দুইজনাতেই পর্ব ২৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
বিয়ের কেনাকাটার জন্য একই গাড়িতে সামিল হলো সাম্য, কথা, কণা, কৌশিক ও আদনান। কণা, কৌশিক ও আদনান সাক্ষ্যর মামাতো ভাই বোন।কৌশিক আর আদনান ছাড়াও আরো চারজন মামাতো ভাই আছে তার। মামাতো বোন বলতেই কণাই। সবার ছোট এই মেয়েটাকে সবাই মোটামুটব মাথায় করেই রাখে। সাক্ষ্য সাম্য ও ব্যাতিক্রম নয়। উনিশ বছরের মেয়েটিকে ছোট মেয়ের মতোই জানালার পাশে বসতে দিল। একটু পর পর অসুবিধা হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করল। এসব কথা ছোট থেকে দেখে আসলেও দ্বিতীর কাছে প্রথম। মেয়েটাকে সে আরো একবার দেখেছিল বিয়েবাড়িতে সাক্ষ্যর সাথে। দ্বিতী চেয়ে চেয়ে এই মেয়ের যত্ন দেখে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। অতঃপর একটু সময় পর গাড়ি থেকে নামতেই কণাও নামল। আহ্লাদী কন্ঠে,
“ ভাইয়া, আমি কিন্তু একদম বিয়ের লেহেঙ্গার মতো লাল লেহেঙ্গা কিনব। কিনে দিবে কিন্তু। ”
সাক্ষ্য শুধু স্থির শান্ত গলায় জানাল,
“ আচ্ছা। ”
“ একটা লাল জামদানিও কিনব কেমন? ”
দ্বিতী শুধু শুনে গেল একের পর এক ইচ্ছাগুলো। কেন জানি তার এই মেয়েটাকে পছন্দ হলো না। চাহনি, কথা কিছুইনা। দ্বিতী সরু চোখেই সবটা পরখ করে যাচ্ছিল। কণা কি সাক্ষ্যকে পছন্দ করে? নাকব পুরোটাই মনের ধারণা? কে জানে! ফোঁস করে শ্বাস ফেলে পা বাড়াল দ্বিতী। অতঃপর কেনাকাটার পর্যায়ে অনেকটা কেনাকাটা পর যখন দ্বিতীর জন্য ভারী লাল টকটকে লেহেঙ্গাটা দেখা হলো ঠিক তখনই কণা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে উঠল,
“ এইটা তো খুব সুন্দর! আমি নিই এটা? ”
দ্বিতী ছোটকাল থেকে সব একা পেয়েছে। মা বাবার একমাত্র সন্তানই সে। মা সামর্থ্যের মধ্যে সবকিছুই তাকে দিয়েছে। সে দ্বিতী বিয়ের জন্য মনের মতো লেহেঙ্গাটা পছন্দ করে কণার কথাটা শুনে মাথা তুলে চাইল। পাশ থেকে কথা বলে উঠল,
“ এত ভারী লেহেঙ্গা পড়বে কণা? কনে হলে পড়লে তাও ঠিক হতো তাই না? ”
কণা চাইল। হেসেই বলল,
“ কনে তো আমিই ছিলাম কথা আপু। মাঝখানে উনি এসে আমায় সরিয়ে দিলেন। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকাল। মাঝখানে এসে সরিয়ে দিয়েছে মানে? কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
“ মানে? ”
“ মানে বুঝে আর কি করবেন? বিয়ে তো আপনাদের হয়েই গেছে তাই না? ”
দ্বিতী তাকাল। কণার কপাল কুঁচকানো। একটু ঝুঁকে দ্বিতীর কানে ফিসফিস করে আবারও বলল,
“ যে বিয়েটা আপনার সাথে আয়োজর করা হচ্ছে ঠিক এই বিয়েটাই আমার সাথে হওয়ার কথা ছিল। ”
দ্বিতী তাকায় মুহূর্তে। মানে? আশপাশ তাকিয়ে একবার চোখ বুলাল সাক্ষ্যর উদ্দেশ্যেও। না, নেই। সাক্ষ্য, সাম্য দুইজনেই অন্য দিকটায়। দ্বিতী ওভাবেই স্থির বসে থাকল। বলল,
“ লেহেঙ্গাটা ওই নিক। আমি অন্য কিছু নিব। ”
অতঃপর তার আরো একটু সময় পর সাক্ষ্য এল। দ্বিতীকে দেখল ভ্রু বাঁকিয়েে।অতঃপর ফোনটা হাতে নিয়েই বাঁকা হেসে ম্যাসেজ করল,
“ মিসেস এহসান, পছন্দ করেননি কিছু এখনো? নাকি আমি পছন্দ করে দেওয়ার জন্যই কিছু না নিয়ে বসে আছেন এখনো? ”
হাতের ফোনটায় ম্যাসেজ টোন পেয়ে চাইতেই স্ক্রিনে ভাসল বার্তাটা। দ্বিতী মুহূর্তেই পিছু ঘুরল। দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার দিকেই। দ্বিতী চেয়েই বলে উঠল,
“ এখানে কি পাঞ্জাবী, শার্ট এসব পাওয়া যাবে? কিনবেন? ”
সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলে। পাশে কথা আর কণা বলতে পারল না,
“এখানে পাঞ্জাবী শার্ট না পাওয়া গেলেও আপাতত আমার বউকে পাওয়া যাবে। ”
সাক্ষ্যর খুব ইচ্ছা হলেও বলল না। ভ্রু নাচিয়ে মুখে শুধু এইটুকু বলল,
“ বাহ! আপনি আমার কথা এত ভাবছেন কবে থেকে? ভাবতে ভাবতে আমার জামাকাপড় নিয়েও ভাবছেন? ”
দ্বিতী ঠোঁট বাঁকায়। বলে,
“ হু। কখনো ছেলেদের জামাকাপড় দেখিনি তো। জেন্টস শপের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ”
“ দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে হলে সরাসরিই বলুন। ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন কেন? ”
দ্বিতী রেগে তাকাল এবারে। সুযোগ পেলেই জিজ্ঞেস করত যে, কণা এই কথা কেন বলল? কেন বুঝাল বিয়েটা তার সাথে হওয়ার কথা ছিল? দ্বিতীর মনের ভেতর বিষয়টা খচখচ করেই গেল সবটা ক্ষণ। সাথে রয়ে গেল চাপা রাগ। দ্বিতী সে রাগ নিয়েই বিয়ের কেনাকাটা শেষ করল। লাল লেহেঙ্গার বদলেই কিনল শুভ্র রঙা একটা লেহেঙ্গা। ইচ্ছে করেই নিল। কারণ প্রথমবারে তার পছন্দের জিনিসটা হয়নি যখন তার বিপরীতেই নিবে সে।
কথা দুটো জামা নিয়েছে। কিছুটা স্বাস্থ্য থাকায় তার ধারণা তাকে শাড়িকে মানায় না। এই কারণেই শাড়ি নিল না মেয়েটা। অথচ বান্ধবীর জোরাজুরিতেই একটা শাড়ি পছন্দ করতে হলো তাকে। দ্বিতী হাসল। এই মেয়েটা বড্ড সহজ সরল। তার দেখা সবচেয়ে ভালো মনের মেয়েটা। হেসেই বলল,
“ আমরা অনেক ছবি তুলব দোস্ত হুহ? এ শাড়িটাই পরবি হুহ? ”
সাম্য পাশ থেকে নাক কুঁচকাল। বিরস স্বরে বলে উঠল,
“ ও শাড়ি পরবে? দ্বিতু, ও যে মোটা। শাড়ি পরলে ওকে ছোটখাটো একটা হাতিই লাগবে। এর থেকে ভালো, জামাই পরুক। ”
পাশ থেকে কৌশিক আর আদনান হেসে ফেলল সাম্যর কথা শুনে। কথার চোখ এড়াল না। নিজের এমন উপহাসে কথার চোখ টলমল করে উঠল যেন। শাড়িটা একপাশে রেখেই উঠে দাঁড়াল কথা। পা বাড়ানোর আগেই দ্বিতী বলল,
“ সাম্য ভাই। সবসময় এভাবে কথা শোনাও কেন ওকে? তুমি শিওর তুমি কখনো মোটা হবে না? যদি হও, তখন তোমায় প্রতিটা মুহূর্তে কেউ এভাবে বললে কি করবে? ”
“ কি করব? ওর মতো বসে না থেকে ওজন কমানোর চেষ্টা করব। ”
সাম্যর মধ্যে ভাবাবেগ দেখা গেল না। দ্বিতী নিজেও উঠল তখন। কথার পিছু পিছুই গেল।
প্রায় সন্ধ্যা হলো তখন। কেনাকাটা শেষে সবাইকে যার যার মতে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর গাড়িতে যখন কেবলই দ্বিতী ছিল ঠিক তখনই সাক্ষ্য শুধাল,
“ আমার পছন্দ সাদা হলেও আপনাকে লালেই বউ বউ লাগত দ্বিতী। আসবেন যখন, বউ রূপেই আসেন। আমিও তাকিয়ে দেখে বারকয়েক হার্টফেইল করি। ”
দ্বিতী চাইল পাশ ফিরেই। সাক্ষ্যর ঠোঁটে তখনও বাঁকা হাসি। ওভাবেই ড্রাইভ করছিল সে। দ্বিতী থমথমে চাহনিতে চেয়েই উত্তর করল,
“ আপনার পছন্দ সাদা বলেই আমি সাদা পছন্দ করিনি। আমার মন চেয়েছে তাই করেছি। ”
“ আপনার মন ঘুরেফিরেই আমাকেই চায় তাই আসার পছন্দগুলোই চায়। ”
“ দুনিয়ায় কি মানুষ নেই আর? ”
“ অথচ দুনিয়ায় এত মানুষ থাকলেও আপনার পছন্দ তো সাক্ষ্য এহসানকেই! সুতারাং, লাল টুকটুকে বউ সেজে সাক্ষ্য এহসানের হার্ট ফেইল করার দায়িত্বটা নিয়ে নিন বরং। ”
দ্বিতী মুখ কুঁচকায়। সাক্ষ্যর বাঁকা হাসিটা পরখ করে বলে,
“ যার তার হার্টফেইলের কারণ হয়ে লাভ কি বলুন? ”
ততক্ষনে দ্বিতীর বাসার সামনেই গাড়িটা থামল৷ আচমকা গাড়ি থামিয়েই ফিরে চাইল দ্বিতীর দিকে। অতঃপর বলল,
“ আবার বলুন..”
