Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৪

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৪

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৪
সুরভী আক্তার

তোফায়েল কাবির প্লেটের উপর হাত রেখে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলেন ছেলের দিকে । নিজের কন্ঠ ভার করলেন আরো দ্বিগুন । তার ছেলে যে বেপরোয়া , একবার যখন বলেছে ফিরবে । তখন সে ফিরবেই । ওকে আটকাতে পারবে না কেউ । অনেক কথা, সিদ্ধান্ত প্রকাশ মনে জমিয়ে রেখেছেন তিনি । সঠিক সুযোগের অভাবে কিছুই বলা হয়ে ওঠে নি । আর এই ছেলে , এই ছেলে তো কোনো দিন এসবে গুরুত্ব দেবে না তাও জানা আছে । মুখের খাবার টুকু গলা দিয়ে কোনো রকমে নামিয়ে কাঠ স্বরে বললেন তিনি….

” বিয়ের পর যাবে যাও ‌। কোথায় যাবে যাও । বাঁধা দিয়ে লাভ নেই তোমায় । বাঁধাও দেবো না আমি । তবে যাওয়ার আগে জোর পূর্বক চাপিয়ে দেওয়া একটা বিয়ের সম্পর্ককে ভেঙ্গে দিয়ে তবেই যাবে ।
আদ্র , আইনি ভাবে ডিভোর্সের সব ব্যবস্থা করবে । কাগজ পত্র আগামী দুদিনের মধ্যে তৈরি করবে । দুদিন পর বিয়ে , অতঃপর তোমার ভাই চলে যাবে দেশ ছেড়ে । যাওয়ার আগে যেন মেঘা মামুনি কে মুক্ত করে দিয়ে যায় সে । যা যা ব্যবস্থা করার , সব করবে । বিয়েটা কোনো ছেলে খেলা নয় । ছেলে খেলায় বিয়েটা হয় নি । আর না স্বাভাবিক ভাবে হয়েছে ‌। স্বাভাবিক নেই এই সম্পর্ক । এই অস্বাভাবিক সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই । মূল্যহীন কোন কিছুতে আটকে থাকবে না মেঘা । ওর লাইফ আছে , আর মুক্তি নিয়ে ও ওর লাইফ লিড করবে । কোনো ঝামেলা যেনো না হয় । সব পেপার তৈরি করার ব্যবস্থা করো ।
তার কথা শেষ হতে না হতেই কাঁচ ভাঙ্গার বিকট ঝংকার উঠলো । রুবিনা কাবির ছলকে উঠে চেঁচালেন তৎক্ষণাৎ….

” রৌদ্র ।
সবাই ধড়ফড়িয়ে চকিতে চায় রৌদ্রের দিকে । রৌদ্রের মুখশ্রী গম্ভীর নিরেট ‌। ঝাঝালো দৃষ্টি জোড়া সামন পানে স্থির । ক্ষুব্ধতা পরিলক্ষিত । সবার দৃষ্টি রৌদ্রের মুখ থেকে হাতে নামলো । রাগের তোপে পানির গ্লাস টা বাম হাতের মুঠোয় পিষ্ট করতে গিয়ে অধীক চাপ প্রয়োগের দরুন ঝরঝরিয়ে ভেঙে গেছে ফাঁকা গ্লাসটা । কাঁচের কুটি কুটি টুকরো ঝরঝর করে আছড়ে পড়লো ডাইনিং টেবিলের উপর । মুহুর্তেই বিন্দু বিন্দু রক্ত কণা টুপ টুপ করে পড়লো টেবিলের কাচের উপর । মেঘাও সবার সাথে তাকিয়েছিল । এক বিন্দু রক্ত দেখেই ছ্যাত করে দৃষ্টি সরালো সে । চোখ খিচে হাত মুঠো করে চিবুক নামিয়ে নিলো । অস্ফুটে উচ্চারণ করলো ভয়ার্ত কন্ঠে….

” ভাইয়া…..
আদ্র ছলকে চায় নিজের পাশে । মেঘা কে চোখ খিচে থাকতে দেখে আদেশ করে তড়তড়ে গলায়….
” মেঘ চোখ খুলবি না একদম । টুকটুকি , উপরে যা তোরা ।
খাওয়া আর হলো না কারোরই । খাওয়া ফেলে আদেশ তামিল করে মেঘা কে সাথে করে উপরে উঠলো শাফাহ্ । রুবিনা কাবির বিচলিত হয়ে পড়লেন ছেলের অবস্থা দেখে ‌। একাধারে রক্ত ঝড়ছে । শুভ্র খাওয়া ফেলে ফাস্ট এইড আনতে ছুটলো । নিজের শাড়ির আঁচলে ছেলের হাত চেপে ধরলেন রুবিনা কাবির ‌। কান্না রোধ করে ধরা গলায় বললেন….
” কিসব শুরু করেছেন খেতে বসে ? আপনাকে শুধু একটা বিষয় জানতে বলেছিলাম । নিজের ছেলের বিষয়ে জানতে বলেছিলাম । আর আপনি , আপনি এসব কি বলছেন তখন থেকে ? ছেলের থাকা না থাকা নিয়ে কিছু এসে যায় না আপনার ? আপনি পড়ে আছেন ডিভোর্স নিয়ে ? রৌদ্র যাওয়ার আগে ডিভোর্স দিয়ে যাবে ঐ মেয়েটাকে ? তার মানে আপনি ছেলেকে আটকাবেন না ? ছেলের যাওয়ার পথ রোধ না করে ঐ মেয়েটার পথ সুগম করে দিতে চাইছেন ?
উঠে দাঁড়ালেন তোফায়েল কাবির ,,

