Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৪

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৪

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৪
আসিফা খান

কেটেছে একটা দিন। রিফাত এর যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।। সেই সকালের ফোন কল পেয়ে রিফাত নার্সিংহোম চলে যায় ফিরে আসে যখন তখন ঘড়িতে রাত আড়াইটা।। ঘুমন্ত ইয়ানা কে এক বার দেখে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে।। রাতের খারাপ নার্সিংহোমের ক্যান্টিন থেকেই সেরে ফেলার দরুন ফ্রেশ হয়ে সোজা বিছানায় যায়,,,নিদ্রায় মগ্ন বউ কে টেনে নেয় নিজের সান্নিধ্যে। অভিমানী ইয়ানা ও নিদ্রারার মাঝে তার অভিমান ভুলে বিড়াল ছানার মতো লুকিয়ে পড়ে রিফাত এর প্রশস্থ বুকে। হাসে রিফাত,, ইয়ানার চুল সরিয়ে কপালে গভীর এক চুম্বন আঁকে। ক্লান্তির চোটে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় দ্রুত।।

ইয়ানার ঘুম ভাঙ্গলো সকাল সাড়ে আটটার দিকে।।রাতে রিফাত এর জন্য অপেক্ষা করতে করতে প্রায় একটা পনেরোর দিকে চোখ লেগে যায় তার কখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো তাহ ইয়ানার খেয়াল নেই।। রুমের দরজা ভিড়ানো,,,বেড সাইট টেবিলের উপর রাখা রিফাত এর ফোন। তারমানে রিফাত তার ঘুমিয়ে যাওয়ার পর এসেছে কিন্তু লোকটা এখন গেলো কোথায়! ইয়ানা হাত খোঁপা করে,,আজও শরীর হালকা ভারী অনুভব হচ্ছে তার। ফ্রেশ হয়ে মাথায় ওড়না চাপিয়ে নিচে যায়।। ইয়াসমিন বেগম আর আসফিয়া নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইয়ানা গিয়ে তাদের সাথে গল্প জুড়ায়,কিছু কাজে হেল্প ও করে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নাস্তা টেবিলে রাখার সময় দেখে রিফাত সদর দরজা থেকে বাড়িতে প্রবেশ করছে।। চোখাচোখি হয় দুইজনের। ইয়ানা চোখ সরিয়ে টেবিলে বসে,,রিফাত ও হাত ধুয়ে তার পাশে বসে পড়ল। ধীরে ধীরে সবাই এক সাথে নাস্তা শেষ করে।। রিফাত টেবিল ছাড়ার সময় ইয়ানা কে রুমে আসার কথা বলে প্রস্থান করে।। কিন্তু ইয়ানা জমে থাকে একই জায়গায়।। সবাই বোঝে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মনমালিন্য চলছে,,,তাতে কারোর হস্তক্ষেপ ঠিক নয়।। ইয়ানা টেবিল গোছায় মিসেস আসফিয়ার না করার শর্তেও। এঠো থালাবাসন ধুয়ে চুপ চাপ বসে থাকে সোফায়।সে যাবে না রুমে।।
মিসেস আসফিয়া সবটাই পরখ করছেন।। রিফাত এর জন্য কফি বানিয়ে ইয়ানার কাছে যায়।। কোনো কথা না বলে কফি মগ ইয়ানার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,,,,”যা তো ইনু রিফাত কে দিয়ে আয়। সকালে কফি খাইনি ছেলেটা এখন নিশ্চই কফির দরকার তার।।”

“আমি যাবো না রুমে,,,তুমি যাও দিয়ে আসো।”
মিসেস আসফিয়া হাসে কিছুটা,,,তত্পর ইয়ানা দিকে ঝুঁকে দুষ্টু কন্ঠে বলল,,,”ইসস তোকে দেখে আমি আমি ফিল হচ্ছে। আমিও যখন তোর খালুর ওপর অভিমান করে থাকতাম,তার সামনে যেতাম না তখন এই ভাবেই চুপটি করে বসে থাকতাম।। কিন্তু যখন ভুল বসত তার সামনে পড়তাম হাজার উপেক্ষার পর তখন শুরু হতো আসোল খেলা।”
ইয়ানার মাঝে কৌতূহল সৃষ্টি হয়,,,ঠোঁট ফাঁকা করে,ভ্রু তে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞাসা করলো,,,”কি করতো খালু! মারতো বুঝি!?”