সাক্ষ্যর চাহনি স্খির, শীতল। দ্বিতী নজর রাখতে পারল না। শুধু বলল,
“ সবার হার্টফেইলের কারণ তো সবাই হয় না স্যার। ”
সাক্ষ্য ফের ভ্রু নাচাল। মুখে হাসি ঝুলিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ শিওর? ”
“ অবশ্যই।আপনার হার্ট এতোটা ঠুনকো নাকি যে ভালোবাসা ছাড়াই যার তার জন্য ফেইল করে? ”
দ্বিতী চেয়েছিল সাক্ষ্য মুখে বলুক তাকে। বলুক যে, সেও দ্বিতীকে ভালোবাসে। অথচ সাক্ষ্য বলল। বরং একটু ঝুঁকে শুধাল,
“ অনেক বছর আগে আমি কোন এক মেয়ের হৃদয়ের অস্থিরতার জন্য দায়ী ছিলাম। বোধহয় আমায় দেখলে তার হৃদ কম্পন বাড়ত। হাঁসফাঁস লাগত। তারপর তার প্রতিশোধ স্রষ্টা কিভাবে নিল জানেন? ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে জানাল,
“ কিভাবে? ”
“ ঐ একই মেয়েটাকেই আমার হৃদয়ের অস্থিরতার জন্য দায়ী করে। আমি সে অস্থিরতা দক্ষভাবে সামলেও নিচ্ছিলাম ম্যাম। কিন্তু মেয়েটা অবাধ্য হচ্ছিল… ”
দ্বিতী সঙ্গে সঙ্গেই কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
“ তো? ”
“ এত অবাধ্যতা মানা যায় না মিসেস। ”
“ কি মানা যায়? ”
সাক্ষ্য হাসে। উত্তরে বলে,
“ লুকিয়ে চুরিয়ে দেখুক, ভালোবাসুক, প্রেমে পড়ুক, চুমু খাক ,হাজার বার তা আমার চোখে ধরা পড়ুক সমস্যা নেই। কিন্তু আমি ব্যতীত অন্য কোন ছেলের সাথে এক বিন্দুও মানব না। ”
“ একই অধিকারটা তো উল্টো দিকেরও হওয়া উচিত মিস্টার।”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ একই নয় বলছেন? ”
“ সেটা আপনিই ভালো জানবেন। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী গাড়ি ছেড়ে নামল। অতঃপর পা বাড়ানোর আগ মুহূর্তেই সাক্ষ্য হাত টেনে ধরল। আরো একটা শপিয় ব্যাগ তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে মিষ্টি করে হাসল সে৷ অতঃপর নিজের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল,
“ এটা আমার হয়ে আমার রাঙা বধূ সাজার জন্য দিলাম। নিন। ঠিক সময়ে আমার ঘরনী হয়ে চলে আসার অনুরোধ থাকল। ”
দ্বিতী বাকি দিনগুলোতে সাক্ষ্যর দিকে একটাবারও তাকায়নি। একটাবারও আড়াল হতেও দেখেনি। অথচ মস্তিষ্ক সর্বক্ষণ ভেবেছে ঐ পুরুষটির কথাই৷ দ্বিতী নিজের এহেন দুর্বলতাতে নিজেই মাঝেমাঝে বিরক্ত হয়। কখনো বা ভালো লাগে। দ্বিতীর পাশেই খেয়া বসা ছিল। দ্বিতী ভাবতে ভাবতে খেয়াকেই আনমনে করল,
“দোস্ত? একটা ছেলের প্রেমে কবার পড়া যায় ঠিক? কবার? শত, হাজার, লাখ নাকি কোটি কোটি বার? ”
উত্তর এল,
“ বহুবার। কিন্তু কেন? ”
দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলে। উচ্ছ্বাস, হতাশা সব নিয়ে বলল,
“ দোস্ত জানিস? আমি আসলেই উপরেই সাহসী সাহসী ভাব দেখাই। ভেতরে ভেতরে আমি এখনো একটা ছেলেকে দেখলে বুক কাঁপে আমার। ”
“ কে সেই ছেলে? ”
“ বলব সময় হলে। ”
খেয়া আর জোর করল না। দ্বিতীও বলল না।বলল না, এক পুরুষকে সে কবেই মন দিয়ে বসে আছে।
ভার্সিটি থেকে যখন ট্যুর প্ল্যান করা হলো ঠিক ঐ সময়টাতেই দ্বিতীর আর সাক্ষ্যর আনুষ্ঠানিক বিয়েটা অনুষ্ঠিত হলো। ফলে দ্বিতীর বন্ধুবান্ধব কাউকে বলতে চেয়েও বলা হয়নি। কিন্তু জীবনের একটামাত্র বিয়ে বন্ধুবান্ধবদের না বলার জন্য দুঃখ ও হচ্ছিল তার। সে দুঃখের সাথে আরো একটা দুঃখ যোগ হলো যখন দেখল কণাও লাল লেহেঙ্গা, ভারী সাোজে সেজেছে। বিয়ে তার, কণা কেন এত সাজবে? উত্তর না পেয়ে দ্বিতী মায়ের কাছেই প্রথমে বলল,
“ কণাও একই রকম সেজেছে আম্মু? কারোর বিয়েতে কেউ এমন সাজে? ও কেন সাজল? ”