” হ্যাঁ চাইছি , কারন ও একটা মেয়ে । ওর পরবর্তী জীবন আলাদা হবে । তোমার ছেলের মতো বেখেয়ালি, বেপরোয়া হবে না । আর বাকি রইলো ছেলের থাকা না থাকা নিয়ে । যেখানে তোমার ছেলের কাছে আমাদের, আমাদের কথা , আমাদের মান সন্মান , কোনো কিছুর পরোয়া নেই , গুরুত্ব নেই । সেখানে ওকে আকটানোতে কি গুরুত্ব দেবো আমি ? পাঁচটা বছর তোমার ছেলে বাইরে কাটিয়েছে , খোঁজ পেয়েছো কোনো দিন ? কোনো দিন তোমার ছেলে তোমার খোঁজ নিয়েছে , নাকি নিজের খোঁজ দিয়েছে ? বিদেশের মাটিতে কিভাবে জীবনযাপন করেছে জানো তুমি ? জিজ্ঞেস করো তো ওকে , সেখানে কিভাবে কাটিয়েছে এতো গুলো দিন, এতো গুলো বছর ? এই লাইফস্টাইল , এভাবে বিন্দাস ভাবে লাইফ লিড কিভাবে করছে ও ? কি করেছে ও এতো দিন ?
তিনি থামতেই স্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়লো । রুবিনা কাবির ফিকড়ে উঠলেন । বললেন ভেজা গলায়….

” রৌদ্র না হয় একটু বেপরোয়া , তাই বলে ও শুধু আমার ছেলে হয়ে গেলো ? আপনার ছেলে নয় ? কই , আপনি ও তো খোঁজ নেননি এতো দিন । কিভাবে,কোন অবস্থায় দিন কাটিয়েছে ও , খোঁজ নিয়েছেন আদৌও ?
ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেললেন তোফায়েল কাবির । সত্যিই কি তিনি খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন নি ? এসব জানেন না রুবিনা কাবির ?
শুভ্র ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এক মুহুর্তের ব্যবধানে ফিরে আসলো । বিচলিত হয়ে টেবিলের উপর বক্স রেখে বললো….
” রুডি , হাত দেখি….
রৌদ্র না শুনে, পরোয়া না করে হুট করে উঠে দাঁড়ালো । মায়ের আঁচল থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে গটগট পায়ে দ্রুত কদমে উঠে গেলো উপরে । রুবিনা কাবির, শুভ্র , তৌসিফ কাবির , উভয়েই ডাকলেন । তবে গায়ে লাগলো না রৌদ্রের ।
তোফায়েল কাবির ও দমলেন না । খাওয়া ফেলে বেসিনের দিকে এগোলেন তিনি । বাকিরা নির্বিকারত্ব বজায় রাখলো । এ বিষয়ে কারোরই কিছুর বলার নেই ।
দুপুরের খাবার টা কারোরই খাওয়া হয় নি শান্তি মতো । এখন বিকেল গড়িয়েছে । বাড়ি সাজাতে লোক এসেছে । ক্লিনিং করা হয়েছে পুরো বাড়ি । মেহমান এসেছেন টুকটাক । শাহিনা কাবিরের বাপের বাড়ি থেকে এসেছেন অনেকে । তবুও বাড়িটা ভর্তি নয় । বিয়ে বাড়ির সমাগমের তুলনায় ফাঁকাই বলা চলে । বাদ বাকি মেহমান আসলে পরিপূর্ণ হবে । বিয়ে বাড়ির সমাগম বাড়বে তখন ।
ক্লিনিংয়ের লোকেরা চলে যেতেই মেঘা নিচে নামলো । ড্রইং রুমে অনেকে উপস্থিত । প্রায় সব মুখ মেঘার চেনা । এই পাঁচ বছরে এ বাড়িতে থাকার দরুন অনেক বার এই মুখ গুলোকে দেখেছে সে ।
টুকটুকির নানু বাড়ির সবাই এসেছে । মেঘা নিচে নামতেই সবাই চকিতে তাকালো ওর দিকে । টুকটুকির মামি আনতারা বেগম মেঘা কে দেখে স্বভাব সুলভ হাসলেন । খাতির দেখিয়ে নিজে থেকেই বললেন…

” আরে মেঘা , ভালো আছো ?
হাসার চেষ্টা করে মেঘা , উত্তর করে নরম বিনয়ী কন্ঠে…
” জ্বি মামি ‌। আপনারা ?
” এইতো আছি । ভালো না থাকলে বিয়ের দু’দিন আগে আসতে পারি ?
এবার মুখ খুলে বসলেন ভদ্রমহিলা…
শাহিনা কাবির, রুবিনা কাবির ডাইনিংয়ের কাছে । আনতারা বেগম গলা বাড়িয়ে বললেন আগ পিছ না ভেবেই….
” শুনেছি রৌদ্র এসেছে । কোথায় ও ? এসেছি থেকে তো দেখলাম না ।
স্বাভাবিক প্রশ্ন ধরেই উত্তর করলেন রুবিনা কাবির….
” ও বেরিয়েছে একটু ।
” তা মেঘা , এতো গুলো বছর পর রৌদ্র কে দেখে কেমন লাগছে ? সেই তো তোমাকে বিয়ে করেই পাড়ি জমিয়েছিলো ঐ ছেলে ! পাঁচ বছর পেরোলো বোধহয় । এতো বছর শ্বশুর শ্বাশুড়ির অধীনে ছিলে । এখন তো স্বামী এসেছে , সম্পর্কটা কি এগোবে এবার ? তোমাদের মাঝে সব ঠিকঠাক তো ?
শাহিনা কাবির মেঘা কে এক পলক দেখে আনতারা বেগম কে আটকালেন আরো কিছু বলার আগেই…
” আহ্, ভাবি । কি বলছো বলতো ? এখন কি এসব কথা বলার সময় ? মেঘা , কি হয়েছে ? নিচে নামলি কেনো ? কিছু প্রয়োজন ?
মেঘা মলিন মুখে এগোয় সব উপেক্ষা করে । শাহিনা কাবিরের কাছ ঘেঁষে কন্ঠ খাদে নামিয়ে ভেজা গলায় বলে…

