Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৮

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৮

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৮
নুসরাত ফারিয়া

তাড়াতাড়ি ঘুমানোর ফলে ভোররাতের দিকে ঘুম ভেঙে যায় আলোর। চোখ মেলে তাকাতেই সর্বপ্রথম নজরে এল, মেঝেতে বসে থেকে বিছানায় হেলান দিয়ে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটাকে। আলো নিজের বাম হাতের দিকে তাকায়। মানুষটা তার হাতের আঙুলের ভাঁজে নিজের হাতের আঙুলগুলো ডুবিয়ে রেখেছে। ঘুমের মধ্যেও কেমন শক্ত করে ধরে আছে তার হাত, যেন ছেড়ে দিলেই সে পালিয়ে যাবে। আলো উঠে বসে আস্তে করে হাত সরিয়ে নিয়ে নেমে পড়ল। ঘুমন্ত মানুষটার সামনে হাটু ভেঙে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ওই কিউট চেহারার দিকে। কাত করে রাখা মাথাটা সোজা করে দিতেই আধার ঘুমের ঘোরে মৃদুস্বরে গোঙাল। আলো চমকে উঠে কপালের মাঝে হাত রাখল, নাহ জ্বর নেই! নিশ্চয়ই মাইগ্রেন ব্যথা উঠেছে লোকটার।
আলো বিছানা হাতড়ে একটা বালিশ নিল। সে তো আর মানুষটাকে তুলে বিছানায় শোয়াতে পারবে না, তাই একটু আরাম দেওয়ার চেষ্টা করল। এক হাত ঘাড়ের নিচে গলিয়ে মাথাটা উঠিয়ে নিয়ে, অন্য হাতে বালিশটা পিছনে রাখল। কিন্তু মানুষটার মাথা আর সেখানে রাখা হলো না, কারণ লোকটা সামনে হেলে তার বুকের মাঝে মাথা রেখেছে। এবং শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়েছে। আলো ধপ করে বসে দু’হাতে আগলে নিল স্বামীকে। সে বুঝতে পারছে না, কতক্ষণ এইভাবে বসে থাকবে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে মানুষটাকে টেনেটুনে উঠানোর চেষ্টা করল।

আধারের ঘুমটা হালকা হয়ে গেল। তবে সে চোখ মেলে তাকায় না। শুধু উঠে বিছানায় বসে। আলো একটুতেই হাঁপিয়ে গিয়েছে। সে নিজেকে সামলিয়ে মানুষটাকে ঠিকঠাক ভাবে বিছানায় শুয়ে দিতেই, অনুভব করল সে নিজেই বিছানায় শুয়ে আছে৷ হুট করে কী থেকে কী হয়ে গেল ঠিক বুঝতে পারল না আলো। তবে নিজের শরীরের ওপর স্যারকে দেখে হতবাক হয়ে গেল। অসভ্য লোকটা ঘুমের নেশায় তাকে কোলবালিশ ভেবে চেপেচুপে ধরে, তারই উপর শুয়েছে। উন্মুক্ত ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে গরম নিঃশ্বাস। স্যারের নিচে থেকে আলোর মনে হচ্ছে, সে আলু ভর্তা হয়ে গেছে৷ অথচ লোকটা কী আরামসে ঘুমাচ্ছে।
আলো হাসফাস করে উঠল। ঘাড় কাত করে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। লোকটার হাতির মতো ওজনের কাছে তার শরীরটা চ্যাপ্টা হয়ে গেল। সে দু’হাতে মানুষটাকে সরাতে চেয়েও সরিয়ে দিল না, বরং একহাত পিঠের ওপর রেখে অন্য হাত মাথার চুলের ভাঁজে গলিয়ে দিয়ে, বুলিয়ে দিতে থাকল। আধার বুঝি আরাম পেল। সে মৃদুস্বরে গুঙিয়ে ছোট্ট শরীরটাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গলায় নাকমুখ গুঁজল। আলোর কষ্ট হলেও সে একটুও নড়াচড়া করল না। কারণ সে বুঝতে পারছে, লোকটা শান্তি পাচ্ছে না মাইগ্রেনের ব্যথায়। একটু ঘুমিয়ে নিলে আরাম পাবে৷ তাই সে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মানুষটাকে ঘুম পারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল৷
সময় আজ কোনদিক দিয়ে অতিবাহিত হলো, ঠিক বোঝা গেল না। অদূর থেকে মৃদুস্বরে ভেসে আসা আযানের শব্দে আধারের ঘুম ভাঙল। কিন্তু সে তখনই উঠল না। কিছুক্ষণ চোখ বুজে থেকে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মিষ্টি ঘ্রাণ টেনে নিল। এটা তার খুব পরিচিত! কারণ এই সুঘ্রাণের অধিকারী রমণীই তার সাথে মিশে থাকে। আধার নিজের অবস্থান বুঝে-ও একটু নড়ল না, আর না সরে গেল। সে তো মটকা মে’রে পড়েই থাকল মেয়েটার ওপর। নিজের এই বেহায়া কাজে মনে মনে নিজেই ভীষণ বিরক্ত হলো। ব্রেন বলছে উঠে যেতে, কিন্তু মন বলছে আরেকটু থাকতে। অবশেষে মনটাই জয়ী হলো।
বেশ কিছুক্ষণ পর আধার চোখ মেলে তাকায়। দু’হাতে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখে, চোখমুখ কুঁচকে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

