কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৮
হামিদা আক্তার ইভা
কথা হচ্ছে আজ হলিহাটে নতুন নতুন মেয়ে আনা হয়েছে।মূলত এদের জোর করেই আনা হয় এখানে।শুধু যে এক জায়গা থেকে তাদের আনা হয় তা-নয়।বিভিন্ন গ্রাম থেকে এখন অব্দি এখানে হাজার খানিক মেয়েকে আনা হয়েছে।এখান থেকে বেশ মোটা দামে মেয়েদের বি ক্রিও করা হয়।এসবের পেছনে কার হাত থাকতে পারে?
হলিহাট তখন জমজমাট।উৎসব লেগে আছে পুরো মহলে।তিন তলার দক্ষিণ পাশের এক বিশাল ঘরে নারী নিয়ে মত্ত রমজান সওদাগর।ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে এক নোংরা মুখ লুকিয়ে আছে এই লোকের।যাকে গ্রামের মানুষ সম্মানের উঁচু জায়গায় রেখেছে,সেই মানুষটাই অতি জঘন্য।
ঘরের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে ধূপ আর মদের গন্ধে। মোটা পর্দা টানা, বাইরে উৎসবের আলো-শব্দ ঢুকতে পারছে না। তিন তলার সেই দক্ষিণ পাশের বিশাল ঘরটা যেন অন্য এক জগৎ!যেখানে হাসি নেই, আছে শুধু দখল আর নিষ্ঠুরতা।
রমজান সওদাগর এলিয়ে পড়েছেন নরম গদির উপর। চোখ দুটো আধখোলা, ঠোঁটে বিকৃত তৃপ্তির রেখা। তার সামনে বসে আছে একটি মেয়ে।নতুন আনা। বয়স আন্দাজ করা কঠিন, তবে চোখের ভেতরের ভয়টা খুব চেনা। এই হলিহাটে আসা প্রতিটা মেয়ের চোখেই এই ভয় একরকম।
মেয়েটা চুপ করে আছে। কথা বললে কী হবে, সে জানে না। কাঁদলেও কেউ শুনবে না। ঘরের কোণে রাখা লণ্ঠনের আলোয় তার হাত দুটো কাঁপছে অজান্তেই। রমজান সওদাগর সেটা দেখেও না দেখার ভান করে বললেন,
“নাম কী?”
গলা ভারী, আদেশের স্বর।মেয়েটা একটু দেরি করে উত্তর দেয়। গলাটা যেন নিজের নয়।
“জ…জানিনা।”
রমজান সওদাগর হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল মালিকানার দম্ভ।
“এখানে নাম দিয়ে কী হবে? এখান থেকে বেরোলে নতুন নাম হবে।”
মেয়েটার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে বোঝে,এখানে মানুষ পরিচয় হারায়, দামে রূপান্তরিত হয়।রমজান সওদাগর ধীরে উঠে বসলেন।তার ছাঁয়াটা দেয়ালে বড় হয়ে পড়েছে। বাইরে ঢোলের শব্দ, হাসি, আলো—সব মিলিয়ে এই ঘরের নীরবতা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
হলিহাটে প্রতিটা উৎসবের রাত এমনই।
এই হলঘরের আড়ালেই তৈরি হয় লেনদেনের হিসাব, মানুষের দাম, আর ভবিষ্যৎ ধ্বংসের নকশা।
আর এই সবকিছুর ঠিক মাঝখানে রমজান সওদাগর,গ্রামের “সম্মানিত মানুষ”,আর ভেতরে ভেতরে এক নিষ্ঠুর ব্যবসায়ী।
কিন্তু সে জানে না,এই হলিহাটের প্রতিটা অন্ধকারের ভেতরেই কোথাও না কোথাও জমে উঠছে আগুন।যে আগুন একদিন এই ঘর, এই মুখোশ সব পুড়িয়ে দেবে।
রমজান সওদাগরের চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বদলে গেল। আধখোলা চোখ দুটো এবার আর অলস নয়,ভেতরে জমে উঠল হিংস্র লোভ। মুখের কোণে থাকা বিকৃত হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল কঠিন এক নিষ্ঠুরতায়।
