Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩
সুরভী আক্তার

রৌদ্রকে হসপিটাল থেকে ছাড়া হবে না এতো সহজে । কিন্তু সেই ছেলে থাকবে না হসপিটালে । তার ভাষ্যমতে এখানে থাকলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যাবে সে ‌। বরাবর সে অবাধ্য । তাকে রুখতে পারে কার সাধ্যি ? এবারও পারলো না কেউ । বিকেল হতে না হতেই সব গুটিয়ে বাড়ি ফিরেছে অবাধ্য যুবক ।
রৌদ্রের অবস্থার কথা শুনে শিকদার বাড়ি থেকে ওকে দেখতে সবাই এসেছিলেন হসপিটালে । সারা সেদিক থেকে কাবির ম্যানশনে এসেছে মেঘার জোরাজুরিতে । এখন সন্ধ্যা । ইয়াশ এ বাড়িতেই আছে গত পরশু থেকে । ছেলেটার শরীরের অবস্থাও ভালো নয় খুব একটা । শাহিনা কাবির ওর দেখভালে বেশ তদারকি চালাচ্ছেন । মোদ্দা কথা মেঘার মতো করে ইয়াশকে দেখলেও মায়া লাগে ভীষণ । সন্ধ্যায় টুকটাক খাওয়া দাওয়া হয়েছে সবার । ছেলেটা নিচে নামে নি । তিনি এক কাপ কফি বানিয়ে বেরোলেন কিচেন থেকে । ড্রইং রুমে শাফাহ্ ক্যাটবেরি খাচ্ছে আর ফোন ঘাটছে । সারা আর শিশির ও আছে । তবে ওরা হাতের কাজে ব্যাস্ত কিছুটা । মটরশুটির খোসা ছাড়াচ্ছে দুই রমনী । সাথে গল্প গুজব করছে নিজেদের মাঝে ।
শাহিনা কাবির শাফাহ্ কে ফাঁকা পেয়ে বললেন আদেশের সুরে…..

” শাফাহ্ ,, এই কফিটা মেঘার ভাইয়াকে দিয়ে আয় তো । ছেলেটা সেই দুপুরের পর থেকে কিচ্ছুটি খায় নি আর । ওদের তো আবার কফি খাওয়ার স্বভাব সময়ে অসময়ে । দিয়ে আয় এটা ।
শাফাহ্ বিরক্ত হলো চরম । চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো । মুখের উপর বাঁধ সাধলো…..
” পারবো না আমি ।
নিজেও বিব্রত হলেন ভদ্রমহিলা । রাগলেন কিছুটা,,
” পারবি না কেনো ? এমনি তো বসে আছিস । কাজ বাজ কিছু আছে তোর ? যা দিয়ে আয় বলছি…..
সিঁড়ির দিক থেকে একখানা ঠান্ডা পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসলো ভদ্রমহিলার কথা শেষ হতেই…..
” ওকে বকছো কেনো আন্টি ?
চকিতে তাকালেন শাহিনা কাবির । শুভ্র আর সায়ান পাশাপাশি । ছেলেটাও এসেছে সন্ধার দিকে । ওকে দেখে হাঁফ ছাড়লেন শাহিনা কাবির……

” বকছি কি আর সাধে ? একটা কথা যদি শোনে ও আমার ! কি করবো আমি এই অবাধ্য মেয়েকে নিয়ে ?
সায়ান মৃদু হাসলো । নেমে এসে বসতে বসতে বলল…..
” তোমাকে কিছু করতে হবে না । আমি আছি তো । এবার বলো, কোন কথা শুনছে না ও ? কি হয়েছে কিউটিপাই ? আন্টির কথা শুনছিস না কেনো ?
শাফাহ্ নড়েচড়ে বসল । আহ্লাদী সুরে বললো…..
” সব কথা তো শুনি । কিন্তু এটা শুনতে পারবো না । আম্মু মেঘার ভাইয়াকে কফি দিয়ে আসতে বলেছে । পারবো না এটা করতে । ঐ লোক খালি ধমকায় আমায় ।
সায়ান চোখ কুঁচকে ফেললো । শাহিনা কাবিরের দেওয়া কাজটা তারও পছন্দ হলো না খুব একটা । যদিও সে ইয়াশ কে চেনে না খুব বেশি ।
শাফাহ্’র সাথে তাল মেলাতে চাইলো । তার আগেই সারা বলে উঠলো অবিশ্বাস্য স্বরে……

” কি বলছো শাফাহ্ , ইয়াশ ভাইয়া তোমায় ধমকায় ? উনি তো খুব শান্ত স্বভাবের । আর তোমাকে কি না ধমকায় ?
” হ্যাঁ , সত্যিই বলছি আমি ।
বিশ্বাস না হলে করো না । কিন্তু আমি ওনাকে কফি দিয়ে আসতে পারবো না,ব্যস ।
শাফাহ্’র জেদে প্রশন্য হয় সায়ান । হাসে নীরবে ।
সারা হাতের কাজ ফেলে উঠে দাঁড়ায় ।
” আমায় দাও আন্টি , আমি দিয়ে আসছি ।
শাহিনা কাবির দ্বিমত না করে ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন । শাফাহ্’র দিকে তাকিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন ।
শাফাহ্ ভেংচি কাটে তাকে । শুভ্র এসে বোনের পাশে বসে । আচমকা বলে…..
” টুকটুকি ,, একটা প্লান করেছি । শুনবি ?
” কি প্লান ?
” আচ্ছা ওয়েট,,
শিশির আদ্র কোথায় ?
শিশির হাতের কাজ ফেলে চকিতে উত্তর করলো…..
” উনি তো বেরিয়েছেন একটু ।

