Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৭

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৭

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৭
তোনিমা খান

একটা বন্ধুরূপী শত্রুর চেয়ে দশটা প্রকাশ্য শত্রু অধিক উত্তম‌। একটা বন্ধুরূপী শত্রু এক আঘাতে শেষ করার ক্ষমতা রাখে কারণ তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো ‘বিশ্বাস’।
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি বলেন,
‘শত্রুকে চেনা সহজ, তাই তার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়া যায়। কিন্তু ছদ্মবেশী বন্ধু শত্রুর চেয়ে বিপজ্জনক কারণ তার আক্রমণের স্থান ও সময় আপনার জানা থাকে না।’
প্রতিটা সম্পর্ক ওই এক শব্দে এসেই থমকে যায় ‘বিশ্বাস’। স্ক্রিনে চলতে থাকা রেকর্ডিংটার দিকে স্থির হ্যাজেল রঙা সরু চোখদুটো। ব্যাগ হাতে লুকিয়ে লুকিয়ে বেসমেন্ট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তার সবচেয়ে প্রিয় নারীটি। দৃশ্যটা যতবার দেখছে, তালহারের উজ্জ্বল চোখের আলোটুকু ততটাই নিভে আসছে। সে বারবার ব্যাকওয়ার্ড-প্লে করে দেখল নারীটির পুরো অবয়ব। প্রতিটা ফ্রেমে দৃশ্যটা স্পষ্ট হতেই তার চোখের কোণে শিরাগুলো রক্তবর্ণ ধারণ করতে লাগল। কানে চেপে ধরা ফোনটা আরেকটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বুজে আসা কণ্ঠে বলল,

‘আই বেগ ইউ নিশি, প্লীজ আমায় সত্যিটা বলো। বিন্দু শেষ কলটা তোমাকে করেছিল। ও কী বলেছিল তোমাকে? আমার উপর অনেক বড় বিপদ আছে এই মুহূর্তে। আর সেটা সর্বপ্রথম ওকেই টার্গেট করবে। প্লীজ, আমায় বলো।’
নিশি শুকনো ঢোক গিলল। এতবার বুঝানোর পরেও বিন্দু এমন কাজ করবে সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘বিন্দু প্রেগন্যান্ট ছিল, তালহার।’
দালানের সিসিটিভি রুমের পরিবেশ আচমকাই হীম হয়ে আসল। কিবোর্ডে থাকা তালহারের হাতটা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। ভেগাস নার্ভগুলো অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ল। কিন্তু তার চোখেমুখে কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখাগেল না।
নিশি থামল না। অপরাধীর মতো বলতে লাগল,

‘তুমি বাচ্চা চাওনা বলে ও ভেবেছিল তুমি যখন এটা শুনবে তখন অ্যাবোর্শন করিয়ে দেবে। তাই ও ঠিক করেছিল তোমায় বাচ্চার কথা না জানিয়ে ছেড়ে চলে যাবে দূরে কোথাও। কিন্তু আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছি এমনটা না করার জন্য। ও বুঝেছিল ও। ও আমায় বলেছিল ও শুধু চেকাপ করাতে যাবে আর তুমি সত্যি বলছ কিনা সেটা নিশ্চিত হতে যাবে। বাচ্চার কন্ডিশন যদি সুস্থ থাকে তারপর তোমায় জানাবে।’
‘তোমায় ছেড়ে চলে যাবে দূরে কোথাও’ অতটুকু শুনতেই তার প্রতিটি উত্তেজিত স্নায়ু শিথিল হয়ে এল। রক্তসঞ্চালন ক্ষীণ হয়ে আসল। কিছুক্ষণ আগের সব তেজ, সব প্রখরতা উধাও হয়ে গেল এক পলকে। ঘাড়ের পেছনের অসহ্য ব্যথায় মাথাটা ঝুঁকে আসল তার, চোখের সামনের আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীটা হঠাৎ করেই ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল।
তালহার ঝাপসা হয়ে আসা চোখে স্ক্রিনে পজ করা মেয়েটির অবয়বের দিকে এক পলক তাকালো। দেড় মাসের আগের করা মেয়েটির কর্মকাণ্ড তাকে এতটুকু বিশ্বাস করাতে বাধ্য করে—যে ‘বিন্দু চাইলেই তালহারকে ছেড়ে যেতে পারে।’

কিবোর্ড থেকে হাত দুটো খসে পড়ল তার। নিশি ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ডাকল,
“তালহার? শুনছ? তালহার?”
তালহার জবাব দিতে পারল না। তার কণ্ঠের শক্তি তো কেড়ে নিয়েছে তার নিজের স্ত্রী। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে অসংলগ্ন, টলমলে পায়ে সে গ্যারেজের দিকে বেরিয়ে আসল। দৃষ্টি এতটাই ঘোলাটে হয়ে এসেছে যে, সামনে কে আছে আর কে নেই—তা অনুধাবন করার ক্ষমতাও তার অবশিষ্ট নেই। টলমলে কদমে হাঁটতে হাঁটতেই সে সজোরে এক ধাক্কা খেল কারোর সাথে। হাতের মুঠো থেকে ফোনটা ছিটকে গিয়ে সিমেন্টের মেঝেতে বিকট শব্দে চুরমার হয়ে গেল। মালা আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল,
‘ভাইজান, ভাইজান আমারে মাফ কইরা দেন আমি বুঝি নাই ভাইজান। আপনি ঢুলতেছিলেন দেইখা আমি আসছিলাম।’
ভয়ে মালার কেঁদে ফেলার অবস্থা। তালহার এক ঝলক ঝাঁপসা চোখে তাকে দেখে হাতের ইশারায় যেতে বলল। সে হাঁটু গেড়ে বসে ফোনটা তুলে নেয়। ওটা তার ব্যক্তিগত ফোন। সে দারোয়ানের দিকে তাকালো। টাকা দিয়ে কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল,

‘এটা একটু দ্রুত ঠিক করিয়ে আনুন, আসলাম ভাই।’
দারোয়ান ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
‘স্যার, আপনি কী অসুস্থ? কিছু কী হয়েছে?’
সে ক্ষীণ স্বরে জবাব দিল,
‘হঠাৎ শরীরটা খারাপ করে এসেছে!’
বলেই সে টলমলে পায়ে লিফটে গিয়ে উঠল। লিফটে ঢুকতেই তার দেহ ছেড়ে দেয়। সে কোনোমতে নিজের ফ্লাটে গিয়ে ঢুকলো। বিছানায় গিয়ে ধপ করে পড়তেই সে দুই মিনিটের জন্য সকল চেতনা খুঁইয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর যখন চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে মেলল, তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো বিছানার ঠিক পা বরাবর দেওয়ালে টাঙানো বিশালাকৃতির বাঁধাই করা ছবিটার ওপর। ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা তালহারের ঠিক সামনের চেয়ারে বসে আছে বিন্দু। মেয়েটির কাঁধ গলিয়ে বুকের কাছে থাকা তালহারের হাতটি খুব যত্ন করে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে ভীষণ ভরসার সাথে সেই বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে বিন্দু।
তালহার কখনো কাঁদতে জানত না। অথচ এই প্রথম মনে হলো তার চোখের কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা উষ্ণ তরল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে নিষ্পলক চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

‘She never loved me.’
সে থামলো। পরমুহূর্তেই ভীষণ অসহায়ত্বের সাথে বলল,
But I couldn’t resist myself to love her;
সে আবারো অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে আওড়ালো,
She dreamed about a baby,
I dreamed about a happy married life with her,
She never wanted me,
I always wanted her,
She could leave me for a baby,
I couldn’t leave her for anything.
She won,
I lost.
তার প্রতিটা বাক্যে নিজের অসহায়ত্ব আর হেরে যাওয়ার ক্লেশ। চোখের কার্নিশ বেয়ে নোনাজল গুলো অবাধে গড়াচ্ছে। জীবদ্দশায় কখনো কোনো লড়াইয়ে না হারা মানুষটাকে তার স্ত্রী খুব যত্ন সহকারে হারিয়ে দিয়েছে। ক্যারিয়ার জীবনে জিতে যাওয়া এক অফিসার ব্যক্তিগত জীবনে বাজেভাবে হেরে যাওয়া এক স্বামী হয়ে বিছানায় পড়ে আছে।

