তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৮
ঐশী আফরিন
একটা টং দোকানের বেঞ্চিতে বসে আছে ইচ্ছে আর রুহি।তাদের আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দ,অপূর্ব,
আয়াজ,অভি।অরিন্দ আর আয়াজ এক সাথে পড়াশোনা করে ধরতে গেলে দুজন খুব ভালো বন্ধু।তার উপর অপূর্বের আপন ছোট ভাই অরিন্দ।
সকলে সেই আধ ঘণ্টা যাবৎ এখানে বসে আছে আর একের পর এক চায়ের কাপ শেষ করছে।কেন বসে আছে কারো জানা নেই।রুহিকে অর্ধেক ক্লাস থেকে তুলে এনেছে অভি।এনে এখানে বসিয়ে রেখেছে।
ইচ্ছে এবার বিরক্ত হয়ে বলে “কি সমস্যা তোদের বুঝলাম না।এখানে এভাবে বসিয়ে রাখার মানেটা কি?”
“আরিয়ানটাকে মিস করছি।বেটা থাকলে আড্ডাটা জমতো”
অপূর্বের কথায় রুহি উত্তর দেয় “তো তোমরা বড়রা এখানে আড্ডা দেবে আমাকে বসিয়ে রেখেছো কেন?”
“আমি জানি কেন তোকে বসিয়ে রেখেছে?অভিকে জিজ্ঞেস কর।সে তোকে এনেছে”
“চুপচাপ বসে থাক।এত কথা বলছিস কেন?”
আয়াজের কথায় রুহি বেকুব বনে যায়।মানে এরা কি এভাবেই নিরবতা পালন করে আড্ডা দেয়!
অরিন্দ আর আয়াজ আরেকটা বেঞ্চ নিয়ে আসে।এবার দাঁড়ানো সকলে বেঞ্চে বসে।
প্রথমে মুখ খোলে আয়াজ “ইচ্ছে…?”
ইচ্ছে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে “কি?বলে ফেলো”
“বিয়ে করবো তোমাকে”
ইচ্ছে যেটুকু চা মুখে দিয়েছিল তা ছিটকে মুখ থেকে বেরিয়ে পরে।অপূর্বের সাদা এপ্রোনে চা পড়তেই অপূর্ব ওর মাথায় চটি মারে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“কি মুখ থেকে ফেলে দিলি কেন?করবি না বিয়ে?না করলেও করতে হবে।করতে হবে মানে হবেই।আরিয়ান অন্য কাউকে ভালোবাসে।আর আরিয়ানের সেই নিরব ভালোবাসার কথা আমি জানি,তোরা না।ও মরে গেলেও ঐ মধু নামের মেয়েটা ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না।শুধু শুধু নিজেও কষ্ট পাস না আর আয়াজকেও কষ্ট দিস না”
আয়াজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।জীবনে প্রথম বারের মত তার কোন মেয়েকে এতটা ভালো লেগেছিল।লাগারই কথা।এরকম অভাবনীয় সৌন্দর্য আয়াজ প্রথম বার দেখেছিল।তার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী ইচ্ছে।শুধু তার দেখাই না।যে যে মানুষ মাধবীকে না দেখে ইচ্ছেকে প্রথমে দেখেছে তারা সকলে বলতে বাধ্য তাদের দেখা প্রথম সুন্দরী নারী ইচ্ছে।আর যারা মাধবীকে দেখেছে তাদের কাছে তো দুনিয়ার সমস্ত সুন্দর ঠুনকো মনে হবে।ভাগ্যিস মাহফুজ চৌধুরী ছোট থেকে মেয়েটাকে পর্দায় রেখেছিল।না হয় এই মেয়ে কত মানুষের রাতের ঘুম হারাম করতো।
ইচ্ছের প্রতি তার অনুভূতি দিনে দিনে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় রুপ নিলো।এখন সেই মেয়ে নাকি তারই ছোট ভাইকে ভালোবাসে।আয়াজ আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
অপূর্ব আবারও বলে “ভালো হয়ে যা ইচ্ছে।তোর মত মেয়েকে আয়াজ ভালোবেসেছে এটাই তোর ভাগ্য।আরিয়ান কখনোই তোর দিকে চেয়েও দেখবে না”
আয়াজ চোখ রাঙায় “সে খারাপ হলেও আমি ওকে ভালোবাসি।ভালো হলেও।আর আমি তোদের অধিকার দেইনি ওকে খারাপ বলার”
ইচ্ছে তাচ্ছিল্য হাসে “আমার সমস্ত খারাপের মাঝে ভালো বলতে শুধু আরিয়ানের প্রতি অনুভূতিটুকুই আছে।এছাড়া আর কিছু আছে বলতে মনে হয় না”
“দেখ ইচ্ছে মেনে নে।এতে তোদের দুজনের জীবনই গোছানো হবে”
অভির কথায় ইচ্ছেরও বলতে ইচ্ছে হলো ‘তুই পারবি রুহিকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে?’
