আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৮
suraiya rafa
রাতের অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে অশ্বরবের মতোই ভেসে এলো জিসানের কর্কশধ্বনি,
— আমি জাস্টিন ওয়াল্টার, বাঙালী বংশভূত এক ব্রাজিলিয়ান। ঠিক বাঙালী নয় এক্সুয়ালী, আমার মা বাঙালি আর ওই যে সামনে দাঁড়ানো হাদাটা,ও আমার জমজ ভাই জিশাদ ওয়াল্টার। আমার অবর্তমানে বিভিন্ন সময়ে জিসান রোলটা ও-ই প্লে করেছে আসলে ।
আঙুলের ইশারায় সদৃশ চেহারার মানুষটিকে ইঙ্গিত করলো জিসান, এরীশ একপল আধো আধো দৃষ্টিতে তাকাতেই পুনরায় প্রসঙ্গে ফিরে এলো সে,
— এদিক থেকে তোমার আর আমার একটা বিরাট মিল আছে অবশ্য, তুমিও অবৈধ আর আমিও!
এই একটা কথা যা এরীশ কখনোই শুনতে পারেনা,মাথায় খু”ন চেপে বসে ওর। চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে ওঠে। ভেতরের পিশাচ টা ক্রোধের তোড়ে দানবের মতো গজরায়। কাটাছেঁড়া র’ক্তা’ক্ত ঠোঁট ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে অশ্রাব্য কিছু গালি, অথচ তার দু’চোখ নিজের অস্তিত্বের সুরক্ষায় উদগ্রীব। হাত দু’টো ধাতব শিকল দিয়ে বাঁধা হলেও হৃদয় তার
পিতৃত্বের অদৃশ্য শিকলে আবদ্ধ, যা চাইলেও কোনোদিন ভাঙা যায়না। অগত্যা দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে সংবরণ করে বাক্য ছুড়লো সে ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
— নিজেকে আমার সমকক্ষ দাবি করা বন্ধ কর, ইউ আর জাস্ট আ প্যাথেটিক নো বডি!
— জবান সংযত করো মাফিয়া বস, আমি এখানকার রাজা, দ্যা রিয়াল টমেটো প্রিন্স!
— ইন ইউওর ড্রিম বাস্টার্ড!
কথাটা বলতেই এরীশের মুখের উপর আঁচড়ে পড়লো নানচাক্সের তীব্র কষা”ঘাত। নাসারন্ধ্র আর ঠোঁটের কোণ ফেটে নিসৃত হলো তরতাজা র’ক্তে’র স্রোত। সেই মুখ ভর্তি র’ক্ত নিয়েই জিভের ডগায় গাল ঠেললো মাফিয়া বস। নিঃশব্দে বিস্তৃত হেসে উপহাসের স্বরে আওড়ালো,
— তুই তো দূর্বল, তাই আমাকে দূর্বলতা দিয়ে বশ করতে চাইছিস। পুরুষ হলে রাজার বেশে যুদ্ধ করতিস।
বিপরীতে ঠোঁট বাঁকালো জিসান। নিজের পায়ের রোবটিক সিস্টেম অন করে ভ্রু উঁচিয়ে গর্ব নিয়ে বললো,
— মানব শরীরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী আমার এই পা। ডোন্ট আন্ডারেস্টিমেট মি মাফিয়া বস।
এরীশ আবারও হাসলো, সেই হাসিতে খেলে গেলো অব্যক্ত কিছু সুক্ষ্ম বিদ্রুপ। যা বুঝতে সময় লাগলো না জিসানের, ভ্রুকুটি করে সহাস্যে প্রত্যুত্তর করলো সে,
— ইউ্য নো হোয়াট? আ’ম ইমপ্রেসড! মৃ”ত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কোনো আলফা যদি এভাবে হাসে তারচেয়ে আকর্ষনীয় আর কিছু নেই,ট্রাস্ট মি! ইউ্য লুক মাচ মোর হ্যান্ডসাম দ্যান বিফোর। হাউ এবাউট আমি তোমায় আরেকটু র’ক্তা’ক্ত করি?
কপটতায় চোখ ছোট করে ফেললো জিসান, তখনই বেজমেন্টের গুপ্ত সিঁড়ির দিক থেকে ভেসে এলো একের পর এক জোড়ালো পদধ্বনি সেইসঙ্গে অবিশ্রান্ত গোলাবারুদের বিকট আওয়াজ। এরীশকে আরেকদফা আহত করতে গিয়েও থেমে গেলো উদ্যত হাত। গ্রীবা উঁচিয়ে সামনে দৃষ্টিপাত করতেই দেখতে পেলো শয়ে শয়ে মাফিয়া গার্ডের নির্ভীক অবস্থান। সকলে একযোগে এক ভঙ্গিতে অ”স্ত্র তাক করে আছে জিসানের পানে। এরীশ না তাকিয়েই সতর্ক হলো, হাত তার শিকলে আবদ্ধ তাই চোখের ইশারায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলো, কন্ঠভেদ করে নিসৃত হলো কঠোর আদেশ,
— স্টপ রাইট নাও!
শত্রুর সম্মুখে পরাজিত মাফিয়া বস, অথচ তার কণ্ঠের দাপটে স্তব্ধ হয়ে গেলো গোটা বেজমেন্ট। থমকালো পদক্ষেপ।
অতঃপর আবদ্ধ তর্জণী আর মধ্যমার সন্ধিতে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতপূর্ন হুকুম। সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে পিছিয়ে গেলো গোটা সশস্ত্র বাহিনী। চামড়ার বুটের আওয়াজ থেমে যেতেই পৈশাচিক তৃপ্তে হেসে উঠলো জিসান। স্ট্রোলারে ঘুমিয়ে থাকা অবুঝ অসহয় প্রাণটার দিকে চেয়ে অভিভূত স্বরে আওড়ালো,
— ওয়াও! নো সারপ্রাইজ ইউ্য আর দ্যা সন অব আ ব্লাডিবিস্ট!
পরমূহুর্তেই চোয়াল শক্ত করে নির্দেশ আরোপ করলো সে,
— অস্ত্র নামাও।
জীবন্ত মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সব। মাফিয়া বস ব্যাতিত অন্য কারোর আদেশে একচুল ও নড়ে না তারা। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট হলেও একই নীতি প্রযোজ্য। সেখানে জিসান তো এক তুচ্ছ কীট।
সাইকোটা তখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টে ইয়াশকে পর্যবেক্ষন করছে, কোনোরূপ বাক্যব্যয় ছাড়াই গড়ে তুলেছে অদ্ভুত হুশিয়ারি। তার সেই অশুভ প্রহেলিকা দৃষ্টি অনুসরণ করে দু’হাত মুঠিবদ্ধ করে সংযত হলো এরীশ, কণ্ঠফুঁড়ে বেড়িয়ে এলো আরেকদফা অপ্রত্যাশিত আদেশ,
— ডু ইট!
