নিবৃতা পর্ব ১০
নেহার ছায়ালিপি
ফারুকী নিবাসে আজ জমজমাট হয়ে উঠেছে। বেশ আয়োজন চলছে সাথে। বিয়ের পর, আজ প্রথম মেয়ের জামাই বাসায় এসেছে। তার জন্য বিশেষ আপ্যায়ণের ব্যাবস্থা করা যে অত্যন্ত আবশ্যিক! রান্নাঘর থেকে বসার ঘর পর্যন্ত, নিরলসভাবে ছুটোছুটি করছেন শিউলি। তার মাঝে আজ কোন ক্লান্তি, অবসাদ কিচ্ছুটি নেই। আর তার সাহায্যে রয়েছে রত্না। তাবিব অবশ্য, এতে ভীষন কুণ্ঠিত বোধ করছে। তার জন্য কেউ এতোটা ব্যস্ত হোক, এটা সে পছন্দ করে না। নিজেকে বড্ড অপ্রস্তত অনুভুত হয়। এর আগেও অন্য কারও মেয়ের জামাই ছিল সে, কিন্তু সেই কদর কখনো মিলে নি ওর। উল্টো ভর্ৎসনা, অপমান, লাঞ্ছনা ভরে ভরে শুনতে হয়েছিল। মানুষের জীবনে, দিন যেরকমভাবে আসে ঠিক সেরকমভাবে চলেও যায়। তবে পেছনে ফেলে রেখে যায় স্মৃতিগুলো। তার মধ্যে অনেকাংশ ভুলতে চেয়েও সম্ভব হয় না, আর কিছু কিছু ঘটনা মানুষ আজীবন নিজের মনিকোঠায় লালন করতে চায়। শেষ কবে এতোটা সমাদর মিলেছে, তাবিবের মনে নেই। কেউ এতো স্নেহ ভরে পাতে খাবারও তুলে দেয় নি৷ যতটা মমতা আজ শিউলি বেগম ঝরাচ্ছেন ওর উপর, সেরকমই আদর শেষবার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলো তাবিব। এখন মা নেই, সাথে সেই আদর, যত্ন, মায়া, মমতাও নেই। কারণ মায়ের জায়গা কেউ নিতে পারে না৷ বাবাও পারে না, নাকি বাবারা চান না, সেটা তাবিব বুঝে না। সেতো নিজেও এক বাবা। সে তো তানহাকে অবহেলা করার কথা চিন্তাও করতে পারে না। তবে কেন যে এতো তফাৎ!
– বাবা আরেকটু ভাত দেই?
– না মা। আর সম্ভব হবে না আমাকে দিয়ে।
আন্টি সম্বোধনটা এখন মা’ নামক শব্দে এসে ঠেকেছে। কিছু কিছু সম্পর্কের সম্মান ঠিক এভাবেই করতে হয়। তাবিব স্মিত হেসে বলে,
– আপনি বসুন। অনেক তো হলো। এবার একটু জিরিয়ে নিন।
মেয়ের জামাই খানিকটা সহজ হয়েছে তার ব্যবহার আচারে। শিউলি একটু হলেও মনে শান্তি পাচ্ছেন। একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে মেয়েকে দেখেন। যে অপর পাশেই বসে বসে তানহাকে খাইয়ে দিচ্ছে নিজ হাতে। এক সময় যে মেয়ে কোনভাবেই খেতে চাইতো না, জোর করে কয়েক লোকমা মুখে তুলে দিতে হতো, আজ সেই অন্যের খাওয়ার দায়িত্ব আপন কাঁধে তুলে নিয়েছে। ওর শরীরের নানান অঙ্গ জুড়ে সোনার অলংকার চোখের লাগার মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সময়ের পরিবর্তন বোধহয় একেই বলে। উনি প্রশান্তির এক শ্বাস ছেড়ে একটি চেয়ার টেনে বসলেন। প্রশস্ত হেসে তানহাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– আমার নানুমনির আর কিছু লাগবে না?
– না, না! একদমই পেট ভরে গিয়েছে। কিন্তু আম্মু যে ছাড়ছেই না!
তানহার গোমড়ামুখে বলা কথায় সবাই এক চোট হেসে উঠে। অথচ নিবৃতা সম্পূর্ণ নির্বিকার। ধ্যান, জ্ঞান সমস্ত কিছু এখন তানহার খাওয়াতে।
– আরেক লোকমা। এই যে শেষ!