মেয়েটা পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পিঠে ঠেকল নরম গদি, পালাবার কোনো পথ নেই। ঘরের বাতাসটা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। লণ্ঠনের আলো কেঁপে উঠছে, নাকি মেয়েটার চোখ কাঁপছে বোঝা বড্ড মুশকিল।রমজান সওদাগর কাছে এসে দাঁড়ালেন।তার ছাঁয়াটা মেয়েটাকে ঢেকে ফেলল পুরোপুরি। বাইরে ঢোলের শব্দ আরও জোরে বাজতে লাগল, যেন ভেতরের আর্তনাদ ঢেকে দেওয়ার জন্যই এই উৎসব।মেয়েটার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। এখানে শব্দের কোনো মূল্য নেই,এটা সে ইতোমধ্যেই জেনে গেছে।
ঘরের দরজাটা বন্ধ হলো ভারী শব্দে।হলিহাটের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিচে লোকজন নাচছে, হাসছে, গান বাজছে। কেউ জানে না, তিন তলার ওই দক্ষিণ পাশের ঘরটায় ঠিক এই মুহূর্তে কী হারিয়ে যাচ্ছে।একটা জীবন, একটা নাম, একটা ভবিষ্যৎ।
সময় গড়িয়ে গেল।রাত একটু গভীর হলো।
চাঁদটা মেঘের আড়ালে ঢুকে পড়েছে। উৎসবের শব্দও এখন ক্লান্ত। ঢোল থেমে থেমে বাজছে, হাসির আওয়াজ পাতলা হয়ে এসেছে। হলিহাটের গলিগুলোতে ধোঁয়া আর আবর্জনার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
রমজান সওদাগর আবার গদিতে এলিয়ে পড়েছে। চোখে তৃপ্তির ছাপ, মুখে সেই পুরোনো মুখোশ।সব স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি।
ঘরের এক কোণে মেয়েটা বসে আছে। মাথা নিচু। চোখ ফাঁকা। যেন এই শরীরটার ভেতর সে আর নেই।নিজের সব চেয়ে বড় সম্মানটাই আজ বিসর্জন হয়েছে এক নরপশুর ক্ষুধার কাছে।কেমন ঘৃণা হচ্ছে নিজের প্রতিই।মনে হচ্ছে পুরো শরীরটা টেনে ছিঁ ড়ে ফেলতে।
দরজার বাইরে পাহারাদার ফিসফিস করে বলল,
“নতুন মাল কাল সকালে পাঠানো হবে?”
অন্য একজন বলল,
“হ্যাঁ। ভালো দামে যাবে। খবর দে উপরের লোকদের।”
এই ‘উপরের লোক’ কারা?এই প্রশ্নটাই হলিহাটের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন।কারণ রমজান সওদাগর একা নয়।
সে শুধু মুখ।পেছনে আছে হাত, মাথা, আর পুরো একটা অদৃশ্য জাল।আর রাত যত গভীর হয়,এই জাল তত শক্ত হয়। অন্ধকার যত ঘন হয়,
আগুনের তাপও তত বাড়ে।
রাতের অন্ধকারে আজ বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে বড্ড বেশি।কিশোরী বয়সে বাড়ির বড় বধূ হয়ে পা রেখেছিল আফিয়া।আজ অনেকটা বছর কেটে গেছে বিবাহের।অপরিচিত জায়গা খানা আজ বড্ড চেনা।শুধু অচেনা হয়ে রয়ে গেছে তার স্বামী।খোলা জানালা দিয়ে হাওয়া বইছে।আফিয়া বিয়ের পর পড়াশোনা করছিল বেশ কিছুদিন।তার জন্য মাহতাব একটা পড়ার টেবিল বানিয়ে দিয়েছিল।আজ সেই টেবিলের সামনে মেয়েটা চেয়ার টেনে বসেছে।হাতে ধরেছে কালো কলম।সামনে সাদা ধবধবে খাতা।সে মুখের সামনে চলে আসা চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে কলম চালাল।
“কোত্থেকে শুরু করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।হঠাৎ সব রেখে খাতায় কেন লিখতে বসেছি সেটাও জানি না।তবে আজ বড্ড ইচ্ছে করে কাউকে বুকে চেপে রাখা কথা গুলো খুলে বলতে।ইচ্ছে করছে খোলা বইয়ের মতো নিজেকে মেলে দিতে।আজ-কাল বুকে এত যন্ত্রণা হয়,মনে হয় এই বুঝি আমার প্রাণটা কেউ টেনে ছিঁ ড়ে বের করছে।
আচ্ছা…আচ্ছা আমার কী জীবনে সুখ আসবে না কখনও?এই দহন নিয়ে মৃত্যু হবে আমার?আমি কী দুনিয়ায় একটু সুখ উপভোগ করতে পারব না?দিন যত যাচ্ছে,তত দুঃখ বাড়ছে।এত দুঃখ রাখার জায়গাটা কোথায়?”
