ ঘণ্টা দেখত। সেই সময়টা পড়াশোনায় দিত। সারাদিনের কাজগুলোকে কমবেশি করে ব্যালেন্স করতে জানত বলেই বন্ধুরা কখনো তাকে পড়ার কারণে খেলার মাঠে দেখা যায়না বলতে পারেনি। যখনই এসে ডেকেছে, সে সন্ধ্যা হোক কি রাত এগারোটা, সাইবান ঠিকই তাদের সাথে বেরিয়েছে। পরে ফিরে দুই ঘণ্টা কম ঘুমিয়ে নিজের পড়া শেষ করেছে। তাকে সবসময় সব জায়গায় পাওয়া যেত বলেই বোধ হয় মানুষ ভাবত, পড়াশোনায় ভালো হওয়াটা শুধুমাত্র তার সৌভাগ্যের কামাল।
তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ মানুষের অভাব কোনোকালে ছিলনা। সে বন্ধু বান্ধব হোক কি স্কুল কলেজের স্যার ম্যাডাম কি কোচিংয়ের ভাইয়া আপুরা। তাদের কাছে সাইবান সর্বদা ছিল অলরাউন্ডার। যে পড়াশোনা হোক বা খেলাধুলা, সবকিছুতেই অগ্রগণ্য। অথচ যেই না সাইবান হোঁচট খেল, অমনি জীবন থেকে সকল শুভাকাঙ্ক্ষী কর্পূরের মতন হাওয়া হয়ে গেল।
পেরিয়েছে গোটা একটা বছর। সাইবানের বন্ধুরা আজ একেকজন একেক দিকে। ঢাকা মেডিকেলে একজন, অন্যজন বুয়েটে। অনুরাগও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এমনকি ক্লাসের সবথেকে দুষ্টু ছেলেটা, যাকে উঠতে বসতে কানে ধরিয়ে স্যাররা বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখত, সেও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। শুধু সাইবান রয়ে গিয়েছে, আগের মতন, একই জায়গায়, সুতো কাটা ঘুড়ি হয়ে। মেডিকেল রেজাল্ট দেয়ার পর সাইবান আর কোথাও পরীক্ষা দেয়নি। তাকে কেউ ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় বসাতে পারেনি, না পেরেছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। এত এত পরিশ্রমের ফসল, এত নির্ঘুম রাত্রি, এত সাধনা, এত অধ্যবসায়ের ফল শুধুই ব্যর্থতা? সাইবান কি আসলেই ডাক্তার হওয়ার যোগ্য নয়? নিজের স্বপ্নটাকে চোখের সামনে ঝনঝন করে ভেঙে যেতে দেখার পর থেকে আর স্বাভাবিক হতে পারেনি সে। এমনকি, সামিয়া, আহমদের মুখোমুখিও দাঁড়াতে পারেনি। কত স্বপ্ন ছিল তার বাবা মায়ের, ছেলেকে ডাক্তার হিসাবে দেখবে, সাইবান তাদের মুখে চুনকালি মেখে দিয়েছে। যে পিতা তার জন্য নিজের হাতে অ্যাপ্রোন কিনে এনেছিল, সেই পিতাই চোখের সামনে তার সাদা অ্যাপ্রোনটা জ্বালিয়ে দিয়েছে! সাইবান সেদিন চিৎকার করে বলেছিল,
“হ্যাঁ! মেশিন মনে করো তো আমাকে! তোমাদের মর্যাদা পাহাড়া দেয়ার মেশিন!”