শান্ত স্বরে বলা একটি কথাও তানহা ফেলতে পারে না। যতই মুখে না করুক, মনে মনে এই ছোট ছোট শাসন, আহ্লাদ, যত্নের কাঙাল ও! তাই চুপচাপ খাবার টুকুন মুখে তুলে নিলো। খাওয়ানো শেষ হতেই নিবৃতা উঠে দাড়ায়।
– চলো মুখ ধুবে।
মা, মেয়ে দু’জন চলে যেতেই তাবিবের মুখের হাসি বিলীন হয়। প্লেটের খাবারগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে গম্ভীর গলায় বলে,
– মা, আমার আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।
তাবিবের মুখায়বে কঠিন এক ভাব দেখা যাচ্ছে। শিউলি একটু সাবধানী কন্ঠে বলেন,
– জ্বি বাবা। বলো।
এক প্রলম্বিত শ্বাস টানে তাবিব। মাথা নিচু করে বলে,
– বিয়ের আগে আমি খুব বিস্তারিতভাবে নিবেদিতার সম্পর্কে জানতে চাই নি। তবে সেটা বোধহয় আমার ভুল হয়েছে।
মেয়ের অতীত সম্মুখে চলে আসতেই শিউলির মুখে আঁধার নামলো। তবে অপ্রস্ত উনি মোটেও হন নি। তার স্বামী মেয়ের জন্য সবটা দিয়ে গিয়েছেন। নিবৃতাকে অবহেলা করা কিংবা ওকে নিয়ে বিরূপ অনুভব করার অর্থই হলো তার সংগ্রামকে তুচ্ছ করে তোলা। উনি স্বাভাবিক গলায় বললেন,
– এখন জানতে চাচ্ছো? আমার মেয়েকে খুব বেশিই অস্বাভাবিক লেগেছে তোমার কাছে?
তাবিব দ্রুত মাথা নেড়ে বলে,
– আপনি ভুল ভাবছেন। ওকে নিয়ে আমার মনে কোন ক্লেশ নেই। বরঞ্চ নিবেদিতা একটু বেশিই ভালো, সরল৷ আমাদের বাবার মেয়ের জীবনে সে এক অসাধারণ সংযোজন।
– তাহলে?
– সবকিছু ছাপিয়ে গেলেও ওর মাঝে কিছু একটা আছে, যার জন্য ও নিজেও শান্তিতে নেই। সুখে থেকেও সুখী নয়। কেমন বিচ্ছিন্ন সবকিছু থেকে। মনে হচ্ছে ওর সাহায্য দরকার। আর আমি সেই সহায়কটা হতে চাচ্ছি।
– ওর বাবা তো কম চেষ্টা করে নি। এতোটা খারাপ অবস্থা না থাকলেও খুব বেশি উন্নতি সাধন সম্ভব হয় নি৷ আর উনি চলে যাওয়ার পর ও আরও নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।
তাবিবের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। অন্তঃকরণে ছেয়ে যাওয়া দুঃখের প্রতিফলন মুখে ছড়িয়ে পরলো। পরাজিত না হয়ে বললো,
– বাবা তার চেষ্টাটা করেছেন। এবার স্বামী হিসেবে নাহয় আমি আমার ভাগের দায়িত্বটুকু পালন করি।
শিউলির দু-চোখ কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো। ভেজা কন্ঠে বললেন,
– শুকরিয়া বাবা।
– এভাবে বলবেন না। আমি এসব আমার পরিবারের জন্যই করতে চাচ্ছি।
ওড়নায় চোখ মুছলেন শিউলি। তাবিব দেখলো একজন মায়ের করুণ রূপ। সে যদি এখন ফেলোশিপের জন্য না যেতো তাহলে হয়তো বিষয়টা দ্রুত সমাধানে নেমে পরতে পারতো ও। তবে এটা হওয়ারই ছিল। নিবৃতাকে নাহয় একটু অপেক্ষায় রাখলো। হতেও পারে নতুন পরিবেশ, জীবন ও তানহার সাহচর্যে অনেকটা পরিবর্তন চলে আসে ওর মানসিকতায়। আর নিতান্তই যদি কোন কাজে না আসলে তখন দিনশেষে তাবিবকে নিজের পাশে পাবে ও।
– নিবেদিতার সাথে ঠিক কি হয়েছিল? আমি বলতে চাচ্ছি ওর অতীতের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?
