ছায়াস্পর্শ বোনাস পর্ব
জান্নাত চৌধুরী
আজ পুষ্প আর নাযেমের আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে হচ্ছে। শিকদার বাড়ির চারদিকে উৎসবের জমজমাট আমেজ। গাঁদা ফুলের মিষ্টি গন্ধ আর বাবুর্চির ডেকচি থেকে ভেসে আসা রোস্ট-বিরিয়ানির ঘ্রাণে পুরো বাড়ি ম-ম করছে। তৌসিরেও দম ফেলার ফুরসত নেই, অতিথি আপ্যায়ন আর হাজারো ফরমায়েশ খাটতে খাটতে সবাই একেবারে গলদঘর্ম। অথচ এই আনন্দঘন পরিবেশের ঠিক উল্টো চিত্র বাড়ির ভেতরের তৌসিরের আধো-অন্ধকার ঘরে। সেখানে নাজহা জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে। তৌসিরের দেওয়া একটু আদরেই সে কাত হয়ে গিয়েছে। থার্মোমিটারের পারদ বোধহয় নামতেই চাইছে না। হাড়কাঁপানো শীত আর শরীরের তীব্র ব্যথায় তৌসিরের কৈতরী বিছানায় পড়ে আছে। ঝড়ের আঘাতে উপড়ে পড়া লতার মতো তার নিস্তেজ শরীর। বাইরের হইচই, হাসির শব্দ তার কানে পৌঁছালেও, উঠে বসে একটু দেখার শক্তিটুকুও আজ তার নেই।
বিয়ের এমন জমজমাট আয়োজনের মাঝেই হঠাৎ ছন্দপতন। সদর দরজায় সশব্দে তালি বাজিয়ে একদল হিজড়া এসে হাজির হয়। বিয়েবাড়ি মানেই তাদের বকশিশের অধিকার, আর আজ তারা বেশ বড় অঙ্কের দাবি নিয়েই এসেছে। তাদের উচ্চকণ্ঠ আর চিৎকারে মেহমানদের মাঝে কিছুটা অস্বস্তি নেমে আসে। বিবিজান পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত এগিয়ে যান। শাড়ির আঁচল সামলে তিনি নরম সুরে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। তন্ময় চাচার পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটি কড়কড়ে নোট বের করে একজনের হাতে গুঁজে দিয়ে বলেন, “নাও, এই এক হাজার টাকা নাও আর আজকের মতো খুশি মনে চলে যাও।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! এক হাজার টাকা দেখে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের দলনেতা কড়া গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, “না! এই টাকা নিমু না! এত বড়লোকের বাড়ির বিয়া, আর এই কয়টা টাকা! আরও বেশি টাকা দে।”
তৌসির এদিকের এই ঝামেলার খবর জানত না। কানে আসতেই সে তড়িঘড়ি করে চলে আসে এদের শায়েস্তা করতে। তৌসির পরনের লুঙ্গির কোঁচড় দুহাতে শক্ত করে তুলে ধরে একেবারে বুক ফুলিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় তারপর কণ্ঠে তাচ্ছিল্য আর স্পষ্ট রাগ নিয়ে বলে, “বিয়া আমাগো, আর টাকা তগো দিমু ক্যান? যা দিছি তা নিয়া শুকরিয়া আদায় কর। আর বিসমিল্লাহ বিসমিল্লাহ কইয়া এক দৌড়ে এইখান থাইকা বাহির হ!”
তৌসিরের এমন অভাবনীয় জেদ আর রুক্ষ মেজাজ দেখে হিজড়াদের একজন তাকে ভয় দেখানোর জন্য মোক্ষম অস্ত্র ছাড়ে চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠে, “বিয়া বাড়ি আইছি, টাকা না দিলে কিন্তু কাপড় খুইলা নিমু! তখন দেখবি টাকা না দেওয়ার ফল!”
কিন্তু তৌসিরকে দমানো এত কি সহজ? সে তো জাউরামিতে উস্তাদ ও উল্টো এ শুনে হা-হা করে হাসতে হাসতে বলে “তো খুলার হইলে খুইলা নে।কি দেখমু দেখার মতো তো কোনো সাউয়াই নাই।
ওর এমন অপ্রত্যাশিত আর চাঁচাছোলা কথায় হিজড়াদের দল রীতিমতো হতভম্ব, আর পরক্ষণেই তারা অপমানে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি আরও নোংরা দিকে মোড় নিচ্ছে বুঝতে পেরে বিবিজান আর এক মুহূর্তও দেরি করেন না। তড়িঘড়ি করে আরও কিছু টাকা মিলিয়ে মোট তিন হাজার টাকা তাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আলগোছে তাদের বিদায় করেন।
তৌসির এসবের আর তোয়াক্কা করে না। নিজের কথা ছুড়ে দিয়েই সে গটগট করে অন্যদিকে হাঁটা ধরে। ক্যাটারিং সার্ভিসের লোক আসেনি বললেই চলে। তাই বাড়ির সব পুরুষরাই আস্তিন গুটিয়ে মেহমানদের প্লেটে খাবার তুলে দেওয়ার কাজ চালাচ্ছেন। দূর থেকে তৌসিরের ডাক পড়ে, সেও লুঙ্গির গিঁটটা শক্ত করে বেঁধে আবার সেই কর্মব্যস্ত ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায়।
ওয়াসেমের সময়টা বড্ড খারাপ যাচ্ছে আজকাল। আয়রাদের উপস্থিতি আর কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না তার। মনে হচ্ছে, এই আয়রদা বুঝি তৃষ্ণাকে তার কাছ থেকে একেবারে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই এসেছে! সুযোগ পেলে আয়রাদকে জ্যান্ত কবর দিতেও দু’বার ভাববে না ওয়াসেম আয়রদাদের উপস্থিতি জালিয়ে মারছে তাকে। আজ নিজের গোপন কারখানায় যেখান থেকে তাদের অবৈধ অস্ত্রের কারবার চলে সেখানে এসে পাগলের মতো কিছু একটা খুঁজছে ওয়াসেম। কিন্তু মনমতো কিছুই জুটছে না হাতে ওর। তাকে এভাবে হন্যে হয়ে খুঁজতে দেখে নিক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “বস, কেমন অস্ত্র চাই আপনার?”
