এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩২
আসিফা খান
রিফাত কে হুট করেই নিজের সামনে দেখে কিছুটা চমকে উঠে নূর।।কিন্তু কোনো রূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে আসতে নিলে শুনতে পায় রিফাত এর কন্ঠ,,,,
“উপেক্ষা করার কারণ বললে আর তোমার সামনে এসে দাঁড়াব না নূর।”
রিফাত এর কথা শুনে এক মুহূর্ত নূরের পদচারণ থেমে গেলেও পরপর আবারও হাঁটা শুরু করে। উত্তর দেয়না রিফাত এর কথার।। রিফাত ও যেনো নাছোড় বান্দা হয়ে মঞ্চে নেমেছে।। নূরের সামনে দাড়িয়ে আবারও জিজ্ঞাসা করে,,,
“কেনো করছো এমন নূর!”
“সরে দাঁড়ান,,,আমায় যেতে দিন।”
কাঠ কাঠ গলা নূরের। নিজের আবেগ কে একপ্রকার প্রত্যাখ্যান করছে নূর। এমন আচরণে ক্ষিপ্ত হয় রিফাত,,,তেজ দেখিয়ে বলে,,,
“আমার প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোথাও যেতে পারবে না তুমি।।”
“কিসের অধিকার!”
আবেগে আপ্লুত হয় রিফাত। চোখে এক রাশ তরঙ্গ,,,অনুভূতির জোয়ার,,,লাগামহীন করুনা। কন্ঠে জর্জরিত অনুরাগ।। রিফাত নূরের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবে বলে,,,
“সেটা মুখে প্রকাশ করার অপেক্ষা রাখে না নূর,,,একবার আমার চোখের দিকে তাকাও,,,আমার ভিতরে বহমান ঝড় বাতাস বইছে যাহ প্রতিনিয়ত আমায় লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে।। তোমার উপেক্ষা পোড়াচ্ছে আমায় নূর,,,,এই পীড়া থেকে আমায় মুক্তি দাও।”
নূর বাক্যহীন রয়।। অন্তর কাপছে তার। কান্না গুলি গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকা পড়েছে যেনো। শাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার আকুতি তাকে ছারখার করে দিচ্ছে। মন চাইছে ঝাপটে ধরতে রিফাত কে। নিজের ভালোবাসার ভাব প্রকাশ করতে,,,কিন্তু তার কপালে যে সীমাহীন ত্যাগ। তার উপর ভালোবাসা নিষিদ্ধ।। নূর নিজেকে সামলে ওঠার আগেই রিফাত এমন কথা বলে উঠলো যার জন্য নূর মোটেই প্রস্তুত ছিলনা।।
“আমায় বিয়ে করবে নূর?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নুর যেনো আসমান থেকে পড়লো।। সুনসান নীরবতা ছড়ালো চারিপাশে। আশেপাশের সব কিছুই যেনো নূরের দৃষ্টি সীমানার বাইরে। মনে হচ্ছে কেউ যেন নূরের হৃৎপিণ্ড খামচে ধরেছে,,,নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।। রিফাত এর এহেন বাক্য নূর কে যেনো অফুরন্ত কষ্টের সাথে সাক্ষাৎ করিয়েছে। হ্যাঁ কষ্ট! অন্যান্য রমনীর কাছে যেটা সুখ নূরের কাছে সেটা দুঃখ। নূর যে অনন্য। প্রিয় পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সর্গিও পস্তাব পেয়ে যেখানে আনন্দে আত্মহারা হওয়ার কথা সেখানে নূর হৃদ মাঝারে অসহ্য ব্যাথা অনুভব করছে। অবমূল্যায়ন এই প্রস্তাব আজ।। কাজল কালো চোখ নিমিষেই ভিজে উঠলো। রিফাত এর কাতরতা পরিপূর্ণ ওই আঁখি জোড়ায় শুদ্ধ ভালোবাসার ছাপ স্পষ্ট।।ঠোঁট কাপছে নূরের,,,সাথে সারা বদন থরথর করছে,,, অসাড় হয়ে যাচ্ছে পা,,,দাড়িয়ে থাকা বড়ই মুশকিল হয়ে আসছে এখন।।
রিফাত এখনও তাকিয়ে আছে নূরের দিকে,,, দেখছে সেই ডগর আখি জোড়ায় টাইটুম্বুর পানির আবরণ।। রিফাতের ইচ্ছে করছে সেই চোখের পানি নিজের আঙ্গুল দ্বারা মুছে ফেলতে, ইচ্ছে করছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ায় ভরপুর মেয়েটাকে নিজের সাথে বেধে ফেলতে ,,,নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করতে। কিন্তু তার যে হাত বাধা,,, তার যে নেই সেই অধিকার।।
রিফাত সুধীর কন্ঠে ডেকে ওঠে,,,”নূর,,,,”
আহা কি শীতল ডাক। কি আদর সেই ডাকে। নূর নিজের চোখ ফট করে বন্ধ করে ফেলে আর সাথে সাথে গড়িয়ে পড়ে সে অবাধ্য নোনা পানি,,,ভারিক্কি নিঃশ্বাসে নিজেকে শান্ত করে।। সুখ তার আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে যেন,, মাঝেমধ্যেই নূরকে ডেকে বলছে ‘ আমাকে ধর ‘।। নূর বারেবারে শুকনো ঢুক গেলে,,, নিরস গলা ভিজাতে যেন মরিয়া হয়ে ওঠে।। চারিদিক কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে নূরের কাছে,,, এক পা দু পা করে পিছিয়ে যায় নূর। যেন সে রিফাত এর কাছ থেকে পালাতে চাইছে।। কোনরকম কম্পনরত কন্ঠে নূর বলে ওঠে,,,,
