আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১২
সুরভী আক্তার
সন্ধ্যার পর বাড়িতে ফেরা থেকেই বৈঠক বসেছে । আজকের দিনটা শেষ । আজকের দিনটা বাদ দিলে হাতে মোটে চারটা দিন থাকে । পঞ্চম দিন বিয়ে । যদিও ছেলে পক্ষে মেয়ে পক্ষের তুলনায় তোড়জোড় কম । তবুও পাল্লা সমান । কাবির পরিবারের বড় ছেলের বিয়ে । জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হবে সমতা রেখে । হাতে সময় কম থাকলেও খামতি থাকবে না কোনো কিছুতে । এতক্ষণ
তোফায়েল কাবির আর তৌসিফ কাবির ড্রইং রুমে বসে আলোচনা করছিলেন এই নিয়ে । সবকিছুই বাকি এখনো । শপিং হয় নি । কাল শপিংয়ে যাওয়াটা ফাইনাল হয়েছে শেষমেশ । এক সাথে দু পক্ষের শপিং হবে । সায়ান মেহের কে নিয়ে আসবে ও বাড়ি থেকে ।
শপিংয়ের পর্ব শেষ হলে একটা ঝামেলা কমবে ।
রাত্রি এখন বারোটার ঘর ছাড়িয়েছি । কাবির পরিবারে এগোরাটা হতে হতেই সবাই ঘুমিয়ে যায় সকলে । রুটিনে পরিনত হয়েছে এটা । তবে এই রুটিন থেকে রৌদ্র বহির্ভূত । সে তো মানে না এসব । আগেই কখনো মানে নি ।
এখন এই বারোটায় ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ফিরলো সে । রুবিনা কাবির কে পরপর দুদিন বলার পর আজ আর ছেলের জন্য জেগে নেই তিনি । রৌদ্র চাবি ঘুরিয়ে সদর দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকলো । ড্রইং রুমের লাইট জ্বলছে এখনো । লাইট নিভিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে উপরে উঠলো সে । কোনো কাজ নেই তার , তবুও শরীর অবসন্ন । অযথা সারাটা দিন বাইরে কাটায় । নিজের প্রতিবিম্ব টাকে কালো করে ফোটায় সবার সামনে । বাড়িতে বসে বাধ্যতা দেখানো টা ওর কাছে বিব্রতকর । হঠাৎ এতো বছর ফিরে এসে সবার অনুগত হতে চায় না সে । সে যে অপরিবর্তনীয় , তাই দেখাতে চায় সবাইকে । আর এটাই দেখাচ্ছে ।
আজ তবু বাড়িতে ছিলো সেই দুপুরের পর থেকে । সবাই ফেরার আগে আগে সন্ধ্যার পর আবার বেরিয়ে গেছে । মদ খেয়েছে । চোখ জ্বলছে । নিভিয়ে আসছে পত্র যুগল । শরীর খানা তপ্ত । কোন রকমে করিডোর পেরিয়ে ঘরে ঢুকলো রৌদ্র । গায়ের শার্টের বোতাম গুলো হেঁচকা টানে একে একে খুললো । শার্টটা খুলে ছুড়ে মারলো মেঝেতে কোথায় । রুমের লাইট অফ । সুইচ বোর্ড হাতড়ে লাইট অন করলো । অলরেডি দুইবার শাওয়ার নেওয়া হয়েছে আজ । এক বার সকালে , অন্য বার দুপুরে বাড়িতে ফেরার পর ।
এখন আবার সোজা ওয়াশ রুমের দিকে এগোলো রৌদ্র । শাওয়ার ছেড়ে নিচে দাঁড়ালো দেয়ালে হাত ঠেসে । অদ্ভুত ভাবে ছটফট লাগছে । দূর্বোধ্য অনুভুতি কাজ করছে । হৃৎপিণ্ড তীব্র বেগে লাফাচ্ছে কেমন ।
মদ খেলে তো শান্ত লাগে । আজ এমন অশান্ত লাগছে কেনো ? মিনিট দশেক শাওয়ারের নিচে থাকার পর সেখান থেকে সরে আসলো সে । ভেজা শরীরে ওয়াশ রুম ছেড়ে ঘরে ঢুকলো । কাবাড খুলে জলদি একটা ট্রাউজার বের করে চেঞ্জ করে নিলো । মিররের সামনে দাঁড়ালো অতঃপর ।
চোখ দুটো বিভৎস লাল হয়ে এসেছে । শ্যামলা বর্ণের শরীর ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে । বেশি ভেঁজে নি , তবুও । রৌদ্র নিজেকে খুটিয়ে দেখলো । হাত বাড়িয়ে চেয়ারের উপর থেকে টাওয়েল নিয়ে শরীর মুছলো । মাথা টা মুছলো আধো আধো । ভেজা চুল লেপ্টে আছে কপালে । সেগুলো ঠিক মতো মোছার চেষ্টা করলো না ।
উদ্দাম শরীর খানা স্পষ্ট ভেসে উঠেছে মিররে । প্রথমেই রৌদ্রের নজর পড়লো নিজের গলার নিকট । কালো একটা ট্যাটু করা গলার নিচটায় । ট্যাটুর ডিজাইন ভিন্ন , একটু অদ্ভুত বলা চলে । রৌদ্র আপনা আপনি হাত তুললো নিজের গলায় । ট্যাটুর উপর এক আঙ্গুলে স্লাইড করলো । কি ভেবে এটা করিয়েছিল কে জানে ?