কিন্ত আয়াজ সামনে তাই বললো না।অভি আর রুহির ব্যাপারটা শুধু কয়েকজন ছাড়া কেউ জানে না।এটা জানানোর মত কথাও না।কারণ দুজনের ধর্ম আলাদা।কারো পরিবারই মেনে নেবে না।এই যে পাগল প্রেমিক আয়াজ সে নিজেই কখনো এটা মেনে নেবে না তার বোন অন্য ধর্মের কাউকে ভালোবাসবে।যতই সে ভালোবাসার মানে বুঝুক।
রুহি সকলের কথা শুনছে আর অবাক হচ্ছে।ইচ্ছেকে ওরা খারাপ কেন বলছে?আর আরিয়ান কে ইচ্ছেও ভালোবাসে!আরশিও ভালোবাসে।আবার শুনলো আরিয়ান নাকি মধু নামের একটা মেয়েকে ভালোবাসে।তার জানা মতে তো আরিয়ান মাধবীকে মধু ডাকে।কি গোলমাল!তবে সে মুখ না খুলে চুপচাপ সবার কথা শুনতে লাগলো।কারণ এখানে সেই একমাত্র ছোট আর কম বেশি সকলেই সমবয়সী।
“ইচ্ছে তুই চাস বা না চাস তোকে বিয়ে করতেই হবে।তোর জন্য সবার বিয়ে আটকে আছে।আয়াজের বিয়েটা হলে সিরিয়ালে সকলে বিয়েটা করে ফেলতে পারতাম”
অরিন্দর কথায় অপূর্ব খেকিয়ে উঠে “ওরে শালা তোর বড় ভাই এখনও বিয়ে কথাটা বলতে ভয় পায় আর তুই আছিস সিরিয়ালের ধান্দায়”
“তোর আর আরিয়ান কে বলাও লাগবে না বিয়েও করা লাগবে না।কি বালের বন্ধু বানিয়েছিস?বন্ধুর বোনকে ভালোবাসিস আর বলতে পারছিস না’
অরিন্দর কথায় একটা ছোটখাট বম ব্লাস্ট হয়।সকলে একসাথে চেঁচিয়ে উঠে “কিহহহহ”
এদের একটু পর পর চিৎকারে দোকানদার বিরক্ত।ওনার ছোট্ট দোকানটায় প্রতিদিনই এই দামরা গুলো আড্ডা দিতে চলে আসে।আর যে সে আড্ডা না একদম প্রতিদিনই ২-৩ ঘন্টা বসে থেকে দোকানের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে যায়।বছরের পর বছর ধরে এরা কেন ওনার দোকানেই ঝর তুলতে আসে বুড়ো দোকানদার বুঝে পান না।কিছু বলতেও পারেন না ওদের এত সুন্দর বন্ধুত্ব দেখে।তাই বরাবরের মত নিরবে একের পর এক চা বানাচ্ছে।
অভি আর ইচ্ছে অবাক হয়ে বলে “অপূর্ব তুই আবার আরিয়ানের কোন বোনকে পছন্দ করিস?”