“হ্যাঁ,,মারতো,,,কিন্তু সেই মারের আঘাত দেহে নয় হৃদয়ে হতো।।”
ইয়ানা চুপসে গেল। বুঝলো তার আন্টি মায়ের কথার অর্থ। গাল লাল হয়ে গেল মুহুর্তেই।। তার আন্টি মা বরাবরই তার সাথে ভীষণ বন্ধুসুলভ,অসঙ্কোচ ভাবে সব বলে দেয়। এই যেমন এখন লজ্জাজনক কথা কেমন নির্দ্বিধায় বলে দিলো তাকে।। ইয়ানা আর এক সেকেন্ড দাড়ায়নি। দ্রুত পা ফেলে কফি হাতে নিয়ে চললো সে রুমের দিকে।। তার মনে কেমন এক ভয় বাসা বাঁধলো,,,রিফাত ও কি তার উপেক্ষায় রেগে আছে!
দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করতে দেখলো রুম ফাঁকা। ব্যালকনি তে উকি দিতেই দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত মানুষের।। রিফাত দাড়িয়ে আছে মুখ ঘুরিয়ে। লম্বা,সুঠাম দেহের রিফাত পিছন ফিরে দাড়িয়ে আছে।। ইয়ানা এক ঢুক গিললো। কিছু বলার আগেই রিফাত ফিরে তাকালো। ইয়ানার দিকে তাকিয়েই এগিয়ে আসতে লাগলো বিনা বাক্যে। এদিকে ইয়ানা কোনো এক অদৃশ্য ভয়ে পিছিয়ে যেতে লাগলো একটু একটু করে। পিছিয়ে আসার এক পর্যায়ে ধপ করে পড়ল সোফায়। রিফাত তার মুখ মুখী এসে দাড়াতেই কাপা হাতে কফির মগ এড়িয়ে দিলো।। রিফাত পুরোপুরি তাহ উপেক্ষা করে ইয়ানার হাত থেকে মগ নিয়ে টি টেবিলে রেখে ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার দিকে। শান্ত কিন্তু কঠিন কন্ঠে বলল,,,,

“কখন আসতে বলেছিলাম আমি তোমায়?”
ইয়ানা কিছুই বলে না। ঠোঁট কামড়িয়ে মিট মিট করে তাকিয়ে থাকে রিফাত এর দিকে। ভিতরে ভয়ে সিটিয়ে গেলেও তাহ বাহিরে প্রকাশ করলো না ইয়ানা।। রিফাত আরো একটু ঝুঁকে পড়ে,,,গম্ভীর স্বরে বলল,,,”পুরো পঞ্চাশ মিনিট পর রুমে আসলে! এই প্রবলেম কি তোমার,,,ইগনোর করছ আমায়!”
কি ছেলেরে ভাই,,,কোথায় বউ এর রাগ ভাঙ্গাবে তাহ নয় উল্টে বাবু রেগে গেছে! ইয়ানা দাতে নিচের ঠোঁট কামড়িয়ে এদিক ওদিক মাথা নাড়ায়। মানে না,সে ইগনোর করছে না।। এবার রিফাত টানটান হয়ে বললো,,,”গুড,,,চেষ্টাও করবে না। ফল খারাপ হবে।। অতিরিক্ত অভিমান পরে গভীর রাগে পরিণত হয়,,,যাহ সম্পর্কে তিক্ততা আনতে সময় লাগায় না।।”

