তোমার আমার গল্প পর্ব ৫১
noorayn
খান বাড়ির সকল সদস্যই এখন সিটি হসপিটালে অবস্থান করছে। বাড়ির প্রতিটি মানুষের অবস্থা বেশ শোচনীয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাসি-খুনসুটিতে ভরা একটা পরিবার কীভাবে এমন আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেলো! কেউ যেন এটা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
ইজাজ খান একটু আগেই ছুটে এসেছেন হসপিটালে।
নীলা বিলাপ ধরে কাঁদছে।
আয়শা যেন পাথর বনে গেছেন ; তার চোখ দুটো স্থির, মুখে কোনো কথা নেই। পাশে বসে আলিশা মাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে তার হেঁচকি উঠে গেছে তবুও কান্না থামছে না তার।
আজ সকালেও তো পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করেছে। হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি ; সবকিছু কত স্বাভাবিক ছিলো। অথচ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে।
আলিশার কান্নার মাঝেই হসপিটালের করিডোর দিয়ে ডোরাকে কোলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো আরহাম।
এসেই উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করলো –
“গাড়ি কীভাবে এক্সিডেন্ট করেছে?”
ইজাজ সাহেব ছেলের দিকে এক পলক তাকালেন। নিজের ভেজা চোখজোড়া লুকিয়ে কোনোমতে জবাব দিলেন,
“ব্রেক ফেইল করেছিলো।”
“গাড়িতে কে ছিল বাবা?”
“নিয়াজ আর আরশাদ… দুজনের অবস্থাই বেশ আশঙ্কাজনক।”
বলেই শার্টের হাতায় চোখ মুছে নিলেন ইজাজ খান।
–বাবার মুখ থেকে কথাটা শুনে আরহাম চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিলো। সে ভেবেছিল, হয়তো খুব গুরুতর কোনো এক্সিডেন্ট হয়নি। ফোনে শুধু জানানো হয়েছে – নিয়াজ খানের গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। কিন্তু সে কোনোভাবেই ভাবতে পারেনি দুর্ঘটনাটা এতটা ভয়াবহ হবে ; চোখজোড়া টলটল করে উঠলো তার। দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলো।
একবার চারপাশে তাকাতেই একটু দূরে আলিশাকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা গেলো। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ডোরাকে কোলে নিয়েই এগিয়ে আলিশাকে বুকে টেনে নিয়ে নরম গলায় শুধালো –
“ডোন্ট ক্রাই, জান।”
“আ… আরহাম… বাবা… ভাই…”
কান্নার চাপে কথাগুলো ঠিকমতো বের হচ্ছেনা আলিশার মুখ থেকে।
আরহাম তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কিছু হবে না। ব্রো আর ছোট বাবা দুজনেই সুস্থ হয়ে ফিরবে।”
আলিশা চোখ মুছতে মুছতে আরহামের দিকে তাকালো।
“ডাক্তার বলেছেন… দুজনের কারো অবস্থা ভালো না। যেকোনো কিছু হতে পারে।”
আরহামের কাছে এর জবাব নেই ; শুধু আলিশার মাথায় হাত রেখে চুপ করে রইলো।
এদিকে প্রায় তিন ঘণ্টা পর মায়ের আওয়াজ কানে যেতেই ডোরা বাবার বুক থেকে মাথা তুলে তাকালো।
সে আসার সময় গাড়িতে আরহামের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। কিন্তু মায়ের কণ্ঠ কানে আসতে না আসতেই যেন তার সব ঘুম উধাও!