গাড়ির ভেতরকার পরিবেশ ভীষণ থমথমে। কাঁপা কাঁপা হাতে বাটন ফোনের বাটন চাপতে থাকা মেয়েটির দেহ বরফ শীতল হয়ে আসল সুপ্তর ক্ষীণ স্বরে,
‘ফোনটা রেখে দাও, বিন্দু।’
বিন্দু চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো এক দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা ড্রাইভ করতে থাকা সুপ্তর পানে। সুপ্ত দৃষ্টি রাখল তার দিকে। নির্বিকার হাত বাড়িয়ে বিন্দুর হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল। চোখের সামনে ধরতেই দেখল বিন্দু একটা মেসেজ সেন্ড করে দিয়েছে। সে মৃদু হেসে বলল,
‘মেসেজ সেন্ড করে দিয়েছ? কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তালহার এটা দেখবে না।’
বলেই সে জানালা খুলে ফোনটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। বিন্দু এক দৃষ্টিতে তার বদলে যাওয়া পৈশাচিক আনন্দে বিদঘুটে হয়ে যাওয়া চেহারা দেখতে দেখতে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘এত তাড়াতাড়ি নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দিচ্ছেন?’
সুপ্ত পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তার পানে। বলল,
‘তুমি বাধ্য করছ, বিন্দু। তুমি কী ভেবেছো, আমি বিশ্বাস করে নিয়েছি যে তুমি আমার কথায় বিশ্বাস করে নিয়েছ?’

বিন্দু স্মিত হাসল।
‘আমি হাজার ভীড়ের মাঝেও তালহারের কণ্ঠকে আলাদা করতে পারি। ওই এক কণ্ঠ জুড়েই আমার বিগত তিন বছর! কোনটা এডিটেড আর কোনটা আসল এতটুকু বোঝার মতো ক্ষমতা আমার আছে।’
সুপ্ত হাসল। বলল,
‘আমি জানি তো। তোমায় ভুল বোঝানো গেলে বিগত দুই মাসেই আমি সফল হতাম। কিছুক্ষণ আগে তুমি যেমন নাটক করলে, আমিও নাটক করলাম। তুমি নাটক চালিয়ে যেতে, আমিও নাটক চালিয়ে যেতাম। কিন্তু তুমি তালহারকে কেন আমাদের মধ্যে টানছ বলো? তুমি একজন গোয়েন্দার স্ত্রী, আমি একজন গোয়েন্দা, বিন্দু। ছলনা কাকে বলে তুমি আমায় জিজ্ঞেস করো!’
‘কী চাই আপনার?’
বিন্দু চোয়াল শক্ত করে বলল।
‘তোমাকে।’
সুপ্তর সোজাসাপ্টা জবাবে বিন্দু বেদনাভরা কণ্ঠে বলল,
‘তালহার শেষ হয়ে যাবে সুপ্ত। সে নিজের পরিবার, নিজের স্ত্রীর থেকেও তার বাল্যকালের বন্ধুকে বেশি কাছের মনে করে।’

‘কাছের মানুষকে কষ্ট দেয়ার মাঝে কেমন ভালোবাসা থাকে বলোতো?’
বিন্দু তার কথার মানে বুঝল না। সে হিসেব মেলাতে ব্যস্ত!
‘দুই মাস আগে মেঘ আর তালহারের অন্তরঙ্গ ছবি আপনি পাঠিয়েছিলেন, তাই তো? নীলক্ষেতের এড্রেস ও আপনি পাঠিয়েছিলেন। এমনকি তালহার যে আমায় বাচ্চা নিতে দিচ্ছে না সেই মেসেজ ও আপনি পাঠিয়েছিলেন।’
সুপ্ত মৃদু হেসে বলল,
‘আর তুমি বিশ্বাস করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলে।’
‘আমি মোটেও বিশ্বাস করিনি আপনার ওই ছবিগুলোকে। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তালহারের ফোন থেকে প্রমাণ পেয়েছি।’
‘অবিশ্বাস তো করেছিলে? অবিশ্বাসের কারণেই তো তালহারের ফোন চেক করেছিলে। ওটাই আমার প্রয়োজন ছিল।’

‘কারণ আমি কারোর জীবনে বোঝা হয়ে থাকতে রাজি ছিলাম না। তালহার কার সাথে থাকতে চায় এটা তার সিদ্ধান্ত। আমি জোরপূর্বক কারোর জীবনে থাকব না। এতটা তুচ্ছ আমি নই।’
‘তোমার ঠিক এই ধারণাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, বিন্দু।’
‘আমি আমার জীবনে কখনো কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে জায়গা দেইনি। আজ ও দেইনি। আমি শুধু নিজের ভুল ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করতে চেয়েছিলাম‌। তালহারের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে তালহারের শত্রু হিসেবে দেখার জন্য নয়। কিন্তু আপনি আমায় সত্যি প্রমাণিত করলেন।’
বিন্দুর চোখ টলমল করছে। সুপ্ত নীরব। বিন্দু পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
‘হঠাৎ করে কেন আমাদের জীবনে এসেছেন?’
‘হঠাৎ?’
সুপ্ত আচমকা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

‘হঠাৎ নয় বিন্দু। আমি বিগত সাড়ে তিন বছর যাবৎ তোমার জীবনে আছি। যখন তালহার তোমার জীবনে ছিল না। কেউ যদি আমাদের মাঝে এসে থাকে তবে সেটা তালহার।’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
‘তোমার কী মনে হয় তোমাদের বিয়ে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ?’
বিন্দু নির্বাক। সুপ্ত বেদনাভরা হাসি নিয়ে বলল,
‘বোকা বিন্দু! তোমাদের বিয়েটা সত্যিই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ছিল। কিন্তু অ্যারেঞ্জড বাই তালহার। তুমি তালহারকে এখনো চেনোনি। অচেনা অজানা একটা মেয়েকে ও বিয়ে করে নেবে? সাড়ে তিন বছর আগে আমি ওকে বলেছিলাম আমি বরিশাল ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের কেমিস্ট্রি বিভাগের একটা মেয়েকে পছন্দ করি। এবং সবচেয়ে চমৎকার বিষয় কী জানো? পনেরো দিনের মাথায় ও আমার পছন্দ করা মেয়েটিকেই বিয়ে করে।’
বিন্দু স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সুপ্তর মুখাবয়ব বদলে যাচ্ছে অদ্ভুত ভাবে। সে চোয়াল শক্ত করে বলল,
‘আমি তোমার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম তোমার পরিবারের কাছে। কিন্তু তারা কিছু মিস ইনফর্মেশনের ভিত্তিতে আমার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এবং সাথে সাথেই তালহারের মা প্রস্তাব নিয়ে যায়। আর তোমার পরিবার রাজি হয়ে যায়।’

বিন্দু আশ্চর্য হয়ে শুনছে। সে কখনোই তার জন্য আসা সম্বন্ধের বিষয়ে জানত না। ওটা বাবা মা দেখত। সে জীবদ্দশায় একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছিল। আর সেটা তালহার। যে কি-না আজ তার স্বামী। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
‘এখানে তালহারের কী দোষ? আপনি তার সাথে এমন কেন করছেন?’
সুপ্ত চোয়াল শক্ত করে বলল,
‘আমার একাধিক নারীর সাথে মেলামেশা এটা কে জানত বলোতো? তালহার ছাড়া কেউ জানত না। তোমার পরিবারের কাছে সেই প্রমাণ কী করে গেল?’
‘তালহার পাঠিয়েছে, এমনটা তো নাও হতে পারে? হতে পারে আপনি যেই নারীদের সাথে মেলামেশা করেছেন তারাই এই কাজ করেছে।’
সুপ্ত উদাসীন চিত্তে হাসল।
‘তুমি একজন সাধারণ মানুষের মতো চিন্তা করো। কিন্তু যাকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছি তাকেই তালহারের বিয়ে করা কাকতালীয় ঘটনা নয়, বিন্দু। তুমি তো দেখেছ, বিয়ের পর থেকে তালহার তোমায় আমার থেকে কীভাবে লুকিয়েছে। যেই তালহার বিয়ের আগে আমায় ছাড়া এক মুহুর্ত ও থাকত না।’
‘ভুল বোঝাবুঝি তো হতেই পারে, সুপ্ত‌। তাই বলে এই সামান্য কিছুর জন্য আপনি আমার পিছনে কেন পড়েছেন? আমার কী দোষ?’