” আমার চেনটা খুঁজে পাওয়া যায় নি মনি ? ক্লিনার’রা তো চলে গেছে ! পায় নি তারাও ?
শাহিনা কাবির মেঘার মুখের উপর আলতো হাত ছুঁইয়ে বললেন….
” এখনো এটা নিয়ে মন খারাপ করে বসে আছিস ?
” তার মানে খুঁজে পাওয়া যায় নি ?
” যায় নি । তবে যাবে না তা তো নয় । কোথায় ফেলেছিস কে জানে ! এতো দিন হারালি না , এখন হঠাৎ হারালো তো হারালো , আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । এখন এই বিয়ের হাঙ্গামায় কোথায় খুঁজবো বল ? পুরো বাড়ি তো দেখা হয়েছে , পাওয়া যায় নি । তুইও এটা নিয়ে মন খারাপ করে বসে আছিস । এখন কি করবো আমি ?
মেঘা মলিন হাসলো । বললো বিষন্ন হয়ে….

” কিছু করতে হবে না মনি । আর খুঁজতে হবে না ।
পাশ‌ থেকে রুবিনা কাবির শক্ত কন্ঠে বললেন….
” ওকে বলে দাও আপা , আদ্রের বাবা নতুন একটা চেন গড়াতে দিয়েছেন ওর জন্য । আমাদের বাড়িতে যেহেতু হারিয়েছে , দায় তো আমাদেরই । একটা চেনই তো হারিয়েছে , এই নিয়ে অতো মুখ কালো করে থাকার কি আছে ?
” একটা চেনই ছিলো মামনি । ঐ একটাই ছিলো আমার মায়ের স্মৃতি ‌। মাকে তো পাই নি , তার স্মৃতি পেয়েছিলাম । ওটাও নেই এখন । জানো ,, আমার কাছে কিছুই থাকে না কখনো । সব শুধু হারায় । হারানোর শূন্যতায় একটু তো খারাপ লাগবেই । আর কি যেনো বললে , বাবা চেন গড়াতে দিয়েছে ? কেনো ? আমার জন্য ? ওসব আমার লাগবে না । একটার শূন্যতা আরেকটায় পূর্ণ হয় না মামনি । তোমরা কাজ করো । আমার জিনিস নিয়ে আর ভাবতে হবে না তোমাদের ।
মেঘা পিছু ফিরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো ‌। দূরে যেতেই ধমকানোর মতো করে রুবিনা কাবিরের উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে বললেন শাহিনা কাবির ….

” তুই সবসময় মেয়েটার সাথে এমন কড়া গলায় কথা বলিস কেনো হ্যাঁ ? কন্ঠ নরম হয় না ? জানিসই তো ঐ চেনটা ওর মায়ের শেষ স্মৃতি ছিলো । মায়া লাগে না ঐ এতিম মেয়েটা কে দেখলে ?
” মায়া লাগে দেখেই এতো গুলো বছর ও এ বাড়িতে পড়ে আছে আপা । মায়া না থাকলে জায়গা হতো না এ বাড়িতে !
” ও এমনি এমনি পড়ে নেই । পড়ে থাকার মূল্য দিয়ে তবেই পড়ে আছে । বিনামূল্যে জায়গা দিস নি ওকে । তোর ছেলের বউ হওয়ার ও কোনো সুবিধা দিস নি । আর না ও কোনো সুযোগ নিয়েছে । সবসময় এভাবে ছোট করে কথা বলবি না ওর সাথে ‌।

সন্ধ্যায় ছাদে উঠেছে মেঘা,শাফাহ্, আর শাফাহ্’র মামাতো বোন #সাবা । সাবা’র বয়স হবে সতোরো । এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে । সামনে ফাইনাল পরীক্ষা , পরীক্ষা ফেলে বিয়ে খেতে এসেছে ও ।
শুভ্রের বিয়ের জন্য মেঘা আর শাফাহ্ কত সখ করে নাচ তুলেছিলো । এখন মেঘা ম্রিয়মাণে সবটা ঘোলাটে হয়ে গেছে । তার উপর শাফাহ্’র পা ভাঙ্গা । পুরোপুরি ঠিক হয় নি এখনো । এই পায়ে ধেই ধেই করে নাচতে পারবে না সে । মেঘা কে ছাড়া একা একা উৎসাহ ও পাচ্ছে না । মেঘাও বিমর্ষ হয়ে গুটিয়ে আছে । এতো দিনের সব প্লান , আশা আকাঙ্ক্ষায় বালি চাপা পড়েছে ।
কাল হলুদের অনুষ্ঠান । হবে জাঁকজমকতা । গার্ডেনে ভেন্যু সাজানো হচ্ছে । ডেকরেশনের কাজ চলছে সেখানে । মেঘা রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে নিচে তাকিয়ে আছে । শাফাহ্ গান চালিয়ে আগে শিখে রাখা নাচ গুলো মলিন চোখে দেখলো একটু । ইশশ্ , এই নাচ গুলো কত কষ্টে আয়ত্ত করেছিলো , এখন আর নাচতে পারবে না । ক্ষণে ক্ষণে গাল ফুলিয়ে নাক টানছে শাফাহ্ ।