আফিয়া লেখা থামিয়ে ঠোঁট কামড়ে জানালার বাইরে তাকাল।বাইরে চাঁদের আপছা আলোয় আলোকিত চারপাশ।চাঁদের আলোটা জানালার কাঁচ ছুঁয়ে ভেতরে ঢুকছে, কিন্তু সেই আলো আফিয়ার চোখে কোনো উষ্ণতা আনতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। সে আবার খাতার দিকে তাকাল। কলমটা একটু কেঁপে উঠল, তবু থামল না।
“আমি জানি না, আমার এই লেখাগুলো কেউ কোনোদিন পড়বে কি না। হয়তো না! হয়তো এই খাতাটাও একদিন পুড়ে যাবে বা হারিয়ে যাবে। কিন্তু লিখতে না পারলে আমি দম বন্ধ হয়ে মরে যাব। এই বাড়ির দেয়ালগুলো সব শোনে, কিন্তু কিছু বলে না। মানুষগুলো দেখে, কিন্তু বোঝে না। আর আমি..আমি প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছি।আজ ইচ্ছে করছে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কাঁদতে।ইচ্ছে করছে অচেনা শহরে হারিয়ে যেতে।পেছনে ফেলে আসা এত স্মৃতি মস্তিষ্ক থেকে সরছে না।যত সব ভুলে যেতে চাইছি,তত আমায় আঁকড়ে ধরছে।আমার সব কিছু থেকে মুক্তি চাই।খোলা আকাশে উড়ে যেতে চাই।চাই আমার কবর যেন অতি শীঘ্রই খোড়া হয়।”
আফিয়া লেখা থামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মরণ তুমি আপন হয়ে বুকে আগলে নাও আমায়।”
শেষ লাইনটা লিখে আফিয়া খাতাটা বন্ধ করতেই দরজায় হালকা একটা শব্দ হলো। কাঠের গায়ে কারও আঙুলের নরম টোকা। আফিয়া চমকে উঠল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল, যেন নিজের গোপন আর্তনাদ কেউ ধরে ফেলেছে।
সে তাড়াতাড়ি চোখের কোণ মুছে নিল, খাতাটা টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।
“কে?”
গলাটা নিজের কাছেই অপরিচিত শোনাল।
দরজার ওপাশ থেকে মাহতাবের কণ্ঠ,
“আমি।”
আফিয়া দরজাটা খুলল। মাহতাব দাঁড়িয়ে আছে সামনে। গায়ে দিনের ক্লান্তি, চোখের নিচে হালকা ছাঁয়া। দু’জনের চোখাচোখি হলো। মাহতাব যেন কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
“এত রাতে জাগছ কেন?”
মাহতাব জিজ্ঞেস করল, গলাটা অস্বাভাবিক নরম।
আফিয়া একটু সরে দাঁড়াল।
“ঘুম আসছিল না।”
মাহতাব ঘরের ভেতর ঢুকল। টেবিলের দিকে একবার তাকাল, তারপর জানালার দিকে। খোলা জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে, পর্দা দুলছে।
“জানালা খোলা রেখেছ?ঠান্ডা লেগে যাবে।”
আফিয়া কোনো উত্তর দিল না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। মাহতাব নিজেই এগিয়ে গিয়ে জানালাটা একটু বন্ধ করে দিল।আফিয়ার কাছে আজ-কাল নিজেকে ভীষণ তুচ্ছ মনে হয়।এইযে তার স্বামী,মাহতাব।সে দেহের চাহিদা পূরণ হলে আর তাকে মনে রাখে?ভালোবাসা তো অবশ্যই ছিল।ভালোবাসা থেকেই শারীরিক টান তৈরি হয়।কিন্তু শুধু দেহের চাহিদা মেটানোকেই কী ভালোবাসা বলে?
সে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসল।মাহতাব শুয়েছে টানটান হয়ে।আফিয়া বলল,
“কী মনে করে?”
মাহতাব চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
“আমার বুকে একটু মাথা রাখবে আফি?”