-“আমাকে দেখা হয়ে গেলে এখন সরুন!”
আধারের কপাল কুঁচকে গেল৷ সে গমগমে গলায় বলল,
-“সরব না, কী করবে?”
আলো অদ্ভুত চোখে তাকায়। এই লোকটা রাতে কত কথা শোনালো তাকে। আর এখন কি-না তার উপর থেকে সরতে চাইছে না। এই লোকটা আসলেই কী চায়, একমাত্র ওপরওয়ালা জানে। আলো কিছু না বলে বাম হাতটা মানুষটার গালে রেখে জানতে চাইল,
-“মাথা ব্যথা কমেছে?”
আধার চোখ বুজে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“হু!”

আলোর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে দু’হাতে স্বামীর মাথার চুলগুলো টেনেটুনে, এলোমেলো করে দিল। আধার বিরক্তিতে সরে গেল। এটা দেখে আলো উবুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে খিলখিল করে হেঁসে উঠল। আধার ঘাড় কাত করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল! তারপর কিছু একটা মনে হতেই তড়িঘড়ি করে উঠে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে ভার্সিটিতে ইমেইল পাঠিয়ে দিল। আজ আর তার যাওয়া হলো না!
আধার শাওয়ার নিয়ে একেবারে নিচে নামল। ডাইনিংয়ে তখন রাত বসে থেকে একা খাবার খাচ্ছিল। আধার এসে রাতের সামনের চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। শেফালি চাচি আরো খাবার নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রেখে গেলেন। রাত একপলক ভাইয়ের ভেজা চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ পর আলোও নেমে এল। গতকাল সেই দুপুরে খেয়েছিল খাবার, এরপর আর খাওয়া হয়নি। তাই খুব খিদে পেয়েছে তার।
স্বামীর পাশের চেয়ারে এসে আলো বসতেই রাত মুখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকায়। আলো স্বামীর কথামতো বড় ওড়না হিজাবের মতো পেচিয়ে পড়ে আছে৷ ফলস্বরূপ মুখ ছাড়া আর কিছুই উন্মুক্ত না, এমনকি একটা চুলও বেরিয়ে নেই। হঠাৎ করে মেয়েটার এমন লুক আর চোখমুখ ফোলা ফোলা দেখে রাতের কপালের মাঝে চারটে ভাজ পড়ল। তাহলে কী তার ভাই…. আর ভাবতে পারল না রাত। চোয়াল শক্ত করে ভাইয়ের দিকে তাকায়। রাতকে এমন করে তাকাতে দেখে আধারের চোখ হাসে! সে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,