” তাহলে তুমি শোনো , বিয়ের পর তোমরা ঘুরতে যাওনি কোথাও । আমাদের ও যাওয়া হয় নি । মেহের খিটখিটে হয়ে আছে এই নিয়ে । এ সময় রৌদ্র আর মেঘার রিলেশন টাও নর্মাল হয়ে এসেছে ।
তাই ভাবছি কোথাও একটা থেকে ঘুরে আসি সবাই মিলে । শীত তো শেষ হতে চলেছে । ঠান্ডা আর গরমের মিশ্রণে ওয়েদারটা বেশ ভালো । কোথায় যাওয়া যায় বলতো ? বান্দরবান গেলে কেমন হয় ?
শাফাহ্ চিকচিক করে লাফিয়ে উঠলো ।
” খুব ভালো হয় ভাইয়া । ইশশ্ , কতদিন ঘুরতে যাওয়া হয় না । ট্যুরে তো একেবারেই না । আর আমি পাহাড়েও যাই নি কোনো দিন । এবার যাই প্লিজ । ওখানেই যাবো । কবে যাবে বলো ?
” এহহ্, এসেছে গাব্বু ।
তোকে কে নিয়ে যাবে ! আমরা তো কাপল’রা মিলে যাবো । তোকে ভেন্ডি ব্যাগ হিসেবে সাথে নেবো কেনো ? রৌদ্র আর মেঘা সহ আমরা ছয়জন যাচ্ছি শুধু ।
মেয়েটা আহত হয় । চুপসে আসে মুখখানা । একটা কুশন ছুড়ে মারে ভাইয়ার দিকে…..

” এহহহ্ ,,, যাবো আমি ।
” তাহলে বিয়ে কর । তোর হাসবেন্ড নিয়ে যাবে তোকে ।
” ভাইয়া , ভালো হচ্ছে না কিন্তু । আম্মু , তোমার ছেলেকে ভালো হতে বলো ।
চেঁচালো মেয়েটা । সায়ান মৃদু হাসলো দু’টোর কান্ডে ।
” শুভ্র , জ্বালাচ্ছিস কেনো ওকে ?
কিউটিটাই ,,,, আমরা সবাই মিলে যাবো ঘুরতে । শুভ্রর কথায় কান দিস না । ও নিয়ে না গেলেও আমি সাথে নিয়ে যাবো তোকে ।
” তোকে সাথে নেবে কে শুনি ? তুই কোন দিক থেকে নিজেকে মিঙ্গেল ভাবিস ? বললাম তো, আমরা কাপলরা যাবো শুধু । তুইও বিয়ে কর । তারপর বউ নিয়ে চল আমাদের সাথে । নয়তো আরেকটা অফার দিচ্ছি , ক্যামেরা ম্যান হতে পারিস আমাদের !
শুভ্রর খোঁচা সহ্য হলো না সায়ানের । এই ছেলে ইচ্ছে করে জ্বালাচ্ছে সব জেনে বুঝে । দেখো, হাসছে মিটিমিটি ।
দিন কয়েক হলো এতো সবের মাঝে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সবার অগোচরে । পরশু সায়ানের মা-বাবা আসবে এ বাড়িতে । কেনো আসবে, তা সবার জানা । অবশেষে ছেলের ধৈর্য ফুরিয়েছে । সে চায় কিছু একটা, কাউকে একটা ।
শুভ্র আর শাফাহ্’র কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে । সায়ান থামালো দুটোকে । শুভ্রকে টেনে দাঁড় করালো । ঘাড় ধাক্কে সদরের দিকে ঠেলে দিয়ে শাফাহ্’র দিকে ফিরলো । বললো হাসি সমেত……
” মাই বাডি,,,, আসছি ! কাল বাদ আবার আসবো, ওকে ? টেক কেয়ার ।
হাসলো রমনী ।
” ফুল নিয়ে আসবে কিন্তু !
” উঁহু , ফুল নিতে আসবো । আমার ফুল ।

করাঘাত করে কফির মগ সমেত ঘরে ঢুকলো সারা । অমনি নাকে একটা বিদঘুটে গন্ধ ঠেকলো । যেটা আসছে ব্যলকনি থেকে । সারা গলা বাড়িয়ে উঁকি দেওয়ার আগেই গটগট পায়ে ঘরে আসলো ইয়াশ । এতে কিছুটা ভড়কায় রমনী । আকস্মিক নিজের কামরায় সারাকে দেখে যুবক হাসার চেষ্টা করে বলে….
” তুমি ? কিছু বলবে ?
মেয়েটা কফির মগ বাড়িয়ে দিয়ে আমতা আমতা করলো…..
” আ… আপনার কফি ?
মুচকি হাসলো ইয়াশ ।
” রেখে যাও ।
ডিভানের এক পাশে মগটা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সারা । ঢোক গিললো , মুখ ফসকে বলে বসলো…..
” আপনি সিগারেট খান , ভাইয়া ? স্মেল পেলাম ।
” হু , খাই ।