মেঘা মনযোগ দেয় নি ওদিকে । শাফাহ্ ফোন থেকে দৃষ্টি সরালো । মেঘা কে এমন বিষন্ন চিত্তে দেখেও শান্তি মিলছে না কিছুতেই । খচখচ লাগছে সর্বদা । না পারছে আনন্দ করতে , আর না পারছে এই মেয়ের মনে আনন্দ জাগাতে ।
শেষমেষ ফোন ছেড়ে মেঘার দিকে এগোলো সে । ওকে পেছন থেকে আলতো করে স্নেহাবেষ্টন করে বললো….
” মেঘা , আমার না তোকে এভাবে দেখে একটুও ভালো লাগছে না । হাসবি না তুই ? কাল থেকে তোকে এমন উদাস দেখছি । আর ভালো লাগছে না । প্লিজ মেঘা ‌, এবার একটু হাস । আমাদের সাথে বিয়েটা এনজয় কর । সেই কতদিন ধরে ভাইয়ার বিয়ের অপেক্ষায় আছি , এখন এই কারেন্ট মোমেন্টে এসে সব কিছুতে জল ঢেলে দিবি ? আমি তো অর্ধেক জল ঢেলেছি । বাকি টা তুই উপুড় করে ঢেলে দিচ্ছিস । বিয়েটা কেমন মরা মরা লাগছে…
একটু তরতাজা এনজয় না হলে চলে ?

” তুই এনজয় কর ।
” তোকে ছাড়া ভালো লাগছে না । কান্না পাচ্ছে আমার বিশ্বাস কর । এই মেঘা , এবার একটু নরমাল হ মা আমার । আমার পা ঠিক থাকলে তোকে এতক্ষণে নাচিয়ে ছাড়তাম । কিন্তু আমিই তো ঠিক নেই , নিজে নাচতে পারবো না , তোকে কি করে নাচাবো ?
মেঘা মৃদু হাসলো ।
শাফাহ্ চট করে হেসে বললো….
” এইতো , তুই হাসলে আদ্র ভাইয়া যেনো কি বলে ? উমমম , একদম আমার মেঘ বুড়ি ‌। চল আদ্র ভাইয়ার মেঘ বুড়ি , এবার নাচের স্টেপ গুলো শেষ বারের মতো মিলিয়ে নে । কালকে পারফর্ম করতে হবে তো ।
” তুই নাচবি ? পায়ের অবস্থা তো ভালো হয় নি এখনো ! পারফর্ম করতে পারবি ?
” আমি বাদ ,,, তুই তো আছিস ।
” আমি একা ? আচ্ছা , আদ্র ভাইয়া কোথায় ?
” বেরিয়েছে বোধহয় …
” মেইল পার্টনার লাগবে , বুঝলি ? তুই ও তো নেই । ভাইয়া কে নাচাবো কাল ।
শাফাহ্ চোখ বড় করে চমকে বললো..
” এহহহ্ , ভাইয়া ? আর নাচ ? হয়েছে , এসব চিন্তা বাদ দে । শুধুমাত্র বাড়ির ছেলে হলে আলাদা ব্যাপার ছিলো । কিন্তু , প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্র ? সে কিনা নাচবে ?

” হুম !
” সিরিয়াসলি , ভাইয়া কে চিনিস না ? ঐ মহাশয়ের রুপ একেকবার একেক রকম ‌। তবে নাচুনি রুপ তার ডিকশনারিতে আছে বলে মনে হয় না আমার । ভাইয়ার কথা ছাড় ।
” উঁহু , ছাড়বো না । ভাইয়া কে নাচিয়ে তবেই ছাড়বো !
” আর ইউ শিওর ?
” হান্ড্রেড পার্সেন্ট ।
” বাজি লাগাবি ? চল বাজি লাগাই ,,,
” আচ্ছা । আদ্র ভাইয়াকে যদি নাচাতে পারি , তাহলে আগামী এক সপ্তাহ তুই চকলেট ছুঁয়েও দেখতে পারবি না ।
” ওক্কে , আর যদি হেরে যাস , তাহলে আগামী এক সপ্তাহ আমাকে আনলিমিটেড চকলেট খাওয়াতে হবে ‌। আনলিমিটেড মানে আনলিমিটেড । যত খুশি তত ‌। বাঁধা ও দিতে পারবি না বলে রাখলাম ।
” ওকে ডান ।
সাবা সাক্ষী ।

রাতটুকু পেরিয়েছে কোনো রকমে ‌।
এ রাতে রৌদ্র বাড়ি ফেরে নি । সেই দুপুরের পর ঘর থেকে নেমেই বেরিয়ে গেছে । আর ফেরে নি । ফোন বন্ধ । খোঁজ পাওয়া যায়নি ।
বিয়ে বাড়ীতে ছেলে কে নিয়ে মন খুলে হুতাশ করতেও পারছেন না রুবিনা কাবির । তিনি ব্যাতীত কেউই তেমন চিন্তায় নেই । কেননা রৌদ্র কে সবার চেনা । ও ছেলে আগেও বাড়িতে থাকতোই বা ক’রাত ? এক রাত বাড়িতে কাটালেও সপ্তাহের বাকি ছয়টা রাত থাকতো বাইরে । এই বেঘরে , বেপরোয়া ছেলেকে নিয়ে যত চিন্তা সব রুবিনা কাবিরের । মা তো , মায়ের মনে সর্বদা খচখচানি রয়েই যায় ।
আজ এই দিনটায় সকলের ব্যস্ততা । শত পেরেশানি আজ । ছোটাছুটি শুরু হয়েছে এদিক ওদিক । বিকেলের দিকে কিছু ঝামেলা চুকিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো আদ্র । নিচে নেমে রুবিনা কাবির কে খুঁজে পাওয়া গেলো না ।
তাকে খুঁজতে খুঁজতে ঘরে উঠলো আবার । বাবা মায়ের দরজায় টোকা মেরে ঘরে ঢুকলো । আলমারি থেকে কাপড় বের করছেন রুবিনা কাবির । মুখ কালো তার ‌। আদ্র এগিয়ে বললো….

