তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৮
আশফিয়া হিয়া
সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে দুটো বছর অতিক্রম হয়েছে। সকলের জীবনই বেশ ভালোভাবেই কাটছে। আরু বর্তমানে ২৩ বছরের যুবতী। অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে সে। রুদ্ধর সঙ্গে সংসার জীবনটার বেশ ভালোই কাটছে। রুদ্ধর প্রতি তার ভালোবাসা এক বিন্দুও কমেনি বরং ভালোবাসা দিন দিন বেরেই চলেছে। রুদ্ধকে দেখলেই সেই আগের মতো মুগ্ধতায় কাজ করে। রুদ্ধর ক্ষেএেও তাই আরুর প্রতি ভালোবাসা তার দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই পিচ্চি মেয়েটা সে এতটা ভালোবাসবে কোনোদিন ভাবতেই পারেনি। আরুকে ছাড়া সে নিজের জীবনটুকু ভাবতেই পারবে না, মাঝে মাঝে মনে হয় এই মেয়েটা তার জীবনে এভাবে না এলে কি হতো।
আরু ড্রেসিং টেবেলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল মুছে চলেছে। পানির ঝাপটায় রুদ্ধর চোখে সদ্য নেমে আসা ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। বুকের ওপরে ভার অনুভব না করায় চোখ মেনে তাকাল। পাশে তাকাতেই চোখ গেল আরু দিকে যে কিনা নিজের কাজে ব্যস্ত। রুদ্ধ একবার দেয়াল ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে দেখল, ঘড়িতে সবে ভোর পাঁচটা বাজে। রুদ্ধ বিছানা থেকে নেমে আরুকে পেছন থেকে শক্ত করে জরিয়ে ধরল। আরু একটুও বিচলিত হলো না, কারণ সময়ে অসময়ে এসব আক্রমণে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। রুদ্ধ তার ভেজা চুলে মুখ ডুবিয়ে জোড়ে শ্বাস টেনে বলল,
– ‘ আজ হঠাৎ শাড়ি?’
আরু রুদ্ধর হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
– ‘ এমনি ইচ্ছে হলো। জান ফ্রেশ হয়ে আসুন এক সঙ্গে নামাজ পড়বো।’
– ‘ ওকে।’
রুদ্ধ তাকে ছেড়ে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। দুজনে এক সঙ্গে নামাজ আদায় করল। আরু বেডের দিকে এগিয়ে যেতে নিলে রুদ্ধ তাকে তৎক্ষনাত কোলে তুলে নিল। আরু হকচকিয়ে বলল,
– ‘ কি হলো ঘুমাবো না? আপনার জ্বালায় সারারাত ঘুমাতে পারিনি এখন কিন্তু আমি ঘুমাবো একদম উল্টো -পাল্টা কাজ করবে না। ‘
রুদ্ধ তাকে কলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
– ‘আপাতত উল্টো – পাল্টা কিছু করার মুডে নেই। আগে ভোর বিলাষ হবে এরপর যত ইচ্ছে ঘুমাবি।’
– ‘ ভোর বিলাশ?’
– ‘ হুহ।’
রুদ্ধ তাকে নিয়ে কোলে নিয়েই সোজা কিচেনে চলে এল। এ বাড়িতে সকলে ঘুম থেকে ওঠে সাতটায় তাই নিচে এখন কারোরই উপস্থিতি নেই। রুদ্ধ আরুকে কিচেন কাউন্টারে বসিয়ে দিয়ে নিজের মতো কফি বানাতে লাগল। আরু এক দৃষ্টিতে রুদ্ধর দিকে চেয়ে আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে আবারও নতুন করে রুদ্ধর প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। রুদ্ধ তার দৃষ্টি দেখে বলল,
– ‘ আমি আপাতত মুডে নেই আমার দিকে এমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকে সিগনাল দিয়ে কোনো লাভ নেই। ‘
আরু প্রথমে রুদ্ধর কথাটা বুঝতে পারেনি, কথাটা বোধগম্য হতেই হাতের কাছে যা পেল সেটাই রুদ্ধর নিকট ছুঁড়ে মারল। রুদ্ধও সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটা ক্যাচ করে নিল। আরু চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্ধ মিটিমিটি হাসছে আর কফি বানাচ্ছে। কফি বানানো শেষ হতেই সে আরুকে নিয়ে ছাদে চলে এল। আরুকে দোলনায় বসিয়ে নিজেও আরুর পাশে বসল। আরু রুদ্ধর কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে কফি খেতে লাগল। রুদ্ধ তার পিঠের পেছন থেকে হাত নিয়ে আরুর শাড়ির ভাঁজে ডুকিয়ে দিল। আরু তার হাতে মৃদ্যু চড় মেরে বলল,
– ‘ কি হচ্ছেটা কি?’
