Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ২

এক দেখায় পর্ব ২

এক দেখায় পর্ব ২
সুরভী আক্তার

বাবা – মায়ের একমাত্র আদরের কন্যা মিহি . গায়ের রং ঠিক উজ্জল ফর্সা নয় তবে উজ্জল শ্যামলা বলা‌ চলে । যার কারণে মেয়েটাকে একটু বেশি মায়াবী লাগে,, সবচেয়ে বড় বিষয় এই মেয়েটির চোখ যা পুরো একটা পৃথিবী স্তব্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে,,যে চোখের দিকে তাকিয়ে পুরো একটা উপন্যাস লেখা সম্ভব । কোনো মেয়ের চোখ এতো সুন্দর হয় কিভাবে ? বড় বড় পাপড়ি সমেত টানা টানা দুটো চোখ,, শ্যামলা পানপাতার মতো মুখের আদলে ডাগর ডাগর টানা টানা চোখ দুটো একটু বেশি মানানসই,,যা সবাইকে আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ।
কোনো প্রকার কাঠিন্যতা বিহীন মিহি মেয়েটা যেমন চঞ্চল তেমন দূরন্ত স্বভাবের ,এক সেকেন্ডও কথা না বলে থাকতে পারে না ,, সারাক্ষন যেনো মুখে খই ফুটছে,, খুব সহজেই সবার সাথে সক্ষতা গড়ে তুলতে পারে । যার কারনে স্কুল কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে সকল বন্ধু-বান্ধব সবাই মিহিকে একটু বেশি ভালোবাসে..
কিন্তু পুরনো বন্ধু-বান্ধব আর চেনা মানুষদের ছেড়ে বাবা মায়ের সাথে মিহি এখন এক নতুন শহরে —

*বর্তমান —
ঢাকা সিটি কলেজ যেখানে আজকে মিহির প্রথম দিন,, মিহির যাতায়াতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তাই আজমাল হোসেন ধানমন্ডিতেই তাদের নতুন বাসা নিয়েছেন । মিহি দের নতুন বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব বেশি নয় । বাড়ি থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই কলেজে এসে আজমাল হোসেন মেয়েকে নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যার এর সাথে কিছু কথা বলে নেন । তারপর বাইরে এসে মিহির মাথায় আলতো হাত রেখে বলেন…
” আম্মু মন‌ দিয়ে ক্লাস করবে কেমন ? আমাকে তো এখন যেতে হবে ,কলেজ শেষে বাসায় ফিরতে তোমার কোনো সমস্যা হবে না তো ??
আব্বুর আদুরে গলায় বলা কথায় মিহিও গদগদ হয়ে উত্তর করে…
” আব্বু আমি কি এখন ও ছোট আছি বলো তো ? আমি হলাম তোমার মেয়ে ,,আমি অনেক Brave girl বুঝলে । আমাকে নিয়ে তোমার কোনো tension করতে হবে না।
” আমি জানি তো আমার মা টা অনেক সাহসী..
বলেই মুচকি হাসলেন আজমাল হোসেন,, একবার হাতে থাকা ঘড়ির দিকে চেয়ে আবারো বললেন..
” আচ্ছা মা তাহলে আমি আসি ?
মিহি ঘাড় কাত করে সম্মতি দেয় । আজমাল হোসেন হাঁটা লাগাতেই মিহি তড়িঘড়ি করে ডাকে..

” আব্বু…
সবে হাঁটা শুরু করতে যাচ্ছিলেন,
মেয়ের ডাকে আজমাল হোসেন পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন,, মিহি শাহাদাৎ আঙুল দিয়ে কিছু একটা ইশারা করছে,,, মেয়ের ইশারা বুঝতে বাকি রইলো না আজমাল হোসেনের, তিনি মানিব্যাগ থেকে একটা ১০০ টাকার নোট বের করে দেন মেয়ের হাতে । সকালেও দিয়েছেন এখন আবার মেয়ের আবদারে আবার দিলেন । দিয়ে বললেন..
” পাগলি মেয়ে,,আমি এতোক্ষণ এটারই অপেক্ষায় ছিলাম,,ছোট বেলার অভ্যাস টা এখনো যায়নি তোমার ।
মিহি গদগদ হয়ে আব্বু কে জড়িয়ে ধরে বলে..
” I love you আব্বু 💝
আজমাল হোসেন মুচকি হাসেন ‌।
এরপর বাবার থেকে বিদায় নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে ক্লাসে আসে মিহি , ক্লাসের সকলের উদ্দেশ্যে প্রিন্সিপাল স্যার বললেন…