ওয়াসেম কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে স্থির গলায় বলে, “এমন একটা কিছু দে, যেটা দিয়ে চোখের মণি কয়েক কোপে উপড়ে ফেলা যায়।”
নিক কথাটা শুনেই কপাল কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “হঠাৎ এমন মাল দিয়ে কী করবেন?”
উত্তরে ওয়াসেম দাঁত চেপে, চোয়াল শক্ত করে বলে, “একটা ছোট্ট মৌমাছি আমার ফুলের দিকে নজর দিয়েছে। তো যে চোখ দিয়ে সে নজর দিয়েছে, আমি সেই চোখটাই তুলে নিতে চাই।”
নিক ঠিক বুঝতে পারে না ওয়াসেম কার কথা বলছে, তাও সে আর কথা না বাড়িয়ে একটা ধারালো, চৌকো লোহার রড ওয়াসেমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই নিন, এটা দেখতে পারেন।”
রডটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে, খুঁটিয়ে দেখে নেয় ওয়াসেম নাহ ঠিক আছে এতেই কাজ হয়ে যাবে এ ভেবে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্রুর হাসি ফুটে ওঠে তার সে নিকের দিকে তাকিয়ে বলে “হবে, এতেই হবে। আমি গেলাম।”
এইটুকু বলেই নিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ওয়াসেম। কিন্তু কিন্তু বাড়িতে পা রাখতেই ওর মেজাজটা এক নিমেষে সপ্তমে চড়ে যায়। আর এর কারণটাও যথেষ্ট ডাইনিং টেবিলে বসে রাতের খাবার খাচ্ছে আয়রাদ আর ইব্রাহিম সাহেব, আর তাদের খাবার বেড়ে দিচ্ছে স্বয়ং তৃষ্ণা! সিতুজা আশেপাশে নেই। এই দৃশ্য দেখে ওয়াসেমের মাথার শিরা দপদপ করে ওঠে। কতবার সে এই মেয়েকে কড়া করে শাসিয়েছে আয়রাদের সামনে না যেতে! কিন্তু কে শোনে কার কথা! ওয়াসেম স্থীর হয়ে দাড়িয়ে তৃষ্ণার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে ফুঁসে ওঠে, “শালির ঘরে শালি! আজ তোর ঠ্যাং কেটে তোর গলায় যদি না ঝোলাই, তাহলে দেখিস আমি কি!”
রাগে, ক্ষোভে আর আক্রোশে কাঁপতে কাঁপতে এতটুকু বলে সে সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। ইব্রাহিম সাহেব তাকে দেখতে পেয়েই পেছন থেকে ডেকে ওঠেন, “ওয়াসেম, আয়! আমাদের সাথে খেয়ে নে।”
কিন্তু ওয়াসেম কি এসব শোনার পাত্র? সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতেই জমাট বাঁধা ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়, “তৃষ্ণা খাইয়ে দেবে। হাত কাটা, নিজে খেতে পারব না।”
এটুকু বলেই ও হনহন করে ওপরে চলে যায়। ওয়াসেমকে দেখেই তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত ছ্যাঁত করছে। ভয়ে রীতিমতো হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে তার। আজ নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরতে হবে তাকে। ওয়াসেম কড়াভাবে নিষেধ করেছিল আয়রাদের সামনে আসতে, আর এখন এই ঘটনার পর সে যে কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে, তা ভেবেই তৃষ্ণার রক্ত হিম হয়ে আসছে। এখন তৃষ্ণা কী করবে? এদের খাওয়া বাদ রেখে এখনই ওপরে চলে যাবে? নাকি তাদের শেষ হলে একিবারে সব গুছিয়ে যাবে। তৃষ্ণা আড়চোখে দেখে তাদের খাওয়া প্রায় শেষ। তাই খাবার শেষ হওয়া পর্যন্ত কোনোমতে অপেক্ষা করে। তারা খেয়ে উঠে যাওয়ার পর দ্রুত হাতে টেবিল গুছিয়ে, একটা ট্রেতে ওয়াসেমের জন্য খাবার নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ভয়ে বুক শুকিয়ে আসছে তার, মনে মনে সে ক্রমাগত আয়াতুল কুরসি পড়ে চলেছে না জানি কি হয় না জানি করে ওয়াসেম।