– ‘ ডোন্ট ডিসটার্ব মি।’
আরু ভেংচি কাটল। রুদ্ধ তার একপাশের গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। আরু তাকাতেই অন্যপাশের গালেও ঠোঁট ছোঁয়াল। আরু হেসে দিল। রুদ্ধ নিজের গালের দিকে ইশারা করতেই আরুও রুদ্ধর দু গালে, কপালে, নাকের ডগায়, ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল।রুদ্ধ হেসে বলল,
– ‘ ব্যস ব্যাস এতগুলো চাইনি।’
আরু আবারো খেঁপে গেল। রুদ্ধ তাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরল। ভোরের এই সিগ্ধ পরিবেশ, পাখিদের কিচিরমিচির হালকা আলোয় ও নিস্তব্ধ পরিবেশ তাদের এই ভালোবাসা ও খুনশুটির সাক্ষী হয়ে রইল। দুজন অনেকটা বেলা পর্যন্ত অনেক গল্প করল। আরুর ঘুমে চোখ জোড়া বুঝে আসতেই রুদ্ধ তাকে কোলে তুলে ঘরে শুইয়ে দিল।
এই দু বছরে আহির জীবনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে৷ সেই ছোট মেয়েটা এখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। কিছুদিন পরেই তার এইচএসসি পরীক্ষা। মেয়েটা পড়াশুনা নিয়ে এখন ভীষণ চাপের মধ্যে আছে, সঙ্গে ইয়াজের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা তো আছেই। এটা করা যাবে না সেটা করা যাবে না। আহি কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে প্রতি পদক্ষেপে সেই খবর তার চাই। আহি ভেবেছিল ইয়াজ হয়তো বা সেখানে গিয়ে বদলে যাবে, আহির তেমন খোঁজ খবর নেবে না তবে সে সম্পূর্ণ ভুল ছিল, ইয়াজ দিনকে দিন তার জন্য আরো ডেস্পারেট হয়ে উঠেছে৷ আহির ক্ষেএেও তাই ইয়াজের প্রতি তার অনুভূতি নিত্যদিন বেড়েই চলেছে। ইয়াজ একদিন কল না করলেই তার ভেতরটা হাসফাঁস করে উঠে। আহির আজ কোচিং করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। সে ফ্রেশ হয়েই ভাবল আরুকে একটু জ্বালিয়ে আসা যাক সেই অনু্যায়ী আরু ও রুদ্ধর ঘরের সামনে গিয়ে দেখল দরজাটা হালকা চাপানো, আহি দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। আরু তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। আহি গিয়ে তাকে কতক্ষণ ডাকল তবে আরুর কোনো সারাশব্দ নেই। আহি এবার ভয় পেয়ে গেল। আরুর ঘুম কখনোই এতটা গভীর হয়নি, সামান্য শব্দ পেলেই যেই মেয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ে আজ এতবার ডাকার পরেও তার ঘুম ভাঙছে না? আহি দৌড়ে গিয়ে মাকে ডেকে নিয়ে এল। মিতা বেগম মেয়েকে ডাকলেন, তাদের চেঁচামেচি শুনে রুমা বেগম ও সুমিতা বেগম ও ছুটে এলেন। মিতা বেগম ও আহি তো কেঁদেই ফেলেছে। এর মাঝে আরু পিটপিট করে চাইল। মা ও বোনকে এভাবে কাঁদতে দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে উঠে বসল।
– ‘ কি হয়েছে মা তোমরা কাঁদছো কেনো?’