-“তুই চলিস হারাম পথে, আর আমি চলেছি হালাল পথে।”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-“এখন কেন জানি বড্ড আফসোস হচ্ছে, শুধু শুধু এতগুলো দিন উপোস করে ছিলাম। বাট….ফাইনালি উপোস ভাঙলাম!”
বলেই বাঁকা হাসল আধার। রাত হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“তুমি কিন্তু এটা একদম ঠিক করলে না!”
আধার কিছু না বলে শুধু নিঃশব্দে হাসল। রাত রাগে গজগজ করতে করতে উঠে হনহনিয়ে চলে যায়। অন্যদিকে, সবকিছু আলোর মাথার ওপর দিয়ে গেল। সে স্বামীর দিকে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি এতদিন উপোস থাকলে, প্রতিদিনের খাবার কে খেয়েছে? আপনার ভুত?”
আধার পাশে তাকিয়ে মেয়েটার সরু নাক টেনে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“একদম বড়দের কথার মাঝখানে নিজের এই লম্বা নাক গলাবে না।”
আলো কপাল কুঁচকে বিরবির করে বলল,

-“মিথ্যেবাদী কোথাকার!”
আধার চোখ রাঙায়। আলো খ্যাক করে বলল,
-“একদম ওইভাবে তাকাবেন না। নয়তো…!”
-“নয়তো?”
-“বাপের বাড়ি চলে যাবো।”
-“ঠিক আছে যাও!”
আলোর খুব অভিমান হলো৷ সে খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যাবে, তখনই আধার তার কোমর খামচে ধরে বসিয়ে দিল। এবং দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“আমার পারমিশন ছাড়া যদি বাপের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করো, তাহলে আই সোয়ার! তোমার ওই সুন্দর পা জোড়া ভেঙে দেবো।”
কোমরের ব্যথায় আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে লোকটার হাতটা সরাতে চাইল। কিন্তু…আরো শক্ত করে খামচে ধরল তার কটিদেশ! আলো অসহায় কণ্ঠে বলল,

-“ল…লাগছে।”
আধার খেতে খেতে জবাব দিল,
-“লাগার জন্যই ধরেছি!”
-“আপনি খুব খারাপ।”
-“আই নো! আর এই খারাপ আমিটার সাথেই তোমাকে থাকতে হবে। যেমনটা আমি থাকছি, তোমার মতো আধপাগলের সাথে।”
-“আমি আধপাগল?”
-“উঁহু…..পুরোটাই পাগল!”

আলো দাঁতে দাঁত চেপে কিছু না বলে চুপ করে বসে থাকল। ইচ্ছে তো করছে, একটা হাতুড়ি এনে এই লোকটার লোহার মতো হাতটা ভাঙতে। হঠাৎই মাথায় শয়তান চাপল, সে মাথা নিচু করে লোকটার হাতে চিমটি কাটল! তবুও ছাড়ল না তার কোমর। আলো বেশ কয়েকবার খামচি, চিমটি মে’রে অবশেষে হাল ছেড়ে দিল। ঠিক তখনই তার নরম পেটে শক্তপোক্ত চিমটি এসে পড়ল। আলো পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠতেই তার মুখের ভেতর আলুর টুকরো গুঁজে দিল আধার। আলোর মন চাইল একটা লাথি মে’রে এই লোকটাকে চেয়ারসহ ফেলে দিতে। সে নিজের ইচ্ছেটাকে দমিয়ে পেটের কাছ থেকে জামাটা সরিয়ে দেখল, পুরো জায়গাটা লাল টকটকে হয়ে আছে, এমনকি নখের দাগও খুব বাজেভাবে বসে গেছে। যেকোনো সময় র’ক্ত গড়িয়ে পড়তে পারে। এসব দেখে আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“আপনাকে আমি দেখে নিবো!”