ঘরে পা রাখতেই তৃষ্ণা দেখে, ওয়াসেম সবেমাত্র গোসল সেরে ভেজা শরীরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসছে লুঙ্গির গিঁট ঠিক করতে করতে। ওয়াসেম চুল-দাড়ি সুন্দর করে ছেঁটেছে, আগের সেই রুক্ষ ভাবটা নেই, এখন তাকে দেখতে বেশ পরিপাটি আর স্বাভাবিক মানুষের মতোই লাগছে। তৃষ্ণা কোনো প্রকার শব্দ না করে সন্তর্পণে খাবারের ট্রে-টা টি-টেবিলের ওপর রাখে। তারপর ওয়াসেমের ছেড়ে রাখা লুঙ্গি আর শার্টটা ধুয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিঃশব্দে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। ওয়াসেম ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃষ্ণার দিকেই তাকিয়ে আছে। তৃষ্ণা মাথা নিচু করে তার পাশ কাটিয়ে ভেতরে যেতে নেবে, আর ঠিক তখন তৃষ্ণার মনের ভয় বাস্তব রুপে রুপান্তর হয়! ওয়াসেম ক্ষুধার্ত বাঘের মতো হিংস্রতায় তৃষ্ণার হাতের বাহু খামচে ধরে এক ঝটকায় তাকে টেনে নিয়ে সজোরে চেপে ধরে পাশের দেয়ালের সাথে। তারপর ভয়ংকর গলায় চিৎকার করে ওঠে, “এই শালি! জানোয়ার! তোকে না বলেছিলাম তুই আয়রাদের সামনে যাবি না? তাহলে গেলি কেন? জানোয়ারের বাচ্চা মনে খুব লাড্ডু ফুটছে, তাই না? নতুন নাগরকে দেখে খুব আহ্লাদ জেগেছে?”
তৃষ্ণা জানতো এমন কিছুই একটা হতে চলেছে। এই অজানা ভয়েই তো সে তটস্থ ছিল এতক্ষণ, তাও ব্যথায় হঠাৎ আর্তনাদ করে ওঠে কাঁপা গলায় বলে, “না, না! আপনি ভুল বুঝছেন। আমি যেতে চাইনি, কিন্তু আমাকে যেতে হয়েছে।”
ওয়াসেম তৃষ্ণার দুই বাহু শক্ত করে খামচে ধরে। রক্তবর্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে গর্জে ওঠে, “আমি বাড়িতে না থাকলে তুই ওর সামনে যাস! ওর সাথে কথা বলিস, তাই না? এই হারামজাদী, তোর কি প্রাণের ভয় নেই?”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে খানিকটা সাহস জুগিয়ে বলে, “আপনি তো আমাকে স্ত্রী হিসেবে মানেনই না, তাহলে আমি যার সামনে ইচ্ছে যাই, তাতে আপনার কী?”
তৃষ্ণার এই কথাটা ওয়াসেমের রাগের আগুনে সরাসরি ঘি ঢেলে দেয়। ওয়াসেম হাত বাড়ায় তৃষ্ণার মাথার দিকে। তৃষ্ণা ওয়াসেমের হাতটা ধরে ফেলে, চোখে চোখ রেখে কাতর স্বরে বলে, “আমার মাথায় এমনিতেই অনেক ব্যথা, দয়া করে চুল টেনে ধরবেন না।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! ওয়াসেম দাঁত কামড়ে তৃষ্ণার একমুঠো চুল শক্ত করে চেপে ধরে। সজোরে এক ঝাঁকি দিয়ে হিসহিস করে বলে, “তুই আমাকে যে কথাটা বললি, আবার বল! আবার বল শালী!”
তৃষ্ণা ব্যথায় কুকঁড়ে গিয়ে তোতলায়, “কী কী বলব?”
ওয়াসেম ধমকে ওঠে, “বল, আবার বল! আমি তোকে স্ত্রী হিসেবে মানি না? তোর অধিকার চাই, তাই না?”
তৃষ্ণা ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে বলে, “না, না, আমি তেমন কিছু বলিনি। আমাকে মাফ করে দিন, আমি আর কখনো এমন বলব না।”
এ শুনে ওয়াসেমের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক বিষাক্ত হাসি। ও লুঙ্গির কোমরের ভাঁজ থেকে একটা প্যাকেট বের করে তৃষ্ণার চোখের সামনে ধরে, অন্য হাতে সজোরে জড়িয়ে ধরে তার কোমর। প্যাকেটটা দেখেই তৃষ্ণার চোখ আতঙ্কে বড় বড় হয়ে যায় ও ভয়ে অস্ফুট স্বরে বলে, “আ… আপনি সত্যি… না, না, না!”
ওয়াসেম এবার শক্ত করে তৃষ্ণার চোয়াল চেপে ধরে বলে, “কেন? না কী জন্য? তুই তো অধিকার চাস! আয়, আজ তোকে বোঝাব অধিকার কেমন হয়।”
কথা শেষ করেই ওয়াসেম এক হ্যাঁচকা টানে তৃষ্ণাকে কোলে তুলে নেয়। তৃষ্ণা আতঙ্কে হু হু করে কেঁদে ওঠে। এতদিন শুধু মানসিক নির্যাতন সয়ে এসেছে, আজ কি তবে শারীরিকভাবেও ছিন্নভিন্ন হতে হবে? ওয়াসেম তাকে নিয়ে সজোরে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে তৃষ্ণা ব্যাথায় ফুঁপিয়ে ওঠে। ওয়াসেম ধীরে ধীরে উঠে এসে তৃষ্ণার মুখের ওপর ঝুঁকে দাঁত চেপে বলে, “কাঁদছিস কেন? আজ তো তোকে অধিকার দেব। তোর রাত আজ। নাকি আমার ছোঁয়া তোর পছন্দ না? নতুন নাগর পেয়েছিস, তাই আমাকে আর ভালো লাগছে না?”