মিতা বেগম মেয়ের পাশে বসে স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন,
– ‘ তোর কি হয়েছে রে মা কখন থেকে ডাকছি, শরীর খারাপ লাগছে? ডাক্তারের কাছে যাবি?’
– ‘ না না ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না, আসলে শরীরটা খুব দুর্বল লাগছিল একটু শুতেই কেমন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম বুঝতেই পারিনি।’
রুমা বেগম চিন্তিত স্বরে বললেন,
– ‘ সে কি কথা এটা তো ভালো লক্ষণ নয়, আজ রুদ্ধ এলে বলবো একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে।’
মিতা বেগম বললেন,
– ‘ সেটায় ভালো হবে। আহি তুই একটু এখানে বসে থাক আমি কিছু ফল কেটে আনি খেলে ভালো লাগবে।’
– ‘ না না আমি এখন ফল খাবো না, আমার না ভীষণ তেঁতুলের আচার খেতে ইচ্ছে করছে।’
রুমা বেগম ও মিতা বেগম একে অপরের মুখ চাওয়া- চাওয়ি করে কিছু বোঝার চেষ্টা করছে, তবে আগেই কিছু বললেন না, ডাক্তারের কাছে গেলেই না হয় নিশ্চিত হওয়া যাবে। আহিকে আরু কাছে রেখে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তারা চলে যেতে আহি গিয়ে বোনের পাশে বসল। আরু তার কান টেনে বলল,
– ‘ ইয়াজের সঙ্গে তোর কি চলছে বল তো?’
– ‘ কি.. কি চলবে?’
আরু তাকে ভেঙ্গিয়ে বলল,
– ‘ কি.. কি চলবে আমাকে তোর গাঁধা মনে হয়? ভুলে যাস না আমি নিজেই এক সময় এর মধ্যে দিয়ে গিয়েছি তাই তোর মনে কি চলছে আমি ভালোই বুঝতে পারি বুঝেছিস?’
– ‘ তেমন কিছুই না।’
– ‘ আচ্ছা তাই? তোর ঘরে বাটন মোবাইল আমি দেখে নিয়েছি মাকে বলবো?’
আহি তড়িঘড়ি করে তার হাত ধরে বলল,
– ‘ না না আপু প্লিজ মাকে বলিস না, মা আমাকে মেরেই ফেলবে। কিভাবে কি হলো আমি নিজেও জানি না, কিন্তু এখন ওকে ছাড়া একদমই সম্ভব নয় রে।’ কথাটা বলার সময় তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। আরু মুচকি হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– ‘ ছেলেটা যদি অন্যকেউ হতো তবে অবশ্যই আমি মাকে বলতাম। তবে ইয়াজকে আমি ভালো করেই জানি ও তোকে খুব সুখে রাখবে। আর কোনো তিড়িংবিড়িং করলে আমাকে জানাবি ওর ব্যবস্থা আমি করবো।’
আহি তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
– ‘ থ্যাঙ্কিউ আপু উম্মাহহহহ।’
রুদ্ধ অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেই আরুর অসুস্থতার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওপরে ছুটে গেল। আরু তখন বেডে বসে আয়েশ করে আচার খাচ্ছে। আরুকে অসময়ে আচার খেতে দেখে রুদ্ধর চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে রাগ ও হলো ভীষণ। বেড এ বসে আরুর হাত থেকে আচার নিয়ে বলল,
– ‘ এটা আচার খাওয়ার সময়? তোর শরীর খারাপ লাগছিল আমাকে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করিছিস নি। রেডি হয়ে নে আমরা এক্ষুনি ডক্তরের কাছে যাব।’
– ‘ আরেএ আমাকে কিছু বলার সুযোগ তো দিবেন, আজ ডক্তরের কাছে যেতে হবে না আমাকে একটা জিনিস এনে দিবেন?’
রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ‘ কি?’
আরু তার কানের কাছে কিছু বলতেই রুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার ঠিক কি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত সে বুঝতে পারছে না। আরুকে কাঁপাকাঁপা গলায় শুধাল,
– ‘ আর ইউ সিউর?’
আরু কপাল চাপড়ে বলল,
– ‘ আরেএএ ইউর হওয়ার জন্যই তো আনতে বলছি।’
রুদ্ধ তৎক্ষনাত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরু তার অস্থিরতা দেখে হাসল। রুদ্ধকে আবারও বাইরে যেতে দেখে রুমা বেগম বললেন,
– ‘ সবেই তো এলি এখন আবার কোথায় যাচ্ছিস?’
রুদ্ধ যেতে যেতেই বলল,
– ‘ কাজ আছে একটু এখনি চলে আসবো।’
রুদ্ধ কাক্ষিত জিনিসটা এনে আরু হাতে দিতেই মেয়েটা সেটা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। রুদ্ধর হাত – পা প্রচন্ড পরিমানে কাঁপছে, ভেতরে ভেতরে কেমন অদ্ভুত এক অজানা অনুভূতি কাজ করছে। সে সমানে পুরো ঘর জুড়ে পায়চারি ক ল্রতে লাগল। আরুর হতে দেরি হওয়ায় আরও বেশি অস্থির হয়ে ওয়াশরুমের দরজায় নক করল। ওপাশ থেকে আরু জবাব দিল না তবে কিছুক্ষণ বাদেই খট করে ওয়াশরুমের দরজার খোলার শব্দ পেতেই রুদ্ধ এক প্রকার ছুটে সেদিকে গেল। আরুর হাতটা পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। রুদ্ধর চোখে – মুখে অস্থিরতা দেখে ধীরে ধীরে হাত দুটো সামনে আনল। রুদ্ধর চোখের সামনে স্পষ্ট দুটো লাল দাগের চিহ্ন ভেসে উঠল। রুদ্ধর কাঁপাকাপি আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। আরু তাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরল। রুদ্ধ নিজেকে স্বাভাবিক করে তৎক্ষনাত আরুকে কোলে তুলে দু বার চক্কর মারল। আরু বলল,
– ‘ আরেএএ কি করছেন কি পড়ে যাবো তো।’
– ‘ এটা সত্যি আম.. আমি বাবা হবো। এই ছোট মেয়েটা আমার বাচ্চার মা হবে। ‘
রুদ্ধ তাকে নামিয়ে দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতটায় শক্ত করে ধরেছে যে আরুর মনে হচ্ছে হাড়গোড় বুঝি ভেঙ্গেই যাবে। আরু তার পিঠে হাত রেখে বলল,
– ‘ আস্তে ধরুন ব্যাথা পাচ্ছি।’
রুদ্ধ তাকে তড়িঘরি করে ছেড়ে দিয়ে বলল,
– ‘ ওহ সরি সরি এখন থেকে খুব সাবধানে থাকতে হবে, আমার বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে।’ সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পেটের ওপর থেকে কামিজ সরিয়ে উন্মুক্ত করল। পেটে গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
– ‘ এই ছোট পেটে আমার বাচ্চা আছে?’
রুদ্ধ অনেকক্ষণ আরুর পেটে মুখ ডুবিয়ে সেভাবেই রইল। আরু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
আরুকে ছেড়ে রুদ্ধ উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে নিলে আরু তার হাত আটকে ধরে বললেন,
– ‘ কোথায় যাচ্ছেন?’
