তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৭
আশফিয়া হিয়া
দেখতে দেখতে একমাস কেটে গিয়েছে। এক মাস আগেই রুহানির বিয়েটা হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে সে ফারিশের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই সংসার করছে। আরু বর্তমানে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে, সঙ্গে সংসারের কাজেও বেশ মনোযোগ দিয়েছে। কিছুদিন যাবৎ শেখ বাড়িতে বিষন্নতার ছায়া ইয়াজের ইউএসএ যাবার সময় এগিয়ে এসেছে, আগামীকাল তার ফ্রাইট। বাড়িতে সবারই ভীষণ মন খারাপ, সঙ্গে মা – চাচীদের কান্নাকাটি তো আছেই। আহি আজ সারাদিন নিজের ঘর থেকে বের হয়নি। এমনি যেই মেয়ে না খেয়ে থাকতেই পারে না, সে আজ একবারও খাবার জন্য নিচে নামে নি। মিতা বেগম হাজারবার ডেকে গেছে তবুও তার সারা নেই৷ আহির বিষয়টা আর কেউ না বুঝলেও ইয়াজ ঠিকই বুঝতে পেরেছে। সবাই রান্নাঘরে ব্যস্ত এই ফাঁকে সে প্লেটে খাবার সাজিয়ে ওপরে চলে এল। আহির রুমে নক করার পরেও সে দরজা খুলনা না। ওপাশ চেঁচিয়ে বলল,
– ‘ মা আমি বললাম তো পড়ে খাব।’
তার গলাটা ইয়াজের নিকট ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঠেকল। অনেক সময় ধরে কাঁদলে যেমনটা হয় ঠিক তেমন।
ইয়াজ গলার স্বর নিচু করে বলল,
– ‘ আমি এসেছি।’
মিনিটের মাঝেই খট করে দরজা খুলে গেল। ইয়াজ ঘরে প্রবেশ করে দরজাটা পা দিয়ে কিছুটা চাপিয়ে দিল। প্লেটটা টেবিলের ওপরে রেখে আহির দিকে তাকাতেই থমকে গেল। কেঁদে কেটে নাক মুখ একদম ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। যা দেখে ইয়াজের নিজের চোখ জোড়াও লাল হয়ে এল। আহির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার গাল দু হাতে আগলে নিল। এক হাত দিয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে খুবই নরম স্বরে শুধাল,
– ‘ আমি কাল চলে যাচ্ছি বলে কাঁদছিস?’
আহির চোখ দিয়ে আবারোও পানি গড়িয়ে পড়ল তবুও নিজেকে সামলে বলল,
– ‘ না তুমি চলে গেলে আমি কাঁদতে যাব কেনো, আমি তো আরও খুশি হবো, আমার ইচ্ছে মতো সব করতে পারবো বারণ করার কেউ থাকবে না।’
– ‘ তাহলে নিশ্চয় সুখে কাঁদছিস?’
আহি জবাব দিল না। ইয়াজ তার হাত ধরে বেডে বসাল। প্লেটের খাবার নিয়ে সে নিজেও আহির পাশে বসল। খাবার দেখেই আহি বলল,
– ‘ আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।’
ইয়াজ তার বারণ শুনলো না, পরোটা সবজিতে ডুবিয়ে আহির মুখে পুরে দিল। অনেক সময় ধরে কান্নার ফলে আহির নাকের ডগা ও গালদুটো লাল হয়ে রয়েছে। চোখে এখনো পানি ছলছল করছে। থেমে থেমে নাক টানছে ও চুপচাপ খাবার চিবিয়ে যাচ্ছে। ইয়াজের চোখে তাকে এখন গুলোমুলো টমেটোর মতো লাগছে। সে না চাইতেও ফিক করে হেসে দিল। আহি তা দেখে চোখ দুটো কটমট করে বলল,
– ‘ আমি এখানে কাঁদছি আর তোমার হাসি পাচ্ছে? অবশ্য হাসি তো পাবেই তুমি তো খুব খুশি। ‘
– ‘ আমি খুশি এটা আমি তোকে বলেছি?’