সেই শুরু! এরপর থেকে সাইবানকে সবসময় চ্যাম্প বলে ডাকা আহমদও কেমন দূরে সরে গিয়েছেন ছেলের কাছ থেকে। বাবা ছেলের মধ্যে শীতল দ্বৈরথ আজ পর্যন্ত বর্তমান। সামিয়া খুব চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি কিছুই স্বাভাবিক করতে।
আগামীকাল সাইবানের মেডিকেল সেকেন্ড টাইম পরীক্ষা। অথচ এরপরও বিশেষ হেলদোল নেই তার। অনুভূতিগুলো কেমন ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। এই একটা বছর সে প্রায় ঘরবন্দী ছিল। উঁহু, রুমবন্দী। তার রুমে এখন আসবাবের চাইতে বইখাতার সংখ্যা বেশি। সারাদিন অনলাইনে ক্লাস করতে করতে ল্যাপটপ, মোবাইলের চার্জ চলে যায় বিধায় চারটা পাওয়ারব্যাংক পড়ে আছে টেবিলে। সোফায়, চেয়ারে, বিছানার উপর, নাইটস্ট্যান্ডে শুধু বই – খাতা – হ্যান্ডনোট ছড়ানো। জায়গাটাকে ময়লার ভাগাড়ের মতন লাগে সাইবানের কাছে। সে এখন আর স্টপওয়াচও ব্যবহার করে না। চব্বিশ ঘণ্টা তো পড়ার টেবিলেই থাকে প্রায়, গোণার কি দরকার!
বায়োলজি বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সাইবান। মস্তিষ্কটা কেমন যেন বিষণ্ন। পড়ার কিছু আর মাথায় ঢুকছে কিনা তাও জানা নেই। সে শুধু তাকিয়েই আছে, নিষ্প্রাণ রোবটের মতন। এমন সময় আস্তে করে ছেলের রুমে ঢুকলেন সামিয়া। তার হাতে এক গ্লাস গরম দুধ আর ফলের বাটি। সেগুলো টেবিলের উপর রেখে ছেলের কাঁধে হাত জড়ালেন তিনি। সাইবান একটুও নড়লনা, প্রতিক্রিয়া দেখালনা। সামিয়া ঝুঁকে এসে তার কাঁধে মুখ ডুবিয়ে ছেলেকে শান্তনা দিতে চাইলেন বুঝি। নরম গলায় বললেন,
“চিন্তা করিস না আমার বাচ্চা। কালকে যা হওয়ার হবে। না হলে নেই। আমি সবকিছু রেডি করে ফেলেছি। তোকে প্রাইভেটে পড়াব।”
এতক্ষণে সাইবান একটু নড়ল। তার ঠোঁটে অতি মলিন এক হাসি ফুটল। বায়োলজি বইটা বন্ধ করে হালকা ভেঙে বসে যাওয়া গলায় সে বলল,
“মানুষকে আরও বলার সুযোগ দিতে চাও যে আমি তোমাদের কতটা প্যাম্পার করা কিড?”
সামিয়ার ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল। ভীষণ হতাশ বোধ করলেন তিনি।
“মানুষের কথার এতই দাম তোর কাছে? মানুষ তোকে খাওয়ায় না পড়ায়?”
“তোমরা আমাকে খাওয়াও, পড়াও। তাই তোমাদের খারাপ লাগার দাম বেশি। অস্বীকার করার কিছু নেই। আমি জানি, আমি তোমাদের ব্যর্থ সন্তান। লস প্রজেক্ট।”
সামিয়ার ঠোঁটজোড়া কাঁপল, অনেককিছু বলতে ইচ্ছা হলো তার। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে জানাতে ইচ্ছা হলো, এসব সত্যি না। সাইবান যেমনি হোক না কেন, তিনি ছেলেকে একই রকমভাবে ভালোবাসবেন। অথচ কেন যেন বলতে পারলেন না। তবে কি তিনিও কোনোভাবে আহমদের মতন ছেলের প্রতি হতাশ হয়ে পড়েছেন? ভাবতেই ভয় হলো তার। দ্রুত পিছিয়ে গেলেন।
“আমার আজকে রাতে দুটো অপারেশন আছে। হাসপাতালে থাকতে হবে। বেশি পড়তে হবে না, এক বছর পড়েছিস। এবার ঘুমিয়ে যা।”
এটুকুই। সামিয়া আর দাঁড়ালেন না। দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন বাইরে। তার চলার পথের দিকে চেয়ে সাইবানের ঠোঁটের পরিহাসের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো। তাচ্ছিল্য করল সে, নিজেকেই,
“একটুখানি সময়, মম। যদি তোমার হাসপাতালের একটুখানি সময় আমার হত, তবে কি খুব ক্ষতি হত?”
