Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৪

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৪

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৪
আসিফা খান

ঘড়িতে সময় নয়টার কাছাকাছি।ভ্রু কুঞ্চিত করে ধীর গতিতে উঠে বসে ইয়ানা। কক্ষ ফাঁকা। রিফাত এর খোঁজে অন্তর ব্যাকুল হলে বিছানা হতে নামে। এলোমেলো বস্ত্রে বেরিয়ে যায়। রান্নাঘর থেকে খুট খাট শব্দ পেতেই ইয়ানা চকিত হয়। তাহলে কি রিফাত রান্নাঘরে!কৌতূহল নিয়ে পা বাড়াতেই দেখে রিফাত খুন্তি নাড়ছে কড়ায়। রান্নাঘরের হাল অগোছালো কিছুটা। ইয়ানা পিছন থেকে আলিঙ্গন করতেই রিফাত প্রশস্থ হাসে। তার বোকা প্রেয়সী জেগেছে। রিফাত ঘুরে দাঁড়ায় । মেয়েটির মাথার উপরি ভাগে চুমু এঁকে বলে,,,
“হ্যাপি ফিফথ ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি,,,ইনু।”
ইয়ানা ত্বরিত মাথা তুলে তাকায়। সুদর্শন পুরুষের কপালে,গলায় ঘামের বিন্দু বিন্দু ফোঁটা। ইসস,,,কি যে আকর্ষণীয় লাগছে লোকটাকে। ইয়ানা রিফাত এর কথায় কিছুটা হলেও বিস্মিত হয়। আজ তারিখ কত! মাথায় জোর দিলেই মনে পড়ে। সে কি করে ভুলে গেলো এই দিনটা! ইয়ানা মৃদু স্বরে আওড়ায়,,

“আপনার মনে ছিলো?”
“মনে না থাকার কারণ!”
ইয়ানা বিস্তার হেসে জড়িয়ে ধরে রিফাত কে। তাদের নতুন পথ চলা শুরু। রাতের কথা স্মরণ হতেই বেশি করে আকড়ে ধরে রিফাত কে। ফজরের সময় উঠে দুইজন একই সাথে গোসল করে নামাজ শেষ করে অতঃপর রিফাত এর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যায় ইয়ানা। বিবাহ বার্ষিকীর কথা যেনো সে ভুলেই বসেছিল। ভাগ্যিস রিফাত মনে করালো। রিফাত তার আদুরে খরগোশ ছানাকে বুকের সতির আগলিয়ে তুলে কিচেন কেবিনেট এর উপর বসায়। অগোছালো চুল কানের পিছে গুঁজে দিয়ে বলে,,,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“তো এই বিশেষ দিনে আপনি আমার কাছ থেকে কি চান মিসেস?”
ইয়ানা রিফাত এর কপালের ঘাম টুকু মুছে দিতে দিতে বলে,,,”আপনাকে চাই। যখন আমার চামড়া কুঁচকে যাবে,যখন আমার চুল সাদা হবে,যখন খিটখিটে মেজাজ নিয়ে কাউকে বকা দেবো ঠিক সেই সময়ে আপনি এসে আমার পাশে দাড়িয়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বলবেন,,,তুমি তো এমন ছিলে না ইনু,বুড়ি হয়ে কেমন হয়ে গেছো।”
কথাটি বলেই ইয়ানা খিলখিল করে হাসলো। রিফাত শুধুই চেয়ে দেখেলো সেই মায়াময় হাসি। আচ্ছা সে যদি জেদ দেখিয়ে বিদেশেই পরে থাকত তাহলে সে এই মেয়েটা কে কি কখনই পেতো! এই সময় তার কাছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকতো! জীবন টা অর্থহীন হতো! রিফাত এর চিত্ত আকুল হয়। ইয়ানা কে সে পেয়েছে কোনো পুণ্যের পরিবর্তে। আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া যেনো কম হবে।। রিফাত ইয়ানার কপালে চুমু এঠে
বলে,,,

