এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪০
নুসরাত ফারিয়া
কিছু জরুরী কাজ ও মিটিংয়ে জন্য আধারকে আজ অন্য শহরে যেতে হবে। ভার্সিটি থেকে এসেই নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিয়েছে ব্যাগে, সাথে কিছু ফাইলস, ডকুমেন্টস সবকিছু। আধার ফোনে কথা বলতে বলতে চেঞ্জ করে নিল। একটু পরই বেরিয়ে পরবে। কাঁধে ফোন গুঁজে মাথা কাত করে চেপে ধরে, দু’হাতে শার্টের বোতাম লাগানোর সময় খেয়াল করল—আলো এসে নিজেই আলতো হাতে বোতামগুলো লাগিয়ে দিচ্ছে। আধার মেয়েটার মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে, অপর প্রান্ত ব্যক্তির সাথে কথা বলতে থাকল।
আলো সুন্দর করে সব বোতাম লাগিয়ে দিয়ে, কোটও পরিয়ে দিল। আধার আজ সাদা-কালো পরেনি, বরং নীল স্যুটবুট পরেছে। আলো নিজের কাজ শেষ করে সামনে থেকে সরে যেতে চাইলে, আধার বামহাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিল। মেয়েটা মুখ তুলে উপরে তাকাতেই, ভেজা চুমু এসে তার ললাটের মাঝে পড়ল।
আধার কিছুটা সময় নিয়ে কথা বলা শেষ করে, ফোন রেখে দিল বিছানার ওপর। তারপর পাঁজি মেয়েটার সরু নাক টেনে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি যতদিন আসব না, ততদিন ভদ্র মেয়ের মতো থাকবা। শরীর ভালো লাগলে ভার্সিটিতে যেও, নয়তো যেতে হবে না। বাড়িতে বসেই সব নোট এবং পড়া কমপ্লিট করো। রাতে একা থাকতে অসুবিধা হলে তিথির কাছে যেও! অহেতুক রাতবিরেতে ড্রয়িংরুমে যাবে না। আর না রুমের দরজা খুলে রাখবে। আমি যেমনটা রেখে যাচ্ছি, ফিরে এসে যেন তেমনটাই পাই। নয়তো তোমাকে কেটেকুটে নদীতে ফেলে আসব!”
আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“আপনি এত নেগেটিভ ভাবেন কেন, বলুন তো? সবসময় খালি ওভারথিংকিং করেন।”
-“তোমাকে নিয়ে আমি ভাববো না তো আর কে ভাববে শুনি? তুমি যেটাকে নেগেটিভ মাইন্ড বলছো, সেটা আসলে নেগেটিভ নয়! তোমাকে নিয়ে আমার ভয়, চিন্তা দুটোই হয়। কারণ তোমাকে আমি হারাতে চাই না। দিনশেষে এই তুমিটাকেই আমার চাই, খুব করে চাই। তাই সাবধানে থাকতে বলছি। আজকাল দুনিয়া আর ভালো নেই। কিছু কিছু মানুষের চেহারার আড়ালে কুৎসিত রূপ লুকিয়ে আছে। অচেনা মানুষ হোক কিংবা পরিচিত মানুষ, তবুও তুমি একা কখনো কোনো পুরুষ মানুষের কাছে যাবে না। সয়ং আমার ভাইয়ের কাছেও না। আমি তোমাকে অনেক কষ্টে পেয়েছি, বাকীটা জীবন এই তোমার সাথেই কাটাতে চাই। তাই বলছি, তোমার স্বামীর জন্য হলেও নিজের একটু খেয়াল রেখো।”
আলো অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। এই লোকটা যে তাকে নিয়ে এত ভাবে, সেটা কল্পনার বাইরে ছিল। সে তো এমনই একজনকে চেয়েছিল, যে কি-না তাকে সবসময় আগলে রাখবে, চোখেচোখে রাখবে। উমম…মাঝেমধ্যে ভালোও বাসবে। আলো মুচকি হেঁসে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে, চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“এত চিন্তা করবেন না। আমি নিজের খেয়াল রাখব, আর আপনিও কিন্তু নিজের খেয়াল রাখবেন। কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না, প্রয়োজন ছাড়া কথাও বলবেন না। হাসা তো একদম বন্ধ! কারোর আশেপাশেও যেন ঘেঁষবেন না। অপরিচিত কারোর হাতে কিছু খাবেন না। ওকে?”