“আপনি আমার সামনে আর আসবেন না রিফাত,,, কখনো আসবেন না।”
কথাটি বলেই নূর পিছন ঘুরে দৌড় দেয়। তার গায়ে জড়ানো হালকা পাতলা শালটা একপাশে হয়ে হেলে মাটির সাথে লুটিয়ে পড়ে। মাথায় রাখা কাপড় খুলে চুল বাঁধভাঙ্গা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আর হাওয়ার সাথে দুলে দুলে রিফাতকে যেন বিদায় জানায়।। রিফাত নুর বলে ডাক দিলেও কঠিন অবয়বটি ঘুরেও তাকায় না।। রিফাতের নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে,, মনে হচ্ছে যেন কেউ ভারি পাথর চাপিয়ে দিয়েছে বুক মাঝারে, শুধু চেয়ে রয় নূরের যাওয়ার পানে ,,মেয়েটা যেন আজ বড়ই অচেনা।
নূর মেসে প্রবেশ করেই তার রুমে যায়। বেসিনের সামনে আসতে না আসতেই হরহর করে বমি করে ভাসিয়ে দেয় চারিপাশ,,, বেসিনের সামনে লাগানো আরসিতে নিজের চেহারা দেখার আগেই অচেতন হয়ে পড়ে মেঝেতে।।
” সেদিনের পর কেটে যায় বেশ কিছুদিন চোখের তৃষ্ণায় আমি পাগল প্রায়।। সেদিনের পরের দিনই নূরের প্রচণ্ড জ্বর আসে,, বয়েজ হোস্টেলের এক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি তার মেসে যাওয়ার পারমিশন পাই না।। সারাটাক্ষন নূরের ভাবনায় ডুবে থাকতাম আমি।। বিরহ আমায় আঁকড়ে ধরেছে,,, খাওয়া দাওয়া পড়াশোনা যেন ভুলেই গেলাম।। আমি যে প্রেম সাগরে ভেসে গিয়েছি তার কুল কিনারা আমি খুঁজে পাচ্ছিনা।। সেদিনের নুরের চোখ আমায় বারবার বলছে,,,নূর আমায় ভালোবাসে। কিন্তু নূরের কঠিন অবয়ব তার ভালোবাসা কে ঢেকে রেখেছে,,,,কিন্তু কেনো? নূরের নিষ্ঠুর আচরণের পিছনের কারন কি? কেনো সে আমার ভালোবাসা অস্বীকার করছে? এই রকম এর প্রশ্ন রাতে ঘুমাতে দিত না আমায়।। রোজ নূরের মেসের সামনে একনিষ্ঠতার সাথে হাজিরী জানাতাম। এক পলক নূর কে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম।। নূরের অসুস্থতা আমায় দগ্ধ করতো।।
একদিন সন্ধায় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে। মুষলধারার বৃষ্টি। মানুষ জন্য রানাঘোনা কমতে শুরু করে।। সেই বৃষ্টির মাঝে আমি নূরের বাড়ির সামনে বৃহৎ শিমুল গাছের নিচে করা ছোট্ট বেঞ্চের উপর বসে আছি।। আকাশ মাঝের মধ্যে তীব্র গর্জন তুলছে।। শীতে কেপে উঠছে আমার শরীর,,,ছোটকাল থেকেই বৃষ্টির পানিতে অসুস্থ্য হই আমি,,,তাই নিজে থেকে কখনোই বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছে হয়নি আমার।। কিন্তু সেদিন আমি নিজের মাঝেই ছিলাম না যেনো,,,এতদিনে পাগল প্রেমিক এর মোহর এঁটে গেছে রিফাত নামের সাথে।। ঝুবুথুবু অবস্থা,,,চোখ জ্বলে ওঠছে ধীরে ধীরে।। বিমর্ষতাপূর্ণ অবসরে হঠাৎ করেই নিজের উপর বৃষ্টির পানির আবাস না পেয়ে আশ্চর্য হয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম,,,”
কালো রঙের ছাতা ধরে দাড়িয়ে আছে নূর। ছাতার অর্ধেক অংশ রিফাত এর মাথার ওপরে। চোখের নিচে কালি পড়া,স্বাস্থ্যহীন রুগ্ন শরীরে ক্লান্তিবোধ স্পষ্ট। মুখশ্রী গ্লানিতে ভরপুর,,,ঠোটে যেনো খরা পড়েছে মেয়েটার। অন্তরে মৃদু ব্যথা অনুভব হলো নূরের।। কিয়ৎকাল পর পর গগনে বিদ্যুতের ঝলকানি নূরের শুভ্র মেঘের মত আননে পড়ছে।। রিফাত এর বুক মুচড়ে উঠলো।। তার চঞ্চল,প্রাণবন্ত,সুশ্রাব্য নূরের এহেন অবস্থায় দেখে পাথর প্রায় তার চিত্ত।। বৃষ্টির তেজ বাড়লো,,,আজ যেনো ধরণী কে ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তার।। বিদ্যুতের সাথে ভেসে উঠলো দুই মানব মানবীর অবয়ব।। জনশূন্য পরিবেশে দুই নর নারী সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করার চেষ্টায় লিপ্ত। কেও তার ভালোবাসা লুকাতে ব্যাস্ত তো কেও ভালোবাসার উজাড় করার লক্ষ্যে।।
নূর শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল রিফাত এর দিকে। প্রিয়তম পুরুষের এরকম মাতাল অবস্থা আশঙ্কাজনক।। কেঁদে উঠলো অন্তর।। আকুলিবিকুলি অনুভূতিতে খলবলিয়ে ওঠে হৃদ।। রিফাত এর চাহনি সরল কিন্তু ভয়ংকর। চোখ বলেছে তারা কতদিন দুই পাতা এক হয়নি।। নূর প্রচুর কষ্টে ফিচলে কন্ঠে বলে উঠলো,,,
“অসুস্থ হবেন রিফাত,,,হোস্টেলে ফিরে যান।”
কথাটি বলেই নূর চলে হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রিফাত কাপা কন্ঠে বলে উঠলো,,,,” বুক পুড়ছে সেটা দেখতে পারছ না?”