“আমি আছি। আজীবন।”
ইয়ানা চোখ ভরে দেখে রিফাত কে। মৃদু স্বরে সুধায়,,,”এরকম সুন্দর লাগছে কেনো আপনাকে?”
“রাতে বউ যা কামাল দেখলো এটা তারই এফেক্ট।”
ইয়ানার কান লাল হয়। সে মোটেও কাল রাতের কথা ভাবতে চায় না। আরক্ত চেহারায় একরাশ লাজুকতা নিয়ে বলে,,,”আপনি কি করছেন করায়ে?”
“পাস্তা,,,তোমার পছন্দের।”
ইয়ানার দুই ঠোঁটের মাঝে কিঞ্চিৎ ফাঁকের দেখা মেলে। অবাক সুরে বলে,,,”আপনি রান্না পারেন?”
“ইয়েস ম্যাম। বিদেশ থাকতে নিজের রান্না নিজেই করতাম। মেড বাকি কাজ করলেও রান্না আমিই করতাম।”
“আর কি কি রান্না পারেন?”
“কি কি খেতে চাও?”
“মানে অনেক রান্না পারেন?”
রিফাত কাটা চামুচে অল্প চিকেন এর পিস তুলে ইয়ানার মুখে দিয়ে বলে,,,”ইন্ডিয়ান,চাইনিজ, থাই, আরো নানান পদের।”

ইয়ানা অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যেনো। লোকটা তাকে আর কত ভাবে চমকাবে। এমন পার্ফেক্ট মানুষ কি ইয়ানার কপালে ছিল? ভাবতেই দেহ শিউরে ওঠে তার। রিফাত প্লেটে পাস্তা সার্ভ করে।ইয়ানা দেখে রিফাত এর কাজের পারফেক্টনেস। ওভেন থেকে গরম চকলেট কেক বের করতেই ইয়ানার চোখ কপালে। পাশে থাকা বাটিতে মেল্ট করা চকলেট রাখা যাহ রিফাত কেকের উপর ঢালে। আহা,,, টেস্টফুল। রিফাত ইয়ানার বিস্মিত নয়ন দেখে স্মিথ হাসে। রিফাত কিছুটা চকলেট নিয়ে ইয়ানার ফুলে ওঠা অধরে লেপ্টে দেয়। অতঃপর খুবই কায়দার সাথে তাহ সফাচাট করে দেয়। ইয়ানা মৃদু সুর তোলে। রিফাত মেয়েটাকে কোলে তুলে ডাইনিং টেবিলে বসায়। নিজেই তাকে খাওয়াতে থাকে।প্রথম চামুচ খাওয়ার পর ইয়ানা চোখ বড় বড় করে রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বলে,,,
“আল্লাহ,,,অনেক মজা হয়েছে রিফাত।। আপনি আমাকে দিনে দুপুরে অবাক করছেন।”
“কেনো? রাতে অবাক করিনা?”
“অসভ্য।”
ইয়ানার কথার পরিপেক্ষিতে রিফাত কিছুই বলে না। শুধু তার ঢিলা টি শার্ট সরিয়ে দেখায় ইয়ানার দেওয়া নখের আঁচড়। ভেবেছে ইয়ানা এতে কিছুটা লাজুক হবে,লজ্জায় বোল হারাবে কিন্তু হলো উল্টো। মেয়েটা তার কামিজ সরালো,,নানান জায়গার জখম পরিদর্শন করলো স্বামী কে। রিফাত আড়ালে জীভ কাটে। ইয়ানা খাবার চুবুতে চুবুতে বলে,,,

“এত কিছু কখন করলেন? আমায় ডাকেননি কেনো?”
“ডাকলে তোমার এই চমক দেখতে পেতাম!?”
ইয়ানা হাত স্পর্শ করে রিফাত এর দাড়িতে। রিফাত সংগোপনে ইয়ানার চিকন সমস্ত আঙ্গুলে ঠোঁট ছোঁয়ায়। গলার কিনারে হালকা অধর স্পর্শ করে বলে,,,” যত দিন যাচ্ছে আমি কেমন হয়ে যাচ্ছি ইনু। তুমি নামক রোগ হয়েছে আমার,,,মেডিসিন টাও কেমন অদ্ভুত। নাম তার, তুমি।”
আহা,,,ভালবসার কি নিদারুণ স্বীকারোক্তি। ইয়ানার সুখের ঠেলায় উড়ে বেড়াচ্ছে। রিফাত এর গালে হাত রেখে সেও সুধায়,,,”আমি আপনাকে ভালোবাসি। ঠিক ততটা যতটা আকাশের বুকে তাঁরা আছে।”
রিফাত মাথা তুলে দেখে ইয়ানা কে। মসৃণ গালে হাত ঘষে বলে,,,”আমার সামনে জন্ম নেওয়া মেয়েটা আজ আমাকেই ভালোবাসি বলছে! এত বড় কবে হলে?”