– ‘ সবাইকে কথাটা জানাতে হবে না? তাছাড়া মিষ্টিও তো আনতে যেতে হবে।’
– ‘ এখন নয়, কাল ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নি এরপর না হয় বলবেন।’
– ‘ ঠিক আছে।’
পরেরদিন ডাক্তার দেখিয়ে রিপোর্ট হাতে নিয়ে রুদ্ধ ও আরু হাসি মুখেই বাড়িতে ফিরল। বড়দের খবরটা জানাতেই পুরো বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেল। বাড়িতে এতগুলো দিন পর ছোট বাচ্চা আসছে। আসলাম শেখ ও আজাদ শেখ একে অপরের সঙ্গে কোলাকোলি করে বললেন,
– ‘ আমি দাদা হচ্ছি আজাদ শুনেছো।’
– ‘ হ্যাঁ ভাইজান, আর আমি নানা হচ্ছি।’
মিতা বেগম, সুমিতা বেগম ও রুমা বেগম তখন থেকেই আরুকে নিয়ে পড়ে আছে, এই সময় এটা করতে নেই, সেটা করতে নেই, বেশী বেশী খাওয়া – দাওয়া করতে হবে এসব। শুনে শুনে আরুর মুখস্থ হয়ে গেছে। সে আর না পেরে বলল,
– ‘ হয়েছে তো আমার মা এবং আমার শাশুড়ী মায়েরা আপনাদের কথা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে, আপনারা যদি ক্লান্ত হয়ে থাকেন, তবে অনুগ্রহ করে কি আপনারা এবার একটু চুপ করিবেন?’ তিনজন একে ওপরে মুখ চাওয়া – চাওয়ি করে হেসে ফেলল।
মিষ্টি কেনা নিয়ে বাঁধল এক বিরাট ঝগড়া আজাদ শেখ বলছেন আমি নানা তাই আমি মিষ্টি আনব। আসলাম শেখ ধমক দিয়ে বললেন,
– ‘ খবরদার আজাদ এসব নিয়ে একদম নাক গলাবে না, আমি দাদা হচ্ছি তাই মিষ্টি আমিই আনব।’ বড় ভাইয়ের ধমক খেয়ে তিনি চুপসে গেলেও নিজের দাবি ছাড়লেন না।
রুদ্ধ এক ধাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
– ‘ আমি বাবা তাই মিষ্টি আমিই আনব এখানে তোমাদের কারোরই নাক গলানো চলবে না।’
আসলাম শেখ ছেলেকেও ধমক দিয়ে বললেন,
– ‘ তুমি চুপ করো। ‘
তাদের এই ঝগড়া – খুনশুটি দেখে বাড়ির সকলে হাসছে।শেষমেষ ঠিক হলো তিনজনই নিজের মতো করে মিষ্টি আনবে, কেউই তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না।
আহি ভেতরে ভেতরে বিষণ ছটফট করছিল। ইয়াজকে কখন এই খবরটা জানাতে পারবে সে।ইয়াজ যদিও আগেই খবরটা পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে, তখন থেকে তার আফসোসের শেষ নেই। সে ওদের জন্মের সময় থাকতে পারবে না, কোলে নিয়ে আদর করতে পারবে না এসব ভেবেই তার মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। ইয়াজ আজ কিছুটা আগেই কল করল। ইয়াজের কল রিসিভ করা মাএই আহি তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উচ্ছাসিত হয়ে বলল,
– ‘ খবরটা শুনেছো আপু মা হবে, আমি খালামনি হচ্ছি আর তুমি মামা।’
ইয়াজ তাকে শুধরে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৭
– ‘ গাঁধা তুই খালামনি হবি না, চাচিমনি হবি বুঝেছিস অথবা মামি। ‘
– ‘ না আমি তো খালামনিই হবো, আমার কতদিনের শখ আমি খালামনি হবো, প্রয়োজন হলে তুমি খালু হয়ে যাও।’
– ‘ আমি কেনো খালু হতে যাব, আমার ভাইয়ের বাচ্চারা আমাকে ছোট বাবা বলবে আর তোকে ছোট মা। ‘ দুজনের এই নিয়েও তর্ক লেগে গেল। কেউ কাউকে একবিন্দুও ছাড় দেবার নয়। ঝগড়া করতে করতেই তাদের রাত দিন পার হয়ে যায় তবুও কেউ ক্লান্ত হয় না। তাদের কাছে ভালোবাসা প্রকাশের ধরণটাই ঝগড়া।