” আম্মু , তুমি রুমে ? আর আমি তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি ।
ঝাইঝাই করে বললেন রুবিনা কাবির…
” কি দরকার আমার সাথে ?
আম্মুর কন্ঠ তিরিক্ষি দেখে কপাল কুঁচকায় আদ্র । শুধোয় কারন…
” কি হয়েছে আম্মু ?
” কি আবার হবে ? এ বাড়িতে আমিই তো আলাদা ! আমার চিন্তা ধারা আলাদা । কারোর যাকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই , মাথা ব্যথা নেই , তাকে ঘিরেই আমার সব চিন্তা । কাল থেকে যে রৌদ্র বাড়ি ফেরে নি , এ বাড়ির কারোর খেয়াল আছে ? বিয়েতে মজেছে সকলে । আমার ছেলেটা বাড়িতে নেই , ফোন বন্ধ , কোথায় আছে না আছে , কারোর জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই । কোনো চিন্তা নেই আমার ছেলেকে নিয়ে । আমি তো মা , সবার মতো কই হতে পারলাম আমি ? ঠিকি তো ওর চিন্তা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আমায় ।
আদ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে । এটাই ধারনা ছিলো ওর । এজন্যই পরিস্থিতি বোঝার তাগিদে রুবিনা কাবির কে খুঁজছিলো সে । আদ্র এগিয়ে এসে আম্মু কে টেনে খাটে বসালো । নিজে বসলো সামনাসামনি । আম্মুর হাত দুটো ধরে বোঝানোর স্বরে বলল….

” তুমি রুডি কে চেনো না ? ও কেমন জানো না ? আজ নতুন দেখছো ওকে ? নাকি নতুন করে আবিষ্কার করছো ?
” রৌদ্র বদলেছে !
” কোথায় বদলেছে ?
” বদলেছে তো ! শুধু বদল দেখাচ্ছে না । ঐ মেয়েটা যদি এ বাড়িতে না থাকাতো , তাহলে এতো সব কিছু হতো না । যা হচ্ছে সব ওর জন্যই হচ্ছে । ওর জন্য রৌদ্র থাকছে না এ বাড়িতে । আর ওর জন্যই আবার ফিরে যাবে রৌদ্র । ও না থাকলে আর ফিরতো না । কিচ্ছু হতো না এসব ।
” এখানে মেঘ কে জড়াচ্ছো কেনো ?
” জড়াবো না তো কি ? ঐ মেয়ে কেই মাথায় তুলে রেখেছিস সকলে , আর আমার ছেলেকে পায়ে ঠেলছিস ওর জন্যই । ওকে দেখলেই রৌদ্র রেগে যায় ।
” ওকে কিন্তু রুডিই এনে ফেলেছিলো !
” তাই বলে এখনো ওকে আটকে রাখবি তোরা ? ওকে তাড়িয়ে দে না এ বাড়ি থেকে ! যেতে দে ওকে ।
” চলে তো যাবেই ।
” তাহলে সময় নষ্ট করছিস কেনো । পাঠিয়ে দে ওকে । আর তোর ভাইকে আটকা । কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না এই নিয়ে । শুনছে না আমার কথা ।

” সময় আসে নি এখনো । আর সেও আসে নি ওকে নিতে । সময় আসলে সে এসে নিয়ে যাবে ওকে । তখন তোমার ছেলে কি করে তাই দেখবো । আর একটা কথা বলি আম্মু , তোমার ছেলে বদলেছে ঠিকি । বদল দেখাচ্ছে না এটাও ঠিক । ও যতক্ষণ না বদল দেখাচ্ছে , ততক্ষণ ওর বদল এ বাড়ির কেউ নজরে নেবে না । তোমার ছেলে কে ধরা দিতে হবে আগে । ধরা পড়ে গেলে ওকে নিয়ে এভাবে চিন্তা করতে হবে না তোমায় । কি ভেবেছো তুমি ? আমি , আমরা , আমরা সবাই অন্ধ ? কিছু বুঝি না । তোমার ছেলে আর আমি এক নারিতে যুক্ত ছিলাম । তোমার ছেলেকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি । একটা কথা মিলিয়ে নিও , তোমার ছেলে কোত্থাও যাবে না আর । দেখে নিও । সে যাবে না , আর যেতেও দেবে না অন্য কাউকে । নিজের জিনিসের প্রতি আরেকটু টান আসুক , সে নিজেই আটকে যাবে , আর আটকাবেও ।

তুমি বেকার বেকার চিন্তা করছো । ওকে নিয়ে চিন্তা বাদ দাও । সুতোয় টান পড়লে ও নিজেই চলে আসবে । কাল থেকে তো ফেরে নি । এখন বিকেল গড়িয়েছে , দেখো , হয়তো আসছে তোমার ছেলে ।
রুবিনা কাবির বেশি গভীরে বুঝলেন না । ঝাঁপসা চোখে পানি ঝরার আগেই দুহাতের পিঠে চোখ মুছলেন ।
আদ্র কিছু একটা ভেবে ঠোঁট কামড়ে হাসলো ।
সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে চারদিকে । ঘনীভূত হচ্ছে আশপাশ । আজ বাড়ি ভরপুর । বাকি সব অতিথিদের আগমন ঘটেছে আজ । বিয়ের আমেজে উন্মাতাল কাবির ম্যানসন । গার্ডেনে হলুদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে ।
হুড়োহুড়ি পড়েছে পুরো বাড়িতে । একেক জন একেক দিকে ছুটছে । শুভ্র, আদ্র ওরা অলরেডি রেডি হয়ে বেরিয়ে গেছে বাইরে । মেয়েদের তৈরি হওয়া হয় নি এখনো ।