‘তোমার দোষ শুধু একটাই, সেটা হলো তুমি তালহারের একমাত্র সুখ। আমার সব সুখ কেড়ে নিয়ে ও কী করে সুখে থাকবে বলোতো?’
‘ছোট্ট একটা বিষয়কে এত জটিল করবেন না, সুপ্ত। যদি আপনার তার উপর রাগ থেকে থাকে তবে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। তাকে ক্ষমা করে দিন। কিন্তু নিজেদের এত বছরের সম্পর্ক নষ্ট করবেন না। সে শেষ হয়ে যাবে।’
‘আমি একবার ভেবেছিলাম সব ভুলে যাব। কিন্তু এখন এটা আর সম্ভব নয়, বিন্দু। আমার জীবনের অন্যতম একটা ভুল ছিল, প্রাচীকে মারা। যার জন্য আজ না হোক কাল আমায় তালহার খুঁজেই নেবে। তার আগে আমিই ওকে শেষ করে দেব। আমার প্রত্যেকের জন্য ‘জীবন’ সৃষ্টিকর্তার দেয়া একটি মূল্যবান উপহার। তুমি তো জানো জীবন বাঁচানো ফরজ?’
বিন্দু বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
‘প্রাচী! প…প্রাচীকে আপনি মেরেছিলেন?’

‘হ্যাঁ, সেও তোমার মতোই তালহার ভক্ত ছিল জানো। তালহার বলতে সে অন্ধ ছিল। আমার পুরো জীবনজুড়ে শুধুই তালহার। আমার নিজের কোনো অস্তিত্ব নেই। শেষবার যখন আমার কাছে সুযোগ আসল নিজের পরিচয় দাঁড় করানোর জন্য। তখন প্রাচী বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। আমি প্রাচীকে মারতে চাই নি। বারবার বলেছিলাম তালহারকে ভুলে আমার হয়ে থেকে যেতে। কিন্তু সে তালহারকে ছাড়বে না, আর না আমায় দাঁড়াতে দেবে। এরপর বাধ্য হয়ে আমায় তাকে মারতে হয়েছে। যার জন্য আমি এখন একজন গোয়েন্দা অফিসার।’
বিন্দুর ভেতর এবার ভয়ে কুঁকড়ে যায়। সে বুঝে গেল সমস্যা অনেক গভীর। সুপ্ত তাদের শেষ না করে ছাড়বে না। তার চোখের পাতা ভিজে উঠল। সে খামচে ধরল নিজের উদর। অনুনয়ভরা কণ্ঠে বলল,
‘আমায় যেতে দিন, সুপ্ত। আমি তালহারকে কিছু বলব না আপনার কথা। নিজেদের বন্ধুত্ব শেষ করবেন না। আমি অনেক কষ্টে এই বাচ্চাটিকে পেয়েছি। প্লীজ সুপ্ত।
সুপ্ত মৃদু হাসল তার অনুনয়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে নম্র দৃষ্টিতে তাকায়। ভীষণ নম্র স্বরে বলল,
‘আমার সাথে হারিয়ে যাবে বিন্দু? আমরা একসাথে তালহারের থেকে অনেক দূরে চলে যাব। একসাথে সুখে থাকব। যেখানে তালহারের ছায়াও থাকবে না। আমি দরকার পড়লে তোমার বাচ্চাকেও নিজের নাম দিতে রাজি। চলো হারিয়ে যাই।
বিন্দুর চোখমুখ ঘৃণায় বিষিয়ে আসল। বলল,

‘কোনোদিন না।’
সুপ্ত হেসে উঠল গা দুলিয়ে। ড্রাইভিং স্পিড ততক্ষণে দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে।
‘আমি জানতাম তুমি স্বেচ্ছায় আমার সাথে কখনো যাবে না। আর আমি জোরপূর্বক কাউকে নিজের করি না। এটা আমার রুচিতে বাঁধে।
‘তবে আমায় ছেড়ে দিন।’
‘আমি তোমায় কিছু করব না। তোমায় কিছু করার ক্ষমতা থাকলে আমি তিন বছর আগে যেদিন তোমাদের বিয়ে হয়েছিল সেদিনই মেরে ফেলতাম। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তালহারকে এতটা বাজেভাবে হারাতে যেন সে জীবনে আর কখনো উঠে দাঁড়াতে না পারে। আমি অনেক অপেক্ষায় ছিলাম কখন তুমি কনসিভ করবে। তুমি জানো? তালহার বাচ্চার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে আছে। ও তোমাকে চিকিৎসা করানোর জন্য বিদেশে পাঠাতে চাইছে। ও যদি জানে তোমার বাচ্চা সুস্থ সবল আছে তবে ওর থেকে আনন্দিত কেউ হবে না। এটাই সঠিক সময় ওকে বাজেভাবে হারানোর জন্য। আমি শুধু তালহারকে নয় একজন স্বামী আর একজন বাবাকে হারাতে পারব।’

বিন্দুর চোখ বেয়ে অবাধে অশ্রু গড়াচ্ছে। সে আবারো বলল,
‘প্লীজ সুপ্ত।’
‘আফসোস হচ্ছে আমার সাথে চালাকি করার জন্য?’
পরপরই সুপ্ত দ্বিগুণ উৎসুক কণ্ঠে বলল,
‘আফসোস করো না। তুমি যদি আজ ফিরেও যেতে তবে আমার লোকেরা তোমায় তুলে নিতো। এমনকি তুমি যদি বাড়িতেও থাকতে তবে মালা আমাকে সাহায্য করত তোমাকে তুলে নিতে। কিন্তু তুমি আমার কাজটা সহজ করে দিয়েছ ঘর থেকে বের হয়ে। তার থেকেও বেশি সহজ করে দিয়েছ নিজে থেকে আমার সাথে এসে। আমি আসলে জোরজবরদস্তি পছন্দ করি না।’
বিন্দু আরেকদফা চমকে উঠল।
‘মালা?’

‘হ্যাঁ, মালা। সে বিগত ছয় মাস যাবৎ আমার হয়ে কাজ করছে। আমায় তোমার এক একটা খবর দেয়‌। আর আমি যতবার তোমাদের ভালোবাসার কথা শুনি আমার ভেতরকার ক্ষত ঠিক ততটাই গভীর হয়।’
‘তোমাদের সম্পর্কে ভাঙন সৃষ্টি করাই আমার আসল উদ্দেশ্য ছিল। তুমি নিজ থেকে তালহারকে ছেড়ে দিলে সেটা বেশি কষ্ট দিতো তালহারকে। কিন্তু তুমি প্রতিবার আমায় হারিয়ে দাও, বিন্দু। এতকিছুর পরেও তুমি তালহারের কাছেই ফিরে যেতে চাও। তাই এখন আমায় এই কাজটা করতে হচ্ছে।
বিন্দুর মাথা ঘুরছে তাদের চারিদিক অদ্ভুত অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
‘আমায় যেতে দিন। আপনি আমার কিচ্ছু করতে পারবেন না। তালহার আমায় যেকোনো মূল্যে খুঁজে নেবে। কিন্তু আপনার নিজের চিন্তা করা উচিত। তালহার যদি আপনার খোঁজ পায় তবে সে আপনাকে জানে মেরে দেবে।’

সুপ্ত স্মিত হেসে বলল,
‘স্বামীর মতো অহংকারী হয়ে গিয়েছ,বিন্দু। তুমি চিন্তা করো না, তালহার এমনিতেও আমায় খুঁজে পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে যতক্ষণে আমাদের কাছে পৌঁছাবে আমি তোমাকে ততক্ষণে পাচার করে দেব। আর নিজেও দেশ ছেড়ে চলে যাব।’
বিন্দুর হাত পা ঠান্ডায় জমে এল। সুপ্তর ফোনটি তখনি বেজে উঠল। সে রিসিভ করে ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বলল,
‘হ্যাঁ, মালা বলো।’
বিন্দু ফ্যালফ্যাল করে তাকালো ফোনটির দিকে। অপরপ্রান্ত থেকে মালা বলল,
‘স্যার, আমি তালহার ভাইজানের ফোনটা ভেঙে দিছি যেমনটা আপনি বলেছিলেন।’
‘কালো ফোনটা ভেঙেছ তো?’
‘হ্যাঁ, স্যার। তার হাতে কালো ফোনটাই ছিল।’
‘আচ্ছা, তোমার কাজ শেষ মালা। আমার লোক তোমায় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেবে।’
‘আচ্ছা, স্যার!’
সুপ্ত বিজয়ের হাসি নিয়ে বিন্দুর দিকে তাকালো। বলল,
‘তোমার মেসেজ পাওয়ার আগে আমরা অনেকদূর চলে যাব, বিন্দু।’
শেষ ভরসাটুকু হারিয়ে যাওয়ায় বিন্দুর দেহ ভর ছেড়ে দিল। সে দরদর ঘেমে ওঠে পেট আঁকড়ে ধরে। জীবন কেন সবসময় এই ছোট্ট অংশটিকে নিয়েই পরীক্ষা নেয়?

