এক দেখায় পর্ব ৫১
সুরভী আক্তার
সকাল সকাল মাথায় কারোর আলতো স্পর্শে ঘুম হালকা হলো মিহির । ঘুম জড়ানো অক্ষি যুগল খোলার চেষ্টা করলো ও । আজ কাল ঘুম হয় প্রচুর । ঘুমের রেশ কাটে না সহজে । রাতে ঘুমোলে আর টের পাওয়া যায় না । ঔষধ খেতে হয় অনেক । সেসবের ওভার ডোজের সাইড এফেক্টের ফলে ঘুম বেড়েছে অনেক । ঘুমোলে বোধশক্তি কমে যায় ।
সকাল কটা বাজলো কে জানে । মিহি ঘুমে বিভোর ছিলো এতোক্ষণ । মাথা গড়িয়ে কপালের কাছটায় ঠান্ডা হাতের স্পর্শে ঘুমের মাঝে কেঁপে উঠলো মেয়েটা । পিটপিট করে চোখ খুলে সামনে তাকালো । কেউ অতি যত্নে চুলের ভাঁজে আঙ্গুল বুলিয়ে দিচ্ছে ওর । মিহি কাত হয়ে শুয়ে । সেভাবেই দেখলো পাশে রুহি নেই । ও উঠে পড়েছে হয়তো । শরীর খানা অচল লাগছে মিহির । জোর পাচ্ছে না । ও কোনো রকমে কাত হয়ে শোয়া থেকে সোজা হয়ে শুলো । মাথায় আদর মাখানো বুলিয়ে দেওয়া হাত খানার মালিক কে দেখার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে চোখ ফেরালো পাশে । ওকে চোখ খুলতে দেখে তৎক্ষণাৎ মুচকি হাসলেন রাবেয়া চৌধুরী । আচমকা রাবেয়া চৌধুরী কে দেখে ছটফটিয়ে উঠলো মিহি । ছ্যাত করে উঠে কাতর অক্ষি যুগল বৃহৎ করলো । বুক খানা কেমন মুচড়ে উঠলো আকস্মিক রাবেয়া চৌধুরী কে দেখে । মেয়েটা অস্ফুটে উচ্চারণ করলো মৃদু স্বরে….
” মা’হ..
রাবেয়া চৌধুরী মিহির কথাটা বুঝলেন না । শুনলেন না হয়তো । তিনি মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিজের মতো করে বললেন স্বাভাবিক ভাবেই….
” ওঠে পড়েছিস ?
কত ঘুমাস রে তুই ! আমি কতক্ষন ধরে তোর ওঠার অপেক্ষায় এখানে বসে আছি জানিস ? তুই তো উঠছিলিই না ! শরীর খারাপ তোর ?
ভালো আছিস ?
মিহির চোখ দুটো জ্বলে উঠলো । ও হুট করে ঝট করে রাবেয়া চৌধুরী কে আকড়ে ধরলো । শক্ত করে কোল জড়িয়ে ধরলো তার । ফিকড়ে উঠলো কোলের কাছে মুখ গুজে….
” মা….
এবারো বুঝলেন না রাবেয়া চৌধুরী । বরং মিহি তাকে জড়িয়েছে এটা দেখে স্মিথ হাসলেন তিনি । মিহির চুলের ভাঁজে হাত রাখলেন আবার । মায়ের আদর মাখা পরশে চোখ বুজলো মিহি । বন্ধ চোখের পাপড়ি ছাপিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে নিমিষেই মিশে গেলো রাবেয়া চৌধুরীর শাড়ির কুচিতে । মিহি হাতের বাঁধন শক্ত করলো ।
বললেন রাবেয়া চৌধুরী….
” এই মেয়ে , তোর নামটা ভুলে যাই বারবার । কিছুতেই মনে থাকে না । তুই তো আমাদের বাড়িতে কাল থেকে আছিস না ? দেখ, আমি তোর কাছে আসিই নি একবারও । রাগ করেছিস আমার উপর ? তুইও তো আমার কাছে অনেক দিন আসিস নি , আমি কিন্তু একটুও রাগ করিনি ।
” মা …
তুমি আমার মা ?
রাবেয়া চৌধুরী খানিক থামলেন । স্পষ্ট শুনলেন এবার । বললেন…
” তোর মা ? আমাকে মা ডাকলি ? আমি তো তোর মা নই । তোর মা বাইরে আছে । আমি আসার সময় দেখেছি উপর থেকে ।
মিহি নিঃশব্দে গুমড়ে উঠলো । রাবেয়া চৌধুরী ডাকলেন ওকে ঝাঁকিয়ে….
” কি রে মেয়ে , উঠবি না ? দেখ নয়টা পার হয়ে গেছে । এতো বেলা অবধি শুয়ে থাকতে নেই বুঝলি !
ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে উঠে বসলো মিহি । ওর ভেজা চোখ দেখে চোখে মুখে আঁতকে উঠলেন রাবেয়া চৌধুরী ।
” এই মেয়ে কাঁদছিস কেনো ? কি হয়েছে ?
দুদিকে মাথা নাড়ালো মিহি । কিচ্ছু হয়নি । হয়েছে তো অনেক , যা হয়েছে তা তো আপনি বুঝবেন না ,বলে লাভ কি ? যার জন্য আজ আপনার এই অবস্থা , সে কি সবটা জেনে ঠিক থাকতে পারে ? ঠিক থাকা যায় ?