ইয়ানা শোনে রিফাত এর কথা। লোকটার কথার মাঝে কিছু একটা আছে যাহ ইয়ানা কে বারংবার মোহিত করে। এই যেমন এখন,,,খুব সহজেই ইয়ানা কে পড়ে ফেললো,,,বুঝিয়ে দিল সম্পর্কের মর্ম। সত্যি বলতে ইয়ানার রাগ অভিমান তো কালকেই রিফাত এর বলা হৃদয় নাড়ানো সুশীল বাক্যে কমে গিয়েছে। আর আজ করা উপেক্ষা রিফাত এর যাওয়ার কষ্টে। সকাল থেকেই বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে তার ।কেনো জানি মনে হচ্ছে লোকটার সামনে গেলে সে ভীষণ দুর্বল হয়ে যাবে।। রিফাত এর প্রতি তার অনুভূতি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ইয়ানা রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো গোপনে,,,লোকটা নিশ্বাসের শব্দও শুনে ফেলে।। রিফাত ধপ করে ইয়ানার পাশে বসে গা ঘেঁষে।। চুমুক বসায় কাপে,,,চোখ বন্ধ করে,কপালে আঙ্গুল ঘোষে কর্কশ স্বরে সুধায়,,,

“ঠোঁট কামড়ানো বন্ধ করো ইডিয়েট।”
ইয়ানা কেপে উঠলো নিমিষেই। স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রয় রিফাত এর দিকে।। রিফাত তাকায়,,,চোখে লাগে ঘোর। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় গোলাপী অধর,,,যাহ দাতে কামড়ানোর ফলে এখন লাল রং ধারণ করেছে। ইয়ানা বিচলিত হয়। চিত্ত আকুল হয়ে ওঠে।।
” এভাবে আর কখনোই ঠোঁট কামড়াবে না,,আমার সামনে তো একদম না। দেখো কেমন লাল হয়ে গেছে। এবার যদি আমি কিস করি তাহলে ব্লিডিং হবে।,,,করবো!?”
শেষের দুই বাক্য রিফাত ইচ্ছাকৃত ভাবে বলে। তার চাওয়া সফল ও হয়,,,লজ্জায় মিহীয় যায় ইয়ানা। ভারী নিশ্বাস ফেলে চোখ ঘোরায় এদিক সেদিক। আরক্ত হয় মুখায়ব।। রিফাত সবটাই দেখে,,,কেনো জানি ইয়ানার লাজুক চেহারা রিফাত এর ভীষণ প্রিয়। আসক্তি হয়ে উঠেছে ইয়ানার এহেন ভঙ্গিমা।।
ইয়ানা জীভ দ্বারা অধর ভেজায়,,,কথা কাটানোর জন্য বলে,,,

“কাল কখন এসেছেন?”
রিফাত হাসে।। বোঝে ইয়ানার মতলব। মাথা এলিয়ে দেয় সোফার পিছনে,,,গভীর শাস ছেড়ে বলে,,,”নাইস ট্রাই।। এখন এই সব টেকনিক কাজে লাগিয়ে নাও পরে আর এই চান্স পাবে না। আমাকে তুমি যা চেনো সে আমার দেহযষ্টি আর যা চিনবে তাহ আমার আত্ম।।”
এবার ঠোঁটের কোণে গর্তের সৃষ্টি হয়,,,অমাইক এক হাসি দেয় রিফাত। তাকায় ইয়ানার দিকে।। ইয়ানার বকা চাহনি,সরল মনোভাব এটাই বুঝে উঠতে পারেনা তার সামনে বসে থাকা ব্যাক্তি তাকে কি পরিমান চায়! কি গভীর ভেবে নিজের মন পিঞ্জরে আটক করে রেখেছে তাকে।। দ্বিতীয় বার নিখুঁত ভালোবাসায় সিক্ত মানব রিফাত,,,যাদের প্রথম প্রেম বিফল তাদের দ্বিতীয় ভালোবাসা হয় ভয়ংকর। রিফাত নিজের ভয়ংকর ভালোবাসার আগুনে ভস্মীভূত করবে তার প্রেয়সী কে,,,তার চঞ্চল বোকা প্রেয়সী।। এদিকে ইয়ানা দেখে রিফাত এর হাসি,,, সচোর আচর হাসে না রিফাত কিন্তু যখন হাসে তখন,যুবতীদের হৃদয় দখল করার মত হাসে। ইয়ানার হিংসে হয়,,,রিফাত এর হাসি সে ছাড়া অন্য কেউ দেখবে কেনো? ইয়ানা মনের কথা মুখে প্রকাশ করে,,,চিত্তহারী সুরৎ বানিয়ে বলে,,,