বিকেলের দিকে ড্রয়িংরুমে বসে থেকে দাদাজানের সাথে গল্প করছিল আর চা খাচ্ছিল আলো। তখন দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। শেফালি চাচি সেদিকে গেলেন। এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন একটা বড় সাইজের পার্সেল নিয়ে। কাটুন দেখে আলোর কপাল কুঁচকে গেল। জিজ্ঞেস করল,
-“কার পার্সেল এটা?”
-“তোমার!”
চাচির কথা শুনে আলো চমকে উঠল। তার পার্সেল মানে? সে তো কিছু অর্ডার করেনি, তাহলে? সে কৌতূহলী হয়ে উঠে এসে বক্সের কাছে বসে খুলতে লাগল। ভেতরে আদৌ কী আছে কে জানে! সোবহান খানও উঠে এসে নাতবউয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে। কাটুন খুলতেই আলোর চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসল। এক কাটুন ভর্তি শুধু ওড়না আর ওড়না! এটা যে কোন পাগলের কাজ সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না।
আলো মাথা উঁচু করে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,

-“তোমার বড় নাতির মাথায় কোনো সমস্যা আছে দাদাজান? না মানে, উনি অল্প কিছু নিতে পারেন না?”
সোবহান খান বিষয়টা বুঝতে পেরে হেঁসে বললেন,
-“বুঝলে নাতবউ? আমার বড় নাতিটা এসবের ব্যাপারে বড়োই অধৈর্য্য। সে আবার খুব সহজে কিছু পছন্দ করতে পারে না, আর না সময় নিয়ে বেছে বেছে পছন্দ করবে। তার যেটা প্রয়োজন ওটার পুরো চৌদ্দ গুষ্ঠিই তুলে নিয়ে আসবে। আমি একবার নদীর একটা মাছের নাম বলেছিলাম, ওটা নিয়ে আসার জন্য! তারপর তোমার স্বামী কী করেছে জানো? বাজারের অর্ধেক নদীর ছোট মাছ নিয়ে চলে এসেছে। সেদিন ছোট বউমার কী রাগ! এতগুলো ছোট মাছ কীভাবে কাটাবে? টাকা দিয়ে এনে তো আর ফেলে দিতে পারবে না। তাই ছোট বউমা আর শেফালি মিলে মাছ কাটতে বসে। পুরো দিন পেরিয়ে যাবার পরেও মাছ কাটা শেষ হয় না। ছোট বউমা রেগেমেগে অর্ধেক মাছ পাড়াপ্রতিবেশিদের দিয়ে দেয়। তারপর থেকে আমি ভুলেও আর বড় নাতিকে মাছ কিনতে বাজারে যেতে বলি না। নয়তো দেখা যাবে আবার পুরো মাছের বাজারই তুলে নিয়ে এসেছে।”
কথাগুলো শুনে আলো শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,

-“উনার মতো ঠিক আমার বাবাও! বাজারে গেলে পুরো বাজারই তুলে নিয়ে আসে। তারপর মায়ের কাছে বকা শুনে। একবার তো রেগেমেগে মাথায় লাউ ফিকে মে’রেছিল হেহেহে!”
মেয়েটার কথা শুনে সোবহান খান হাসলেন। তখন তাহমিনা খান এসে এতগুলো ওড়না দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
-“আজকাল দেখছি আপনার বড় নাতি অহেতুক টাকাপয়সা নষ্ট করছে!”
মূহুর্তেই আলোর মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল। সোবহান খান পিছনে ফিরে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
-“আমার নাতি তার বউকে কী দিবে না দিবে, সেটা একান্তই ওর বিষয়! আর এখানে অহেতুক টাকাপয়সা নষ্ট কোথায় দেখলে ছোট বউমা? ছেলেটা তো আর বারবার মেয়েটাকে ওড়না কিনে দিবে না। তাই সে এক বারেই নিয়ে দিয়েছে। আর তুমি ওর স্বভাব কিন্তু ভালো করেই জানো। ও যেটা নেয় সেটা কয়েকমাসের জন্যই নেয়! একটু একটু করে জিনিস নেওয়া পছন্দ করে না। আর না ধৈর্য্য আছে। তার সার্মথ্য অনুযায়ী সে তার বউকে দেয়। এতে কারোর আপত্তি তো হওয়ার কথা নয়!”
শশুরের কথা শুনে তাহমিনা খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

