Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৪

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৪

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৪
নুসরাত ফারিয়া

পড়ন্ত বিকেল বেলায় হরেকরকমের ফুলের চারা ভরতি খোলা ছাঁদে এসে দাঁড়ায় যুবক। ফর্সা শরীরে কালো স্যুটবুট! মাথার সিল্কি চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে। যুবকটি একহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে, অন্য হাতে কানে ফোন ধরে কথা বলছে আর হাঁটাহাঁটি করছে। কথা বলার তালে তালে নিচের রক্তিম ঠোঁট কামড়ে ধরছে দাঁত দিয়ে। যুবক একটু সময় নিয়ে কথা বলা শেষ করল। বাম হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে কপাল স্লাইড করতে করতে দরজার দিকে যেতেই কপাল কুঁচকে গেল। সিঁড়িতে যার সাথে ভুলবশত ধাক্কা লেগেছিল, ওই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় মেয়েটা তড়িঘড়ি করে বলল,

-“মিস্টার মৃন্ময় আহমেদ রাজ! আমি আপনাকে চিনি। বলতে পারেন…আপনার বিশাল বড় ফ্যান।”
মৃন্ময় থেমে গেল। পিছনে ফিরে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি…?”
-“আমি ছায়া রহমান।”
-“উমমম…আপনি আলো রহমান রিক্তার বোন?”
যুবকের মুখে বড় বোনের নাম শুনে ছায়া চমকাল। সে তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হ্যাঁ, হ্যাঁ! আমার আপু। আর এটা আপুর শ্বশুর বাড়ি। কিন্তু…আপনি আমার আপুকে চিনলেন কীভাবে?”
-“আপনার দুলাভাইয়ের মাধ্যমে।”
ছায়া ভাবল—হয়তো দুলাভাইয়ের সাথে লোকটা পরিচিত। তাই তো আজ এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে দেখা পেল। সে অত কিছু না ভেবে হাসিমুখে বলল,

-“আপনাকে সামনাসামনি দেখার অনেক ইচ্ছে ছিল আমার। এত বছর শুধু টিভি, ফোনের পর্দায় দেখেছি। কিন্তু আজ, আপনি আমার সামনে। এতে আমি অনেক হ্যাপি! উমমম…একটা অটোগ্রাফ দিবেন?”
মৃন্ময় অচেনা মেয়েটার হাসিমাখা মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে বুক পকেট থেকে কলম বের করল। এটা দেখে তো ছায়া মহা খুশি। কিন্তু এখন সে অটোগ্রাফ কোথায় নিবে? তার কাছে তো কোনো ডায়েরি বা নোটপ্যাড নেই। হঠাৎই কিছু একটা মনে হতে সে দ্রুত হাতব্যাগ থেকে নিজের কারুকাজ করা সাদা একখানা রুমাল বের করে দিয়ে বলল,
-“এখানে দিন!”
মৃন্ময় ভদ্র ছেলের মতো রুমালে অটোগ্রাফ ও একটা ফানি ইমোজি আঁকিয়ে দিল। এত সময় ধরে ছায়া শুধু অপলক নয়নে তাকিয়েই ছিল, ওই সুন্দর মুখশ্রীর পানে। মেয়েটা কল্পনাও করতে পারেনি আজ আপুর শ্বশুর বাড়িতে এসে প্রিয় মানুষটার সাথে দেখা হয়ে যাবে। যাকে সে মনে মনে এতগুলো বছর চেয়ে এসেছে। অথচ মানুষটা জানেই না!
-“হেইই প্রিটিগার্ল? কই হারালেন?”
ছায়াকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে এবং অন্যমনষ্ক হতে দেখে চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে কথাগুলো বলে মৃন্ময়। ছায়া হকচকিয়ে উঠে চট করে নজর নামিয়ে নিয়ে এতিওতি তাকিয়ে বলল,