“আপনি এই ভাবে আর কারোর সামনে হাসবেন না।”
রিফাত ভ্রু নাচায়।। মেয়েটা কি জানে তার হাসি আসেনা সবার সামনে,,,ইভেন অত্যাধিক ক্লোজ মানুষরাই তাকে হাসতে দেখেছে যে হাসি ঠোঁটের প্রশস্ত হওয়ার আকার দেখলেই বোঝা যায়।। খোলা দাত দেখানো হাসি সে একমাত্র ইয়ানার সামনেই হাসে।। রিফাত ইয়ানার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ে,,,ফিসফিসিয়ে বলে,,,,”আর ইউ জেলাস!”
হ্যাঁ ইয়ানা জেলাস। আলবাদ জেলাস সে। কিন্তু চেহারায় ভাবলেশহীন মনোভাব নিয়ে বললো,,,”বয়েই গেছে।”
ইয়ানা আবারও জিজ্ঞেস করে,,,”বললেন না তো কাল কখন এসেছেন?”

“আড়াইটা,,,”
“ওহহ”
ইয়ানা ছোট্ট জবাব দেয়।। রিফাত হুট করেই ইয়ানার কোলে মাথা রেখে সোফায় লম্বা শুয়ে যায়।। মেয়েটা প্রথমে ভরকে গেলেও পরে সামান্য হাসে। দেখে রিফাত কপালে আঙ্গুল ঘোষছে। ইয়ানা মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করছে,,,”মাথা ব্যাথা করছে!?”
রিফাত উত্তর দেয়না শুধুই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়। ইয়ানার খারাপ লাগে। কোনো রকম দ্বিরুক্তি ছাড়াই নিজের চিকন আঙ্গুল গুলি স্পর্শ করে রিফাত এর পৃথু কপালে। হালকা হাতে কপাল টিপে দিতে থাকে।। রিফাত আরামে চোখ বুজে ফেললো। অনুভব করতে লাগল তার বোকা প্রেয়সীর হাতের ছোঁয়া।। ঠোঁট নাড়িয়ে বললো,,,
“ইয়ানা,,,নারীদের রাগতে নেই তাতে তারা ঘোরতর সুন্দরী হয়ে ওঠে,,,আর সেই সৌন্দর্যের প্রভাবে বশীভূত হয়ে আমরা অশালীন হয়ে উঠি।।”
ইয়ানা চমকে উঠলো। কান গরম হয়ে গেল মুহুর্তেই। গাল লালিমায় ছেয়ে গেছে ক্ষণিকের মধ্যেই।। তারমানে রিফাত অশালীন হতে গিয়েও হয়নি!

ঘড়িতে সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা। এক ট্রলি লাগেজ গুছিয়ে রাখা আছে বিছানার পাশে।। লাগেজ গুছিয়ে দিতে ইয়ানা রিফাতকে হেল্প করে।। দুপুরে সমস্ত খাবার হয়েছিল রিফাত এর পছন্দের। রিফাত ও তৃপ্তি সহকারে সমস্ত কিছু খায়।। রাত এগারোটার ফ্লাইট রিফাত বাড়ি ছাড়বে সাড়ে সাতটা কিংবা আটটার মধ্যে।। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর রিফাত নিজ দায়িত্বে ইয়ানা কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে ইয়ানা নড়া চড়া করলেই হাতের চাপে অস্থির করে মেয়েটাকে অতঃপর ধমক দিয়ে বলে,,”খবরদার। চুপ চাপ ঘুমাবে আমার সাথে। বিকালে লাগেজ গুছিয়ে দিতে হেল্প করবে।। আমি চলে যাওয়ার পর একা ঘুমিও,,, এখন শান্তি মত ঘুমাতে দাও আমায়।”
রিফাত এর এহেন সামান্য বাক্যে ইয়ানার কেঁদে ওঠে। মুখ লুকায় রিফাত এর বুকে। মানুষটাকে ছাড়া সে থাকবে কি করে! বুকের মাঝে অসামান্য যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়েছে মেয়েটার। এখন জানি রিফাত কে ছাড়া সে কিছুই ভাবতে পারে না। মানুষটা মন মস্তিষ্ক জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।। ইয়ানা কে নিবিড় ভাবে আগলিয়ে নেয় রিফাত।। ঠোঁট কামড়িয়ে নিঃশব্দে হাসে সে,,,মেয়েটা তার জন্য কাদছে কথাটি মস্তিষ্কে আঘাত করলেই হৃদয়ে কেমন তৃপ্তি লাভ করছে সে।। ইয়ানা কাঁদবে তার জন্য,হাসবে তার জন্য,ইয়ানা জুড়ে শুধুই বিজরণ করবে রিফাত।।