“যবে থেকে রিফাত নামক মানুষটার সংস্পর্শে এসেছি।”
রিফাত আলতো হাসে। দুইজনেই বেশ গল্প করতে করতে খাওয়া শেষ করে। ইয়ানা এটাও বলেছে,সে এই ফ্ল্যাটে থাকবে না। রিফাত যেনো পরিবারের সাথেই থাকে ওই বাড়িতে, এই বাড়িতে তারা সময় কাটাতে আসবে ব্যাস। রিফাত সম্মতি জানায়। দুইজনে কেক কাটে। ইয়ানা সুস্বাদু কেক খেয়ে টুকুস করে চুমু খায় রিফাত এর কাধে।
“অনেক মজা।”
খাওয়া শেষ করে রিফাত নিজেই সব গুছিয়ে কিচেন এর দিকে যেতে নিলে তৎক্ষণাৎ ইয়ানা বলে ওঠে,,,”এই যে ডক্টর।”
রিফাত ঘুরে তাকায়। ইয়ানা দাঁত বের করে বলে,,,”মিস্টার রিফাত আমার সাথে ডেটে যাবেন?”
রিফাত ঠোঁট কামড়িয়ে হাসে। মেয়েটার চঞ্চল স্বাভাব তার কাছে ভীষণ প্রিয়। এগিয়ে এসে ইয়ানার ঠোঁটে আলতো স্পর্শ করে বলে,,,”যাবো ইয়াবা।”
“ইয়াবা?”
“মাই অ্যাডিকশন।”

হাফিজ হাসি মুখে আলেয়ার রুমে প্রবেশ করে। অন্তরে মিশ্রিত অনুভূতি। একটু আগেই হাফজা বেগম মিসেস আসফিয়ার কাছ থেকে সরাসরি হাফিজ এর জন্য আলেয়া কে চেয়েছেন। হাফিজ এর মায়ের কথায় সবাই অবাক হলেও পরে বেশ সময় ধরে আলাপ আলোচনা হয় এই বিষয়ে। আসফিয়া হাফিজ কে ভালো জানে। ছেলেটা যোগ্য। হাঁফজা বেগম এক প্রকার অনুরোধ করেছে যাতে আসফিয়া এবং আফতাব মিয়া তার প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। আলেয়া তার ভীষণ পছন্দের,মেয়েটা চঞ্চল,সরল মনের। এরকম চোখে দেখা বাড়ন্ত মেয়ে যার স্বভাব, চরিত্র সম্পর্কে অবগত তাকে নিজের বাড়ির সদস্য করতে কার না ভালো লাগবে। আলেয়া তার অনেক প্রিয় হাঁফজা বেগম আগলিয়ে রাখবেন তাকে। ছেলের বউ হিসাবে আলেয়া অমায়িক।বেশ সুদীর্ঘ কথোপকথন এর পর আসফিয়া এবং আফতাব মিয়া রাজি হয়। ইব্রাহিম সাহেব তো খুশীই।