পিটপিট করে চোখ খুলে সামনে তাকাতেই মাকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ছোট দুটো হাত বাড়িয়ে দিলো।
“মাম্মা… কুলে দাই।”
আরহাম একবার ছেলের দিকে তাকালো।
আলিশা কান্নায় এতটাই ভেঙে পড়েছে যে ডোরার কথা তার কান পর্যন্তই পৌঁছায় নি।
মাম্মা নিচ্ছেনা দেখে ডোরা আবারও ডেকে উঠলো –
“মাম… কুলে নাউ। দোরা মিচ্চি ইউ।”
আলিশা তখনও মুখে হাত দিয়ে কেঁদে চলেছে।
আরহাম এক পলক ছেলের দিকে তাকিয়ে তাকে আবারও নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।
“মাম্মার কাছে যেতে হবে না এখন। বাবার কাছে থাক।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো। না, সে যাবেই।
“নান… নাই। দোরা মাম্মা কুলে দাই।”
আরহাম তার কথায় পাত্তা না দিয়ে ছোট মুখখানা নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে তাকে ঘুম পাড়াতে চাইছে।
কিন্তু ডোরা এখন ঘুমাবে না ; তার শুধু মাকে চাই…
সে আবারও মুখ তুলে বললো –
“তাইত বাবা, তাইত! দোরা গুমি নাই নাই… দোরা গুমি বেড়ু গেচে।”
আরহাম তখনও তাকে মায়ের কোলে দিচ্ছে না দেখে ডোরা এবার হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে। বারবার ঝাঁপ দিয়ে আলিশার কোলে যেতে চাইছে সে।
তার এমন ছটফটানিতে আরহামের তাকে সামলাতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে।
শেষমেশ একটু বিরক্ত হয়ে ধমক দিয়ে উঠলো –
“ডোরা! স্টপ ইট…বলেছি না, বাবার কাছে থাক। মাম্মা এখন নিতে পারবে না।”
সবসময় বাবার আদরে থাকা ডোরা হঠাৎ’ই বাবার ধমক খেয়ে গলা উঁচিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।
তার কান্নায় আশেপাশের নার্স আর ওয়ার্ডবয়রাও একবার ফিরে তাকালো।
আরহাম কোনোভাবেই তাকে শান্ত করতে পারছে না।
এদিকে, এতক্ষণ নিজের কান্নায় মগ্ন থাকা আলিশার যেন হঠাৎ ধ্যান ভাঙলো ছেলের কান্নায়।
পাশ তাকিয়ে দেখলো, ডোরা কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ লাল করে ফেলেছে।
সে চটজলদি নিজের চোখের পানি মুছে ডোরাকে কোলে তুলে নিলো।
মায়ের বুকে যেতেই ডোরা ফুঁপিয়ে উঠলো ; বাবার ওপর তার ভীষণ রাগ হয়েছে। মায়ের কাছে গিয়ে ছোট আঙুল আরহামের দিকে তাক করে সঙ্গে সঙ্গে নালিশ জানাতে শুরু করলো – “বাবা পুচা… দোরাকে তাইত দিচে।”
আলিশা ছেলের কপালে চুমু খেয়ে শুধালো –
“বাবাকে আমরা তাইত দিয়ে দিবো, ঠিক আছে?”
“উম উম… বাবা তাইত… দোরা গুট বয়।”
আলিশা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে রাখলা।
মিনিট দুয়েক যেতে না যেতেই ডোরা আবারও মুখ তুলে আবদার জুড়ে বসলো –
“দোরা ‘ইয়াম ইয়াম’ কাই।”
–ডোরার ‘ইয়াম ইয়াম’ মানেই সে মায়ের কাছ থেকে খেতে চাইছে।
আলিশা ছেলের কথায় কোনো সাড়া দিলো না। তার এখন এসবের দিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থাও নেই।
–এখনো মাম্মা তুত্ত দিচ্ছেনা দেখে ডোরা এবার ঠোঁট ফুলিয়ে ফেললো।
“ইয়াম ইয়াম কাই… মাম ইয়াম কাই কাই।”
–দুই মাস আগেই আলিশা ডোরার ব্রেস্টফিডিং বন্ধ করেছে। তবে, মাঝেমধ্যে হঠাৎ দুধের জন্য বায়না ধরে বসে ডোরা। তখন না দিলে কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে ফেলে। এখন তো হসপিটালে ফিডার বা ফর্মুলা দুধেরও ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
আরহাম ছেলের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আলিশাকে বললো – “ওর বোধহয় ক্ষিদে পেয়েছে। তোকে ছাড়া বাইরে কিছু খায়নি। একটু খাইয়ে দে।”
“অভ্যাস হয়ে যাবে আবার।”
“সবসময় তো দেস না। আজকে একবার দিলে কিছু হবে না।”
“এখানে কীভাবে দেবো?”