– ‘ না আমি বলেছি, খুশি বলেই তো যাচ্ছ। এখানে কি ভালো ভার্সিটি ছিল না? এখান থেকে পড়াটা শেষ করা যেত না।’
ইয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– ‘ যেত তবে এটা আমার ড্রিম ছিল। আগে তো বুঝতে পারিনি ছেড়ে যেতে এতটা কষ্ট হবে তাহলে তখনই ইচ্ছেটা মাটি চাপা দিতাম। এখন তো কিছু করার উপায়ও নেই সব ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছে।’
আহি জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
– ‘ কিছু করতে হবে না, তুমি তোমার ইচ্ছেটা পূরণ করো, যাতে ভবিষ্যৎ এ তোমার কোনো আক্ষেপ না থাকে।’
ইয়াজ তার নাক টেনে বলল,
– ‘ বাব্বাহ পিচ্চিটা বড় হয়ে যাচ্ছে, বড়দের মতো কথা বলতে শিখেছে। ‘
ইয়াজ তাকে সবটা নিজের হাতে খায়িয়ে দিল। আহিও চুপচাপ সম্পূর্ণ খাবারটা খেয়ে নিল। খাবার খাওয়ানো শেষ হতেই ইয়াজ নিজের পকেট থেকে একটা বাক্স বের করে। আহি বোঝার চেষ্টা করল জিনিসটা কি হতে পারে। ইয়াজ প্যাকেটটা খুলতেই একটি বাটন ফোণ বেরিয়ে এল । আহি অবাক হয়ে বলল,
– ‘ এটা তো বাটন মোবাইল, এইটা এনেছো কেনো হঠাৎ।’
ইয়াজ মোবাইলটা অন করে বলল,
– ‘ এটা তোর জন্য এনেছি।’
– ‘ আমার জন্য?’
– ‘ হু আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য। ভার্সিটিতে উঠার আগ পর্যন্ত তুই কোনো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ব্যবহার করতে পারবি না বুঝেছিস? এটা দিয়েছে শুধুমাএ আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য। এই সিমের নাম্বারটা আমার কাছে রয়েছে, আমার সময় – সুযোগ মতো আমিই তোকে কল করব আশা করি বুঝতে পেরেছিস?’
আহি মাথা নাড়াল। পরক্ষণে ভীত স্বরে বলল,
– ‘ মা অথবা আপু যদি এটা দেখে ফেলে তখন কি হবে? আমাকে তো মেরেই ফেলবে।’
– ‘ লুকিয়ে রাখবি যেন মোবাইলটা কারোর চোখে না পড়ে। ‘
– ‘ আচ্ছা।’
শেখ বাড়ির আজকের সকালটাও বিষন্নতায় ঘেরা কিছুক্ষণ পরেই ইয়াজের ফ্লাইট। বাড়িতে সবাই একদফা কান্না – কাটি করছে। সুমিতা বেগম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তখন থেকে কেঁদেই চলেছে। ইয়াজও মাকে শান্তনা দিতে গিয়ে চোখে পানি চলে এসেছে। আরু রুহানি ও আহি তিনজনই তখন থেকে কাঁদছে। ইয়াজ মাকে ছেড়ে বড় মা ও মেজো মায়ের কাছে এল। দুজনই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এই বাড়ির প্রত্যকটা বাচ্চাকেই তারা নিজের ছেলে – মেয়ের মতো করে ভালোবেসে মানুষ করেছে। রুমা বেগম বললেন,
– ‘ সাবধানে থাকিস বাবা, প্রতিদিন কিন্তু ফোণ করে জানাবি কি করছিস, কোথায় যাচ্ছিস আমরা কিন্তু ভীষণ চিন্তায় থাকবো।’
ইয়াজ মৃদ্যু স্বরে বলল,
– ‘ জানাবো।’
ইয়াজ এবার বাবা চাচাদের কাছে এল। তারাও ছেলেকে জড়িয়ে ধরে নানা ধরনের কথা বললেন, তাদের চোখেও স্পষ্ট পানি দেখতে পেল সে। আহি আরু ও রুহানি এক পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল ইয়াজ গিয়ে তিনজনকে একসঙ্গেই জড়িয়ে ধরল। তিন জনই শব্দ করে কেঁদে ফেলল।