মাথায় ভুত চড়ে মাঝে মাঝে । দৃষ্টি ফেরালো রৌদ্র । ওষ্ঠ বাঁকিয়ে শীতল কন্ঠে বিড়বিড় করলো নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে….
” দ্যা ফার্স্ট টোকেন অফ হেইট ফ্রম মাই সানি….
টাওয়েল টা সোফায় ছুড়ে মারলো । দাঁড়িয়ে থেকে মাথা উঠিয়ে খানিক চোখ বুজে রেখে ধপ করে উবু হয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায় । চার হাত পা চার দিকে মেলিয়ে দিলো । মাথাটা ভীষণ ভার লাগছে । বমি আসছে । ড্রিংক করা জেয়াদা হয়ে গেছে আজ ।
আরাম লাগলো না রৌদ্রের । স্বস্তি আসলো না ঠিক । কেমন ধক্ ধক্ করছে হৃৎপিণ্ড । অস্থিরতা লাগছে । নিজের অনুভুতি নিজেই ঠাহর করতে পারছে না সে । চোখ বুজে রাখতে পারলো না । ছটফটে তৃষ্ণায় উঠে বসলো । বিছানা থেকে নেমে এক গ্লাস পানি খেলো ঢকঢক করে । কি একটা ভেবে দ্রুত কদমে ঘর ছাড়লো ।
সেভাবেই এসে থামলো মেঘা আর শাফাহ্’র ঘরের সামনে । হাত মুঠো করে নিজেকে সংযত করতে গিয়েও পারলো না । দরজা ঠেললো , খুললো না । বিরক্ত হলো রৌদ্র । এই মেয়েকে বলেছিলো দরজা খুলে ঘুমাতে , শোনে না কেনো এই মেয়ে ওর কথা ? আর একটু জোর খাটিয়ে দরজায় চাপ প্রয়োগ করতেই আকস্মিক দরজা খানা খুলে গেলো । সিটকিনি লাগানো ছিলো না । চাপানো দিলো শক্ত করে । দরজা খুলতেই বিরক্তি উধাও হলো রৌদ্রের । ঠোঁট ভেজালো জিভে । করিডোরে এদিক ওদিক তাকিয়ে দ্রুত ঘরে ঢুকলো । ফের দরজা চাপিয়ে দিলো ।
ঘরে একটা হলদে ডিম লাইট জ্বলছে । দুটো রমনী ঘুমোচ্ছে বেঘোরে । এক পলক দেখেই চোখ সংযত করলো রৌদ্র । অবয়ব দেখে কাঙ্ক্ষিত জনকে চিনতে ভুল করলো না । ডান পাশে মেঘা শুয়েছে । রৌদ্র নিঃশব্দে পা বাড়ালো । ডান দিক দিয়ে মেঘার পাশে গিয়ে থামলো । হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো মেঝেতে । ডান কাত হয়েই ঘুমিয়েছে মেঘা । হলদে আলোয় পূর্ণ মুখশ্রী স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । ফর্সা ভাবটা কমে হলদেটে লাগছে । রৌদ্র এতক্ষণে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । অস্থিরতা কমলো বিধায় তৃপ্ত হলো শ্বাস ।
সেকেন্ড কয়েক চোখ বুজে রেখে চোখ খুললো । মেঘার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল নিভু স্বরে….
” গুড জব MP ,, দরজা খোলা রেখেছিস আমার কথায় ? ব্যাপারটা ভালো লাগলো । আই এম ইমপ্রেস ।
একটু থামলো । ওষ্ঠপূটে দাঁত বসিয়ে ভাবুক হয়ে শুধালো নিজেই নিজেকে…
” রিয়েলি আই এম ইমপ্রেস ?