লোকটার এমন সহজ স্বীকারোক্তিতে সারা অবাক হলো ভীষণ । চোখে মুখে অন্ধকার নামলো । তার জানা আর চেনা মতে ইয়াশ খুব ভালো ছেলে । প্রশংসা করেও শেষ হওয়ার নয় । ও এসব সিগারেট খায় জানা ছিলো না । মেয়েটা চিবুক নামালো । প্রশ্ন করলো ইয়াশ…..
” আর কিছু বলবে ?
” হু ,, না ! মানে , আপনি চলে যাবেন কাল ?
গলা কাঁপলো প্রশ্ন করতে গিয়ে । লোকটা উত্তরে সময় নেয়…..
” না , একদিন পর ! ডেট পিছিয়েছি ।
” ওওও ‌‌। হঠাৎ পেছালেন কেনো ?
” এমনি , মনে হলো আরেকটা দিন থাকা উচিত !
” কবে আসবেন আবার ?
” হয়তো কখনো না ।
মেয়েটার মুখখানা মলিন হয়ে আসলো । নিভে এলো কন্ঠ….
” সত্যিই আর আসবেন না ?
” এসে কি করবো ?
” কিছু ফেলে যাচ্ছেন না তো ?

” না তো , কি ফেলে যাচ্ছি বলতো ? মেঘার কথা বলছো ? ও তো আর আমার বোন নেই । অন্যের বউ এখন । ওকে নিয়ে টানাটানি করবো না ভেবেছি । ফিরবোও না । ফেরারি হওয়ার ইচ্ছে নেই আর ।
ইয়াশ কফির মগ তুলে নিয়ে চুমুক বসায় । তা দেখে মেয়েটা হাসে অদ্ভুত নির্মম ।
” আপনার বয়স হয়েছে ভাইয়া । বিয়ে করবেন না ? ছোট বেলা থেকেই আপনার বউকে দেখার খুব ইচ্ছে আমার ।
ইয়াশ ও হাসলো তাল মিলিয়ে ।
” আচ্ছা ,, আমার বউকে দেখবে ? যদি কোনোদিন বিয়ে করি , তাহলে দেখে নিও ।
পিছু ফিরলো সারা । আর কিছু বলার নেই । বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো । কি সব উটকো অনুভূতি জমিয়েছে মনে । বছরের পর বছর ধরে এসব জমে জমে পাহাড় হয়েছে । এসবের মানে হয় কোনো ? ইয়াশ কে ? কেনো এনাকে নিয়ে অযথা ভাবে এই অবাধ্য মন ? এর তো মানে নেই কোনো । লোকটা চলে গেলে আর ফিরবে না । অবশ্য না ফেরার সম্ভাবনাই বেশি । ফেরার তো হেতু নেই মেঘা ব্যাতীত । সারা আর কে ? বাঁচে কোন অহেতুক আশায় ?

রাতের খাবারের পর ইয়াশের কাছে যেতে চাইলো মেঘা । কিন্তু আর যাওয়া হলো না । দূর্বলতার বাহানায় বিশ্বাস করতে গিয়ে এখনো অবধি রৌদ্রের কাছ থেকে ছাড়া পায়নি সে । ডিনার ও খাইয়েছে হাতে তুলে ।
যেইনা লোকটার চোখের আড়াল হতে চায় , সেই তখনই ডাকাডাকি পড়ে যায় । একবিংশী ভারী বিড়ম্বনায় পড়েছে এতে । লোকটা তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল করছে না । রাতের কিছু মেডিসিন ছিলো । ইয়াশ কে ডেকে সবটা বুঝিয়ে নিয়েছে মেঘা । ইয়াশ বেরোতেই পিছু পিছু বেরোতে চাইলো , কিন্তু পারলো না রৌদ্রের যন্ত্রণায় । সে লোক দশটা বাজতে না বাজতেই দরজায় খিল মেরেছে ।
দূর্বল শরীর টেনে কাঁচুমাচু হয়ে এখন বসে আছে বিছানার উপর । মেঘা কোমরে হাত ঠেসে চোখ সরু করে তাকে অবলোকন করলো । অতঃপর চাপা স্বরে বিড়বিড় করতে করতে ঢুকলো ওয়াশ রুমে । ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আয়নার সামনে বসে হেয়ার ব্রাশ তুললো হাতে । চুলে লাগানোর আগেই মিটিমিটি স্বরে ডাকলো রৌদ্র……

” ইভারা ,, কাছে এসো তো ।
মেঘা পাত্তা দিলো না । জব্দ করে ছাড়ছে লোকটা । সে না তাকিয়ে ভারী গলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লো…..
” আবার কি হয়েছে রাইনো মুখো ? জ্বালাচ্ছেন খুব আমায় !
” কাছে এসো, ঘুমোনোর আগে আরেকটু জ্বালাবো । বেশি নয় , খুব অল্প ।
তৎক্ষণাৎ ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ সরু করলো মেঘা । রৌদ্র হাত নাড়িয়ে বোঝায়…..
” এইই ইডিয়ট , যা ভাবছো তা নয় ‌। খালি উল্টোপাল্টা চিন্তা , তাই না ? এসো , দরকার আছে ।
হাঁফ ছেড়ে উঠলো মেঘা । বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুটিয়ে বললো…..
” কি হয়েছে ?
রৌদ্র ওকে টেনে পাশে বসায় । মেয়েটার হাত থেকে হেয়ার ব্রাশ ছিনিয়ে নেয় । অতঃপর রমনীর ছিমছাম কোমর টেনে নিজের বুকের সাথে হেলান দিয়ে বসায় ভালোমতো । চকিতে ঘাড় ঘোরায় মেঘা । ভ্রু নাচায় । চুলের ভাঁজে চিরুনি চালাতে চালাতে বলে রৌদ্র……