আধার কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সে এমনিতেও এইগুলো কিছুই করে না। অথচ মেয়েটার কথা শুনে মনে হচ্ছে, সে এতদিন এইগুলোই করে বেরিয়েছে। এই কথাগুলো বলার কোনো মানে হয়? আশ্চর্য!
-“আমার কথা শুনলেন? নাকি অন্য কান দিয়ে বের করে দিলেন?”
-“আজকাল কানে কম শুনতেছি৷ তাই তোমার কথাগুলো বুঝতে পারিনি। সো স্যাড!”
আলো দাঁত কটমট করল। তার বেলায় হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা, আর নিজের বেলায় একটুও না? এটা আবার কেমন নিয়ম?
-“এমন করে বাঁদরের মতো গলায় ঝুলে না থেকে সরো, আমাকে রেডি হতে হবে।”
আলো গলা ছেড়ে দিয়ে মুখ গোমড়া করে বলল,
-“আমি বাঁদর?”
-“না, হনুমান।”
-“আর আপনি একটা পেটমোটা হাতি।”
-“ইঁদুরের মতো চুই চুই করলে কিন্তু রুম থেকে বের করে দিবো।”
আলো অভিমানে মুখ সরিয়ে নিয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। আধার আড়চোখে ফুলে ওঠা গালের দিকে তাকিয়ে, মনে মনে হেঁসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ভেজা চুলগুলো ব্লু ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিল, তারপর জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে সেট করে রেখে দিল। হাতের কব্জিতে ঘড়ি বেঁধে, মানিব্যাগ প্যান্টের ব্যাক পকেটে রাখার সময় একহাতে শার্টের তিনটা বোতাম খুলে রাখল। এই মেয়েটা গলা অবধি বোতাম লাগিয়ে দিয়েছে।
-“তিনটে বোতাম না খুলে, পুরো শার্ট-ই খুলে যান।”
একথা কর্ণগহ্বরে পৌঁছাতেই আধারের হাত থেমে গেল। ও কিছু না বলে চুপচাপ শার্টের তিনটে বোতাম লাগিয়ে বলল,
-“আর কিছু?”
আলো ভাব নিয়ে বলল,
-“জলদি ফিরে আসা হোক, নয়তো খান বাড়ির দরজা আপনার জন্য বন্ধ।”
-“নো প্রবলেম। এ বাড়িতে আসব না!”
আলো অদ্ভুত চোখে তাকায়। এই শয়তান লোকটা আর কখনো ভালো হবে না। সারাজীবন ত্যাড়া বাঁশই হয়ে থাকবে। সে একরাশ মন খারাপ নিয়ে রুম থেকে চলে যেতে শুরু করল। কিন্তু দরজার চৌকাঠ পেরোতে পারল না। তার আগেই লোকটা ঝড়ের বেগে তেড়ে এসে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। এবং গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,
-“যেতে বলেছি তোমাকে?”
আলো অভিমানী সুরে বলল,
-“বাঁদর, হনুমান, ইঁদুর থেকে কি করবে?”
-“আদর নিবে এবং দিবে।”
একথা বলে আধার একহাতে মেয়েটার দুগাল চেপে ধরে ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। আলো বড়বড় চোখে তাকিয়ে আছে। লোকটা যে এখন এমন কাজ করতে পারে, সেটা ভাবতেও পারেনি। সে চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে দু’হাতে কোটের কলার চেপে ধরল।
-“রেসপন্ড টু মি…মিসেস খান!”