ইয়াজকে এয়ারপোর্টে অবদি এগিয়ে দিতে বাড়ির সকলেই যাচ্ছে। আহি নিজেকে সামলাতে ওপরে দৌড়ে গেল। ইয়াজ তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে পকেট হাতরিয়ে কিছু খোঁছার ভঙ্গি করে বলল,
– ‘ আমার মোবাইলটা বোধহয় ঘরে ফেলে এসেছি, নিয়ে আসছি। বলেই সে ওপরে সোজা আহির ঘরে চলে গেল। আজি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার নিজেকে দেখে চোখ মুছে চলেছে। ইয়াজ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– ‘ আমি কি একবার আমার ঠিক সামনে দাঁড়ানো মেয়েটিকে জরিয়ে ধরতে পারি?’
ইয়াজের কন্ঠস্বর শুনে আহি হালকা কেঁপে উঠে পেছনে ঘুরল। ইয়াজ আবারও ইশারায় অনুমতি চাইল। আহি ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ইয়াজ ও তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। কতক্ষণ তারা এভাবে ছিল কারোর জানা নেই। এটায় ছিল তাদের প্রথম আলিঙ্গন। নিচ থেকে ইয়াজের ডাক পড়তেই দুজন দুজনকে ছেড়ে দিল। ইয়াজ তার গাল জোড়া নিজের দু হাতে আগলে নিয়ে বলল,
– ‘ আমি দূরে যাচ্ছি বলে ভাবিস না তোর ওপর আমার নজর থাকবে না, তোর সব খবরা – খবর ঠিকই আমার কানে পৌছে যাবে। যেমন ভাবে রেখে যাচ্ছি, ফিরে এসে যেন ঠিক তেমন ভাবেই পাই।’
আহির তাকে অনুসরণ করে বলল,
– ‘ তুমিও দূরে যাচ্ছো বলে ভেবো না, তোমার কোনো খবর আমি জানতে পারবো না, তোমাকেও যেমন ভাবে পাঠাচ্ছি ফিরে আসার পরেও যেন ঠিক তেমনভাবেই পাই।’
দুজনেই একসঙ্গে হেসে দিল। দুজনেরই চোখে পানি ও ঠোঁটে হাসি কি অদ্ভুত এক অনুভূতি।
যাওয়ার পূর্বে ইয়াজ রুদ্ধকে একটা কথায় বলল,
– ‘ আমার মা ও আহির দিকে খেয়াল রেখো ভাইয়া।’
রুদ্ধ ভাইকে শক্ত করে জরিয়ে ধরল। ভাইয়ের কাছে এসে ইয়াজ চাইলেও নিজেকে শক্ত রাখতে পারেনি। ভাইয়াকেই ধরেই কেঁদে ফেলল।
ইয়াজকে বিদায় দিয়ে যে যার মতো ঘরে রয়েছে। সকলেরই মনের একই অবস্থা। রুহানির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে আহি নিজের ঘরে একাই ঘুমায়। মেয়েটা তখন থেকেই নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে চোখের পানি ফেলছে৷ তার পাশে ইয়াজের একটা টি – শার্ট রয়েছে। বাড়িতে ফিরেই এটা সে ইয়াজের ঘর থেকে নিয়ে এসেছে। সেটা ধরেই অনেকক্ষণ কেঁদেছে।
আরু নিজের ঘরে মন খারাপ করে শুয়ে আছে। একেই তো ইয়াজের চলে যাওয়ায় মন খারাপ সঙ্গে শরীরটাও ভালো লাগছে না। পেটে ভীষণ ব্যাথা করছে। ব্যাথায় চোখ – মুখ খিঁচে ওভাবেই বিছানার এক কোণে পড়ে রইল। হঠাৎ করে নিজের পেটের ওপর উষ্ণ কিছুর আভাস পেতেই চোখ মেলে পাশ ফিরে চাইল। রুদ্ধ তার পেটে হট ওয়াটার ব্যাগ চেপে ধরেছে। আরু তার দিকে ঘুরে অবাক স্বরে বলল,
– ‘ আপনি কি করে বুঝলেন?’