ধনুকধারী আদিবাসী গুলো পেছন থেকে তীরের নিশানা করতেই পোশাকে সিলমোহর লাগানো মাফিয়া স্নাইপার গুলো তাদের অ”স্ত্র নামিয়ে নিলো। যেন লিডারের সুরক্ষায় তারা নিবেদিত প্রাণ। তেমন করেই একে একে বসে গেলো হাঁটুগেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মোটা শিকলের বাঁধনে আঁটকে দেওয়া হলো তাদের হাত।
গোটা পাইথন প্যারাডাইস এখন জিসানে সামনে নতজানু, ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছে সে। নিজেকে এবার সত্যিই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচাইতে বড় গড ফাদার মনে হচ্ছে তার। মাফিয়া বসের জীবদ্দশায় যা কখনো কেউ পারেনি, তা সে করে দেখিয়েছি আজ ।
এরীশ আসলে ঠিকই বলতো,মাফিয়াদের দূর্বলতা থাকতে নেই, যতদিন সে অনুভূতিহীন পাথর হয়ে বেঁচে ছিল, ততদিন তার ধ্বং”সের হাতিয়ারও ছিল দুস্পাপ্য।
পরিস্থিতি আয়ত্তে, সহসা নিজের কথায় ফিরে গেলো জিসান। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দ্রীপ্ত গলায় বলে উঠলো,
— আমার বাবাকে মা’রা উচিৎ হয়নি তোমার মাফিয়া বস।
— বাবা!
কপাল বেঁকে গেলো এরীশের। ঠোঁট নেড়ে কথাটা উচ্চারণ করতেই আগ্রাসী হয়ে প্রত্যুত্তর করলো জিসান,
— হ্যা বাবা! বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যাবসায়ী এ্যাপোলো খান, ওরফে এ্যাপোলো ওয়াল্টার। ব্যাবসায়ী খ্যাতি আর সমাজ সেবকের মুখোশের আড়ালে তার ছিল আলাদা এক চরিত্র, আলাদা এক জগত।এই সাম্রাজ্য, এই টেররিজম সবকিছুই ছিল আমার বাবার। এক্সুয়ালী সুইট ডেমোন বৈশিষ্ট্যটা বাবার থেকেই পেয়েছি। বাবাই আমাদের আইডল। তাইনা জিশাদ?
জিসানের দিকে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে কলের পুতুলের মতো মাথা নাড়ালো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সদৃশ যুবক।
গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে ড্রাগ নেয়নি এরীশ, ফলস্বরূপ প্রচন্ড চাপে ছিঁড়ে যাচ্ছে তার মস্তিষ্ক। শরীরের প্রতিটি স্নায়ুকোষ অসহ্য যন্ত্রণায় ফেটে পড়েছে। দাবানলের মতো জ্বলছে ভেতরটা। বাহ্যিক শরীর থরথর করে কাপছে, দৃশ্যপট ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে তার। এমতাবস্থায় মনে পড়ে গেলো সেই রাতের দৃশ্য, যেদিন ঈশানীকে উত্ত্যক্ত করার দ্বায়ে নিজ হাতে কুড়াল দিয়ে কু”‘পি'”য়ে নির্মম মৃ”ত্যু দিয়েছিল এক বয়জেষ্ঠ্য লোলুপ হায়েনাকে। মা’রা’র পরে সমুদ্রে ফেলে নিশ্চিহ্ন করেছিল তার লাশ। তারমানে ওটা জিসানের বাবা এ্যাপোলো ওয়াল্টার ছিল! দুইয়ে দুইয়ে বেশ ভালোভাবেই চার মিলে গেলো, ব্যাপারটা ভাবতেই ব্যাঙ্গাত্তক ভঙ্গিতে হেসে ওঠে এরীশ। ঝাপসা চোখে চেয়ে বলে,
— তারমানে বাবার মৃ”ত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছিস?
— কাইন্ড অফ। তবে তোমার বউই আমার মেইন টার্গেট এরীশ ইউভান। ওকে আমি মা”র’বোই!
— শী ইজ মাই এভরিথিং। ও না বাঁচলে আমিও বাঁচবো না।
— দ্যাট’স মাই পয়েন্ট। ওকে মা’রলে বাবার মৃ”ত্যুর প্রতিশোধ আপনাআপনি নেওয়া হবে আমার। বাট একটা জিনিস ভেবে দেখেছো কখনো? মেয়েটা একটা কোল্ড ব্লাড ফিশ। ও ইনোসেন্ট সাজার নাটক করে সবসময়। কিন্তু আসলে ও একটা বিচ। ওর জন্যই কিন্তু তোমার আজ এই অবস্থা। মাফিয়া বস এরীশ ইউভান ভে’ঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে শুধুমাত্র ওই নীল চোখের ছলনায় । এবার শুধু নিঃস্ব হওয়ার অপেক্ষা। ডা’ইনী ও একটা। ওর চোখ দু’টো আসলে প্রহেলিকা …
এরীশের অ’গ্নিদৃষ্টি অবলোকন করে বাক্য শেষ না হতেই মাঝপথে থমকে গেলো জিসান, এরীশ দৃষ্টি তুলে বজ্রদ্রীপ্ত গলায় বললো,
— ওর সাথে কিসের এতো শ”ত্রুতা তোর?
—- আছে! অনেক শত্রুতা আছে! ওর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমাকে রেখে তোমায় পছন্দ করা। কতবড় স্পর্ধা! আমি ওর জন্য কিই না করেছি। তারপরেও!
— কি করেছিস?
এরীশ খুব কৌশলে সময় অতিবাহিত করতে চাইলো। কোনোরূপ ভাবান্তর না করেই সেই কথার জের ধরে বলতে আরম্ভ করলো জিসান,
— বহুবছর আগে এক আষাঢ়ে আঁধারি রাত্তিরে রাঙামাটির কোনো এক পরিত্যক্ত পাহাড়ি জঙ্গল অতিক্রম করে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিল একদল অ্যামাজনীয় জংলী আদিবাসীর দল। ওরা মূলত সমুদ্র পথে এসেছিল। মাঝপথে জাহাজ ডুবে যাওয়ায় স্থানীয় বাড়িঘর লু’টপা”ট করে গা ঢাকা দিয়ে স্থল পথেই যাচ্ছা শুরু করেছিল নিজেদের গন্তব্যে। বাবা তখন সীমান্তেই ছিল, সমাজ সেবার নাম করে অতি সাবধানে সুরক্ষা দিয়েছিল আদিবাসীদের । কারণ সেই সময় পৃথিবী বিখ্যাত ব্লাড ডায়মন্ড ছিল তাদেরই কব্জায় । তবে এদেশের সীমানা অতিক্রম করার আগেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে আ’টক হয় তারা । ওই সেনাবাহিনী টিমের মধ্যে একজন ছিলো ঈশানীর বাবা, পিটার উইলিয়াম । ঘটনার কালক্রমে পিটারের হাতেই সেই মূল্যবান রত্ন গিয়ে পৌঁছায়। ব্যাস, শুরু হয় চোর পুলিশের অদৃশ্য লড়াই । পরের দিনই চাকরি থেকে অবসর নেয় পিটার। তার এই কাণ্ডে সন্দেহের পারদ প্রগাঢ় হয় সকলের, তবে উপযুক্ত প্রমান না থাকায় কেউ কিছু বলতেও পারেনা। ওদিকে বাবা তো ওঁত পেতেই ছিল, ঘটনার পালাক্রমে তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে ব্লাড ডায়মন্ড আসলে পিটারের কাছেই রয়েছে।
ফলস্বরূপ, টার্গেট হয় পিটার উইলিয়াম। বাবার নজরে পড়া মানে আয়ুষ্কাল ওখানেই শেষ। যা হবার তাই হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম অতিক্রম করার আগেই জীবনের জ্যোতি ফুরিয়ে এলো তার। সেই কাঙ্ক্ষিত র’ক্তহীরক অবশেষে হাতে পৌঁছালো বাবার। শুধু ব্লাড ডায়মন্ডই নয়, তার পাশাপাশি পেলো অগাধ অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা আর গোটা অ্যামাজন আদিবাসীদের কাছে প্রভুতুল্য সম্মান।
এরপর থেকে বাবা যা বলতো, ওরা অন্ধের মতো শুধু তাই করতো। কারণ ওদের বদ্ধ ধারণা র’ক্তহীরক যার অ্যামাজনও তার। গড ফাদার হওয়ার যাত্রাটা তখন থেকেই শুরু।
কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এই ঘটনার প্রায় একযুগ পরে সরকার নতুন করে পিটারের মা”র্ডার কেইস নিয়ে তদন্ত শুরু করে। সৃষ্টি হয় একের পর কৌতুহল, সেই সাথে নতুনরূপে ঘটে তথ্যের উদঘাটন। জল ঘোলা হওয়ার আগেই তৎপর হয়ে ওঠেন বাবা। মূলত ওই কেইসটাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই প্রথমবারের মতো আমার বাংলাদেশে পদার্পন। কারণ বাবা তখন বাংলাদেশের টপনোচ ব্যাবসায়ীদের মধ্যে পরিচিত এক মুখ। রেইনবো গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত সিইও!আর আমি তার একমাত্র সুযোগ্য পুত্র। খেলার মাঠে যার শরীর নয়, মস্তিষ্ক আগে চলে। দেশে পৌঁছে এদিকওদিক তাকায়নি আর।একের পর কৌশলে খেলেছি, টাকা দিয়ে মনুষ্যত্ব কিনেছি। সবকিছু পরিকল্পনা মতোই চলছিল, কিন্তু হঠাৎ…..