এই মিহি নামক মিফতাহুল কে চিনবে না তার গর্ভধারিনী মা । একটা প্রাণহীন জড় বস্তুকে নিজের মেয়ের জায়গায় বসিয়ে গত সতেরো টা বছর তাকে আকড়ে বেঁচে এসেছেন ইনি । অথচ আজ , সেই প্রাণহীন পুতুল টার প্রাণ এই যে মেয়েটার মাঝে তা কে বোঝাবে এনাকে ? মিহিই যে তার মেয়ে ? তার মিফতাহুল ।
রাবেয়া চৌধুরী খানিক থেমে থেকে বললেন কেমন করে…
” তোর নামটা বলবি ? ভুলে গেছি !
মিহি উত্তর করলো হীম কন্ঠে…
” মিহি !
” ও , আমার মেয়ের নাম মিফতাহুল । ও কখন উঠে গেছে । ওকে ঘরে একা রেখে এসেছি আমি । তোর কাছে আসলাম ।
জানিস , তুই যখন ছিলি না ,আসতি না আর , তখন খুব দেখতে ইচ্ছে করতো তোকে । আমি রাফি কে কতবার বলেছি , তোকে যেনো একবার আমার কাছে নিয়ে আসে । কিন্তু ও তো নিয়েই আসতো না ।
তুই এখন থেকে আমাদের বাড়িতে থাকবি , না ? সত্যিই থাকবি ? রাফি বলেছে তুই থাকবি !
” থাকবো তো । সবসময় থাকবো ।
আগে তুমি বলো , কাল থেকে আমার কাছে আসো নি কেনো ? আগে যখন ছিলাম না , তখন দেখতে ইচ্ছে করতো । এখন আছি বলে দেখতে ইচ্ছে করে নি ?
” করেছে তো । তাইতো এলাম ।
কাল আসিনি । আমার না মন খারাপ ছিল জানিস ?
মিহি আস্তে করে শুধালো…
” মন খারাপ ছিলো কেনো ?
রাবেয়া চৌধুরী চুপ করে থাকলেন । দৃষ্টি সরালেন মিহির থেকে । হাঁটুর ভাঁজে মাথা ঠেকিয়ে দরজার দিকে মুখ করলেন হুতাশের ন্যায় । মিহি তাকে উদ্দেশ্য করে দরজার দিকে তাকালো । রাফি দাঁড়িয়ে নীরব হয়ে । মিহির সাথে চোখাচোখি হলো ওর । শীতল দৃষ্টি রাফির । মিহি খানিক ক্ষণ চোখে চোখ রেখেই রইলো । রাফি রাবেয়া চৌধুরীর দিকে তাকাতেই রাবেয়া চৌধুরী বললেন ওকে উদ্দেশ্য করে…
” জানিস রাফি , এই মেয়ে টা আমাকে মা বলে ডাকলো একটু আগে ! ভুল করে ডেকেছে না ? আমার মেয়েটা তো আমাকে ভুল করেও ডাকে না রে ! কথাই বলে না কখনো । আমিই বকবক করি শুধু …
রাফি এগোতে এগোতে বললো…
” মা ডাক শুনবে ? মেহজাবিন তো ডাকে তোমায় আম্মু বলে ! আরো শুনবে ?
আজ থেকে মিহি তোমাকে মা বলে ডাকবে , মন ভালো হবে না এতে ?
” ওর তো মা আছে ! আমাকে কেনো ডাকবে ? আমার মেয়েই ডাকে না…! আর ও তো অন্যের মেয়ে !
মিহি বলে উঠলো তৎক্ষণাৎ…
” আমি তোমার ও মেয়ে । আমার আম্মু আছে । মা হবে তুমি ? একজন আম্মু আর একজন মা…. তোমাকে কিন্তু মা বলে ডাকবো ।
রাবেয়া চৌধুরী টু শব্দও করলেন না । সেভাবে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে খাট থেকে নামলেন । ঠিক যেভাবে নিঃশব্দে সবাই কে আড়াল করে এসেছিলেন , সেভাবেই নিঃশব্দে ঘর ছাড়লেন । মিহি মা বলে ডাকলো পিছনে । কোনো পিছুটান সৃষ্টি হলো না । তিনি চললেন ঘরে রেখে আসা তার পিছুটানের পিছু । তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আবার চোখ ছলছল করে উঠলো মিহির । ঠোঁট উল্টালো ও । রাফির শীতল কন্ঠের ডাকে ধ্যান ভাঙ্গলো….
” মিহি !