– ‘ তোর চোখ – মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারি, তোর কখন ঠিক কোন জিনিসটা প্রয়োজন।’
শত মন খারাপ ও ব্যাথার মাঝেও আরু মুচকি হাসল। এই একটা মানুষ তার সমস্ত মন খারাপ, অসুস্থতা সব এক নিমিষেই দূর করে দিতে পারে। রুদ্ধ তাকে শোয়া থেকে উঠিয়ে পিঠের পেছনে বালিশ দিয়ে হেলান দিয়ে বসাল। আরুর পেটে হট ব্যাগ রেখে, আসছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্ধ যেতেই আরু পেটে হট ওয়াটার ব্যাগের ছ্যাঁকা দিতে লাগল। এখন এটায় প্রয়োজন ছিল মেয়েটার। কিছুক্ষণ পরেই ধোঁয়া ওঠা মগ নিয়ে ফিরে এল। আরু ভাবল রুদ্ধ নিজের জন্য কফি আনতে গিয়েছিল বোধ হয়, তবে তাকে ভুল প্রমাণ করে রুদ্ধ মগটা আরুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
– ‘ এটা খেলে ব্যাথা একদমই কমে যাবে। ফিনিশ ইট।’
আরু দেখল আদা থেতো করে পানিতে ফুটিয়ে এনেছে রুদ্ধ। এটা খেলে আসলেই ব্যাথা অনেকটা কমে যায়। আরু শুধাল,
– ‘ আপনি কিভাবে জানলেন এটা খেলে ব্যাথা কমে যায়।’
– ‘ নেট ঘেটে জেনেছি। ‘
– ‘ বাব্বাহ আর কি কি নেট ঘেটে জেনেছেন শুনি?’
– ‘ এই যেমন এই সময় মেজাজ খিটখিটে থাকতে পারে। বউকে ভীষণ প্যাম্পার করতে হবে, আদর – যত্নে ভরিয়ে ফেলতে হবে, বউ চাইলে কোলে তুলে পুরো বাড়ি হাঁটেও হতে পারে এসব।’
আরু শব্দ করে হেসে দিল। হাসতে হাসতেই বলল,
– ‘ এইসব নেট এ লেখা ছিল বুঝি?’
– ‘ হু এটা শেখ রুদ্ধ মাহতাবের স্পেশাল নেটওয়ার্ক। ‘
আরু আবদারের স্বরে বলল,
– ‘ তাহলে কোলে নিন।’
– ‘ উম্ আগে পানিটা শেষ করতে হবে, ফাস্ট।’
পানিটা বেশ ভালোই গরম ছিল, আরু আস্তে ধীরে পানিটা খেয়ে রুদ্ধর দিকে দু হাত বাড়িয়ে দিল। রুদ্ধ তাকে দুহাতে কোলে তুলে পুরো ঘর জুড়ে হেঁটে বেড়াল। এমকি বেলকনি ও ওয়াশরুমটাও বাদ দিল না। আরু বলল,
– ‘ পাগল হয়েছেন? ওয়াশরুমে কেউ বউকে কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়ায়?’