নীরব রইলো কিছুক্ষণ । বিছানার ধারে মাথা এলিয়ে দিলো মেঘার মুখ বরাবর । সিলিংয়ে ফ্যান চলছে । এসি অফ । বিরক্ত হয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে রিমোট তুলে এসি অন করলো রৌদ্র । অতঃপর ফের মাথা এলিয়ে দিলো । ফ্যানের বাতাসে মেয়েটার বেনি থেকে ছুটে আসা ছোট ছোট চুল গুলো উড়ছে । মুখে বাঁড়ি খেয়ে আবার উড়ে উড়ে যাচ্ছে । একেই রুমে আলো কম । এই ক্ষিণ আলোতে এই মেয়ে টাকে দেখে শান্তি মিলছে না , তার উপর এই চুল গুলো দেখার মাঝে বড্ড ডিস্টার্ব করছে । রৌদ্র মুখে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো । কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে হাত বাড়িয়ে দিলো মেঘার দিকে । বাম হাতের তর্জনীর দ্বারা অতী আলগোছে খুব সন্তর্পণে বেবি চুল গুলোর অবাধ্যতা রুখলো । খুব সাবধানে কানের পাশে গুজে দিলো চুল গুলো । তড়িতে হাত সরিয়ে নিলো আবার । খুব কাছে থাকায় ঘুমন্ত মেঘার গরম শ্বাসের তোপ মাঝে মাঝে টের পাচ্ছে সে । ভারী শ্বাসেই মেয়েটার ঘুমের গভীরতা আন্দাজ করতে পারছে । এগোরাটায় ঘুমায় । এখন প্রায় একটা বাজতে চললো । বেজেও গেছে হয়তো । এই দু ঘন্টায় ঘুমের অনেকটা অতলে তলিয়েছে এই মেয়ে ।
রৌদ্র চেয়ে থেকে বিড়বিড়ায়….
” কি করলি রে তুই ? তোকে দেখে শান্তি লাগছে কেনো এখন ? এতক্ষণ তো অশান্তিতে মরছিলাম । ছটফট লাগছিলো সাংঘাতিক । এখন তোকে দেখার পর এতোটা শান্তি কোথায় পেলাম ? দমে গেলো কেনো ছটফটানি ? ভেবেছিলাম তুই আমার অসুখের কারন হবি , এখন তো দেখি শান্তির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালি । কি আছে তোর মাঝে , যা এভাবে প্রশান্তি দিচ্ছে আমায় ? প্রশান্তি দিয়েও এভাবে কিভাবে জ্বালাচ্ছিস আমায় ? এ কেমন জ্বলন ? যেখানে এতোটা প্রশান্তিতে থেকে জ্বলছি আমি ! এই কদিনে রুডভিক কাবির রৌদ্রের মাথা কিনে নিলি তুই ? আশকারা তো দিস নি , তাহলে এতোটা লাই পেলো কি করে এই অবাধ্য মন ? অবাধ্য আমি টাকে আরো বেশি অবাধ্য করে দিলি ? আমি তো অবাধ্য , বেপরোয়া । তাহলে কেনো পরোয়া আসছে তোর প্রতি ? তোর প্রতি নিজের মনটা অবাধ্য হচ্ছে কেনো দিনকে দিন ? তোকে তো চিনি না আমি । এই কদিন ধরে দেখছি । এখন এতোটা চিনতে ইচ্ছে করছে কেনো তোকে ? কে তুই বলতো ? কি করলি আমায় ? কোনো এক লাফাঙ্গা বললো , হালাল সম্পর্কে নাকি টান থাকে । কিসের টান ফিল করছি তোর প্রতি আমি ? হালাল সম্পর্কের টান ? হোয়াট দ্যা ফা*ক ! ঐ বিয়েটা কোনো হালাল বিয়ে ছিলো না । আমার ভুল ছিলো ওটা । আমি মানি না তোকে । তাহলে কেনো এতো টানছিস আমায় । অবাধ্য পিছুটান কেনো তৈরি করছিস তোর প্রতি ? আমি তো চলে যাবো ! এখানে থাকতে আসি নি আমি ! তোকে না দেখে এভাবে এক মুহুর্তেই ছটফটাচ্ছি , তড়পাচ্ছি , তাহলে সেই অদূরে গেলে থাকবো কি করে তুই বিহনে ? এই কদিনে পাগল বানালি আমায় ? কেনো বলতো ? কেনো এ বাড়িতে থেকে গেলি তুই ? তুই এ বাড়িতে আছিস জানলে আমি কিছুতেই আসতাম না , এখানে , ট্রাস্ট মি ! এখন যেহেতু থেকেই গেছিস , আর আমিও এসে গেছি , এখন আর তোকে ফেলে যাবো না আমি এটাও শুনে নে । ঐ আদ্রের কাছে তোকে রেখে তো আরও কিছুতেই যাবো না । তোর খুব ভাব জমেছে ওর সাথে , ইডিয়ট ? তোর ভাব অভাবে ট্রান্সফার করবো আমি ! মিলিয়ে নিস….