চোখ নামিয়ে পলক ফেলে পরের পলকে রাফির দিকে তাকালো মিহি । রাফি বসলো ওর সম্মুখে । দুহাতে আপন অধিকারে চোখ দুখানা মুছিয়ে দিলো । মিহি বাঁধা দিলো না । বুজলো দুচোখ । রাফি মুখখানা আগলে ধরে বললো…
” মামনি এমনই । কেঁদো না । ধীরে ধীরে ওনার সংস্পর্শে থাকলে সবটা মানিয়ে নিতে পারবে ।
রাফি থেমে দৃষ্টি গাঢ় করলো । সদ্য ঘুম থেকে ওঠা মিহির মুখখানা অন্যরকম লাগছে । কেমন ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে । বিনুনি থেকে ছুটে আসা ছোট ছোট চুল কপালের পাশে এলোমেলো । বেনিটা কাঁধ গলিয়ে সামনে এসে পড়েছে । ঢিলে ঢালা একটা জামা পড়নে । শ্যামলা উন্মুক্ত কাঁধের কিছুটা অংশ স্পষ্ট । ভেজা অক্ষি যুগলের বৃহৎ পাপড়ি শিশিরে আবৃত ফুলের পাপড়ির ন্যায় ঝিকঝিক করছে । ওষ্ঠপূট উল্টে রেখেছে মেয়েটা । রাফি সেদিকটাতেও খেয়াল করলো । ফুলের নরম পাপড়ির ন্যায় আকর্ষণ সেদিকটায় । মনে মনে আওড়ালো রাফি….
” আপনাকে এভাবে দেখার সৌভাগ্য যেন প্রত্যেক টা দিন হয় আমার ম্যাডাম । আপনাকে গুছিয়ে রেখে প্রতিটা রাত কাটাতে চাই , রাত্রির অবসানে এভাবেই এলোমেলো ভাবে দেখেই শুরু করতে চাই দিন ।
রাফির এলোমেলো চাহনি দেখে চোখ নামালো মিহি । নত চোখে নিজেকে পরখ করলো । ইসস , কি অবস্থা ওর । গায়ে ওরনা নেই । মিহি ঝট করে পিছিয়ে আসলো । বালিশের পাশ থেকে ওরনা টা টেনে গায়ে জড়ালো । মুখ ফেরালো অন্য দিকে ।
ওকে ওভাবে দেখে একটু হাসলো রাফি । বাইরে কারোর পায়ের শব্দে উঠে দাঁড়ালো । ঘুরে মিহির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো । গলা ঝেড়ে মিহি কে বললো….
” ওঠো , ওয়াশ রুমে যাবে । ফ্রেশ হবে….
” আমি যেতে পারব , আপনি যান ।
মিহির অস্বস্তি বুঝে রাফি বললো….
” কোলে নেবো না , হাত ধরবো শুধু । ওঠো ।
” ওঠে পড়েছিস পাখি ??
রুহির উচ্ছ্বাস কন্ঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরলো মিহি । রুহি এক ছুটে এগিয়ে আসলো । রাফি কে দেখে কপাল গুটিয়ে বড়দের ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে….
” তুমি এখানে কি করছো ?
রাফিও চোখের চাহনি সূক্ষ্ম করলো । বোনের মাথায় একটা গাট্টা মেরে চাপা আদুরে কন্ঠে বলল….
” তোর ভাবি জান কে দেখতে এসেছি ।
” উহুম ,, বিয়ের আগে তো এতো দেখা দেখি চলবে না ।
দুহাত বুকে ভাঁজ করতে করতে গুরুভার ভঙ্গিতে বলল রুহি । রাফি চাহনি আরো তীক্ষ্ণ করলো । ফিক করে হাসলো রুহি । ওর হাসি দেখে রাফি বলল….
” মারবো একটা । বেশি বেশি কথা শিখেছিস না ?
রুহি গম্ভীরতা বাড়ালো । কন্ঠে রসিকতার টোন টেনে বললো ….
” মেরে দেখাও ! আমাকে মারলে কিন্তু আমার বনুর সাথে বিয়ে দেবো না তোমার !
আমি কিন্তু সম্পর্কে তোমার বড় , মনে রেখো পাখি আমার থেকে দুই মাসের ছোট । সেই দিক থেকে আমি তোমার সম্বোন্ধে বড় শালি , থুরি শালি তো বলা যাবে না , বড় আপু হোই তোমার । সো , রেসপেক্ট মি , ওকে ! তুমি আমার ছোট বোনকে বিয়ে করবে , আর আমাকে মার খাওয়ার ভয় দেখাবে ? সাহস তো কম নয় ! বলবো আব্বু কে ? এই ছেলে ভালো না , সম্মান করে না আমাকে , আমার মতো গুরুজনকে । এই ছেলের সাথে আমাদের বাড়ির মেয়েকে , আমার একমাত্র পাখিকে কিছুতেই বিয়ে দেবো না ।
কথা গুলো খানিক দেমাক দেখিয়ে বললো রুহি । মিহি হেসে উঠলো ফিক করে । রাফির তীক্ষ্ণ সরু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণ তর হলো । মুখ ফাঁক করে কয়েক মুহূর্ত রুহির ভঙ্গিমা দেখলো ও । নীরব পরিস্থিতি বুঝে রুহি আড়চোখে তাকালো রাফির দিকে । অমনি তেড়ে আসলো রাফি ।
” তবে রে , তোকে তো আমি…..
তৎক্ষণাৎই ছুট লাগিয়েছে রুহি । পিছু পিছু ছোটদের ন্যায় ধাওয়া করলো রাফি । রুহি ছুটে খাটের অন্য পাশে আড়াল হলো । খাট টাকে চক্কর কেটে দৌড়াচ্ছে দুই ভাই বোন । মিহি মাঝখানে বসে দেখছে ওদের । একবার রুহিকে তো অন্যবার রাফি কে । রুহি চেঁচিয়ে উঠলো…..