নূর ফ্যাকাসে হাসে,,, উল্লাসের হাসি নয়,,,এই হাসি যেনো রিফাত কে ঝাকিয়ে তুললো,,,,নূর বললো,,,
“কারোর শীতল ছোঁয়া লাগবে,,,অপেক্ষা করুন।”
“সেই ছোঁয়া টা তোমার হাতের হলে ক্ষতি কি নূর?”
“অশান্ত মস্তিষ্ক, যত্নহীন হৃদয় আমার,,,আমি যে অপরিপূর্নের নিসানি রিফাত। আমার ছোঁয়া বিষাক্ত,,, আপনার বুকের দহন বাড়িয়ে দেবো।।”
এইবার রিফাত নূরের সামনা সামনি দাড়ায়। চোখে চোখ রাখে। নূরের আত্ম কেপে উঠলো। এই স্নেহ ভরা চোখে সে নিজের সর্বনাশ দেখছে,,,সুখের আবেশে বাঁচার লোভ হচ্ছে তার।। কিন্তু ভাগ্যের লীলাখেলায় নূর আটকা পড়েছে।। ওই চোখের দিকে তাকিয়ে হাতে আর কত দিন আছে সেটাও ভুলতে বসেছে।। নাহ নাহ এই চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যাবে না।। নূর দুই কদম পিছিয়ে পিছন ফিরে চলে যাওয়ার আগেই নিজের বাম হাতের কব্জিতে শক্ত হাতের টান অনুভব করে। এই প্রথম রিফাত তাকে স্পর্শ করল,,,যে স্পর্শে শুধুই অনুরাগ।। শুনতে পায় রিফাত এর নির্মল কণ্ঠ,,,
“নারী দের নাকি এক আলাদা ক্ষমতা আছে নূর। তারা নাকি পুরুষদের চোঁখের ভাষা বুঝে ফেলে!
আমি তো আজ তোমায় স্পর্শ করলাম নূর,,,কি বুঝতে পারলে? কি অনুভব করলে?”
নূর ঘুরে তাকালো। বৃষ্টির ফোঁটা চুয়ে চুয়ে পড়ছে রিফাত এর চাপ দাড়ি থেকে। শরীরে জড়ানো হাকলা আকাশি রঙের শার্ট কুচকে বসেছে সুডৌল দেহের সাথে। শোভন চেহারা দেখে নূর হিমশিম খায়।। ছেলেটা বড্ডো আদুরে।। নূর শান্ত স্বরে বলে,,,,
“ভালোবাসা পাওয়াটা সৌভাগ্যের অনুভূতি,কিন্তু যখন কেও তোমাকে ভালোবাসে,তখন সেটা অমূল্য।। সেই অমূল্য সম্পদ আমার কপালে নেই রিফাত।”
“কেনো নেই নূর। বিশ্বাস করো ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখবো তোমায়,,,এমন ভালোবাসা যা দূরত্বের সাথে মিলিয়ে যায় না। সহস্র, অজস্র, যুগ যুগান্তর কে হার মানায় এমন ভালোবাসা।”
ইসস একই বলে হয়তো সৌভাগ্য।। দুর্ভাগ্য শুধুই নূরের এইযে এত ভালোবাসা পেয়েও সেটা তার নয়।। নূর সামান্য কঠিন হয়ে বলে,,,
“ভালোবাসায় বোকা হতে হয়। আপনি তো ভীষণ ধূর্ত রিফাত।।”
“বোকা হবো তোমার জন্য।”
“আমার প্রতি আপনাকে ভালোবাসা অসম্ভব।”
“আমি সম্ভব করে নেবো শুধু একবার স্বীকার করে নাও আমায়।”
“র রিফাত,,,,”
“ভালোবাসি,,,প্রচুর ভালোবাসি।”
বিকট আওয়াজে মুখরিত হলো পরিবেশ। কথা বলার এক পর্যায়ে রিফাত নূরের কপাল বরাবর এসে দাড়িয়েছে।। ছাতার আবরণ কিয়ৎকাল আগেই হওয়ার জোরে নরম হাতের ফাঁক দিয়ে উড়াল দিয়েছে। এতক্ষণে নূরের অবস্থা খারাপ। বৃষ্টির পানিতে একাকার সে।। মাথায় প্রচণ্ড রকমের ব্যাথা টের পায়,,পরক্ষনেই লুটিয়ে পড়ল রিফাত এর বুকে।। সহসা রিফাত চমকে উঠলো। অচেতন নুর কে দেখে অন্তর আত্মা কেপে উঠলো তার। সময় অপচয় না করে সরাসরি নূর কে কোলে তুলে নিলো।। ছুটে চললো তার মেডিকেলের প্রফেসর ইউনুস আলীর কাছে।। এই মুহূর্তের অন্যকোনো কারোর কথা তার মনে পড়ছে না।।
রুমের বাহিরে দাড়িয়ে আছে রিফাত শরীরে জড়ানো ইউনূস স্যার এর শার্ট প্যান্ট।। ভদ্রলোক ভীষণ ভালো মনের মানুষ। আচানক নিজের বাড়িতে রিফাত আর সাথে তার কোলে অচেতন মেয়েকে দেখে মধ্য বয়স্ক ইউনুস সাহেব কোনো রকম রিয়েক্ট করলেন না তিনি। উপরন্তু নিজের স্ত্রী কে দিয়ে নূরের কাপড় চেঞ্জ করিয়েছেন।। আর চেকাপ করছেন নূরের। একপর্যায়ে তিনি রুম থেকে বেড়িয়ে আসলেন।। ইউনুস স্যার কে দেখেই রিফাত ছুটে এগিয়ে এলো। রিফাত এর অশান্ত অনুভূতির প্রকাশ দেখে তিনি ভরকালেন। তার জানামতে রিফাত দুর্ধর্ষ মেধাবী ছাত্র। যে ছেলে কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও নিরাশ আজ সেই ছেলেই রুমে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকা মেয়ের জন্য এত উতলা।। এটাই হয়তো ভালোবাসা। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস।। রিফাত এর কাধে হাত রেখে তিনি তাকে নিজের পাশে বসালেন,,, কোনরূপ দ্বিধা ছাড়াই জিজ্ঞাসা করলেন,,,
“ভালোবাসো মেয়েটাকে?”
