Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৮

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৮

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৮
ইশরাত জাহান জেরিন

ফারাজের রাগ তখন সীমা ছুঁয়ে গেছে। মেজাজ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চিত্রাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এই সত্যটাই তাকে ভিতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছে। এত সাহস হলো কীভাবে? তাকে না জানিয়ে, কোনো জবাব না দিয়ে এভাবে হারিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস চিত্রার হলো কী করে? তবু রাগের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তীব্র অস্থিরতা। তাহলে এখনই হারাবে কেন? একবার খুঁজে তো পাক এইবার এমন ট্রিটমেন্ট দিবে ১০ মাস দশ দিন ঘর থেকে বের হতেই পারবে না। স্বামীর সাথে বাটপারি করে হাতে রিভলভার তোলার মজা তো ফারাজ তার আগুন সুন্দরীকে অবশ্যই দিবে। আগুন সুন্দরী বোধ-হয় ভুলে গেছে সে আগুন হলে ফারাজ জল। আর কার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি সেটা তার বুদ্ধিমতি বিবিজান ভালোই জানে আশা করি।

সে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, জলের ওপর সন্ধ্যার আলো ঝিলমিল করছে। পাশে অভ্র। বজ্রই ডেকে এনেছে এখানে। অপেক্ষা করতে বলেছে। কিছুক্ষণ পর কালো একটি বিএমডব্লিউ এসে ঘাটের সামনে থামল। গাড়ি থেকে নামল বজ্র। তার পেছনে জমেলা আর আয়েশা। আয়েশা একবার অসহায়ের মতো তাকাল তার স্বামীর দিকে। অভ্র চোখ সরিয়ে নিল৷ ভেজা দৃষ্টি আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা। পরিস্থিতির ভারে সবার মুখে চাপা উদ্বেগ। তার ওপর চিত্রা নিখোঁজ। পুরো শহর তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছে, অথচ কোনো খবর নেই। বজ্রকে দেখামাত্র ফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে দৃঢ়ভাবে রিভলভারটা তুলে বজ্রর থুতনির কাছে ধরল। তার কণ্ঠস্বর হিমশীতল,
“শোন বজ্র, চিত্রার গায়ে যদি একটা আঁচড়ও লাগে… আমি তোকে মেরেই ফেলব। কবরেও জায়গা পাবি না এই কথা মনে রাখিস। দোয়া কর, ওকে সুস্থ অবস্থায় যেন খুঁজে পাই। নইলে তুই কালেমাও পড়ার সুযোগ পাবি না।”
অভ্র ধীরে ফারাজের পিঠে হাত রাখল। কণ্ঠস্বর নিচু,

“ভাই, এখন রাগের সময় না। আগে ভাবীকে খুঁজে বের করতে হবে। আপনি রিভলভারটা নামান… প্লিজ।”
ফারাজ গভীর শ্বাস নিল। হাত কাঁপছে না, কিন্তু ভেতরটা তছনছ হয়ে আছে। মাথার ভেতর আগুন জ্বলছে। এই মুহূর্তে সামনে কাউকে পেলেই হয়তো ঝড় বয়ে যেত। তবু সে জানে এখন ভুল করলে ক্ষতি চিত্রারই হবে। ধীরে ধীরে রিভলভারটা নামাল, কিন্তু মনের দহন নিভল না। বজ্র তখনও অস্বাভাবিক স্থির। এই ধরনের হুমকি তার অচেনা নয়। রক্ত, যন্ত্রণা, মৃত্যুর সাথে তার প্রতিদিনের ওঠাবসা। ভয় দেখিয়ে তাকে ভাঙা যায় না। সে পকেট থেকে ফোন বের করল। ডায়াল লিস্ট থেকে একটি নম্বর খুঁজে পরপর কয়েকবার কল দিতেই ওপাশে এক তরুণ কণ্ঠ রুক্ষ স্বরে বলল,

“কি চাই?”
বজ্র সংক্ষিপ্ত গলায় বলল, “সোহান পালোয়ান কোথায়?”
ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্য ভেসে এলো, “ভাইরে দিয়ে কী কাজ? আপনার সাহায্য আর লাগবে না। সে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিয়েছে।”
বজ্রর চোখে ঝিলিক খেলল। “ফোনটা ওর হাতে দাও।”
কিছুক্ষণ পর ফোন গেল সোহানের কাছে। নদীর বুক চিরে ছুটে চলা একটি লঞ্চে বসে আছে সোহান। ভেতরের কেবিনে দু’জন নারী চিত্রাকে নিয়ে গেছে শাড়ি পরিয়ে, সাজিয়ে তুলতে। লাল শাড়ি না হলে তার নাকি ‘বিয়ে-বিয়ে’ অনুভূতি আসে না। চেয়ার হেলান দিয়ে বসে সোহানের মুখে অদ্ভুত তৃপ্তির ছাপ। ফোন কানে নিয়ে সে হাসল, “কিরে ভাই, খবর কী?”