” খবরদার ভাইয়া ,, যদি আমাকে কিছু করেছো তাহলে আমি সত্যিই সত্যিই বিয়ে ভেঙে দেবো কিন্তু । আমি কিছুতেই এমন বেপরোয়া ছেলের সাথে আমার বনুর বিয়ে হতে দেবো না । বড়দের সম্মান করতে জানে না , বড় আপু কে মারার জন্য পিছু পিছু ছোটে । এটা কোন ধরনের ইয়ার্কি, হ্যাঁ ? আমি কিন্তু আব্বু কে সব বলে দেবো…
রাফি দাঁড়ালো । থামলো রুহিও । রাফি প্রশ্ন করলো….
” কি বলবি আব্বু কে ?
রুহি মিনমিন করে থেমে থেমে উত্তর করলো…
” বলবো,, বলবো আমি…
” বল কি বলবি ?
” কি বলবো ? কিছুই বলবো না !
বোকা বোকা স্বরে হেসে ফেললো রাফি । খানিক বাদ রুহিও । হাসতে হাসতে গদগদ হয়ে মিহির সামনে এসে দাঁড়ালো । রাফি গিয়েই আরো একটা গাট্টা মারলো ওকে । রুহি চোখ মুখ জড়ো করে মৃদু স্বরে আহ্ করে উঠলো । মাথায় হাত বোলালো সাথে সাথে ।
মিহি কে হাসতে দেখে চোখে মুখে প্রগাঢ় হাসলো রাফি ।
ওদের ভাই বোনের খুনসুটিও হলো অনেক দিন পর । রুহি আবার বললো ।
” বলবো তো , আব্বু কে বলবো আমার একমাত্র পাখিকে যেনো আমার একমাত্র ভাইয়ার বউ করে এই বাড়িতে সারাজীবন রেখে দেয় ।
কাটলো আরো দুদিন । সেদিন থেকেই অফিস পুনরায় জয়েন করেছে রাফি । সকাল সকাল অফিসে যায় । দুপুরে লাঞ্চ করতে আসে , বিকেলের দিক আবার যায় । ফেরে একেবারে সন্ধ্যার পর ।
কাল মেহজাবিন কে নিয়ে এসেছে মাহিম । এবার বহুদিন থাকবে ও । মাহিমের অফিসের জন্য ওকে ফিরতে হয়েছে আজ ।
মিহি হাঁটা চলা করছে । তবে অতি সাবধানে । ও যতটা সাবধানী , তার থেকেও অধিক সাবধানী বাড়ির লোক ।
সন্ধ্যার পর পর ড্রইং রুমে বসেছে মহিলা পার্টি । মিহি,রুহি, মেহজাবিন, জেনি এরাও আছে । চব্বিশ টা সিঁড়ি বারো মিনিট ধরে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে একেকটাকে পাড় করিয়ে মিহি কে নিচে নামিয়েছেন সাবিনা বেগম । মিহি বিন্দাস আছে , এতো কিছুও হয় নি ওর । তবুও বাড়ির সবাই বেশিই খেয়ালি ওর প্রতি ।
মিহির যে গুলি লেগেছে এটা বাড়ির সবার জানা কিনা সন্দেহ । রাফি বেশ অবাক হয়েছে এই নিয়ে । ওকে কেউ একটা বারও জিজ্ঞেস করে নি , মিহি বা ওর এই অবস্থা কি করে হলো ? গুলি লাগা স্বাভাবিক নয় । কি করে ঘটলো এই অস্বাভাবিক ঘটনা ?
কে টার্গেট করলো রাফি আর মিহি কে ? এসব কেউ কেনো জানতে চাইলো না ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর মুখোমুখি হাজার বার পড়েছে রাফি , তবুও রাশেদ রায়হান চৌধুরী এক বাক্য ও জানতে চান নি । রাফিও নিজে থেকে বলে নি । নিজে থেকে বললে পানি গড়াতো আরো অনেক দূর ।
ড্রইং রুমে বসে টুকটাক কথা হচ্ছে । সাবিনা বেগম চুপ করে শুনছেন । ভীষণ একা লাগছে তার । ভারাক্রান্ত মনে একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে । অস্থির লাগছে ভিতর ভিতর । উপরে উপরে শান্ত থাকার চেষ্টা করছেন তিনি ।
হেনা বেগম শীতল কন্ঠে রুহি মিহির ছোট বেলার ঘটনা শোনাচ্ছেন । তিনি ব্যতীত আর কারোরই জানা নয় এগুলো । হালিমা বেগম তো এই বাড়ির বউ হয়ে আসলেন কত পর ।
হেনা বেগম নিজ ধ্যানে বলছেন সাবিনা বেগম কে উদ্দেশ্য করে….
” জানেন আপা , আমাদের রুহি আর মিহি কিন্তু রাফির থেকে দশ বছরের ছোট । রুহির থেকে দুই মাসের ছোট মিহি । শান্ত এমনি এমনি রুহিকে ছিঁচকাদুনে বলে না , রুহি ছোট বেলায় কাঁদতো অনেক …
” আম্মু… তুমিও ?
হেসে উঠলো সবাই । রুহি মুখখানা ভার করলো । বললেন হেনা বেগম….