আধার কয়েক মিনিট পর ঠোঁট ছেড়ে, ফিসফিসিয়ে কথাটা বলে আবারো মত্ত হলো, রমণীর কোমল ঠোঁটের মাঝে। সময় গড়ালো, উন্মাদনা বাড়াল। শক্তপোক্ত হাতের এলোমেলো স্পর্শে এবং পুরু ঠোঁটের তীব্র ছোঁয়ায় আলো হাঁপিয়ে উঠেছে। সে রেসপন্স না করে উল্টো দু’হাতে চওড়া বুক ঠেলে সরাতে চাইল। কারণ সে ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। এই মিসকে শয়তান লোকটা আজ ইচ্ছে করে ওয়াইল্ড হচ্ছে। এতদিন কি সুন্দর করে সফটলি চুম্বন করত, আর আজ শ্লার ব্যাডা রাফলি চুম্বন করছে।
-“তোমাকে রেসপন্স করতে বলেছি, এইভাবে গরুর মতো ঠেলাঠেলি করতে নয়।”
আধার জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে হিসহিসিয়ে বলে। সে কবে ফিরবে জানে না, তাই এখন একটু মন ভরে মেয়েটাকে আদর করতে চাচ্ছে। অথচ এই বেকুব মেয়েটা তাকে দূরে সরিয়ে দিতে ব্যস্ত। আধার নিজেকে সামলে নিয়ে আলোকে ছেড়ে দিয়ে গমগমে গলায় বলল,
-“বেরিয়ে যাও রুম থেকে। আর বাহিরে গিয়ে মিরকি রোগীদের মতো কাঁপা-কাঁপি করো।”
আলো বুক খামচে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে ছলছল চোখে তাকায়। সে কি ইচ্ছে করে এমন করে নাকি? দম আঁটকে এলে বাঁধা দিবে না তো কি করবে? এই লোকটা কি তাকে রোবট ভাবে? নাকি নিজের মতে অনুভূতিহীন ভাবে? যে ছুঁয়ে দিলেও কোনো রিয়াক্ট করবে না! আলো নাক টেনে ওড়না ঠিক করে বলল,
-“আমার হার্ট দূর্বল, ভীষণ দূর্বল। যেই মেয়ে স্ট্রং, ছুঁয়ে দিলেও রোবটের মতো থাকবে, আপনার কথা শুনবে, আপনাকে তৃপ্তি দিতে পারবে, তাদের সাথে গিয়ে রোমাঞ্চ করুন। কারণ আমি এই গরুর মতো ঠেলাঠেলি আর মিরকি রোগীর মতো কাঁপা-কাঁপি ছাড়া কিছুই করতে পারব না।”
আধার একহাত দেয়ালে রেখে, আলোর দিকে ঝুঁকে—আলতো হাতে চিবুক ধরে উঁচু করল। তারপর চোখে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
-“আধার খানকে সুখ, শান্তি, তৃপ্তি দেওয়ার জন্য তার আলোই যথেষ্ট। এর বাইরে কেউ না মানে কেউ-ই না! ইউ আর মাই পার্সোনাল হ্যাপিনেস। জাস্ট ফর ইউ…জান!”
আলো থমকাল, চমকাল, স্তম্ভিত হলো। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, পরক্ষণেই মুখ সরিয়ে নিল। আধার গালে পরপর দুটো চুমু খেল।
-“রাগ করে না জান।”
এইভাবে কেউ বললে, আর রেগে থাকা যায়? উঁহু, যায় না তো। তেমনি করে আলোও পারল না রাগ করে থাকতে। তবে সে বাহিরে কিছু প্রকাশ না করে, স্বাভাবিক গলায় বলল,
-“আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আধার কিছু না বলে সরে গেল। নিজেকে ঠিকঠাক করে ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে আসতেই আলো সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল।
-“কিছু বলবে?”
-“উমমম….পাঁচ মিনিট হবে?”
আধার হাত ঘড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,
-“হুম। কিন্তু কেন?”
আলো চটজলদি সোফার ওপর দাঁড়িয়ে ইশারায় বোঝাল, তার সামনে আসতে। আধার কপাল কুঁচকে মেয়েটার সামনে যায়। আলো হেঁসে দু’হাতে প্রিয় মানুষটার গলা জড়িয়ে ধরে—কপালে, দুই চোখের পাতায়, নাকে, দুগালে ও থুতনিতে ছোট ছোট চুমু খেল। আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মেয়েটার লাজুক চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো এতটুকুই আদর চেয়েছিল।
-“সাবধানে ড্রাইভ করবেন আর রাস্তাঘাট দেখেশুনে যাবেন, ঠিক আছে?”
আধার বাধ্য ছেলের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে বলল, -“ঠিক আছে ম্যাডাম!”