বলতে বলতে ওয়াসেম কোমরের ভাঁজ থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে। তৃষ্ণার ওপর ঝুঁকে থেকেই সে সিগারেট ধরিয়ে, লম্বা টান দেয়। তৃষ্ণা ভয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছে, শুধু ঢোক গিলছে আর ভয়ার্ত চোখে চেয়ে আছে ওয়াসেমের দিকে। ওয়াসেম তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে এক তিক্ত হাসি হাসে, “নতুন পুরুষ পেয়েছিস, তার সামনে যেতে খুব ভালো লাগে, তাই না? তোর যাওয়ার শখ আজ আমি চিরতরে মিটিয়ে দিচ্ছি।”
এই বলে ওয়াসেম জ্বলন্ত সিগারেটটা তৃষ্ণার কামিজের ওপর দিয়ে সোজা তার পেটে চেপে ধরে। মুহূর্তেই চামড়া পোড়ার গন্ধ আর অব্যক্ত যন্ত্রণায় তৃষ্ণার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যায়। সে দুই হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে দাঁত কামড়ে এই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে নেয়। সে জানে, এখন চিৎকার করলে ওয়াসেম তাকে আরও বেশি কষ্ট দেবে। একটু রেখেই ওয়াসেম সিগারেটটা দ্রুত সরিয়ে নিয়ে তৃষ্ণার মুখের দিকে তাকায়। তৃষ্ণা অঝোরে কাঁদছে, চোখের পানিতে বালিশ ভিজছে, ব্যথায় মুখমণ্ডল লালচে হয়ে গিয়েছে তাও ভয়ে তার মুখ থেকে টুঁ শব্দটিও বেরোচ্ছে না। ওয়াসেমকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তৃষ্ণা একবুক অভিমান আর কাঁপা গলায় বলে ওঠে, “থামলেন কেন? মারুন না আরও মারুন! আমি তো এতিম, ভাতের কাঙাল। আমি তো একটা কুকুর, আমাকে তো এভাবেই মারা উচিত! মারুন আমাকে, যতক্ষণ না আমার দম বন্ধ হয়ে আসে ততক্ষণ পর্যন্ত মারুন। দুনিয়ায় এত মানুষ মরে যায়, অথচ আমার কেন মরণ হয় না!”
কথাগুলো বলেই তৃষ্ণা ডুকরে কেঁদে দেয়। ওর কান্নারত চেহারার দিকে তাকিয়ে ওয়াসেমের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ও হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের অবশিষ্টাংশটুকু সজোরে চেপে ধরে নিজের বুকের বাঁ-পাশে! জ্বলন্ত সিগারেটা ওর বুকের চামড়া স্পর্শ করতেই ও তৃষ্ণার দিকে উন্মত্তের মতো তাকিয়ে হিসহিস করে বলে, “বুকে ব্যথা হয়! ঠিক এইখানে প্রচণ্ড ব্যথা হয়! তুই যখন ওর সামনে যাস, ও যখন তোর দিকে তাকায় আমার এই জায়গাটা জ্বলেপুড়ে যায়!”
তৃষ্ণা হন্তদন্ত হয়ে ওয়াসেমের হাতটা চেপে ধরে তাকে থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ওয়াসেম তো পাথরের মতো অনড়! জ্বলন্ত সিগারেটটা ততক্ষণে ওয়াসেমের পাঁজরের চামড়া ভেদ করে গভীরে গেঁথে যেতে চাইছে। তৃষ্ণা মরিয়া হয়ে ওয়াসেমের হাত আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমি যাব না, আর কোনোদিন ওর সামনে যাব না! আপনি এমনটা করবেন না, দয়া করে ছাড়ুন! আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, সারাদিনে আমি একবারও ওর সামনে যাইনি। শুধু রাতের বেলা মায়ের শরীরটা ভালো ছিল না বলে বাধ্য হয়ে খাবার দিতে গিয়েছিলাম। আমি আর কখনোই তার সামনে যাব না! সিগারেটটা সরান আপনার পাঁজর তো পুড়ে যাচ্ছে!”