কথার এই পর্যায়ে কিয়ৎক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়লো জিসান, পরমূহুর্তেই বুক ফুঁড়ে ভারী এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ব্যথাক্লিষ্ট কণ্ঠে আওড়ালো,
— আমার ঈশানীর সঙ্গে দেখা হলো, আর তখনই স্রোতের বিপরীতে বইতে শুরু করলো পৃথিবী। সেই মেয়েটা,আমার জীবনে যার অস্তিত্ত ছিল হেমলকের মতোই নীরব, তিক্ত অথচ অনিবার্য। মৌখিক কিছু প্রমানের তাগিদে মা ও নানীর সাথে থানায় এসেছিল মেয়েটা। ধবধবে সাদা চুরিদার পেঁচানো শরীরের সেই অদ্ভুত সুঘ্রাণ আজও মাদকের মতো আকৃষ্ট করে আমায়। শিহরণ তুলে দেয় মস্তিষ্কে। আমি উন্মাদ হয়ে যাই, ছটফট করে ওঠে ভেতরটা। সেই সমুদ্রের মতো গাঢ় দু’টো নীল চোখ যা দেখে আমি অন্য চোখে তাকাতে ভুলে যাই।
ভুলে যাই আমার উদ্দেশ্য। আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সবকিছু ভুলে মোহগ্রস্তের মতো শুধু মেয়েটাকে অনুসরণ করতে থাকি। শুধু কাছাকাছি থাকবো বলে নিজের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দিতেও একমূহুর্ত পিছপা হয়নি আমি। ওর পছন্দানুসারে নিজের বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটাই, হয়ে উঠি জাস্টিন থেকে জিসান। ওর জন্য কিই না করেছি আমি? ভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে কফি হাউজ, কোন জায়গায় নিজেকে এডজাস্ট না করেছি? ভদ্রের খোলস গায়ে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে নিজের আসল সত্তাটাকে পর্যন্ত ভুলতে বসেছি। তবুও! তবুও ওই বিচটা আমার দিকে একটাবার ফিরে অবধি তাকায়নি। অথচ দিনশেষে গিয়ে সেই ভিলেইনের প্রেমেই পড়লো। একটা মাফিয়া টেরোরিস্টের জন্য পাগলামি করতে শুরু করলো। তাহলে আমি কি দোষ করেছিলাম?হোয়াট’স রং উইথ মি ম্যান!
শেষ কথাতে গর্জে উঠলো জিসান।চোখে তার প্রতিহিংসার দপদপে লেলিহান। ক্ষণকালের ব্যাবধানে কন্ঠ শিথিল করে নীরব হুশিয়ারি ছুড়লো সে,
— আমি ফিরে এসেছি এরীশ ইউভান। প্রথমে তুমি আমার ভালোবাসার মানুষকে হরণ করেছো, আমাকে পঙ্গু বানিয়েছো, আমার থেকে ব্লাড ডায়মন্ড কেড়ে নিয়েছো, আমাকে সাম্রাজ্য চ্যুত করেছো, কেড়ে নিয়েছো আমার বাবার প্রাণ। এই সবকিছুর বদলা নিতেই ফিরে এসেছি আমি। হয়ে উঠেছি তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় কাল। কি মনে হয় এতো সহজে তুমি আমার সামনে এভাবে বসে আছো?
খেলাচ্ছলে প্রশ্নটা করে ফের একাই হাসতে হাসতে মাথা নাড়ালো জিসান, আঙুলের ডগায় নানচাক্সটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে স্বগোতক্তি করে বলে উঠলো,
— নো ম্যান নো। এতো সহজে নয়। গত কয়েক বছরে তোমার আর ঈশানীর সাথে যা যা অপ্রত্যাশিত ঘটেছে সবকিছুর পেছনে এই আমিই ছিলাম। টমেটো আর ডেনিয়েল তো আমার চালানো তুচ্ছ গুটি মাত্র। ওরা তাই করেছে, যা আমি বলেছি। নয়তো টমেটো সেদিন পেন্ট হাউজ ক্র্যাশ করে রাশিয়ান সুন্দরীকে টেষ্ট করতে পারতো না। ওর মাথায় এতো বুদ্ধি আছে বলে তোমার মনে হয়? উই আর জাস্ট ডিলিং এভরিথিং টুগেদার।
হঠাৎ কারোর অযাচিত পদধ্বনিতে কথার এই পর্যায়ে হোঁচট খেলো জিসান। চলমান আবহের ছন্দপতন ঘটিয়ে বেজমেন্টে এসে উপস্থিত হলো কেউ একজন। তার বুটের আওয়াজে আগুনঝড়া কতৃত্ব, গোলোক ধাঁধা মিশ্রিত সেই সুক্ষ্ম আওয়াজ তরঙ্গের মতোই ঝঙ্কার তুলেছে বেজেমেন্টের প্রতিটি কোণায়। আগন্তুকের চলমান পদক্ষেপের দাম্ভিকতায় ভেসে আসছে নীরব হুশিয়ার। জিসানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আশেপাশের ধনুকধারী আদিবাসী গুলোও একযোগে সতর্ক ওয়ে উঠেছে এবার। কোনো এক অতর্কিত প্রলয়ের পূর্বাভাসে অদ্ভুত ভাবে কান খাঁড়া করে রেখেছে একযোগে।
কয়েক মূহুর্ত অতিবাহিত হলো গা ছমছমে নৈঃশব্দ্যে। অথচ অপ্রীতিকর কিছুই ঘটলো না। জিসান সহ তার সাঙ্গপাঙ্গরা তখনও শীতল ঘামে আদ্র। এ যেন অসহনীয় এক ধৈর্যের পরীক্ষা।
তবে খুব বেশি সময় নিলো না আগন্তুক, শয়তান গুলোর সকল কৌতুলের অবসান ঘটিয়ে আঁধারের পর্দা ফুঁড়ে এসে হাজির হলো সম্মুখে। জ্বলন্ত মশালের নিচে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা হাঁটুসম টেইলকোট আর ব্লাকহ্যাট পরিহিত সুঠামদেহী লোকটাকে জিসানের পরিচিত ঠেকলো। ভাবতে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলো সে। পরক্ষণেই গলা ফেঁড়ে হাঁক ছাড়লো সেই মানবের উদ্দেশ্যে ,
— অযথা মুখ ঢেকে লাভ নেই, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি তুষার জাওয়াদ!