o
সাইবান দ্বিতীয়বারেও মেডিকেলে টিকলনা। শুধুমাত্র ১.২৫ নম্বরের জন্য লিস্টে তার নাম আসেনি। যদি সেকেন্ড টাইমের কাট মার্কস ৫ না থাকত, তাহলে হয়ত এবার সাইবান সত্যিই টিকে যেত। কিন্তু, ব্যর্থতার গ্লানি যেন কাটবার নয়।
রেজাল্ট দেখেনি সাইবান। তাকে জানিয়েছে অনুরাগ। সেদিন তার বন্ধুটা নিজে এসে তার সঙ্গে থেকেছে। অনেকটা সময় তার হাত ধরে বাগানে বসেছিল, হাজার কথা বলেছে সাহসের, শান্তনার। সাইবানকে বুঝিয়েছে, সে যেন বসে না থেকে প্রাইভেটে ভর্তি হয়ে যায়। তার পরিবারের তো অভাব নেই। এই একটামাত্র ছেলেই সাইবানের পাশে আগের মতন থেকে গিয়েছে। আর কাউকে দূরবীন দিয়ে খুঁজেও পাওয়া যায়না। স্কুল – কলেজের গ্রুপ গুলো এমনিতেই ভেঙে গিয়েছে একেকজন একেক জায়গায় চলে যাওয়ার পর। তবুও, প্রথম দিকের সারিতে যেসব ছেলেমেয়ে ছিল, তারা নিত্য একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু সেই গ্রুপে সাইবান নেই। আগে বন্ধুরা ফোন দিয়ে নোটস চাইত, তাকে সাবাশি দিত, কলেজে দেখা হলে লাফিয়ে এসে জড়িয়ে ধরত। আজকাল তাদের দেখা পাওয়া যায়না। সাইবান মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার আগে আগে তার ঢাকা মেডিকেলে থাকা বন্ধুকে ফোন দিয়ে পরামর্শ চেয়েছিল, বিপরীতে উত্তর এসেছে,
“পড়াশোনা নিয়ে ব্যাস্ত আছি রে। কার্ড চলছে। পরে ফোন দিচ্ছি।”
পরে ফোনটা আর আসেনি। সাইবান দ্বিতীয়বার তাকে ফোন করেনি। আগে রাস্তায় বের হলে কলেজের স্যারদের সাথে দেখা হত, কেমন করুণ দৃষ্টিতে তাকাত, বলত,
“তুমি আরও ভালো করবে ভেবেছিলাম। যাক, ভাগ্য। দেখো সামনে কি হয়।”
সাইবানের কথাগুলো সহ্য হতনা। অতএব, দূরত্ব বাড়িয়েছে সে। যে কোচিংয়ে পড়ত, সেই কোচিংয়ের বিশাল বিলবোর্ড শহরের আনাচে কানাচে। সেখানে সব সফল ছেলে মেয়েগুলোর হাস্যোজ্জ্বল ছবি। হয়ত ওখানে একটা জায়গা সাইবানেরও হওয়ার ছিল। কিন্তু হলনা। বাইরে যাওয়া বন্ধ করল সে। যে সামিয়া তাকে নিয়ে রীতিমত বড়াই করতেন, সেই সামিয়ার বাড়ি বয়ে এসেই প্রতিবেশী আন্টি মিষ্টি দিয়ে গিয়েছে,
“ভাবী, মেয়েটা চট্টগ্রাম মেডিকেলে টিকে গিয়েছে। এই নিন মিষ্টি। আপনার ছেলেটার এখনো কিছু হয়নি না?”