বজ্রর কণ্ঠ এবার কঠিন, “চিত্রা কোথায় আগে সেটা জানতে চাই।”
সোহান মৃদু হেসে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “এই মুহূর্তে ওর কার কাছে থাকার কথা ছিল?”
বজ্র চোয়াল শক্ত করল। “মানে তোমার কাছে? শুনো, পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ফারাজ ঢাকায় যায়নি। ভালোয় ভালোয় ওকে ফিরিয়ে দাও। আমি যে কথা দিয়েছি, সেটা রাখব।”
সোহানের কণ্ঠে এবার আত্মবিশ্বাসের ভার, “আর লাগবে না। সামনে যে ঝামেলা, সেটা আমি সামলাব। মাথা আছে, খাটাতে জানি। আর সিফাত কোথায়? চিত্রাকে আমার লোক পেয়েছে, তাকে কেন পায়নি?”
লাইন কেটে গেল। ” বজ্র ধীরে ফোন নামাল। ফারাজ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান। যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হতে পারে।
ফারাজ নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা ঠাণ্ডা বাতাস মুখে লাগছে, কিন্তু সে কিছু অনুভব করছে না। চোখ শুধু বজ্রের দিকে ঝাপসা, অদ্ভুত স্থির। অভ্র পাশে দাঁড়িয়ে হাতটা তার পিঠে রাখে,“এখন রাগে ভেঙে পড়ার সময় নয়।” হঠাৎ ফারাজ শান্ত গলায় বজ্রের দিকে এগিয়ে যায়। সিগারেট ধরিয়ে এক টান দিয়ে বজ্রর দিকে এগিয়ে দেয়। বজ্রও টান বসায়। অতঃপর সে বজ্রকে বলল, “অনেক হয়েছে… এইবার ঘটনা খুলে বল,” ফারাজের কণ্ঠে আংশিক উৎকণ্ঠা। “আমাকে আর রাগাবি না। আমার চিত্রা কোথায়? কই, বজ্র? তোদের সাথেই তো ছিল।”

বজ্র গভীরভাবে শ্বাস নিল। “ফারাজ,” বজ্র শুরু করল। যতটুকু আপাতত জানা উচিত ততটুকুই বলল। বলল চিত্রা কোথায় আছে, কার আছে সব। ফারাজ চুপ আছে। একদম চুপ করে। তার ভেতরে একটা দোষের ছায়া। কেন বের করে দিয়েছিল সে চিত্রাকে বাড়ি থেকে? চিত্রা হয়তো নিরাপদ থাকত, যদি সে নিজের অহংকার আর রাগে উষ্ণ তাকে বের না করে দিত। আসলে তখন পরিস্থিতিই এমন ছিল যে, মাথাই কাজ করেনি। হঠাৎ সে বজ্রকে বলল, “আর সোহান?” ফারাজ জিজ্ঞেস করল, “সে কী করে সাহস পায় আমার স্ত্রীকে বিয়ের স্বপ্ন দেখার?” বজ্র কিছুক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলল, “এখন এসব প্রশ্নের উত্তর জানার থেকে বেশি দরকার চিত্রাকে নিরাপদে ফিরে পাওয়া।”
ফারাজ মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে রিভলভারটা নামাল। ভেতরে বিক্ষুব্ধ আগুন এখনও লেগে আছে, কিন্তু ঠাণ্ডা বাস্তবতার ছোঁয়ায় সামান্য শান্ত। ফারাজ হঠাৎ বলল, “যাই হয়ে যাক না কেন সোহানকে আমি খুঁজে তো বের করবোই, কারন মালাকুল মউত তার অপেক্ষায়।”