শেষের দিকে হাফিজ প্রবেশ করে। সম্মতি শুনেই সে আলেয়ার সাথে একান্তে কথা বলার অনুমতি চায়। অনুমতি পেতেই সে উজ্জ্বল চিত্তে পা বাড়ায় আলেয়ার কাছে যাওয়ার। রুমে প্রবেশ করেই শুনতে পায় আলেয়ার মৃদু স্বরে কান্নার শব্দ। থমকে যায় হাফিজ। দরজা বন্ধ করে দ্রুত পায়ে আলেয়ার পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েটা ঘুরে তাকায়। হাফিজ কে দেখে কান্নার বেগ বাড়ে বৈ কমে। চোখ মুখের অবস্থা কাহিল মেয়েটার। হাফিজ কিছু বলার জন্য উদ্যোগী হতেই আলেয়া কান্না মিশ্রিত কন্ঠে আওড়ায়,,,”বাহিরে সবাই কি বলছে হাঁপানি রোগী! জানো? বলছে তোমার সাথে আমার বিয়ে দেবে।”
হাফিজ দ্বিধায় পড়ে। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না সে। ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাবে,এই অনুভূতির জোয়ারে ভাসছে পুরুষটি। তাও কোনো রকম সুধায়,,,”হ্যাঁ আমি জানি।”
“তুমি জানো!? তাহলে সবাই কে বলো না,আমি বিয়ে করতে চাই না!”
হৃদয় ধক করে ওঠে হাফিজ এর। কন্ঠে সতেজতা আনার চেষ্টা করে বলে,,,”কেনো?”
“আমি পড়তে চাই। বিয়ে করবো না এখন। প্লিজ কিছু করো।”
“আমি তোকে পড়বো আলু। কখনো বাঁধা দেবো না। তুই যত দুর পড়তে চাস আমি পড়বো।”
আলেয়া এবার বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে হাফিজ এর দিকে। অবিশ্বাস্য কন্ঠে আওড়ায়,,,”তার মানে তুমি এই বিয়ে তে মত দিয়েছো?”

“হ্যাঁ,,”
“কেনো?”
হাফিজ এবার কিঞ্চিৎ সরে আসলো আলেয়ার দিকে। মেয়েটির নরম দুই বাহুতে হাত রেখে তার কাছে টেনে আনলো অতঃপর মোহিত কন্ঠে বলল,,,”আমি তোকে ভালবাসি আলু। বিশ্বাস কর যখন এই অনুভূতি বুঝতে পারি তখন আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু হৃদয় এর কাছে আমি হেরে গেলাম আলু। অনেক ভালো রাখবো তোকে,, জীবনভর তোর হয়ে থাকবো।”
সরল মনের আলেয়া হঠাৎ করেই ক্রোধে উন্মত্ত হলো। তীব্র ঝাড়া দিয়ে দূরে ঠেলে দিল হাফিজ কে। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে হাফিজ বুকে দুই হাত দিয়ে ধাক্কা দিলো যেনো সে এখন হাফিজ কে সহ্য করতেই পারছে না। হাফিজ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আলেয়ার পানে। তার প্রাণ ভোমরার রোষ পূর্ন রূপে তার মস্তিষ্ক কাহিল।
আলেয়া উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বলে,,,,
“যাও চলে যাও আমার সামনে থেকে। আমি তোমার ছোটো বোনের মত ছিলাম হাফিজ ভাই,কিন্তু তুমি কি করলে! আমি তোমাকে চাই না।”

“তাহলে কাকে চাস ওই সাইফ কে?”
“সেটা তোমার জানার বিষয় না। আমি তোমাকে বিয়ে করবো না। আর কখনো আমি তোমাকে আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না। চলে যাও”
“আমার কথা শোন আলু।”
“আমি তোমার কোনো কথা শুনতে ইচ্ছুক না। আলেয়া তোমাকে চায় না।”
কঠিন বাক্য। তেজী কণ্ঠ। আলেয়া এক প্রকার হাফিজ কে বের করে রুম থেকে। দরজা জোর আওয়াজে বন্ধ করে আলেয়া। তার এত রাগ লাগছে যাহ বলার বাহিরে। বিয়ের কথা শুনেই তার নিউরন কটকট করে ওঠে অতঃপর হাফিজ এর কথায় সেই কাঙ্ক্ষিত রাগ ক্রোধে রূপান্তরিত হয়।। এদিকে হাফিজ ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে দাড়িয়ে রইল দরজার সামনে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। এ কোন বিদ্বেষ শুধা পান করলো হাফিজ? যার অন্ত মরণ কিংবা কষ্ট পূর্ন জীবন। হাফিজ এর পা এগোয় না যেনো। চিত্ত খামচে ধরে রেখেছে কেউ। কণ্ঠনালী কেঁপে উঠলো বারে বারে। চোঁখ জ্বলছে কি তার? হ্যাঁ জ্বালা করছে প্রচুর। কান্না পাচ্ছে? হ্যাঁ পাচ্ছে। হাফিজ আজ সরল মেয়েরা দেওয়া আঘাতে লণ্ডভণ্ড।