“ভীষণ,,,,”
“ওকে ছাড়া জীবন কল্পনা করতে কেমন লাগে?
“যন্ত্রণা হয় বুকের বাম পাশটায়।”
ইউনুস স্যার হাসে। মলিন হাসি। প্রিয় ছাত্রের বিষাদ ময় করুন অবস্থা দেখে আবেগ প্রবন তিনি।। কি হবে যখন রিফাত জানতে পারবে তার প্রিয়তমা আর বেশি দিন নেই,,,সে যে মেহমান এখন দুনিয়ার। আল্লাহর হাতে সমস্ত কিছু,,,তার ইশারায় গাছের পাতা নড়ে না,,,বাকি আল্লাহর হাতে। ইউনুস স্যার এখন মনে প্রাণে পরম দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন,,,মোজেজা হওয়ার পরম আবদার জানাচ্ছে তার কাছে।।
“আমার নূর ঠিক আছে স্যার?”
চমকে উঠলো ইউনুস সাহেব। কি উত্তর দেবে ভেবে পেলো না তিনি।। নিয়তি কখনোই বদলানো যায়না। তাই সেই কটু সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই তার কাছে।। তিনি কিছুক্ষন চুপ থাকলেন পরপরই রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“নিজেকে গুছিয়ে নাও রিফাত,,,আমি তোমায় যাহ বলবো তাহ তোমার কাছে অপ্রীতিকর।”
রিফাত ভিতর থেকে উত্ত্রাস হলেও নিজেকে সংযত রাখে।।
“আমি যে ভবিষ্যত ডক্টর স্যার,,,অপ্রীতিকর পরিস্থিতি আমার জন্যই।”
ইউনুস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। অতঃপর বলতে শুরু করলেন সেই অকাঙ্ক্ষিত অসুন্দর সত্য।।
“লাস্ট স্টেজ ব্রেইন টিউমার।। এই রোগ খুবই অল্প এবং স্বাভাবিক সুলভ ভাবে দেখা দেয়। ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক লক্ষণ মাথাব্যথা ও চোখে ঝাপসা দেখা। ব্রেন টিউমারের জন্য যে মাথাব্যথা হয়, তা সাধারণত খুব ভোরে শুরু হয়। …
মস্তিষ্কের ভেতর পিটুইটারি গ্ল্যান্ডে টিউমার হলে রোগীর দৃষ্টিশক্তি কমে যায়।। সিমটম্ খুবই সাধারণ বিধায় মানুষ রেগুলার কিছু ওষুধ সেবন করে থাকে,,আর তাতে কিছুদিনের জন্য শরীর ভালো ও হয়ে যায়।। কিন্তু যখন এই রাগ পুরোপুরি ধরা পড়ে তখন তার কোনো উপায় থাকে না।।”
রিফাত এর পায়ের তলা থেকে জমিন সোরে গেলো যেনো। চোখের আকার স্বাভাবিকের তুলনায় বড়ো আকার ধারণ করেছে।। নিজেকে পাগল লাগছে তার। মন চাইছে এটা যেনো কোনো ভয়ানক স্বপ্ন হোক যাহ চোখ খোলার সাথে সাথেই মিলিয়ে যাবে।রিফাত এর হৃদপিন্ড অশান্ত ভাবে দৌড়াচ্ছে।। তার নূরের কিছুই হয়নি!নাহ কিছুই হয়নি।। কিন্তু রিফাত এর এই ভাবনা ভুল প্রমাণ করে ইউনুস স্যার আবার বলে উঠলেন,,,
“নূর কে হসপিটালাইজ করতে হবে দ্রুত। এখন আল্লাহের কাছে দুয়া ছাড়া আমাদের হাতে কিছুই নেই রিফাত।।”
“আমি যেনো তখন নিজের মাঝেই ছিলাম না। মনে হচ্ছিলো কেও যেনো আমার হৃদয় খুবলিয়ে খাচ্ছে।। মাথায় যেনো কেও দুঃখের পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছে।। নূর কে হসপিটালে ভর্তি করা হলো,,,তার মা বাবা পাগল প্রায় হয়ে ছুটে আসলেন। আমায় দেখা মাত্র নূরের মা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমি তাকে শান্ত করার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নিজের অসহায়ত্ব আকাশ ছোঁয়া,,,সেখানে তাকে আশ্বাস দেওয়ার মত কোনই বাক্য ব্যয় করতে অক্ষম ছিলাম।। নূরের বাবা কপালে হাত ঠেকিয়ে দূরে দেওয়াল ঘেঁসে বসেছিলেন।। সেকি মর্মান্তিক দৃশ্য,,,কুড়ি বছরের মেয়ের শেষ সময় পার করছেন দুই মধ্য বয়স্ক নর নারী।
পুরো এক দিন পর নূরের জ্ঞান ফেরে।। হসপিটালের কক্ষের উপুস্থিত বিভিন্ন মেশিন। যা সবটাই নূরের বাঁচার সম্ভাবনা দেখছে।। বারে বারে ডক্টর চেকাপ করছে নূরের।। হাতে সেলাইন,মুখে অক্সিজেন মাস্ক,,,হার্টবিট মাপার যন্ত্র যা প্রতিনিয়ত লাইন উপর নিচ হয়ে বোঝাচ্ছে নূর বেচে আছে।। ওই মারাত্মক সময়ে আমি নিলাম এক কঠিন সিদ্ধান্ত।। চোখে মুখে পানি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলাম,,,তত্পর প্রবেশ করলাম কেবিনে।”
মরণ ব্যাধি রোগ। যেখানে বাঁচার সম্ভাবনা নেই। নেই কোনো চিকিৎসা। যেথায় মরণ নিশ্চিত।। নূর তার মায়ের আদর খাচ্ছে। সময়ের স্রোতের সাথে চলছে নূরের জীবন।। রিফাত কে রুমে প্রবেশ করতে নূর তাকালো তার প্রিয় পুরুষের দিকে। এই মানুষটার স্পষ্ট গভীর ভালবাসার কেন্দ্র সে, কথাটি ভাবতেই সর্ব সুখী মনে হয় নিজেকে।। রিফাত এগিয়ে এলো,,,নূরের দিকে নয় বরং তার বাবার কাছে,,,হাঁটু মুড়ে বসলো সেই অসহায় বাবার সামনে। হাতে হাত রেখে বলল,,,,
“আঙ্কেল পাত্র হিসাবে আমি কেমন?”