– ‘ তো কি হয়েছে আমার ইচ্ছে হয়েছে, আমার যেখানে ইচ্ছা আমি সেখানেই হাঁটতে পারি ।’
আরু কপাল চাপড়ে বলল,
– ‘ অনেক হয়েছে এবার আমাকে নামিয়ে দিন।’
– ‘ নো, এখনো নিচে যেতে হবে।’
আরু হালকা চেঁচিয়ে বলল,
– ‘ না না কেউ দেখে ফেললে কি হবে, আমি লজ্জায় মুখই দেখাতে পারবো না, আমাকে নামিয়ে দিন আমি নিজেই যেতে পারব।’
– ‘ স্যাট আপ।’
রুদ্ধ তাকে নিয়ে সোজা কিচেনে চলে এল। নিচে তখন কেউই নেই। সকলের মন খারাপ থাকাই যে যার মতো ঘরে রয়েছে। কাউকে নিচে না দেখতে পেয়ে আরু স্বস্তির শ্বাস ফেলল। রুদ্ধ তাকে নিয়ে সোজা কিচেনে চলে এল। আরুকে কিচেন কাউন্টারে বসিয়ে ফ্রিজ থেকে খাবার এনে গরম করতে লাগল। আরু তার হাতে খাবার দেখেই বুঝতে পেরে গিয়েছে এই খাবার তার জন্যই গরম করা হচ্ছে। আরু বলল,
– ‘ আমার এখন একদমই খিদে নেই বিশ্বাস করুন, শুধু শুধু খাবার গরম করতে হবে না।’ রুদ্ধ তাকে এক ধমক দিয়ে বসিয়ে দিল। আরু তৎক্ষণাত চুপ হয়ে গেল। রুদ্ধ নিজের মতো খাবার গরম করে আরুর মুখে খাবার তুলে দিয়ে বলল,
– ‘ এই অবস্থায় খাবার না খেলে শরীর আরও উইক হয়ে পড়বে, তাই না চাইলেও খেতে হবে। ‘ রুদ্ধর এত যত্ন দেখে ভেতরটা ভালোবাসা ও গর্বে উপচে পড়ছে। সে রুদ্ধকেও বলল তার সঙ্গে খেয়ে নিতে। রুদ্ধ বারণ করতেই তাকে চোখ রাঙাল। রুদ্ধ হেসে বলল,
– ‘ বাহ্ আজকাল আমাকেও চোখ রাঙাল হচ্ছে, খুব সাহস বেড়েছে দেখছি।’
আরু ফিক করে হেসে দিল। বাধ্য হয়ে রুদ্ধকেও আরুর সঙ্গে খেতে হলো।
বাংলাদেশ থেকে ইউএস পৌছাতে ইয়াজের দুদিন সময় লেগেছে। ইয়াজের সঙ্গে তার দুজন বন্ধুও গিয়েছে, তাই খারাপ লাগাটা কিছুটা কম হলেও পরিবারের অভাব তো কেউ পূরণ করতে পারে না। আজাদ শেখের খুব ছোটবেলার বন্ধু তিনি ইউএসএ নিজের পরিবারের সঙ্গে সেটেল রয়েছে। ইয়াজ কিছুদিন বন্ধুদের নিয়ে তার বাড়িতেই থাকবে। এরপর নিজেদের থাকার ব্যবস্থা হলে সেখান থেকে শিফট করে যাবে৷ ইউএসএ পৌছেই আগে বাড়ির সকলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছে সে।
আহি তখন বেঘরো ঘুমাচ্ছে। ইয়াজ বলেছিল বাংলাদেশ সময়ে রাতের দিকে মোবাইলের সাইলেন্ট খুলে রাখতে, সেই অনুযায়ী আহিও ফোণ তার সঙ্গেই রেখেছে। ইয়াজের কলের অপেক্ষা করতে করতেই মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোণের শব্দ পেয়ে মেয়েটা হকচকিয়ে উঠে বসল। ফোণ কানে দিতেই ওপাশ থেকে ইয়াজের ধমকের স্বর ভেসে এল।
– ‘ একটা ফোণ রিসিভ করতে এত সময় লাগে, কখন থেকে ফোণ দিচ্ছি, এখনই অবহেলা করতে শুরু করেছিস।’ আহিকে কিছু বলার সুযোগই দিল না সে নিজের মতো বকেই চলেছে৷ ইয়াজ থামতেই আহি বলল,
– ‘ তোমার বলা শেষ হয়েছে? আমাকেও তো কিছু বলার সুযোগ দেবে, আমি তোমার ফোণের অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ‘
আহি ঘুমিয়ে পড়েছে শুনে ইয়াজ কিছুটা ঠান্ডা হলো। আহি বলল,
– ‘ কি করছো?’