-“আপনি কী জানেন? আপনার নাতি এই মাসে কত টাকা সংসারের পিছনে দিয়েছে?”
-“অবশ্যই জানি! আর যতটা দিয়েছে এতেই সংসার দিব্যি চলে যাবে। তুমি কী ভুলে গেলে? আধার এ মাসে সবথেকে বেশি কার ওপর খরচ করেছে?”
একথা শুনে তাহমিনা খান চুপ হয়ে গেলেন। সোবহান খান তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
-“তোমার ছেলে দেশে ফেরা মাত্রই তোমার কাছে আবদার করল বাইকের জন্য। আর তুমি সেটা বললে আধারকে। ছেলেটা নিঃশব্দে তোমাকে বাইক কেনার জন্য চেক দিয়েছে। আর যে সে বাইক নয়, তোমার ছেলে সবচেয়ে দামী বাইকটাই নিয়েছে। তবুও আধার কিছু বলেনি। উল্টো লাইসেন্স, কাগজপত্র তৈরি করার জন্য তোমাকে আবারো টাকা দিয়েছে। তখন তো তুমি কিছু বললে না? আর ছেলেটা তার বউকে সামান্য কিছু ওড়না কিনে দিয়েছে বলেই অহেতুক টাকা নষ্ট করা হয়ে গেল?

শুনো ছোট বউমা, আমি কিছু বলি না মানে এই নয় যে, তোমরা ছেলেটার র’ক্ত ঝোড়ানোর টাকাগুলো এইভাবে শেষ করবে। তোমার ছেলেরের পড়াশোনা শেষ না? তাকে ক্যারিয়ারের জন্যই তো দেশের বাইরে পাঠিয়েছিলে। তাহলে তোমার ছেলের ক্যারিয়ার কই? এইভাবে বেকার জীবন পার করে কী বোঝাচ্ছে বলো তো? লেখাপড়া করে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে এসে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে আর আমার নাতির টাকা ফুরাচ্ছে। ছেলেটার কী ভবিষ্যত নেই? সে আর কতদিন এই সংসারের পিছনে খাটবে? এই পর্যন্ত তো আর কম খাটল না! সেই ছোট বেলা থেকে খেটেই যাচ্ছে। এই বাড়ির বড় ছেলের সব দায়িত্ব পালন করেছে, এবং এখনো করে আসছে। কিন্তু তোমার ছেলে কোনো দায়িত্ব পালন করেনি। আর না কখনো চেষ্টা করেছে। আজ রাত বাড়ি ফিরলে বলবে, যতদ্রুত সম্ভব একটা চাকরি খুঁজে জয়েন হতে। নাহলে কিন্তু আমি ওর সব খরচ বন্ধ করে দিবো।”
তাহমিনা খান কথাগুলো চুপচাপ হজম করে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। সোবহান খান এসে সোফায় বসলেন। এতক্ষণ আলো মেঝেতে বসে থেকেই সমস্ত কথাগুলো শুনল। সে উঠে ডাইনিং থেকে পানি নিয়ে এসে দাদাজানকে দিল। সোবহান খান পানি খেয়ে ইশারা করে নিজের পাশে বসতে বললেন আলোকে। মেয়েটা গ্লাস রেখে চুপচাপ দাদাজানের পাশে বসল। তখন সোবহান খান বললেন,