হাতে চায়ের কাপ নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখলো রিফাত পায়চারি করে ফোনে কারোর সাথে কথা বলছে।। আর ঘণ্টা খানিক এর মধ্যেই চলে যাবে রিফাত।। ইয়ানা রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে কাপ টি টেবিলের উপর রেখে ধির পায়ে ব্যালকনিতে দাড়ায়।। মন খারাপের পাল্লা ভারি তার। চোখের কোনে পানি জমে মুহূর্তেই। একদিকে রিফাত এর অতীতও সে পুরোপুরি মস্তিষ্ক থেকে মুছে উঠতে পারছে না,,, তার ওপরে আবার রিফাত চলে যাওয়ার কষ্ট, সব মিলিয়ে ইয়ানার অন্তর বিধ্বস্ত।।
কিছুক্ষণের মাঝে ব্যালকানিতে হাজির হয় রিফাত,, ইয়ানার পিছনে দাঁড়িয়ে দুই দিকে রেলিংয়ে হাত রাখে সে।। আপন অর্ধাঙ্গিনীকে বন্দিনী বানায় মুহূর্তে।। শান্ত কন্ঠে ইয়ানার কানের কাছে ফিসফিস কইরা সুধায়,,,”মন খারাপের কারণ কি আমি?”
ইয়ানা নিঃশব্দে পিছন ফেরে। মাথা উঁচু করে রিফাতের দিকে তাকায়। লম্বা রিফাত কাধ বাঁকা করে চেয়ে রইল তার বোকা প্রিয়সীর দিকে।। ইয়ানা বাচ্চাদের মত মাথা এদিক সেদিক নাড়িয়ে ইশারায় ‘ না ‘ বলে।। রিফাতের ঠোট প্রশস্ত হয়,,, ইয়ানার নাক টেনে দিয়ে বলে,,,,

” মিথ্যুক”
রিফাতের আহ্লাদী কণ্ঠে আস্কারা পায় ইয়ানার আবেগ।। রিফাত কে ঝাপটে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে ইয়ানা।। রিফাত আহত হয় মেয়েটার কান্নায়।
ইয়ানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল রিফাত,,মেয়েটাকে শান্ত করতে হবে। রিফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে,,, ইয়ানার চিবুক ধরে তার মুখ তোলে, বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলে,,,
“কাঁদে না ইনু,,, মাত্র পনেরো কুড়ি দিনের ব্যাপার তারপরে আবার এসে পড়বো,, ততদিনে নিজের যত্ন নেবে। খাওয়া দাওয়া করবে সময় মত। কলেজ যাবে আতিকার সাথে। আর সব থেকে ইম্পর্টেন্ট,, আমায় মনে করবে প্রতিনিয়ত।”
ইয়ানা নাক টেনে ঠোঁট উল্টে বলে,,,”আমায় ভুলে যাবেন না তো!”
রিফাত ভুলে যাবে তাও ইয়ানাকে সেটা কি আদেও ইহ জন্মে সম্ভব।! রিফাত ইয়ানার অবাধ্য চুল কানের পিছে গুঁজে দিয়ে বলল,,,” নিজের অস্তিত্বকে কেউ ভুলে যায় বুঝি!”