– ‘ কফি খাচ্ছি।’
– ‘ এখন? আচ্ছা তোমার ওখানে এখন কয়টা বাজে?’
– ‘ দুপুর বারোটা। ”
– ‘ তাহলে তো সময়ের অনেক পার্থক্য।’
– ‘ হু।’
আহির হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় বলল,
– ‘ বাবা বলছিল, ওখানে নাকি তার বন্ধুর মেয়েও আছে, মেয়েটা নাকি তোমার সমবয়সী।’
– ‘ হু আছেই তো, কথাও হয়েছে বেশ কয়েকবার।’ কথাগুলো ইয়াজ সরল মনেই বলল, তবে আহি সেটা সহজভাবে নিতে পারল না। ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলে উঠল। চোখ – মুখ শক্ত করে বলল,
– ‘ মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দর তাই না?’
– ‘ হ্যাঁ সুন্দরী তো বটেই বেশ স্মার্ট ও আছে।’
আহি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রেগে গিয়ে বলল,
– ‘ বাহ্ মেয়েটা সুন্দরী দেখতে স্মার্ট এত কিছু খেয়াল করেছো, তুই বরং ঔই মেয়েকেই দেখতে থাক আমাকে ফোণ করার তোমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাকে একদম কল করবে না।’ বলেই খট করে লাইন কেটে দিল। ইয়াজ বারংবার কল করলেও ফোণ রিসিভ করল না। মিনিট পাঁচেক বাদেই মোবাইল এ মেজেসের শব্দ ভেসে এল। ইয়াজ লিখেছে,
– ‘ তুই যদি এখন ফোণ রিসিভ না করেছিস আমি সিরিয়াসলি নেহার সঙ্গে গল্প করতে চলে যাব, তার প্রমাণ হিসেবে কাল সকালে আরুর ওয়াটস অ্যাপটা চেক করলেই জানতে পেরে যাবি।’ মেয়েটার নাম নিশ্চয় নেহা বাহ্ নামটাও জানা হয়ে গিয়েছে। তবে ইয়াজের হুমকি এবার কাজে লাগল। এবার ইয়াজ কল করতেই আহি কলটা রিসিভ করল। রিসিভ করেই ইয়াজের কতগুলো বকা শুনতে হয়েছে।
– ‘ এই জন্যই পিচ্চি মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করতে হয় না, ভাইয়াও একটাকে ভালোবেসে ফেঁসেছে, আমি নিজেও সেই একই কাজ করে ফেঁসেছি। ‘
আহিও মুখটা ফুলিয়ে বলল,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৬
– ‘ তাহলে প্রেম করছো কেনো, তোমাকে প্রেম করতে বলেছে কে?’
– ‘ চুপ ইডিয়েট, আর কোনোদিন যদি আমার ফোণ রিসিভ না করেছিস, বিডি গিয়ে তোর মোবাইল ভেঙ্গে দিয়ে আসব আমি মাইন্ড ইট।’
আহি বিরবির করে বলল,
– ‘ বিদেশে গিয়ে হাঁটতে পারল না ওমনি ইংলিশ ঝাড়া শুরু হয়ে গিয়েছে।’
তার কথাটা ইয়াজ স্পষ্ট শুনল। না চাইতেও হেসে ফেলল সে। এভাবেই দুষ্ট – মিষ্টি খুনশুটিতে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের কথা চলল।