“ইচ্ছে করছে না।”
“শুধু একবার।”
“ঘৃণা হয় আমার।”
“তাও কবুল।”
আফিয়া তবুও পিছু ফিরে একটাবার মাহতাবের দিকে তাকাল না।মাহতাব লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করল।নিজেই হাত বাড়িয়ে আফিয়াকে টেনে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বলল,
“যদি আমার মৃত্যু হয়,তাহলে আমায় ক্ষমা কোরো আফি।তোমায় দুঃখ ছাড়া কখনও সুখ দিতে পারিনি।”
আফিয়া চোখ বন্ধ করে বলল,
“এমন পাপের ক্ষমা হয় না।”
“তুমি করলেই হবে।”
আফিয়া উত্তর দিল না।তার আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।একটা সময় যার বুকে মাথা রেখে সারারাত কাটিয়েছে,আজ সেই মানুষটার বুকে বিষের মতো লাগছে।
বাইরে তীব্র বাতাস ছেড়েছে।তাহসিনের ঘরের এক কোনায় ময়ূরী বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে আয়নার সামনে বসে আছে।আয়নার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সে একটু মোটা হয়েছে।আগের চেয়ে শরীরটা একটু ভার হয়েছে।তাহসিনের দাদি এই নিয়ে বড্ড জ্বালিয়েছে তাকে।লজ্জায় মেয়েটা দাদির সামনে এখন যেতে চায় না।সে আলমারি খুলে সেখান থেকে একটা হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি বের করল।এটা তাহসিন এনে দিয়েছিল কিছুদিন আগে।বলেছিল এমন এক মধ্যরাতে এই শাড়িটা পরে তার সামনে আসতে।
কিশোরী যে দিন দিন বড্ড দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে,এটা আদৌ সে বুঝতে পারছে?পড়াশোনা গোল্লায় দিয়ে মেতে উঠেছে সংসারে।স্বামী বউ বলতে পাগল,অন্যদিকে বউ স্বামী বলতে পাগল।
ময়ূরী শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। হালকা গোলাপি রঙটা তার গায়ে যেন আরও নরম হয়ে ফুটে উঠেছে। চোখে কাজল টানতে গিয়ে হাত কাঁপল একটু। আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিজেই হেসে ফেলল।এই চোখেই তো কত লাজ, কত দুষ্টুমি একসাথে বাসা বেঁধেছে।
আঁচলটা কাঁধে তুলে নিয়ে যত্ন করে কোমরে গুঁজল। তারপর অজান্তেই পেটের ওপর হাত বুলাল।আয়নায় চোখ পড়তেই বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি জমে উঠল। সে কি সত্যিই মোটা হয়েছে? নাকি ভেতরে ভেতরে অন্য কিছু বদলাচ্ছে?
ময়ূরী নিজেকে বুঝতে পারে না। কিশোরী বয়সের এই বদলগুলো তার কাছে কখনও আনন্দ, কখনও অজানা ভয়ের মতো লাগে। দাদির কথাগুলো কানে বাজে।
কিন্তু তাহসিন তো অন্য কথা বলে। সে তো হাসতে হাসতে বলে,
“আমার বেগম মোটা হলে বেশি সুন্দর লাগবে।”
ময়ূরী লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয় তখন। আজও নামাল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা করে নিজের গালে চাপ দিল। গোল হয়ে আছে একটু। তবু খারাপ লাগছে না। বরং কেমন এক গোপন সুখ কাজ করছে ভেতরে।
হঠাৎ বাইরে পায়ের শব্দ হলো।
“তাহসিন?”
ফিসফিস করে বলল সে।কোনো উত্তর এলো না। হয়তো সে এখনও বাইরে। ময়ূরী একবার দরজার দিকে তাকিয়ে আবার আয়নার দিকে ফিরল। কপালে টিপ পরল ছোট্ট করে। আজ কেন যেন নিজেকে খুব আপন মনে হচ্ছে তার। নিজের শরীর, নিজের মন—সবকিছু নতুন করে চিনতে চাইছে।
আজ পুতুল নেই ঘরে।পুতুলের দাদি তাকে এই ঘরে রাখতে চায় না রাতে।ময়ূরী যদিও রাখতে চেয়েছিল,কিন্তু শাশুড়ির কথা অমান্য করার সাহস হয়নি।
দরজায় শব্দ হলো তখন।ময়ূরী তাড়াতাড়ি দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল।তাহসিন ঠোঁট চেপে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে।হঠাৎ ময়ূরীকে নতুন রূপে নিজের সামনে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।ড্যাবড্যাব করে তাকাল তার কিশোরী বধূর দিকে।শুকনো ঢোক গিলল সে।ভেতরে ঢুকে দরজা আঁটকে বলল,
“বেগম আজ মিসবাহ তাহসিনের বেগম সেজেছেন?”
ময়ূরী লজ্জায় দৃষ্টি এদিক-ওদিক করে বলল,
“আমায় ভালো লাগছে না?”
