চারুবৃত্ত পর্ব ১০
জুলি জোনাকি
শার্ট টা বিছানা ছুড়ে ফেলে দিয়ে দরজা খুলে মিষ্টি একা হাসি দিল । চারু তাকাল , গায়ে শার্ট নেই শুধু একটা গেঞ্জি তা দেখে চারু সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামাল । বৃত্ত ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না । ঠোঁটে হাসি রেখে বৃত্ত বলল,
” ভেতরে এসো ?”
চারু কাপা কাপা হাতে গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
” কাকিমা লেবু শরবতটা পাঠাল , ধরুন ।”
বৃত্ত গ্লাসে দিক একবার তাকাল , হাতে না নিয়ে দরজা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মিটমিটে হাসলো, বলল,
” মা পাঠিয়েছে ?”
“হুমম ।”
“হুমমমমমম ।”
বৃত্ত চারুর হাত থেকে গ্লাস টা নিয়ে একটু খেয়ে চোখমুখ খিচে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
” উমহু এটা কি বানিয়েছ,মুখেই তো নেওয়া যাচ্ছে না ।”
চারু বিস্মিত হয়ে তাকাল , বৃত্ত তা দেখে বলল,
” তাকিয়ে আছো কেন ? খেয়ে দেখ কি বানিয়েছ ?”
গ্লাস টা চারুর দিক এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নাও ধরো , নিজেই খেয়ে দেখ কি বানিয়েছ ।”
চারু ঠোঁট কামড়ে কাপাকাপা হাতে গ্লাস টা হাতে নিলো । চারুর এমন হাল দেখে বৃত্ত ঠোঁট টিপে হাসলো, হাসি আটকে গম্ভীর হয়ে বলল,
” একটু খেতে এতো সময় লাগে ?ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর কোথায় ভাবলাম শরবত টা খেয়ে ক্লান্ত দূর করবো , তা আর হলো কই? যা বানিয়ে দিয়েছে ।”
চারু আরো একবার তাকাল , বৃত্ত চারুর মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
” কি দেখছো হুমম , আগে খাও পড়ে দেখো ।”
চারু কাপাকাপা হাত নিয়ে গ্লাস টা মুখে নিয়ে এক ঢোক খেল , না সব তো ঠিকি আছে । গ্লাস থেকে মুখ সরিয়ে বৃত্তের দিক তাকাল , বৃত্ত ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইলো ,
” কেমন ?”
“স সব ত তো ঠিকই আছে ।”
“তাই নাকি দেখি এবার দাও তো ।”
চারুর হাত থেকে গ্লাস টা ছো মেরে নিয়ে, চারু যেখানে ঠোঁট ছুইয়ে খেয়েছিল ঠিক সেখানেই বৃত্ত ঠোঁট ডুবিয়ে এক নিমিষে শেষ করে বলল,
” হুমম এবার ঠিক আছে ।”
বলে গ্লাস ফিরিয়ে দিল । বৃত্তের মুখে গাঢ় হাসি দেখে চারু ঢোক গিললো, গ্লাসটা নিয়ে সেখান থেকে চলে এলো । চারু যেতেই বৃত্ত তার বুকের বা পাশে দুহাত রেখে কোমল আর নেশালো সুরে বিরবির করল,
” তোমায় দেখলেই এই খানটার ভেতর ঝড় ওঠে যায় । হৃৎপিণ্ডের মধ্যে স্পন্দন বেড়ে যায় আজ কাল । ”