প্রাজ্ঞ হাতে সময় নিয়ে মাথার হ্যাট সরালো তুষার। মাথা তুলে সম্মুখে দৃষ্টিপাত করতেই ওর দিকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে চেয়ে কদাচিত গলায় হেসে উঠলো জিসান। মুখ ফুঁড়ে কোনো গা জ্বালানো বাক্য বেরোবে তার আগেই ঠোঁটের অগ্রভাগে তর্জণী ঠেকিয়ে ওকে ইশারায় চুপ করিয়ে দিলো তুষার।ঠান্ডা নিরুত্তাপ গলায় বললো,
— অভিবাদন জানাতে হবেনা। আ’ম অলরেডি স্যাটিসফাইড!
এহেন সম্মোহনে অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো জিসানের। কপালে জড়ো হলো চিন্তার বলিরেখা, সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো সে তুষারের পানে। কোনোরূপ বাক্যব্যয় করলো না তুষার। বন্দী অবস্থাতে নতজানু হয়ে হাঁটুর উপর বসে থাকা শয়ে শয়ে গার্টদের পেছনে ফেলে হনহনিয়ে এগিয়ে এলো সে। সামনে এসে এরীশের পাশ ঘেষে দাঁড়ালো, অথচ তাকালো না সে একটাবার। কি হাল হয়েছে মাফিয়া বসের চোখ বুলিয়ে দেখার প্রয়োজন অবধি বোধ করলো না। উল্টো সটান হয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব ছুঁড়ে দিলো জিসানকে,
— আমাকে তোমার দলে নাও।
ঠোঁট বিস্তৃত করে মেকি হাসলো জিসান, অসন্তোষ গলায় আওড়ালো,
— পাগল পেয়েছো?
— তুমিতো পাগলই।
প্রলুব্ধ স্বরে কথাটা বলে অবুঝের মতো ঠোঁট উল্টালো তুষার। জিসানের ফুরফুরে মেজাজ উবে গেলো হঠাৎ , কণ্ঠে উষ্মা নিয়ে বললো,
— মশকরা করছো? পাশেই দ্যাখো তোমার মাফিয়া বস মাটিয়ে লুটিয়ে আছে।
— দেখার প্রয়োজনবোধ করছি না।
রোবটিক যন্ত্রের মতো একের পর এক অপ্রত্যাশিত উত্তর দিতে লাগলো তুষার। যেন সিস্টেমে কোনো ভুল হয়েছে তার। জিসান একটু থমকালো, পরপরই শক্ত গলায় বললো,
— ম্যানিউপুলেশনটা ভালোই আয়ত্ত করেছো, বাট আ’ম নট দ্যাট কাইন্ড অফ পার্সন। কথার আগে মস্তিষ্ক চলে আমার।
— ঘোড়ার ডিম!
— কিহ!
— বলেছি ঘোড়ার ডিম চলে।
কিছুক্ষণ কপাল বাঁকিয়ে লোকটার মোটিভ ধরার চেষ্টা করলো জিসান, তন্মধ্যে আবারও একই প্রসঙ্গ টেনে আনলো তুষার। শান্ত নিবিড় দায়সারা কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে প্রগাঢ় হয়ে উঠলো তার ,
— অন্যায় যখন দু’জনার সাথে হয়েছে, তবে প্রতিশোধ তুমি একা কেন নিবে পার্টনার?
— পার্টনার!
জিসানের কণ্ঠে বিস্ময়। নিজের কথায় অনড় থেকে দৃঢ় গলায় প্রত্যুত্তর করলো তুষার।
— ইয়েস পার্টনার।আমার এবং আমার মায়ের সঙ্গে হওয়া সকল অন্যায়ের বদলা নেওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। যা আমি এতোদিন করতে পারিনি, তা তুমি করে দেখিয়েছো, এই ব্লাডিবিস্টটাকে অবশেষে কেউ ঘায়েল করলো। এটারই অপেক্ষায় ছিলাম আমি সারাজীবন। এবার আমাকে একটা সুযোগ দাও। শুধু দেখতে থাকো আমি ওকে কতটা কৌশলে আঘাত করি । ওর কাছ থেকে শেখা ট্রিকক্স ওর উপরই ফলাবো আমি আজ।
এতোক্ষণ কপটতা ভেবে চুপ থাকলেও কথার এই পর্যায়ে তড়াক করে দৃষ্টি তুললো এরীশ। তার ধূসর বাদামি গহ্বরে অবিশ্বাসের তুফান। নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এবার । ভেতর ভেতর ফুঁসতে থাকা পৈশাচিক মনটা তাচ্ছিল্য হেসে বলছে,
— এটাই হওয়ার ছিল। তুষারের দেওয়া ছোবলটাই বাকি ছিল শুধু। এবার ষোলোকলা পূর্ণ।
ওদিকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মনটা সেই অভিযোগ অস্বীকার করছে বারবার। আত্মবিশ্বাসী দাপট নিয়ে বলছে,
— অসম্ভব! আমি নিজেকে অবিশ্বাস করতে পারি,কিন্তু তুষারকে নয়। সে আমার র”ক্ত।
অবুঝ মনের কথায় পৈশাচিক সত্তাটা খ্যাকখ্যাক করে হেসে বিদ্রুপ জানালো ফের,
— র”ক্ত! কেমন র”ক্ত তা সবাই জানে। তুই ওর বাবার অবৈধ সন্তান। শুধুমাত্র তোর জন্যই ওর মায়ের সংসার ভেঙেছে।
অবচেতন এরীশ ঠোঁট নাঁড়িয়ে বিড়বিড়ালো এবার , — তারমানে সে প্রতিশোধ নেবে?
— অবশ্যই!
নিজ মনের তুমুল বাকবিতন্ডা তখনই স্তব্ধ হয়ে যায়, যখন এরীশ শুনতে পায় জিসানকে দেওয়া তুষারের দৃঢ় অঙ্গীকার,
— অবশ্যই আমি প্রতিশোধ নিবো।
— তুমি যে আমার দলের তার প্রমান কি?
ওপাশ থেকে বলে ওঠে জিসান।
সঙ্গে সঙ্গে হাতের মুঠোয় থাকা ধারালো শর্ট নাইফটা দিয়ে এরীশের পিঠ বরাবর আচানক আ”ঘাত করলো তুষার। মুখ দিয়ে কোনোরূপ য’ন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ না করলেও, ব্যথার তোড়ে সামান্য কেঁপে ওঠে এরীশ। তা দেখে পরিতৃপ্ত হাসলো জিসান। এরীশের পানে ভ্রুক্ষেপ না করেই সেই হাসিতে বিমত্ত হয়ে তুষার আবারও বললো,
—- আরও প্রমান চাও?