-“ক…কই? কোথাও না।”
মৃন্ময় কথা না বাড়িয়ে মেয়েটার রুমাল বাড়িয়ে ধরল। ছায়া মুচকি হেঁসে রুমালটা নিল। তখনই মৃন্ময়ের ফোনটা আবারো বেজে উঠল। সে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“এক্সকিউজ মি!”
একথা বলে মৃন্ময় ছাঁদ থেকে চলে গেল। আর ছায়া খুশিতে লাফিয়ে উঠে রুমালে মৃন্ময়ের নাম লেখার ওপর পরপর চারটে চুমু খেল। বুকের মাঝে রুমালটা ধরে গোল গোল ঘুরতে ঘুরতে চিল্লিয়ে উঠল,
-“আআআআ….আমি আজকে ভীষণ খুশি!”
ছায়া দৌড়ে ছাঁদ থেকে নেমে সোজা বড় বোনের রুমের দিকে চলে যায়। তারপর দরজায় নক করে আপুকে ডাকে।
কাছে আসার তীব্র প্রবণতার মাঝে একে অপরের কাছ থেকে ছিটকে সরে গেল দুটি প্রাণ। ছোট বোনের বিচিলিত কণ্ঠস্বর শুনে আলো ধড়ফড়িয়ে বিছানা থেকে নামে। কোনোমতে পরণের এলোমেলো শাড়ি ঠিক করে, জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকায়। আধার গায়ে শার্ট জড়িয়ে, বোতাম লাগাতে লাগাতে ওয়াশরুমে চলে গেল। আলো সময় নষ্ট না করে দরজা খুলে দিল। এবং সঙ্গে সঙ্গে আপুকে জড়িয়ে ধরল ছায়া।
-“ওওও আপু রেএএএ….আজ আমি খুব, খুউউউব খুশি। অবশেষে উনার দেখে পেয়েছি!”
ছোট বোনকে এত খুশি হতে দেখে আলোর ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটল। সে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানতে চাইল,

-“এত খুশি হওয়ার কারণ? আর কার দেখা পেয়েছিস?”
হাতে থাকা রুমাল মেলে ধরে ছায়া আহ্লাদী কণ্ঠে বলল,
-“দেখো, দেখো আপু! আমি আজ কি পেয়েছি।”
আলো কপাল কুঁচকে রুমালের দিকে তাকায়। সেই জনপ্রিয় গায়কের অটোগ্রাফ দেখে চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। অবাক কণ্ঠে শুধাল,
-“ওই লোকটার অটোগ্রাফ পেলি কোথায়?”
-“সিঁড়িতে!”
-“মানেহ??”
ছায়া আপুকে সব ঘটনা এক এক করে খুলে বলল। কথা বলার ফাঁকে দুলাভাইকে খেয়াল করে ছায়ার বকবকানি চুপ হয়ে গেল। আলো ভ্রু কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে স্বামীকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-“দ্য গ্রেট সিংগার মিস্টার মৃন্ময় আহমেদ এখানে কেন? না মানে, আপনি চেনেন?”
-“হুম, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড! আর আজ তিথির বিয়ে উপলক্ষে এসেছে।”
লোকটার কথা শুনে আলো সরু চোখে তাকায়। কই এতদিন তো তাকে কিছু বলেনি! তাহলে অনন্ত ছায়ার সাথে দেখা করাতে পারত। বউকে ওমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আধার কপাল কুঁচকায়। এই মেয়েটার আবার কি হলো কে জানে!

-“আপনার বন্ধুকে ডাকুন, উনার সাথে আমার পুরোনো হিসাবনিকাশ বাকী আছে!”
পুরোনো হিসাবনিকাশের কথা শুনে আধারের কপাল আরো কুঁচকে গেল। তারমানে এই মেয়েটা মৃন্ময়কে চেনে? তবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ প্রায় সব মেয়েরায় মৃন্ময়কে চেনে! তাই সে কথা না বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে ফোন নিয়ে এসএমএস করল। তার ঠিক কিছুক্ষণ পরই মৃন্ময় এসে হাজির।
-“আসসালামু আলাইকুম ভাবীজান! কেমন আছেন?”
এতবড় একটা দামড়া যুবকের মুখে ‘ভাবী’ ডাক শুনে আলো ভেবাচেকা খেল। পর মূহুর্তে নিজেকে সামলিয়ে সালামের জবাব দিয়ে বলল,
-“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
-“আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি।”
-“আপনি আমাকে কীভাবে চিনলেন? আমার জানা মতে আপনার সাথে কখনো দেখা হয়নি আমার, তাহলে?”
-“আমার সাথে আপনার দেখা না হলেও, আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছে।”
আলো চোখদুটো বড়বড় করে বলল, -“মানে?”