তৃষ্ণার আকুতি শুনে ওয়াসেমের হুঁশ ফেরে। হাতের সিগারেটটা সে তৎক্ষণাৎ মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে। ঘোর কাটতেই সে বুঝতে পারে, অন্ধ রাগের বশবর্তী হয়ে সে কত বড় এক ভুল করে বসেছে! তৃষ্ণা তো কখনোই তার অবাধ্য হয়নি, সে যেমন বলেছে মেয়েটা তেমনই চলেছে। আজও মায়ের অসুস্থতার কারণে বাধ্য হয়েই সে ওখানে গিয়েছিল। আর ওয়াসেম কি না পাগলের মতো এমন পৈশাচিক আচরণ করল? উন্মাদনায় বিভোর হয়ে কখন যে জ্বলন্ত সিগারেটটা তৃষ্ণার কোমল পেটেও চেপে ধরেছে, তা সে নিজেই টের পায়নি! নিজের জ্ঞানে ছিল না সে। এমনিতেই ট্রমার মধ্যে থাকে সবসময় তারউপর আয়রাদ কে নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা মাথা নষ্ট করে দিয়েছে।
অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে ওয়াসেম তড়িঘড়ি করে তৃষ্ণার গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিতে থাকে কাঁপা কাঁপা গলায় এই প্রথম ও নরম গলায় তৃষ্ণা কে বলে, “তোর পেটে খুব ব্যথা লেগেছে, তাই না? চামড়াটা জ্বলছে খুব?”
কিন্তু তৃষ্ণার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে একদৃষ্টে ওয়াসেমের বুকের দিকেই তাকিয়ে থাকে। যে অংশে ওয়াসেম সিগারেটটা চেপে ধরেছিল, পুড়ে সেই জায়গাটুকু কালচে হয়ে ছোট একটা গর্তের মতো হয়ে গেছে। নিজের ক্ষতবিক্ষত বুকের দিকে তৃষ্ণাকে এমন নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওয়াসেমের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। সে দুহাতে তৃষ্ণার মাথাটা তুলে অতিশয় মমতায় নিজের বুকে চেপে ধরে অস্থির গলায় বলতে থাকে, “তোকে আঘাত করতে চাইনি রে, বিশ্বাস কর! এমনটা আমি কখনোই চাইনি, কিন্তু রাগের মাথায় হয়ে গেছে। তোর পেটের চামড়া পুড়িয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না, তোকে শারীরিক টর্চার করতে আমি চাইনি। আমাকে বিশ্বাস কর তৃষ্ণা!”
তথাপি এত কিছু বলার পরও তৃষ্ণা কোনো উত্তর দেয় না। ওয়াসেম ধীরে ধীরে অনুভব করে, তার বুকের ভেতর লেপ্টে থাকা শরীরটা একটুও নড়ছে না। বরফের মতো জমে শক্ত হয়ে আছে তৃষ্ণা। বুক থেকে একটু সরিয়ে আনতেই সে দেখতে পায়, তৃষ্ণা কথা বলছে না, নিস্তেজ লতার মতো নেতিয়ে পড়েছে তার শরীরটা। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গিয়েছে তৃষ্ণার। এই দৃশ্য দেখে ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে বারি মারে। চরম আতঙ্কে সে তৃষ্ণাকে পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করে। ওয়াসেম ভয়ের চোটে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলে অসংলগ্নভাবে চিৎকার করে ওঠে, “এই তৃষ্ণা! সরের বাচ্চা কথা বল! কী হলো তোর? কুত্তার বাচ্চা চোখ খোল! কী হয়েছে তোর? শালী জানোয়ার, চোখ খোল বলছি! একদম নাটক করবি না আমার সাথে, চোখ খোল! চোখ খোল!”
কিন্তু তৃষ্ণা ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছে। ওয়াসেমের এই ভয়ঙ্কর রূপ, এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা তার কোমল মন সহ্য করতে পারেনি। অজানা আতঙ্কে আর যন্ত্রণায় থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে তৃষ্ণা নেতিয়ে পড়েছে অন্ধকারের অতলে। উন্মাদ ওয়াসেম কখন যে তার সাথে কী করে বসে এই ভয়াবহ ভয়ই তাকে ধুঁকে ধুঁকে নিশ্চল করে দিয়েছে।
ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। চারদিকের কোলাহল থেমে গিয়ে চরাচর জুড়ে নেমে এসেছে এক গভীর নিস্তব্ধতা। তৌসির বিয়েবাড়ির যাবতীয় ঝামেলা চুকিয়ে নিজের ঘরে আসে। আজ তার কৈতরী ঘর থেকে বের হতে পর্যন্ত পারেনি গত রাতের একটু আদরেই সে একেবারে কাত হয়ে গেছে।
তৌসির ঘরে ঢুকে দরজাটা আটকে দেয়। বিছানার দিকে তাকাতেই তার চোখ আটকে যায়। দেখে, নাজহা পা ঝুলিয়ে বিছানায় বসে আছে। পরনে বার্সেলোনার একটি জার্সি আর কালো ট্রাউজার। নাজহা যখন অসুস্থ বা দুর্বল থাকে, তখন সে এসবই পরে। আর এসব পোশাকে তাকে দেখে তৌসিরের অবস্থা এমনিতেই খারাপ হয়ে যায় বারবার তার অবাধ্য চোখ চলে যায় নাজহার দিকে।
নাজহা নিজের দীর্ঘ, কুঁকড়ানো লালচে-কালো কেশতরঙ্গ দুহাতে একত্রিত করে খোঁপা বাঁধছে। এই বোধহয় শোয়া থেকে উঠে বসেছে, তাই চুল ঠিক করছে সে। খাটপাসীর ওপর খাবার রাখা আছে। তৌসির তো অনেক আগেই খাবার পাঠিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু ও এখনো খেল না কেন?