বৃত্ত বুকে হাত রেখেই ঘরে চলে গেল । ওদিকে চারু গ্লাস রেখে বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে । বৃত্তের মা কোথ থেকে এসে বলল,
“এমন হাপাচ্ছিস কেন ? ”
চারু আবার ও চমকে বুকে হাত রাখলো । মিনমিন করে বলল,
” ক কই কিছু না তো কাকিমা ।”
“তো এখানে কি করছিস কাল না তোর পরীক্ষা যা পড়তে বয় পড়া শেষ করে এসে রান্না বসা । ”
” আচ্ছা ।”
“আমার প্রিয় হবু বর , তুমি আমায় এভাবে ইগ্নোর করতে পারো না । তোমার টানে আমি বারবার শতবার ফিরে আসি । তোমায় একটা সিক্রেট বলি , সকালে তুমি যখন শার্ট পড়ছিলে তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তোমার কিছু হট হট ছবি তুলেছি , এবার তুমি যদি আমায় ভালো না বাসো তাহলে আমি তোমার ছবি ভাইরাল করে দিব ।
ইতি তোমার হবু বউ
রুহি 😚”
বৃত্ত বিকালে কলেজ থেকে ফিরে নিজের রুমে এমন এক খান চিঠি পেয়েছে । তাতে এমন কিছু লেখা দেখে বৃত্তের কপালে বেশ কটা ভাজ পড়লো । জোরে হাক ছেড়ে রুহিকে ডাকলো ,
” রুহিহহহহহহহ ”
আজ রুহি লেবু শরবত বানাচ্ছিল, বৃত্তের বিকট ডাক শুনে শরবতে চিনির বদলে ভুল করে লবন মিশিয়ে তরিঘরি করে নিয়ে বৃত্তের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো । বৃত্ত বিছানায় হাতে ভর করে বসে আছে । রুহি মুখে হাসি টেনে লজ্জিত মুখে বলল,
” তুমি আমায় ডাকছিলে বৃত্ত ভাই ?”
বৃত্ত তাকালো , তারপর বলল,
” ভেতরে আয় ।”
রুহি আরো লজ্জা পেল । তিড়িং বিড়িং করে রুমে ঢুকলো । বৃত্ত কপাল কুঁচকে বলল,
” শরবত টা আমার জন্য? ”
“হুমম আমি বানিয়েছি তোমার জন্য ।”
এগিয়ে দিতেই বৃত্ত হাত বাড়িয়ে নিল । আরেক হাত দিয়ে চিঠিটা রুহির দিক বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” পড়ে শোনা , এতো ভুলভাল বানান পড়তে গিয়ে গলা শুকিয়ে গেছে আমার । ”
রুহি নিজের লেখা চিঠি নিজে পড়তে গিয়েও হিমশিম খেল । তারপর বৃত্তের দিক তাকিয়ে বলল,
” আসলে ভাইয়া তুমি তো জানোই আমার বানানে সমস্যা, শুধু ভুল হয় সে জন্যই তো তোমার কাছে পড়তে চাই ।”
” নে এটা তুই খা ।পড়ে তো গলা শুকিয়ে গেছে তাই না ?”
গ্লাস টা এগিয়ে দিল । রুহি বলল,
” এটা তো আমি তোমার জন্য বানিয়েছি ।”
“তুই আগে না খেলে আমি কি করে খাই ।”
“ওহ এই কথা । দাও ভাগাভাগি করে খাই তাহলে ভালোবাসা বাড়বে । ”
বৃত্ত স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে ছিল । রুহি এক চুমুক দিয়ে কুলি করে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে বলল,
” ওয়াক থু এটা কি ।”
“ভালো না খেতে ?”