” এ তোমাদের নতুন সহপাঠী মাহিতা ইসলাম মিহি,,TC নিয়ে আমাদের কলেজে নতুন এসেছে।
ক্লাসের সবার‌ নজর এখন ডাগর চোখা মেয়েটির দিকে..সবার স্থির দৃষ্টি আটকে আছে মেয়েটির চোখের পানে ,,যার চোখ এতো সুন্দর তার দিক থেকে চোখ ফেরানো যায় কিভাবে..!
স্যারের কথায় ক্লাসের সবাই মিহিকে অভিনন্দন জানায়..
স্যার চলে যেতেই মিহি একটি মেয়ের পাশে বসে পড়ে । তারপর হালকা হেসে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলে….
” hi .. আমি মিহি,, তোমার নাম কি গো ?
প্রতিউত্তরে মেয়েটি বলে..
” তোমার চোখ দুটো না অনেক সুন্দর ❤️
মিহি গাঁ দুলিয়ে একটু হাসে.. মেয়েটার দিকে সম্পুর্ন ঘুরে বলে…
” আমার চোখ সুন্দর কিন্তু তুমি তো পুরোটাই সুন্দর,,হায় কি cute তুমি…
মিহির কথায় মেয়েটি লাজুক হেসে বলে ..
” কি যে বলো । By the way.. আমি ফারহানা চৌধুরী রুহি ,, আমার ডাকনাম রুহি ‌। রুহি বলেই ডাকতে পারো…
” আরে সাবাশ ,,, তোমার নাম আর আমার নাম তো প্রায় same ,,,
friend ?
বলেই রুহির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় মিহি । রুহি handshake‌ করতে করতে বলে..
” অবশ্যই ।

প্রত্যেকটা ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে প্রায় সবার সাথেই পরিচিত হয় মিহি ,, এরমধ্যে — নাদিয়া,, সোহেল,মিরা‌ আর রৌনক এর সাথে একটু বেশি সক্ষতা গড়ে উঠে । কেননা এরা ছিলো রুহির team members ।
দুপুর ২:৩০ এ কলেজ ছুটির পর মিহি তার নতুন বন্ধুদের সাথে কলেজের বাইরে আসে ,, সবাই ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছে । এরমধ্যে রৌনক বলে…
” আচ্ছা মিহি তুমি তো ঢাকা শহরের তেমন কিছুই চেনো না তাইনা?
মিহি তপ্ত শ্বাস ফেলে জবাব দেয়…
” হুম,, আমরা তো সবে তিন দিন আগে ঢাকায় এসেছি । তাই তেমন কিছু চিনি না এখনো ‌ । ঢাকায় আসার পর দিন আব্বুর সাথে একবার কলেজে এসেছিলাম তাই কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তা ব্যাতিত তেমন কিছুই আর চেনা হয়নি,, তবে ধীরে ধীরে সব চিনে যাবো ইনশাআল্লাহ ❤️
” আমি একটা কথা বলতে চাই,,,
সবাই কে থামিয়ে হাত উঁচিয়ে বলে রুহি । রুহির কথায় মিরা মেকি স্বরে বলে…
” তোকে আবার কথা বলার জন্য পারমিশন নিতে হবে নাকি?
রুহি খানিক বিরক্তি নিয়ে বলে…
” তুই চুপ কর তো ,,,