তৌসিরকে আসতে দেখে নাজহার দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ হয়। তারপর ঠোঁটে এক চিলতে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে তৌসিরের উদ্দেশে বলে ওঠে, “আপনি এত তাড়াতাড়ি ঘরে চলে এলেন যে? বিয়েবাড়িতে তো কত কাজ!”
নাজহার এই হাসিমাখা মুখটা দেখে তৌসির মনে আলাদা একটা শান্তি পায়। যাক বাবা, মহারানী তাহলে রেগে নেই! একবুক প্রশান্তি নিয়ে তৌসির ধীরে ধীরে নাজহার পাশে বসতে বসতে বলে, “কাজকাম আর বেশি নেই। সবই শেষ।”
“ওহ।”
ছোট্ট করে উত্তর দিয়ে নাজহা বিছানা থেকে ওঠার উপক্রম করে। তা দেখে তৌসির নিজেই উঠে গিয়ে খাবারের প্লেটটা তুলে দেয় নাজহার হাতে। খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে নাজহা বিছানায় একটু নড়েচড়ে বসে। তারপর বিছানায় পড়ে থাকা ওড়নাটার দিকে ইশারা করে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে বলে, “ওড়নাটা মাথায় দিন তো!”
তৌসির ওড়নাটা হাতে নিয়ে পরম যত্নে নাজহার মাথায় পরিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, “এত চুপচাপ যে? রাগ-টাগ ঝাড়লে না?”
নাজহা ভাত মাখাতে মাখাতে মৃদু হেসে বলে, “কিসের জন্য রাগ করব?”
“এই যে সারাদিন তোমার কোনো খোঁজখবর নিলাম না, বেশি করে এত রাতে ঘরে এলাম।
তৌসিরের কথা শুনে নাজহা মুচকি হাসে। তারপর তৌসিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে, “আমি কে যে আপনার ওপর রাগ করার অধিকার রাখব? আপনার ওপর রাগ করেছি বহুবার, তবে আমার রাগের মূল্য আপনার কাছে কখনোই ছিল না। তাই আজ থেকে নাহয় মানিয়েই নিলাম। সব তো মানিয়েই নিয়েছি, তাহলে এই বিষয়টাকেও মানিয়ে নিই।”
নাজহার এমন কথায় তৌসির যেন আকাশ থেকে পড়ে। কী বলছে এসব এই মেয়ে? মানিয়ে নেওয়া মানে কী? তাহলে গতরাতে যা হলো, তা কি মানিয়ে নেওয়ার এক নিদারুণ উপহাস ছিল? তৌসিরের অবাক হওয়া চেহারা দেখে নাজহা আলতো হেসে বলে, “অবাক হচ্ছেন, তাই না? আচ্ছা, আপনার কি মনে পড়ে, আপনি বলেছিলেন আমাদের সংসার হবে আপনার হাত ধরেই, আমরা একসাথে বৃদ্ধও হবো, তথাপি আমরা একে অপরকে কখনোই ভালোবাসব না। আমি না আপনার এই কথাকেই মেনে নিয়েছি, মানিয়ে নিয়েছি। আমার পরিবার যখন আপনার সাথে বিয়ের কথা বলেছিল, আমি বলেছিলাম আপনার সাথে থাকতে পারব না। তারা বুঝিয়েছিল, মানিয়ে নিতে হবে। সেই কথা থেকেই মেনে নিয়েছি। অনেক তো দেখলাম! আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করলাম, গাদ্দারি করলাম ভেবেছিলাম এসব করার পর আপনি অন্তত তালাক দিয়ে দেবেন। কিন্তু দিলেন না। তাই আপনাকেই মেনে নিলাম। যেমন ছিলেন, যেমন আছেন, তেমনই মেনে নিলাম। মানিয়ে নিতে হবে, তাই মানিয়েই নিলাম।”
একটুখানি থেমে নাজহার কণ্ঠস্বরে কিছুটা গাঢ়তা নিয়ে বলে , “তবে আপনার করা কিছু আচরণ আমি কখনোই ভুলব না। কোনোদিনও না। ওই আচরণগুলোর জন্য আমি আজও আপনাকে মনের এক গভীর কিনারা থেকে প্রচণ্ড ঘৃণা করি।”
কথাগুলো বলে নাজহা এক লোকমা ভাত তুলে নেয় মুখে। তৌসিরের পৃথিবীটা বোধহয় উল্টে গেল এইসব বাণী শুনে। গতরাতের পর থেকে ভেবেছিল তারও একটা সংসার হবে, নাজহা তাকে মেনে নিয়েছে। তৌসির যে কী পরিমাণ খুশি ছিল এগুলো ভেবে, তা কাউকে বর্ণনায় বোঝানোর মতো না। নাজহার এমন কথাগুলো শুনে সব সুখ, সব খুশি মুহূর্তেই গায়েব হয়ে গিয়েছে। তৌসির কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁট টেনে একটা তিক্ত হাসি এনে বলে, “যেমনে আছিস এমনেই থাকিস, এতেই হইবো। তোর তো আবার একশো রূপ, একেক সময় একেকটা দেখাস।”
“মুখ সামলে কথা বলুন। এতদিন নামে বউ ছিলাম, এখন পূর্ণাঙ্গ বউ হয়েছি তাই কথাবার্তা সাবধানে।”
“তোমার নানির সাউয়া সাবধানে! বগার মাইয়া, মেজাজটা খারাপ করে দিছিস!”