” আরে আমি তো এমনি এমনি বলছি । তুই ছোটতে কাঁদতিস খুব । কিন্তু মিহি কাঁদতো না । একটু ও জ্বালাতন করতো না । সব সময় ফিক ফিক করে হাসতো । কি মিষ্টি ছিলো ও জানিস ? সবে কথা বলতে শিখেছিলো , আমায় তখন মাম বলে ডাকতো ।
তোরা দুটোতে কত খেলেছিস । ছোট্ট ছোট্ট দুটো পায়ে পুরো বাড়ি গুটি গুটি পায়ে হেটে বেড়াতিস । মেহজাবিন তোদের থেকে বড় ছিল । কি মেহজাবিন , মনে আছে তোর ?
রুহি মিহির থেকে পাঁচ বছরের বড় মেহজাবিন । সেই দিক থেকে তখন ওর বয়স ছিল সাত বছর । মনে নেই তেমন কিছু । ও খানিক ইয়ার্কি করে ঠোঁট কামড়ে বললো….
” মনে আছে তো মামনি ,, কি মনে আছে জানো ? রুহির কান্না ….
বলেই ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করলো । রুহি জ্বলে উঠলো । বসা থেকে উঠলো । গাল ফুলিয়ে বললো…
” তোমরা সবাই এখন আমায় নিয়ে পড়লে ? ওনার মতো তোমরাও ? ভাল্লাগে না আমার ! থাকো তোমরা , আমি গেলাম ….
রুহি সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে নিলে আফসানা বেগম খানিক গলা ভার করে ধমকে বললেন….
” উনি,উনি কি হ্যাঁ ? ভাইয়া বলতে পারিস না ?
থমকালো রুহি । এই ভুলটা আফসানা বেগম সচরাচর ধরেন । রুহি কিনা শান্ত কে ভাইয়া বলবে ? এটাও সম্ভব ? রুহি নিজে থেকে কখনো বলেনি । আফসানা বেগমের ধমকের পর বহুবছর আগে একবার ভাইয়া বলে ডেকেছিল , শান্তর ধমকে আবার শুধরে গেছে । কেউ না বুঝলেও মেহজাবিন আর মিহি একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে উঠলো ।
একটু দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করতে করতে উপরে উঠে গেল রুহি । মেইন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো শান্ত । মায়ের কথাটা কান এড়ায় নি । এটা যে আরো কতদিন চলবে কে জানে ? নাহ ,আর পারা যাচ্ছে না । ভবিষ্যতের জামাই বউ কিনা ভাই বোন ? এটা মেনে নেওয়া যায় না । এবার একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে । রাফি শান্ত কে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো । দূর থেকে সবার সাথে মিহি কে দেখে মুচকি হাসলো । মেয়েটা সোফার উপর পা তুলে হেনা বেগমের কোলে হেলান দিয়ে বসে আছে আরামে । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ঝুলছে । ওর নিচে নামা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলো না রাফি । শরীর টা ক্লান্ত লাগছে । মাথাটাও ধরেছে । চিনি ছাড়া কড়া করে একটা ব্লাক কফির প্রয়োজন । যেটা এই মুহূর্তে রোজই প্রয়োজন হয় ওর । রাফি আর শান্ত কে আসতে দেখে আফসানা বেগম সেদিকে খেয়াল দিলেন । উদগ্রীব হয়ে বলে উঠলেন…
” এসেছিস তোরা ? ভাইয়া আসে নি ?
প্রথমেই ভাইয়ের খোঁজ দেখে ভ্রু গুটালো শান্ত । এগোতে এগোতে বললো…
” না আসে নি । আসবে একটু পর ?
” আচ্ছা । কখন আসবে ?
” আটটার পর । কেনো বলতো ?
” তোকে কেনো বলবো ? আমার ভাইয়ার সাথে দরকার আছে আমার ।
শান্ত পেচাল বাড়ালো না । রাফি সবাইকে এক পলক করে দেখে ক্লান্ত স্বরে বলল….
” আম্মু , এক কাপ কফি পাঠাও আমার জন্য । শান্ত খাবে কি না জানি না , ও খেলে ওর টাও পাঠিয়ে দিও ।
বলেই দায় সারা ভাবে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল । শান্ত ওর পিছু নিতে নিতে বলল….
” আমার জন্য পাঠাতে হবে না মামি । আমি ফ্রেশ হয়ে নিচে নামছি…
দুই ছেলেই এলোমেলো শরীর নিয়ে নিস্তেজ পায়ে উপরে উঠলো । মিহি সরে বসতেই উঠে দাঁড়ালেন হেনা বেগম । আগের কথা টেনে কিচেনের দিকে এগোতে এগোতে বললেন…
” রুহিটাও না , এতো বড় হয়েছে তবুও শান্ত কে ভাইয়া বলে ডাকতে ইতস্তত করে । এমনিতে তো ওদের জুড়ি মেলা ভার । ভাইয়া বলতে কি সমস্যা কে জানে !