প্রশ্নটা ঠিক বুঝলেন না শিউলি। উনার ভ্রু কুঁচকে এলো। জানতে চেয়ে বললেন,
– রত্না তোমায় বলে নি সবটা?
– আমার মনে হয় আমার জানার ভাগটা খুবই ছোট ও অস্পষ্ট। আমি…..
– মা!
তাবিব কথা শেষ করতে পারে নি। এরই মাঝে অস্থির কন্ঠে ডেকে উঠে রত্না। তাকে দেখে বড্ড উদ্ভ্রান্ত লাগছে। শিউলি উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,
– কি হয়েছে?
– কল এসেছে।
শিউলির মুখটা ঝলমল করে উঠলো। ছেলে তার নিবৃতার বিয়ের আগ থেকেই বাসায় কল করে না। আজ হঠাৎ এই অসময়ে কল এসেছে বিধায় উনি একটু তটস্থই হলেন। বিনয়ের সহিত তবিবকে বলেন,
– তাবিব, আমি একটু আসছি।
– জ্বি জ্বি। কোন সমস্যা নেই।
শিউলি ত্রস্ত পায়ে ছুটলেন। রত্না এক অক্লিষ্ট ঢোক গিলে চললো তার পেছনে। ঘরে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে শিউলি অবাক হয়ে বললেন,
– কানেকশনে তো নেই।
রত্না অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
– দেখি মা।
মোবাইল হাতে নিয়ে হতাশ হওয়ার ভঙ্গিমা করে বললো,
– নেটওয়ার্কে সমস্যা হয়তো। একটু অপেক্ষা করি আমরা।
শিউলি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসলেন। ছেলের সাথে কথা বলাটা ভীষন জরুরি। এভাবে কেউ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়? বোন কি ওর একারই আদরের? মা হয়ে কি মেয়ের খারাপ চাইবেন শিউলি? এ কেমন কথা! এসব ভাবতে ভাবতেই তার কপালে ভাজ পরলো। শিউলিকে বসে অপেক্ষা করতে দেখে হাফ ছেড়ে যেন বাঁচলো রত্না। আলগোছে কপালে জড়ে হওয়া ঘাম মুছে নিলো।
সন্ধ্যার পরই তাবিবের ফ্লাইট। তাই দুপুরে শিউলির বাসায় ওদের নিমন্ত্রণ ছিল। নিচে গাড়িতেই তাবিবের লাগেজ রাখা আছে। এখান থেকেই সরাসরি ও বিমানবন্দরে চলে যাবে। কাওকে সাথে নিবে না ও বিদায়ের জন্য। মা মেয়েকে এখানে রেখে যাবে আজ। তাদের যখন ইচ্ছে তখন ফেরত চলে আসবে বাসায়। তাবিবের জোর নেই। আর তখন শিউলি ব্যস্ত হয়ে পরায় আর কথা এগোয় নি তাদের। পরে নাহয়, মোক্ষম সময় বুঝে সামনাসামনি কথা হবে।
বসার ঘরে সবাই জড়ো হয়েছে। তাবিব এখন বেরিয়ে পরবে। এ বেলায় তানহার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই থেমে থেমে তার চোখে পানি জমছে। হিচকি উঠে যাচ্ছে নিজেকে সামলাতে গিয়ে। অথচ নিবৃতা বরাবরের মতোই অনুভূতিহীন চেহারা নিয়ে চুপচাপ বসে। আর তাবিব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার প্রচেষ্টায় মত্ত।
– কে যেন বলেছিল, বাবা আমি তোমার সাথে যাবো না অস্ট্রেলিয়া। তুমি একাই যাও। সে তো, এখন আমি চলেই যাচ্ছি। কিন্তু আপনি খুশি না কেন?
বাবার কথায় তানহা ফুঁপিয়ে উঠলো এক প্রকার। শ্যাম গাল রক্তাভ হয়ে উঠেছে। ভেসে যাচ্ছে অশ্রুর তোড়ে। বাবার কথায়, অস্থির হয়ে হাত পা দাপাদাপি করেতে করতে বলে,
– তুমি অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছো বাবা। অনেক খারাপ।
তাবিব বিষন্ন হাসে। মেয়েকে শান্ত করতে, এক পেশে জড়িয়ে ধরে বলে,
– আর কাঁদে না আমার মা। দুটো বছর কোন সময় হলো? এই চোখের পলকে কেটে যাবে। আমি তো কাজের জন্যই যাচ্ছি তাই না? তানহার তো আরও গর্ব হওয়া উচিত বাবার উপর!
