এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৭
সুহাসিনী
স্ট্রেচারে রাহির রক্তাক্ত দেহটি রেখে সেটিকে নিয়ে ছুটলো অপারেশন থিয়েটারের দিকে।প্রেম কম্পিত স্বরে সেই কখন থেকে রাহিকে ডেকে যাচ্ছে।
“এই মেয়ে চোখ খোলো, কিচ্ছু হয়নি তো।আমাকে জ্বালাতে হবে তো নাকি,তাড়াতাড়ি উঠো।তুমি ছাড়া তো আমায় কেউ জ্বালাতে পারেনা। নিজে আরামে শুয়ে থেকে আমাকে কেনো এতো যন্ত্রণা দিচ্ছ বেগমজান।আমাকে কষ্ট দিয়ে তুমি কেনো এতো সুখ পাও।তুমি তো আমাকে কথা দিয়েছিলে আর কখনো আমার অবাধ্য হবে না,আমার সব কথা মেনে চলবে।তাহলে এখন কেনো আমাকে কষ্টে রেখে নিজে আরামে শুয়ে আছো।কেনো আমার কথা শুনেও সাড়া দিচ্ছ না।”
প্রেমের চোখ জোড়া জ্বলছে।মনে হচ্ছে টোকা দিলেই লাল চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়বে। এর আগে কখন প্রেমের এতো যন্ত্রণা হয়েছিল এটা তার জানা নেই।
ওটিতে রাহিকে ঢোকানোর সময়ে ডাক্তার প্রেমকে বাইরে অপেক্ষা করতে বললে প্রেম তৎক্ষণাৎ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো,
“আমার কাছ থেকে আমার বেগমজানকে আলাদা করতে চাইছিস কেনো? দেখছিস না ও আমার হাত ধরে রেখেছে।”
ডাক্তারের চোখ এবার রাহির হাতের দিকে গেলো। হ্যাঁ সত্যিই রাহি প্রেমের হাত ধরে রেখেছে।মেয়েটার যদিও জ্ঞান নেই তবুও মেয়েটা চায় নিজের প্রিয় মানুষটা সবসময় তার পাশে থাকুক। কখনো ছেড়ে না যাক।প্রেমের অবস্থা দেখে ডাক্তার বুঝলেন প্রেমের উপর কতটা মানসিক চাপ পড়েছে।তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“দেখুন স্যার,আপনার স্ত্রীর তো ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে।নয়তো বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে। গুলিটা বুকে লেগেছে তার উপর অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। এবার যদি সময় মতো ওটি করতে না পারি তাহলে তো বুঝতেই পারছেন। আর ওটিতে ডাক্তার এবং নার্সদের ছাড়া অন্য কেউ এলাও না।”
প্রেম এবার গর্জন করে বলে উঠে,
“আর একবার যদি ওর বাঁচা নিয়ে প্রশ্ন তুলিস ডাক্তার তাহলে তোর ওই জবান আমি রাখবো না।”
এতক্ষণে খবর পেয়ে আমজাদ খান সহ শান্ত হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে। প্রেমের এরূপ আচরণে তারা অভ্যস্থ কিন্তু বাইরের লোক তো প্রেমকে ভদ্র বলেই জানে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আমজাদ খান ডাক্তারকে ইশারায় আশ্বস্ত করে বললেন প্রেমকে যেনো অপারেশনে রাখতে নয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে। ডাক্তারও আর বাধা দিলেন না।নয়তো রুগীর সমস্যা হয়ে যেতে পারে।
টানা তিন ঘণ্টা অপারেশন চলল। গুলিটা হাটের পাশে লেগেছে বলে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি।যদি হার্টের মাঝে লাগতো তাহলে মুহূর্তেই মৃত্যু নিশ্চিত। রক্ত ক্ষরণের জন্য অনেক ক্ষতি হয়েছে যদিও তবে রাহিকে বাঁচানো গেছে। অপারেশন চলাকালীন তিন ঘণ্টা প্রেম রাহির হাত ধরে পাশে বসে নিষ্পলক রাহির মুখের দিকে টলমলে চোখে তাকিয়ে ছিল। আর একটু পর পর রাহির হাতে চুমু খেয়েছে।একজন নার্স আড়চোখে তাকিয়ে দেখেছে তাদের এই পবিত্র ভালোবাসা। একজনের প্রতি আরেকজনের টান। হয়তো এই নার্সের জীবনে এরকম ভালোবাসার অভাব তাই এই পবিত্র ভালোবাসা দেখে নিজের তৃষ্ণা মিটিয়েছে।
রাহির এখনোও জ্ঞান ফিরেনি।বাইরে মিডিয়ার লোকেরা যাতা কথা বলছে।যে যা পারছে নিজের মতো গল্প বানিয়ে প্রচার করছে।তাই প্রেম এবার নিজেকে সামলে প্রেস মিটিং ডাকলো সবকিছু ক্লিয়ার করতে।
চারপাশে শুধু একই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই মেয়ে কে?এই মেয়ের জন্য প্রেমের কেনো এতো চিন্তা? কেনো প্রেম মেয়েটাকে নিয়ে এত পজেসিভ?কি হয় মেয়েটা প্রেমের?