” আমি করে দিচ্ছি ! তুমি শুধু অনুভব করো ।
” আমি পারতাম করতে ।
” জানি পারতে । কিন্তু আমি তোমার যত্ন নিতে চাই । খুব বেশি যত্ন নিতে চাই । যত্নে যত্নে আমার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে চাই । বোঝাতে চাই আমি কতটা ভালোবাসি তোমায় । তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার নিখাদ প্রকাশ হোক প্রতিটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্ষনে । আমার যত্নে ভরে উঠুক তোমার নারী সত্ত্বা । সিক্ত হও তুমি ‌। আমি তোমার এতোটা যত্ন নিতে চাই, যতটা যত্ন পেলে আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা তো দূর , আমাকে ছেড়ে এক মুহুর্ত অতিবাহিত করার চিন্তাও ঘুনাক্ষরে আসবে না তোমার মনে ।
মেঘা মূক বনে শুনে গেলো । লোকটা পাগল ! তবে ওর জন্যই সেটা । এটাই বুঝলো । ভরা গালে হাসলো মৃদুভাষী কন্যা । পিঠ মিশিয়ে নিলো লোকটার সুঠাম বুকের সাথে । বললো ঠান্ডা হয়ে……
” বিনুনি গেঁথে দিন !
” ভুল বোঝাবুঝি মিটেছে ?
” ভুলে গেছি !

” ভুলে যাওয়া কোনো কিছু একদিন না একদিন মনে পড়ে আচমকা । আমি চাই না আর কখনো মনে পড়ুক । বরং চাই তুমি সবটা মুছে ফেলো মন থেকে । আমি তোমায় ঠকাই নি ইভারা । বিশ্বাস করো , যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম , সেদিন কিছু একটা তো হয়েছিলো আমার সাথে ‌। বুঝে গেছিলাম , চলবে না তোমায় ছাড়া । পরে বুঝলাম , এটাকে বোধহয় ভালোবাসা বলে ‌। আর এর চক্করেই ফেঁসে গেলাম । ইয়াশের সাথে আমার সম্পর্কটা খুব একটা ভালো ছিলো না । জানতাম ও এসবে বাগড়া দেবে । কিন্তু যখন ইয়াশ চলে গেলো , তখন আমি খুব খুশি হয়েছিলাম বিশ্বাস করো । মনে হয়েছিলো তোমায় পেয়ে যাবো ‌। কিন্তু ভয় হতো , তুমি কিভাবে গ্রহণ করবে আমায় ? মানবে না তো । যদি চিনতে পারো আমায় , তাহলে তো ভয় পাবে । ভুল বুঝবে, পালাবে আমার থেকে । তাই তোমার সামনেও যাইনি কখনো । আড়ালে থেকেছি । যখন সামনে আসলাম দ্বিতীয় বার , তখন তুমি চিনলে না আমায় । সেদিন বোধহয় টিউশন থেকে শিকদার বাড়িতে গেছিলে , সেবার দ্বিতীয় বার ধরা দিলাম তোমার চোখের সামনে । কিন্তু তুমি চিনলে না আমায় । সেদিন আমার কতটা আনন্দ হয়েছিলো জানো ? সেদিনি বাড়ি এসে বলেছিলাম আমি বিয়ে করবো । কিন্তু বাড়ির সবাই উল্টো বুঝলো । ইভা আর ইভারা কে গুলিয়ে ফেললো । আর আমি পাগল নেশার ঘোরে সবাইকে কি বুঝিয়েছি কে জানে । সবাই ভাবলো আমি ইভা কে বিয়ে করতে চাই । আর সেই অনুযায়ী ইভার বিয়ের সম্বোধন টাও ভেঙ্গে দেওয়া হলো ।

আমার ইভারা কে চিনলো না কেউ । এদিকে ইভারাও তখন খুব ছোট । সে কি বিয়ে করতো আমায় ? করতো না তো ! তাই মেনে নিলাম সবার কথা , অনেক কৌশল করে ইভা কে ভাগালাম আসর থেকে । সেই আসরে যখন তোমায় খুঁজলাম , পেলাম না । ততক্ষণে তুমি বেরিয়ে এসেছো । রাগ উঠলো তখন । মদ গেলার পর ভাঙচুর করলাম । বখাটে ছিলাম তো তখন , কোনো কিছুর পরোয়া আসতো না ।
তোফায়েল কাবির চড় মেরেছিলেন আমায় , খুব রাগ উঠেছিলো তখন ‌। আর সেই রাগ ঝেড়েছি তোমার উপর ‌। রাস্তার ধারে আবার তোমায় খুঁজে পেয়ে গেলাম ভাগ্য বশত । সেদিন যদি তোমায় ওভাবে বিয়ে না করতাম , তাহলে হয়তো আজ তুমি আমার হতে না । তোমায় ভালোবাসা হতো না আমার । আ’ম সরি ইভারা , আমি জানি আমি ভুল করেছি । তাই বলে আমার ভালোবাসায় সন্দেহ করো না কখনো । আমি ভালোবাসি তোমায় ।
বিনুনি গাঁথা শেষ । মেঘা ঘাড় ফিরিয়ে চাইলো । শুধালো….