-“আপনি যখন কোমায় ছিলেন, তখন দেখা করেছিলাম।”
আলো, ছায়া দুজনেই বেশ অবাক হয়। কারণ তারা জানতোই না এটা। এবং ভাবনার বাইরে ছিল৷ আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে কোমরে দু’হাত রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আপনার ওপর আমি ভীষণ রেগে আছি, মিস্টার!”
মৃন্ময়ের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে আবার কি করল?
-“দেড় বছর আগে যখন আপনি দেশে ফিরেছিলেন, তখন আমরাও আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। মূলত আমার বোনের জন্য যেতে হয়েছিল। এতটা পথ জার্নি করে, পরিবারকে মিথ্যে বলে অত রাতে এয়ারপোর্টে যাই। কিন্তু আপনি! আপনি সবার থেকে ফুল, চিঠি, ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু নিয়েছেন। অথচ আমার বোনটার থেকে কিছু নেননি, এমনকি সামান্য একটা অটোগ্রাফও দেননি। অন্য মেয়েদের ঠিকই দিয়েছেন৷ আপনি জানেন? ওইদিন আমার বোনটা কত কেঁদেছিল? শুধুমাত্র এই আপনিটার জন্য আমার বোন পুরো রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরেছিল। আমি আপনাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছু কারণবশত আপনার কাছে সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারিনি। ফলস্বরূপ আপনি লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যান। কুখ্যাত গায়ক হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের ফ্যানদের থেকে সারাক্ষণ পালাই পালাই করেন। সামান্য একটা অটোগ্রাফ দিতেও কিপ্টামি করেন। সময়ের মূল সবারই রয়েছে, অথচ আপনার অহংকারের জন্য মাটিতে পা পড়ে না। ফ্যানদের সামলাতে না পারলে গায়ক হয়েছেন কেন? সারাক্ষণ বাড়িতে বসে থাকতেন। শুধু শুধু ভক্তদের ইমোশান নিয়ে খেলেন!”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল আলো। সে সত্যিই বিরক্ত এই গায়কের উপর। মাঝেমধ্যে ফ্যানদের সাথে দেখা করে অটোগ্রাফ দিলে কি হয়? তাহলেই তো কেউ মনে মনে আক্ষেপ করত না।
অন্যদিকে, মৃন্ময় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। এই প্রথম কেউ তার সামনে দাঁড়িয়ে এতগুলো কথা শুনিয়ে দিল। অথচ সে মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারছে না। ওইদিকে আধারও স্তব্ধ হয়ে গেছে। সে ভাবতেই পারেনি তার বউ এইভাবে ছেলেটাকে সাবান ছাড়া ধুয়ে দিবে। এই মেয়েটা এত ঝগড়া করতে কীভাবে পারে? হোয়াই?
আধার তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বউয়ের বাহু ধরে নিজের কাছে নিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“সব জায়গায় তোমার এই রেলগাড়ীর মতো মুখটা না খুললে হয়না?”
-“কেন? কেন খুলবো না? আমাকে না বুঝিয়ে নিজের বন্ধুকে বোঝান। একটু চোখকান খুলে দুনিয়া দেখতে বলুন। উনার জন্য কত ভক্তরা হা হুতাশ করে সামান্য একটু দেখা করার জন্য। সেলিব্রিটিদের এত অহংকার করতে নেই। দিনশেষে এই সাধারণ ভক্তদের কারণেই এত ফেমাস হয়েছে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য!”
আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল৷ সে এই মেয়েটাকে থামাতে পারবে না। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ওর কথায় কিছু মনে করিস না। তোকে বলেছিলাম তো ও কেমন!”
মৃন্ময় কিছু বলতে যাবে তখনই আলো স্বামীর দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“বন্ধুর কাছে আমার নামে দুর্নাম করা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে আপনার?”
আধার নিজের কপাল চেপে ধরল। সে এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়ল?

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ও সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে এসেছে। একই সাথে তিথি ও তিহানের বিয়েটা সম্পূর্ণ হয়। ড্রয়িংরুমে মির্জা পরিবারসহ রহমান পরিবারও রয়েছে। সোবহান খান সবার সাথে বসে গল্প করছেন। আর একটু পর তিথির বিদায়!
আলো এক কোণে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠিক সামনে আধার স্যার দাঁড়িয়ে থেকে মৃন্ময়ের বোন মিরার সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। এই মেয়েটাকেই ওইদিন রাস্তার পাশে লোকটার সাথে দেখেছিল। তখন অন্যকিছু ভেবে নিয়েছিল, কিন্তু আজ জানতে পারল, এরা আগে থেকেই পরিচিত। এমনকি মিরার বয়ফ্রেন্ডও আছে। তবুও তার হিংসা হচ্ছে। বয়ফ্রেন্ড থাকা সত্ত্বেও তার বরের সাথে চিপকে লেগে আছে। আর তার বরটাও মেয়েটার সাথে রাজ্যের আলাপ করতে ব্যস্ত। তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না!