“আরে শুধু পছন্দ নয়।মন,প্রান,দিল,কলিজা আরও যেন কি কি আছে ওসব তো তোরা ডাক্তারেরা জানিস।আচ্ছা যাই হোক সব দিয়ে ভালোবাসে”
“অরিন্দর বাচ্চা।তোর কাছে বলাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভূল।তুই যে কোন মেয়েকে চি….”
অপূর্ব আর শেষ করতে পারে না অরিন্দ এসে মুখ চেপে ধরে কানে কানে বলে “কেমন বড় ভাই তুমি?ছোট ভাইয়ের মান ইজ্জত সব নিয়ে নিচ্ছো।মুখটা বন্ধ করো দয়া করে”
“সর এখান থেকে।তুই কি কোন মেয়ে?যে আমি তোর মান ইজ্জত নেবো?আমার রুচি এত খারাপ হয়নি”
“এই থামলি তোরা দু ভাই”
অভির আকস্মিক চিৎকারে দু ভাই ছিটকে দু পাশে বসে পরে।এই বন্ধু গুলোও হয়েছে একেকটা ক্ষেপা ষাড়।
আয়াজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে “তুই কি আরশিকে ভালোবাসিস অপূর্ব?”
“আস্তাগফিরুল্লাহ”
আয়াজ বোকা বনে যায়।সে বললো কি আর অপূর্ব বললো কি!অরিন্দ মাঝে থেকে বলে,
“অপূর্ব ভাই। আমি বলে দেই?”
“অরিন্দ নিজের মুখ বন্ধ রাখ।নয়তো আমার মুখও কিন্ত খুলবে?”
“বাল বলবি তুই কাকে ভালোবাসিস?”
অপূর্ব আরিয়ানের আগে কাউকে বলতে চাচ্ছে না।আরিয়ান তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।কত করে শুনতে চেয়েছে এতদিন!কিন্ত অপূর্ব বলেনি।এখন ওদের বলে দিলে বিষয়টা কেমন হয়ে যায় না?
“বলবি তুই?”
ইচ্ছের চিৎকারে অপূর্বের ভাবনায় ভাটা পরে।এই মেয়েদের গলা কেন এত বড় থাকবে সে বুঝে পায় না।আবার বুঝতেও চায় না।তার ভালোবাসার কথা বললেই তো সেই তীক্ষ্ণ চোখ,কুসুমের ন্যায় কমল ঠোঁট,বড় বড় চোখের পাপরি।এগুলোই তার মনে পরে।কিন্ত এতটুকুই বলতে পারে বাকিগুলো বর্ণনা করার সাধ্য তার নেই।বড় বড় কবি সাহিত্যিকরাও হয়তো পারবে না এই রুপ বর্ণনা করতে।
হঠাৎই তার চোখ যায় তার দিকে রক্ত চক্ষু নিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা মানুষ গুলোর দিকে।সে ভরকে গিয়ে গলা খাকারি দেয় “কি?সবাই এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
সকলে এভাবেই তাকিয়ে থাকে।অপূর্ব এবার না পারতে বলে দেয় “জমিদার মাহফুজ চৌধুরীর বড় কন্যা মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতী”
এবার আর ছোটখাট না একেবারে বড় ধরনের বম ব্লাস্ট হয়।এবার আর কেউ কথাই বলতে পারে না।চিৎকার দেবে দুর।দোকানদার কানে আঙুল দিয়ে রেখেছিল ওদের চিৎকারের ভয়ে।তবে কাউকে চিৎকার দিতে না দেখে কান থেকে হাত সরিয়ে নেয়।
তখনই সবগুলো একসাথে চিৎকার করে উঠে “অপূর্বর বাচ্চা….তুই আর কাউকে পেলি না?”
বুড়ো দোকানদারের এখন ইচ্ছে হলো ঝাড়ু দিয়ে সবগুলোকে তাড়াতে।কিন্ত এমপির লোক ভেবে আর কিছু বলতে পারে না।
“এজন্যই আমি তোদের বলতে চাইনি”
আয়াজ আর অভি এসে অপূর্বর গা ঘেঁষে বসে।অপূর্ব আবারও খেকিয়ে উঠে “এই দূরে যা।মেয়েদের মত ঘেষাঘেষি করবি না।কথা নিতে চাচ্ছিস আমি জানি।বলে ফেল কি শুনতে চাচ্ছিস?”