প্রথম দিকে নরম হলেও শেষ পর্যায়ে আসতে আসতে কঠোর ভঙ্গিতে কথা গুলো শেষ করলো রৌদ্র । এতো গুলো কথা বলার পর ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । আচানক চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো । হলদে আলোয় দৃষ্টি পড়লো মেঘার গ্রীবার নিকট । অর্ধ উন্মুক্ত গলায় সেই একখানা চেইন ঝিকঝিক করে জ্বলছে । ডিম লাইটের রিফ্লেকশনে ক্ষণে ক্ষণে চমক ছড়াচ্ছে । চকচকে হয়ে ঝিলমিল করে নিজ দখলদারির আধিপত্য দেখাচ্ছে । জ্বলছে যেনো রৌদ্র কে দেখিয়েই । হয়তো বোঝাতে চাইছে রৌদ্রের আগে তার আধিপত্যের বিশালতা । চোখ সরু করলো রৌদ্র । পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো । সেদিনের ন্যায় আজকেও অসহ্য লাগলো এটাকে । মস্তকে রাগ চড়লো ভীষণ । চোয়াল শক্ত করে খিচলো রৌদ্র । হিসহিসিয়ে বললো…
” সি ইজ মাই সানি । হার এনটাইয়ার বিইং উইল বিলং অনলি টু মি ।
ওর সম্পুর্ন শরীরে শুধু আমার আর আমারই আধিপত্য থাকবে । যতক্ষণ না আমি আধিপত্য বিস্তার করবো ততক্ষন ওর সংস্পর্শেও কাউকে সহ্য করবো না । ওর উপর একটা উটকো জিনিস কেও সহ্য করবে না এই রুডভিক কাবির রৌদ্র । আর তুই কে ? যে তোকে সহ্য করবো আমি ? ইউ’ভ হাং অ্যারাউন্ড হার নেক লং এনাফ । ফ্রম টুডে অনওয়ার্ডস… ইউ’আর ডিসমিসড ।
সকাল হতে না হতেই হুটোপাটি পড়েছে । ইনভাইটেশন শুরু হয়ে গেছে অলরেডি । ছেলে মেয়েরা শপিংয়ে যাবে দুপুরের পর পর । সকালের ব্রেকফাস্টের টেবিলে আরো এক দফা তর্ক বিতর্ক হয়েছে । শাফাহ্ হাঁটতে পারছে না এখনো । পারছে একটু আধটু । তবে শরীরের সম্পূর্ণ ভার পায়ের উপর ছাড়তে পারছে না । খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে । নতুবা লাফিয়ে লাফিয়ে । যদিও কষ্ট হচ্ছে , তবুও সে কষ্ট প্রকাশ করছে না । করলেই সবাই খিল ধরিয়ে বসিয়ে রাখবে ওকে । নড়তে চড়তে দেবে না । আজ সবাই শপিংয়ে যাবে । ও কি এভাবে খোঁড়া হয়ে বাড়িতে বসে থাকবে নাকি ? কিছুতেই না । ও নিজেকে যথেষ্ট সুস্থ দাবি করছে । বাজে এখন দশটার কাছাকাছি । ব্রেকফাস্টের পর থেকেই মেঘা, সিরাত আর শাফাহ্ লিস্ট করতে বসেছে । কোন কিছু কিনতে গেলেই সবটা গুলিয়ে যায় । হারিয়ে যায় খেয়াল । উপস্থিত সময়ে যাতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে না যায় , তাই খাতা কলম নিয়ে বসেছে ওরা । এক্ষুনি ভেবে চিন্তে সবটা লিস্ট করে রাখলে পরে শুধু কেনা হবে । তখন আর বেশি ভাবতে হবে না । লিস্ট মাফিক একে একে গুছিয়ে কেনা যাবে সবটা । মোটামুটি লিস্ট করা ডান । এখন আবার খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে , কিছু বাদ পড়লো না তো ?
শাফাহ্ চেঁচিয়ে বললো বিচলিত হয়ে….
” মেঘা , আমার নেইলপলিশের নাম লিখেছিস ? ওটা বাদ পড়ে নি তো আবার ? বাদ পড়লে লিখে ফেল । উমমম , লিখবি ব্রাউন কালার নেলপলিশ । আমার ড্রেসের সাথে ম্যাচ করে ব্রাউন নেলপলিশ কিনবো আমি । যদি ভুলে যাই তাহলে কেনা হবে না । তুই ওটাও লেখ….
মেঘা আর সিরাত নিজেদের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো । ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করলো সিরাত । মেঘা কে ইশারা করে বললো ওটাও লিখতে , নয়তো এই মেয়ে ছাড়বে না ।
আজ বৃহস্পতিবার । আদ্রের ক্লাস ছিলো না ভার্সিটিতে । তাই সে যায় নি । আর বিয়ের এই হাঙ্গামায় মেঘা আর শাফাহ্ ও যাবে না কদিন । ছুটি নেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে ।
আদ্র নিচে নামলো এতক্ষণে । শাফাহ্’র পাশে সোফায় বসতে বসতে বলল….
” লিস্ট হলো তোমাদের ? তাড়াতাড়ি করো , একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে । অনেক কিছুই তো কিনতে হবে । সময় সংকুলান হবে দেরি করে গেলে । দশটা পেরিয়েছে অলরেডি । বারোটার দিকে বেরোবো ।
সিরাতের দিকে তাকিয়ে আবার বললো….
” তুমি যাবে আপু ?
অসহায় কন্ঠে নিজের কোলের রামিশা কে দেখিয়ে উত্তর করলো সিরাত…..