” তাহলে ফেলে রেখে গেছিলেন কেনো ?
রৌদ্র কে কিছুটা বিষন্ন দেখালো । উত্তর করলো ধরা গলায়…..
” সেদিন যাওয়াটা ভীষণ প্রয়োজন ছিলো । পাওয়ার সুখ বিসর্জন দিয়ে হারানোর দুঃখ টা গ্রহণ করেছিলাম সেদিন । আর নিজেকে তো বদলাতে হতো না কি ? তোমার যোগ্য করতে হতো । কথায় কথায় হাত চালানো স্বভাব ছিলো আমার । মারতে মারতে শেষ করে দিতাম নয়তো । যেখানে চাই তুমি আমার প্রনয়ে নিঃশেষ হও ।
” ফিরে এসেও কতবার মেরেছেন খেয়াল আছে ?
অভিমানী স্বর । রৌদ্র অপরাধী স্বরে কানের লতিতে চিমটি বসিয়ে বললো….
” তার জন্য সরি সুইটহার্ট ।
” নিজেকে পরিবর্তন করতে পাঁচ বছর লাগে কার ? এই পাঁচ বছরে খোঁজ নেননি আমার । যদি এখানে না থাকতাম ?
” কে বলেছে খোঁজ নেই নি , সারা কে জিজ্ঞেস করে দেখো । পাঁচ বছরের প্রতিটা দিন তোমার খোঁজ নিয়েছি আমি ।
” দেখতে ইচ্ছে হয় নি ?
” হয়েছে তো ? আগ্রহ টা বাড়িয়েছি । তাইতো পেয়েছি এই সুন্দরী একবিংশীকে ।
রমনীর নাকের ডগায় আলতো টোকা মারলো রৌদ্র । মেয়েটা চিবুক নামিয়ে নিলো মৃদু লাজে ‌। লাল হয়ে উঠলো তার নাকের উপরিভাগ । এক চিমটি হেসে গাল ফুলিয়ে সরে আসতে আসতে বললো….

” হয়েছে ! ঘুমান এখন !
” আগে কথা দাও , আমায় আর দ্বিতীয় বার ভুল বুঝবে না । ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা আনবে না মাথায় ।
” আনবো না ।
হাসলো রৌদ্র । বিছানায় গা এলিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো , বুকে চাইলো রমনীকে…..
” এসো ।
তৎক্ষণাৎ রমনী নিজেকে সঁপে দেয় । লোকটার বুকের বা পাশে মাথা গুঁজে শক্ত করে মিশে যায় । চোখ বুজে হাসে লাজুক । বেপরোয়া যুবক ওর কানে আর গলার নিকট ঠোঁট ছোঁয়াতেই শিরশিরে অনুভূতিতে কুঁকড়ে যায় মেয়েটা । রৌদ্র ওকে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে চোখ বুজতেই আকস্মিক মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো একটা চিন্তা । ঝট করে চোখ খুললো যুবক । কলিজা শুকিয়ে আসলো এক মুহুর্তে । ধীরে ধীরে হাতের বাঁধন শিথিল করে আবারো শক্ত করে জড়িয়ে নিলো । ঘড়ির দিকে তাকালো । রাত্রি এগারোটা বেজে আটান্ন মিনিট । রমনীর ঘুমোতে সময় লাগবে না খুব একটা । সে শুল্ক ঢোক গিললো ।
সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই নড়েচড়ে উঠলো মেঘা । খুব একটা স্বস্তি পেলো না । অল্প জায়গায় জড়িয়ে আছে সে । পিষে আছে কারোর বাহুডোরে । সদ্য ঘুম ভাঙ্গার রেশে দম বন্ধ লাগলো । চোখ বুজেই খচখচ করলো সে । নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো ক্ষুদ্র শক্তির দ্বারা । পারলো না । ভারী পাপড়ি মেলে খোলার চেষ্টা করলো দুচোখ । আধো আধো খুলে মাথা তুলে তাকালো । লোকটা তাকে জড়িয়ে নিতে একটুও কার্পণ্যতা করে নি । ঠিক সেভাবেই শক্ত করে জড়িয়ে আছে এখনো । মেঘা আনমনে হাসলো । ফের মাথা তলিয়ে যুবকের বুকে নাক ঘষলো । গলার নিকট পরপর কয়েকবার ঠোঁট ছুঁইয়ে বিড়বিড় করলো ঘুমে আচ্ছন্ন স্বরে…..

” গুড মর্নিং, মাই কেয়ারিং হাসবেন্ড !
” ভেরি গুড মর্নিং, মাই লাভিং ওয়াইফি…
মেঘা চমকে গেলো । তড়াক করে মাথা তুললো । ড্যাব ড্যাব করে ঘুমন্ত লোকটার মুখ পানে তাকিয়ে আহম্মক হয়ে বুলি ফুটালো অস্ফুটে…..
” আপনি ঘুমোচ্ছেন না ?
” হু, ঘুমোচ্ছি তো । তুমি চালিয়ে যাও ।
রৌদ্র চোখ বুজেই ঘুম কাতর স্বরে উত্তর করলো । মেঘা ওর বুকের কাছে চিমটি কাটে । হাত ছাড়িয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতে তাকায় দেয়াল ঘড়ির দিকে । অমনি আঁতকে ওঠে সময় দেখে । ধড়ফড়িয়ে উঠে বসার চেষ্টা করতেই টান পড়ে বাম হাতে । কিঞ্চিত ব্যাথায় মুখ বিকৃত করে ঝট করে তাকায় নিজের হাতের দিকে । দ্বিগুণ আঁতকে ওঠে এবার । হতবাক হয় পাশাপাশি । চোখ বড় হয়ে যায় আপনা আপনি । মেয়েটা মুখ গোল করে আশ্চর্য হয়ে রৌদ্র কে ঝাঁকায় । তখনো লোকটা চোখ বুজে । মেঘনার ঝাঁকানিতে বললো নড়েচড়ে….
” জ্বালাচ্ছো কেনো সুইটহার্ট , ঘুমোচ্ছি তো ।
” রাইনো মুখো ,, সাড়ে আটটা বেজে গেছে । আর এটা কি করেছেন আপনি ? আমার হাতে এটা কি ?
রৌদ্র চোখ মেললো তড়াক করে । হাতের দিকে তাকালো । সাবলীল ভাবে ফের চোখ বুজে উত্তর করলো…..