এই শোক অবকাশে রিফাত এর এহেন অবাঞ্চিত প্রশ্নে বিস্মিত হলেন নূরের বাবা।।প্রশান্ত মানসিকতা এবং খুবই অমায়িক পার্সোনালিটি সম্পন্ন ভদ্র লোক তিনি। সামনে বসে থাকা ছেলেটি তার হাঁটুর বয়সী,,,ছেলে হিসেবে রিফাত কোনো দিক থেকেই মন্দ নয়,,শালীন,প্রশংসনীয় ব্যাক্তিত্বের অধিকারী রিফাত।। তাই মুচকি হেসে বললেন,
” উত্তম,,,তোমার মত ব্যক্তিত্ব সমৃদ্ধ ছেলেকে কি কেও নাপছন্দ করতে পারে! তুমি শুধু পাত্র হিসেবেই নও একজন পুরুষ হিসেবেও অতিশয় চমৎকার।।”
নুরের বাবা কথা গুলো এমনি এমনিই বলেননি,,,বয়সের একটা অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর চোখ মানুষ চিনতে ভুল করতে পারে না। তারুপর মেয়ের হৃদ মাঝারে লালন করে এই ছেলে,,,বাবা হিসেবে মেয়ের পছন্দের পুরুষের খোঁজ নেওয়া তাঁর কর্তব্য।। নূরের বাবার কথা শুনে রিফাত সাহস পায়,,,দ্রুত শাস ফেলে চোখে আশা নিয়ে বলে ওঠে,,,
“তাহলে এই অতিশয় চমৎকার ছেলেকে নিজের মেয়ের জন্য কবুল করেন আঙ্কেল।।”
রিফাতের এরূপ কথায় নুরের বাবা চমকে ওঠ ে।
হয়তো তিনি আশা করেননি রিফাত এমন কিছু বলে উঠবে। একজন মেয়ের বাবা হিসাবে তিনি সবসময়ই চাইতেন নিজের ফুলের মত মেয়েকে এক উত্তম পুরুষের হাতে তুলে দিতে। যার সাথে তার মেয়ে সুখী হবে আর সেই সুখে ভরপুর মেয়েকে দেখে তিনি নিজের জীবন পার করে দেবেন।। কিন্তু ভাগ্যের নির্মাণ পরিহাস আজ তাকে অন্য এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে এসে দাঁড়াবে বলে নুরের বাবা কখনো কল্পনাই করেননি।।
মেয়ের যে বয়সে বাবা-মা ভাবে তার হাত মেহেন্দি দ্বারা ভরপুর হবে, সেখানে নূরের বাবা নিজের মেয়েকে মৃত্যু সাথে লড়াই করতে দেখছেন।। এ যে কি যন্ত্রণাকর, পীড়াদায়ক লগ্ন তাহ হয়তো মুখে প্রকাশ করা অসাধ্য।।
নূরের বাবা ভাঙ্গা কন্ঠে বলে,,,”এটা সম্ভব নয় বাবা।”
“কেনো সম্ভব নয় আঙ্কেল! বিশ্বাস হচ্ছে না আমায়?”
“আমার মেয়ের ভাগ্যের উপর বিশ্বাস হচ্ছেনা বাবা। আমার মেয়ের কপালে ভালোবাসা আছে,,,কথাটি ভেবেই নিজেকে সফল বাবা লাগছে।”
রিফাত পিছন ফিরে নূরের দিকে তাকায়,,, মেয়েটাও নির্মল চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে,, এতক্ষণে নিজের বাবা আর নিজের ভালোবাসার মানুষের কথোপকথন শুনে সে নিজেও স্তম্ভিত।। রিফাত এর আঁখি জোড়া যেন শান্ত সমুদ্র,,, যে সমুদ্রে যখন তখন মাতাল ঢেউ এর সৃষ্টি হতে পারে। রিফাত নিজের প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে গ্ল্যান কন্ঠে বলে,,,
“কাওকে ভালোবেসে তাকে নিজের করে পাওয়া সহজ হলেও,,,নিজের ভালোবাসা কে হারিয়ে যেতে দেখা বড়ই কঠিন।।”
রিফাতের বলা কথায় পুরো রুম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল শীতল আবহাওয়া।। নূরের বাবা মা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে উঠলো।। নিজের মেয়ের প্রতি কারোর এরকম নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে হতচেতন তারা। রিফাত এবার সুদৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলো,,,,
“আমি নুরকে এখন, এই মুহূর্তে , আপনাদের সাক্ষী রেখে বিয়ে করব,,, আপনাদের সম্মতি আমার কামনা। আর সম্মতি না পেলেও বিয়ে হবে,,,।”
কথাটি বলেই রিফাত রুম ত্যাগ করে নুরের বাবা কিঞ্চিত হাসে,,, যুবক বয়সের রক্ত রিফাতের ধমনীতে দৌড়াচ্ছে,,, তারপর ভালোবাসার শীতলতা বুকের গহীনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।। মেয়ের জন্য এমন ছেলের তালাশ এ তো তিনি ছিলেন। এখন যখন ছেলে নিজ দায়িত্বে তার মেয়েকে আপন করে নিতে চাইছে তখন বিধাতার বিধান তার সম্মুখে এসে হাজির।। নূরের বাবা এগিয়ে মেয়ের কপালে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে আদর মাখা কন্ঠে বলে,,,,
“আমার আম্মু কি চায়! হুমম?”