আলো বামহাতে মানুষটার চোখদুটো ঢেকে, লালচে ঠোঁটে অনেকগুলো চুমু খেল। তারপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে কান্নারত কণ্ঠে বলল,
-“আ…আমি আপনাকে খুউউব মিস করব।”
আধারের মনের মাঝে প্রশান্তির বাতাস বয়ে যায়। অবাধ্য পিছুটানের এই একটাই বড় কারণ তার। যার জন্য সে সবকিছু বদলেছে, সয়ং নিজেকেও! আধার চোখ বুজে অর্ধাঙ্গিনীকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করল। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীর কণ্ঠে আওরাল,
-“মন খারাপ করো না। যতদ্রুত সম্ভব আমি, তোমার কাছে ফিরে আসব।”
কেটেছে চারদিন! বড় ভাইয়ের কথামতো রাত তিহানের ব্যাপারে সব খোঁজখবর নিয়েছে। ছেলেটা যথেষ্ট ভালো এবং তার পরিবারও ভালো। মির্জা বংশের একমাত্র ছেলে হওয়ায় এখনো কাজকর্মে যোগ দেয়নি, লেখাপড়া শেষ করে তবেই নিজেদের কোম্পানিতে যোগদান করার প্ল্যান আছে। রাত অফিস থেকে ইমার্জেন্সি ছুটি নিয়ে চট্টগ্রামে নিজে গিয়েছিল তিহানের সাথে কথা বলতে। কোনোদিকেই তার খারাপ মনে হয়নি, আর তিহানের পুরো পরিবারের ব্যাপারে জানলে তাহমিনা খান তো এক পায়ে রাজী হয়ে যাবেন। এসব ভেবে আনমনে হাসল রাত। ফোনকলে বড় ভাইয়ের সাথে তিহানের বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে গাড়ি থেকে নামল। সে দু’দিন পর মাত্র বাড়ি ফিরল। সামনে হাঁটতে হাঁটতে তার নজর বাগানে যায়। আলো গুনগুন করতে করতে পানির পাইপ দিয়ে ফুলগাছে পানি দিচ্ছে। আর তিথি দোনলায় বসে থেকে ফোনে কারোর সাথে কথা বলছে। হঠাৎই রাতের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি এল। সে মনে মনে ক্রুর হেঁসে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,
-“তোমার পুচকে বউ বর্তমানে কি করছে জানো?”
জরুরী আলাপআলোচনার মধ্যে হুট করে বউয়ের কথা শুনে আধারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
-“তুই আবার ওর আশেপাশে গেছিস?”
-“একই বাড়িতে থাকি, সেখানে আশেপাশে যাওয়াটা স্বাভাবিক। বাই দ্য ওয়ে স্যার! আপনার বউ বর্তমানে হেঁসে হেঁসে একটা ছেলের সাথে কথা বলছে, তাও ভিডিও কলে। কোনো মেয়ে ব্ল্যাশ করলে যে, এত কিউট লাগে সেটা বোম্বাই মরিচকে না দেখলে জানতামই না। উফফ…পুরাই পিংক বার্বিডল!”
আধারের মেজাজ খারাপ হলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“ঢাকায় ফিরতে দে, তারপর তোকে দেখে নিচ্ছি।”
-“ঠিক আছে, এখন আমি তোমার বউকে দেখি। বাই ব্রো!”
বলেই খট করে লাইন কেটে দিয়ে শব্দ করে হেঁসে উঠল। আচমকা হাসির শব্দ শুনে আলো, তিথি দুজনেই চমকে ওঠে। আলো তড়িৎ পাইপ নিয়ে পিছনে ঘুরে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে রাতের হাসি গায়েব হয়ে গেল। এবং মূহুর্তেই ভিজে একাকার হয়ে উঠল।
তিথি এই দৃশ্যটা দেখে খিলখিল করে হেঁসে ওঠে। রাত দু’হাতে পানি থেকে নিজেকে আড়াল করতে করতে চেঁচিয়ে বলল,
-“স্টুপিড মেয়ে। পানির নল সরাও! নয়তো তোমাকে সুইমিংপুলে ফেলে দিবো।”
আলো তড়িঘড়ি করে নল সরিয়ে মাথা চুলকিয়ে আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করল,
-“সরি ভাইয়া। আমি আসলে বুঝতে পারিনি।”
রাত কিছু না বলে মাথার চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বাড়ির ভেতর যেতে যেতে বিরবির করে বলে ওঠে,
-“এই আকাম-কুকাম করার মেশিনটাকে আধার খান কীভাবে সহ্য করে, কে জানে!”
আলো সবে গোসল শেষ করে, শরীরে তোয়ালে পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। আলমারি খুলে পোশাক বের করতেই ফোনটা বেজে উঠল। সে বিছানার কাছে এগিয়ে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখে—আধার স্যার কল দিয়েছে। আলো দ্রুত কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেল,
-“ল্যাপটপ অন করো।”
ব্যস! এটা বলেই লাইন কেটে দিল। আলো ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে, ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসে অন করতেই ভিডিও কল এল। মেয়েটা একপলক নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবল—ধরবে না। কিন্তু পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে কল রিসিভ করল।
আধার চোয়াল শক্ত করে কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, কিন্তু কিছু আর বলা হয়ে উঠল না। মূহুর্তেই তার অশান্ত হৃদয়টা হুট করে শান্ত হয়ে গেল। চোখেমুখে এসে ভর করল, একরাশ মুগ্ধতা। আধার কি বলতে চেয়েছিল, সবকিছু ভুলে গিয়ে সে শরীরটা এলিয়ে দিল বিছানার হেড বোর্ডে। ঠোঁট কামড়ে মেয়েটার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করতে করতে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“ঢাকায় বসে থেকে আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করছো?”