– আমি একা একা কিভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া?
বলতেই বলতেই সেই কান্না উচ্চ শব্দে রূপান্তরিত হয়। নিবৃতা মেয়ের জন্য বিচলিত হলো এবারে। এক দমে ছুটে এসে অন্য পাশ থেকে আগলে ধরলো ওকে। তাবিব আশা নিয়ে ওর দিকে চায়। যাক ওর অনুপস্থিতি মেয়েকে সামলানোর জন্য বিশ্বস্ত কেউ হয়েছে এতো দিনে। পরপর মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলে,
– একা কোথায়? আম্মুর সাথে থাকবে। বাবা নেই তো কি হয়েছে? আম্মু তানহার খেয়াল রাখবে। আম্মু দিয়ে চলবে না?
– দৌড়াবে! কিন্তু বাবাও লাগবে।
– বাবা তো আছি! একটু দুরে থাকবো কিছুদিন। এরপর তো চলেই আসবো।
তানহার কান্না থামলেও চুপ হয় নি সে। তাবিব জানে সে এখনই থামবে না। আহ্লাদ লাগবে৷ মায়ের আদর লাগবে। তাই ওকে আরেকটু বুঝ দিয়ে তাবিব সরে এলো। শিউলির সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
– আমার জীবনে অত্যন্ত দুজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে রেখে যাচ্ছি মা। ওরাই আমার সব। প্রয়োজনে ওদের একটু দেখবেন।
নিজের মেয়ের সাথে নব স্ত্রীকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে সে। কেমন অমায়িক আচরণ। শিউলি আশ্বস্ত করে বললেন,
– চিন্তা করো না বাবা। তুমি তোমার কাজে মনোযোগ দাও আর নিজের যত্ন নিও ঠিকঠাক।
শিউলি গিয়ে তানহাকে জড়িয়ে ধরলেন। রত্নাকে ইশারায় নিয়ে চলে গেলেন ঘরের ভেতরে। একা রয়ে গেলো স্বামী স্ত্রী দু’জনে। এই সুযোগেই তাবিব ঘুরে তাকালো নিবৃতার দিকে। যে কেন যেন, কোন এক কারন বশত ওকেই দেখছিল এতক্ষণ। হঠাৎ নিজের উপর দৃষ্টি আপতিত হতেই চোখ নামিয়ে নিলো। তাবিব মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো। সোফার উপর থাকা অফিস ব্যাগ খুলে একটি ছোট শপিং ব্যাগ বের করলো। সেটি গিয়ে সোজা নিবৃতার সম্মুখে তুলে বললো,
– তোমার জন্য।
হকচকিয়ে তাকালো নিবৃতা। জড়তা নিয়ে বললো,
– আমার জন্য?
– এখানে মোবাইল আছে।
– এটা দিয়ে কি করবো আমি?
বোকা বোকা প্রশ্নে এবার আর হাসলো না তাবিব। তাদের মাঝে থাকা স্বল্প দুরত্ব টুকুন আরও এক পা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে মিটিয়ে নিলো। গভীর গলায় বললো,
– আমার সাথে প্রেমালাপ করবে! একদম বিশুদ্ধ প্রেম!
কেমন নির্লজ্জ কথাবার্তা। নিবৃতা হাসফাস করে গুটিয়ে গেলো। নেত্র পল্লব ভীষন করে কাপলো ওর।
– মোবাইলের কিছু না বুঝলে তানহার সাহায্য নিবে। আমি কল করলে প্রতিবারই যেন তোমাকে পাই। নতুবা খবর আছে। বুঝেছ?
নিবৃতা কেমন গাট হয়ে আছে। বোধহয় মৃদুমন্দ কম্পিত হচ্ছে ওর বদন। ওকে চুপ থাকতে দেখে তাবিব ওর কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে লহু কন্ঠে বলে,
– বুঝেছেন মিসেস তানজিব?