এতো এতো প্রশ্নের ভিড়ে প্রেমের মাথা বিগড়ে যায়। রাগে চিৎকার করে বলে উঠে,
“শি ইজ মাই লেডি।তিন কবুল পড়ে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ আমরা। আমার ওয়াইফ সে। আর কোনো প্রশ্ন আছে আপনাদের?”
প্রেমের কথা বলার মাঝেই সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সাঈদ আর বৃষ্টি। প্রেমের সহজ সরল স্বীকারোক্তি শুনে সাঈদ পাথর বনে গেছে। রাহি প্রেমের বউ কথাটা কানে যেতেই মাথা কেমন যেনো চক্কর দিয়ে উঠলো। এতো বছর পর এসে একজনের মায়ায় সে জড়িয়েছিল, আজকে এসে শুনতে হচ্ছে তাকে তার মায়াবতী নাকি অন্যের বিয়ে করা বউ। মুহূর্তেই বুকের কোণে রাহিকে নিয়ে সাজানো সকল ছোট্ট স্বপ্ন গুলি ধুলিস্যাৎ হয়ে গেলো। এই উত্তেজনা বিরাজমান সময়ে সাঈদের উপস্থিতি যেনো পরিবেশটাকে আরও টানটান করে তুলে।তার উপর সাঈদের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ানো মেয়েটি সবার নজর কাড়ে।
যেই মেয়েকে নিয়ে এত কিছু হচ্ছে,সে এখানে এভাবে পাক্কা সুস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে কিভাবে সেটাই ভাববার বিষয়। প্রেমের স্বীকারোক্তিতে সবার দৃষ্টি এখন বৃষ্টির পানে। সবাই যে বৃষ্টিকে রাহি ভাবছে এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাহির মতো দেখতে মেয়েটাকে দেখে প্রেমের ভ্রু জোড়াও কুচকে গেলো সাথে কপালেও বেশ কয়েকটা ভাজ পরলো। মেয়েটাতে রাহি না সেটা প্রেম প্রথম দেখাতেই বুঝলো। এর প্রধান কারণ হলো বৃষ্টি হাইটে রাহির চাইতে কিছুটা লম্বা এবং রাহির চেয়ে একটু গোলুমোলুও বটে। রাহিকে যারা কখনো নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করেনি তাঁদের রাহি আর বৃষ্টির মাঝে প্যাঁচ লাগানো স্বাভাবিক। যে ছেলেটা নিজের অজান্তেই সময় সুযোগ পেলেই পলকবিহীন রাহির দিকে তাকিয়ে থাকতো সে কখনো তার বউকে অন্যের সাথে গুলিয়ে ফেলবে না।
সাংবাদিকরা তৎক্ষণাৎ এক প্রকার হুমড়ি খেয়ে পড়ে বৃষ্টির উপর। একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ছে তার দিকে। সবকিছু তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এইরকম পরিস্থিতির শিকার এর আগে আর কোনো দিনই হয়নি সে।এসবে সে অভ্যস্তও নয়। তার কেমন ভয় ভয় হচ্ছে। সাঈদ যেনো এই জগতে নেই।এই দুইদিন তার সাথে কি ঘটছে এসবের হিসাব মিলাতে ব্যস্ত সে।এদিকে যে তার পাশে দাঁড়ানো তার অর্ধাঙ্গিনী বিব্রতবোধ করছে সেদিকে খেয়াল নেই।
এমন পরিস্থিতে প্রেম গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
“শি ইজ নট মাই ওয়াইফ। আই ডোন্ট নো হিম।আই থিংক হি নোজ মিস্টার সাঈদ।বাই দ্যা ওয়ে,আপনারা হয়তো আমার মন্ত্রীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন।আমি কেনো দেশের একজন সাবেক এমপি ও বর্তমান মন্ত্রী হয়ে বাল্যবিবাহের মতো এত জঘন্য কাজ করলাম! যাদের মনে এরকম প্রশ্ন তাদের উদ্দেশ্যে বলে রাখি, আমার ওয়াইফ এর সিক্সটিন ইয়ার্স কমপ্লিট হয়েছে কিছুদিন আগেই। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কোন মেয়ের যদি সিক্সটিন ইয়ার্স কমপ্লিট হয় তাহলে সে এবং তার বাবা-মা যদি স্বইচ্ছায় তাকে বিয়ে দিতে রাজি থাকে তাহলে সেটাকে কোনোভাবে বাল্যবিবাহ বলে না। আর একটা কথা পরিস্থিতির চাপে পড়েই আমাকে এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।”