” এই ভ্যান্ডি ব্যাগ কে নিয়ে আমি যাবো কি করে ? তোরা যা । শুভ্রর বিয়ের শপিং না হয় বাদ দিলাম । তোর বিয়ের শপিং টা আমি নিজ হাতে করবো । আচ্ছা বল , কে কে যাচ্ছিস তোরা ?
আদ্র খানিক হাসে । কিছু বলার আগেই শাফাহ্ বলে হাত উঁচিয়ে….
” আমি যাচ্ছি ।
মুহুর্তেই কপাল কুঁচকে তাকালো আদ্র । বললো ভার গলায়….
” তুই যাবি মানে ? কোথায় যাবি তুই ?
” কেনো , শপিংয়ে ।
” পায়ের অবস্থা দেখেছিস । এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটলে নিয়ে যেতে পারবো না তোকে ।
” এহহ্ , আমি কি তোমার সাথে যাবো নাকি ? আমি যাবো আমার ভাইয়ার সাথে । আমার ভাইয়ার বিয়ের শপিংয়ে যাবো আমি । তোমার বিয়ের কথা তো বাদ দিলাম । এ জন্মে তুমি বিয়ে করবে না জানি । তোমার বিয়ে আসতে আসতে আমারই বিয়ে হয়ে যাবে । তোমার বিয়ের শপিংয়ে তো যেতে পারবো না আমি । তাই এখন আমি আমার ভাইয়ার বিয়ের শপিংয়ে যাবো । তুমি কে আমায় বাঁধা দেওয়ার ?
আদ্র চোখ পাকিয়ে তাকালো । শাফাহ্ ভেংচি কাটলো বিপরীতে । চোখ উল্টিয়ে নির্ভয়ে বললো….
” আমাকে দেখবে না এভাবে । তোমাকে ভয় পাই আমি ?
” টুকটুকির বাচ্চা , থাপ্পর খাবি বলে দিলাম ।
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চা , শুধু থাপ্পর মেরে দেখাও । তোমার বাপকে বিচার দেবো আমি ।
মেঘা আর সিরাত ফিক করে হেসে ওঠে ।
রৌদ্র নিচে নামছে । পায়ের শব্দে সিরাত তাকালো সিঁড়ির দিকে । আজ এখনো বেরোয় নি রৌদ্র । এখন হয়তো বেরোবে । পকেটে এক হাত গুঁজে টানটান হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে সে । নামতে নামতে সবাইকে এক পলক করে দেখলো । নির্বিকারে কোনো কথা না বলে সদরের দিকে এগোতে গেলে ডাকলো সিরাত….
” রৌদ্র ?
এক মুহুর্ত থেমে উত্তর করলো রৌদ্র…
” হ্যাঁ আপু !
” বেরোচ্ছিস এখন ? তুই যাবি না শপিংয়ে ?
” না ।
” সবাই তো যাচ্ছে । আমি রামিশা কে নিয়ে যেতে পারছি না । আম্মু আর মনিও যাচ্ছে না । তুই যা না ওদের সাথে । তাহলে ওদের একটু রেহাই হবে । আর এমনিতেও, কতদিন হলো তোরা একসাথে কোথাও যাস না । একসাথে হোস না তোরা । এই সুযোগে একসাথে কিছুটা সময় পার করতে পারবি ।
রৌদ্র এক পলক বাঁকা চোখে নিজের জমজ ভাইয়ের দিকে তাকায় । গম্ভীরতা দেখিয়ে বলে….
” যাবো না আমি ।
ফের পা বাড়াতে গেলে সিরাত আকস্মিক বললো…
” মেঘাও যাচ্ছে । টুকটুকি , আদ্র , শুভ্র , এরাই চারটে যাচ্ছে শুধু । তুই তো বেকার বাইরেই যাচ্ছিস । ওদের সাথে গেলে কি রাজ কার্য মিস হবে তোর ?
রৌদ্র সহসা থমকালো । অধীক পরিমানে মুখ কুঁচকে পিছু ফিরলো । পা বিপরীতে ঘুরিয়ে বললো….
” জোর করছো কেনো আমায় ? বললাম তো যাবো না !
সিরাতের আগুনে ঘি ঢালা শেষ । মেঘার নামটাই যথেষ্ট ছিলো । এবার রৌদ্রের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ঘাড় উঁচিয়ে দায় সারা বললো….
” তো যাস না । জোর করবো না আর ।
রৌদ্র কিড়মিড় করে । ঠায় দাঁড়িয়ে রয় । সামনেও এগোতে পারে না , আবার পিছনেও যেতে পারে না ।
আদ্র এতক্ষণে মেঘা কে খেয়াল করলো । পৃষ্ঠার ভাঁজে কলম চালিয়ে আঁকিবুঁকি করছে মেঘা । সেখানেই মনযোগী প্রমান করছে নিজেকে । আদ্র নিঃশব্দে দুদিকে মাথা নাড়ায় । পরক্ষনে মেঘার দিকে কিছু একটা খেয়াল হতেই কপাল কুঁচকে আসে আপনা আপনি । নিজের ধারনা কে স্বাভাবিক ধরেই সন্দিহান হয়ে কপাল গুটিয়ে প্রশ্ন করে আদ্র…..