” হ্যান্ডকাফ !
মেঘা বাম হাত উপরে তুলতেই রৌদ্রের ডান হাতে টান পড়লো । একটা হাতকড়ায় বেঁধে রয়েছে দুটি হাত । মেয়েটা তাজ্জব বনে যায় । একে একে দুজনের হাত দেখে নেয় ‌। মুখ গোল করে বলে…..
” ইউ রাইনো ,, এটা কেনো লাগিয়েছেন আমার হাতে ?
” তোমাকে বেঁধে রাখতে ।
” হোয়াট ?
” হু । ডিভোর্স চেয়েছিলে না , যদি পালিয়ে যাও আমার ঘুমের সুযোগে ? ধরতে পারতাম না তো । সেই চিন্তায় ঘুম আসছিলো না রাতে । পরে আইডিয়া পেলাম । তাই বেঁধে নিলাম তোমায় । ট্রাস্ট মি , এটার পর শান্তিতে ঘুমিয়েছি সারারাত ।
লোকটা উঠে বসেছে । মেঘা তাজ্জব বনে চেয়ে রয় । ঠোঁট পিষে হাসে নিঃশব্দে । হাঁফ ছেড়ে পরক্ষনে কপাল চাপড়ায়……

” উফফফ , কোথায় যাবো আমি এই পাগলকে ছেড়ে ? যাই নি তো , দেখুন । এইযে আছি এখনো । এবার খুলে দিন , কত বেলা হয়ে গেছে । উঠতে হবে এবার । সবাই কি ভাববে ?
রৌদ্র হাতে টান মেরে মেঘাকে কাছে এনে ফেললো । বললো জড়িয়ে নিয়ে…..
” কে কি ভাবে ভাবুক । নয়টার আগে এই রুম থেকে বেরোতে দিচ্ছি না তোমায় !
” কিন্তু কেনো ?
” নয়টায় ইয়াশের ফ্লাইট আছে , ও চলে যাক আগে । আমি বিশ্বাস করি না ওকে ‌। ও তোমাকে কেড়ে নিতে পারে সু্যোগ বুঝে ।
মেঘা এবার মুখশ্রী শিথিল করলো । বললো ক্ষণ কাল বাদ….
” ভাইয়া আজ যাবে না । কাল ন’টায় ফ্লাইট, আজ নয় । এবার তো ছাড়ুন । যাবো না আমি কোথাও ।
রৌদ্র যেনো কিছুটা বিব্রত হলো ।
ঐ ছেলে আবার থেকে গেলো কেনো ? কি মতলব আটছে আবার ? কি চলছে মনে ?
অবশ্য ওর সাথে এখনো কিছু কথা বলা বাকি ! জানানো বাকি অনেক কিছু । কিছু সত্য । যা ওকে পীড়া দেবে । যা না জেনেই এখনো অবধি ব্যাথিত হয়ে আসছে সে ।
সবকিছু ওকে জানানো উচিত এবার ।
ব্রেকফাস্টের সময় পেরিয়ে গেছে । শনিবার হওয়ায় ভার্সিটি বন্ধ । আদ্র আছে বাড়িতেই । শুভ্র ছুটেছে অফিসে । কর্তারাও বাড়িতেই আছেন আজ । মেঘা ঘর ছাড়লো ঠিক নয়টার পর । ওকে এতো দেরিতে দেখে মুখ টিপে হাসছে শিশির আর মেহের । সিঁড়ি থেকে ওদের এমন হাসাহাসি দেখে মেয়েটা লজ্জায় নিচে নামতে পারলো না আর । ফের তড়তড়িয়ে উঠলো উপরে ।
ইয়াশ কে না দেখে ওকে ডাকতে ঘরে ঢুকলো । ছেলেটা রকিং চেয়ারে শরীর এলিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে । মেঘা চেয়ে থেকে নিঃশব্দে পায়ের কাছে বসে ডাকলো ভেজা গলায়……