প্রেম থেমে আবার বলতে শুরু করলো,
“দেশের জনগণ চাইলে আমি পদত্যাগ করতে পারি। যদিও আইনের দিক দিয়ে আমি নির্দোষ।তবে আমি সবার আগে আমার জনগণকে প্রায়োরিটি দিয়ে এসেছি এবং সবসময় দিবো। তাই জনগণ যা বলবে তা আমি বিনাবাক্যে মেনে নিবো।”
এই একটা কথায় যেনো প্রেম আবার সকলের মন জয় করে নিলো।সে জানে জনগণকে গুরুত্ব দিলে সেও গুরুত্ব পাবে। যতোই হোক বর্তমান জেনারেশনের এক প্রকার আইডল সে।
এরপর বৃষ্টির দিকে আঙ্গুল তাক করে বলল,
“সব শেষে সবার উদ্দেশ্যে একটা কথায় বলবো,আজকে আমার ওয়াইফকে যে আঘাত করেছে তাকে তো আমি ছাড়বো না। বাই এনি চান্স ফিউচারে যদি কেউ ভুল করেও আমার বউ এর ক্ষতি করার চিন্তা করে বা চেষ্টা করে খোদার কসম তার কলিজা আমি নিজে হাতে ছিঁড়বো। আমি সব ছাড় দিবো কিন্তু আমার বউ এর ক্ষেত্রে ছাড় এর প্রশ্নই আসে না।”
প্রেম চলে গেলো। প্রেমের পোজেসিভনেস দেখে সবাই হতবাক সাথে ইমপ্রেসও।আগে থেকেই প্রেম অনেক মেয়ের স্বপ্নের পুরুষ ছিল এর পর থেকে সবাই যেনো আরেক দফা উস্টা খেয়ে পড়লো।আবার কিছু মেয়ের মন ভেঙেও গেলো।
সাঈদ মনোযোগ দিয়ে দেখলো শখের নারীর প্রতি অন্য পুরুষে ভালোবাসা। সেও তো ভালোবেসেছিল, পোজেসিভ ছিল। চোখে হারাতো রাহিকে।তাহলে সৃষ্টিকর্তা কেনো তার ভাগ্যে তার প্রিয় নারীকে রাখলো না।কেনো নিজের করে পাওয়ার আগেই সে অন্যের হয়ে গেলো।আচ্ছা তার প্রেয়সীও কি একই ভাবে প্রেমকে ভালোবাসে? হয়তো বা বাসে।কারণ এর আগে যতবার রাহির সাথে দেখা হয়েছে সাঈদের ততবার সে রাহির চোখে প্রেমের জন্য অন্য কিছু দেখেছে।তার সন্দেহ যে সত্যি হবে তা তার কল্পনার বাইরে ছিল।
রাহির চিন্তায় সে ভুলে বসেছে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভয়ার্ত চেহারার মেয়ে শহরের এমন পরিস্থিতিতে আরও ভয় পেয়ে গেছে। বৃষ্টি মনে মনে শুধু ভাবছে এখান থেকে কখন বের হবে।সাঈদের থমথমে মুখ দেখে মুখে আর কিছু বলল না। ভদ্র মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো পাশে।
সাঈদ চৌধুরীকে এখানে দেখে আর তার পাশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বউ এর মতো দেখতে মেয়েটাকে দেখে মিডিয়ার লোকজন এবার এদের চেপে ধরলো। বিশেষ করে তাদের নজর ছিল বৃষ্টির দিকে। কে এই মেয়ে? রাহির বোন হয়? সাঈদ চৌধুরীর সাথেই বা কি সম্পর্ক।নানা প্রশ্নে খুবই বিব্রত বৃষ্টি।এক প্রশ্ন বার বার করা হচ্ছে তাকে।যতবার এই প্রশ্ন করা হচ্ছে ততবার সে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সাঈদের দিকে তাকাচ্ছে।কিন্তু সাঈদের কোনো ভাবান্তর নেই।এক পর্যায়ে আর সহ্য করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে বৃষ্টি মিনমিনে কণ্ঠে বলে ফেলে,
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৬
“আমি কোনো মন্ত্রীর বউ বা তার বউ এর বোন না।আমি উনার স্ত্রী।”
সাঈদের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল কথাটা।এই কথার প্রেক্ষিতে আবার নতুন করে যেনো নেট দুনিয়ায় এবং মিডিয়ায় আরেক বোমা বিস্ফোরণ ঘটলো। এতক্ষণ সাঈদের কানে কিছু না পৌঁছালেও এই একটা কথা তার কর্ণকুহরে ঠিকই প্রবেশ করলো।