ফারাজ একা এগিয়ে চলে নদীর দিকে। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া তার গায়ে লেগে গেছে, কিন্তু সে তাতে কিছু অনুভব করছে না। একাকী মন নিয়ে সে নদীর জল আর ভোরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ চিত্রার এই অবস্থা তার হৃদয় ছিঁড়ে ফেলেছে। চিত্রা তার জীবনসঙ্গী, তার অর্ধাংশ। সে মা হতে চলেছে, অথচ কত শত বিচ্ছেদ তাদের মধ্যে এখন। ফারাজের চোখে জল জমে আসে, কিন্তু শব্দহীন। কেউ শোনার নেই। সে নদীর কালো জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে। সেই অন্ধকার জল যেন তার নিজের জীবনের প্রতিফলন, পাপ আর অপরাধে আচ্ছন্ন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সে বুঝতে পারে, পাপ কীভাবে চারপাশে বীভৎসভাবে ঘিরে ধরে প্রতিটি মুহূর্তে। ভেতরে একটা অনিঃশেষ আকুতি, হাহাকার জেগে ওঠে। আত্মা যেন বারবার চিৎকার করছে, “ফিরে আসো চিত্রাঙ্গনা, ফিরে আসো প্লিজ।” কথার কোন সীমা নেই, হৃদয়ের শোক আজ মৃত। অপরাধবোধ, প্রেমের তীব্র তৃষ্ণা সব মিলেমিশে পিষে মারছে তাকে। ফারাজ জানে, জীবনের এই মোড়ে তার অনেক কিছু না বলা থেকে গেছে। সেই না বলা কথাগুলো যেন ভেতর থেকে বের হতে চায়, বেদনার বলি হয়ে। সে বলতে চায়, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু চোখের জলে, হৃদয়ের অগ্নিতে, প্রতিটি শ্বাসে তার আকুতি প্রকাশ পাচ্ছে। ফারাজের শূন্য হৃদয় চিৎকার করে বলছে,

~আলেয়ার পিছে, ছুটে মিছেমিছে
বুঝিনি তো আলোর ভাষা
আজকে তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি
কাকে বলে ভালোবাসা
আঁধারে খোঁজে মন
আলোকে সারাক্ষণ
মেলে না, ওহোহো মেলে না
করে তুমি তুমি মন যে আমার
করে তুমি তুমি মন যে আমার
লাগে না ভালো আর~

চিত্রাকে আগের থেকেও অসুস্থ মনে হচ্ছে। রাত জাগা, শেষ হয়ে যাওয়া ক্লান্তির চাপ তার চোখের নিচে গভীর ছাপ ফেলে দিয়েছে। তাকে জোর করে লাল শাড়ি পরানো হয়েছে। চোখে জল ভেসে উঠেছে, ভেতরের অদৃশ্য যন্ত্রণার প্রতিফলন। চিত্রার চোখের সামনে ফারাজের চেহারা ভেসে উঠল৷ সেই মুখ, সেই চোখের গভীরতা, যা বারবার তার মনে ঘুরছে। লাল শাড়ি দেখে এলাহী বাড়িতে প্রবেশ করা সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ছে। এলাহী বাড়িতে প্রবেশের পর থেকে তার জীবনে যে সব কিছু ঘটে গেছে, তা যেন চোখের সামনে ঝলসে উঠছে।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৭

চিত্রাকে মহিলা দু’জন রুম থেকে বের করার জন্য জোরজবরদস্তি করতে গেলেই হঠাৎ সোহান পালোয়ান মহিলা দুটোকে ধমকে বদল, “অজাতের দল সর সামনে থাইকা। সাহস কত বড় আমার চিত্রারে বেদনা কেন দেস? যাহ কইলাম।” মহিলা দু’জন ভয়ে জলদি ক্যাবিন থেকে বের হতেই সোহান তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কাজীকে ইশারা করল। কাজী ভেতরে প্রবেশ করতেই চিত্রার দিকে তাকাতেই চিত্রা ভয়ে একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। সোহান তা দেখে বলল, “ভয় পাও কেন বউ? তোমারে কষ্ট দিমু নাকি? তোমারে তো আদর করমু।” হঠাৎ সোহানের ফোনে কল এলো। সে বিরক্ত হলো। এই শুভ কাজে নিজের বাল ঢুকায় কোন জানোয়ার? সে ফোন হাতে নিতেই দেখল বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। এক ধরে ফেলল জলদি। মুখটা কালো হয়ে আসল তার। সে মুহূর্তেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের বলল, “জলদি লঞ্চ ঘুরানোর ব্যবস্থা কর। আমার আম্মা অসুস্থ হইয়া পড়ছে।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৯

6 COMMENTS

  1. আপু পরের পার্ট টা তাড়াতাড়ি দেন প্লিজ 🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹

  2. আপু কবে দিবেন পরের অংশ 🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹🥹😭😭😭😭😭😭😭

Comments are closed.