সময়ের বাঁধ ভাঙা স্রোতে পেরিয়েছে মাস পাঁচেক এর বেশি। সময়ের সাথে সব কিছু ঠিক হয়ে যায়! কথাটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। সুখের আবেশে কারোর জীবন তলিয়ে যাচ্ছে তো কেউ হৃদয় ব্যথায় জর্জরিত হয়ে জীবন পার করছে। সেদিন এর পর আর আলেয়া এবং হাফিজ এর বিয়ের কথা ওঠেনি। এর পিছনে অবশ্য হাফিজ এর হাত আছে। ঘটনা টি ইয়ানা এবং রিফাত জানার পর বিস্মিত হয় প্রবল। আলেয়া কে তারা সুললিত ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। মেয়েটা সর্ব সময় চুপ ছিলো। হাফিজ এর সাথে ব্যাবহার খারাপ করায় তার মধ্যে অনুতাপ সৃষ্টি হয়েছে। ইয়ানার বোঝানোর এক পর্যায়ে রিফাত গম্ভীর স্বরে বলেছিল,,”আমার বোন যা চায় তাই হবে।”

আলেয়া বেশ কয়েক বার হাফিজ এর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু ছেলেটা অত্যন্ত কায়দার সাথে তাকে এড়িয়ে গেছে। আলেয়ার মন খারাপ করে। মেয়েটা আগের তুলনায় বুঝদার হয়েছে। বয়স বেড়েছে কি না। সতেরো বছরের একটি কিশোরী সে। রেজাল্ট বেশ ভালো হয়েছে তার,উচ্চ ক্লাসে ওঠার এক্সাইটমেন্ট এ পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে সে। তিক্ত অতীত ভুলেছে মেয়েটা। বয়সটাই যে তার এমন।। হাতে রেজাল্ট নিয়ে হাফিজ এর বাড়ির দিকে উদ্যোগী হয় আলেয়া। রেজাল্ট বেরিয়েছে তিরিশ দিন এর উপরে কিন্তু এখনও হাফিজ কে দেখানো হয়নি। ছেলেটা পরীক্ষার সময় অনেক সাহায্য করেছে আলেয়া কে। খুশি মনে রাস্তার সামনে আসলে আলেয়া দেখে হাফিজ হেসে হেসে কথা বলছে কোনো এক মেয়ের সাথে। উৎফুল্ল চেহারা ছেলেটার। কেনো জানি আলেয়ার রাগ হয়। তাকে দেখলে এড়িয়ে যায় আর এই মেয়েটার সাথে দাঁত বের করে কথা বলছে! ধপ ধপ পা ফেলে সে চলে এসে নিজের রুমে।

ইয়ানা আয়নার সামনে দাড়িয়ে আছে। তার পেটের কাছের শাড়ির আঁচল সরানো। একদৃষ্টিতে নিজ উন্মুক্ত অবয়বের দিকে তাকিয়ে আছে। আরক্ত চেহারা তার। মনে পড়ে কিছু দিন আগের কথা,,,
আতিকা এবং আহিল এর বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন ইয়ানা একটা সুন্দর জামদানি শাড়ি পরে হালকা সাজে হিজাব পরিহিত মায়াবী মুখটায় যেন রিফাত ঘায়েল হয়। মেয়েটা কেমন ছুটে যাচ্ছে এদিক সেদিক। নানান কাজে নিজেকে ব্যাস্ত রেখেছে । রিফাত এর দায়িত্বও কম কিসের! আহিল বেশির ভাগ কার্যভার রিফাত এর কাঁধেই দিয়েছে।। তার পরেও অবসর নিয়ে তার বোকা প্রেয়সী কে চোখে রেখেছে। মেয়েটা নাজুক যা! অনুষ্ঠান হচ্ছে বাড়িতেই বেশ জাঁকজমক ভাবে। আহিল কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করতে চেয়েছিল কিন্তু আতিকার আবদারে সবটাই বাড়ির বড়ো আঙিনায় হচ্ছে কোনো রকম অসুবিধে ছাড়াই। রিফাত ঘামার্ত অবয়বে বসার ঘরে প্রবেশ করতেই দেখে ইয়ানা টেবিলে কি যেনো করছে। ওদিকে সোফায় বসে আছে আহিল এক কাজিন। রিফাত তাকে মোটেই পছন্দ করে না। ছেলেটার চোখ তার বউ এর উপর কিনা!এখানে আসা থেকেই ছেলেটা কেমন উবজে খাতির করতে চায় ইয়ানার সাথে। যদিও বা ইয়ানা যথা সম্ভব এড়িয়ে চলে।