নূর সরল দৃষ্টিতে তার আব্বুর দিকে তাকালো। রিফাত কে আপন করে পাওয়ার কামনা, আকাঙ্ক্ষাকে আর দমিয়ে রাখতে পারল না।। সুখ নিজে তার দরজায় কড়া নাড়ছে, সেই দরজা কে নিজের ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বন্ধ করে রাখলে যে বড়ই অপরাধ হবে।। রিফাত আল্লাহর পাঠানো অমূল্য উপহার,,,নূর আর অবহেলায় রাখবে না তাকে।। তার নিঃশ্বাসের সাথেই না হয় তাদের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটবে,,,, যতক্ষণ নিঃশ্বাস চলছে, একটু লোভী হলে দোষ কি! সুখের লোভ।। নূর তেজোহানি কন্ঠে সুধায়,,,
“সুখের শহরে দুঃখের আগমন এর মর্ম অতি ক্ষুণ্ণ। কিন্তু দুঃখের শহরে সুখের ছিটাফোটাও বিলাসিতা।।,,,শেষ নিশ্বাস টা নাহয় বিলাসপূর্ণ ভাবেই ত্যাগ করি।।”
নূরের কথা শুনে তার মা চোখ বন্ধ করে উচ্চারণ করলো ‘ আল্লাহ্ ‘।।
কিছু সময়ের মধ্যে হসপিটালে এসে হাজির হলো আহিল এবং দানিশ। নূরের কেবিনের দরজায় সাজানো হলো গাঁদা ফুলের মালা।। রিফাত কেবিনে প্রবেশ করল সাদা রঙের পাঞ্জাবি পায়জামা পড়ে। রিফাত ভ্রু নাচিয়ে,চোখের ইশারায় নূর কে জিজ্ঞাসা করল তাকে কেমন লাগছে ,,,নুর চঞ্চল হৃদয়ে স্যালাইন লাগানো হাত উঁচু করে তর্জনি এবং বৃদ্ধাঙ্গুল এক করে বোঝালো,, সুন্দর।। এক জোড়া লাল ওড়না নূরের মাথায় চাপালো,,, এতেই যেন নূরকে গোধূলিবধূ লাগছে। স্নিগ্ধ মেয়েটার হাতে ফুলের তৈরি বালা পোড়ানো হল।।রিফাত টাটকা রজনীগন্ধা এবং গোলাপ ফুলের তৈরি সেই বালার দিকে রিফাত একবার তাকিয়ে তার নূরের দিকে তাকালো, আজ যেন তার ফুল সমস্ত ফুল হার মানাচ্ছে।। রিফাত চেয়ার টেনে নূরের পাশে বসলো। অতঃপর নূরের বাবার দিকে তাকিয়ে সুস্থির কণ্ঠে বললো,,,
“মেয়ের বিয়ে বাবা পরানো সুন্নাহ ,,,,নিজের সুন্নাহ পালন করুন আঙ্কেল।।”
পিতৃত্ব বোধে জোশ খেলে গেল রিফাতে নিদারুণ কথায়।। রিফাত বড্ডো স্নেহময়, প্রতিভাশালী,বিচক্ষণ একটা ছেলে।। নূরের বাবা এগিয়ে আসলেন,,, বাবা হিসেবে মেয়ের প্রতি দেখা তার স্বপ্ন আজ পূরণ হচ্ছে।। আবেগে উৎফুল্ল নূরের বাবা বিয়ে পড়ালেন তার পাখির। সবাই হাত তুলে দুয়া করলেন সেই পরম দয়াময় আল্লাহর কাছে। নব দম্পতির জন্য শুভ কামনা করলো সবাই নিজ নিজ অন্তরে।পুরো হসপিটালে মিষ্টি বিতরণ করা হলো।।
কবুল বলার মুহূর্তে নুরের চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু কনা। রিফাত তাহ সযত্নে মুছিয়ে দিল,,,,সবার সামনেই কোনো রকম সংশয় ছাড়াই নিজের সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর কপালে এঁ্যঠে দিলো গভীর চুমু। নূর আবেশে চোখ বুজে ফেললো। অনুভব করলো তার শৌখিন ব্যক্তির সোহাগ পরিপূর্ণ ঠোঁটের স্পর্শ।।
পরমুহূর্তেই চোখ খুলে তাকালো,,,সবার দৃষ্টি তাদেরই উপর। লজ্জা পেলো নূর,,,মুখের আদলে লাজ ভরে উঠলো।। মাথা থেকে থেকে ঝিন ঝিণ করে উঠছে তার,,,কিন্তু এই সুখের অবকাশে সেই ব্যাথা কে পাত্তা দিলো না নূর। সেতো দেখতে ব্যস্ত তার আদুরে পুরুষকে। এই দারুন ছেলেটা তার স্বামী ভাবতেই নিজেকে সৌভাগ্যশালী মনে হচ্ছে নূরের।।
নব দম্পতি কে সবাই একা ছেড়ে দিল একাকী সময় কাটাতে।। সবাই বেরিয়ে যেতেই রিফাত ঝাপটে ধরে নূরকে। যেনো ছেড়ে দিলেই নূর হারিয়ে যাবে।। নূর এক হাত রিফাত এর ঘাড়ে রাখে,,,আলতো হাতে বুলিয়ে দিতে থাকে রিফতের ঘাড়,পিঠ।।
“এত সুখী কেনো লাগছে রিফাত?”
রিফাত মুখ তুলে,,,মুহূর্তের মধ্যে নূরের সারা মুখে আদর মাখা চুমুতে ভরিয়ে দেয়।। নূর শুধুই অনুভব করে। শেষের চুমু নূরের ঠোঁটের কিনারে এঁকে দিয়ে দুই হাত নূরের গালে রাখে। মন ভরে দেখতে থাকে নূর কে,,,রিফাত এর এরকম তাকানো দেখে নূর হেসে বলে ওঠে,,,
“শেষ দেখাটা এই ভাবে দেখো।”
নূরের কথায় চেতনা ফিরে পায় রিফাত।এতক্ষণে ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পাওয়ার অনন্দে হারিয়ে গেছিল সুখানুভবে।। কিন্তু সত্য কে কি কেও বদলাতে পারে! রিফাত এর বুকের উপর যেনো কেও পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।। নূরের কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলে রিফাত।।
নূর রিফাত এর পিঠে হাত রাখে,,,,রিফাত ভাঙ্গা কন্ঠে বলে,,,,
“আমি তোমায় কোথাও যেতে দেব না নূর।। আল্লাহ আমাদের সাথে এটা করতে পারে না। ভাগ্য এত নিষ্ঠুর কেনো নূর!”