পর্দার আড়াল থেকে সাইবান দেখেছে সেদিন, সামিয়ার ঠোঁটের হাসিটা কীভাবে মিইয়ে এসেছিল। অন্য কারো সন্তানের সফলতা দেখে নয়, বরং নিজের ছেলের ব্যর্থতার ভারে জর্জরিত এক মা ছিলেন তিনি। আর আহমদ? সাইবানের প্রথম ব্যর্থতাই যথেষ্ট ছিল তাকে ছেলের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। দ্বিতীয়বার আর কিছু বলার থাকে না। এইযে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়েও আহমদ বাড়িতে নেই। তিনি বিজনেস ট্যুরে গিয়েছেন। তিনদিনের সেমিনারের জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন সামিয়া। না, কেউ আজকাল পাশে থাকার প্রয়োজনও মনে করে না। অনুরাগটা কীভাবে যেন এখনো রয়ে গিয়েছে! ভার্সিটির ক্লাস শেষে সপ্তাহে দুবার কি তিনবার সে অবশ্যই সাইবানকে দেখতে আসে। যখন আসে, তখন জোর করে রুম থেকে বের করে এনে খাইয়ে দেয়। মিরাজ মামার টং দোকানে নিয়ে যায় কখনো সখনো। আজকাল নতুন আরেকজন সাগরেদ জুটেছে। তিতলি। তিতলি মেয়েটা প্রথমবার তেমন একটা আশেপাশে ছিল না, কিন্তু সাইবান মেডিকেলে দ্বিতীয়বার অকৃতকার্য হওয়ার পর অনুরাগের সাথে প্রায়ই আসে।
তিতলির মাঝে একটা উজ্জ্বলতা আছে। সে যখন থাকে, তখন দুঃখগুলোকে ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাওয়া যায়। এইত, সেদিন সাইবান আর অনুরাগকে টানতে টানতে সিনেমা হলে নিয়ে গেল। হ্যাঁ, উপভোগ করতে পারেনি সাইবান, তবে তার জন্য এই দুটো মানুষের চেষ্টাকে সে শ্রদ্ধা জানায়। অনুরাগ আর তিতলি তার মাঝে কি এমন যে দেখে! কে বলতে পারে!
আজ বহুদিন বাদে নিজের রুম ছেড়ে বাড়ির বাইরে এসেছে সাইবান। রাত প্রায় নয়টা। সামিয়া, আহমদ দেশের বাইরে। বাড়িতে আছে শুধু সে আর সারিকা। কিছুক্ষণ আগেই সারিকা তাকে জানিয়েছে, তার সঙ্গে নাকি কোচিংয়ের এক ভাইয়া দেখা করতে এসেছে। বাড়িতে বসেনি, বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। সাইবান পায়ে পায়ে হেঁটে গেল। তাদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাফাত ভাইয়া। সাইবানের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক। নিজের বাইকের গায়ে ঠেস দিয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন। সাইবান এগিয়ে গেল,
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া। বাড়িতে বসলেন না?”
রাফাত ভাইয়া সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।
“না। আসলে সাইবান, আমি ঢাকা থেকে চলে যাচ্ছি। আমার নতুন চাকরি হয়েছে, খুলনায় শিফট। তাই তোমার সাথে দেখা করতে এলাম।”
“ওহ।”
অন্য সময় হলে সাইবান ভীষণ অনুভূতি দেখাত। খারাপ লাগা প্রকাশ করত। শুভকামনাও জানাত। তবে আজকাল সবকিছুই ভোঁতা। তাই কিছু বলা হলোনা। রাফাত ভাইয়া চোখ সরু করে তাকে দেখলেন। কেমন যাতনা হলো তার। সাইবানের মতন উজ্জ্বল ছেলেটা কেমন যেন মুষড়ে গিয়েছে। শক্তিশালী গড়নের পেটানো অ্যাথলেটিক শরীরটা কেমন হ্যাংলা পাতলা দেখাচ্ছে। চোখের নিচে গাঢ় কালি। এককালের গভীর কালো মণিগুলো কেমন নিষ্প্রাণ। রাফাত ভাইয়ার মনে আছে, কোচিংয়ে একবার সানস্ক্রিন নিয়ে গিয়েছিল সাইবান। সেই নিয়ে কী এক মজার কান্ডই না ঘটেছিল সেদিন! নিজের রূপের প্রতিও অত্যন্ত সচেষ্ট ছেলেটার চেহারা এখন শুষ্ক, মলিন। ঠোঁট ফাটা ফাটা। তার সাধের চুলও অনেকটা বেড়ে গিয়েছে, এলোমেলো হয়ে আছে। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো রাফাত ভাইয়ার বুক চিরে। তিনি একটা প্যাকেট হাতে এগোলেন, সাইবানের হাত ধরে সেটা রাখলেন। সাইবান অবাক হয়ে সেটি নিল,
“এটা কি ভাইয়া?”