“উপরের ফ্লোরে ব্রেস্টফিডিং রুম আছে। সেখানে চল।”
আলিশা আর কোনো কথা না বলে ডোরাকে সমেত আরহামের পিছু পিছু উপরের ফ্লোরে চলে গেলো।
–একটুপর, আরহাম তাদের উপরে রেখে নিচে ফিরে এলো।
এদিকে, নীলার কান্নায় অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছে। তার আবার অ্যাজমাও রয়েছে ; তাই অতিরিক্ত কান্নার কারণে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিলো না দেখে আরহাম নার্সকে ডেকে পরিস্থিতিটা সামলাতে বললো। পরে ডাক্তারের পরামর্শে নীলাকে শান্ত করার জন্য ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে পাশের ক্যাবিনে বিশ্রামের জন্য রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, আয়শার হালাত যেন বোঝাই যাচ্ছে না।
তিনি কেমন বিমূঢ় হয়ে বসে আছেন। চোখের সামনে এত বড় একটা বিপর্যয় ঘটেও যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।
–শাইনা একটু পরপর আঁচলে চোখ মুছে চলেছেন।
হসপিটালের অন্য পাশে ইজাজ খান ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছেন।
“প্রয়োজন হলে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাবো। যত দ্রুত সম্ভব যা যা করা দরকার করুন।”
ডাক্তার গম্ভীর মুখে কিছু একটা বোঝাচ্ছেন আর ইজাজ খান তা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। তার চোখেমুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
একদিকে ভাই আর ছেলে সমতুল্য মেয়ের জামাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তো অন্যদিকে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।
রাত প্রায় আটটা…
দেখতে দেখতে কেটে গেছে কয়েক ঘণ্টা। অথচ সময় যেন এক জায়গাতেই থমকে আছে খান পরিবারের জন্য।
–অপারেশন শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই ; কিন্তু নিয়াজ খান কিংবা আরশাদের অবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। দুজনকেই এখন আন্ডার অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।
–ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন, নার্সরা ছুটে বেড়াচ্ছেন কিন্তু তবুও পরিবারের কাউকেই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না তারা।
–নিয়াজ খানের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। দুর্ঘটনার ধাক্কায় মাথার ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে আর সেই রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনতেই চিকিৎসকদের সবচেয়ে বেশি বেগ পোহাতে হচ্ছে। জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও তার অবস্থা এখনো সংকটমুক্ত বলা যাচ্ছেনা।
অন্যদিকে, আরশাদের অবস্থাও ভালো নয়। সে গাড়ি ড্রাইভ করছিলো তাই দুর্ঘটনার সময় গাড়ির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার একটি পা গুরুতরভাবে ভেঙে গেছে…একই সঙ্গে গাড়ির ভাঙা কাচের কয়েকটি টুকরো তার শরীরের বিভিন্ন অর্গানকে বিশেষ করে কিডনিকে বেশ আঘাত করেছে। তাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলেও পরিস্থিতি যেন নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে।
–দুজনের অপারেশন সাকসেসফুল হলেও কাউকেই এখনো সংকটমুক্ত বলা যাচ্ছেনা। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, নিয়াজ খান আর আরশাদের বডি রেসপন্স করছেনা। তাই চব্বিশ ঘন্টার আগে কিছুই বলা যাচ্ছেনা।
অন্যদিকে, হসপিটালের বাইরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গেটের সামনে একের পর এক ক্যামেরা, সাংবাদিকদের ভিড়। মাইক্রোফোন হাতে রিপোর্টাররা লাইভে দাঁড়িয়ে আছে। খান ইন্ডাস্ট্রির মালিক নিয়াজ খান এবং তার পুত্র আরশাদ খান ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত…
গাড়ির ব্রেক ফেইল। এটা কি নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রহস্যা?
–কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কেউ বলছে, এটা নিছক দুর্ঘটনা।
আবার কেউ বলছে ষড়যন্ত্র।
আসলে কি হয়েছিলো তা এখনো কেউ জানেনা।
কারণ তদন্ত শুরুই হয়নি পুরোপুরি।
আর ঠিক এই কারণেই ইজাজ খান কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নন।
পুরো হসপিটাল এরিয়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। গার্ডস মোতায়েনের পাশাপাশি সরকারি প্রোটোকল অনুযায়ী অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
নিয়াজ খান এবং আরশাদ খানকে যে ফ্লোরে রাখা হয়েছে, সেটি পুরোটাই খান পরিবারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া সেখানে কারও প্রবেশের সুযোগ নেই।
এমনকি হসপিটালের সাধারণ ওয়ার্ক এমপ্লয়িদেরও ওইদিকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
–হসপিটালের একটি নিরিবিলি কক্ষে বসে ইজাজ খান ফোনে কথা বলছেন পুলিশ কমিশনার রফিকুল হাসানের সঙ্গে।
“কমিশনার সাহেব, আমি চাই বিষয়টা যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত করা হোক।”
ওপাশ থেকে রফিকুল হাসানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“মিস্টার খান, আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। গাড়িটাও পরীক্ষা করা হবে। ব্রেক ফেইলের বিষয়টা নিশ্চিতভাবে যাচাই করা হবে।”
“আমি শুধু একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চাই, এটা যেন কোনোভাবেই ধামাচাপা না পড়ে। দুর্ঘটনা হয়ে থাকলেও তা কেন আর কিভাবে হয়েছে তার সম্পুর্ন ডিটেইলস চাই আমার। আর যদি কোনোভাবে ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে তবে অপরাধিদের দ্রুত আমি আমার সামনে উপস্থিত চাই।”
“বুঝতে পারছি। আপনার পরিবার এখন হাসপাতালে আছে। আপনি চিকিৎসার দিকে মন দিন। তদন্তের বিষয়টা আমরা দেখছি।”
ইজাজ খান ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
তার চোখের সামনে তখনও ভেসে উঠছে আদরের ছোট ভাই আর আরশাদের চঞ্চল মুখখানা।
–আরহামের ফোনে একের পর এক কল এসে চলেছে।
প্রথমে সে কয়েকটা কল ধরেছিলো কিন্তু ওপাশের মানুষের প্রশ্ন শুনে তার ধৈর্যের বাধ যেন ভেঙে গিয়েছে।
আরহামের ফোনের স্ক্রিনে আবারও একটা কল ভেসে উঠলো। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা সম্পূর্ণ বন্ধ করে ফেললো।
তারপর নিজের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট আনিসের দিকে তাকিয়ে বললো –
“মিডিয়ার বিষয়টা তুমি হ্যান্ডেল করো, আমার কাছে যেন আর কোনো কল না আসে।”
“চিন্তা করবেন না, বস। আমি বিষয়টা দেখছি।”
আজ রাতে হসপিটালে থাকবে আয়শা, শাইনা আর আরহাম।
আলিশা অনেক করে থাকতে চেয়েছিলো ; বারবার বলেছে, কেঁদেছে, অনুরোধ করেছে কিন্তু আরহাম অনুমতি দেয়নি। বাচ্চা নিয়ে হসপিটালে রাত কাটানো তার জন্য কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। প্রথমে শান্তভাবে বুঝিয়েছে, বারবার বলেছে বাড়ি ফিরে যেতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলিশা যখন কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলো না তখন বাধ্য হয়েই একটু ধমকের সুরে তাকে বাড়ি পাঠাতে হয়েছে।
আরহাম কথা দিয়েছে, সকাল হলেই আবার নিজে আলিশাকে এখানে নিয়ে আসবে।
–ইজাজ খানকে সঙ্গে নিয়ে আলিশা হাসপাতালের পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মেইন গেটজুড়ে এখনো মিডিয়ার কোলাহল। এক্সিডেন্টের মতো দুঃসংবাদকে পর্যন্ত তারা লাইমলাইট বানিয়ে সত্য/মিথ্যা না জেনে নিউজ বানাতে ছাড়েনি। সেখানে ডোরার ব্যাপারটা এখনো সবার অজানা। এই অবস্থায় ভুল করেও যদি ডোরা মিডিয়ার কারও নজরে পড়ে যায় তাহলে পরিস্থিতি সামলানো তখন হাতের বাইরে চলে যাবে তাই আরহাম তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।
–ডোরা সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো, সারাদিনে ঠিকমতো কিছু খাওয়া হয়নি তার, ফ্রেশও হয়নি।
মায়ের বুকের ওপর কেমন নেতিয়ে পড়েছিলো তার ছোট্ট ছানাটা। আরহাম আর যাই করুক তবে ডোরাকে নিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ করে না তাই একপ্রকার ধমকা-ধমকি করেই আলিশাকে পাঠিয়ে দিয়েছে সে।
–শাইনা মেয়ের ক্যাবিনে বসে আছেন। নীলার শিওরে বসে মেয়েটার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন – তার মেয়েটার জীবনেই কেন একের পর এক এত কিছু ঘটছে?