দ্বিতীর আম্মুর মেয়ের কথা শুনে চোখ ছোট ছোট করে চাইল। নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে কোথায় হাসিখুশি থাকবে, তা নয় অন্যের সাঁজ দেখে অভিযোগ করছে। ধীর গলায় বলল,
“ ওর হয়তো ইচ্ছে হয়েছে, সেজেছে।তাতে কি? সবথেকে সুন্দর তো আমার আম্মুকেই লাগছে।একদম রাজকন্যার মতো। ”
দ্বিতী চাইল নরম চাহনিতে। ছোট থেকে তার আপন মানুষ বলতে মা ই সবসময় পাশে ছিল। বাবা বাসায় আসত মাসে একবার অথবা দুয়েক সপ্তাহ পরপর। এইজন্য সবসময় মাই তাকে আগলে রেখেছিল। সে দ্বিতী আজ মাকে রেখে চলে যাবে ভাবতেই কান্না আসে। উপর দিয়ে সে বেশ রাগ রাগ স্বভাবের হলেও ভেতরে ভেতরে সে আসলেই নরম মনের একটা মানুষ। যার কারণে মায়ের থেকে প্রশংসা শুনে সে বোকার মতো বলল,
“সত্যি? ”
দ্বিতীর মা হাসে। উত্তর দেয়,
“ হ্যাঁ সত্যিই। একদম পরীর মতো লাগছে আমার ছোট্ট দ্বিতীকে। কবে যে বড় হয়ে গেল বুঝেই উঠিনি। ”
দ্বিতীর এই প্রথম ইচ্ছে হলো মায়ের কাছে আরো কিছু সময় থেকে যেতে। ইচ্ছে হলে মাকে জড়িয়ে বসে থাকতে। দ্বিতী কখনোই অতোটা ইমোশনাল মেয়ে ছিল না। অথচ আজ ওর কান্না পাচ্ছে। না চাইতেও চোখ টলমল করছে। দ্বিতী ওভাবেই চেয়ে থাকল। নিজের কান্না আটকে হঠাৎ বলে উঠল,
“ আম্মু? আব্বুর পরিবারের কেউ আজও আমার বিয়েতে এল না ?”
দ্বিতীর মা তাকায়। বিয়েতে তাদের আত্মীয় স্বজন তেমন কারোরই উপস্থিতি নেই বললেই চলে। যা আছে তারা দ্বিতীদের প্রতিবেশী। দ্বিতীর মায়ের বান্ধবীদের পরিবার। বাবার দিক থেকে শুধু ওর বাবাই উপস্থিত আছে। এমন নয় যে দ্বিতী আগেও কখনো তার বাবার পরিবারের সদস্যদের দেখেছে। না, দেখেনি। বুঝ হওয়ার পর সে কখনোই দেখেনি তাদের৷ এমনকি কতশত ছুটিতে ও গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্না করলেও কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি। দ্বিতী আবারও বলল,
“ তুমি তো বলেছিলে আব্বুর পরিবারের অনেক মানুষ আছে। আব্বু কি বলেনি তাদের? ”
দ্বিতীর মা উশখুশ করলেন কেমন। অপ্রস্তুত গলায় বললেন,
“ কেন বলবে না? অবশ্যই বলেছে। উনাদের ইচ্ছে হয়নি তাই আসেনি। এতে মন খারাপ করতে হয়? ’
“ কনেপক্ষের তেমন তো কেউই নেই আম্মু। ”
“ আমি আছি না? তোর বাবা আছে।পুরো বিল্ডিংয়ের সবাই আছে। আমার কলিগরা আছে, বান্ধবীরা আছে। আর কি চাই? ”
দ্বিতী মানল। সবসময় তো সবাই থাকে না। সবাই আমাদের শুভাকাঙ্খী ও হয় না। এই বিষয়টা মেনেই তার আত্মীয়রা তার বিয়েতে আসেনি দেখেও সে মন খারাপ করল না।
দ্বিতী গত তিনদিন যাবৎ ভার্সিটিতে যায়নি। বাসাতেই থেকেছে সবটা সময়। সাক্ষ্য বেচারা একটানা তিনটে দিন বউকে না দেখে ভাবনায় পড়ে। হুট করে উধাও হওয়ার কারণ ও বুঝে না। বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে কি মানুষের ছুটি নিতে হয়? দ্বিতীকে সামনাসামনি পাত্তা না দেখানো পুরুষটা দুটো দিন কারণবিহীনই দ্বিতীদের বাসার রাস্তা দিয়ে গিয়েছিল। সরাসরি দেখার তৃষ্ণা মেটাতেই বোধহয়। সাক্ষ্য গতকাল রাতেও এসেছিল। দ্বিতীকে গুণে গুণে নিরানব্বইটা মিসড কল দিয়েছে শুধু নিচে নামতে বলার জন্য। অথচ ঘাড়ত্যাড়া দ্বিতী ইচ্ছে করেই কল তুলে নি। আকদ হওয়ার এতগুলো দিনেও যেখানে একটা কল করে বউয়ের খোঁজখবর নিল না সেখানে কেনই বা কল তুলবে দ্বিতী? তাই তো তুলল না৷ সাক্ষ্য সে হেতুতেই বিয়ের অনুষ্ঠানে দ্বিতীর পাশে বসে সর্বপ্রথমই থমথমে গলায় বলে উঠল,
“ গতকাল আপনাকে গুণে গুণে নিরানব্বইটা কল দিয়েছি দ্বিতী। তোলার প্রয়োজনবোধ করেননি না?”