“খুলে দেখ।”
সাইবান কৌতূহলও বোধ করলনা। তবে উপহারের অপমান করা হবে বিধায় সে প্যাকেটটা খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো, একটা সাদা অ্যাপ্রোন! চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল তার, জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে অধরা স্বপ্নটার দিকে। রাফাত ভাইয়া তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“সাইবান, মাই ডিয়ার, ইউ উইল অলওয়েজ বি আ ডক্টর ইন মাই আইয।”
সাইবানের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বসল অ্যাপ্রোনের মাঝে। ঠোঁট কামড়ে ধরল সে অনুভূতিদের দমন করতে। শেষ কবে তাকে কেউ এভাবে বলেছে? নাহ, তার নিজের মা বাবাও বলেনি! রাফাত ভাইয়া নিজের একটি হাত সাইবানের মাথায় রাখলেন,
“তুমি না ডাক্তার? ডাক্তাররা এভাবে ভেঙে পড়ে? অপারেশন সবসময় সহজ হয়না। সবসময় সব রোগীকে বাঁচানো যায়না। কিন্তু সেজন্য কি একজন ডাক্তার ডাক্তারি ছেড়ে দেয়? উঁহু, বরং ডাক্তার আবারও উঠে দাঁড়ায়। কারণ তারাই পৃথিবীর অভ্যন্তরে মানুষদের একমাত্র ভরসাস্থল। ডাক্তাররা হলো ফাইটার। মেডিকেল সাইন্সের সাথে যুক্ত প্রত্যেকটা ওয়ার্ড বয়, কর্মচারী, নার্স, মেডিকেল স্টুডেন্ট, প্রফেসর একেকজন ফাইটার। সেই মহৎ সেবার উদ্দেশ্যেই তুমি নিজেকে গড়েছ। পেশাটা অর্জন করতে পেরেছ কি পারনি ডায নট ম্যাটার। শিক্ষাটাকে কাজে লাগাও। উঠে দাঁড়াও। তুমি যখন উঠে দাঁড়াবে, দেখবে তোমার সামনে হাজারো পথ খুলে গেছে।”
এক বছরে এক ফোঁটাও কাঁদেনি সাইবান। অথচ এই মুহূর্তে তার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়াচ্ছে। রাফাত ভাইয়া তার মুখটা ধরলেন, নিজের রুমাল বের করে অশ্রু মুছিয়ে দিলেন। নরম গলায় বললেন,
“স্বপ্নের কোনো সীমা নেই ছেলে। সেই অসীমের ভেতরে হাতড়ে দেখ, কোথাও তোমার লালিত শখ আজও বাস করে।”
সাইবান চোখ তুলে তাকাল রাফাত ভাইয়ার দিকে। ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। তিনি নিজের বাইকে চেপে বসলেন। তাকে বিদায় জানানোটা আর হলনা সাইবানের। সে নিশ্চুপ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকল যতক্ষণ না রাফাত ভাইয়ার বাইকটা দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়। তারপরই হুট করে সে ঘুরে তাকাল। রাস্তার ওপাশে দেখা মিলল দন্ডায়মান মুন্সীবাড়ির। দুই তলার আলো এখনো জ্বলছে। দ্রুত নিজের অশ্রু মুছে নিল সাইবান। অতঃপর দৌঁড়াতে শুরু করল। বিনা দ্বিধায় সে ঢুকে গেল বাড়িটার ভেতরে, যেখানে বহু বছর তার পা পড়েনি। বসার ঘরে বসে নিজের পড়াশোনা করতে থাকা ইহান তাকে উদ্ভ্রান্তের মতন ছুটে ঢুকতে দেখল, কিন্তু কিছু বলল না, আটকালোও না। সাইবান সিঁড়ি টপকে লাফিয়ে চলে গেল দুই তলার ঘরটায়। দরজা ঠেলে ঢুকেই কন্ঠে আকুল আবেদন নিয়ে ডেকে উঠল,
“ইরাম আপু!”