-“জানো নাতবউ? তোমার ওই পঁচা স্বামী না থাকলে আজ আমাদের পথে বসতে হতো। ছেলেটা এইচএসসি পরীক্ষার পরই কিছু কারণের জন্য এ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। বাহিরের দেশে লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করে নিজের খরচ চালিয়েছে। আমাদের থেকে কোনো টাকাপয়সা নেয়নি, শুধু বাহিরে যাওয়ার জন্য আমার থেকে টাকা ধার নিয়েছিল। তারপর তার পরিচিত আঙ্কেল সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ওখানে গিয়ে কয়েকমাস পর আমার টাকা শোধ করে দেয়। তারপর কেটে যায় বছরের পর বছর। এরপর আমার গুনধর ছেলেটার জন্য সব শেষ হয়ে গেছে। আমাদেরও কোম্পানি ছিল, কিন্তু কিছু বেইমানদের জন্য বাড়ি, কোম্পানি নিলামে উঠে যায়। ব্যাংকে এত লোন ছিল যে জমি-টমি বেচে দিয়েও শোধ হয়নি।

আধার বাড়িটা বাঁচাতে পারলেও কোম্পানিটা রক্ষা করতে পারেনি। এত এত শোক সইতে না পেরে আমার ছেলেটা স্ট্রোক করে। ও যাদের বিশ্বাস করেছিল, দিনশেষে তারাই তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারপর থেকেই এই বাড়ির সব দায়িত্ব আধার নেয়। রাত, তিথির লেখাপড়ার খরচ থেকে যাবতীয় সবকিছুর দায়িত্ব ও নিজে নেয়। ছেলেটা বাইরের দেশে খেয়ে না খেয়ে থেকে আমাদের জন্য মাসের পর মাস টাকা পাঠিয়েছে। আমি ছেলেটাকে একটু সাহায্য করার জন্য বাচ্চাদের পড়াতে শুরু করি। এইভাবে দিন যাচ্ছিল আমাদের। রাত এইচএসসি দেওয়ার পর সেও জেদ ধরল বাইরের দেশে গিয়ে ভাইয়ের মতো লেখাপড়া করবে। ছোট বউমাও ছেলের ভবিষ্যতের জন্য রাজি হয়ে গেলেন। তারপর রাতও তার বড় ভাইয়ের কাছে চলে যায়! ওর ওখানকার সব খরচটাও আধার সামলে নিত। ছেলেটা পিএইচডি শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে দেশে আসেনি। অস্ট্রেলিয়াতে কয়েকবছর থেকে কোম্পানিতে জব করে নিজের ব্যাংকব্যালেন্স তৈরি করে তারপর এসেছে।

ছেলেটা সবার জীবন গুছিয়ে দিলেও নিজের জীবনটা বড্ড অগোছালো। সে একাকিত্বের মাঝে থাকতে থাকতে ভুলেই গেছে ভালোবাসা কী! আমার বড় নাতিটা এমন ছিল না, সে খুব হাসিখুশি আর চঞ্চল ছিল। কিন্তু….পরিস্থিতি তাকে এমন কঠোর করতে বাধ্য করেছে। ছেলেটা কখনো সঙ্গী পায়নি নিজের মনের কথাগুলো প্রকাশ করার জন্য। আর ও খুব একটা মনের কথা কাউকে বলতে পারে না। ছেলেটার বুক ফাটবে, তবে মুখ ফাটবে না! সাথে ভীষণ ঘাড়ত্যাড়া।”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন সোবহান খান। নাতবউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,

-“আমার নাতিটা বাইরে যতটা কঠোর, তারচেয়ে বেশি মনের দিক দিয়ে নরম। ও সহজে কিছু মুখ ফুটে বলে না। ছেলেটা ভালোবাসা, আদর, যত্ন থেকে অনেক আগেই বঞ্চিত হয়েছে৷ কাজের চাপে, পরিবারের চাপে, মানষিক চাপে ভালোবাসা কী জিনিস সেটা ভুলেই গেছে। আমার নাতিটা মনের দিক দিয়ে খারাপ নয় নাতবউ! তুমি শুধু একটু কষ্ট করে মানিয়ে নিয়ে ওর কাছে থেকে যাও। দেখবে, একদিন না একদিন ও ঠিক স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।”
দাদাজানের বলা প্রতিটা কথাগুলো খুব মনোযোগ সহকারে শুনল আলো৷ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একগাল হেঁসে বলল,
-“তুমি চিন্তা করো না দাদাজান। আমি বেঁচে থাকাকালীন আর ছাড়ছি না তোমার বড় নাতিকে। উনি না চাইলেও আমি উনার সাথে থাকব। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তুমি তোমার পঁচা নাতির কান মলে দিবে, ঠিক আছে?”
সোবহান খান হেঁসে বললেন,
-“ঠিক আছে।”