তালহারের চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। তমসাবৃত সামিয়ানায় ভাসছে সাড়ে তিন বছর আগের কিছু দৃশ্য।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই তার বাসা। তখন বাড়িতে তার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা হচ্ছিল এবং তাকেও চাপ দেয়া হচ্ছিল। সেবার মায়ের অনুরোধে সে জব থেকে দু’দিনের ছুটিতে সে বাড়িতে গিয়েছিল। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটা কোচিং সেন্টারের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল নিজের বাইকের পাশে। তার একটা খালাতো ভাই দেখা করতে আসবে বলে। তার বেশভূষা সবসময়ের মতোই আপাদমস্তক কালো পোশাকে আবৃত ছিল। মাথায় পি-ক্যাপ, মুখে মাস্ক আর চোখে সানগ্লাস।
সে যখন অলস বদনে বসে ফোন দেখছিল তখন খেয়াল করল কোচিং সেন্টারের দেয়াল টপকে কিছু মেয়ে আর কিছু ছেলে লাফিয়ে পড়ে দৌড় দিচ্ছে রাস্তার দিকে। হয়তো কোনো ফাজলামো করছে সবাই মিলে। সে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করল না। কিন্তু এর মাঝেই দেখল দেয়ালের ওপার থেকে একটা মুখ অসহায় চাহনিতে ছুটে যাওয়া ছেলে মেয়ে গুলোকে দেখছে। আর চেঁচিয়ে বলছে,

‘বিশ্বাসঘাতকের দল! আমায় নিয়ে যাও। আমি এত উঁচু দেয়াল টপকে যাব কী করে?’
কিন্তু ততক্ষণে ছেলে মেয়েগুলো অনেকদূর চলে গেল। তবে একটা মেয়ে থেকে গিয়েছিল তার অপেক্ষায়। সে এক পলক মেয়েটির অসহায় মুখ দেখে আবার ফোনে মুখ গুঁজল। কিন্তু আচমকাই মেয়েটি তাকে ডাকল।
‘এক্সকিউজ মি! শুনছেন?’
তালহার মুখ তুলল। সানগ্লাসের কালচে আলোয় মেয়েটিকে ঠিকঠাক ভাবে না দেখতে পেরে সে সানগ্লাস খুললো। মেয়েটি অনুনয় করে বলল,
‘আপনার বাইকটা একটু এখানে এনে রাখবেন? আমি নামতে পারছি না।’
তালহার এক পলক বাইকটিকে দেখল আর এক পলক মেয়েটিকে। অতঃপর নীরবে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে গেল। মেয়েটিকে অবাক করে দিয়ে সে নিজের হাতের তালু পেতে দিল। গমগমে স্বরে বলল,
‘নেমে আসুন।’
মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘আমি আপনার হাতে পা দেব? এটা কেমন দেখায়? আপনি হাতে ব্যথা পাবেন। আপনি বাইকটা আনুন না!’
তালহার মুখ তুলে তাকালো। রুক্ষ স্বরে বলল,

‘নামবেন নাকি আমি চলে যাব?’
‘না না।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘আরে বিন্দু নেমে আয় না। তোর যন্ত্রনায় আজ স্যার আমাদের সবাইকে ঘাড় ধরিয়ে সি.টি দেওয়াবে।’
বিন্দু তড়িঘড়ি করে দেয়াল টপকে নামতে লাগল। সে ভীষণ ভয়ের সাথে তালহারের হাতের উপর নিজের এক পা রাখল। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
‘আপনি কিন্তু আমাকে ছেড়ে দিবেন না।’
‘দেয়াল ছেড়ে দিয়ে ভর ছাড়ুন।’
লোকটির নিরুদ্বেগ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বিন্দু চোখ বন্ধ করে নিজের পুরো ভর ছেড়ে দিল লোকটির হাতের তালুর উপর। মিনিটের মাঝে একটা ঝাঁকি অনুভব হলো। এবং সে খেয়াল করল তার পায়ের নিচে মাটি। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
‘থ্যাংক ইউ।’

সে উৎসুক কণ্ঠে বলেই ছুট লাগায় বন্ধুদের পেছনে। তালহার ততক্ষণে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে চলে গিয়েছে তার বাইকের কাছে। সেটাই তার প্রথম দেখা ছিল বিন্দুকে। তার দু’দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্ট হলো। খালাতো ভাই আর স্থানীয় ভাই ব্রাদারদের সাথে সেও গিয়েছিল কনসার্টে। যদিও সে এসবে অনাগ্রহী ছিল। কিন্তু দলে থাকলে একার ইচ্ছা খুব একটা গুরুত্ব পায় না।
সে অনাগ্রহে কনসার্ট দেখছিল। স্টেজে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ক্লাসিক্যাল ড্যান্স হচ্ছিল। তার দৃষ্টি হঠাৎ করেই সরু হয়ে আসে মাঝের সারির তিন নাম্বার মেয়েটিকে দেখে। সবার থেকে ওই মেয়েটির মুদ্রা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠছিল। লাল শাড়ি, খোলা চুলের মাঝ বরাবর এক গুচ্ছ গজরা ঝুলছে, হালকা সাজসজ্জায় তাকে খুব মিষ্টি দেখতে লাগছিল। সেখানে সবাই লাল শাড়ি পরেছিল কিন্তু ওই মেয়েটিকে অন্যরকম লাছিল। যেন লাল রঙটি তার জন্যই তৈরি হয়েছে। তার শাড়ি পরার ধরণই অন্যরকম সুন্দর আর মার্জিত ছিল। ওটা সেই মেয়েটা ছিল যাকে সে গত পরশু সাহায্য করেছিল। কী যেন নাম বলেছিল? ব…বিন..বিন্দু!
‘বিন্দু! বি টি এম!’

তালহার নিজমনে আওড়ালো। মুহুর্তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে কনসার্টটি আগ্রহের সাথে দেখার একটা কারণ খুঁজে পেল। সে বাদাম খেতে খেতে কনসার্ট দেখছিল। মেয়েটির নাচ শেষ হতেই সে ছুটে স্টেজের নিচে নামল তার সঙ্গীদের সাথে। তালহারের দৃষ্টি তখন স্টেজ থেকে সরে গিয়েছিল। এবং ঘুরেফিরে তার দৃষ্টি ভীড়ের মাঝে ওই মেয়েটির উপরই থামে।
বিন্দু নামতেই একটা ছেলে হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটে আসল তার কাছে। সবাইকে একদফা ভড়কে দিয়ে হাতের একগুচ্ছ গোলাপ ফুল এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘এই বিন্দু আমি তোর আর তোর নাচের প্রেমে পড়ে গিয়েছি। ওয়ান্না বি মাইন?’
তালহারের বাদাম খাওয়া ততক্ষণে থেমে গিয়েছিল। সে নিগুঢ় চোখে দৃশ্যটি দেখছিল। সে প্রচুর আগ্রহের সাথে বিন্দু নামক মেয়েটির প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিন্তু মেয়েটি এক ফালি হেসে ফুলটা নিয়ে বলল,

‘আই’ম অ্যান অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ লাভার। অচেনা অজানা কারোর প্রেমে পড়ব। তোকে তো চিনি উল্লুক! ফুলগুলো নিলাম। ফুলগুলো সুন্দর!’
বলেই সে ফুল নিয়ে বন্ধুদের সাথে দৌড়ে চলে গেল। সে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়েছিল। তার কোমর সমান চুলগুলো সমীরণের তালে দুলছিল। তালহার কোনাচোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোনে অপ্রকাশিত হাসির রেশ। সে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ লাভার! প্রিটি লেডি!’
এরপর দুদিনের বদলে সে পনেরো দিন বরিশালে থেকে যাওয়ার কারণ পেল। এবং পনেরো দিনের মাথায় সে বিন্দু নামক মেয়েটিকে বি.টি.এম এ পরিণত করেছিল। অবশ্যই তার উত্তম মাধ্যম অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ-ই ছিল। কিন্তু অ্যারেঞ্জড বাই তালহার মুজাহিদ।
অফিশিয়াল ফোনটা স্বশব্দে বেজে উঠতেই তালহার নড়ে উঠল। সে ফোন কানে ঠেকালো। মেহমেদ ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