আলোর ভীষণ রাগ হচ্ছে। হয়তো এর আগে কখনো মানুষটাকে অন্য মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখেনি। তাই এখন অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। তার বিশ্বাস আছে, লোকটা কখনো তাকে ঠকাবে না! তবুও কেন জানি খারাপ লাগছে তার।
আধার মিরার সাথে মৃন্ময়ের বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। সে যেমন তিথিকে ভালোবাসে, তেমন এই মেয়েটাকেও বোনের মতোই ভালোবাসে, স্নেহ করে। আর এই মেয়েটাও তাকে মৃন্ময়ের থেকেও বেশি ভালোবাসে। একটু দেখা হলেই জমিয়ে রাখা কথাগুলো বলে। তাই সে চেষ্টা করছে মিরাকে একটু সময় দেওয়ার জন্য। কারণ মেয়েটা আর কিছুদিন পরই দেশের বাইরে চলে যাবে মাস্টার্স কমপ্লিট করতে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার একফাঁকে খেয়াল করল, অদূরে তার বউটা মুখ কালো করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
মানুষটাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে আলো চোখমুখ কুঁচকে পাশে ফিরতেই দেখতে পেল—তার বোন ছায়া মৃন্ময়ের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত! তাদের সাথে মায়াও আছে। বিকেলে ওইসব কথাগুলো বলার পর মৃন্ময় তাকে বলেছিল, এখন থেকে সে চেষ্টা করবে ভক্তদের ইচ্ছেটাকে পূরণ করতে। আলো মনে মনে খুশি হয়, তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। কারণ সে জানে, ছায়া মনে মনে কতটা চায় এই লোকটাকে। মুখে না বললেও সে বুঝতে পারে। কিন্তু…লোকটাকে পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়! বয়সের ব্যবধান তো আছেই, তারওপর কোথায় মৃন্ময় আর কোথায় তার সাধারণ বোন৷ এ তো বামুন হয়ে চাঁদ ধরার চেষ্টা।

আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে অনেকবার বুঝিয়েছে মেয়েটাকে। কিন্তু অবুঝ মেয়েটা কিছুই বুঝতে চায় না। তার মতে, মৃন্ময় তাকে না চাইলেও সে গোপনে ভালোবেসে যাবে। ভালোবাসার মানুষটিকে যে পেতেই হবে, এটা কোথাও লেখা নেই। বরংচ দূর থেকেই একতরফা ভালোবাসা সুন্দর, উমম…ভয়ংকর সুন্দর!
সময়ের সাথে সাথে তিথির বিদায়ের পালা সমাপ্তি ঘটল। তাহমিনা খান মেয়ের ওপর কিছুটা রেগে থাকলেও, বিদায়ের সময় সবকিছু ভুলে গিয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিয়েছেন। একমাত্র মেয়েকে আদরে আদরে ভরিয়ে দেন। আধার, রাতও বোনকে আদর করে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে গাড়িতে তুলে দেয়। সোবহান খানও হাসিমুখে নাতনিকে বিদায় দেন।

সবকিছু ভালোভাবেই পার হয়ে যায়। মতিউর রহমান পরিবারকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আধার এত রাতে যেতে দিতে নারাজ। সোবহান খানও বাঁধা দেয়, তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আলোও নিজের পরিবারকে যেতে দেয় না। অগত্যা সবাইকে খান বাড়িতেই থাকতে হলো। আর তাহমিনা খানও কোনোরকম খারাপ আচরণ করেননি, হয়তো মেয়ের বিয়ের জন্য। উনি যথাসম্ভব অতিথিদেরকে অ্যাপায়ণ করার চেষ্টা করছেন। কোনোরকম ক্রুটি রাখেননি। এসব দেখে সোবহান খান মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। আজ যদি তাহমিনা খান ভুলেও কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করত, তাহলে তার বড় নাতি কি করত কে জানে। ছেলেটা এমনিই রেগে আছে ছোট বউমার ওপর। তারওপর আজ কিছু করলে, খান বাড়িতে ঝড়-তুফান সব বয়ে যেত! কারণ আধার উনাকে সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তার শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের যদি একটুও অপমান করার চেষ্টা করে, তাহলে কিন্তু সেও ছেড়ে দিবে না। এইজন্যই তিনি তাহমিনা খানকে বুঝিয়েছেন ঝামেলা না করতে। আর মেয়েটাও উনার কথা রেখেছে।