সারিকা টিভির সামনে বসে আছে। তবে টিভির দিকে বিশেষ কোনো মনোযোগ নেই তার। পড়াশোনার ব্যস্ততা একটু কম কারণ কিছুদিন আগেই মাত্র প্রফ শেষ হয়েছে। বাড়িটাতে থাকতে ইদানিং তার ভালো লাগে না। যেন গুমোট মেঘ ভেসে বেড়ায় বাতাসে। অদ্ভুত বিষণ্নতার দহন। দেয়ালে দেয়ালে শুধু হতাশার দীর্ঘশ্বাস। সে কতক্ষণ নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল বলতে পারবেনা। হুট করে হন্তদন্ত হয়ে সে বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেখল সাইবানকে।
“সাই? রাফাত ভাইয়ার সাথে দেখা করেছিস?”
সারিকা প্রশ্ন করল। কিন্ত উত্তর এলোনা। সাইবান ফিরেও তাকালনা তার দিকে। দৌঁড়ে গেল ঊর্ধ্বশ্বাসে, যেন পিছনে বাঘ পড়েছে। সাইবানের রুমটা নিচতলায়। সেদিকেই সে আড়াল হয়ে গেল। সারিকা দূর থেকে ঠাস করে দরজা আটকানোর শব্দ শুনল। এরপর পিনপতন নীরবতা। হাতের মাঝে থাকা রিমোট আঁকড়ে ধরল সারিকা। ব্যাপারটা কি হলো? প্রথমটায় সে বিশেষ কিছু না ভাবার চেষ্টা করল। সাইবান তো বেশিরভাগ সময় রুমেই কাটায়। মাথা ঝেড়ে টিভির দিকে তাকাল সে। তবে ক্রমশ তার অন্তর ছটফট করতে লাগল। কেমন যেন লাগছে। একটা অশুভ অনুভূতি হচ্ছে। অজান্তেই বারবার সাইবানের রুমের দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে সে। তার মুখটা দেখার সুযোগ হয়নি, কিন্তু ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছিল ভাই হয়ত কাদঁছে! যখন ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁয়ে গেল, তখন সারিকা আর সইতে পারলনা। উঠে এলো। রুমের দরজা ধাক্কা দিল, জোরে ডাকল,
“সাই? সাই শুনতে পাচ্ছিস? দরজা খোল, খাবি না?”
নৈঃশব্দ্য। কোনো সাড়া নেই। সারিকা প্রায় মিনিট দশ দরজা ধাক্কাধাক্কি করল, এরপরও কোনো প্রতিক্রিয়া এলোনা। এবার রমণী সত্যিই ভয় পেল। সাইবান যতই ডিপ্রেসড থাকুক না কেন, অন্তত এরকম করেনি। সারিকা ডাকাডাকি করলেই অন্তত জবাব দিয়ে হলেও বলত চলে যেতে, তাকে একা থাকতে দিতে। তবে আজ এমন কেন করছে। ভাবতে ভাবতে মেঘের গর্জনের শব্দ কানে গেল সারিকার। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় হবে নাকি? প্রকৃতি কি অঘটনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? মাথা চেপে ধরল সারিকা।
“সাই? ভাইয়া? সাই! সিস ভয় পাচ্ছে কিন্তু, দরজা খুলতে হবে না, শুধু জবাব দে, তুই ঠিক আছিস?”
ধপাস!
জবাব এলো না। কিন্তু সারিকা ভেতর থেকে ভারী কিছুর শব্দ শুনল। জিনিস পড়েছে নাকি মানুষ? হাড় হীম হয়ে গেল তার। সারা শরীর কাঁপতে লাগল। না, আর সম্ভব না। ছুটে গেল সে। সোফার উপর থেকে নিজের ফোন নিয়ে সবার আগে কল করল অনুরাগকে। আহমদ, সামিয়া কাউকে ফোন দিয়েই লাভ নেই। যে সবচেয়ে কাছে আছে, যে সবচেয়ে ভরসার তাকেই ডাকা দরকার। অনুরাগ ফোন রিসিভ করতেই সারিকা কেঁদে ফেলল,
“সাই…সাই দুই ঘণ্টা ধরে দরজা খুলছে না!”