‘স্যার, সুপ্ত স্যারকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তিনি খুব চতুরতার সাথে নিজেকে লুকিয়ে আমাদের দৃষ্টি থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন।’
‘এটা কী করে হলো মেহমেদ? সে চতুরতা কেন করবে?’
‘স্যার, হয়তো তিনি বুঝে গিয়েছেন আপনি তার উপর নজর রাখছেন! এমনকি তিনি নিজের গাড়িও বদলে ফেলেছেন। আমরা এখন তার গাড়ির কাছেই আছি।’
‘আর ট্র্যাকার?’
‘ট্র্যাকার ও কাজ করছে না স্যার। ওটা শুধু এই জায়গাটাই নির্দেশ করছে। এর মানে তো স্পষ্ট তিনি ট্র্যাকার ও সরিয়ে ফেলেছেন। আর তার ফোন ও কানেক্ট করা যাচ্ছে না।’
তালহার চোখের উপর থেকে হাত সরায়। ভ্রু যুগলে ভাঁজ!ল। সে বলল,
‘আমি আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাচ্ছি না, মেহমেদ।’
মেহমেদ চমকে উঠল।
‘স্যার, এতে কী সুপ্ত স্যারের হাত থাকতে পারে?’
‘আমার স্ত্রী নিজে বাড়ি থেকে বের হয়েছে।’
‘কিন্তু স্যার, সুপ্ত স্যারের নেক্সট টার্গেট ম্যাডাম ই হওয়ার কথা। হয়তো তিনি অনেক আগে থেকেই নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।’

তালহার তড়িঘড়ি করে উঠে কাবার্ডের কাছে গেল। একটা ডায়রি বের করে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল। সেখানের লেখাগুলো মেহমেদকে বলল,
‘এখানটায় খোঁজ নিন, মেহমেদ।’
‘জি স্যার।’
ফোনটা কেটে যায়। তালহার টলমলে চোখে ডায়রিটা রেখে আরেকটা অ্যালবাম তুলে নেয় হাতে। প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই সাত বছরের দুটি ছোট্ট ছেলের গম্ভীর মুখ ভেসে উঠল। যারা কি-না পাশাপাশি গলায় গলায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ডান পাশের ছেলেটার মুখটা ছুঁয়ে দেয়। তার দারুচিনি রঙা চোখদুটো ছবিতেও কেমন চকচক করছে।
ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ ছেলেটির একদিন টিফিন নষ্ট হয়ে যায়। ছেলেটি না খেয়ে চুপটি করে জানালার পাশে বসেছিল। তখন একটা ফর্সা সুন্দর হ্যাংলা পাতলা ছেলে এসে নিজের টিফিন বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,
‘শেয়ারিং ইজ গুড। এসো তুমি আমি একসাথে টিফিন খাই।’

ছোট্ট তালহার সেদিন ছেলেটার টিফিনের অর্ধেক খেয়েছিল। সেদিনের পর থেকে তারা পুরো একুশ বছর তারা একে অপরের খাবার ভাগ করে খেয়েছিল, একে অপরের সমস্যা ভাগ করে নিয়েছিল, একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগ করে নিয়েছিল। কিন্তু একে অপরের শেষটাও যে তারাই নিশ্চিত করবে এটা কখনোই ভাবেনি।
তালহারের লালচে চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসল।
আজকে তালহার মুজাহিদ সত্যিকার অর্থেই একটি পরাজিত সত্তা। যে তার সাথে জুড়ে থাকা সম্পর্কগুলোর কাছে হেরে যায় তার ক্যারিয়ারের বিজয়ের কী গুরুত্ব?
সে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে অ্যালবাম উল্টালো। তাদের দু’জনের মাঝে একটি মেয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেই অনাথ মেয়েটির একমাত্র ভরসা, পরিবার, সুখ ছিল সে আর তার বন্ধু। তার কেমন লেগেছিল যখন তার নিজের বন্ধু তাকে পুড়িয়ে মেরেছিল?
তালহারের গলার কাছে কিছু একটা আঁটকে যায়। সে গতকাল থেকে এই কথাটা জানে। কিন্তু সে বিশ্বাস করেনি। যতক্ষণ না পর্যন্ত সুপ্ত নিজে নিশ্চিত করেছে। আর যখন তৈরবকে মেরে সে ওটা নিশ্চিত করল। তখন-ই তালহার মুজাহিদ হেরে গিয়েছিল। সে ধপ করে অ্যালবাম বন্ধ করে দেয়। কেঁপে ওঠা ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে ড্রয়ার থেকে ইনটেক একটা রিভলবার পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক আর চোখে সানগ্লাস পড়ে আবার বেরিয়ে আসে।
এই দূর্বল তালহারকে কেউ দেখতে পারবে না।
মোবাইল সার্ভিসিং এর দোকানে ঢুকতেই লোকটি বলল,

‘স্যার, আসলাম ভাই দিয়ে গিয়েছিল। এখনো কাজ শেষ করতে পারিনি। বাজেভাবে ভেঙেছে।’
‘আর কতক্ষণ লাগবে?’
‘আধা ঘন্টা স্যার।’
‘একটু তাড়াতাড়ি করো।’
‘জি স্যার!’
সে বেরিয়ে এসে কাউকে ফোন দিল। অপরপ্রান্ত থেকে রিসিভ হতেই বলল,
‘সোয়াইব, কিছু পেলে?’
অপরপ্রান্ত থেকে সোয়াইব উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
‘স্যার, পেয়েছি। কবির যেই হাসপাতালের নাম বলেছে সেই হাসপাতালেই ম্যাডাম গিয়েছিল। হাসপাতালের কতৃপক্ষ সিসিটিভি আর অভ্যন্তরীণ তথ্য দিতে নারাজ ছিল। আমি অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি। দুইটা রিপোর্ট পেয়েছি আর একটা ফুটেজ পেয়েছি।’

‘পাঠাও।’
তালহার হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। সদ্য আসা নোটিফিকেশনটা অন করতেই একটা সনোগ্রাফি রিপোর্ট ভেসে উঠল স্ক্রিনে। তালহারের দেহ স্তিমিত হয়ে আসল। সে জুম করে ছবিটিকে। একটা ছোট্ট মাংসল পিণ্ডের মতো অস্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে। সে ছবিটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতেই মলিন হাসল। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘সবসময় বাবার সাথে খেলা করো।’
সে ছবিটি সরিয়ে ফেলল। পরবর্তী ছবিতে আরেকটি রিপোর্ট দেখাগেল। যেখানে ভ্রুণর বয়স দশ সপ্তাহ লেখা। কিন্তু তার দৃষ্টি আটকায় নিচে লেখা একটি বাক্যে। ভ্রুন কন্ডিশন সুস্থ। তার এডামস অ্যাপলটি নড়ে উঠল।
পরবর্তী ফুটেজটাতে তিন দফা বিন্দুকে দেখা গেল। বিন্দু ফুটপাতে ওঠার পর আর কিছু দেখা গেল না। ঠিক দুইটার সময়কার ফুটেজ। যেখানে শেষবার বিন্দুকে দেখা গিয়েছে। এখন বাজে সাড়ে তিনটা।
সে আবার ফোন দিল সোয়াইবকে। বলল,
‘ফুটপাতের আশেপাশে কোনো দোকান বা স্টোরে সিসিটিভি আছে কি-না দেখো, সোয়াইব।’
কিন্তু সোয়াইব দুঃখের সাথে জানালো।

‘দুঃখিত স্যার। হসপিটালের সামনে আর তেমন কোনো সিসিটিভি ফুটেজ নেই যা আমাদের সাহায্য করতে পারে।’
‘ঢাকার বাইরে যাওয়ার সব রাস্তায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, স্যার অফিসাররা কাজ করছে।’
‘আমি আধা ঘন্টার মধ্যে আসছি।’
তালহার ফোন কেটে দিয়ে আবার সার্ভিসিং এর দোকানে গেল।
টানা তিন ঘন্টা কেটে গেল বিন্দুর নিখোঁজ হওয়ার। এমনকি সুপ্তর ও কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। তালহার নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করা শেষে তখন থমকে বসে ছিল। কিন্তু কোথাও থেকে আশানুরূপ সংবাদ আসল না।
ঠিক তখনই মেহমেদের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে মেহমেদের নাম দেখেই তালহারের টানটান হয়ে থাকা পেশিগুলো কিছুটা শিথিল হয়ে এল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেহমেদের উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে এল,