সাক্ষ্যর কন্ঠটা টানটান। যেন রেগে আছে। দ্বিতী পাশ ফিরেই চাইল। হ্যাঁ। মুখটা থমথমে।দ্বিতী সে থমথমে মুখশ্রীকে পাত্তা না দিয়েই ফোঁড়ন কেটে বলল,
“ ইহজীবনে কখনো আমার ফোনে আপনার এত তদারকি বা কল দেখতে পাইনি তো তাই বুঝে উঠিনি। ”
সাক্ষ্য চাইল। দ্বিতীর খোঁচা দেওয়া কথাটা বুঝতে অসুবিধা হলো না তার। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ তদারকি করলে এই কয়েকটা মাস থাকতে পারতেন আপনার আব্বু আম্মুর কাছে? ”
“ কিডন্যাপ করে নিতেন নাকি? ”
সাক্ষ্যর থমথমে মুখটায় এবারে বাঁকা হাসি ফুটল। বলল,
“ করতাম বোধহয়। ”
“ এতই সহজ? ”
ভ্রু নাচিয়ে বলল সাক্ষ্য,
“ কঠিন বলছেন? ”
“ আলবাত কঠিন। ”
“ অথচ আমি এফোর্টবিহীনই আপনাকে চুরি করেছি বহুবছর আগে।আফসোস হচ্ছে এখন। এফোর্ট দিলে তো আরো চুরির পাশাপাশি ডাকাতিও করতে পারতাম। ”
দ্বিতী মুখ কুঁচকাল। বহুবছর আগে থেকেই এই ছেলের জন্য পাগল হয়ে এখন তার আফসোস হয়। কি দরকার ছিল এত পাগল হওয়ার? এতোটাই পাগল হতে কে বলেছে যে সাক্ষ্য সব বুঝে গিয়েছিল? দ্বিতী নিজের অনুভূতি র এহেন কার্যক্রমে আর সাক্ষ্যর সবসময়ই এই খোঁচা দেওয়াটা ভালো লাগে না। নাহয় একটু পছন্দ হয়েছিল। দেখত একটু। ওটা সবসময় বলার কি আছে? বলল,
“ ভালো কাজ তো করেননি। করেছেন চুরিই। ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলে। বলে,
“ আপনার মতো সুন্দরী মেয়েদের চুরি করা জায়েয ম্যাম। ”
“ আর আপনার মতো ছেলেদের কি করা জায়েয? ”
“ শুধুই ভালোবাসা। ”
দ্বিতী রাগতে চেয়েও রাগল না। মন ভালো লাগছে। ফুরফুরে একটা অনুভূতি বয়ে বেড়াচ্ছে। এতসবের পরেও উপরে দেখাল ভ্রু কুঁচকে রাখা মুখশ্রীটা। যেন সে ইহজীবনে কখনো সাক্ষ্যকে ভালোই বাসবে না।
দ্বিতীর বিদায়ের বেলায় দ্বিতী প্রায় ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে মাকে জড়িয়ে কেঁদেছে। এখনো কাঁদছে। সে চলে গেলে মা একদম একাই। বাবা তো আসে কত কত দিন পর। এর মাঝের দিনগুলো মা একা থাকতে পারবে? দ্বিতীই বা মাকে ছাড়া একা থাকবে কি করে? যে মেয়ের এখনো ব্যাগটা অব্দব মা গুঁছিয়ে দেয়, খাবারটা অব্দি মা খাইয়ে দেয়, কাপড়টা অব্দি প্রায় সময় মা ধুঁয়ে দেয় সে মেয়ে মাকে ছাড়া একা থাকবে কি করে? দ্বিতী ভালোবাসার অনুভূতিতে মজে চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই চড়ুই এর মতো উড়ত। অপেক্ষায় থাকত সাক্ষ্যকে কবে পাবেে। অথচ আজ তার সাক্ষ্যকে পাওয়ার আনন্দের থেকেও মাকে ছেড়ে যাওয়ার ব্যথাটাই বেশি অনুভব হচ্ছে। একটা ঘর, একটা বাসা সে ছেড়ে যাচ্ছে। এরপর থেকে সে এখানে আসবে অতিথি হয়ে। সারাদিন টইটই করা, খবদ্দারি করা দ্বিতী এরপর আর এই বাসায় খবদ্দারি করবে না ভাবতেই দ্বিতীর বুক ভার হয়ে আসে। প্রায় ঘন্টাখানেক মাকে জড়িয়ে রেখেও দ্বিতীর কান্না বন্ধ হলো না। শরীর কেঁপো কেঁপে উঠছে। সাক্ষ্য আর কখনো দ্বিতীকে এমন কান্না করতে দেখেনি। না তো দেখেছে মায়ের প্রতি তার এমন বাচ্চামো। এই যে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে মেয়েটার, কেঁদেকেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে সাক্ষ্যর বুকটা কেমন করল বোধহয়। অস্থির লাগল। এই প্রথম অনুভব করল এই মেয়েটা কাঁদছে দেখে তার ভালো লাগছে না। সাক্ষ্য ফোঁস করেই শ্বাস ফেলল। মায়ের দিকে
তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
“ তোমার বান্ধবীর মেয়ে কি পাঁচ
ছয় বছরের ছোট বাচ্চা আম্মু?
এমন ভ্যা ভ্যা করে কাঁদে কেন
খালি? আশ্চর্য! কান্না বন্ধ করতে বলো উনাকে।”
সাক্ষ্যর মা চোখ রাঙ্গায়। ছেলেকে মুহূর্তেই ধমকে বললেন
“ সাক্ষ্য! কাঁদবে না ও? এতগুলো দিন বাবা মায়ের কাছে থেকেছে। এখন চলে যাচ্ছে৷ কাঁদবে না?”