“যদি কোনো সাদা চামড়ার রমণী প্রেমের চিঠপত্র দেয়,,,তখন!”
“দেবে না, আর দিলেও বলবো আমার কাছে বউ আছে। No entry”
রিফাতের এই সামান্য শিথিল বাক্যে ইয়ানার মনে প্রজাপতি খেলে যায়।। চেয়ে রয় রিফাতের দিকে। সুদর্শন সুশ্রী মুখশ্রী ইয়ানাকে বারংবার প্রেমে ফেলে।। ছেলেদের এত সুন্দর কি হতে হয়!!,,, পরপরে আবার মনে করে রিফাতের এই সুদর্শন চেহারায় সে একা মোহিত হয়নি,,, হয়েছিল আরো একজন, যে কিনা রিফাত কে রেখে গেছে তার জন্যই।। আচ্ছা সে যদি বেঁচে থাকতো তাহলে তো ইয়ানা কখনো রিফাত কে পেতই না। অবাঞ্ছিত তিক্ত চিন্তা ভাবনা গুলি ইয়ানার মনে দুঃখের ঢেউ খেলিয়ে দেয়।। নিজেকে সংযত রাখে ইয়ান া রিফাত তার বর্তমান ভবিষ্যৎ এর থেকে বেশি সে আর কিছুই ভাবতে চায় না।।

ইয়ানা হুট করেই করে বসে কিছু হৃদয় নিংড়ানো কার্যক্রম যা রিফাতের পুরো সত্তাকে কাঁপিয়ে তোলে।। ইয়ানা পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে দুই হাত রাখে রিফাতের গালের ভাজে ,,,খুবই যত্নে, সংগোপনে ,অনুরাগ মিশিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ায় রিফাতের প্রশস্ত ললাটে।। রিফাত চোখ বুঝে ফেলে অনুভব করে ইয়ানার দেওয়া প্রথম ঠোঁটের স্পর্শ।। রিফাতের হার্টবিট দ্রুত চলছে।। তত্পর রিফাতের চাপ দাড়ি ছুঁয়ে দেয় ইয়ানার চিকন আঙুল। রিফাত তাকায় আবেগী চোখে,,,শুনতে পায় ইয়ানার মোহিত কণ্ঠস্বর,,,

“যান আর দুয়া করুন,যেনো সেই রাতের স্মৃতি গুলি আমার স্মৃতির পাতা থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।। আমি আপনাকে ভালোবাসতে চাই অবিরাম,বাধাহীন ভাবে।”
রিফাতের চিত্ত নড়ে ওঠে,,,কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয় সে।।
‘ নারী বড় অদ্ভুত ‘ এই কথাটি যেন রিফাত আজ উপলব্ধি করতে পারছে।। রিফাত ইয়ানার কোমর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,,,
“তুমি আমার বেচেঁ থাকার গল্প ইয়ানা,,,তোমায় পড়বো বারবার,,, হারিয়ে যাবো প্রতিটা পঙ্ক্তিতে।। আমার হৃদয়ে তোমার জন্য রয়েছে অনুরাগের বিশাল আকাশ,,,সেই আকাশে তোমার ভালোবাসা হবে চাঁদের মত।। ”
“আপনার আকাশে কখনো মেঘ জমে আমার চাঁদ কে ঢেকে দেবে না তো!”
“কখনোই না।।”

