তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২২
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা সৌরভের ধাওয়া খেয়ে বাড়িতে ঢুকে ড্রইং রুমে বসা আরশাদ খানের পাশে গিয়ে বসলো। সৌরভ সদর দরজার সামনে লাঠিটা রেখে এগিয়ে গেলো। প্রাণেশা আরশাদ খানকে বলল,
“দেখো বাবা ভাইয়া কেমন করে মারতে আসছে। আমি কি এখন ভাইয়াকে জ্বালাতন করি বলো? তাহলে আমাকে মারবে কেনো?”
আরশাদ খান মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললেন,
“নাহ আমি জানি তো তোমরা ভাইবোন কোনো ঝগড়া করো না। ঝগড়া করতেই পারো না।”
সৌরভ সিঁড়ি দিয়ে যেতে যেতে প্রাণেশাকে বলল,
“তু্ই শুধু আমার সাথে কথা বলতে আসিস!”
প্রাণেশা গলা উঁচিয়ে বলল,
“ঠিক আছে যাও যাও। তোমার সাথে কথা না বললে আমার কিছুই হবে না।”
সৌরভ যেতে যেতে কর্কশ কণ্ঠে বলল,
“মিছে মিছে কৌতুক না শোনালেও পারিস। তু্ই শুধু কথা বলতে আসিস। এক ধাক্কা দিয়ে শশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিবো।”
প্রাণেশা মুখ ভেঙচি দিয়ে বসে রইলো।
আরশাদ খান প্রাণেশাকে বললেন,
“শুধু শুধু ওর সাথে ঝগড়া করতে যাও কেনো মা?”
প্রাণেশা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“আমি ঝগড়া করিনি। ভালো কথাই বলেছি।”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“তোমাদের ভালো কথাও জানি। আবার মন্দ কথাও জানি মা। ওর সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নিও।”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে ওর বাবাকে বলল,
“বাবা তোমার ছেলে যদি নিজে থেকে ঠিক করতে আসে তাহলে ওর সাথে কথা বলবো। তাছাড়া একটা কথাকে বলবো না।”
আরশাদ খান মেয়ের কথা শুনে বললেন,
“ঠিক আছে। দেখা যাক কি হয়। কে আগে আসে।”
দুপুরে দুপুরে স্নিগ্ধই প্রাণেশাকে কল দিলো। প্রাণেশা শাওয়ার নিচ্ছিলো তাই শুনতে পায়নি। স্নিগ্ধ কয়েকবার কল দেওয়ার পরে আর দিলো না।
এদিকে প্রাণেশা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে হলুদ রঙের টু পিস পড়েছে। চুলগুলো মুছে নিজেকে পরিপাটি করে তুলে বিছানায় এসে ফোনটা হাতে নিলো। স্নিগ্ধর এতগুলো কল পেয়ে কল ব্যাক করলো।
স্নিগ্ধ কল রিসিভ করে বলল,
“কি করছিলে শুনি? এতোবার কল দিয়েছি দেখোনি?”
“শাওয়ার নিচ্ছিলাম। কি হয়েছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন নাকি?”
“তোমার সাথে কথা বলাই গুরুত্বপূর্ণ। এক্সট্রা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বুঝি না।”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“বাব্বাহ! এতো গুরুত্বপূর্ণ আমি?”
“হুমম।”
“এই যে স্যার, কালকে কি করে আমার ভাইয়ের বিয়ে দিলেন সেটা বললেন না তো!”