কাজের ব্যস্ততায় ইয়ানা যেনো ভুললো তার বস্ত্রের হাল তাল। শুভ্র পেটের কিঞ্চিৎ অংশ উন্মুক্ত হতেই রিফাত যেনো চোটে গেলো। ধপ করে উঠলো মাথার ভেতর।। মেয়েটা কি ভুলেছে যে এখানে সে ছাড়াও মানুষ আছে!রিফাত দ্রুত পায়ে হেঁটে ইয়ানার সামনে দাঁড়ায়। মেয়েটা নির্বাক দৃষ্টিতে তার দিকে এক বার চেয়ে আবারও কাজে মন দিলো। রিফাত যেনো হুস হারায়। মেয়েটাকে এক টান দিয়ে নিজের সাথে নিয়ে যেতে লাগলো তাদের বরাদ্দ করা কক্ষে। দরজা বন্ধ করে মেয়েটাকে সোজা বিছানায় চিৎ করে শুইয়ে দিলো। ইয়ানা হতভম্ভ। কি হলো এটা! রিফাত আসে পাশে কি যেনো খুঁজলো! পেয়েও গেলো।
“কি করছেন আপনি?”

শান্ত ছেলে রেগেছে। উত্তর করলো না রিফাত। ইয়ানার উদর হতে শাড়ি উন্মুক্ত করে। নিজের হাতে থাকা মেহেন্দি দ্বারা পেট জুড়ে লেখে ‘ রিফাত এর বউ ‘। কি এক ছেলেমানুষী! নিজের নারীর অধিকারে রিফাত কি করলো বুঝে আসলো না।ঈর্ষায়,ক্রোধে জর্জরিত হয়ে রিফাত যেনো চৈতন্য ভুলে। ইয়ানা কি বলবে ভেবে পায় না। এটা সেটা বলে গেলেও উত্তর আসে না বিপরীত দিক থেকে। পেটের যে টুকু অংশ বাকি থাকে সেথায় নিজের দাঁতের সূচালো আঘাত এবং ঠোঁটের করাজিতে রক্তিম চিহ্নে ভরে তোলে। ইয়ানা ছট্ফট্ করে উঠলেই রিফাত দেয় এক ধমক। কেপে ওঠে চিকন বদন। অতঃপর খুবই কায়দার সাথে মুখ গুঁজে দেয় ইয়ানার গলায়। ক্লান্ত রিফাত ততক্ষণ উঠেনি যতক্ষণ না সেই মেহেন্দি শোখায়।

~ফোনের কটু শব্দে ইয়ানার চেতনা ফেরে। আপন উদর এর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে সে। জ্বলজ্বল করছে সেই কাঙ্ক্ষিত লেখা,রক্তিম চিন্হ। ইয়ানা বিছানা থেকে মোবাইল হাতে তুলে দেখে তার প্রাণের স্বামীর ডাক। ইয়ানা রিসিভ করে ফোন কানে ধরতেই শুনতে পায় রিফাত এর চিন্তান্বিত কণ্ঠ,,,
“আর বমি হয়েছে ইনু?”
ইয়ানা মিষ্টি হেসে বসে,,”নাহ,,,এখনও হয়নি।”
“শরীর বেশি খারাপ লাগছে?”
“না না,,,আমি ঠিক আছি। আপনি খেয়েছেন কিছু?”
“হ্যাঁ। আচ্ছা শোনো!”
“জ্বী”
“সত্যি কথা বলবে ইনু,,,পিল খাওয়া হয় ঠিক সময়?”
ইয়ানার অনন এর রঙ বদলায়। ভিতরের অংশ ছ্যাৎ করে ওঠে তার। পিল শেষ হয় কিন্তু তাহ ইয়ানার পেটে যায় না,যায় জানালার বাহিরে,বাড়ির পিছন দিকে। ইয়ানা ঠোঁট ভেজায়। আমতা আমতা করে বলে,,,
“হ্যাঁ খাই তো। শেষ হয় কি এমনি এমনি!”
“লাস্ট পিরিয়ড কবে হয়েছে!”
শব্দ জড়িয়ে আসছে ইয়ানার। মিথ্যে বলার অভ্যাস নেই তার। তাও কোনো রকম উচ্চারিত করে,,,