‘স্যার, সুপ্ত স্যারের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে! আধা ঘণ্টা আগে ওনাকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে দেখা গিয়েছে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এই দেড় ঘণ্টার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যগামী একটা কানেক্টিং ফ্লাইট আছে। যেটা দুটি দেশে ট্রানজিট নিয়ে ইউরোপ যাবে। সুপ্ত স্যার ওটাতেই টিকিট কেটেছেন। এটা নিশ্চিতভাবেই ওনার প্রি-প্ল্যান্ড মুভ, অনেক আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ করেই কেন দেশের বাইরে যাবেন? ম্যাডামের নিখোঁজের সাথে হয়তো তিনি যুক্ত আছেন। তাকে পেলেই হয়তো ম্যাডামের খোঁজ পাওয়া যাবে।’
তালহার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শুধু গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
‘ফ্লাইট কখন?’
‘স্যার, প্রবলেমটা সেখানেই! ফ্লাইট টেকঅফের আর মাত্র দশ মিনিট বাকি। বোর্ডিং কমপ্লিট হয়ে প্লেন অলরেডি রানওয়ের দিকে রোল করছে। এই মুহূর্তে নরমাল প্রোটোকলে এভিয়েশন সিকিউরিটি ফ্লাইট থামাতে পারবে না!’
‘আপনি ফ্লাইটের নাম বলুন।’

মেহমেদ নাম বলতেই তালহার এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। মেহমেদের ফোনটা কেটে দিয়েই লাল রঙের একটি প্রাইভেট ডায়াল কোডে চাপ দিল। সরাসরি কলটা গেল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এর চিফ টাওয়ার কন্ট্রোলারের কাছে।
ফোন রিসিভ হতেই তালহারের গলায় গতির চেয়েও বেশি ধার ফুটে বেরোল,
‘আমি সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা তালহার মুজাহিদ বলছি। যেই ফ্লাইট এই মুহূর্তে টেকঅফ করার জন্য প্রিপেয়ার্ড ওটা এখনই হোল্ড করুন। টেকঅফ পারমিশন ক্যান্সেল করুন। বিমানে এমন একজন আছে যাকে নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রাউন্ডেড করা জরুরি। এক মিনিটও দেরি হলে ইউ উইল বি হেল্ড রেসপন্সিবল।’
অপরপ্রান্তের জবাব শোনা গেল না।
আর ঠিক সাত মিনিট ফ্লাইট টেক অফের। বিমানের সব মূল দরজা বন্ধ করে আর্মড করে দেয়া হয়েছে। চোয়ালে হাত চেপে উদ্বিগ্ন চিত্তে নিজের সিটে বসা সুপ্তর কপালে গভীর চিন্তা আর তাড়ার ছাপ। ককপিট থেকে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা দিচ্ছে। সে জানে এখন আর চিন্তার বিষয় নেই। তবুও সে স্থির বসতে পারছে না।
কারণ সে তালহারকে চেনে বলেই হয়তো এই ভয়টা পাচ্ছে। এবং দুই মিনিটের মাথায় সুপ্তর ভয় বাস্তবে রূপান্তরিত হলো।

প্লেনের ভেতরকার পরিবেশ ছমছমে কৌতুহলী হয়ে উঠল আচানক যখন পেছনের মেইন ডোরটা ভারী শব্দে আনলক হলো। জরুরি প্রোটোকল মেনে এয়ার ব্রিজ অলরেডি বাইরে সেট করে দেওয়া হয়েছে। দরজার ভারী প্যানেল সরে যেতেই বিমানের কনকনে এসি হাওয়ায় বাইরে থেকে ঢুকে পড়ল আর্দ্র আর তপ্ত বাতাস। সাথে সাথেই ভেতরে প্রবেশ করল চারজন সশস্ত্র এভিয়েশন সিকিউরিটি কর্মকর্তা এবং তাদের ঠিক পেছনে ডাবল ব্রেস্টেড স্যুটে একজন এয়ারপোর্ট এপিবিএন এর সিনিয়র কমান্ডার। তারা সোজা এগিয়ে এলেন বিজনেস ক্লাস সিটের দিকে।
কমান্ডারের হাতে একটি পোর্টেবল ডিজিটাল ট্যাব। চোখে তীক্ষ্ণ স্ক্যানিং দৃষ্টি। পুরো কেবিনে তখন পিনপতন নীরবতা। সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থাতেই যাত্রীরা ঘাড় বাঁকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে কী ঘটছে। সুপ্তর ভেতরকার প্রতিটা রক্তকণিকায় হিমস্রোত বয়ে যাচ্ছে। সে নিজের মুখটা জানালার দিকে ঘুরিয়ে নিজেকে প্রাণপণ চেষ্টা করল।
কিন্তু লাভ হলো না।
কমান্ডার এসে থামলেন ঠিক সুপ্তর পাশে। ট্যাবের স্ক্রিনে সুপ্তর ছবির সঙ্গে সামনাসামনি মুখ মেলাতে ঠিক তিন সেকেন্ড সময় নিলেন তিনি।

‘মিস্টার সুপ্ত?’ কমান্ডার একদম নিচু কণ্ঠে ডাকলেন।
সুপ্ত চোয়াল শক্ত করে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। কোনো উত্তর দিল না।
‘ইমার্জেন্সি গ্রাউন্ডেড অর্ডার। প্রোটোকল ৯বি। সিভিল এভিয়েশন এবং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অথরিটির অর্ডারে আপনাকে ডিটেইন করা হচ্ছে। ইউ আর কামিং উইথ আস, রাইট নাও।’
‘উইথ হোয়াট অথরিটি?’
সুপ্ত নিজের ভয়ার্ত কণ্ঠ ঢেকে উচ্চস্বরে রাগ ফুটিয়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
‘আমার কাছে ভ্যালিড পাসপোর্ট আর বোর্ডিং পাস আছে! প্লেন অলরেডি রানওয়েতে, আপনারা এভাবে ফ্লাইট হোল্ড করতে পারেন না।’
‘কোনো তর্ক নয়, স্যার।’
কমান্ডারের পাশের অফিসারটি কোনো ভূমিকা না করে ঝটকা মেরে সুপ্তর সিটবেল্টের বাকল খুলে দিল।
বলল,

‘হাত দুটো বাইরে রাখুন এবং সোজা দাঁড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটুন। রেসিস্ট করলে আমরা ফোর্সেবলি রিমুভ করতে বাধ্য হব।’
সুপ্ত চারপাশে তাকাল। সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে। কেবিনের সামনে-পেছনে দুজন সিকিউরিটি অফিসার প্রস্তুত দাঁড়িয়ে। কোনো প্রকার বুদ্ধি খাটানোর ন্যূনতম সুযোগ নেই।
সে বলল,
‘আমায় একট ফোন করতে হবে। শুধু সেটুকু করতে দিন।’
‘দুঃখিত স্যার। কোনো প্রকার ডিভাইস ইউজ করা নিষিদ্ধ। আপনাকে দ্রুত আসতে হবে। নয়তো আমরা বাধ্য হবো আমাদের পদ্ধতি বদলাতে।’
সুপ্ত দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেল। বিমানের দরজার কাছে পৌঁছাতেই তীব্র বাতাসের সাথে দূরে রানওয়েতে একটা কালো রঙের অফ-রোডার সার্ভিস জিপ সায়রেন না বাজিয়েই এসে থামতে দেখা গেল। সদ্য গাড়ি থেকে বের হয়ে সামনের দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী অবয়বকে দেখতেই তার দেহ বরফের মতো জমে গেল। তবুও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে এগিয়ে গেল।
চোখে ডার্ক সানগ্লাস থাকলেও এই দূর থেকেও লোকটার চোখের বরফশীতল চাহনি সুপ্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। তালহার! হেরে যাওয়ার তীব্র অপমান আর আতঙ্কে সুপ্তর পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল।‌ অফিসাররা তাকে বিমানের সিঁড়ি দিয়ে তালহারের গাড়ির দিকে নামিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল।
মুখোমুখি হতেই সুপ্ত থমথমে মুখে বলল,

‘এগুলো কী?’
তালহার পেছনে হাত বেঁধে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘বিন্দু কোথায়?’
‘তোর বউ কোথায় সেটা আমার জানার কথা? নাকি আবারো তোকে ছেড়ে চলে গিয়েছে?’
তালহার কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করে তার সামনে নিজের ফোনটা তুলে ধরল। কালো ফোনটি দেখতেই সুপ্তর হাতের আঙুলগুলো কেঁপে উঠল কিঞ্চিৎ। দেহ ভরশূন্য অনুভব হতে লাগল।
‘তালহার, আমি বিন্দু। আমি সুপ্তর সাথে আছি। আমার লোকেশন ট্রাক করুন তাড়াতাড়ি।’
একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার ছোট্ট কামরা। যেন কোনো পাতালঘর। সূর্যের এক ছটা আলোও সেখানে নেই। সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসা সুপ্ত চোখ তুলে তাকালো। ঠিক সামনে সোফায় বসা তালহার বড্ড শ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল,
‘কেন করলি এসব?’