নূর মোলায়েম কন্ঠে বলে,,,”নিশ্চই আল্লাহ শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।। এর মধ্যেও ভালো কিছু লুকিয়ে আছে রিফাত।”
“কি ভালো লুকিয়ে আছে! তোমায় পেয়েও হারানোর ব্যাথা আমি সহ্য করবো কি করে।। আমি মরে যাবো নূর,,,তুমিহীনা আমার জীবন বৃথা।”
“কেউ কারোর জন্য মরে না,,, কারোর জন্যই কারোর জীবন বৃথা হয় না।। আপনাকে তো বাঁচতে হবে রিফাত,,,এখন যে আপনার মায়ের সাথে আমারও স্বপ্ন আপনাকে পূরণ করতে হবে।।,,একটা ওয়াদা করুন রিফাত।”
“কি?”
“আপনি আপনার জীবন গুছিয়ে নেবেন। আপনি আবার ভালোবাসবেন কাওকে।”
“এটা সম্ভব না নূর।”
নূর মৃদু হেসে বলে,,,”অসম্ভবকে সম্ভব করাই হলো রিফাতের কাজ। আমি তো আল্লাহর কাছে গিয়ে আপনাকে একটা পারফেক্ট লাইফ পার্টনার দেওয়ার কথা বলবো।।”
রিফাত অসহায় তাকায় নূরের দিকে।। নূরের বাম হাত নিজের বুকের বা পাশে ঠেকিয়ে বলে,,,”এইখানে ভীষণ রকম ব্যাথা হয় নূর,,,ছেড়ে যাওয়ার কথা বলো না।”
“আচ্ছা বলবো না।। আজকে তোমাদের ফার্স্ট নাইট রিফাত,,, আপনাকে স্বামীর সুখ দেওয়ার মতো অবস্থা আমার নেই,,, আপনি কি একটু আমার বুকে মাথা রাখবেন।।”
মেয়েটা কি দিয়ে তৈরি রিফাতের বুঝে আসে না।। এই অবস্থায় ও সে স্বামীর অধিকার এর কথা ভুলে যায়নি।। নূরের আদর মাখা আহ্বানে রিফাত কি সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে! আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল প্রেয়সী কে ,মাথা রাখলো নূরের বুকের ওপর।। সময় গড়ালো নিজ গতিতে।। ইস এ সময় যদি এখানেই থেমে যেত! রিফাত যদি পারতো সবটাই আটকে ফেলতে! রিফাত এর কাছে এখন প্রতিটা সেকেন্ড যেন অমূল্য খাজানা। যদি সময়কে ধরে রাখা যেত রিফাত নিজের সর্বশক্তি দিয়ে বেঁধে রাখতো।। আচ্ছা পৃথিবীতে এমন যদি কোন নিয়ম হতো,,,যেখানে লেখা থাকতো – ভালোবাসার মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকা অপরাধ,,তাহলে তো রিফাত ভালোবাসা হারানোর ব্যথা থেকে মুক্তি পেত।। নূর মাঝে মধ্যে রিফাত এর চুলের ভাঁজে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে।। যতটা সম্ভব এই সময় কে আকড়ে ধার যায়।।
নুর আর রিফাতের প্রেমময় অবকাশের মাঝে দরজা ঠেলে হাজির হলো নূরকে প্রথম থেকে চেকআপ করা ডক্টর।। নুর আর রিফাত কে দেখে তিনি মোটেও অপ্রস্তুত হলেন না ,,উপরন্ত মুচকি হেসে বলে উঠলেন,,,
“এ ভেরি হ্যাপি ম্যারেড লা,,,,,,”
লাইফ শব্দটি আর উচ্চারণ করতে পারেন না তিনি।। হাতে তার নূরের বর্তমান রিপোর্ট।। মুখের আদল পরিবর্তন হলো ডক্টরের। এই মেয়েটার জন্য তিনি সূক্ষ বেদনা উপলব্ধি করতে পারছেন,,,এই মায়ায় ভরপুর মেয়েটাকে যেই দেখবে সেই মেয়েটার মায়ায় পড়বে।। ডাক্তারের মুখের রং উড়ে যেতে দেখে নূর কিঞ্চিত হেসে বলল,,,
“আমার হাতে টাটকা ফুলের বালা আছে ডক্টর,,, এই ফুল শুকিয়ে যাওয়া অবধি আমি আছি নাকি তারও কম সময়!”
নুরের এহেন কোথায় কেঁপে উঠলো স্বয়ং ডক্টরের মন,,, যে মনে পেশেন্টের প্রতি মায়া থাকা বেঠিক।। গলা কেশে উঠলেন তিনি,,,রিফাত এর চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না।। ছেলেটা কেমন অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে তার দিকে।। নূর আরো বেশি চিঞ্চল হয়ে উঠলো,,, ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,
“আচ্ছা বলতে হবে না ,,কিন্তু একটা কমপ্লিমেন্ট দিন তো,,, আমার হাজব্যান্ড টা প্রচুর হ্যান্ডসাম তাই না!”
ডক্টর তাকাল রিফাতের দিকে ছেলেটা সত্যি সুদর্শন।। হাসার চেষ্টা করে বললেন,,,”হ্যাঁ,,,,অনেক হ্যান্ডসাম।”
“ধন্যবাদ।। এখন বাজে রাত এগারোটা,আমাদের বিয়ে হয়েছে নয়টায়,,, আমি কোনো আশা নিয়ে থাকতে চাই না ডক্টর। কালকের ভোর আমার জন্য নয় তাই তো!”