স্নিগ্ধ খিলখিলিয়ে হেসে বলতে শুরু করলো,
গতকালকে…
সৌরভ এয়ারপোর্টে ঢুকবে কি করে তার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো স্নিগ্ধ আরশাদ খান আর গার্ডগুলো। সৌরভ রাগে-দুঃখে পাগল হওয়ার উপক্রমে। কিন্তু যে করেই হোক ওকে তো যেতে হবে ভিতরে।
সৌরভ এতো ভাবাভাবি বাদ দিয়ে এগিয়ে গেলো। আরশাদ খান সামনেই দাঁড়িয়ে বললেন,
“সৌরভ, প্লিজ তুমি যেও না। বাড়িতে চলো। যাও তোমার সুবহাকে বিয়ে করতে হবে না। তবুও তুমি দেশে থাকো। তোমার বিয়ে করতে হবে না।”
স্নিগ্ধও তাই বলল। সৌরভ আরশাদ খান আর স্নিগ্ধর কথা বিশ্বাস করে ফিরে এলো। সাব্বিরকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। স্নিগ্ধ সৌরভের সাথে কথা বলতে বলতে ওর নাকে সেন্সলেস হওয়ার স্প্রে করলো। সৌরভ অজ্ঞান হওয়ার পরে ওকে নিয়ে চলে এলো স্নিগ্ধদের বাড়িতে।
কাজী ওখানেই বসে ছিলো। আর সুবহাকে রেডি করে আনলো ওর মা আর চাচি। স্নিগ্ধ সৌরভকে ধরে বাড়িতে নিয়ে এসে চোখ-মুখে পানি ছিটিয়ে দিলো। কিছুক্ষন পরে সৌরভের জ্ঞান ফিরতেই ও তো পুরো শকড। যে কোথায় এলো। ওর সামনে কাজী। আবার সুবহা বউ সেজে আছে।
এরপরে আরশাদ খান ওকে ধরে বসলেন। খুব দ্রুতই বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু করা হলো। সুবহাকে কবুল বলতে, বলা হলে সাথে সাথেই কবুল বলে দিলো। কিন্তু সৌরভ, সে পাক্কা দেড় ঘন্টা বসেই ছিলো। কোনো কথাও বলেনি। এরপরে আরশাদ খান, সাঈদ রেজা চৌধুরী সহ সবার জোরাজোরিতে কবুল বলল। তাও আরও আধঘন্টা বসে থাকার পরে।
ওকে কবুল বলাতে সবাই হাপিয়ে গিয়েছে।
—স্নিগ্ধর থেকে এসব শুনে তো প্রাণেশা হতভম্ব। তার ভাইটাকে কি জবরদস্তি করে বিয়েতে রাজি করিয়েছে।
প্রাণেশা অবাক কণ্ঠে বলল,
“আমার ভাইটার সাথে এমন করেছেন?”
“হুমম। না করলে কি বিয়ে করতো?”
“বুঝিয়ে বললেই করতো।”
স্নিগ্ধ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল কপালে ঘষে বলল,
“তোমার ভাইকে বুঝিয়ে বললে সে শুনবে? তুমিই শোনো না, আর তোমার ভাই তো আকাশ ছোয়া।”
প্রাণেশা গাল ফুলিয়ে বলল,
“আপনি আমার আর আমার ভাইয়ের নামে বদনাম করছেন?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“না, জান আমি আমার বউ আর শালাকে নিয়ে কথা বলছি। বদনাম করবো কেনো?”
বিকেল বিকেলে প্রাণেশা বের হলো শপিংয়ে যাবে। স্নিগ্ধকেও বলেনি।
প্রাণেশা একা এসে টুকটাক শপিং করে একটু ঘোরাঘুরি করছিলো মলে। ওর যে বান্ধবী আসার কথা ও এসেছে কিন্তু উপরের তলায় রয়েছে। প্রাণেশা লিফটে উঠল। সেখানেই এলো আরও তিনজন লোক। তাঁরা একই রকম পোশাক পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে গার্ড হবে হয়তো।
প্রাণেশা এক সাইডে দাড়ালো। তাঁদের থেকে একজন গার্ড আরেকজনকে বলে উঠল,
“এই সাইডে দাড়া স্যার আসছে।”
প্রাণেশা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় হুড়মুড়িয়ে লিফটে উঠল একজন ছেলে। মুখে মাস্ক। লিফটে ঢুকেই সামনের দিকে ফিরলো। প্রাণেশা ছেলেটার চোখ একঝলক দেখতে পেলো। ওর কেমন চেনা চেনা লাগছে। আর তার শরীরে থেকে ভেসে আসা পারফিউমের স্মেলটাও খুব চেনা। এই পারফিউম স্নিগ্ধ ব্যবহার করে।
প্রাণেশা একটু উঁচু হয়ে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না ওই তিনজন গার্ডের জন্য। প্রাণেশার ইচ্ছে করছে এই গার্ডগুলোর মাথা ফাটিয়ে দিতে।
লিফট থেমে গেলো। একজন গার্ড প্রাণেশাকে বলল,
“এই ফ্লোরে নামবেন আপনি?”