সুপ্ত টলমলে চোখে আর শক্ত মুখশ্রীতে ভেতরের জমা অজস্র ক্ষোভগুলো বড্ডো হিংস্রতার সাথে ফুটে উঠল।
‘স্কুল টপার, হোল ক্যাডেট কলেজের সেরা তালহার মুজাহিদ। বুয়েটে সিএসই এর প্রতিটা সেমিস্টারে টপ করা, প্রোগ্রামিং এ আশ্চর্যজনক দক্ষতা। সামান্য একটা কেস সলভে তুই একবার খিলজি মাহমুদকে সাহায্য করেছিলি।এরপর সকলের নজর তালহার মুজাহিদের উপর। ভার্সিটি পাস করতে না করতেই সরাসরি জয়েনিং, আর মাত্র দুই বছরের মাথায় অবিশ্বাস্য প্রমোশন! ঢাকা গোয়েন্দা সংস্থার সবচেয়ে তূখোড় অফিসার! অন্যদিকে আমি? প্রতিবার এক দুই মার্কে তোর থেকে পিছিয়ে যেতাম। প্রোগ্রামিং এও আমি তোর মতোই দক্ষ। কিন্তু তবুও আমার উপর কারোর নজর পড়ত না।
টানা দুই দফা হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর চেষ্টা করেও আমি গোয়েন্দা হিসেবে জব নিতে পারিনি। সবাই শুধু তোর গুণগান গাইত। এগুলো শুনতে শুনতে আমি ত্যক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের দিকে তাকালে ডিপ্রেশনে বুক ফেটে যেত, আয়নায় নিজের মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারতাম না আমি। আবার ভার্সিটি লাইফে জীবনের সাথে জুড়ে যায় প্রাচী। তাকে আমার খুব ভালো লাগত। মেধাবী অনাথ মেয়েটা নিজের যোগ্যতায় বুয়েটা চান্স পেল। কিন্তু সেও আমার আর তোর মাঝে তোকেই বেছে নিলো।তোকেই বেশি প্রায়োরিটি দিতো, তোকে ভালোবাসত। আমার ও ইচ্ছা হতো কেউ আমায় ভালোবাসবে, প্রায়োরিটি দেবে।
কিন্তু সে করল না। তুই ওকে বন্ধুর নজরে দেখিস তবুও ও তোর প্রতি ভালোবাসা লালন করত। তোর সব কাজে সাহায্য করত।

এরপর পাঁচ বছর আগের সেই মুহুর্তটি আসল যখন আমায় উপরমহল থেকে অফার করা হলো, আমি যদি তাদের একটা কাজ করে দেই তবে আমায় গোয়েন্দা সংস্থার একটা বড় পদ দেবে। আমার জন্য সেটা জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল। আমি ওই পদের জন্য সব করতে রাজি। কিন্তু তারা এমন একটা কাজ দিল যা আমায় এক মুহুর্তের জন্য থমকে দিয়েছিল। তোর সদ্য হাতে নেয়া কেসের যত প্রমাণ তোর কাছে আছে তা তাদের হাতে তুলে দিতে হবে।
আমায় এক মুহুর্তের জন্য ভাবতে হয়েছিল সিদ্ধান্তটা নিতে। কিন্তু আমি বন্ধুত্বের আগে নিজের ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছিলাম। তুই সেদিন নিজের সব ল্যাপটপ আর ফাইল প্রাচীর কাছে রেখে বরিশালে গিয়েছিলি। প্রাচী স্বাভাবিক ভাবেই আমায় জানালো সেই কথা। আমি তার কাছে গেলাম। প্রমাণ গুলো আমায় কিছুক্ষণের জন্য দিতে বললাম। কিন্তু সে দিতে নারাজ। আমি তাকে জানালাম আমি তাকে ভালোবাসি। কিন্তু সে আমায় ভালোবাসে না। তোকে ভালোবাসে। আমি তাকে আবারো বুঝিয়ে বললাম, এটা দিলে আমি আমার ড্রিম জবটা পেয়ে যাব। কিন্তু সে দিলই না। বরং আমায় হুমকি দিল তুই আসলে সব বলে দেবে। তারপর আমায় পুলিশে দেবে। ব্যাস! আমার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। ওই প্রমাণ মেটাতে না পারলে আমি জব আর টাকা পেতাম না। ফলস্বরূপ সেদিন একতলা ওই ব্যাচেলর বাড়িটিতে শর্ট সার্কিট হয়।

বিশ্বাস কর আমি লাগাইনি। ওই কেসের সাথে জড়িত লোকেরাই কাজটা করেছিল। তৈরব ও ছিল। আমি শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ও দেহে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে জানালা থেকে আমার কাছে অনেক অনুরোধ করেছিল। প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু তখন পিছু হটার আর সুযোগ ছিল না।
তবে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, সব প্রমাণ মিটিয়ে দেয়ার পরেও তুই ওই কেস জিতে গিয়েছিলি। ভাগ্যবশত কেউ আমার নাম নেয়নি। আমি তওবা করেছিলাম আর কখনো খারাপ কাজ করব না। কিন্তু তুই সেটা হতে দিলি না। সেই সবাইকে খুঁজে খুঁজে মারতে লাগলি যারা প্রাচীর মৃত্যুর সাথে জড়িত ছিল। আমার ভয় বাড়তে লাগল।’
সে দম ফেলে। পুনরায় বলতে শুরু করে,
‘এরপর অনেক সময় কেটে গেল। কিন্তু চমকপ্রদ ঘটনাটা ঘটল ঠিক তখনই, যখন তুই বিয়ে করলি।
তোকে যখন জানিয়েছিলাম, আমি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের তৃতীয় বর্ষের একটা মেয়েকে পছন্দ করি। তুই শুনেও না শোনার ভান করে এড়িয়ে গিয়েছিলি। এমনকি যখন বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলাম সেটাও তোর অজানা ছিল না।

এরপর আমি যখন ঢাকায়, ঠিক তখনই তুই হুট করে বিয়েটা সেরে ফেললি। নিজের শৈশবের বন্ধুকে একবার জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করলি না। বিয়ের পর ফোনে শুধু জানালি মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সাধারণ একটি মেয়েকে বিয়ে করেছিস। শুনে নিজের অজান্তেই মনে মনে একটু শান্তি পেয়েছিলাম। ভাবলাম, অন্তত এই একটা জায়গায় হলেও তোকে হয়তো হারিয়ে দিতে পারব। কারণ আমার সাথে মেলামেশা করা কিংবা আমার গার্লফ্রেন্ডরা সবাই তো অন্তত তথাকথিত হাই-ক্লাস আর অতি-সুন্দরী ছিল।
কিন্তু যখন আমি তোর সেই ‘সাধারণ’ মধ্যবিত্ত বউকে প্রথমবার দেখলাম… আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
না, সে সত্যিই কোনো বিশ্বসুন্দরী ছিল না। কিন্তু সে ছিল ঠিক সেই মেয়েটা… যাকে আমি একসময় নিজের করে চেয়েছিলাম। তখনো নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি—এটা স্রেফ একটা কাকতালীয় ঘটনা। চেষ্টা করেছিলাম বিন্দুকে ভুলে যেতে, কিন্তু পারলাম না। তুই বিন্দুকে আমার থেকে লুকাতে শুরু করলি। যত দূরে লুকাতে চাইতি, আমি তার প্রতি ঠিক ততটাই দুর্বল হয়ে পড়তাম। সে এতটাই সাধারণ ছিল যে দশটা মেয়ের মধ্যে সে নিমেষেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। তার মার্জিত গোছালো চলাফেরা, চাহনি, হাসি, কথা বলা, আগলে রাখার দক্ষতা সবটা একটা হাই ক্লাস মেকআপ সুন্দরী মেয়েকে হারিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। অজস্র সুন্দরী, হাই ক্লাসের মেয়েকে ডেট করার পরেও আমার চোখে শুধু সেই ভাসতো। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, তোর বিন্দুকে বিয়ে করাটা মোটেও কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না।’