কিচেনের দরজার সামনে থেমে পিছু ফিরে আবার বললেন…
” আর একটা কথা মনে পড়ে গেল । মিহি , জানিস , তুই না ছোট বেলায় রাফি কে কখনো ভাইয়া ডাকিস নি । যা কথা বলতে শিখেছিলি, তাতে সবাইকে ডাকতে পারতিস । শান্ত কেও ডাকতিস । কিন্তু রাফি কে ডাকিস নি কখনো । ওকে দেখলেই মুখ ভার হতো তোর । এই নিয়ে রাফি কতো চটে যেতো তোর উপর । তোকে ধরে বেঁধে ভাইয়া ডাক শেখাতো ।
কথা শেষ করে পিছু ফিরে রান্না ঘরে ঢুকলেন হেনা বেগম । হাসলেন হালিমা বেগম আর আফসানা বেগম । হালিমা বেগম হাসতে হাসতেই বললেন…
” ঊনিশ বছরের ভাইয়া ডাক এখনই ডেকে নাও মিহি । কদিন পর তো শশুর বাড়ি যাবে , আর ডাকতে পারবে না কিন্তু । এখন সারাদিন ডেকে ডেকে ঋণ শোধ করে ফেলো ।
মিহি তড়িতে তাকালো সাবিনা বেগমের দিকে । সাবিনা বেগম আগে থেকেই ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো । আম্মু সোজাসুজি দৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে থতমত খেলো মিহি । চোখ খিচে দ্রুত চোখ নামালো । মেয়ে চোখ নামাতেই আলতো হাসলেন সাবিনা বেগম ।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো মিহি । সাবিনা বেগম প্রশ্ন করলেন…
” কোথায় যাচ্ছিস ?
” ঘরে ?
” একা পারবি যেতে ? আমি যাচ্ছি !
মেহজাবিন সোফা থেকে উঠতে উঠতে বললো…
” আপনি বসুন আন্টি । গল্প করুন আম্মু দের সাথে । আমি বনুর সাথে যাচ্ছি ।
দুই বোন সবে দুটো সিঁড়ি উঠেছে অতি সাবধানে । হেনা বেগম ডাকলেন…
” মেহজাবিন , উপরে যাচ্ছিস তো রাফির কফিটা নিয়ে যা না । আমাকে আর উঠতে হয় না তাহলে ।
মামনির কথা মতো মেহজাবিন সিঁড়ি দুটো পুনরায় নেমে কফির কাপ হাতে নিলো । মিহির সাথে ও নিজেও ধীরে ধীরে উঠলো সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে । উঠতে উঠতে মিহি ডাকলো….
” আপু ?
” হ্যাঁ বনু !
” তোমার ছেলে বাবু হবে না মেয়ে ?
মুচকি হাসলো মেহজাবিন । উত্তর করলো…
” আমি কি করে জানবো ! সবে তো দেড় মাস হলো !
” আচ্ছা মেয়ে বাবু হলে ভালো হবে বলো ! আমি একটা নাম ঠিক করেছি ,…
” তাই , কি নাম ?
” মেহরুবা !
সুন্দর না নামটা ? ভাইয়া আর তোমার দু’জনের নামের সাথেই মিল আছে । যদি মেয়ে হয় , তাহলে আমার দেওয়া নামটা রাখবে কিন্তু !
” আচ্ছা রাখবো ।
আচ্ছা বনু , একটা কথা জিজ্ঞেস করি ?
” হুম !
” ভাইয়াকে ভালোবাসিস ?
সবে করিডোরে পা রেখেছিল । আচমকা প্রশ্নে থমকে গেলো পা খানা । ধক্ করে উঠলো মিহি । চকিতে চাইলো আপুর দিকে । মেহজাবিন ওর দৃষ্টি দেখে কপাল গুটিয়ে ভ্রু নাচালো । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মিহি । তবুও চোখ সরালো না । পুনরায় প্রশ্ন করলো মেহজাবিন…
” ভাইয়া তোকে ভালোবাসে , না ?
মিহি আরো বেশি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো । চোখ সরাতে বাধ্য হলো এবার । ওর অবস্থা বুঝে শীতল হাসলো মেহজাবিন । বোনের হাত খানা ধরে বললো…
” আরে পাগলি , হেজিটেড করছিস ক্যান ? আমি কিন্তু সব জানি । একেবারে শুরু থেকেই । কেউই আমাকে বলে নি , তাই বলে কি আমি বুঝবো না নাকি । আমার ভাইয়া কোনো মেয়ে কে পছন্দ করবে আর আমি জানবো না ? আমার বোনটাও যে আমার ভাইয়াকে ভালোবাসে এটা তো পরে জানলাম । ভাইয়ার ভালোবাসার মানুষ টা যে আমার বোন , এটা ভাবতেই ভীষণ আনন্দ লাগছে জানিস ।
আচ্ছা তোকে আমি ভাবি ডাকবো নাকি বনু ডাকবো,বলতো ?
” আপুউউউ …
হাসলো মেহজাবিন । মিহি বললো….
” কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে , আগে গিয়ে দিয়ে এসো যাও ।
মেহজাবিন একটু কাতর ভান ধরলো । বললো…
” তুই দিয়ে আয় না বনু । আমার ভীষণ টায়ার্ড লাগছে । একটু রেস্ট করবো । প্লিজ তুই যা , তোর ঘরের পাশেই তো ভাইয়ার ঘর । ওটুকু হাঁটতে পারবি ।
মেহজাবিনের অবস্থা দেখে দ্বিমত করলো না মিহি । শান্ত ও ঘরে আছে । নিসংকোচে যাওয়া যেতে পারে । বাইরে থেকে না হয় কফিটা দেবে । ভেতরে যাবে না কিছুতেই । রাফির হাবভাব আজকাল ভালো ঠেকে না ।
মেহজাবিন ঘরে ঢুকলো নিজের । মিহি ধীরে ধীরে এগোলো ।
ঘরে এসে প্রথম ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে শান্ত । রাফি কে বলেছে ওর একটা জরুরী কাজ আছে । ফ্রেশ হয়ে সেই কাজেই যাবে । কাজটা পাশের ঘরে , এটা বুঝিয়েছে ইঙ্গিতে ।
মিহি দরজার কাছে যেতে না যেতেই ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো শান্ত । সামনে মিহি কে দেখে মুচকি হাসলো ।
” কি পরী ? রাফির জন্য কফি নিয়ে এসেছিস ?
মুচকি হাসলো মিহিও । বললো…
” হ্যাঁ ভাইয়া ।
” রাফি ওয়াশ রুমে । ভেতরে রেখে আয় ।
বলতে বলতে আবার নিজেকে শুধরে ঝটপট করে বললো..
” এই না না , ভেতরে রেখে এখন আসিস না । আসলেও পাশের ঘরে আসিস না, কেমন ? আমার মিটিং আছে পাশের ঘরে । একটু সময় করে দে পাখি । তোর হবু ভাবির সাথে দরকার আছে আমার । তুই ছোট মানুষ , ওসব বুঝবি না ।
বলেই চোখ টিপলো শান্ত । কানে এয়ার ফোন গুজতে গুজতে আবার বললো…
” আসবি না কিন্তু । আমি যাচ্ছি , কাজ শেষে তোকে ডেকে নেবো ।
বলেই গুনগুন করতে করতে পাশের ঘরে ঢুকলো দরজা ঠেলে । মিহি ওদিকটায় তাকিয়ে মুগ্ধ হাসলো । হাসি গায়েব হলো পরমুহূর্তেই । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাফির ঘরে কফিটা রেখে বেরিয়ে আসতে হবে । পালাতে পারলেই বাঁচে মিহি । এই রুজান রাফি চৌধুরী কে ভরসা নেই আর ।
মিহি দরজা থেকে গলা বাড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিলো । কতদিন পর দ্বিতীয় বারের মতো এই ঘরে মিহি । ভেতরের অদ্ভুত মন মাতানো সুগন্ধে চোখ বুজে আসলো মিহির । ঘরে এসি চলছে । ঠান্ডা শীতল ঘরটা । কি সুন্দর গোছানো পরিপাটি । ঠিক আগের ন্যায় , আগের থেকে ঘরটা চেঞ্জ হয়েছে একটু । নতুন রং করানো হয়েছে এটাই চেঞ্জ । বাকি সব আগের জায়গায় আগের মতোই আছে । মিহি তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকলো । আরো বেশি ঠান্ডা হাওয়া শরীরে ছুঁয়ে যেতেই কাঁপুনি দিয়ে উঠলো ।
শিরশির করে সোজা হয়ে গেলো শিরদাঁড়া । মিহির চোখ বুজে আসলো আবার সেই তীব্র ঝাঁজালো গন্ধটা নাকে আসতেই । কফির মগটা চোখ বুজেই সোফার সামনের কাঁচের ছোট টেবিল টায় রাখলো । দাঁড়ালো সোজা হয়ে । বুক ভরে শ্বাস টেনে গন্ধ টাকে গভীর ভাবে টেনে নিলো নিজের মাঝে । বন্ধ অক্ষি যুগল আর কম্পিত হৃদয় শীতল হয়ে আসছে মিহির । ও এক পা এক পা করে খাটের কাছে এগিয়ে আসলো একই আবেশে । দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে চোখ মেললো । এই সুগন্ধের উৎস টা কোথায় ? এতো মাদকীয় আকর্ষণ কেনো এই গন্ধে । রাফি ব্যাতিত অন্য কারোর কাছে এই গন্ধের ছিটেও পায় না মিহি ।
মিহি সামনে তাকালো । খাটের উপর রাফির কালো শার্ট টা পড়ে আছে । এটাই তো পড়নে ছিলো একটু আগে । ব্লেজার টাও পাশে । মিহি শুল্ক ঢোক গিললো । ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকালো একবার । রাফি বোধহয় এখন বেরোবে না ওয়াশ রুম থেকে । মিহি আরো একটু এগিয়ে রাফির শার্ট টা কম্পিত হাত বাড়িয়ে তুললো হাতের মুঠোয় । মুখ সম্মুখে ধরতেই আরো তীব্র ভাবে গন্ধ টাকে অনুভব করতে পারলো । মিহির আকাঙ্ক্ষিত মন ভরলো না । ইচ্ছে জাগলো আরো গভীরে যাওয়ার । খুব কাছ থেকে অনুভব করার । ভেতরে ভেতরে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে মিহির । গলা কেমন শুকিয়ে আসছে । ও শার্ট টাকে দুহাতে আকড়ে ধরলো । নাকের কাছে টেনে শার্টের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে চোখ বুজলো ।
আচমকা পিছন থেকে কারোর স্পর্শ পেতেই আঁতকে উঠলো । কম্পমান হাত থেকে ফসকে গেল শার্টটা । নিঃশব্দে পড়লো মেঝেতে । মিহি ঝটকা মেরে পিছনে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ওর কোমর জড়িয়ে ধরল রাফি । টেনে নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে মিলিয়ে নিলো মিহির পিঠ । মিহি কে পিছন থেকে জড়িয়ে কাঁধে থুতনি ঠেকালো ।
মুহুর্তেই পাথরের ন্যায় জমে গেলো মিহি । অবস হয়ে স্থির হয়ে আসলো আপনা আপনি । শরীরের ভার হারিয়ে রাফির মাঝে আটকে রইলো । রাফির হাস্কি স্বর…
” কি করছিলেন ম্যাডাম ?