আর অন্যদিকে আয়শা এখনো করিডোরের সিটিং এরিয়ায় বসে আছেন ; সকাল থেকে একইভাবে।
নড়েননি, ঠিকমতো কিছু খাননি।
–আরহাম হাতে একটা জুস আর কেক নিয়ে ধীরে ধীরে তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো।
“ছোট মা?”
–কোনো জবাব নেই।
“ছোট মা? তোমার ছেলের ডাক শুনবে না?”
এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন আয়শা।
“কিছু খেয়ে নাও, প্লিজ। এভাবে থাকলে তো তুমিও অসুস্থ হয়ে যাবে। ছোট বাবা আর আরশাদ ব্রো হুশে আসলে কিন্তু তোমাকে এমন অবস্থায় দেখলে অনেক রাগ করবে।”
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন এতক্ষণ শক্ত করে ধরে রাখা বাঁধটা ভেঙে গেলো ; আচমকাই হুহু কেঁদে উঠলেন আয়শা।
“এটা কী হয়ে গেল, বাবা? আমার স্বামী… আমার আরশাদ… আমি কীভাবে নিজেকে ঠিক রাখবো?”
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা কেঁপে উঠছে। সারাদিনের ভয়, উৎকণ্ঠা আর অসহায়ত্ব যেন একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে চোখের পানির সাথে…
আরহাম উঠে তার পাশের সিটে বসে নিজের ছোট মায়ের মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে আগলে ধরলো।
“ছোট বাবা আর আরশাদ ব্রোর কিছু হবে না। আমরা আছি না?”
আয়শা কাঁদতে কাঁদতেই বললেন,
“ডাক্তার বলেছে অবস্থা ভালো না… যেকোনো মুহূর্তে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে।”
আরহাম চুপ করে রইলো কয়েক সেকেন্ড। নিজের বুকের ভেতরেও যে ভয়টা তীব্র হয়ে উঠছে সেটা কাউকে বুঝতে দিলোনা সে।
“ডাক্তাররা কত কিছুই না বলে, তাই না? আমরা খুব জলদিই ব্রো আর ছোট বাবাকে সিঙ্গাপুরে শিফট করে দেবো। ওখানকার উন্নত চিকিৎসায় দুজনেই খুব জলদি সুস্থ হয়ে যাবে।”
“সুস্থ হবে তো?”
“হুম।”
“আমার স্বামীর হাতটা আবার আমার মাথায় থাকবে তো?”
আরহামের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো।
আয়শা আবার বললেন,
“আমার বাচ্চাটা… আমার বুকে ফিরে আসবে তো?”
সদা শক্ত থাকা, সবকিছু সামলে নেওয়া সেই আয়শা আজ যেন বিপদের কাছে একেবারে অসহায় এক নারী।
“অবশ্যই সুস্থ হবে। আমরা সবাই আবার একসাথে হবো।”
দৃঢ় গলায় জবাব দিলো আরহাম।
“সত্যি?”
“হুম। এখন চটজলদি এই কেকটা খেয়ে নাও। তারপর নীলার ক্যাবিনে গিয়ে একটু রেস্ট নেবে।”
“নীলা কেমন আছে এখন?”