নিজে আঘাত না করে, তুষারের মাধ্যমে এরীশকে যন্ত্রণা দিয়ে জিসানের বোধহয় বেশ আনন্দই হলো। সহসা উৎকন্ঠা নিয়ে জানালো,,
—- দাও দেখি।
সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটাকে আড়াআড়ি ধরে এরীশের পিঠে আরও একটা নির্মম টান বসালো যন্ত্রমানব । প্রচন্ড যন্ত্রণায় মৃদু স্বরে কাতরে উঠলো অস্তিত্ব তার। চওড়া বলিষ্ঠ পিঠ র”ক্তে প্লাবিত হলো।
বিপরীতে তুষারের অনুভূতিহীন পাথুরে চেহারার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বিস্তৃত করে উন্মাদের মতো হেসে উঠলো এরীশ । জোরপূর্বক সেই হাসিতে ছিল অজস্র নীরব ব্যথার স্লোগান। রি”ক্তশূন্য মস্তিষ্ক আর বিশ্বাসঘাতকতার অতলে ডুবে হাসতে হাসতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো মাফিয়া বস। চারিপাশের প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ বিমূঢ় চিত্তে সাক্ষী হয়ে রইলো সেই ভাতৃত্বের ধার্যহীন নগ্ন মৃত্যুর।
ঠিক সেসময় এরীশের বেদনাক্লিষ্ট দু’চোখের পাতায় একের একের ভেসে উঠতে লাগলো নিজের অ’ভিশপ্ত অতীত। এক অজানা প্রহেলিকা। এক অবুঝ, চঞ্চল নিস্পাপ শিশুর মরীচিকা হয়ে ওঠার গল্প।
সময়টা ১৯৯৪। সেসময় আন্ডারগ্রাউন্ড স”ন্ত্রাসী সংঘের অন্যতম আতঙ্কের নাম ছিল ব্রাটভা। রাশিয়া থেকে শুরু করে গোটা পৃথিবীজুড়ে ছোট ছোট লিংকাপ নেটওয়ার্ক ছিল এই অপ”রাধচ”ক্রের। যার মূল কেন্দ্রস্থানীয় নেতা অর্থাৎ পাখান(বস) ছিল তুষারের বাবা ভানিয়া মিকাইল।
দাম্ভিক,নির্মম অথচ তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী।
ভানিয়া মিকাইলের স্ত্রী ছিল। সেই সঙ্গে ছিল অদৃশ্য চারিত্রিক সুরক্ষা।
পাখান ভানিয়ার সম্পর্কের মায়ায় জড়ানোর ইচ্ছে ছিলনা কোনোকালেই, অথচ যৌবনের প্রথম ভালোলাগা থেকেই তন্দ্রা নামক এক সুশ্রী রমণীকে ভার্সিটির ডরমিটরি থেকে তুলে এনে বিয়ে করেছিলেন সে। প্রচন্ড ভালোবেসে রানী করে রেখেছিলেন নিজের পাপের সাম্রাজ্যে। প্রথমে থাকতে না চাইলেও, ধীরে ধীরে স্বামীর বশীভূত হয়ে যান তন্দ্রা। তবে ভালো হয়তো কোনোদিনও বাসেননি। কারণ তন্দ্রা ছিল বাঙালি বংশভূত এক মুসলিম রমণী। শুধুমাত্র পড়াশোনার জন্যই সুদূর রাশিয়ায় প্রত্যাগমন তার। নিজের ধর্মের উর্ধে গিয়ে একটা পা”পীকে ভালোবাসা ছিল তারজন্য বরাবরই অসম্ভব।
অথচ পাখানের সেই অসামান্য ভালোবাসা, বিয়ে নামক প্রতিশ্রুতি আর দায়বদ্ধতা সবকিছু ভেঙে চূর্ণ হয়েছিল এক নিমেষে, যখন কিনা পা’চারকৃত এক নীলাভ চোখের তরুণী এসে হাজির হয় পেন্টহাউজে। তন্দ্রা তখন ৬ মাসের গর্ভবতী। মূলত তার দেখাশুনার জন্যই একজন বিশ্বস্ত দাসীর প্রয়োজন ছিল। তাইতো বিভিন্ন দেশ থেকে তুলে আনা মেয়েগুলোর মধ্যে থেকে একটা সুন্দরী অল্পবয়স্কা মেয়েকে বাছাই করে ভানিয়া । যার নাম এ্যামিলি।
ছোট্ট, নাজুক ফড়িং এর মতো চঞ্চল সেই মেয়ে। বয়স কতইবা হবে? ষোলো কি সতেরো। মেয়েটাকে প্রথম দেখেই চোখ আঁটকে গিয়েছিল ভানিয়ার।পানপাতার মতো ঢলঢলে মুখের মাঝে নিকশ নীলাভ চোখ দু’টো যেন রহস্যের আঁধার। তাকালেই কেঁপে ওঠে বুক। বিগলিত হয়ে যায় মন।
প্রথম প্রথম অনীহা দেখালেও ওই নীল চোখের মোহ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেনি ভানিয়া। কোনো এক প্রকান্ড ঝড়ের রাতে নে”শাগ্রস্ত হয়ে সে ঢুকে পড়ে এ্যামিলির ঘরে। তারপর যা হবার তাই হয়। বদ্ধ ঘরের চার দেওয়ালে এ্যামিলির করুন আর্তচিৎকার তরঙ্গের মতো সুর তোলে , তবুও কেউ বাচাতে আসে না তাকে। নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় আরামের ঘুম দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে তরুণীর, র’ক্তে ভিজে যায় বিছানা। লোকচক্ষুর আড়ালে সবার অজান্তেই কয়লার মতো কালো পেন্ট হাউজে আরও একবার লেপ্টে যায় সেই ঘৃণিত পাপাচার ।
ইচ্ছে ছিল সে রাতেই পু’ড়িয়ে মে’রে ফেলবে মেয়েটাকে। কিন্তু ভানিয়ার খায়েস মেটেনা। লোলুপ হায়েনার মতোই প্রতিরাতে ছিঁড়ে খেতো মেয়েটাকে। এভাবে কয়েকমাস কেঁটে যায়। দিন দিন এ্যামিলির শারীরিক অবনতি ঘটে, যা চোখ এরায়নি তন্দ্রার। সহসা একদিন ভানিয়ার অনুপস্থিতিতে ডা: মাতভেইকে ডেকে পাঠায় সে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যা জানান তা ছিল ভীষণ অপ্রত্যাশিত আর কষ্টের ।
মেয়েটা তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তন্দ্রার দুঃখ হয়, এই ভেবে না যে তার স্বামী প্রতারণা করেছে। বরং এই অসহায় সপ্তদশীর জন্য কষ্টে বুকভেঙে যায় তার। বাচ্চার কথা জানাজানি হলে মেয়েটাকে জ্যান্ত পুঁতে দেবে ওরা। সহসা বুদ্ধি খাটায় তন্দ্রা। মাতভেইকে চুপ করিয়ে, কয়েকদিনের মধ্যেই ভানিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত চর আন্দ্রেই এর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয় এ্যামিলিকে।
ঘটনার এই পর্যায়ে এসে সবকিছু স্বাভাবিক হলেও হতো পারতো, যদি না ছেলে শিশু জন্মদানের কয়েক বছরের মাথায় ভানিয়া জানতে পারতো এরীশ তারই সন্তান। ধীরে ধীরে আন্দ্রেই এর মনে অসন্তোষের দানাবাঁধে। ছেলেকে সে মোটেই সহ্য করতে পারতো না। তিল থেকে তাল খসলেই মা ছেলে দু’জনের শরীরেই হা:মলে পড়ে অনিয়ন্ত্রিত প্রহার। কখনো হাত, কখনো বেল্ট, কখনো বা ভারী কোনো সরঞ্জামের বেত্রাআ’ঘাত । ছোট্ট, সরল, দুনিয়া না চেনা অরন্য আক্রান্ত হয়, ব্যথায় জ্বর আসে তার। গোল গোল অবুঝ চোখ দু’টো দিয়ে অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে সে মায়ের পানে। মা এতো নির্লিপ্ত হয়? কেনইবা তাকে সুরক্ষা দিতে এতো অপারগ মা?