” ভাইয়া ?
নড়লো না ইয়াশ । সেভাবে শুয়ে থেকেই উত্তর করলো ছোট করে…..
” হু !
” রেগে আছো ?
” কেনো ?
” এইযে , আবার কথা ভাঙলাম । আবার গলে গেলাম ঐ লোকটার উপর । আ’ম সরি ভাইয়া ! আমি ওনাকে ভুল বুঝতে পারলাম না ‌। পারবো না আমি ওনাকে ছেড়ে যেতে । উনি যাই করুক না কেনো , আমি জানি উনি এখন আমাকে ভালোবাসেন । আমিও যে ফেঁসে গেছি ভীষণ ভাবে । তুমি জানো , ওনার অ্যাটাক এসেছে শুধু আমার কথায় । আমি ডিভোর্সের কথা বলেছিলাম , তাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন উনি । আমি না বুঝে অনেক কথা শুনিয়ে দিয়েছি সেদিন । সেসবের জন্যই ওনার এই অবস্থা হয়েছে ।
” তো ?
মেঘা থামলো । সেদিন রৌদ্র কে অতো সব কথা শুনিয়ে দেওয়ার পর ইয়াশের কাছে গিয়ে মেঘা সবটা খুলে বলেছিলো । সে চলে যাবে ইয়াশের সাথে , সেটাও জানিয়ে দিয়েছিলো । কিন্তু তার পরপরই রৌদ্রের ঐ অবস্থা ।
আবার নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে রমনী । রৌদ্র কেই বেছে নিয়েছে শেষ পর্যন্ত ।
এখন ভাইয়ার উহ্য অভিমান দেখে গলা ভিজিয়ে বললো…..

” ওনাকে ক্ষমা করা যায় না ? প্লিজ ভাইয়া , শুধু আমার জন্য ।
” না , যায়না ।
” ভাইয়া ।
” কথা বলতে ভালো লাগছে না মেঘা । একা ছাড় আমায় ।
” তুমি চলে যাবে কাল ? ভুলে যাবে আমায় ? তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই ! আমি কিন্তু আম্মু আব্বুর কাছে নালিশ করবো বলে রাখলাম । বলে দেবো , তাদের ছেলে আমায় কষ্ট দিচ্ছে । কাঁদাচ্ছে । পালাচ্ছে আমায় রেখে ।
” রৌদ্র আছে তোর , আমার আর দরকার পড়বে না । ভাইয়ার করা যত্ন গুলোর অভাব বুঝতে দেবে না ও তোকে ।
” এইতো স্বীকার করছো, তবুও এমন করছো কেনো ? তুমি জানো রৌদ্র কেমন !
” জানি তো । তোর দিক থেকে ও কিন্তু অতটাও খারাপ নয় । ভালো থাকবি , এটুকু বিশ্বাস আছে ।
মেঘা হেসে ফেললো । চোখ মুছলো । উঠে দাঁড়িয়ে বললো ইয়াশের হাত টেনে ধরে…..
” ব্রেকফাস্ট করোনি নিশ্চয়ই ? চলো , খাবে কিছু ।
” খিদে নেই ।

মেঘা শুনলো না । টেনে নিচে নামালো ওকে । খাবার টেবিলে ইতোমধ্যে ঝিম ধরে বসে আছে রৌদ্র ‌। নিজের পাশের চেয়ারটা ধরে রেখেছে মেঘার জন্য । রুবিনা কাবির খাবার দিয়ে গেলেন । ছুঁয়ে দেখেনি । অপেক্ষায় আছে একবিংশীর জন্য । মেঘা ইয়াশকে নিচে নামিয়ে রৌদ্র কে এক পলক দেখে নিলো । হেসে ভাইয়াকে টেনে রৌদ্রের পাশের ঠিক সেই চেয়ার টাতেই বসালো ।
ঝট করে পাশে তাকাতেই বিব্রত হলো রৌদ্র । কপাল কুঁচকে তৎক্ষণাৎ বেফাঁসে বলে উঠলো……
” এই শালা , এটা আমার বউয়ের চেয়ার । ওঠ ওঠ, অন্যটায় বস তুই ।
ইয়াশ চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে অপমান বোধে । রাগে চোয়াল খিচে তাৎক্ষণিক উঠে দাঁড়ায় । হাত মুঠিয়ে ঝাড়ি মারার আগেই সামলায় মেঘা…..
” ভাইয়া , তুমি বসো । আমি অন্য চেয়ারে বসছি ‌।
রাইনো মুখো , চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে খান আপনি । বেশি কথা বলেছেন তো ঠোঁট সেলাই করে দেবো একদম ।
থতমত খেলো রৌদ্র । মেঘার চোখের ইশারা বুঝে জিভে কামড় বসালো । সকালে প্লান হয়েছে, দুটোতে মিলে ইয়াশের রাগ ভাঙাবে । কিন্তু এখন ও তো ভুলভাল করে ফেললো । রৌদ্র নিজেকে শুধরে বোকা হেসে আমতা আমতা করে….
” না মানে ,, সরি ইয়াশ । বস এখানেই । আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি তোকে । বস বস…..
রৌদ্র নিজে ইয়াশের প্লেটে স্যান্ডউইচ আর সেদ্ধ ডিম তুলে দিলো । হাসি ঠেলে বললো মিনমিন করে…
” আ’ম সরি ফর অল ।