ইচ্ছে সর্বপ্রথমেই জিজ্ঞেস করে “তুই মাধবীকে দেখলি কিভাবে?”
“কোন এক কাল রাত্তিরে আকস্মিক আমার সামনে এক পরীর দেখা মেলে”
“ভাই তুই রাতের বেলা দেখে ভয় পাস নি?আমি তো মেয়ে হয়েও দিনের বেলাতে দেখেই ভয় পেয়েছিলাম!”
“কলিজাটা হাতে ছিল আমার।আমিতো ভেবেছিলাম আজ বুঝি ভরা জঙ্গলে আমি শেষ”
“কিন্ত ঐ মেয়ে জঙ্গলে কি করছিলো?”
অভির প্রশ্নে সকলেই উৎসুক হয়ে তাকায় অপূর্বর দিকে।
“জানি না।তবে মেয়েটার প্রচুর সাহস।ঐ দিন আমার সাথে ঝগড়াও করেছিলো”
রুহির হাত আপনা আপনিই মাথায় চলে যায়।আরশি,ইচ্ছে দুজনেই আরিয়ান ভাই কে ভালোবাসে।আবার অপূর্ব,আরিয়ান ভাই দুজনেই মাধবী আপুকে ভালোবাসে।দুজনে এই খবর জানলে দুজনের বন্ধুত্বের কি হবে ভেবেই রুহির হাত পা ঠান্ডা হয়।
“এতদিন তুই আমাদের কাউকে বলিসনি কেন?”
অভির দিকে তাকায় অপূর্ব।তারপর বলে “যে রিয়েকশন তোরা দিয়েছিস।ভয় লাগে”
আয়াজ বলে “কালকের মধ্যে হয়তো আরিয়ান এসে পরবে।তখন ওকে বলে দিবি।এমনিতেও মাহমুদা কাকী মাধবীকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে।হাত ছাড়া হওয়ার আগে বিষয়টা জানিয়ে দেওয়া ভালো।আমার আর ইচ্ছের বিয়ের পরেই তোরা বিয়ে করছিস।তারপর তোদের পর আরিয়ান”
“নাহহহ”
“তোমার আবার কি হয়েছে?”
নিজের কথায় রুহি নিজেই বেকুব বনে যায়।পরক্ষণেই অভির দিকে তাকিয়ে বলে “না।আমার আবার কি হবে।কিছু না কিছু না।ভালো সিদ্ধান্ত”
“কিসের ভালো সিদ্ধান্ত?দেখ আয়াজ আমি তোকে বিয়ে করবো না।আর আরিয়ান আমাকে বিয়ে না করলে চিরকুমারী থাকবো।তোর বিয়ে করার ইচ্ছা না থাকলে তুইও চিরকুমার থাকিস”
অরিন্দ মুখ ভেংচায় “ইশশশ।একেকজন বাংলা সিনেমা পেয়েছে সারাজীবন দেবদাস হয়ে ঘুরবে।সব কথার এক কথা আয়াজ যেভাবে বলেছে সেভাবেই হবে শুধু তাড়াতাড়িই করে সব শেষে আমার বিয়েটা হলেই হবে”
“তুই আবার বিয়ের জন্য নাচিস ক্যান?তোরও এহ এহ আছে না কি?”
অভির কথায় অরিন্দ লজ্জা পাওয়ার ঢং করে “সব কথা বলতে হবে?বিয়ের সময়ই দেখতে পাবি”
“এহ।সবাই নিজের কথাটা ভাবছে। আমি যে কি করবো
সেটা কেউ ভাবছে না।একদম রুহিকে তুলে নিয়ে পালিয়ে যাবো।হতচ্ছাড়ারা”
কথাগুলো অভি মনে মনে বললো।তবে মুখে কিছু বললো না।
তারপর ওরা আরো অনেকক্ষণ এসব নিয়ে কথা বলে।কিন্ত আর কিছুই রুহির কানে ঢোকে না।সে মুখ বন্ধ করে কেবল বসে থাকে।আর ভাবতে থাকে যদি মাধবী অন্য কাউকে ভালোবাসে?