এ্যামিলি ততদিনে অনুভূতিহীন এক প্রস্তরে রূপান্তরিত হয়েছে। ছেলে মেয়ে সকলের প্রতি তীব্র অনীহা তার। বিদ্বেষ এই দুনিয়ার প্রতি। নেই কোনো বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা আর না তো কোনো আগ্রহ। তার এই নিস্পৃহতায় স্বয়ং জীবন যেন ধিক্কার দিয়ে যায় তাকে । অথচ জীবনের প্রতি তার কত সহস্র অভিযোগ, কত অব্যক্ত অনুযোগ। সবটাই এখন তার নির্মম ভাগ্যের লিখন। মিছে মিছে বেঁচে থাকা এক গতিহীন সত্তা তখন এ্যামিলি। যার দুনিয়া বলতে, বারো ফুটের অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর আর এক চিলতে বারান্দা।
ওদিকে তন্দ্রার জীবনে ঘোর অশান্তি। সে কিছুতেই তার ওইটুকুনি কোলের ছেলেকে জড়াতে দেবে না পা”পাচারে, অথচ ভানিয়ার তখন উত্তরাধীকারীর প্রয়োজন। যে এই সামাজ্য, এই প্যারাডাইসকে অন্তর দিয়ে লালন করবে। যার চোখে থাকবে প্রতিহিংসার তেজ। অন্তরে ক্ষমতার দাপট, আর মস্তিষ্কে পৈশাচিক নির্মমতা।
“এরীশ ” নামটা ওই দূর মহাআকাশের বামন গ্রহের মতো অধরা হলেও কার্জত তার জীবন ছিল অ”ভিশাপ আর কলুষতার অরণ্যে ঢাকা। যদিও অরন্য নামটা কেবল এ্যামিলির মুখেই শোনা যেত। ছেলের ওই টুকটুকে ফর্সা রাশান মুখটা দেখলেই মন খারাপ হয়ে যেতো তার। বুকের ভেতর একটা নীরব ব্যথা পাথরের মতো চেপে বসতো, সেই ব্যথাক্লিষ্ট অন্তর নিয়েই ছেলেকে এই নামে ডাকতো সে।
চঞ্চল হাসিখুশি বালক অরণ্যের নিস্পাপ চোখ দু’টো ছিল ঝিলের জলের মতোই স্বচ্ছ আর স্বপ্নে পরিপূর্ণ। দিগন্তে ডানা ঝাপটানো মুক্ত বিহঙ্গের মতোই আকাশে উড়ে বেড়ানোর অদম্য ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু মানুষের তো আর পাখির মতো ডানা নেই, তাই ছোট্ট বেলা থেকেই পাইলট হওয়ার শখ করেছিল ছেলেটা। ওইজন্যই বোধহয় দূর দূরান্তে উড়ে বেড়ানোর অভ্যেসটা আজও বদলাতে পারেনি এরীশ।
বাবার বিরূপ আচরণ আর অবিরাম নির্যাতনে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকলো এরীশ। তার চঞ্চল চাহনি কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। কথা কমিয়ে দিতে দিতে এক পর্যায়ে বাক্যব্যয়ই বন্ধ করে দিল সে । বালকসুলভ চেহারা কেমন নিস্প্রাণ হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে অভিব্যক্তি জুড়ে ভর করলো শীতল কাঠিন্যতা । আগে আন্দ্রেইয়ের কাছে নি”র্যাতিত হলে কাঁদত, সে প্রহার করলে আকুল হয়ে ছেড়ে দেওয়ার জন্য মিনতি করতো। সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেলো সেই কান্নার সুর, কেবল চোখ দু’টোই ছলছল করতো অব্যক্ত ব্যথায়।
তারপর এলো সেই অশুভ একত্রিশ। এরীশের অষ্টম জন্মদিন। যেদিন ওকে ধরেবেঁধে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভানিয়া মিকাইলের ভয়াবহ ট”র্চার সেলে। এরীশের এখনো মনে আছে। তুষার ঝরের একরাতে ঘরের কোণে হ্যাজাক জ্বালিয়ে ও অপেক্ষা করছিল আন্দ্রেইর। ভেবেছিল আজকের দিনটা হয়তো মনে রাখবে তার বাবা, ঘরে ঢুকেই সুর তুলে উইশ করবে, দু’হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিবে, হয়তো বা একটা কেক ও নিয়ে আসবে। কিন্তু তেমন কিছুই হয়না। জীবনের প্রথম নির্মমতা নিজের জন্মদিনেই দেখা হয়েছিল বালক এরীশের। দু’জন বিশালদেহী লোক যখন ওকে টেনেহিঁচড়ে ঘরে থেকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন চিৎকার করে কাঁদছিল ছেলেটা। বাবার পায়ে পড়েছিল, মায়ের পোশাক টেনে ধরে কত আকুতিই না করেছে সেদিন। অথচ কেউ ওর দিকে একটাবার ফিরে অবধি তাকায়নি। ওর পৃথিবীতে আসাটাই যেন সবচেয়ে বড় অ”ভিশাপ।
আট বছরের এরীশ সেদিন একটা কথা ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল, এই গোটা দুনিয়ায় ওর জন্য কোনো ভালোবাসা নেই, নেই কোনো উষ্ণ আশ্রয়।
তুষারে ভেজা এরীশকে যখন পেন্ট হাউজে নেওয়া হয়, তখন হারকাঁপানো শীতে ঠকঠক করে কাঁপছিল ছেলেটা। তখনও দু’জন গার্ড ওকে ধরে রেখেছিল দু’দিক দিয়ে। সেদিন লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা ছেলের মুখের পানে চেয়ে এগিয়ে এসেছিল ভানিয়া। নিজের শরীর থেকে ওভার কোটটা খুলে ওর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে, অঞ্জলিতে তুলে ধরেছিলো তিরতির করে কাঁপতে থাকা বালকের ছোট্ট চিবুক। ছেলের চেহারা, চোখের চাহনি দেখেই কপট হাসির ঢেউ খেলে গিয়েছিল তার ঠোঁটের আগায়। প্রসন্ন হয়ে বলেছিল,
— আমার উত্তরসূরী। লিডার অব পাইথন প্যারাডাইস!