” মেঘ , তোর গলার চেন কোথায় ?
মেঘা প্রথমত বুঝলো না । সহসা তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল….
” হ্যাঁ ভাইয়া ?
” তোর চেন ? চেন কোথায় ? খুলে রেখেছিস ?
মুহুর্তেই ধক্ করে ওঠে মেঘা । দ্রুত নিজের গলায় হাত রাখে । খুব কাক্ষিত, গচ্ছিত জিনিসটার উপস্থিতি গলায় না পেয়ে ছ্যাঁত করে ওঠে মেঘা । ধড়ফড়িয়ে নড়েচড়ে ওঠে । বক্ষস্থল কেঁপে ওঠে মেয়েটার । মুহুর্তেই মুখশ্রীতে ভয়ার্ত ভাব ফোঁটে । সিরাত এতক্ষণে নিজেও লক্ষ্য করলো , আর শাফাহ্ও । সিরাতও একই প্রশ্ন করলো….
” কি হলো মেঘা , চেন খুলে রেখেছিস ?
মেঘা কেমন তিড়তিড়িয়ে কাঁপে । রুদ্ধ গলায় বলে অস্থির হয়ে…..
” আপু , আপু আমার চেন…..
এটুকুনি বলেই উঠে দাঁড়ায় মেঘা । ছটফটিয়ে তড়তড়ে এলোমেলো পায়ে উপরের দিকে ছুট লাগায় । পেছনে কেউ কিছু বুঝলো না । আদ্র সচকিতে ডাকলো….
” মেঘ , কি হলো ?
” আদ্র , দেখ না কি হলো ? ওভাবে ছুটলো কেনো ও ?
সিরাতের কথায় এবার আদ্র উঠে দাঁড়ায় ।
খুব একটা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ধীরে উপরে উঠতে লাগে । এদিকে হাত মুঠো করে নেয় রৌদ্র । বাকিটা বুঝলো না । শুধু একটা কথাই বুঝলো , কানে বাজলো আদ্রের কথাটা..
‘ তোর গলার চেন কোথায় ?
মেঘা ঘরে উঠেছে এক নিমিষেই ।
আদ্র পিছন পিছন উঠলো । ঘরে গিয়ে ঘরের অবস্থা দেখে তাজ্জব বনলো সে । পুরো ঘর এর মধ্যেই এলোমেলো । বালিশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে । বেড শিটটাও ছিটকে পড়ে আছে একপাশে । টেবিলের উপরের ফুল দানিটা উল্টে পড়ে আছে । ড্রেসিং টেবিলের উপরের মেয়েলি সাজগোজের জিনিস গুলো সব মেঝেতে ছড়ানো ছেটানো । মেঘার অবস্থা হন্তদন্ত । সেভাবেই ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসলো ও । কিছু খুঁজেছে হন্নে হয়ে । কাঁপছে ও । খোপা খুলে চুল গুলো ছড়িয়ে পড়েছে পিট ঝাঁপিয়ে । এলোমেলো হয়ে এদিক ওদিক সবকিছু ঘাটছে মেঘা । আদ্র সবটা দেখে নিজেকে সামলে ডাকলো….
” মেঘ , কি করেছিস এসব ? কি হয়েছে ?
মেঘা চকিতে চায় । দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসে ওর । আদ্র কে ঝাপসা দেখে । ছুটে আসে আদ্রের কাছে । আদ্রের এক বাহু আঁকড়ে ধরে । কোনো রকমে থেমে থেমে বলে ভেজা গলায় …
” ভাইয়া আমার চেন ? আমার চেন কোথায় ?
আদ্র না বুঝে বলে…
” চেন কোথায় মানে ? কোথায় রেখেছিস ? খুলে রাখিস নি তুই ।
মেঘা ওষ্ঠ উল্টে দুদিকে মাথা নাড়ায় । এ পর্যায়ে চোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে টুপ করে পানি ঝড়ে কয়েক ফোঁটা । ছ্যাঁত করে ওঠে আদ্র । চোখ গোল গোল করে তাকায় অধীরে । মেঘা বলে কান্না চেপে থেমে থেমে…..
” আমি চেন খুলি নি ভাইয়া । গলাতেই ছিলো । কিন্তু এখন , এখন কোথায় আমি জানি না । আমি গলা থেকে খুলিনি ওটা । তুমি তো জানো আমি ওটা কাছছাড়া করি না । কোনো দিন খুলিনি গলা থেকে ।
আর আজ , আজ জানি না কোথায় ,ঘরেও কোথাও নেই । ওয়াশ রুমে ও নেই । ওটা আমাকে খুঁজে এনে দাও ভাইয়া । প্লিজ খুঁজে এনে দাও । আমি ওটা হারিয়ে ফেলেছি ভাইয়া । তুমি প্লিজ খুঁজে এনে দাও । ওটা ছাড়া আমার কাছে আর কিছু নেই । কিচ্ছু না । আমার আম্মুর শেষ স্মৃতি ওটা ভাইয়া, আমি ওটাও হারিয়ে ফেললাম । প্লিজ ভাইয়া , আমাকে ওটা ফিরিয়ে এনে দাও । আমি ওটা হারাতে চাই না ভাইয়া । প্লিজ খুঁজে এনে দাও..