“গত মাসে।”
“এই মাসে!?”
“সময় হয়নি।”
“ডেট আট আজ এগারো তারিখ।”
ইয়ানা দন্ত্ দ্বারা অধর কাটে। মানুষটা এত বিচক্ষণ কেনো? সব মনে থাকে তার। নাহলে কি এমনি এমনিই হৃদয় এর ডাক্তার সে! ইয়ানা জড়িত সমস্ত প্রসঙ্গ রিফাত এর জানা। ইয়ানা দূরদর্শী,হুঁশিয়ার পূর্ন মানব কে মিথ্যা বলছে! ভাবা যায়? ইয়ানা তাও দমে যায় না। ইয়ানা আত্ম সংযম করে বলে,,,
“আপনি অযথায় চিন্তা করছেন। আতিকার বিয়েতে অনেক খেয়েছি তারই এফেক্ট দেখা দিচ্ছে এখন। ঠিক হয়ে যাবে।”
রিফাত এর ভাবান্তর হলো কি না বোঝা গেলো না।শোনা গেলো রুদ্ধ শ্বাস এর শব্দ। ইয়ানা চিত্ত উদ্দীপ্ত হয়। মানুষটার সত্যি জানতে কতক্ষন! ডাক্তারের চোখের সামনে ঘুরঘুর করে রোগী রোগ লুকায়! এটাও সম্ভব? হ্যাঁ হয়তো সম্ভাব্য যদি রোগী আপন প্রাণ ভোমরা হয়।

“রিফাত!”
ইয়ানার মৃদু সুর। রিফাত গভীর চিন্তা হতে বেরিয়ে আসে। জানায়,,,
“আমায় যেতে হবে। নিজের খেয়াল রেখো,,,ফিরতে লেট হবে হয়ত।”
“আচ্ছা”
ইয়ানা দুরু দুরু বক্ষে ফোন কেটে সোফায় বসে। ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে চেহারা। সে যা করেছে ঠিক করেছে কিনা তাহ নিয়ে সন্দেহে গ্রেফতার তার অন্তর। পরামর্শ টা তার আন্টি মায়ের। ইয়ানা ও উপদেশ গ্রহন করে। রিফাত এর সাথে কোনো রূপ ঝামেলা ছাড়াই ইয়ানা কনসিভ করতে চাইছে তাই তো এত রূপ বাহানা।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৩

নার্সিং হোম জুড়ে কান্নার রোল ছড়িয়ে পড়ে। কোনো এক পুরুষের কঠিন কান্নার শব্দে মুখরিত হয় পরিবেশ। যে কও এই শব্দ শুনলে অন্তর কেঁপে উঠবে। সদ্য ধরণীতে আগত শিশুর মৃদু কান্না যেনো কারোর চোখে পড়ছে না। ফ্লোরে বসে পুরুষের আহাজারি শুনে পাখিরা উড়াল দিয়েছে দুর আকাশে।
রিফাত দূরে দাঁড়িয়ে দেখে সবটাই। তার নিউরন কটকট করে ওঠে। হৃদয় ব্যাকুল হয়। হৃদস্পন্দন বেড়ে হাজার গুন। রক্ত কণিকার বয়ে যাচ্ছে তড়িৎ। নিশ্বাসের বেগতির দেখা মেলে তার। সেই পুরুষের জায়গায় নিজেকে অনুভব করে রিফাত। বেদনায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। নিজেকে সামলাতে না পেরে পাশের টেবিলে ধপ করে বসে পড়ে রিফাত। আসে পাশের নার্স তার দিকে ছুটে আসে। আহারে,,,প্রিয় মানুষ। এই পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দর অনুভূতি কারোর প্রিয় মানুষ হওয়া। ইয়ানা সেই ভাগ্যবতী।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৫