ইয়ানা কে লেপ্টে নেয় নিজের বুকে। ইয়ানা চোখ বন্ধ করে শোনে রিফাত এর দ্রুত গতিতে ছুটে চলা হৃদস্পন্দন।। রিফাতের প্রতিটা হৃদস্পন্দন যেন ইয়ানাকে প্রেম বার্তা দিচ্ছে,,, আচ্ছা মানুষটা এত নিখুঁত কেন! এত নিখুঁতভাবে ইয়ানাকে পড়ে ফেলে কিভাবে! অবুঝ ইয়ানাকে বুঝিয়ে দেয় নিরেট পাঠ।। রিফাত অনুভব করে ইয়ানার চিকন আঙ্গুলের চাপ তার পিঠে। উতলা হয় পুরুষ সত্তা,, প্রণয় এসে ঝাকি মারে রিফাতের চিত্তে। রিফাত এর শাস ভারী হয়। মাতাল ঢেউ খেলে যায় বক্ষস্থলে। ইয়ানার গরম নিশ্বাস তার শার্ট ভেদ করে দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। রিফাত পারে না নিজেকে দমিয়ে রাখতে।। ইয়ানাকে বুক থেকে সরিয়ে হাত রাখে মেয়েটির গাল ও কাঁধের ভাজে,,, ইয়ানা পিটপিট করে দেখে রিফাতকে চোখে মুখে কেমন অস্থিরতা,,,মুহূর্তে শুনতে পায় রিফাতের উত্কণ্ঠিত বাক্য,,,
“বেশি না পনেরো মিনিট। এই পনোর মিনিটে একদম চুপচাপ থাকবে ,,নড়াচড়া করবে না ,,,যা হবে তা অত্যাধিক নরমাল।”

ইয়ানা কিছু বুঝে উঠার আগেই রিফাত ঠোঁট বসায় ইয়ানার অধরে।। হাত গলিয়ে দেয় কামিজের আড়ালে। উন্মুক্ত,মেদহীন বদনে জমায় নিজের হাতের আধিপত্য।। ইয়ানা খামচে ধরে রিফাত এর কোমরের কাছের শার্ট। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে ইয়ানা।। হুট করেই রিফাত ঠোঁট ছাড়ে মুখ থেকে নিশ্বাস ত্যাগ করে হালকা স্বরে বলে,,,
“চশমা খোলো আমার,,,অসুবিধে হচ্ছে।”
ইয়ানা ভালো মেয়ের মত তাইই করে।। রিফাতের চশমা খুলে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে।। আবারো ঠোঁটের ভাঁজে রিফাত এর অধর যুগল এর রাজত্ব চলে।। এর আগেও রিফাতের স্পর্শ পেয়েছে ইয়ানা,,,কিন্তু আজকেই চুম্বন যেনো আলাদা। অস্থির,উদ্বিঘ্ন এই ঠোঁটের স্পর্শ। ব্যথায় টনটন করছে নরম অধর। তার ওপর রিফাত এর বেসামাল হাতের ছোঁয়া,,,সব মিলিয়ে ইয়ানা টালমাটাল।। রিফাত মেয়েলি অবয়বে কঠিন স্পর্শে মাতাল করে ইয়ানা কে। পীড়ায়, লাজে প্রমত্ত করে মেয়েটাকে। ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে,,, অস্পষ্ট শব্দ করে ইয়ানা। রিফাত বোঝে ইয়ানার অবস্থা।এবার রিফাত থামে। হাত বের করে ইয়ানার গালে রেখে স্লাইড করে নির্মল কন্ঠে বলে,,,

“Only ten more minutes. Be patient.”
ইয়ানা নতজানু হয়েই উপর নিচে মাথা নাড়ায়।। থরথর করে কাপছে ইয়ানা। ভারিক্কি নিঃশ্বাস নিচ্ছে প্রবল। এইবার রিফাত অদ্ভুত কান্ডে ইয়ানাকে স্তম্ভিত করে। সুদৃঢ় ভাবে ইয়ানার কোমর চেপে নিজের বুকের সহিত আগলিয়ে তোলে। আতংকে নিজেকে রিফাতের প্রশস্থ দেহের সাথে জড়িয়ে নেয় ইয়ানা। দুই বদন মিলেমিশে একাকার হয়। মেয়েলি কাঠামো আচ্ছন্ন হয় পুরুষের শক্ত কায়ায়। পা জড়ায় রিফাত এর কোমরে। ইয়ানা লজ্জায় একাকার। খেই হারাচ্ছে রিফাত,,,আজ তার পুরুষ সত্তা প্রণয় জালে ফেসেছে।। বিধ্বস্তরুপি নিজের লাজ নিবারণের চেষ্টায় লিপ্ত, চোখ বুজে কাপতে থাকা প্রেয়সীর গলায় ঠোট ছোঁয়ার রিফাত।।
ইয়ানা নখ দাবায় রিফাত এর কাধে। পরপরই অনুভব করে মৃদু পীড়া।। রিফাত স্বাদ নেয় মিঠে ইয়ানার গলোদেশের তত্পর দ্বন্ত দ্বারা কাটে, সেথায় আবার চুমুতে ভরিয়ে দেয় দেয়। ইয়ানা গঙ্গড়িয়ে ওঠে।। রিফাত একই অবস্থায় থেকেই রুমে প্রবেশ করে। বিছানায় বসে ইয়ানা কে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। মেয়েটার নাজেহাল অবস্থা দেখে পানির গ্লাস ধরে তার ঠোটে। এক চুমুক দিয়ে সরিয়ে নেয় মুখ।। ইয়ানা কপাল ঠেকায় রিফাতের অবয়বে। প্রেয়সীর গরম নিশ্বাসের উত্তাপে রিফাত ফের ঠোঁট ছোঁয়ায় ইয়ানার মাথার উপরি ভাগে।