আরিয়ান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বাকহীন হয়ে যায়।আপনা আপনিই হাত চলে যায় বুকের বাঁ পাশে।মাধবীর শুভ্র শাড়ির কোমল আভায় তার দুধে আলতা গায়ের দীপ্তি এক অপার্থিব ঔজ্জল্যে মিশে গেছে,যেন সে সদ্য বিকশিত মাধবীলতা।যার পাপড়িতে বিন্দু বিন্দু শিশির লেগে আছে।তাকে দেখে মনে হয় শত ফুলের সমারোহে স্থাপিত এক অনুপম প্রতিচ্ছবি,যার সৌন্দর্য নির্বিচারে সমস্ত চেনা সৌন্দর্যকে অতিক্রম করে নিজ গতিতে ফুটে উঠে।শত সহস্র পুষ্পের মাঝে তাকে স্থাপন করলেও তার অপরূপ সৌন্দর্য এমন স্বতন্ত্র দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হবে-যে অনায়াসেই সব ছঁপিয়ে মন কারবে।
আরিয়ান যেন হঠাৎই রূপকথার কোন পাতায় প্রবেশ করেছে আর মাধবী সেই পাতার অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী মূর্তিমান নায়িকা।উজ্জ্বল গোলাপি ফর্সা ত্বকে জানালার ফাক গলে আসা কোমল রোদ নৃত্য করছে।মেলে দেওয়া লম্বা ঢেউ খেলানো চুলগুলো এক রূপকথার রাজ্যে প্রবেশ করাচ্ছে।ঠোঁটের নিচে বাঁ দিকের কুচকুচে কালো তিলটা যেন আজ বেশিই আকর্ষণীয় লাগছে।তীক্ষ্ণ চোখজোড়া যেন রাতের আকাশে ছুঁয়ে থাকা নক্ষত্রের ঝিলিক।চোখ দুটো নিচু করলেই তার লম্বা পাপড়ির ছায়া গালের উপর পরে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য তৈরী করে।তার হাতের সূক্ষ্ম নরাচরায়,তার শ্বাসের ধীরে উঠানামায় এক তাজা গোলাপ ফোঁটার আগের মুহুর্তের মত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে।এক কথায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত গোটা মানুষটাকেই যেন বিধাতার নিজ হাতে তৈরি করা এক নিখুঁত উপমা।এমনই নিখুঁত যে তার অনাবিল রূপের সজিবতা কোন কবিও তার কবিতায় এত নিখুঁত বর্ণনা দিতে গেলে হাত কাঁপবে,হিমশিম খাবে।
আরিয়ান কে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাধবী না চাইতেও যেন কিছুটা লজ্জা পায়।তার এই লাজে মাখা মুখটা হালকা কাত করা মাত্র তার গালে যে হালকা লালচে আভা ফুটে উঠে যা তাকে এক সফেদ-শান্ত সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি বানিয়ে ফেলে।যা দেখলে মনে হয় বুক চিরে কেউ আলো প্রবেশ করাচ্ছে।
আরিয়ান সেখানেই বুকে হাত দিয়ে বসে পরে।বুকের ভেতর যেন হঠাৎই কিছু থেমে গেছে,যা তার শ্বাস আটকে রাখলো।সর্বক্ষণ চলতে থাকা হৃদপিন্ডের ধুকপুক শব্দরাও থেমে গিয়ে নতুন ছন্দ খুঁজতে লাগলো।মাধবীর সাথে দৃষ্টি মেলার সাথে সাথে তার বুকে ভেতর বজ্রাঘাতের মত একবিন্দু প্রদীপের আলোর স্রোত বয়ে গেল।সে এমন ভাবে থমকে রইল যেন- সময়,শব্দ বাতাস চারপাশের সমস্ত কোলাহল থেমে গিয়ে তাকে স্বর্গীয় হুরকে দেখার অনুমতি দিচ্ছে।
প্রথম বারের মত আরিয়ান বুঝলো,
কোন মানুষের সৌন্দর্য এতটা গভীর ভাবে
হৃদয়ে জাল ফেলতে পারে-
যে নিজের অস্তিত্বটাই ক্ষণিকের জন্য হাড়িয়ে যায়।
তার ভেতর কার পুরুষটা নিঃশব্দে স্বীকার করলো-
“এটা মানুষ নয়…….