” লবন মেশানো তো ।”
“এই তোর ভালোবাসার নমুনা? আর চিঠিতে কি যেন লিখেছিস , আমার হট হট ছবি ভাইরাল করে দিবি । ”
রুহি জিহ্বা তে কামড় দিয়ে বলল,
” সরি বৃত্ত ভাই মিথ্যা বলছিলাম । ”
বৃত্ত ওঠে দাঁড়ালো, রুহির কান ধরতে যাবে তার আগেই রুহি ঘর থেকে দৌড়ে পালাল । বৃত্ত চেঁচিয়ে বলতে লাগলো ,
” ফাজিল মেয়ে, আর একবার আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখলে খবর আছে । বেয়াদব মেয়ে ।”
চারু মাত্রই পরীক্ষা শেষ করে বাড়িতে পা রাখলো । রান্না ঘরে গিয়েই ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেল । গাড়ি না পেয়ে এই টুকু হেটে এসেছে এতেই শরীর ক্লান্তে নুইয়ে পড়েছে । ঘরে গিয়ে ধপ করে বিছানাতে শুয়ে পড়লো । চারুর মা এসে মেয়ে মাথার কাছে বসে চুলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে মাথা মালিশ করে দিল । চারু মাথা তুলে মায়ের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলো কিছুক্ষণ ।
এভাবেই দিন পার হলো । আজ বাদে কাল বিন্দু আর বিন্তির বিয়ে । আজ সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ ।কাল চারুর সাবজেক্টের পরীক্ষা শেষ হয়েছে এখন শুধু ব্যবহারিক পরীক্ষা বাদ আছে । তাই পড়ার তেমন একটা চাপ নেই । সাত দিন আগে থেকে বাড়ি ঘর সাজানো হয়েছে । বৃত্ত ও এদিক ওদিক সব দেখছে , ভাই বলে কথা কতো দায়িত্ব । বৃত্তের বাবা এদিক ওদিক ছুটছে কতো কাজ ।
চারু অতিথিদের জন্য দুপুরের খাবার আয়েজনের আগে সবার জন্য শরবত করছিল এমন সময় বৃত্ত লাল টকটকা পাঞ্জাবি পরে চুপিচুপি রান্না ঘরে এলো , সমনে হাতে ভর করে দাঁড়িয়ে ডাকলো ,
“চারু ।”
চারু কেবল চোখ তুলে তাকাল । বৃত্ত ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলল,
“আমায় কেমন লাগছে ।”
“একদম নতুন বরের মতো লাগছে ।”
চারু কিছু বলাল আগে পেছন থেকে রুহি এমন কথাটার জবাব দিল ।চারু বৃত্ত এক সাথেই রুহির দিক তাকাল । লাল টকটকে জামা পড়ে এদিকেই আসছে । বৃত্ত পালালো জন্য পা বাড়াতে গেলেই খপ করে এসে হাত ধরে ফেলে ।
“আমাদের দুজনকে কি সুন্দর মানিয়েছে তাই না চারু ?”
চারু হেসে জবাব দিল ,
“বেশ মানিয়েছে ।”
বৃত্ত চোয়াল শক্ত করে চোখ ছোট ছোট করে চারুর দিক তাকাল । রুহি বৃত্তের হাত আঁকড়ে ধরে লজ্জা পেয়ে বলল,
“দেখেছো বৃত্ত ভাই , সবাই একি কথা বলে ।”
বৃত্ত হাত ছাড়িয়ে বলল,
“একটুও লজ্জা নেই তোর না ? ভালো হবি না ? মামাকে বলতে হবে ?”
” আব্বা জানে ।”
“কি জানে ?”
“আমরা দুজন বিয়ে করবো ।”
“এই যাবি এখান থেকে ? মাথা গরম করাস না ।”
“যাব না ।”
চারু শরবত নিয়ে অতিথিদের কাছে চলে যেতেই বৃত্ত রুহিকে বলল ,
“ঠিক আছে তাহলে আমিই চলে যাই । একদম পেছন পেছন আসবি না । ”
মুখ বাকিয়ে রুহি উপরে চলে গেল ।
চারু সবাইকে গরমে ঠান্ডা শরবত দিয়ে আসতে নিলে বৃত্ত পথ আটকে দাড়াল । বুকে হাত গুজে বলল,
“আমায় একটা শরবত দাও ।”
চারু একটা বৃত্তের দিক বাড়িয়ে দিল । বৃত্ত এক হাতে ধরল । তারপর একটু ঝুকে বলল,
চারুবৃত্ত পর্ব ৯
“বললে না তো কেমন দেখাচ্ছে আমায় ?”
চারু কিছুটা পেছনে সরতে গিয়ে পড়ে যেতে নিলেই বৃত্ত পিঠে হাত দিয়ে চেপে নিজের বাহুতে চেপে ধরলো । এমন কান্ড খেয়ালে আসতেই চারু ধাক্কা মারে দূরে সরিয়ে চলে যেতে নিলেই বৃত্ত পেছন ফিরে মিষ্টি করে ডাকলো ,
“চারু শুনছো………?”