হলুদের জন্য ড্রেসাপে আলাদা থিম ধার্য করা হয়েছিলো । মেয়েদের কাঁচা সবুজ রঙের শাড়ি , আর শুভ্র ব্যতীত ছেলেদের একই রঙের পাঞ্জাবি । মোটামুটি সবার তৈরি হওয়া শেষ । টুকটুকির জন্য মেঘার লেট হয়েছে নিচে নামতে । এদিকে ওর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মেঘার ফোনে কল আসলো । ফোন রিসিভ করে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো সে ‌। ওর কথা বলার মাঝেই টুকটুকির রেডি হওয়া ডান । নিজের হয়েছে , আর এক মুহূর্ত ও অপেক্ষা করে নি ঐ মেয়ে । মেঘা যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে , এটা বেমালুম ভুলে গিয়ে ওকে ফেলেই নিচে নামলো হুড়মুড়িয়ে । বাড়ির সবাই এখন গার্ডেনে । মেঘার ফোনে কথা শেষ হতে হতেই মিনিট বিশেক পেরিয়েছে । ঘরে গিয়ে দেখে টুকটুকি ওকে একা ফেলেই চলে গেছে নিচে । ঘরে এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে দুদিকে মাথা নাড়ালো মেঘা । বেরোনোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়ালো আবার ।

নিজেকে সম্পূর্ণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিলো । মেঘা উজ্জ্বল ফর্সা । টুকটুকে তার গায়ের রং । সাজগোজ করে নি সেভাবে । হালকা সেজেছে । কাঁচা সবুজ রঙের শাড়িটা মেয়েটার শুভ্রসমুজ্জ্বল শরীরে মাখনের ন্যায় মিশে গেছে । মাঝ বরাবর সিঁথি করে চুল খোলা । সিঁথিতে একখানা চিকন কূটু টিকলি ব্যাতীত অন্য অলংকার নেই পড়নে । গর্জিয়াসে বেমানান হলেও , মেঘার হালকা সাজগোজে এটাই মানানসই । ঠোঁটে একটু গোলাপি ঠোঁট রঞ্জন । চোখে কাজল পড়ে না মেঘা , আজ একটু পড়েছে চিকন করে । এই তার সাজগোজ । অমায়িক সুন্দর মেয়েটাকে এতেই শুভ্র লাগছে বড্ড । একেবারেই অনিন্দ্য সুন্দর কাঞ্চনপ্রভা অপরুপা । মেঘা নিজেকে দেখে নিয়ে মুচকি হাসলো । পরমুহূর্তে কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফেললো । খোলা চুলে মানাচ্ছে না বোধহয় । সম্পুর্ন শরীর তো চুল দিয়েই ঢেকে গেছে । হাঁটু ছাড়িয়ে ঢেউ খাচ্ছে দীঘল কেশ গুচ্ছ । মেঘা কি একটা ভেবে চুল গুলো পেঁচিয়ে নিলো । বাঁধলো একটা আলগা খোঁপা । মুক্ত কেশীর আলগা খোঁপা টা আলগোছে স্থান পেলো গলদেশের নিকট । একটা কাঁটা আটকালো খোঁপা টায় । আলগা খোঁপার বাঁধন চিরে একটু আধটু খুচরো চুল নেমেছে কপালের পাশ গলিয়ে গ্রীবা নীড়ে ।

এবার ঠিক লাগছে ‌। গরমে ওভাবে চুল খুলে রাখাটা দায় হয়ে পড়বে । মেঘা শেষ বার পরিমার্জিত হয়ে নিজেকে দেখলো । অতঃপর তড়িঘড়ি করে বেরোলো বাইরে । সিঁড়ির দিকে এগোনোর পথে করিডোরের শেষ প্রান্তে মুখোমুখি রুডভিক কাবির রৌদ্র । রৌদ্র উঠছিলো উপরে । কালকের পর এই এখন বাড়ি ফিরলো । অবস্থা কালকের ন্যায় । শরীর টা খানিক এলোমেলো । অগোছালো চুল । মুখ শুকনো । মেঘার সাথে শুরুতেই চোখাচোখি হলো তার । সেকেন্ড কয়েক মেঘা মূর্ত রাখলো দৃষ্টি । পরক্ষনে দৃষ্টি নামালো । তবে রৌদ্রের মাঝে ক্ষণিকের পরিবর্তন ও দেখা গেলো না । আর না পলক পড়লো আঁখি দ্বয়ে ।
হীম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে । দেখে মনে হয় অনুভূতিহীন হয়ে তাকিয়ে আছে , তবে তা বোধহয় নয় । আকুল অনুভূতিতে তাকিয়ে আছে এক জোড়া স্তব্ধ দৃষ্টি । মেঘা নীরবে পাশ কাটিয়ে পা এগোতে গেলে রৌদ্র ডাকলো খানিক ….