এটা আমার জীবনে উপস্থিত হওয়া এক
অলৌকিকতার নাম- “মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতী”
আরিয়ান কে এতটা অস্বাভাবিক দেখে মাধবী এগিয়ে যেতে চায়।কিন্ত তার আগেই আরিয়ান হাত উচিয়ে থামিয়ে দেয়।মাধবী কিছুটা হলেও বুঝতে পারে আরিয়ানের মনের তীব্র ঝড়।তাই সে নিঃশ্বব্দে শাড়ির আচঁল দিয়ে চুলসহ মুখটা ঢেকে নেয়।আরিয়ান টেনে হিচঁরে চোখটাকে নিচে নামিয়ে আনে।কিছুক্ষন থম মেরে তাকিয়ে থাকে স্বেত পাথরের ফ্লোরে।সে কিছুতেই চাইছে না মেয়েটার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে।কিন্ত কোন কাজই হচ্ছে না।কিছুক্ষন নিরবতার পর আরিয়ান শত কষ্টে নিজেকে ধাতস্ত করে উঠে দাঁড়ায়।
আরিয়ান কে দাঁড়াতে দেখে মাধবী জিজ্ঞেস করে “কেন এসেছিলেন?”
“স্ত্রী নিতে”
মাধবী যেন আকাশ থেকে পরে “কিহহহ?আপনার স্ত্রী এখানে আসবে কোত্থেকে?দেখুন কোথায় কোন বাঁদরের সাথে কলা খাচ্ছে” বলেই মুখ টিপে হাসে।
“ছেমরি সর এখান থেকে।এখানেই আছে আমার স্ত্রী”
বলে আরিয়ান মাধবীর শেল্ফের উপর থেকে একটা ইস্ত্রী মেশিন নিয়ে আসে।
মাধবী বলে “এটাতো ইস্ত্রী মেশিন!”
“ঐ স্ত্রী আর ইস্ত্রী একই কাজে লাগে।পার্থক্যটা শুধু ইস্ত্রী সোজা করে পাঞ্জাবি আর স্ত্রী সোজা করে পাঞ্জাবির মালিক ”
মাধবী আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে থাকে।সারাক্ষণ বকবক করা মেয়েটা এখন কি বলবে নিজেই ভুলে গেছে।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করে “রুমাকে কেন খুঁজছিলি?”
“আলতা আর গাজরাটা পরতে পারছি না”
“এত সাজঝিস কেন?”
“কোথায় এত সাজলাম!শুধু একটু শাড়িটা আর কাজলটা দিলাম”
“সব আমাকে মারার ধান্ধা” মনে মনে বিরবির করে আরিয়ান।
“এখন কাকে দিয়ে পরাবো?”