তৌসিরের কথা শুনে নাজহা বুঝতে পারে তৌসিরের মনটা তিক্ততায় ভরে গিয়েছে। তাই প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে মৃদু হেসে শুধায়, “খাবার খেয়েছেন? আর নতুন বউ কেমন দেখতে? আমি তো দেখতেই পারলাম না, আপনি জ্বর তুলে দিলেন!”
তৌসির নাজহার পাশ ঘেঁষে শুতে শুতে বলে, “খাইছি। আর নয়া বউ তো পুষ্প মাস্টারনি, চিনোই তো তারে। মাইয়াডা ভালা আছে, ছোট চাচার লগে ভালোই যাইব।”
‘মাইয়াডা ভালা আছে’ কথাটা শুনে নাজহা আপন মনেই বিড়বিড় করে বলে, “কে কত আর কী পরিমাণ ভালো, তা সামনেই দেখা যাবে।”
কথাটা স্পষ্ট না হওয়ায় তৌসির বুঝতে পারে না কী বলল নাজহা। তাই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কী সাউয়া বকস মিনমিনাইয়া?”
নাজহা খাবারটা পুরো শেষ না করে অর্ধেক খেয়ে বাটিতে হাত ধুয়ে নিতে নিতে বলে, “কিছু না, আপনি একটু উঠুন তো।”
তৌসির উঠে বসে। তৌসির উঠতেই নাজহা তৌসিরের মুখে বাকি এক লোকমা ভাত তুলে দিয়ে বলে, “নিন, ভাতটুকু খেয়ে নিন, অপচয় হবে। আমি আর খেতে পারব না।”
তৌসির না পারতেও গিলে নেয় সেই লোকমাটা আর বলে, “তুই মরবি, লগে আমারেও মারবি লো ছিনাল! এত কম খাস ক্যান? একটু বেশি করে খা। এখন জিগর লাগব শরীরে।”
নাজহা তৌসিরের মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে বলে, “ভাত এত খেতে ভালো লাগে না, আর জ্বরের মুখে তো বিরক্তই লাগে।”
তৌসির আর বাহানা না ধরে নাজহার কথামতো বাকি খাবারটুকু নাজহার হাতে খেয়ে নেয়। নাজহা খাইয়ে দিচ্ছে থাকে কি করে না করবে? এ ঢ়ে তার পরম সৌভাগ্য যে তাকে নাজহা খাইয়ে দিচ্ছে। খাবার খেয়ে নাজহাকে ঔষধ খাইয়ে নিচে নিয়ে যায়। খাবারের ট্রে নিচে রান্নাঘরে রাখতে যায়। তৌসির যেতেই তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে নাজহা হাসতে হাসতে আওড়ায়, “পুষ্পকে রানির মতো ঘরে তুলছেন, এই পুষ্প যে কী পরিমাণ খতরনাক তা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন আমার প্রিয় স্বামী আপনি এবং আপনার পরিবার!”
নাজহা কথাটা বলে চারদিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে আর বলে, “আমি তাহলে সত্যিই মুক্ত!”
বিয়েবাড়ি হওয়ায় নানাবিধ খাবার রয়েছে এখন রান্নাঘরে। তৌসির একটা কোকের বোতল আর এক বাটি দই রান্নাঘর থেকে নাজহার জন্য নিয়ে আসে। নিজের টাকা তো সে জীবনেও খরচ করে এসব নাজহাকে খাওয়াবে না, তাই ফ্রিতেই বউকে খাইয়ে নিক। ঘরে এসে দেখে নাজহা সেই আগের মতোই বসে আছে। তৌসির দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। নাজহা তৌসিরের হাতে এসব দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “এসব কী জন্য?”
তৌসির খাটপাসীর উপর দই আর কোকের বোতলটা রাখতে রাখতে বলে, “খাইলি না তো ভাত, এগুলো খাইস রাতে। তোর খিদে লাগব, দেখে নিস।”
নাজহা হাত বাড়িয়ে কোকের বোতলটা নিয়ে মুখ খুলে দু-চুমুক দিয়ে বলে, “সত্যি বলছি, এটার ভীষণ প্রয়োজন ছিল ভেতর ঠান্ডা করার জন্য।”
এটা বলে কোকের বোতলটা তৌসিরের হাতে দেয়। তৌসির বোতলটা নিয়ে খাটপাসীর উপর রেখে দিয়ে বলে, “জার্সিটা খুলো।”
“কেন? জার্সি খুলব কেন?”
“কাল যে যে জায়গায় দাগ বসেছিল সেগুলোতে ঔষধ লাগাবা না? দাগ পড়ে যাবে তো।”
“না, লাগাব না। ওগুলো থাকুক আপনার ছোঁয়ার স্বাক্ষর হিসেবে।”
“ক্যান? স্বাক্ষর থাকব ক্যান?”