আলো মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে বলল,
-“সিডিউস আর আপনার মতো নিরামিষ তরকারিকে করব? হাউ ফানি। আমার এতোটাও খারাপ সময় আসেনি স্যার।”
-“আমাকে তো তুমি কাছেই ঘেঁষতে দাও না। একটু চুমু খেলেই মটকা মে’রে পড়ে থাকো। আর ছুঁয়ে দিলেই অজ্ঞান হওয়ার ভান করো! তাহলে আমি আমিষ হবো কীভাবে হুহ্?”
আলো বুঝি লজ্জা পেল। সে এতিওতি তাকাতে তাকাতে বিরবির করে বলল,
-“আমিষ হতে হবে না, এমন নিরামিষই হয়ে থাকুন।”
আধার কিছু একটা ভেবে জানতে চাইল,
-“হঠাৎ সন্ধ্যা বেলায় গোসল? আমি চলে এসেছি আর নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছো? অসময়ে গোসল করে যদি অসুখ বাঁধাও, তাহলে হাসপাতালে এক বছরের জন্য রেখে আসব।”
আলো গোমড়া মুখে বলল,
-“ইচ্ছে করে করিনি তো। আসলে তিথি আর আমি বাগানে ছিলাম। ও একটা ফুল নিতে চেয়েছিল। আর আমি ভেতরে প্রবেশ করে ফুল ছিঁড়তে গিয়ে, কাদামাটিতে আছাড় খেয়েছি।”
-“ব্যথা পেয়েছো?”
-“অল্প একটু!”
-“সাবধানে চলাফেরা করবে। নয়তো অল্প বয়সেই কোমর ভেঙে নিয়ে বসে থাকবে। তখন আর আমাকে কিছু করতে হবে না।”
আলো এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কেন? আপনি আবার কি করবেন?”
-“কিছু না।”
আলো কিছু না বলে টুনা-টুনির লেজ, বড় বড় কান ধরে টানাটানি করে খেলছে আর হাসছে। অপর প্রান্ত থেকে আধার ঠোঁটের কোণে হাত রেখে অপলক নয়নে মেয়েটার হাসি দেখছে। একসময় শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“আজ কি কারোর সাথে ভিডিও কলে কথা বলেছিলে?”
-“না তো, কেন?”
-“উঁহুম, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। আচ্ছা তুমি চেঞ্জ করে নাও!”
আধার বাহিরে স্বাভাবিক থাকলেও মনে মনে বেশ ক্ষিপ্ত হয়েছে। বাড়ি ফিরে আগে রাতের কানের নিচে কয়েকটা লাগাবে, তারপর শান্ত হবে। কতবড় সাহস ছেলেটার! তার বউয়ের নামে কূটনামি করছে, আবার তারই কাছে। এই ছেলেটা সবকিছুতেই পিএইচডি করে এসেছে। সাথে পাড়াপ্রতিবেশি মহিলাদের মতো কূটনামিতেও। আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ল্যাপটপের উইন্ডো নামাতে যাবে, ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে ওঠা অপ্রত্যাশিত এক দৃশ্য দেখে মূহুর্তেই হার্টবিট থমকে গেল।
অন্যদিকে, আলো হতভম্বের ন্যায় তড়িঘড়ি করে ফ্লোর থেকে সফেদ তোয়ালে তুলে শরীরে জড়িয়ে নিয়ে, চট করে ল্যাপটপের সামনে থেকে সরে যায়। ইশশ…কি লজ্জা! কি লজ্জা! সে তো উঠার সময় খেয়ালই করেনি, তোয়ালে ঢিলে হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ মানুষটার সামনেই….ধ্যাৎ! আর ভাবতে পারল না বেচারি। সে সবসময় কিছু না কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকে। আজকের পর আর তোয়ালে পরে রুমেই আসবে না। ধুর! ধুর!
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৯
-“মিসেস খান?”
-“উমম?”
স্বামীর ডাকে আড়াল থেকেই সাড়া দিল আলো। তখনই শুনতে পেল, গম্ভীর কণ্ঠে বলা কিছু অপ্রত্যাশিত বাক্য—
-“ভোররাতে ফিরছি, নিজেকে প্রস্তুত রেখো!”