-“দিনশেষে নিজের হাঁটু বয়সী ছাত্রীকেই ভালোবাসলি?”
বন্ধুর কথা শুনে আধার শান্ত গলায় বলল,
-“ভার্সিটিতে ছাত্রী, আর বাড়িতে বউ হয় আমার।”
-“তোর বউ তো নয় যেন আগ্নেয়গিরির জ’লন্ত লাভা!”
আধার কিছু না বলে আনমনে হেঁসে কফির মগে চুমুক দিল। মৃন্ময় আর মিরাকেও যেতে দেয়নি। এত বছর পর এল তাদের বাড়িতে, আর এত সহজেই যেতে দিবে? উঁহু, কখনোই না।
-“কেউ একজন বলেছিল—কখনো বিয়ে করবে না, কাউকে ভালোবাসে না! অথচ গিরগিটি তুই…তলে তলে বিয়ে করে এখন সংসার করছিস। আবার ভালোও বাসিস!”
আধার মুচকি হেঁসে ছাঁদের পাঁচিলে হেলান দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“চেয়েছিলাম তো নিজের অন্ধকার জীবনের সাথে আর কাউকেই জড়াবো না! কিন্তু…কীভাবে কি হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। আমার এই নতুন জীবন শুরুর ক্ষেত্রে দাদাজান রয়েছে। ওই ব্যক্তি এবং ওপরওয়ালা আমাকে এই সুন্দর সংসারটা দিয়েছে। দাদাজান যদি জোর করে আমাকে বিয়ে না দিত, তবে আমি হয়তো কখনোই তোর ভাবীকে পেতাম না। আমি ওকে হুট করেই ভালোবাসিনি। বরং একটু একটু করে ওই পাগলিটার প্রেমে পড়েছি!”
মৃন্ময় কফি খেতে খেতে এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-“যেমন??”
আধার সামনে ফিরে আকাশে থাকা এক ফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমি সর্বপ্রথম প্রেমে পড়েছি তার কণ্ঠের! ও যখন ভার্সিটিতে শ্যামা পাখির মতো গান গাইত, তখন এই আধার খান আড়াল থেকে শুনত এবং অনুভব করত। আমি দ্বিতীয় বারের মতো প্রেমে পড়েছি মেয়েটার পাগলামি, বাচ্চামিতে। বলতে পারিস, ওর ঝগড়াঝাটি, আকাম-কুকাম করাটাও আমার ভালো লাগত! ওই মেয়েটাই ছিল একমাত্র আমার ঝগড়া করার সঙ্গী। তৃতীয় বারের মতো প্রেমে পড়েছি বৃষ্টিময় এক রাতে। এই ছাঁদেই মেয়েটা গান গাইছিল আর নৃত্য করছিল। ওই রাতে অজান্তেই আধার খানের হৃদয় থমকে ছিল। অদ্ভুত আমিটা আমার বউয়ের নাচের প্রেমে পড়ি। চতুর্থ বারের মতো প্রেমে পড়েছি মেয়েটার আগলে রাখার ধরণে।

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৩

এমনকি ওর হাতের রান্না খেয়েও আমি মুখ থুবড়ে পড়েছি। মেয়েটার সবকিছুতে আধার খান প্রেমে পড়েছে। তার প্রতিটা পাগলামি, ত্যাড়ামি, দুষ্টুমি….সবকিছু আমি ভালোবাসি। ওই সহজসরল মেয়েটার পুরো অস্তিত্বকে আধার খান ভালোবাসে। সবশেষে আমি ভয়ানকভাবে প্রেমে পড়েছি আমার অর্ধাঙ্গিনীর! যাকে ছাড়া এক মূহুর্তের জন্যও নিজেকে ভাবতে পারি না। ওই আধপাগল মেয়েটাই দিনশেষে আমার শান্তির কারণ রে। আলো বিহীন আধার নিঃস্ব, বড্ড নিঃস্ব!”
একটু থেমে চোখ বুজে পুনরায় আওরাল,
-“রিয়েলি…আই লাভ মাই ওয়াইফ, হার বিউটিফুল স্মাইল, অ্যান্ড এভরিথিং শি ইজ!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৫