“আগের চেয়ে বেটার। এখন ঘুমাচ্ছে।”
এরপর আরহাম নিজ হাতে আয়শাকে জুস আর কেক খাইয়ে দিলো।
–ছোট মা কিছুটা খেয়েছেন নিশ্চিত হওয়ার পরই আরহাম আবার উঠে দাঁড়ালো। তার গন্তব্য এখন ক্যান্টিন ; শাইনা আর নীলার জন্য খাবার নিতে হবে।
–নীলার ঘুমের ওষুধের প্রভাব কিছুক্ষণ পর কমে আসবে। ঘুম থেকে উঠলে তাকে কিছু খাওয়াতে হবে। শাইনাকেও ওষুধ খেতে হবে, তার জন্যও খাবার প্রয়োজন।
একজনের পর একজনের খেয়াল রাখতে রাখতে আরহাম ছুটে বেড়াচ্ছে হাসপাতালের করিডোরে।
কিন্তু এতসব মানুষের খেয়াল রাখতে গিয়ে সে যেন ভুলে গিয়েছে যে সে নিজেও আজ সারাদিন না খাওয়া।
রাত প্রায় একটা বাজে…
নিয়াজ খান আর আরশাদকে এখনো আন্ডার অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোনো পর্যন্ত চিকিৎসকরা নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারছেন না। প্রতিটি মুহূর্ত যেন অপেক্ষার সাথে কাটছে একটা ভালো খবরের আশায়।
–কিছুক্ষণ আগে ঘুম ভেঙে নীলা বেশ কান্নাকাটি করছিলো। আয়শা আর শাইনা দুজন মিলে অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করেছে। আয়শার নিজের শরীরটাও ততক্ষণে ভেঙে পড়েছে। সারাদিনের দুশ্চিন্তা আর কান্নার ধকল সামলাতে না পেরে শরীর যেন আর সায় দিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত শাইনা অনেকটা জোর করেই তাকে পাশের বেডে শুইয়ে দিয়েছে।
–পুরো ফ্লোরটাই বুক করা হয়েছে তাই আরহামও পাশের একটি ক্যাবিনে গিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে পড়লো।
সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ দুটো ভার হয়ে আসছিলো তার।
চোখে ঘুম থাকলেও সে ঘুমাতে পারেনি কারন আরহাম জানে আলিশা এখনো ঘুমায়নি। নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করছে…
সব ভেবে আরহাম কল লাগালো আলিশার ফোনে…
প্রথমবার কল কেটে গেলো, দ্বিতীয়বারও…
তৃতীয়বারে কলটা রিসিভ হলো।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো চাপা ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।
“ঘুমাস নি কেন?”
“ঘুম আসছে না।”
“কেন?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আলিশা খুব অসহায় কন্ঠে বললো,
“আমি বাবা আর ভাইয়ের কাছে যাবো।”
“সকালে এসে নিয়ে আসবো আমি।”
“এখনই যাবো।”
“ডোরা কার কাছে থাকবে?”
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো।
আলিশার কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
সে একবার নিজের বুকে লেপ্টে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট ডোরার দিকে তাকালো।
“ডোরা ঘুমিয়েছে?” আরহাম।
“একটু আগেই ঘুমালো। তোমাকে খুজছিল বারবার। বলেছে তোমার বুকে ঘুমাবে। অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছি।”
কথাটা শুনে আরহাম চোখ বন্ধ করে ফেললো।
ডোরার জন্মের পর থেকে সে আগের তুলনায় অনেক কম রাত বাইরে থাকে। বাচ্চাটা বাবার বুক ছাড়া ঘুমাতে চায় না। আজও নিশ্চয়ই বাবাকে খুজেছে।
আরহাম ধীরে বললো –
“ওর ক্ষিদে পেলে রাতে উঠে…তুই আজকে….”
কথা শেষ করার আগেই আলিশা বলে উঠলো –
“আমি দেখে নেবো। আজ রাতে আমার ঘুম হবে না।”
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলো –
“লিশা… এমন করলে কিভাবে হবে? ছোট মাকে সামলাতে হবে তোকে। তুই যদি এমন ভেঙে পড়িস, উনাকে কে দেখবে?”
কথাটা শুনেই আলিশা আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
“আমাকে কে দেখবে? আমিও তো ঠিক নেই! আমার বাবা আর ভাই জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে…”
“তোর জন্য আমি আছি। আমি দেখবো তোকে। এখন তোকে আর আমাকে মিলে পুরো পরিবারটাকে
সামলে রাখতে হবে।”
“আমি পারবো না… বাবা… ভাই…”
“পারতে হবে, লিশা। ইউ আর মাই স্ট্রং ওয়াইফি, রাইট?”