“আমি আসছি।”
খুব সংক্ষিপ্ত জবাব দিল অনুরাগ। একটাও কথা বাড়ালনা। সারিকা পায়চারি করতে লাগল। ক্ষণে ক্ষণে গিয়ে সাইবানের রুমের দরজা ধাক্কাল। নাহ, কোনো সাড়া আসছেনা। মুন্সীবাড়িতে যাবে কি? রাহাত, ইহানকে ডেকে আনবে? যতই রাগ থাকুক, এই বিপদের দিনে তো অন্তত পাশে দাঁড়াবে! এই ভেবে সারিকা যেই না রওনা হচ্ছিল, তখনি ভেতরে ঢুকল অনুরাগ। প্রচন্ড উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে ছেলেটাকে। ঘেমে নেয়ে একাকার। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে। বেশ খানিকটা ভিজেও গিয়েছে সে। চুলগুলো লেপ্টে আছে কপালে। হাঁপাচ্ছে ভীষণ। তবুও কোনোদিকে পরোয়া না করে সে ছুটে গেল,
“কোথায়? সাইবান?”
“রুমে!”
দুইজনই দৌঁড়ে গেল সাইবানের রুমের সামনে। অনুরাগ তৎক্ষণাৎ দরজার হ্যান্ডেল টানল,
“সাইবান? এই ছেলে, আমি অনুরাগ! দরজা খোল শালা! রাত বিরাতে নাটক মারাস তুই? খোল!”
উঁহু, জবাব নেই। অনুরাগের মনে হলো তার হৃদপিন্ডকে বুঝি ফ্রিজারে রেখে জমিয়ে ফেলা হয়েছে। হ্যান্ডেল টানতে টানতে সে সারিকাকে জিজ্ঞেস করল,
“লকের চাবি নেই?”
সারিকা ডানে বামে মাথা নাড়ল।
“না, সেভাবে সিস্টেম করা হয়নি। অনুরাগ কিছু করো, আমি কিসের যেন শব্দ শুনেছি ভেতর থেকে একটু আগে!”
না পারতে অশ্রাব্য একটা গালি উচ্চারণ করল অনুরাগ, খুব ক্ষীণভাবে। মানুষকে নয়, পরিস্থিতিকে সহ্য হচ্ছে না তার।
“সাইবান! দরজা খোল সাইবান! সাইবান!”
চিৎকার করতে করতে অনুরাগের গলা ভেঙে গিয়েছে। সারিকা তার সঙ্গে দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে হাউমাউ করে কাঁদছে।
“সাই প্লীজ! জাস্ট ওয়ান্স! জাস্ট ওয়ান মোর টাইম, প্লীজ! সাই প্লীজ….ফিরে আয়…সাই! তোকে আর কেউ বকবে না, কেউ তোকে লুজার বলবে না, ড্যাড তোর উপর আর রাগ করে থাকবে না…আমি থাকতে দেব না, শুধু একবার ফিরে আয় না ভাইয়া…প্লীজ!”
সারিকার কণ্ঠের আর্তনাদ বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। অনুরাগ আর অপেক্ষা করতে পারছেনা। সে চোখের অশ্রু মুছে গর্জে উঠল,
“বটি, দা, কুড়াল, চেয়ার এনিথিং! জাস্ট গ্র্যাব এনিথিং! আমি দরজা ভাঙছি!”