“ইয়ানা”
এইবার সামান্য মাথা তুলে তাকায় ইয়ানা।। রিফাত ইয়ানার কপাল থেকে চুল সরিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,,,
“এই শূন্য কক্ষে আমার শূন্যতা অনুভব করবে তুমি।
মনে করবে আমাদের এই ক্ষুদ্র সময়ের প্রনয় মুহূর্ত।
দীর্ঘ প্রনয় রাত্রির জন্য তৈরি করবে নিজেকে।। ফিরে এসে আমি আমার বউ কে দেখতে চাই,,,মিসেস ইয়ানা রিফাত হোসেন।। আই উইল মিসড ইউ সো মাচ ইনু।
কোনো সমস্যা হলে ফোন করবে। কেঁদে নিজেকে অসুস্থ করবে না।। খেয়াল রাখবে নিজের। সুস্থ বউ রেখে যাচ্ছি এসে যেনো এরকমই পাই।।”

ইয়ানা কে বিছানায় বসায়। চোখে চশমা পড়ে আবারও।। ইয়ানা ছোট্ট ছোট্ট বাক্যে সুধায়,,,
“আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।। কারোর সামনে হাসবেন না। আর আমায় ভুলে যাবেন না”
রিফাত হাসে। তত্পর ইয়ানার গলোদেশে নিজের ভালোবাসার চিহ্ন গুলির উপর আঙ্গুল স্পর্শ করে বললো,,,”এই দাগ গুলি নিজে থেকে মেটানোর চেষ্টা করবে না,,, বুঝেছ!”
“উম”
রিফাত এবার উঠে দাড়ায়। সমস্ত দরকারি জিনিস নিয়ে এক পল ইয়ানার দিকে তাকায়। ট্রলি লাগেজ টেনে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,,,”আল্লাহ হাফিজ। নিচে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এখন। ব্যালকনি থেকেই দেখে নিও।”

রিফাত দরজা খুলে বাহিরে পা রাখার আগেই তার কব্জিতে টান পরে। দেখে ইয়ানা অভিলাষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। রিফাত চিত্ত ভরে নিঃশ্বাস টানে। শুনতে পায় ইয়ানার মিহি কণ্ঠ,,,
“আমি আপনার প্রতি অতি দুর্বল আপনি কি তাহ জানেন?”
রিফাত হাসে। সুখের আবেশে অন্তর কেঁপে ওঠে।। ইয়ানার হাতের উপরি পিঠে চুমু দিয়ে আওড়ায়,,
“অনুভবে কাঁচা না আমি।”

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৩

বেরিয়ে যায় রিফাত। ইয়ানা ছুটে চলে ব্যালকনির দিকে। কিয়ৎকাল পরেই দেখে রিফাত গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসছে,,,অবশ্য তার আগে মাথা উঁচু করে দেখে নেই তার বোকা প্রেয়সীর স্নিগ্ধ শোভন চেহারা,,, আঁখির কোণে অশ্রু স্পষ্ট।। ইয়ানা দেখে মুহূর্তেই সাদা গাড়িটি তার দৃষ্টি সীমা অতিক্রম করলো।।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৫