কাঁপল মিহি । নিচের অধর কামড়ে চোখ খিচলো । রাফির ভেজা চুলের পানি মিহির কাঁধে পড়ছে টপটপ করে । প্রতিটা পানির ফোঁটার স্পন্দনে কেঁপে উঠছে মিহি । সাথে রাফির স্পর্শের তীব্রতা তো আছেই ।
রাফির হাতের বাঁধন ধীরে ধীরে শক্ত হচ্ছে । মিহির উদরে হাত পড়তেই মিহি ছলকে উঠলো । বললো কেঁপে কেঁপে….
” ছ.. ছাড়ুন প্লিজ !
” উঁহু , আমার প্রশ্নের উত্তর দিন আগে । কি করছিলেন ?
” কিছু না !
” এটা উত্তর নয় ।
” প্লিজ ছাড়ুন !
মিহির শক্তি নেই রাফি কে ঠেলে দূরে সরানোর । রাফি নিজে থেকে ছাড়বে না এখন । মিহি কে একলা বাগে পেয়েছে অনেক দিন পর । রাফি আরো শক্ত করে জড়ালো । কাঁধ থেকে থুতনি নামিয়ে সেখানে চুম্বন আকলো একটা । কাঁধের পানির ফোঁটা গুলো ওষ্ঠাধরের সাহায্যে শুষে নিলো । আর সহ্য হলো না মিহির । ও শক্তি খাটিয়ে পিছন ফিরলো । দম খিচে দূরে ঠেলল রাফি কে । রাফি নিজের মাঝে নেই । মিহি দূরে সরতেই ও আবারো মিহি কে নিজের কাছে টেনে আনলো । মিহি আর শক্তি খাটাতে না পেরে বুলি ফুটালো রুদ্ধ স্বরে….
” প্লিজ ….
পুরোপুরি দৃষ্টিতে তাকালো রাফি । মিহির কাতর চাহনি দেখে খানিক ওভাবেই তাকিয়ে রইল । রাফির চোখের চাহনি আজ বুঝলো না মিহি । ও চোখ নামালো । শুকনো গলা ভেজালো ঢোক গিলে । রাফি ওকে ছাড়ে নি । বরং এবার সামনাসামনি করে কোমর জড়িয়ে রেখেছে । স্মিথ হাসলো রাফি । নিজেকে সংবরণ করে মিহির লালিত মুখখানাতে ফুঁ দিলো । তৎক্ষণাৎ শ্বাস টানলো মিহি । মিহির দু’টো হাত রাফির দুই কাঁধের পাশে । এক হাতে মিহি খামচে ধরলো রাফির খয়েরী টি শার্টের অংশ ।
ফের একই স্বরে প্রশ্ন করলো রাফি । হয়তো জেনে বুঝেই….
” What were you doing in my absence?
( আমার অনুপস্থিতিতে কি করছিলে ? )
মিহির উত্তর চাপা রুদ্ধ গলায়…
” কিছু না !
” কিছু তো করছিলে ।
কথা শেষ করেই রাফি মেঝেতে নিজের পড়ে থাকা শার্টটার দিকে তাকালো । প্রশ্ন করলো….
” আমার শার্টে কি ছিল ?
” গন্ধ !
কপাল কুঁচকে আসলো রাফির ।
” গন্ধ ?
” সুগন্ধ ?
ঠোঁট চেপে ধরলো রাফি !
” কেমন সুগন্ধ ?
” জানি না !
” কি জানো ?
” কিছু না , ছাড়ুন !
” ছাড়বো না তো । আজ তুমি এসেছো , আমি কিন্তু যাই নি ।
” ক..কফি দিতে এসেছি ।
” প্রথম বারও এসেছিলে কফি দিতেই । সেবার ছেড়েছিলাম বলে আজ ও ছাড়বো নাকি ?
মিহি আঁতকে চাইলো । সঙ্কিত অক্ষি যুগলে কয়েক পলক পড়লো লাগাতার । রাফি আবার বললো….
এক দেখায় পর্ব ৫০
” আজ ছাড়ি বা না ছাড়ি । একটা কথা শুনে রাখো…
আজ দ্বিতীয় বার এসেছো আমার ঘরে , তৃতীয় বার আর আমার ঘরে এভাবে আসবে না । এবার আসলে , রাঙা বউ রুপে রাঙ্গা শাড়ি পড়ে ফুলে সজ্জিত আমার এই ঘরে , ডিরেক্ট বাসর ঘরে আসবে । আমিই নিয়ে আসবো…গট ইট ??