তাহসিন তাড়াহুড়ো করে বলল,
“খারাপ লাগার প্রশ্নই আসে না।”
হুট করেই তাহসিন ময়ূরীকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে পালঙ্কের নিকট এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ময়ূরী নাক ছিঁটকে বলল,
“বাইরে থেকে এসেই বাঁদরামি শুরু করেছেন।পরিষ্কার হয়ে আসুন আগে।”
তাহসিন অধৈর্য হয়ে বলল,
“একসাথে হব।”
ময়ূরী চোখ নামিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তার দৃষ্টি ক্রমে জানালার থেকে ঘরে ফিরে আসে। ময়ূরীর শরীর অজান্তেই কেঁপে ওঠে। শ্বাসের শব্দ, হৃদয়ের টোকা, একরকম নীরব তৃষ্ণা,ঘরটা যেন তাদের জন্য একটি আলাদা জগৎ হয়ে উঠেছে।
ময়ূরী চোখ বন্ধ করে শুধু তাহসিনের নিঃশ্বাস অনুভব করছিল।তার হাতের স্পর্শে ঘ্রাণে মিশে যায় গরম তাপ, হাতে হাত রেখে, কপাল ঠেকিয়ে এক নিঃশব্দ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা। ঘরটা নিস্তব্ধ, জানালা দিয়ে ঢুকা চাঁদের আলো তাদের দেহের ছাঁয়া খেলায় মিশে যাচ্ছিল।তাহসিনের হাত আলতো করে ময়ূরীর গালে চলে আসে। ময়ূরীর বুক ধীরে ধীরে হালকা হয়, হৃদয় একরকম দ্রুত কিন্তু শান্ত স্বরে ধুকছে। তাদের শ্বাস,স্পর্শ, ঘ্রাণ সবকিছু একরকম একীভূত হয়ে যায়।
ময়ূরী জানে,এই মুহূর্তে তার শরীর ও মন একেবারে তাহসিনের কাছাকাছি। ঘরে আড়াল, রাতের নিস্তব্ধতা, চাঁদের আলো সবই তাদের নীরব মিলনের সাক্ষী। তারা একে অপরকে কাছে টানে, হাত, বাহু, শরীর সবকিছু দিয়ে এক অন্তরঙ্গ সংযোগ তৈরি হয়।বাইরে বাতাস বইছে,চাঁদ আকাশে অর্ধেক লুকিয়েছে,কিন্তু এই কোণে তাদের পৃথিবী শুধুই একে অপরের।
শুরুটা ছিল এক রোমাঞ্চ, এখন তা ক্লান্ত; অথচ গভীর ঘনিষ্ঠতার রূপ নিয়েছে।
রাত যখন গভীর,তখন তাহসিন এবং তার বেগম সজাগ।তাহসিন সিগারেট ধরিয়েছে ঠোঁটে।ময়ূরী শরীর গুটিয়ে শুয়ে আছে তাহসিনের শরীর ঘেঁষে।আগে যেমন তাহসিন ময়ূরীর থেকে কথা লুকাত,এখন সেই ভুলটা সে করে না।মানসিক চাপ কাটানোর জন্য হলেও আজ ময়ূরীর সঙ্গ তার বড্ড প্রয়োজন ছিল।তাহসিন সিগারেট শেষে করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ময়ূরীকে।মাথায় চুমু এঁকে বলল,
“কী করব ঠিক বুঝতে পারছি না।একদিকে পরিবার,অন্যদিকে…!”
ময়ূরী ঘাড় উঁচিয়ে তাহসিনের দিকে তাকাল।হাত বাড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“হাজার প্রাণ বাঁচাতে যদি জীবন দিতে হয়,তাহলে জীবন কুরবান করতেও পিছুপা হবেন না।”
“আমার কী করা দরকার এটা আমি জানি।কিন্তু..!”
ময়ূরী সাহস দিয়ে বলল,
“কাল আমি জয় দেখতে চাই।পরিবারের কথা ভাবলে হবে না।এটা অন্যায়।”
তাহসিন মাথা নাড়ল।কাল তার জীবনের সব চেয়ে ভয়াবহ দিন হতে চলেছে।হয়তো জীবনের সব চেয়ে বড় সিদ্ধান্ত কাল তাকে নিতে হবে।
ময়ূরী কথা এড়িয়ে গিয়ে তাহসিনের খালি বুকে নাক ঘষে বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৭
“আপনার মেয়ে আজ কী আবদার করেছে জানেন?”
তাহসিন বলল,
“কী বলেছে?”
“তার একটা ভাই চাই।”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হাসল।বলল,
“আর আমার একটা রাজকন্যা।”