লোকটার উষ্ণ হাসির তোড়ে অবুঝ এরীশের অন্তর বিগলিত হতেই ভেসে আসে রুক্ষ আদেশ,
— ওকে ট”র্চার সেলে নিয়ে যাও। ভোর রাতে উঠিয়ে প্র্যাকটিস করাবে, রাতে কাঁচা মাংস খেতে দিবে, আর প্রতিদিন এক সিসি করে ড্রা”গ।
ব্যাস! শুরু হয়ে যায় এরীশ অরন্য থেকে এরীশ ইউভান হয়ে ওঠার যাত্রা। ভোররাতে উঠে বিভিন্ন উপায়ে মানুষ মা’রা’র কৌশল শেখানো হতো ওকে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে রাতে খেতে দেওয়া হতো কাঁচা মাংস। প্রথমে মুরগী দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে মেনুতে যোগ হতে থাকলো একের পর এক জীবজন্তুর দেহাবশেষ।
প্রথম প্রথম খাওয়া তো দূরে থাক সামান্য কাঁচা মাংসের ঘ্রানেই শরীর গুলিয়ে বমি চলে আসতো ওর।না খেয়ে থাকতে থাকতে শরীর শুকিয়ে যেতে লাগলো। অবশেষে একপর্যায়ে ক্ষিদের জ্বালা সইতে না পেরে থলথলে কাঁচা মাংসই মুখে তুলতে বাধ্য হলো এরীশ । ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তিত হলো, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর ওই অখ্যাদ্য গুলো অমৃতের মতোই সুস্বাদু লাগতে শুরু করলো এরীশের নিকট। খাবার সামনে আসতেই দানবের মতো হামলে পড়ে গপাগপ চেটেপুটে খেয়ে উঠতো সব। প্রথম দিকে হজমে অসুবিধা হলেও সময়ের ব্যবধানে মানিয়ে নিতে শুরু করলো শরীর । সবশেষে রাতে ড্রাগ দেওয়া হলে সকল অন্যায় অ”ত্যা”চার নিপীড়ন ভুলে টর্চার সেলের এককোণে মৃ”তের মতোই নির্জীব হয়ে পড়ে থাকতো ছোট্ট নাজুক শরীরটা। ধূলো,ময়লা, কদাচার সবকিছুকে সঙ্গী বানিয়ে পশুর মতোই জীবন কাটতে লাগলো ছেলেটার।
বোজোর সঙ্গে পরিচয়টা ট”র্চার সেলের মধ্যেই হয়েছিল এরীশের । যেটা ছিল ব্রাটভায়ের দেওয়া দুঃসাধ্য এক টাস্ক। কারণ নেকড়ে কখনো বশ মানে না। অথচ নেকড়ের সঙ্গেই একঘরে বসবাস করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় ওকে । পরিস্থিতিটা সহজ ছিলনা মোটেই, প্রথম দিকে দিনে কয়েকবার করে আ”ক্রম”ণ করতো নেকড়েটা। ধারালো নখের থাবায় নাজুক ত্বকে ছিঁড়ে ফেলতো ওর। সেই প্রাণপন বাঁচার লড়াইয়ে এরীশকে জয়ী হতে হতো, নতুবা মৃ”ত্যু অবধারিত। যদিওবা বোজোও তখন নেকড়ে শাবক মাত্র । খেলাচ্ছলেই এরীশকে মেনে নিতে শুরু করেছিল সে। ধীরে ধীরে যখন দু’জনেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন এরীশ এক নামহীন সঙ্গী খুঁজে পায়। যে কিনা ওর মতোই হিং’স্র মনুষ্যত্বহীন বিবেক বর্জিত জানোয়ার। তখন থেকেই একসঙ্গে রাতের আধারে শিকার করতো ওরা। বহুল উপায়ে মানুষকে আ”ঘাত করে একসঙ্গে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতো দু’জন। একপাতেই খাবার খেতো, ঘুমাতোও একসঙ্গেই গায়ে গা মিলিয়ে।
এমনই এক রাতে, টর্চার সেলের মধ্যে একসাথে বসে র”ক্তেভরা কাঁচা মাংস চিবিয়ে খাচ্ছিল এরীশ আর বোজো। ওদের ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছিল বেশ আনন্দের সাথেই দু’জন উপভোগ করছে তাদের নৈশভোজ।
ঠিক সেই সময়ে সেলের সামনে এসে হাজির হয় মাতভেই আর ভানিয়া। বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরের এহেন বিকৃত দৃশ্য দেখে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে মাতভেই এর দু’নয়ন। সে বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে বলে,
— এভাবে চলতে থাকলে ও একটা মনস্টার হয়ে উঠবে।
মাতভেই এর কথার বিপরীতে চোখে হাসে ভানিয়া। কপট স্বরে আওড়ায়,
— ইয়েস! আই নিড আ মনস্টার। আ ব্লাডিমনস্টার!
কুলকুলে প্রবাহমান স্রোতের মতোই সময় চলে যায়। পেরিয়ে যায় দীর্ঘ আট বছর। সেই আট বছরের ছোট্ট এরীশ তখন তারুণ্যের দোরগোড়ায়, সেই সঙ্গে একজন দক্ষ খু’নিও বটে। তার চোখে চঞ্চলতা নেই আছে ক্রোধের উস্মা। মস্তিষ্কে পৈশাচিক তৃপ্তি। আর হৃদয়? সে তো অনুভূতির অভাবে নির্জীব পাথরে পরিনত হয়েছে সেই কবেই। অনুভূতি, আবেগ কিংবা মনুষ্যত্ব ততদিনে কোনোকিছুই আর ছুঁতে পারেনা তাকে। আট বছরের ব্যবধানে পাল্টে যায় অনেক কিছু, ক্ষমতার রদবদল হয়। ভানিয়াকে মে’রে আন্দ্রেই তখন পাইথন লিডার হয়ে ওঠে।
এরীশ তার প্রশিক্ষনের শেষ পর্যায়ে। এবার তাকে ব্রাটভায়ের উচ্চপদস্থ কোনো পদে ভূষিত করার পালা। সহসা শিথিল করা হয়েছে তার সমস্ত নিয়মকানুন। শিথিল না করেও উপায় ছিল না অবশ্য, কারণ ততদিনে এরীশ ইউভান হয়ে উঠেছিল সকলের গা ছমছম আত”ঙ্কের নাম। কত উপায়ে যে মৃ”ত্যু দিতে পারে তার হিসেব নেই।
সময়ের দোলাচলে ঘুরেফিরে আবারও সেই একত্রিশ এসে হাজির হলো দোরগোড়ায়। এরীশ সিন্ধান্ত নিলো ও বন্দী জীবন কাটাবে আর । এবার বাড়ি যাবে। না, কাউকে দেখতে নয়। মর্জি হয়েছে ব্যাস এইটুকুই।
যেই ভাবা সেই কাজ। সেদিন গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে খুব কৌশলে পেন্ট হাউজ পরিত্যাগ করলো এরীশ। বাড়ির রাস্তা ততদিনে ভুলতে বসেছে ছেলেটা, ভুলে গিয়েছে পরিচিত জনপদ। চারিদিক ভীষণ অচেনা। এদিক ওদিক দেখতে দেখতেই এলোমেলো পা ফেলে সামনে এগুতে লাগলো সে। বরফ কেটে কেটে চলে গেলো বহুক্রোশ। যেতে যেতেই একপর্যায়ে থমকে গেলো পদক্ষেপ। চোখের সামনে দৃশ্যগত হলো এ্যামিলির সেই ছোট্ট কুটির। যার বাইরে জগত বলতে আর কিছুই জানা নেই রমণীর । কদাচিৎ শৈশব, নির্মম অতীত, জ্বরের ঘোরে অস্থির স্বরে কাতরাতে কাতরাতে চেতনাহীন রাত।সমস্ত কিছুই এক নিমেষে মানস্পটে ভেসে উঠলো তার । অথচ রুক্ষ নির্জীব চোখ জোড়ায় জাগ্রত হলোনা কোনো অনুভবের ছাপ। না-তো কোনো দুঃখের ক্লেশ। আনমনেই সে এগিয়ে গেলো ঘরটার দিকে।