আবহাওয়ায় যেন আজ সংগত করছে। থেকে থেকে ভয়ানক বজ্রপাতে কেঁপে উঠছে চারিদিক। তুমুল বৃষ্টির ঝাঁপটায় অশান্ত প্রকৃতি। বিদ্যুৎ এখনো আছে ভাগ্যের ব্যাপার। সারিকা খুঁজে পেতে একটা স্টিলের পাইপ নিয়ে এলো। কিছুদিন আগে ওয়াটার লাইনের কাজ করা হয়েছিল বিধায় থেকে গিয়েছে। অনুরাগ পাইপটা হাতে নিয়ে সারিকাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরাল,
“সরুন।”
পাইপটা দিয়ে পাগলের মতন একের পর এক আঘাত হানতে লাগল অনুরাগ দরজার উপর। কাঠের দরজা, খুব সহজে নাড়ানো দায়। সারিকা মুখ চেপে কেঁদেই যাচ্ছে। চোখের সামনে সে শুধু আঁধার দেখছে। তাকে একটা রামধমক দিল অনুরাগ,
“এই চুপ! সাহায্য করতে না পারলে নেকাকান্না কাঁদবেন না! লকটা অনেকখানি দূর্বল হয়েছে, নড়ছে। আমি আর আপনি একসঙ্গে ধাক্কা দেব। রেডি? ওয়ান, টু…থ্রি!”
দুজনই একসঙ্গে ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ল দরজার উপর। একবার নয়, বারংবার। বজ্রপাতের সঙ্গে পাল্লা দিল দরজার কর্কশ আর্তনাদ। একের পর এক ধাক্কা, অনুরাগের কাঁধ টনটন করে উঠল। হাতের কব্জি ইতোমধ্যে কেটে র*ক্ত ঝরছে। অথচ খেয়াল নেই তার। দরজার ওপাশে তার বন্ধুটা কি অবস্থায় আছে সেই ভাবনাই তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সারিকারও অবস্থা খারাপ। ব্যথায় বাহু চেপে ধরেছে সে। শেষমেষ মেয়েটাকে সরিয়ে অনুরাগ নিজে দরজার সামনে আবারও দাঁড়াল। দুহাত তুলে কপালে ঠেকাল,
“ভগবান, শক্তি দাও।”
ফিসফিস করল সে। তারপরই অদম্য হয়ে ছুটে গিয়ে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে আছড়ে পড়ল দরজার উপরে। বিকট একটা শব্দ হলো। অনুরাগ দরজা সমেত ভেঙে রুমের মেঝেতে গিয়ে পড়ল। সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠল মারাত্মক ব্যথায়। অথচ নিজের শারীরিক যন্ত্রণার দিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠে সামনে তাকাল। সারিকাও ঢুকেছে। মুখে হাত চাপা দিল রমণী, বেরিয়ে এলো ভয়ানক এক আর্তচিৎকার!
“আল্লাহ!”
সারিকার সেই চিৎকার প্রকৃতির উন্মাদনাকেও ছাপিয়ে গেল। রুমের ভেতরের দৃশ্যটাকে মনে হলো কোনো ভৌতিক সিনেমার শ্যুটিংসেট।
সাইবানের সমস্ত বইখাতা টুকরো টুকরো হয়ে এদিক সেদিক পড়ে আছে। তার সাধের প্রত্যেকটা জিনিস ভেঙেচুরে ছড়িয়ে আছে। সমস্ত দেয়ালজুড়ে টকটকে লাল মার্কারের কালিতে লিখা,
আমার আলাদিন পর্ব ৪৬ (২)
—লুজার! লুজার! লুজার!
দুইটি দেয়াল ভর্তি সেই লিখায়। আর দেয়ালের সামনে মেঝেতে উল্টে আছে পড়ার টেবিলের চেয়ারটা। আর উপরেই, ঝালরবাতির জন্য বসানো লোহার আংটায় ঝুলছে একটা মোটা দড়ি। দড়িটা মাসকয়েক আগেই কোরবানির সময় তাদের গরুর গলায় বাঁধা হয়েছিল, সারিকা চিনেছে কারণ দড়িটা মোটা, কালো রঙের। সেটা কেউ রেখে দিয়েছে? এতদিন ধরে?
কালো রঙের সেই অশুভ দড়িটার সঙ্গে পেন্ডুলামের মতন ঝুলছে সাইবানের পাতলা শরীরটা। বড্ড শান্ত, বড্ড নিষ্প্রাণ সেই শরীর। পা জোড়া মেঝে থেকে তিন হাত উপরে ঝুলছে। দুলছে পেন্ডুলাম, কখনো ডানে, কখনো বা বামে……