পড়ন্ত বিকেল । ঝিমিয়ে এসেছে সূর্যের মিঠে তেজ । পশ্চিম দিগন্ত জুড়ে ডুবন্ত সূর্যের লাল আভা ছেয়ে গেছে । পাখির কিচিরমিচিরে ভরপুর ধরনী । আকাশ তখন আঁধার নামাতে চাইছে । সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্ত । ছাদে একা দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে ইয়াশ ।
সারাটা দিন বাড়িতে আছে সে ।
একলা মনমরা । মেঘা কথা বলতে চাইলেও খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় নি । রৌদ্র লেগেই আছে পিছনে ।
বড়রা ছাদে আসেন না খুব একটা । সন্ধ্যার আগে আগে মেঘা আর শাফাহ্ আসতো রোজ রোজ । তবে ইদানিং মেঘা আসে না । শাফাহ্ কে পাত্তাই দেয় না সে । মেয়েটা একলা হয়ে গেছে পুরো ।
সন্ধ্যার খানিক আগে মনমরা হয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ছাদে উঠলো সে । আজকাল ভালো লাগে না কোনো কিছু । সব কিছুতে বিরক্তি আসে । ছাদের গাছ গুলোর যত্ন নেওয়া হচ্ছে না খুব একটা । তাজা ফুল ধরা ছোঁয়া হচ্ছে না বহুদিন । গাছ গুলো কেমন ঝিমিয়ে যাচ্ছে যত্নের অভাবে । পানি দেওয়াও হয় না নিয়ম করে ।
শাফাহ্ ছাদের দরজা থেকে নিজের সখের ফুল গাছগুলো দেখে হাঁফ ছাড়লো । ওর নিজের মতোই এগুলোর অবস্থা হয়েছে । দুদিকে মাথা নাড়ালো মেয়েটা । এগিয়ে গিয়ে পানির পাইপ হাতে তুললো ‌। দুটো গাছে পানি দেওয়ার মাঝেই কাশি এলো গলায় । জ্বলন অনুভব করলো গলার নিকট । নাকে সেই অস্বস্তিকর স্মেল । নিমিষেই শুকনো কাশি শুরু হয়ে গেলো খুশখুশে গলায় । পাইপ ছেড়ে ওরনা দিয়ে নাক মুখ চেপে ধরলো মেয়েটা । তড়াক করে এপাশ ওপাশে নজর বোলালো এতক্ষণে । কে খাচ্ছে সিগারেট ?

পশ্চিম দিকে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছে ইয়াশ । মেয়েটা ওকে দেখে ছলকায় ‌। শ্বাস রুখে নাক মুখ চেপে ধরে আরো বেশি ‌‌। ওর কাশির শব্দেও লোকটা ফিরে চায় নি । ভাবান্তর নেই তার ।
মেয়েটা ইতোমধ্যে লাল হয়ে গেছে । এগিয়ে মুখ খুললো….
” আপনি সিগারেট খাচ্ছেন এখানে ? আমার অস্বস্তি হচ্ছে, ফেলে দিন প্লিজ ।
তাকালো না ছেলেটা । বরং রাশভারী আদেশ ছুড়লো……
” অস্বস্তি হচ্ছে তো স্বস্তি খুঁজে নাও । নিচে যাও ।
” ফুল গাছে পানি দিতে হবে । আপনি সিগারেট ফেলুন । আমি চলে যাওয়ার পর আবার খাবেন । দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার ।
লোকটার নেই কোনো ধ্যান । বরং একটা শেষ করে আরেকটা ধরালো । শাফাহ্ ছোট ছোট চোখে দেখে যায় । ছাদের মেঝেতে গোটা দশেক অর্ধ সিগারেট । ধোঁয়া বেরোচ্ছে এখনো । মেয়েটার দম কুলোয় না । লোকটার ও মায়া হয় না । শেষমেষ দম হারিয়ে হাল ছাড়ে রমনী । ততক্ষণে বুক জমে গেছে পুরো । কাশতে কাশতে মেয়েটা এলোমেলো কদমে ছুটলো সিঁড়ির দিকে । কয়েক কদম সিঁড়ি নেমে শান্ত নির্ভেজাল বাতাস পেয়ে দম টানলো । বুকে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস টানতে লাগলো অনবরত ।
রৌদ্র উঠছিলো উপরে । মেয়েটার অমন ছটফট অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে বললো…..

” টুকটুকি, কি হয়েছে ?
উত্তর করার জন্য জবান ফুটলো না মেয়ের । পানি প্রয়োজন । সে কোনো রকমে রৌদ্র কে পাশ কাটিয়ে ছুটে নিচে নামে । মনে মনে অভিশাপ দেয় ঐ হৃদয়হীন পাষন্ড লোকটাকে…. বিয়ে হবে না তার ।
রৌদ্র ছাদে উঠলো । ইয়াশ আছে , তা জেনে বুঝেই উঠেছে ‌। ছাদের দরজা আটকে দিলো সে ।
ছোট ছোট কদম ফেলে দাঁড়ালো ইয়াশের পেছনে । ছেলেটা এখনো রৌদ্রের উপস্থিতির আভাস পায়নি । হাতের সিগারেট ফুরিয়ে এসেছে ‌। এগুলো যেভাবে জ্বলছে , সেভাবে জ্বালাচ্ছে ওর ভেতরটাকেও । পুড়ছে দুটোই । আগুনে আগুনে হচ্ছে অগ্নিক্ষয় ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬২

হাতেরটা ফেলে পকেটে হাত ঢোকালো । সিগারেটের প্যাকেট টা বের করে দেখলো ফাঁকা সেটা ‌। শেষ সব । বিরক্তি কাজ করলো চরম । দুমড়ে মুচড়ে প্যাকেট টা ছুড়ে মারলো নিচের দিকে । চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো জিভ নাড়িয়ে । মাথা চেপে ধরতেই পাশ থেকে একটা হাত বাড়িয়ে দেওয়া হলো , সিগারেট সে হাতে । জবানে এক বাক্য….
” নে ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here