“যাকে ইচ্ছে তাকে ডাক।আমাকে বলিস না”
মাধবীর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপে “তাহলে অজয় ভাইয়াকে একটু ডেকে দিন না।ওনাকে বলবো পরিয়ে দিতে”
আরিয়ান সাথে সাথে চিৎকার করে উঠে “থাপড়ে মুখের নকশা বদলে ফেলবো”
” ওমা!কেন?সুন্দর নকশা বুঝি পছন্দ হয় না?তা হবে কেন!আপনার তো ভালো লাগে গরুর মত চোখ, গন্ডারের মত চামড়া,হাতির মত লম্বা সুরওয়ালা,ঘোড়ার লেজের মত চুলওয়ালা,বিড়ালের মত ঠোঁটওয়ালা।সুন্দর জিনিস কি আপনার ভালো লাগবে!দেখি বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলে আপনার পছন্দ মত মেয়ে আবিস্কার করা যায় কিনা।আর না হলে মন খারাপ করবেন না।আপনার তো কোলবালিসই আছে ”
“ঘাট হয়েছে আমার।তোর নকশা আর বর্ণনা তোর কাছেই রাখ।নয়তো যে বিজ্ঞানী এত পড়েও পাগল হয়নি সেও তোর এসব বর্ণনা শুনে নির্ঘাত পাগলা গারদে যাবে”
“গেলে মন্দ হয়না।দেশের পাগলা গারদ গুলো খালি পরে আছে।আপনার মত কয়েকটা পাগল পাচার করতে পারলে ভালোই হবে”
“তুই কি আমাকে পাগল বলছিস?”
“এখানে আর কেউ আছে?”
আরিয়ান একটু এগিয়ে যায় তার দিকে।কিছুটা ঝুঁকে বলে “কেউ নেই?”
মাধবী সাথে সাথে কোমরে থাকাটা ছুরিটা দুজনের মাঝে ধরে।এক পেশে হেসে বলে “এটা আছে তো”
আরিয়ান সরে দাঁড়ায়।মুচকি হেসে বলে “দিন দিন ভালোই উন্নতি হচ্ছে”
“নিজেকে রক্ষা করতে একটু উন্নতি হওয়াই যায়”
“নিজের শত্রুদের নিজেই রক্ষা করছিস।আবার নিজের রক্ষাবাঁচকের কাছ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজের কাছে ছুড়িও রাখছিস।আমার দেখা শ্রেষ্ঠ বোকা নারী তুই মধু”
“বুঝলাম না ঠিক”
“বুঝতেও হবে না।আলতা আর গাজরা কি পরা লাগবে?না চলে যাবো?”
“আপনি পড়িয়ে দেবেন?”
“তুই চাইলে”
মাধবী আর কথা না বলে আলতাটা বারিয়ে দেয় আরিয়ানের দিকে।বাঁ হাতটা মেলে ধরে তার সামনে।আরিয়ান কাঁপা হাতে মাধবীর হাতটা ধরে।খুব মনোযোগ দিয়ে আলতাটা পরিয়ে দেয়।নিজের হাতেও লেগেছে বেশখানিকটা।তারপর দু হাতে গাজরাগুলো পরিয়ে দেয়।আবেশিত হাতগুলোর দিকে তাকিয়ে আওড়ায় “আর কিছু?”
“চুলেরটা পরিয়ে দিন”
বলে মাধবী পেছনে ঘুরে মাথা থেকে ঘোমটা টা ফেলে দেয়।সাথে সাথে আরিয়ানের নাখস্রাব্দে প্রবেশ করে তার চুলের মহোনীয় ঘ্রাণ।আবেশে চোখ বুজে নিয়ে তার ব্যাক্তিগত নারীর গায়ের সুন্দর ঘ্রাণ সুকে নেয়।
মাধবী চুলগুলো খোঁপা করতে নিলে আরিয়ান থামিয়ে দিয়ে বলে “স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে চলার স্বাধীনতা দে চুলগুলো কে”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৭
বলে গাজরাটা নিয়ে পরিয়ে দেয় মাধবীর ঢেউ খেলানো খোলা চুলে।কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে গাজরা আর আলতা দেওয়া হাতগুলোর দিকে।প্রচন্ড হিংসেরা নাড়া দেয় তার মনে।কি সুন্দর গাজরাগুলো তার আগে তার ব্যাক্তিগত নারীকে ছুঁয়ে দিচ্ছে।আর আলতাগুলো তার আগে তার ব্যাক্তিগত নারীর হাত দখল করে আছে।
“গাজরা আর আলতাগুলো খুব ভালো ভাগ্য নিয়ে তৈরী হয়েছে”
বলে আরিয়ান তৎখনাত সেখান থেকে প্রস্থান করে।মাধবী বুঝলোই না আরিয়ানের কথার মানে।