“ নিয়ে আসব না উনাকে উনার মা বাবার কাছে? নাকি ওখানে আটকে রাখব? প্লিজ কান্না বন্ধ করতে বলো তোমার বান্ধবীর মেয়েকে। ”
সাক্ষ্যর মা এবারে কিছুই বললেন না। ছেলেকে শুধু চোখে শাসালেন। সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলেই চোখ বুঝে। বিড়বিড় করে,
“ কি জ্বালাযন্ত্রনা। বিয়ে করলে যে অন্যজন কাঁদলেও নিজের এমন হাঁসফাঁস লাগে আগে জানতাম না। ”
দ্বিতীকে যখন অবশেষে গাড়িতে উঠানো হলো বহু কষ্টে তখন সাক্ষ্য বাইরে। উঠতে নিবে ঠিক তখনই দ্বিতীর আম্মু টলমলে চোখে সাক্ষ্যর হাতটা চেপে ধরল। আশ্চর্যের বিষয় হলো এতোটা সময় দ্বিতী একা কাঁদলেও দ্বিতীর আম্মু কাঁদেনি একটুও। শুধু মেয়েকে হাত বুলিয়ে বুঝিয়েই গিয়েছেন। বোধহয় সে কাঁদলে মেয়ে আরও দুর্বল হবে বলেই কাঁদেনি। উনি সাক্ষ্যর হাতটা চেপে ধরেই বললেন নরম গলায়,
“ সাক্ষ্য, ও একটু মা পাগল। মাকে ছাড়া খুব বেশিদিন কোথাও থাকার অভ্যাস নেই। একটু কয়েকদিন পরপর নিয়ে এসো আমার মেয়েটাকে। ”
সাক্ষ্য চাইল। টলমলে চোখের দিকে হুট করেই তার জবাবটা থেমে গেল। যেন বহু কষ্টে কান্নাটা থামিয়ে রেখেছে মানুষটা। সাক্ষ্য মৃদু হেসে বলল,
“ আনব আন্টি। ”
“ ও একটু বাচ্চামো করে। তোমায় হয়তো অনেক জ্বালাবে। রাগ বেশি আমার মেয়েটার। রাগলে প্লিজ কখনো খারাপ ব্যবহার করো না সাক্ষ্য। মানতে পারবে না ও। ”
সাক্ষ্য আশ্বাস দিয়ে বলল,
“ করব না। ”
দ্বিতীর আম্মু এতোটা সময় না কাঁদলেও এবারে টপাটপ এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল চোখ বেয়ে। বলল,
“ ওকে একটু যত্ন উপহার দিও। খুব বেশিকিছু লাগবে না। আমার মতো করে একটু আমার মেয়েটাকে আগলে নিও সাক্ষ্য। যদি তুমি হয়তো বিয়েটায় প্রথমে মত দাও, আমি জানি না তোমাদের ছন্নছাড়া সম্পর্কটার ভবিষ্যৎ কেমন হবে। কিন্তু আমার মেয়েটার সাথে প্লিজ কখনো খারাপ ব্যবহার করো না সাক্ষ্য। ভুল হলে বুঝিয়ে বলিও। হুহ? ”
সাক্ষ্য মাথা দুলাল। শান্ত স্বরে বলল,
“ আন্টি, আপনার মেয়ের সাথে আকদে প্রথমে মত দেইনি বলেই আপনার মনে হচ্ছে হয়তো আমি আপনার মেয়ের যত্ন করব না। অবহেলায় ফেলে রাখব। কিন্তু আমি শুধু এইটুকু বলব, আমার উপর ভরসা রাখবেন আন্টি। অভিযোগ করার সুযোগ পাবেন না দেখবেন। ”
দ্বিতীর মা আর কিছুই বলল না৷ একটু পর সাক্ষ্য নিজেও উঠে বসল। দ্বিতী তখনও ফুফিয়ে কাঁদছে। থেকে থেকেই কেঁপে উঠছে শরীরটা। সাক্ষ্য সরু চোখে তাকিয়ে থেকেই পকেট থেকে টিস্যু বের করে এগিয়ে ধরল। গম্ভীর গলাতে বলল,
“ কয় প্যাকেট টিস্যু লাগবে ম্যাম? বলে রাখলে আনিয়ে রাখতাম। ”
দ্বিতী ফুঁফিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই চোখ ঘুরিয়ে চাইল। কথাটা যে তাকে ফোড়ন কেটে বলা হয়েছে বুঝেই অপর পাশে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল সে। সাক্ষ্য হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বলল,
“ দ্বিতী, প্লিজ! কান্নাটা থামান। আপনার কান্না দেখে মনে হচ্ছে আমি ছোট একটা বাচ্চাকে কিডন্যাড করে নিয়ে যাচ্ছি আমার বাড়িতে। মানুষজন আমায় কিডন্যাপার ভাববে। অথচ আমি আপনাকে এতগুলো দিন সময় দিয়েছি শুধু কান্না না করার জন্য। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে রাগ রাগ চোখে তাকাল। সাক্ষ্য দ্বিতীর কান্নার মাঝেও এমন তাকানো দেখে হেসে ফেলল।
অবশেষে যখন সাক্ষ্যদের বাসার সামনে এসে গাড়ি থামল সাক্ষ্যই প্রথমে নামল। মুখে হাসি রেখে প্রথমেই ঝুঁকে হাত বাড়াল দ্বিতীর দিকে। অতঃপর ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করে ও তো বরের পাশে বসে শ্বশুড়বাড়ি চলে এলেন মিসেস। সব কান্না তো অনর্থক গেল, বলুন? ”