সুপ্ত থেমে যায়। তার চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। চোখ রক্তিম হয়ে আছে। তালহার উদাসীন চোখে দেখল তার চিরচেনা সেই বন্ধুকে হারিয়ে যেতে। শীতল কণ্ঠে বলল,
‘আমি কখনোই জানতাম না তুই যাকে পছন্দ করতি সে বিন্দু।’
‘এখন তুই নিশ্চয়ই এটাই বলবি যে বিন্দুর পরিবারের কাছে আমার অজস্র মেয়ের সাথে মেলামেশা করার ছবি তুই পাঠাসনি?’
‘আমি পাঠাইনি।’
‘অথচ ওগুলো তুই ছাড়া কেউ জানত না।’
‘বিশ্বাসঘাতকতকা তোর মাঝে ছিল আমার মাঝে কখনোই ছিল না। তোর প্রতি অবিশ্বাস থাকলে আমি গতকাল ই তোকে মেরে ফেলতাম। যখন জানতে পেরেছি প্রাচীর মৃত্যুর সাথে তুই জড়িত। কিন্তু আমি কারোর কথায় বিশ্বাস করিনি। আমি তোর থেকে সত্যিটা জানতে চেয়েছি। আমি দুপুর পর্যন্ত ও তোর সাথে একটুও বিরূপ আচরণ করিনি। নিজের সব মনের কথা খুলে বলেছি। কারণ আমি ভেবেই নিয়েছিলাম আমি তোকে আঘাত করতে পারব না। আমরা সবটা ঠিক করে নেব। আমি হয়তো মাফ করে দেব।
আর তুই আমায় বাজে ভাবে হারিয়ে দিলি।’
পরপরই বেদানাভরা কণ্ঠে বলল,

‘প্রাচীর কী দোষ ছিল? শুধু আমায় ভালোবাসত বলে? একটা জব আর টাকার জন্য? ওই অনাথ মেয়েটা আমাদের নিজের পরিবার ভাবত সুপ্ত।’
‘আর কত ইমোশনাল গল্প বানাবি? আমি যা করেছি তা একদম ঠিক করেছি। আমার সাথে অন্যায় হয়েছে আমি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছি।’
তালহার ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘বিন্দু কোথায়?’
‘বিন্দু? সে তোর হাতের নাগালের থেকে অনেক দূরে
যেতে চেয়েছিল আমি তাকে দুনিয়া থেকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
তালহারের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে শুকনো ঢোক গিলে আবার জিজ্ঞেস করল,
‘ও প্রেগন্যান্ট সুপ্ত। অনেক কষ্টের পর এই বাচ্চাটি দশ সপ্তাহ টিকেছে। একটা সুস্থ সবল ভ্রুন। প্লীজ, তার উপর কিসের রাগ?’
সুপ্তর চোখে অপ্রতিরোধ্য হিংস্রতা। সে হিসহিসিয়ে বলল,
‘কারণ সে তালহার মুজাহিদের সন্তান। তাকে মরতেই হবে।’
‘বিন্দু অসুস্থ। প্লীজ বল, ও কোথায়? তোকে আঘাত করতে আমার ভীষণ কষ্ট হবে। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না।’

‘হাহ! সত্যি? তুই আমায় আঘাত করবি? পুরো গোয়েন্দা সংস্থারর সবাইকে আমি আমার বিষয়ে জানিয়ে রেখেছি। আমার গায়ে একটা আঁচড় ও লাগলে তার মূল্য তোকে বাজেভাবে দিতে হবে। তোর বিন্দুকে পৃথিবীর যেখান থেকে পারিস খুঁজে দেখা। অবশ্য তুই যতক্ষণে খুঁজে পাবি ততক্ষণে বিন্দু আর তোর বাচ্চা লাশ হয়ে যাবে! আমি ওকে নিজের হাতে মারতে পারতাম না। বিশ্বাস কর আমি ওকে ভালোবেসে ছিলাম।’
তালহার একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। কিয়ৎকাল বাদ পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে মাঝখানের টেবিলের উপর রেখে উঠে দাঁড়ালো। সুপ্ত সচকিত হয়। সে ধীর কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ওর সামনে। সুপ্ত চোখ তুলে তাকায়।
‘আমায় মারবি?’
তালহার নাকচ করে আবদারের সুরে বলে,
‘একবার জড়িয়ে ধরতে দিবি?’
সুপ্ত এক চুলও নড়ল না। তালহার জোরপূর্বক তার সাথে আলিঙ্গন করে। বিভ্রান্ত সুপ্তকে কপালে ভাঁজ পড়ল। তালহার তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘আমার গোটা বাল্যকাল, কৈশোরকাল, যৌবনকাল সবটা নিজের হাতে শেষ করতে আমার ভীষণ কষ্ট হবে, সুপ্ত। আমি তোকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম, ভালোবাসি।’
‘ন্যাকামো করবি না। ছাড়! দূরে সর!’

সুপ্ত ঝাড়া দিয়ে দূরে সরতে গেলেই আচমকা সে কঁকিয়ে উঠল। তার মেরুদন্ডের ঠিক নিচের অংশে মাঝখান বরাবর একটা সূচালো কিছু ঢুকে যেতেই সে চোখমুখ কুঁচকে নিলো। সপাটে একটা ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বলল,
‘এটা কী ছিল?’
সুপ্ত আবারো ঝাঁপিয়ে পড়ে তালহারের উপর। কিন্তু তালহার নিরুত্তর তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। অবুঝ সুপ্ত দুই মিনিটের মাঝেই দেহে অদ্ভুত নিঃসাড়তা অনুভব করতে লাগল। সে বিভ্রান্ত নিয়ে তাকায় তালহারের হাতের ইনজেকশনটার দিকে। গর্জে উঠে বলে,
‘ওটা কী ছিল?’
সুপ্তর বুক থেকে শুরু করে নিচের অংশ ক্রমেই অবশ হয়ে যেতে লাগল। সে ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। পুনরায় চেঁচিয়ে উঠে বলল,

‘ওটা কী ছিল তালহার?’
তালহার পেছনে হাত বেঁধে শান্ত কণ্ঠে বলল,
‘জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা যাওয়ায় কত কষ্ট তা বোঝা উচিত।’
সুপ্ত আতঙ্ক ভরা চাহনিতে চেয়ে বলল,
‘আমার কিছু হলে পুরো গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয়ে যাবে এটা তুই করেছিস। আমি সবাইকে জানিয়েছি আমার একমাত্র শত্রু তুই। আমায় ছেড়ে দে।’
তালহার মলিন হেসে বলল,

‘আমি তো সেই পাঁচ বছর আগেই পিশাচ হয়ে গিয়েছিলাম। ন্যায় নীতি বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছি যেদিন আমার কারণে একটা নিষ্পাপ মেয়ে মরেছিল। আমার চিন্তা আমি করে নেব। এই জীবনের জন্য আলবিদা। আমি ‘বন্ধু’ শব্দটাকে ঘৃণা করি। আফসোস, আমার জীবনে কখনো বন্ধুই না আসত। তবে আজকে আমি এতটা বাজেভাবে হেরে যেতাম না। আমার বুকের ভেতরটা ব্যথায় সংকুচিত হয়ে আসছে, সুপ্ত!’
সে ছলছলে চোখে একথা বলেই বেরিয়ে আসে। সুপ্ত চেঁচালো পেছন থেকে।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৬

‘তালহার…তালহার….!’
তালহার পিছু ফিরে তাকায় না। হাঁটতে হাঁটতেই তার পায়ে বেঁধে মেঝেতে থাকা জ্বলন্ত একটি মোমবাতি পড়ে যায়। মোমবাতিটির ঠিক পাশে থাকা কিছু কাপড় আগুনের ছোঁয়ায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সুপ্ত ভয়ে, আতঙ্কে গনগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। অথচ সে একচুল ও নড়তে পারছে না।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here