ওষ্ঠ ভেঙে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মেয়েটা । ওর মায়ের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি ছিলো ওটা । যা আজ অবধি এক মুহুর্তের জন্যও কাছছাড়া করে নি সে । সর্বদা কাছে রেখেছে । গলা থেকে খোলেনি কখনো । ওর কাছে এই চেনের মূল্য কতটা , তা এ বাড়ির লোক হাড়ে হাড়ে জানে ।
মেয়েটা কে এভাবে ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে দেখে বিচলিত হয় আদ্র । এমন কিছু হবে , তা ধারনাতেও ছিলো না । আদ্র তৎক্ষণাৎ মেঘা কে সামাল দিতে বলে….
” মেঘ বুড়ি , এই তাঁকা আমার দিকে । কাঁদছিস কেনো পাগল ? তোর চেন হারায় নি । তুই ঠিকমতো খুঁজেছিস ? এভাবে সব এলোমেলো করে খুঁজলে পাবি ? থাম একটু । শান্ত হ । আমি খুঁজে এনে দেবো তোকে । তুই তো কাল থেকে বাড়িতেই ছিলি , কোত্থাও যাস নি । চেন হারালে বাড়িতেই হারিয়েছে । হয়তো খুলে পড়ে গেছে কোথাও ।খুঁজলে ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে দেখিস । আমি খুঁজবো , দাঁড়া । কোথায় কোথায় গেছিলি বল আমায় , ছাদে গেছিলি ? আমি ছাদে গিয়ে খুঁজবো ?
মেঘা ফিকড়ে ওঠে । মুচড়ে ওঠে ভেতরটা । ও যে বড্ড নরম । যতটা কঠোর দেখায় নিজেকে , তার থেকেও হাজার গুণ নরম সে । ওর কাছে আম্মুর একমাত্র স্মৃতি ছিলো ওটা । আব্বুর তো রেখে যাওয়া কোনো স্মৃতি নেই । আজ ও আম্মুর রেখে যাওয়া স্মৃতি টাও হারিয়ে ফেললো ? এটা ভাবতেই কেমন কান্না আসছে ডুকরে ।
আদ্র ওকে সামলে রেখে ছাদে উঠলো । ঠিক মতো দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে পিছিয়ে গিয়ে টেবিলের সাথে ধাক্কা খেলো মেঘা । হেলান দিয়ে পড়লো টেবিলে । খালি ঘরে পেয়ে ওষ্ঠ উল্টে শব্দ করে ফিকড়ে কেঁদে উঠলো এবেলায় । গাল গড়িয়ে টপাটপ অঝোরে পানি ঝড়ছে । ঝাপসা দেখছে চোখে । হাত তুলে গালের পানি টুকু মোছার আগেই হেঁচকা টানে মেঘা কে পিছু ফেরালো কেউ । অকস্মাৎ নিজেকে সামলে দাঁড়ানোর আগেই ঠাস করে সপাটে একটা দাপুটে চড় আছড়ে পড়লো মেয়েটার নরম গালে । মেঘা টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো মেঝেতে । এবারো নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই আবারো কেউ হেঁচকা টানে ওকে তুলে দাঁড় করালো । মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো মেঘার । ব্যাথার তোপে আরো কয়েক ফোঁটা নোনা জল যোগ হলো চোখের কার্নিশে । ঝাপসা চোখ মেলতেই রৌদ্রের ক্ষেপাটে মুখশ্রীর সম্মুখীন হলো মেঘা । কিছু না বুঝেই রক্তিম চোখে চেয়ে বিকট আওয়াজে গর্জে উঠলো রৌদ্র….
” ইউ বাস্টার্ড , গাল চুলকাচ্ছিলো আমার হাতে থাপ্পর খাওয়ার জন্য ? ইডিয়ট , ওরনা কোথায় তোর শরীরে ? পরপুরুষ তোর গলায় নজর দেবে কেনো ? বল আমায় ? ফা*কিং ওমেইন , মেরে ফেলবো তোকে আমি ।
মেঘা চমকায় । অনারগল পানি গড়ায় চোখ থেকে । ঝিঁঝিঁ ধরে মাথা সহ পুরো শরীরে । দাপুটে থাপ্পরের জোরে পুরো শরীর ঝিমঝিমিয়ে ওঠে । রৌদ্র ওর চোখে পানি দেখে আসল হেতু না জেনে ওকে হিচড়ে টেনে আনে নিজের কাছে । দাঁত পিষে আবার চিবিয়ে বলে….