আচ্ছা মিহি শোনো .. আমাদের বাড়ি যাওয়ার পথেই তোমাদের বাড়ির সেক্টর পরে ,,তাই আজ থেকে রোজ আমরা একই সাথে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরব বুঝলে,, ? আমি তোমাকে বাসায় Drop করে দেব ,, আমি কিন্তু কোনো না শুনতে চাই না।
মিহি কোন প্রকার দ্বিমত পোষণ করে না এতে । আলতো হেসে বলে…
” আচ্ছা ঠিক আছে আমি না করছি না,, এই ফাঁকে তোমার সাথে আরো একটু বেশি সময় কাটানো যাবে ।
পাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস টেনে সোহেল বলল…
” আহারে,,, আমার বাড়িটা যদি তোদের ঐ দিকে হতো তাহলে আমিও প্রতিদিন lift পেতাম ।
সোহেলের কথায় নাদিয়া ভেংচি কেটে বলল..
” এহহ ,,,শখ কতো যা ভাগ ।
সোহেল আর নাদিয়ার কথায় সবাই হাসাহাসি করে যে যার মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো । অন্যদিকে রুহি আর মিহি গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল ,, এর মাঝেই তাদের দুজনের সামনে একটা কালো রঙের দামি গাড়ি এসে দাঁড়ায়,, রুহি মিহিকে নিয়ে সেই গাড়িতে ওঠে পড়ে ।

রুহি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে,, ঢাকা শহরের অন্যতম বড় বিজনেস ম্যান এবং চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির মালিক রাশেদ রায়হান চৌধুরীর মেয়ে রুহি,, এতো ধনী পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও রুহির মধ্যে কোনো প্রকার দোটানা বা অহংকার নেই, যা মিহি এতক্ষনে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে,,
দুধে আলতা গায়ের রংয়ের হালকা পাতলা লাজুক মেয়েটি দেখতে কিন্তু একেবারে মাশাআল্লাহ ❤️
দুই বান্ধবী মিলে কথা বলতে বলতে মিহি’র গন্তব্য চলে আসে । তার পর রুহির থেকে বিদায় নিয়ে বাড়িতে ঢোকে মিহি । রুহি ও নিজের বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
বাড়ির কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দেয় সাবিনা বেগম.. বাইরে মেয়েকে দেখে খুশিতে চোখ চিকচিক করে ওঠে তার ‌। তিনি প্রফুল্লতার
সহিত বলেন..

” এসেছিস , তোর অপেক্ষাতেই ছিলাম,,যা আগে তারাতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে তারপর আজকের সব কথা শুনব ।
মিহি ভেতরে ঢুকে আদুরে কন্ঠে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে…
” আম্মু আমি তোমাকে অনেক মিস করছি জানো ..!
” হয়েছে আর বলতে হবে না,,যাও আগে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও ।
মায়ের কথায় বাধ্য মেয়ের মতো উপরে পা বাড়ায় মিহি । উদ্দেশ্যে ফ্রেশ হওয়া …
মিহি দের এই নতুন বাড়িটা একেবারে প্রকৃতির কাছাকাছি নেওয়া হয়েছে। এর মুল কারন হচ্ছে মিহি,, সে প্রকৃতি বিলাসী হওয়ার কারণে প্রকৃতির কাছাকাছি এই বাড়িটি নেওয়া হয়েছে। এই
বাড়ির দোতলায় দুটো ঘর যার একটি মিহির জন্য বরাদ্দ । কেননা ঐ ঘরে আছে একটা ছাদ বিহীন ব্যালকনি যেখানে দাঁড়ালে সরাসরি প্রকৃতিকে অনুভব করা যায় — যা মিহির অনেক পছন্দ । দোতলার অন্য ঘরটি আপাতত ফাঁকা আছে,, আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম Ground floor এর একটি ঘরে আছেন ।

এক দেখায় পর্ব ১

গোসল করে নিচে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে,, বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আজকের সব ঘটনা একে একে বলল মিহি । মিহির মা গালে হাত রেখে মেয়ের সমস্ত বকবক শুনে গেলেন ।
আজমাল হোসেন ও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নীরবে মেয়ের সব কথা শুনলেন..! এই মেয়েই তাদের কাছে সব । একমাত্র সম্বল ।

এক দেখায় পর্ব ৩