” এইই শোন !!
মেঘা দাঁড়ায় । ফিরে চায় লোকটার দিকে । রৌদ্রের চাহনিতে পরিবর্তন নেই । ঘাড় বাঁকিয়ে আবার তাকায় মেঘার দিকে । চেয়ে থেকে সময় পার করে বলে….
” শাড়ি পড়তে কে বলেছে তোকে ?
মুখ কুঁচকে উত্তর করলো মেঘা….
” কে আবার বলবে ? ইচ্ছে হয়েছে তাই পড়েছি !
” যা ইচ্ছে তাই করবি ?
” করবো ?
রৌদ্র বোধহয় রাগলো না । মুখে মুখে তর্ক করার জন্য এতক্ষণে রেগে যাওয়ার কথা । তবে হিতে বিপরীত । শীতল চোখে চেয়েই এক পা এগোলো মেঘার দিকে । হাত বাড়িয়ে টান মেরে খোঁপার কাঁটা টা খুলে দিলো ‌‌। ঝরঝরে করে মেঘ কন্যার মেঘ বরন চুল গুলো এলোমেলো হয়ে ছাড়িয়ে পড়লো ছিপছিপে শরীরে দোল খেয়ে । মেঘা অগত্যা বিরক্ত হলো । চোখ কুঁচকে তাকালো । ধীরুজ স্বরে বলল রৌদ্র…..
” ইটস্ মাই চয়েস । যা এখন….

শুভ্রর গালে মুখে হলুদ ছোঁয়ানো হয়েছে আলতো করে । স্টেজে বসে আছে সে । মেঘা সেই তখন থেকে আদ্র কে খুঁজছে । অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো তাকে । গেইট পেরিয়ে কানে ফোন গুঁজে কথা বলতে বলতে ভেতরে আসছে আদ্র । মেঘা চিকচিক করে উঠলো । এক গাল হেসে শাড়ির কুচি সামলে তেড়ে গেলো আদ্রের দিকে । মুখোমুখি দাঁড়াতেই পা থামালো আদ্র । ফোনে কথা শেষ করে কান থেকে ফোন নামালো । মেঘাকে আগাগোড়া পরখ করে ভ্রু নাচিয়ে বোঝালো…..
” কি হয়েছে ?
মেঘা আমতা আমতা করলো ,
” একটা আবদার করবো , রাখবে ?
” কি ?
” উইল ইউ বি মাই ডান্স পার্টনার ? প্লিজ ভাইয়া ,, শুধু একটা বার ।
আদ্র বুঝে উঠে রাগ দেখিয়ে বললো….
” কিসের নাচানাচি ? কোনো নাচগান হবে না । যেমন চলছে তেমনই থাক ।
” না ভাইয়া , তুমি বুঝতে পারছো না । নাচগান না হলে বিয়ে বাড়ির কোনো ফিলিং আসে নাকি ? কেমন তেজপাতা হয়ে আছে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট ।

” হোক , যা এখান থেকে । এতো গুলো মানুষের সামনে নাচবি তুই ?
” তুমি সহ ।
” আমি ওসবে নেই ।
” ভাইয়া প্লিজজজ , দেখো, টুকটুকি আমার সাথে বাজি ধরেছে – তুমি আমার সাথে পারফর্ম করলে ও আগামী এক সপ্তাহ চকলেট ছুঁয়েও দেখবে না । আর এমনিতেও মুড খারাপ দুদিন থেকে । একটু মুডে আসতে চাইছি । প্লিজ না করো না…
মেঘার কথা শেষ হতেই সিরাতের আগমন । পিছন থেকে বলে উঠলো সে …..
” মেয়েটা কত করে বলছে , শুনছিস না কেনো ? আশপাশ চেয়ে দেখ তো ,এটা কোন দিক দিয়ে বিয়ে বাড়ি মনে হচ্ছে ? বিয়ে বাড়ীতে একটু নাচ গান না হলে চলে ? কে আছে তোরা ছাড়া ? আরেকটা তো পা মচকে বসে আছে । ও থাকলে মেঘা তোকে জোর করতো ? একটা পারফর্ম করেই দেখা….
আদ্র অবিশ্বাসে বললো সচকিতে….

” আপু , তুমিও ?
সিরাত এগোয় । মিটিমিটি হেসে বাড়ির সদরের দিকে চোখ ইশারা করে । বলে…
” হুম , আমিও ।
ইশারা অনুযায়ী সামনে তাকাতেই রৌদ্র কে দেখলো আদ্র । বাড়ি থেকে সবে বেরিয়েছে সে । সটান হয়ে গার্ডেনের দিকে এগোচ্ছে । আদ্র এক পলক চেয়েই পরক্ষনে মৃদু হাসলো ওষ্ঠ পিষে । সিরাতের দিকে চাইতেই আবারো হাসলো দু ভাই বোন ।
আদ্র গলা খাঁকারি দিয়ে এক মুহুর্ত না ভেবে বললো সায় দিয়ে….
” চল মেঘ….
নেচে দেখাই,, সবাইকে আর সাথে কাউকে ।
মেঘা হকচকিয়ে গেলো । যে ছেলে এতক্ষণ খুট গেড়ে ছিলো , সে এখন এক কথায় রাজি হয়ে গেলো ? এমনকি মেঘার হাত টেনে স্টেজের দিকে এগোলো পর্যন্ত । মেঘা যেতে যেতে বললো সন্দিহান হয়ে…