আলো সব ওড়না নিয়ে এসে আলমারিতে গুছিয়ে রাখল, তাকে সাহায্য করলেন শেফালি চাচি। আধার তখন সোফায় বসে থেকে চুপচাপ ল্যাপটপে কাজ করছিল। আলো সব কাজ শেষ করে ফ্রেশ হয়ে এল। এবং এসেই সোজা স্যারের কোলে ঠাস করে বসল। এতে আধার প্রচুর বিরক্ত হয়। এই মেয়েটা এত চিপকু কেন! হোয়াই?
-“কী সমস্যা তোমার?”
আলো দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরতেই আধার চট করে মুখ সরিয়ে নিল। এটা দেখে আলো খিলখিল করে হেঁসে উঠে গালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“যেটার ভয় পেলেন, ওইটাই করলাম!”
আধার দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“তোমার মতো অসভ্য মেয়ে আর দুটো দেখিনি।”
আলো মুচকি হেঁসে কাঁধে মুখ গুঁজে বলল,
-“আলো এক পিসই আছে। আর সেটা আপনার ভাগ্যে জুটেছে।”
-“হুম, এটার জন্যই আফসোস হয়। তোমার মতো পাগল মেয়ে আমার জীবনে না এলেই ভালো হতো।”
-“এখন আমি আপনার কাছে আছি, তাই আপনার আফসোস হচ্ছে! আর যখন আমি থাকব না, তখন এর চেয়েও বেশি আফসোস করবেন।”
একটু থেমে পুনরায় বলল,

-“আচ্ছা, ধরুন আমি ম’রে গেলাম! তখন আপনি কষ্ট পাবেন? নাকি খুশি হবেন?”
আলোর একথা বলতে দেরি হলেও তাকে কোল থেকে ফেলে দিতে একটুও দেরি হলো না আধারের। আলো মেঝেতে বসে থেকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে স্যারের রক্তিম চোখের দিকে। আধার দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“ম’রার খুব শখ না তোমার? তা কীভাবে ম’রতে চাও বলো? আমি তোমাকে সাহায্য করছি। উমমম…একবার বলেছিলে, আমি তোমার নাকমুখ চেপে ধরে নিঃশ্বাস আটকিয়ে মে’রে ফেলতে চেয়েছিলাম। তা এখন ওইটাই আবার রিপিট করি? শুধু আজ হাতের জায়গায় বালিশ থাকবে!”
আলো বড়বড় চোখে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“আমি আপনাকে মা’রতে পারবেন?”
-“এতে কোনো সন্দেহ আছে?”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে গিয়ে বিছানা থেকে বালিশ নিয়ে এসে স্যারের সামনে বাড়িয়ে ধরে বলল,
-“ঠিক আছে, প্রমাণ দিন।”
আধার অদ্ভুত চোখে তাকায়। এই মেয়েটার মাথায় নির্ঘাত কোনো সমস্যা আছে। সে বালিশ নিয়ে ওটা আবার ছুঁড়ে মা’রল মেয়েটার মুখে।

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৭

-“আমার চোখের সামনে থেকে সরো। নয়তো থাপ্পড় খাবে!”
আলো নিচে থেকে বালিশ তুলে হেঁসে বলল,
-“আমি জানি, আপনি কখনোই আমাকে আঘাত করতে পারবেন না।”
আধার এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“এত বিশ্বাস?”
আলো রুম থেকে চলে যেতে যেতে বলে উঠল,
-“নিজের থেকেও বেশি!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৯