–আলিশার কোনো জবাব নেই।
“ছোট বাবা আর ব্রো হসপিটালে অ্যাডমিট। বাবা তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত। নীলা একটু পরপর পাগলামি করছে আর মা ওকে সামলাচ্ছে। ছোট মা যেন একেবারে পাথর হয়ে গেছে। এখন সবার আমাদেরকে প্রয়োজন।”
একটু থেমে আরহাম আবারও বললো-
“তোকে শক্ত হতে হবে। সবার খেয়াল রাখতে হবে। আমি তোকে ছাড়া একা কিছুই পারবো না। বল, পারবি না?”
কান্নায় ভেঙে যাওয়া গলা থেকে ক্ষীণ একটা উত্তর এলো,
“পা…পারবো।”
“গুড। এখন কান্না থামা। কিছু খেয়েছিস?”
“না…”
“কেন?”
“আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না, আরহাম।”
“আমাকে ভিডিও কলে রেখে খাওয়া শুরু করবি। নয়তো সকালে তোকে হাসপাতালে আনবো না।”
“না, না… আমি খাবো।”
“ওকে। ভিডিও কল দিচ্ছি।”
কথা শেষ করে আরহাম ভিডিও কল দিলো।
আলিশা রিসিভ করতেই এক পলক তাকালো সে।
কেঁদে কেঁদে মেয়েটার চোখ-মুখ ফুলে গেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। চুলগুলোও এলোমেলো।
আরহামের দৃষ্টি এবার গিয়ে থামলো তার বুকে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট ডোরার ওপর।
“ডোরা কিছু খেয়েছে?”
“হুম। সুজি খাইয়েছি।”
“তুই ওর পাশে ফোনটা রেখে কিচেনে যা। খাবার নিয়ে আয়।”
আলিশা উঠতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেলো।
“তুমি খেয়েছ?”
প্রশ্নটা শুনে আরহাম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো।
সারাদিন এত কিছুর মধ্যে নিজের খাওয়ার কথাটাই তার মনে ছিলো না।
তবুও এখন আপাতত আলিশাকে শান্ত রাখতে মিথ্যা বললো,
“হুম, খেয়েছি।”
“মিথ্যা বলবে না। আমি জানি তুমি খাওনি।”
–আরহাম চুপ।
“উঠে খেয়ে নাও।”
“ইচ্ছে করছে না।”
“তুমি না খেলে আমিও খাবো না।”
আরহাম এবার অসহায় মুখে বললো –
“এত রাতে হাসপাতালে কী পাবো?”
“ড্রাইভার দিয়ে রাতের জন্য খাবার পাঠিয়েছিলাম। সেখানে দেখো। তোমার জন্য কর্ন স্যুপ থাকবে।”
“তুই বানিয়েছিস?”
“না… কুক বানিয়েছে।”
–কোনো কথা না বলে আরহাম উঠে দাঁড়ালো।
পাশের ক্যাবিনে রাখা টিফিন ক্যারিয়ারটা খুলে কর্ন সুপের বাটিটা বের করে নিজের ক্যাবিনে ফিরে এলো।
এতক্ষণ খাবারের কথা মাথাতেই আসেনি।
কিন্তু বাটিটা সামনে আসতেই যেন হঠাৎ করে ক্ষুধাটা টের পেলো সে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি তার।
এদিকে, আলিশাও কিচেনে গিয়ে একটা প্লেটে কিছু ফল কেটে নিয়ে এলো।
আরহামের কড়া নজরদারিতে কোনোমতে তিন পিস আপেল খেতে পেরেছে সে। আর কিছুতেই মুখে তুলতে পারলো না।
“আর একটু খা।”
“পারছি না।”
“ঠিক আছে। আপাতত এটুকুই থাক।”
ওপাশে আলিশা ফল খাওয়ার পর আরহামও অল্প একটু কর্ন স্যুপ খেয়ে নিলো।
খাওয়ার পর্ব শেষ হতে না হতেই আলিশা আবার বায়না শুরু করলো – “আমি হসপিটালে যাবো।”
“আবার শুরু করলি?”
“প্লিজ, আরহাম। আমি বাবাকে আর ভাইকে দেখতে চাই।”
“জেদ করবি না, লিশা। বলেছি না, সকালে নিয়ে আসবো?”