দ্বিতী ফোলা চোখেই রাগ নিয়ে চাইল। বলল,
“ না আসলেই খুশি হতেন নাকি? চলে যাব? ”
সাক্ষ্য দ্বিতীর হাত ধরল। দ্বিতী হাত ধরে নামতে নামতেই সে বলল,
“ চলে যখন এসেছেনই থাকুন আমার কাছে৷ আপনার দায়িত্বটা পাকাপোক্ত ভাবে নিতে দিন এবার। ”
তখন রাত। ঘরটা সাজানো হয়েছে লাল আর সাদা ফুলে। বিছানা জুড়ে আছে গোলাপের উপস্থিতি। দ্বিতীকে পরানো হয়েছে লাল টুকটকুে একটা শাড়ি। নাকে জ্বলজ্বল করছে নাকফুলটা। দ্বিতী খুব আহামরি সাজে নি। শুধু চোখে হালকা কাজল দিয়েছে। খাটের এককোণে বসেই এতক্ষন দরজার দিকে চাইছিল সে। অতঃপর রুমে সাক্ষ্যর উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই মাথা তুলে চাইল। দিনে এত কেঁদেছে যে মেয়েটার এখন ও চোখ মুখ ফোলা ঠেকছে। সাক্ষ্য ফ্রেশ হয়ে এসেই চাইল দ্বিতীর দিকে। সাদা পাঞ্জাবীর বদলে পরনে সাদা টিশার্ট তখন। ধীর পায়ে এগিয়েই বলল,
“ মিসেস সাক্ষ্য এহসান এতক্ষন না ঘুমিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করেছে?”
দ্বিতী চাইল। উঠে বলল,
“ আপনার জন্য কেন অপেক্ষা করব? আমার ঘুমোতে ইচ্ছে হচ্ছে না তাই বসে আছি। ”
“ দুইদিনের অভিজ্ঞতায় এইটুকু অন্তত বুঝেছি আপনার ঘুম খুবই প্রিয়। ”
“ তো? ”
“ সে ঘুমকে পাত্তা দেওয়া উচিত ছিল না আপনার? ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে নিল। বলে,,
“ আপনার কি কোনভাবে মনে হচ্ছে ঘুমকে পাত্তা না দিয়ে আমি আপনাকে পাত্তা দিচ্ছি? ”
সাক্ষ্য হাসে। নিজের চুলগুলোতে হাত চালিয়ে জবাব দিল,
“ অবিয়েসলি। ”
“ ভুল ধারণা। আমি এখনই ঘুমাব। ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়েই জিজ্ঞেস করল,
“ ঘুমান। না করেছি? ”
“ আপনি না করলেই কি আমি তা শুনে না ঘুমিয়ে থাকতাম? ”
“ অবশ্যই না। তবে ঘুমানোর আগে আপনার দেনমোহরের টাকাটা নিয়ে ঘুমান। ”
কথাটা বলেই সাক্ষ্য একটা খাম এগিয়ে ধরল। ভেতরে বোধহয় একটা কাগজের মতো কিছু। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চাইতে বুঝল খামের ভেতর থাকা পাতাটায় তার দেনমোহরের অঙ্কটা বসানো আছে। ভ্রু কুঁচকেই বরল,
“ এখন কেন? ”
সাক্ষ্য ফের ভ্রু নাচাল। প্রশ্ন ছুড়ল,
“ এখন নয় বলছেন? ”
দ্বিতী উত্তর করল এবারে। সাক্ষ্যর চাহনি, হাসি আর কন্ঠ শুনে উঠল সে। ফ্রেশ হওয়ার জন্য কাপড় নিয়েই বলল,
“ আমি ঘুমাব। ”
দ্বিতীর কথা শুনে হেসে ফেলল সাক্ষ্য। দ্বিতী মনে মনে কি ভাবল? নয়তো সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমাব বলল কেন? হেসেই বলে উঠল,
“ না তো করিনি। ফ্রেশ হয়ে এসে ঘুম দেন। বাচ্চামানুষ। অনেক কান্নাকাটি করেছেন এমনিতেই। ”
দ্বিতী ফিরে চাইল। ভ্রু কঁচকে জানাল,
“ ভদ্র সাজার ঢং করবেন না। দেনমোহরের টাকাটা কেন পরিশোধ করছেন আমি জানি না ভাবছেন? ”
সাক্ষ্য একটু ঝুঁকল। বলে,
“ জানেন? তা, কি জানেন? আমাকেও একটু বলুন৷ ”
“ আপনি যে ভালো না এটা আমি খুব ভালো করে জানি। ”
“ সেটাই তো। আমি চাই আপনি আরো ভালো করে জানুন যে আমি ভালো না। জানবেন? ”
“ ইচ্ছে নেই। ”
কথাটা বলেই দ্বিতী পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। যেতে যেতে বলল,
“ শুনুন? বিছানা থেকে ফুলগুলো সরাবেন না। আমার ভালো লেগেছে সাজানোটা। ”
“ না সরালে ঘুমাব কোথায়? ”
“ সোফাতে ঘুমান। সমস্যা কি? ”