” স্টুপিড , কাঁদছিস কেনো এখন ? খুব লাগলো আমার হাতের থাপ্পর ? আমার ও লেগেছে । যখন ও তোর গলার দিকে তাকিয়েছে তখন লেগেছে আমার । এখান টায় লেগেছে বুঝলি ?
তর্জনী দিয়ে নিজের বুক তাক করে বললো রৌদ্র । আরো বললো…
” কেনো তাকাবে কেউ তোর দিকে ? তোর দিকে তাকিয়েছে , কিন্তু তোর গলার দিকে কেনো তাকাবে বল ? ঢেকে রাখতে পারিস না নিজের সৌন্দর্য । সবাইকে বিলিয়ে বেড়াস ? ইম্পিউডেন্ট গার্ল ! আমার জিনিস শুধু আমার,বুঝলি ? কারোর দৃষ্টি পড়বে না আমার জিনিসের ওপর । কোন ইঞ্চিতেও না । ওরনা কোথায় তোর ? হ্যাঁ ? আলমারিতে…
চল…
মেঘা কে টেনে আলমারির দিকে এগোয় রৌদ্র । ঠাস করে আলমারি খুলে সব কাপড় এলোমেলো করে একটা ওরনা খুঁজে বের করে । মেঘা কে ছেড়ে এক মুহুর্তে সেটা গায়ে পেঁচিয়ে দেয় ওর । মেঘা হতবাকই হতে পারলো শুধু । ঝাঁপসা চোখে অনুভুতি হীন কিংকর্তব্য বিমূঢ় দেখেই গেলো । চোখের নোনা জল গালে মিশতেই জ্বলে উঠলো কপোল খানা । দাঁত চেপে সহ্য করলো মেঘা । রৌদ্র ওরনাটা পেঁচিয়ে দিয়ে ফের মেয়েটার চোখের দিকে তাকালো । ভেজা চোখ আর গালের অবস্থা দেখে কাঁপল পুরুষালি দু চোখ । লাল টুকটুকে হয়ে গেছে শুভ্র গাল খানা । রৌদ্র চোয়াল শক্ত করে । হাত মুঠো করে আঙ্গুল তুলে বলে….
” আজ থেকে যদি এভাবে না থাকিস , তাহলে একটা থাপ্পরের জায়গায় আরো দশটা থাপ্পর খাবি আমার হাতে । কাঁদছিস কেনো এখন ? খুব লেগেছে ? লাগার জন্যই মেরেছি তোকে । এক বার লাগলে দ্বিতীয় বার আর ভুল করার সাহস পাবি না । কথাটা যেনো মাথায় থাকে । কাঁদ এখন তুই । যত খুশি তত কাঁদ । এটাই তোর শাস্তি ।
কথা শেষ করে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । যেভাবে গটগটিয়ে এসেছিলো সেভাবেই বেরোলো । রেখে গেলো নিস্তেজ মেঘা কে । মেয়েটা জড় বস্তুর ন্যায় নুড়বুড়ে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । দরজার নিকট রৌদ্র মুখোমুখি হয় শাহিনা কাবির আর সিরাতের । রৌদ্র কে পাশ কাটিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন শাহিনা কাবির । মেঘার দিকে এগিয়ে মেঘা কে নিজের দিকে ফেরালেন । মেয়েটার ভরাট চোখ জোড়া দেখে আঁতকে বললেন….
” মেঘা , একি মা । কাঁদছিস কেনো এভাবে ? চেন হারিয়ে গেছে তাই ? চেন খুঁজে পাওয়া যাবে তো । কাঁদিস না তুই । আদ্র খুঁজছে ওটা । ড্রইং রুমে রুবিনা ও দেখছে । হারাবে না তোর মায়ের স্মৃতি । ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে দেখিস ।
রৌদ্র থমকেছে খানিক আগে । কথা গুলো কর্নকুহরে প্রবেশ মাত্রই কপাল গুটিয়ে আরো বেশি থমকালো । শিথিল হলো । বুঝলো না বিষয়টা । চেন হারিয়েছে দেখে এই মেয়ে টা কাঁদছে ? নাকি ওর কাছে থাপ্পর খেয়ে ? সিরাত কিছুটা আন্দাজ করে দ্রুত রৌদ্র কে টপকে ঘরে ঢুকলো । মেঘা কে নিজের দিকে ফিরিয়ে দেখা মাত্রই আঁতকে উঠলো সেও । মেঝের দিকে দৃষ্টি গেঁড়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ঝড়াচ্ছে মেঘা । গাল টকটকে লাল । আঙুলের দাগ ফুটে উঠেছে । সবটা আন্দাজ হতে সময় লাগলো না । রেগে মেগে রৌদ্রের দিকে ফিরলো সিরাত । ধমকে ডাকলো…..
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১১
” রৌদ্র…..
শুনলো না বেপরোয়া রৌদ্র । এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । দপাদপ পা ফেলে ঘর পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো । ঠাস করে লাগিয়ে দিলো দরজা টা ।