“স্বাক্ষর থাকুক না, এমনিই থাকুক।”
তৌসির নাজহার এই সিদ্ধান্তে আর কিছু বলে না, মাথা নাড়িয়ে বলে, “তোমার ইচ্ছা। কিন্তু জার্সি তোমায় খুলতেই হইবো।”
“দেখুন, এসব খোলাখুলিতে আমি নাই। গতরাতে যা করছেন আপনি, এরপর এসব আশা করবেন না। মন-মেজাজ আজ প্রস্তুত নয়।”
“মেজাজ না থাকলে তৈরি করে দিচ্ছি, এদিকে একটু আয়।”
এটা বলে তৌসির নাজহার দিকে এগিয়ে গিয়ে একটু ঝুঁকে আসে তার ওপর। নাজহা তৌসিরের চোখের দিকে মোহাবিষ্ট চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে তৌসিরের কলারে হাত রাখে, তারপর শক্ত করে চেপে ধরে বলে, “এসব এখন না, শরীর মানছে না৷”
তৌসির নাজহার চোখে চোখ রেখে নিস্পৃহ গলায় বলে, “আমি কি একবারও বলছি এসব করতেই হবে? যা, বালিশে মাথা রাইখা আলগোছে ঘুমিয়ে পড়। আমি একটা কাম কমপ্লিট কইরা আইতেছি।”
এটা বলে তৌসির নিচু হয়ে নাজহার দু’টি পা সযত্নে বিছানায় তুলে দেয়। নাজহার মনে হচ্ছে, তৌসিরের এই যত্নটুকু কেবলই এক ধরনের প্রলেপ বাইরে গিয়ে আবার কোনো অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি। নাজহা আজ নাছোড়বান্দা। সে জানে, তৌসির এই দরজার ওপাশে পা রাখা মানেই আবার কোনো পাপের ভাগীদার হওয়া। সে চায় না তাদের সম্পর্কের মাঝে নতুন কোনো কালিমার ছায়া পড়ুক। তৌসির সোজা হওয়ার আগেই নাজহা অতর্কিতে তার দু’হাত দিয়ে তৌসিরের গলা জাপটে ধরে। বুকভরা আকুতি আর চোখে মুগ্ধতা নিয়ে সে আবদার করে, “আমি আপনার বুকে ঘুমাব। আজ আপনি কোথাও যাবেন না, আমার সাথে আসুন।”
তৌসিরের শরীরটা শক্ত হয়ে যায় এ শুনে সে নাজহার চোখের দিকে না তাকিয়েই নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে বলে, “কাজ আছে কৈতরী, ছাড়। এহন ঘুমাইলে হইবো না। অনেক বড় কারবার আছে সামনে।”
নাজহা বাঁধন আরও জোরালো করে তৌসিরের খুব কাছে মুখ নিয়ে জেদি গলায় বলে, “কাজ পরে, আগে আমি! কাজ কি আমার চেয়েও বড়?”
নাজহা নিজের নাক তৌসিরের রুক্ষ গালে ঘষতে থাকে। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তৌসিরের গলায় আছড়ে পড়ে। নাজহা ফিসফিসিয়ে আবার বলে, “আজ যেতে হবে না, প্লিজ থেকে যান না আমার কাছে।”
তৌসির কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নাজহার শরীরের ওম আর এই আকুতি তাকে টলায় ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই মাথার ভেতর ঝনঝন করে ওঠে টাকার হিসাব। সে এক ঝটকায় নাজহার হাত সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাড়িয়ে শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে নির্লিপ্ত গলায় বলে, “আমি একটু পরেই চইল্লা আইমু। একটা বড় অংকের হিসাবের বিষয় আছে, তোমার লগে লটকিয়া থাকলে হইবো না। সময় গেলে টাকা হাতছাড়া হইয়া যাইব।”
এ বলে তৌসির একবারও নাজহার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকায় না। সে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগোতে থাকে। পেছন থেকে নাজহার একটা শুষ্ক, তাচ্ছিল্যের হাসি তার কানে আসে নাজহা বিছানায় উঠে বসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে, “যাচ্ছেন তো যান! আমি জানতাম আপনার জীবনে আমার দাম শূন্যের চেয়েও কম। যা মনে মনে জানতাম, আজ তা সামনাসামনি প্রমাণ হয়ে গেল। টাকার কাছে আপনি আমাকে কত সহজে বিক্রি করে দিতে পারেন, আজ তা দেখে নিলাম!”
ছায়াস্পর্শ শেষ পর্ব
তৌসিরের পা দুটো মেঝেতে আটকে যায় এ শুনে। সে এক বিশাল দোটানায় পড়ে। পেছনে ফিরলে নাজহা কে আরো কাছে পাবে, নাজহার তার অভিমানী চোখ তাকে বিদ্ধ করবে। আর যদি সামনে পা বাড়ায়, তবে কয়েক লাখ টাকা তার হাতের মুঠোয় আসবে ঠিকই, কিন্তু তাদের এই টালমাটাল সম্পর্কের সুতোটা চিরতরে ছিঁড়ে যাবে। তৌসির জানে তো ভালো মতোই নাজহা এমন এক নারী, যে একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে হাজার চেষ্টা করেও তাকে ফেরানো যায় না।
একদিকে কাড়ি কাড়ি টাকা, অন্যদিকে তার জীবনের খুঁটি নাজহা। তৌসিরের বুকটা ধক করে ওঠে। সে বুঝতে পারে না সে কি লোভের দিকে যাবে, নাকি সংসারের দিকে?
অসমাপ্ত

ছায়াস্পর্শ কেন? আর অসমাপ্ত..?
এখানেই কি শেষ?