সাক্ষ্যর চোখ ছোট ছোট হয়ে এল। আজ সত্যিই অনেক দখল গিয়েছে। সারাদিন ব্যস্ত থাকা সাক্ষ্য এখন সোফাতে ঘুমাতে হবে কপাল কুঁচকাল। বলল,
“ সোফায় আমার ঘাড়ব্যথা করবে। ”
বিনিময়ে দ্বিতী শুধাল,
“ আমারও কান্নাকাটি করে মাথা আর চোখ ব্যথা করছে। আমি একাই কেন এসব সহ্য করব? বিয়ে তো আপনিও করেছেন৷ ”
“ তাই বলে বিয়ে করে এখন সোফায় ঘুমিয়ে ঘাড়ব্যথা সহ্য করতে হবে? ”
দ্বিতীর হাসি এল। এই প্রথম তার মনে হলো আহা শান্তি। এতক্ষনের মায়ের জন্য করা মন খারাপও ভুলে গেল। বলল,
“ হবে। ”
“না করলে? ”
“ না করলে আমার আম্মুর কথা মনে পড়বে। আম্মুর কথা ভেবে কান্না করব। আমার এখনও আমার আম্মুর কথা মনে পড়ছে। শুধু আম্মু নেই বলে কাঁদতে পারছি না। ”
সাক্ষ্য নিশ্চল চাহনিতে চেয়ে তারিফ করল,
“ বাহ! সেরা ব্ল্যাকমেইল। ”
দ্বিতী একেবারে আধঘন্টা সময় নিয়ে শাওয়ার নিল। সারাদিনের ভারী গহনা, শাড়ি পরে পরে ক্লান্ত হয়ে শাওয়ারটা নিয়েই গায়ে জড়াল হালকা একটা সুতি শাড়ি। শাড়ির একটু আধটু ভিজে গেলেও হালকা গোলাপি শাড়িটা শরীরে জড়িয়েই দ্বিতী চুল থেকে তেয়ালেটা ছাড়িয়ে নিল। অতঃপর বের হয়েই প্রথমে ফোনটা নিয়ে গেল বেলকনিতে। তোয়ালেটা দড়িতে মেলে দিয়ে বসে ফোনে চাইতেই চোখে ভাসল গুঁটিকয়েক ম্যাসেজের নোটিফিকেশন। দ্বিতী চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবগুলোই দেখল। সর্বশেষ দেখল মিহু ম্যাসেজটা,
“ দ্বিতী? সাক্ষ্য স্যার নাকি আরো চার পাঁচ মাস আগে থেকেই বিবাহিত। এমন দুঃখ মানা যায় বল? তাও সাক্ষ্য স্যারের বউটা নাকি নিধি নয়, অন্য কেউ। তাও আমাদেরই ভার্সিটির। আমার তো দুঃখে এখন ট্যুরে থাকতে মন চাইছে না। ”
দ্বিতী চাইল। উত্তর করল,
“ তুই এতসব কিছু কিভাবে জানিস? গ্রুপেও বিস্তর আলোচনা! সবাই কিভাবে জানে এতকিছু? ”
তার একটু পরই রিপ্লাই এল,
“ ডিপার্টমেন্টের অন্য এক স্যার বলেছে ট্যুরের জন্য স্যারের বিয়েতে যেতে পারেনি আজ। তুই কোন জগৎ এ আছিস হুহ? স্যারের আইডিতে গিয়েছিস? ম্যারিড স্ট্যাটাস দেখ। তারিখটা আরো আগের। ”
দ্বিতী চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। অতঃপর আরো ঘন্টাখানেক বসে বসে সব ম্যাসেজ, আলোচনা সব চ্যাক করল। কোথাও এমনটা মনে হয়নি যে সবাই জানে সাক্ষ্য স্যারের বউটা কে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিধি কিছুই বলল না। বরং এসব আলোচনাতেও তার ম্যাসেজ দেখা গেল না। দ্বিতীর নিজেকে আজ কোন এক রহস্যের সমাধান বলে মনে হলো। যাকে নিয়ে সবার এত কৌতুহল। অথচ সেই আড়াল থেকে এসব কৌতুহল দেখে মজা পাচ্ছে। দ্বিতীর মন খুশি হলো। রুমে এসে ফোনটা রেখে একবার চাইল সাক্ষ্যর দিকে। কপালে হাত রেখে সোফাতেই ঘুমিয়েছে। দ্বিতী সোফায় ঘুমিয়ে থাকা সাক্ষ্যর মুখের উপর ঝুঁকতেই দ্বিতীর চুলগুলো গিয়ে
পড়ল সাক্ষ্যর মুখচোখে। দ্বিতীর মুখে তখন বাঁকা হাসি। তর্জনী আঙ্গুলে সাক্ষ্যর ঠোঁট ছুঁইয়ে হাসে সে। ওভাবে ঝুঁকেই আওড়াল,
দুইজনাতেই পর্ব ২৬
“ বর সামনে থেকেও তাকানো নিষেধ তাই না স্যার? এখন বউ সামনে থেকেও বউয়ের থেকে আলাদা থাকার মজা কেমন ব্রো? মচৎকার না? ”
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই সাক্ষ্যর ঘুমন্ত মুখে বাঁকা হাসি ফুটল। এক হাতে আচমকাই দ্বিতীর কোমড় টেনে ধরে নিজের বুক এর উপর ফেলে ধীর গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“ বেঁচেই যাচ্ছিলেন ম্যাম। কিন্তু নিজে থেকেই যখন কাছে এলেন তখনআলাদা আর থাকি কি করে বলেন? শেষ মুহূর্তে এসে সাক্ষ্য এহসানের প্রতি প্রেম দেখিয়ে তো ভুল করে ফেললেন..”