” ভাইয়া , তোমাকে কি ভুত ধরলো ? হঠাৎ রাজি হয়ে গেলে যে ?
” অন্যের মাথায় ভুত চাপাবো এবার , চল….
পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললো সিরাত….
” আমি গান চালিয়ে দিচ্ছি , তোরা যা….
শুভ্রের ইশারায় স্টেজে উঠেছে রৌদ্র । হাসার চেষ্টা করে টুকটাক কথা বললো । এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে আবার । বিয়ে বাড়িতে অনেকের চোখ এখন রৌদ্রের দিকে । একেক জন একেক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে । যদিও তারা মেহমান , কানাঘুষো করছে হয়তো । রৌদ্র এখানে থাকলে একটা বিপত্তি বাঁধিয়ে ফেলবে নিশ্চিত । পাঁচ বছর আগে এই রকমই একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে বিপত্তি বাঁধানোর জন্য তোফায়েল কাবির ছেলের গায়ে হাত তুলেছিলেন পুরো বিয়ে বাড়ির সবার সামনে । রৌদ্র ভোলে নি । আর এখন সেরকম কিছু হোক, সেটা চায় না ও । আর না সবার সামনে নিজেকে বাধ্য প্রমাণ করতে চায় ।
শুভ্র ওকে আটকানোর চেষ্টা করেও পারলো না । কোনো দিকে না তাকিয়ে স্টেজ থেকে নেমে পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বাইরের দিকে এগোলো রৌদ্র । অমনি পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো সিরাত , অলরেডি সাউন্ড বক্সে গান চালিয়ে দিয়েছে । গান চালানোর সাথে সাথে সমস্বরে একটা চিৎকার ভেসে আসলো স্টেজের দিক থেকে । রৌদ্র পাত্তা না দিলেও সিরাতের মুখোমুখি হয়েই থমকালো । মেকি হেসে বললো সিরাত….

” রৌদ্র , কোথায় যাচ্ছিস আজ , এই মুহূর্তে ?
গানের আওয়াজে বিরক্ত হলো রৌদ্র । খিটখিটে স্বরে বলল…..
” বেরোচ্ছি আমি ।
” আরে , যাচ্ছিস টা কোথায় ? আচ্ছা যা , পরে কথা বলছি । আদ্র আর মেঘার পারফর্ম শুরু হয়ে গেছে, মেবি । আমি যাই ওদিকটায়…..
সিরাত এক মুহুর্ত সময় পার করল না ।
রৌদ্রের কপাল গুটিয়ে আসলো আপনা আপনি । কান খাড়া করলো , বোঝার চেষ্টা করলো কথাটার অর্থ । গানের তালে সবার চেঁচামেচি শুনে পথ পাল্টে পা ঘুরিয়ে আবার স্টেজের দিকে এগোলো সে । সাউন্ড বক্সে ফুল সাউন্ডে গান বাজছে….

“ Andar kitni garmi hai , Bahar kitni Sardi hai ,,
Tune bedardi Meri , Halat kaise kardi hai ..
Dil mei basa le , Apnar bana le , Yoon na badha
Meri uljhan …
Tu Mera tu Mera , tu Mera tu Mera, tu Mera hero no.1……
স্টেজে দুজন নৃত্যরত ।
আদ্রের জীবনে প্রথম পারফরম্যান্স । জীবনে এর আগে নাচে নি কখনো । মেঘাও আচমকা এমন গানের সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে । সিরাত কি চালালো এটা ? এক পর্যায়ে নিজেকে সামলে আদ্র কে টেনে নিয়েছে নিজের দিকে । গানের সাথে হাত তালি পড়ছে ক্ষণে ক্ষণে । হাস্যোজ্জ্বল মুখে চেয়ে আছে সকলে । এতোক্ষণে আমেজ জেগেছে । শাফাহ্ আর শুভ্র, আদ্র কে দেখে চরম অবাক । সাথে বাড়ির বাকিরা সবাই ।
একমাত্র ক্ষুব্ধ রৌদ্র । সকলের পেছনে দাঁড়িয়ে সে চেয়ে আছে অগ্নি দৃষ্টিতে । এতক্ষণে মুঠোফোন টার দফারফা হয়ে গেছে হাতের মুঠোয় । নাচের স্টেপের সাথে নিজের ভাই আর মেঘার মুখে উপচে পড়া হাসির ভিড়ে তড়তড়িয়ে রাগ বাড়লো আরো । শক্ত থেকে শক্ততর হলো চোয়াল । বিড়বিড় করলো দন্ত পিষে….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৩

” ইভারা ‌, আই ওন্ট স্পেয়ার ইউ ইডিয়ট….
ক্রোধে ওষ্ঠ দংশন করে নিজেকে এক মুহুর্ত সামলে নিলেও পরক্ষনে আর পারলো না । স্টেপ মেলাতে গিয়ে এক পর্যায়ে আদ্র মেঘার হাত ধরতেই আর সংযত রইলো না বেপরোয়া রৌদ্র । চোয়াল খিচে সবাইকে উপেক্ষা করে দম্ভভরে পা চালিয়ে তেড়ে গেলো স্টেজের দিকে । আদ্র মেঘা কে ঘুরিয়ে আবারো নিজের দখলে নেওয়ার আগেই মেঘা কে টেনে ধরলো রৌদ্র । হেঁচকা টানে এনে ফেললো আপন সন্নিকটে । মেঘা হুবড়ি খেয়ে রৌদ্রের বুকে এসে আছড়ে পড়লো । নিমিষেই ভড়কালো সকলে । আদ্র ঝাড়া মেরে এক পাশে দাঁড়ালো । চমকানোর অভিব্যক্তি প্রকাশ করলো নিজের মাঝেও । বন্ধ হলো গান । সব থেমে স্তব্ধ হলো পুরো গার্ডেন । মেঘা ভয় গিলে মুখ তুলতেই রৌদ্র ক্রোধিত চাপা অনলে ধমকালো…..
” ইউ ইডিয়ট , তেরা হিরো ইধার হেয়য়য়….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৫