অবশ্য তখনও যদি জানতো, ভেতরে তার জন্য কতটা নৃ”শং”স নি”র্মমতা অপেক্ষা করছে, তাহলে বোধ রাস্তা থেকেই ফেরত যেতো এরীশ। ফিরেও তাকাতো না এদিকে। প্রাপ্তবয়স্ক এরীশ হলে বোধ হয় তাই করতো। কিন্তু তরুণ এরীশ পারদর্শী হলেও সুদক্ষ ছিলনা। হৃদয়ের কোথাও একটা তখনও টিমটিমিয়ে আশার আলো ফুটেছিল বোধ হয় তার । হয়তো জন্মদাত্রী জননীকে একটা নজর দেখার লোভ। তা না হলে আজকের দিনেই কেন এই বাড়িতে পা রাখতে হবে ওর।
মন মস্তিষ্কের নিবিড় দ্বন্দ্ব নিয়েই বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো এরীশ। কয়েক পা এগিয়ে যেতেই ভেতর থেকে ভেসে আসা অসহনীয় আর্তচিৎকারে কর্ণকূহর বুদ হয়ে গেলো তার। থমকালো গতিপথ। পরের কয়েক সেকেন্ড কানের ভেতর শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলো না আর ।
এরীশের রুক্ষ চোখ সতর্ক হয়ে উঠলো, কান খাঁড়া করতেই অনুধাবন করলো ভেতরে একজন নয় অনেকজন আছে। উৎকন্ঠায় জ্বলে ওঠা এরীশ কোনোকিছু না ভেবেই ছুটে গিয়ে জোড়ালো পদাঘাতে ভেঙে ফেললো দরজাটা। আর ভেতরে গিয়ে যা দেখলো তাতে পায়ের তলার মাটি সরে গেলো তার।
একজন দু’জন নয় একাধিক নরপশু মিলে একসঙ্গে ওর মা আর নাবালিকা বোনটাকে নিয়ে নগ্ন উল্লাসে মেতে উঠেছে ওরা। ইতিমধ্যে ওর বোনের র”ক্তে থৈথৈ করছে মেঝেটা।
এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে এতোগুলো বছর পর মায়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বোবা প্রাণীর মতো চোখ সরিয়ে নিলো এরীশ । এ্যামিলি তখন য”ন্ত্রণায় ছটফট করছে। হায়েনার দল পারলে ছি”ন্নভিন্ন করে ফেলে তার শরীরটা। সেই অবস্থাতেই দু’হাত জোর করে এরীশের নিকট মিনতি করে ওঠে জননী তার,
—- আমাদের বাঁচাও। দয়া করে আমাদের বাঁচাও। ওরা আমার মেয়েটাকে শেষ করে ফেললো। পায়ে পড়ি তোমার বাঁচাও আমাদের।
শেষবারের মতো পাথুরে হৃদপিণ্ডে তীব্র এক কষাঘাত অনুভূত হয় এরীশের। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতোই অকস্মাৎ দাউদাউ জ্বলে ওঠে মস্তিষ্ক। এক মূহুর্ত সময় অতিবাহিত করেনা সে মানব, ছুটে গিয়ে একের পর টেনে সরায় হায়েনা গুলোকে। একটাকে চেপে ধরে বুকের উপর হাঁটু গেড়ে বসে মাথায় রিভলবার তাক করে ছুড়ে দেয় বজ্রধ্বনি,
— কে পাঠিয়েছে তোদের?
এরীশের র”ক্তজমাট মুখ দেখেই আত্মা কেঁপে ওঠে ধরাশায়ী লোকটার ।হাত জোর করে সবিনয়ে বলে,
— আ.. আন্দ্রেই! আমরা ইতালিয়ান ডিলার। মেয়ে দু’টোকে কিনতে এসেছি।
আন্দ্রেই নামটা কান খাঁড়া করে শুনলো এরীশ। এরপর আর কোনো কথা নয়। চোখ বন্ধ করে গু”লি ছা’ড়লো দু’হাতে। চোখের পলকে একের পর এক মাটিতে লুটিয়ে পড়লো লোলুপ শয়তান গুলোর নিথর দেহ। কোথা থেকে যেন এরীশকে অনুসরণ করে বোজোও ছুটে এলো সেসময়। মনিবের সঙ্গে তালেতাল মিলিয়ে সেও করলো আ”ক্রমন। অঝোর র”ক্তে প্লাবিত হলো ঘর, দোর, জানালা সব। অগণিত লা”শের মিছিল তুলে তবেই ক্ষান্ত হলো ব্লাডিবিস্ট।
মা”রতে মা”রতে সবশেষে মা আর বোনের কাছে এসে থমকে গেলো পদধ্বনি তার। সহসা পায়ে গিয়ে ঠেকলো দৃষ্টি।
ছেলের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে তখনও সম্ভ্রম লুকাতে ব্যস্ত এ্যামিলি। একটাও হায়েনা বেঁচে নেই আর, গো”লাবা”রুদের বর্ষন থেমেছে, নেই কোনো আর্তনাদ। ছোট্ট ঘরটা তখন শান্ত নিস্তেজ শশ্মানের মতো নীরব । মা আর বোনকে ওই অবস্থাতে রেখেই নীরব পদচারণায় প্রস্তান করতে উদ্যত হয় এরীশ। দরজার দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসলো এ্যামিলির আকুতি ভরা কণ্ঠস্বর,
— আরেকটা উপকার করবে?
এরীশ থমকালো।কিন্তু পেছনে ঘুরলো না, নীরব চিত্তে শুনে গেলো আহ্বান। এ্যামিলি স্থির স্বরে বললো,
— আমাদের দু’জনকেও মে’রে ফেলো।
জন্মদাত্রীর কথায় গুরুত্বারোপ না করে পুনরায় সম্মুখে পা বাড়ায় এরীশ। ফের একই মিনতি ভেসে আসলো পেছন থেকে,
— অনুরোধ করছি! এইটুকু দয়া করো আমাদের। আজকের পরেও যদি আমরা বেঁচে থাকি,সেটা মৃ”ত্যুর চেয়েও অধিক য”ন্ত্রণার।এক জীবনে আর কত লাঞ্ছিত হবো বলোতো? এবার তো একটু ভালো থাকতে দাও।
এরীশ নিজেও যে খুব সভ্য তাতো নয়। অনুভূতির সুতো ছুঁতে পারেনা তাকে । সহসা আশ্চর্য হলো না সে। ঠান্ডা হিমশীতল আওয়াজে প্রত্যুত্তর করলো,
—তখন কেন বাঁচাতে বললেন ?
— ওদের হাতে লাঞ্ছিত, কলুষিত হয়ে ধুঁকে ধুঁকে ম”রার চেয়ে, তোমার গু”লির আঘাতে ম”রে যাওয়া ঢের ভালো। নারী ছেঁড়া ধন তুমি আমার কষ্ট হয়তো একটু কমিয়ে…..
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৭
বাক্যটা আর সম্পন্ন করা হলোনা এ্যামিলির। তার আগেই অতর্কিতে ধেঁয়ে আসা পরপর দু’টো গু’লির আ”ঘাতে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো দেহ তার। বোনকেও একইভাবে প্রশান্তি এনে দিলো এরীশ। এরপর আর ঘুরে তাকালো না একবারও। চেহারায় জমে থাকা র’ক্তে’র ছাপটুকু হাতের পৃষ্ঠে মুছতে মুছতে হনহনিয়ে বেড়িয়ে এলো বাড়ি থেকে। পেছনে ফেলে এলো মা, বোন আর নিজের অনুভূতির লাশ ।
অবশেষে স্বর্গীয়সুখে গা ভাসিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো এ্যামিলি। এতোদিনে শান্তি মিললো তার ।

Appu plz porbo gulo taratare den nahole pore ar golpo porte ecca kore na
Apu joto taratari paro baki part gulo diyo please
Apu please Taratari deo
apu next part dao💔
Apu next taratari dio plz💜
Next part please
আপু ৭০ পাট দাও তাড়াতাড়ি করে