“প্লিজ…”
“রাত হয়েছে। এখন ঘুমিয়ে পড়।”
–আলিশা চুপ করে রইলো।”
আরহাম এবার নরম গলায় বললো –
“আর ডোরার দিকে খেয়াল রাখবি। ও মাঝরাতে উঠে। নিজের সঙ্গে আমার ছানাটারও খেয়াল রাখবি। ওর যেন কোনো অসুবিধা না হয়।”
–আজ সকালেও যে পরিবারটা হাসি-আনন্দে ভরপুর ছিলো, চোখের পলকেই যেন সেই পরিবারটার ওপর নেমে এসেছে এক অদৃশ্য স্তব্ধতা।
–মেহরোজা আক্তারকে এখনো জানানো হয়নি নিয়াজ খান আর আরশাদের ব্যাপারে।
তিনি এমনিতেই অসুস্থ। তার ওপর এই খারাপ খবরটা জানতে পারলে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। তাই যতটা সম্ভব উনাকে সবকিছু থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। ফোনটা তার কাছ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে, টিভিও চালু করতে দেওয়া হচ্ছে না ; কোনোভাবেই যেন খবরটা তার কানে না পৌঁছায়।
কিন্তু বাড়ি আজ অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। সেটা তার চোখ এড়ায়নি। সকাল থেকেই একের পর এক প্রশ্ন করছিলেন মিনুকে।
মিনু যখন একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলো ঠিক তখনই ইজাজ খান এসে উপস্থিত হলেন।
মায়ের পাশে বসে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেন তিনি।
তারপর নানা কথায় মাকে বুঝিয়ে, ভুলিয়ে অন্য প্রসঙ্গে নিয়ে গেলেন।
“সবাই একটু বাইরে গেছে মা। আপনিই বা এত চিন্তা করছেন কেন? সবাই তো ঠিক আছে।”
মেহরোজা আক্তার কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“কেমন জানি আজ মনটা ভালো লাগছে না রে…”
ইজাজ খান মৃদু হেসে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“শরীর খারাপ বলেই এমন লাগছে। আপনি বরং একটু বিশ্রাম নেন আম্মা।”
কিছুক্ষণ পর সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছেন মেহরোজা আক্তার।
তবে আজকের ঘুমটাও যেন অন্যদিনের মতো শান্ত ছিলোনা। মায়ের মন বলে কথা।
কিছু না জেনেও হয়তো কোনো অদৃশ্য অনুভূতি তার অন্তরকে বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিলো যে তার সন্তান আর নাতি আজ বিপদের মধ্যে আছে।
একটু আগেই তিনি ঘুমাতে গেছেন।
–ঘুমানোর আগে দীর্ঘসময় নামাজে বসেছিলেন তিনি।
হাত তুলে একে একে পরিবারের সবার জন্য দোয়া করেছেন।
খান বাড়ির হাসি-খুশি পরিবারটার ওপর যেন কারও নজর লেগেছে।
একটার পর একটা বিপদ এসে আঘাত করছে। সুখের দিনগুলো যেন হঠাৎ করেই কোথাও হারিয়ে গেছে। কতটা সময় পেরিয়ে গেলো অথচ এই দুঃসময় যেন কাটতেই চাইছে না।
একদিকে নিয়াজ খান আর আরশাদ এখনো আইসিইউতে। চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়েও তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অথচ প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
এরই মধ্যে যেন আরেকটি দুঃসংবাদ এসে আছড়ে পড়লো খান পরিবারের ওপর।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৫০
–ডোরা…ছোট্ট ডোরা এন.আই.সিউতে অ্যাডমিট। অবস্থা বেগতিক। অনেকটা রক্তক্ষরণ হয়েছে তার নাজুক শরীরটায়। এতটুক একটা শরীর আজ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। কাল রাতেও যে চঞ্চল বাচ্চাটা মায়ের বুকের সঙ্গে লেপ্টে ঘুমিয়ে ছিলো ; আজ সেই ছোট্ট ডোরাই নিথর হয়ে পড়ে আছে এন.আই.সিউর ছোট্ট বিছানায়। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। শরীরজুড়ে চিকিৎসার নানান পদ্ধতি….