এতক্ষণে নূরের বাবা মা, আহিল,দানিশ সবাই কেবিনে এসে হাজির হলো।। নূরের শেষের কথা তারা সবাই শুনেছে।। নূরের মা পড়ে যেতে নিলে তাকে সামলায় দানিশ ,,,আহিল নুরের বাবার খালে হাত রাখে।। ডক্টর কোনো কিছুই বলে না,,,কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় চুপচাপ।। রিফাত গুম হয়ে গেলো।। ঘড়ির দিকে তাকালো,,, মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো সময় যাতে এখানেই থেমে যাক। কিন্তু রিফাতের এই প্রার্থনা বে বানান যা কখনোই সত্য হবে না।। রিফাত সজ্ঞানে থেকেও নিজেকে কেমন অবচেতন লাগছে।
ঘড়িতে তখন রাত দুইটা। চারিদিক নিঝুম। মানবজাতি তন্দ্রায় নিমজ্জিত। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পার হয়ে আজ শুক্রবার।। রিফাত নূর কে ঝাপটে ধরে আছে।। কতক্ষনের এই আলিঙ্গন তাহ বেমালুম।। হঠাৎ করেই নূরের শরীর খারাপ হতে শুরু করলো।। মাথায় প্রচণ্ড ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো মেয়েটা।। নিশ্বাস পরিমাণ বাড়ছে,,,,জোরে জোরে প্রশ্বাস টানছে মেয়েটা।। রিফাত আঁতকে উঠল,,,হৃদপিন্ড অশান্ত তার। চিৎকার করে ডাকতে লাগল ডক্টর দের।। বাকশুণ্য হয়ে নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।।পাগল প্রায় রিফাত।। পানি নূরের দিকে এড়িয়ে দিলে তাহ নাচক করে মেয়েটা।
হুট করেই রিফাত এর নজর পড়ে নূরের হাতের ফুলের বালার উপর,,,,ছয় ঘণ্টায় তাহ প্রায় নেতিয়ে পড়েছে।। ডক্টর এসে কি যেনো চেক করলো,,,অপতপর হতাশ নয়নে তাকালো রিফাত এর দিকে।। এতক্ষণে রিফাতের যা বোঝার বুঝে গেছে।। শরীর শিউরে উঠলো তার,,,ধুপ করে বসে পড়লো নূরের কাছেই।। মেয়েটা কেমন করছে।। নূর রিফাত এর দিকে তাকিয়ে ভারী শাস নিতে নিতে ভাঙ্গা কন্ঠে ধীর গতিতে বললো,,,
“আমি আপনার মনে থাকলেও আজ থেকে আমায় মনে করা বারণ।”
রিফাত ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার ফুলের দিকে।। নূর আবারও বললো,,,,” স্ত্রী কে অনুমতি দিন রিফাত,,,আজ আমার পরম আনন্দের দিন,,,,আজ থেকে নূরের কোনো কষ্ট থাকবে না।। আপন সৃষ্টিকর্তার কাছে যাবো আজ,,, এযে সুখ।”
রিফাত যেনো নিজের মাঝে নেই।। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। হৃদয় আহাজারি করছে।। তাদের ছয় ঘণ্টার সংসার,,,এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখের সংসার ছিল।। রিফাত এর গলা নিরস। অন্তর ছিন্নভিন্ন।। নূরের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে,মেয়েটার গালে হাত ডুবিয়ে বললো,,,
“দিলাম অনুমতি।। আল্লাহ তোমায় শ্রেষ্ট মাকাম দিক আমার ফুল।। আমি রাজি নূর,,,তোমার স্বামী তার স্ত্রীর উপর রাজি।। সাহদাহ্ পড় নূর,,,,”
নূর বিড়বিড় করে পড়লো।। ধীরে ধীরে নূরের চটপটানি কমে আসলো। রিফাত এর দিকে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে দিলো,,,রিফাত ধরে নিলো তার প্রেয়সীর হাত। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসা বিনিময় ঘটালো।। চোখে চোখ, হাতে হাত রেখে তাদের মধ্যকার ভালোবাসার আদান প্রদান ঘটাতে ব্যাস্ত দুই নর নারী। নূরের ঠোটে স্নিগ্ধ হাসি। রিফাত এর নয়ন যুগল হতে গড়িয়ে পড়ছে বারীকনা।। তাদের ভালোবাসা আজ অপূর্ণ হয়েও পূর্ণতা পেল। নূরের চোখ আস্তে আস্তে গ্রথিত হয়ে আসলো। রিফাত অনুভব করলো তার হাতের মাঝে নূরের হাত আলগা হয়ে আসছে। সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই।। পাশের মনিটরে দেখা মিলল সরু লাইন,,,যাহ টু টু শব্দ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। নূরের মা এগিয়ে এলেন,,,মেয়ের কাধ ধরে ঝাকালেন,,,কিন্তু নূরের মাঝে প্রতিক্রিয়া নেই।। মেঝে তে বসে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন তিনি। মা বলে ডাকার কেও রইলো না তার,,,কেও আর তাকে হুট করেই পিছন থেকে জড়িয়ে ধরবে না।। রিফাত ভাবলেশহীন,,,তার মনোভাব বোঝার ক্ষমতা নেই কারোর। সে অপলক তাকিয়ে আছে তার ফুলের দিকে।। যে ফুল চলে গিয়েও নিজের ঘ্রাণ রেখে গেছে রিফাত এর মাঝে।।
(অতীত শেষ)
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩১
চারিদিকে ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে আসলো ইয়ানার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনা পানি। রিফাত চোখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস টানলো। পাশে তাকিয়ে দেখলো ইয়ানা ফুপিয়ে কাদঁছে।। রিফাত আলগোছে আগলিয়ে নিলো তার ইনু কে।।
মনের গহীন থেকে কেও বলে উঠলো,,,’ তার নূর আল্লাহর কাছে গিয়ে সত্যি তার জন্য পারফেক্ট লাইফ পার্টনার এর কথা বলেছে,,,আর আল্লাহ তাকে ইয়ানা দিয়েছে। ‘