প্রাণেশা উত্তরে বলল,
“হ্যা।”
লোকগুলো সাইড হয়ে দাড়ালো। কিন্তু সামনের ছেলেটা পেছনে ফিরলো না। যেমন সামনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে তেমনই। প্রাণেশা চলে গেলো। সামনেই তার বান্ধবী ডাক দেওয়ায় ছেলেটার মুখও আর দেখতে পেলো না। প্রাণেশা পেছন ফিরতেই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। তবুও ওর মনের মাঝে কেমন অস্থির লাগছে।
বারবার মনে হলো ওইটা স্নিগ্ধই ছিলো। কিন্তু স্নিগ্ধ কেনো এখানে আসতে যাবে? আর গার্ড নিয়েই কেনো ঘুরবে।
প্রাণেশার বান্ধবী লাবিবা বলল,
“তোর এতো চিন্তা হচ্ছে তু্ই কল দে ভাইয়াকে।”
প্রাণেশা কল দিলো স্নিগ্ধকে। স্নিগ্ধ সাথে সাথেই রিসিভ করে বলল,
“কি করছো জান?”
প্রাণেশা থমথমে গলায় বলল,
“শপিংয়ে এসেছি একটু। আপনি কি করছেন? কোথায় আপনি?”
স্নিগ্ধ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“কোথায় আবার থাকবো বাড়িতে। আর তুমি যে শপিংয়ে গেলে বললে না কেনো? সাথে কে গিয়েছে?”
“আমার বান্ধবী আছে। আর আপনি কোথায় ভালো করে বলুন তো?”
“আমি বাড়িতেই কেনো? কি হয়েছে?”
“কিছু হয়নি। রাখছি। বাড়িতে গিয়ে কল করবো।”
“ঠিক আছে। আর গাড়ি নিয়ে গিয়েছো?”
“হুমম।”
“ঠিক আছে রাখছি।”
প্রাণেশা কল কেটে দিলো। কিন্তু মনকে শান্তনা দিতে পারছে না। লাবিবা ওকে বোঝাতে বোঝাতে অন্যদিকে নিয়ে গেলো।
প্রাণেশা আধঘন্টার মধ্যে বাড়িতে ফিরে এসে ড্রইং রুমে বসলো। তারপরই ভিডিও কল দিলো স্নিগ্ধকে। স্নিগ্ধও ড্রইং রুমে বসেই কলটা রিসিভ করলো। প্রাণেশা বলল,
“কি করছেন?”
“কিছুনা। কফি খাচ্ছি।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর পরনের জামাটা দেখতে বলল,
“আপনাকে দেখা যাচ্ছে না কেনো? সোজা করে ধরুন।”
স্নিগ্ধ এখন পড়েছে কালো টিশার্ট আর তখন লিফটের ছেলেটা পড়েছিলো সাদা শার্ট।
ওদিকে স্নিগ্ধ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“কি হয়েছে বলোতো।”
প্রাণেশা বলল,
“শপিংয়ে গিয়েছিলাম। তখন আপনার মতো কাউকে দেখেছি।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“ও বুঝেছি। নিশ্চই পাশে কোনো মেয়ে দেখেছো, একসাথে ঘুরতে?”
“উহু। তা দেখিনি। আচ্ছা তাহলে থাকুন। পরে কথা হবে, ফ্রেশ হবো।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“তোমার মুড সুইং বুঝিনা। কখন কি বলো আল্লাহ ভালো জানে।”
প্রাণেশা উপরে চলে এলো। সুবহা এসে ওরই ঘরে বসেছিলো। প্রাণেশা সুবহাকে দেখে শয়তানি করে বলল,
“ভাবি, ভাইয়াকে রেখে এখানে কি করছেন?”
সুবহা বালিশ ছুড়ে মেরে বলল,
“তু্ইও না।”
প্রাণেশা বিছানায় ব্যাগগুলো রেখে চেঞ্জ করতে ঢুকলো ওয়াশরুমে। চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে এসে সুবহার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২১
“এখানে কেনো?”
“ওই ভালো লাগছিলো না একা একা।”
“ওহ, ভাইয়া কোথায়?”
“ঘুমিয়ে আছে।”
প্রাণেশা সুবহার পাশে বসে তখনকার কথা সব বলল।