চোখের পাতা শক্ত হয়ে বুজে আসে। গলা শুঁকিয়ে চৌচির যেন। বহু কষ্টে ফিসফিসিয়ে বলে,
– বুঝেছি।
ওর প্রত্যুত্তরে দেরি, তবে দুটো সৌষ্ঠব হাত ওকে পেঁচিয়ে নিতে দেরি করে নি মোটেও। লোকটা ওকে আলিঙ্গনে বেঁধেছে। অথচ নিবৃতার মনে হলো, কিছু একটা ওকে জাপটে ধরেছে, এবং এখনই ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে।
অপরদিকে তাবিব দুচোখ বন্ধ করে এক লম্বা শ্বাস টানে। প্রিয় মানুষটার নিজস্ব মেয়েলি, মিষ্টি সুবাসের প্রবেশ ঘটিয়ে নেয় মনের অন্দরে। কখনও ভুলবার নয় এট। তবে ও বুঝলো, মেয়েটা একটু বেশিই রোগাটে! মনে হচ্ছে কোন অস্তিত্বই নেই ওর। ও মৃদু হেসে, পরপর সরে আসে। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেখে সেই করুণ মুখটা। তাবিবের একটু হলেও খারাপ লাগলো। ও জানে, নিবৃতা ওকে নিয়ে এখনও কিছু অনুভব করে না। তবে মনের উপর তে কারও জোর নেই। এই যে ও, মেয়েটাকে না চাইতেও পছন্দ করে বসলো, এতে তো ওর নিজেরও কোন বল ছিল না। এক শ্বাস ছেড়ে নিবৃতার কপালে পরে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে গুটিয়ে দেয়। এরপর ছোট্ট এক স্পর্শ একে দেয় ললাট মাঝে। আজ যদি নিবৃতা চোখ মেলে চাইতো, তবে বুঝতো, দেখতো, যে ঠিক কতটা অনুরাগ নিয়ে লোকটা ওকে দেখছে। সেই দৃষ্টিতে কি অপার মায়া!
– ভালো থেকো নিবেদিতা।
আর পেছনে না তাকিয়ে বেরোনের পথ ধরলো তাবিব। আচমকা সম্মুখ বাতাস হালকা হতেই নিবৃতা চোখ খুলে। দেখা যাচ্ছে মানুষটা চলে যাচ্ছে। ও দ্বিতীয় কোনকিছু না ভেবেই পিছু ছুটে। দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থেকে অস্থির হয়ে বলে উঠে,
– সাবধানে যাবেন।
মৃদু এক কন্ঠস্বর। তবে তাবিবের কানে সেটি পৌছেছে। তবে ওর পায়ের গতি মন্থর হলো না। শুধু ঠোটের কোনে এক সূক্ষ্ম হাসির রেখা ভেসে উঠলো।
ঠিকঠাকমতোই মেলবোর্নের মাটিতে পা রেখেছিলো তাবিব। ইতিমধ্যে তার অবস্থানের আজ কয়েক সপ্তাহ পেরিয়েছে। সচল গতিতেই তার কাজ চলছে। যাকে বলে একদম নিয়মমাফিক জীবন। কাজ শেষে ডর্মে ফিরেই কল করে দেশে। দীর্ঘ ফোনালাপ চলে তখন৷ এই মাত্রই ক্লান্ত বদনে কাজ থেকে ফিরেছে তাবিব। দেশের সাথে সময়ের ব্যবধান চার ঘন্টা। ওখানে কেবল মাত্র বিকেল এখন। কোন রকমে ফ্রেশ হয়ে মাথা মুছতে মুছতে কল করলো বাসায়। কেন যেন যতক্ষণ কাজ থাকে ও ভালো থাকে। একটু ফুরসত মিললেই মনটা অস্থির হয়ে থাকে বাসার জন্য। সেখানে থাকা দুটে বিশেষ মানুষের জন্য।
তানহা ও নিবৃতা ব্যস্ত ছিল রান্নাঘরে। আজ তারা একটি কাজে নেমেছে। পুডিং তৈরি করার মতো কঠিন এক যুদ্ধে। মোবাইলের ইউটিউবে শব্দ তুলে রেসিপি চলছিল। মাঝে ব্যাঘাত ঘটলো ফোনকলে। বাবার নাম দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো তানহা। এক লাফে ভিডিও কলটি রিডিভ করলো ও।
– বাবা!
প্রতিদিন কথা হলেও যতবার তাবিব কল করবে, তানহা এরকমই খুশি প্রকাশ করা ঢ়েন বাঞ্ছনীয়। তাবিবের মনটা শান্তিতে ছেয়ে যায়।
– কি করছে আমার মা’টা?
– আজ আমরা পুডিং বানানোর মিশনে নেমেছি বাবা।
তাবিব অবাক হয়ে বলে,
– পুডিং? এতো মহা জটিল এক কাজ।
– হ্যা। কিন্তু তাতে কোন সমস্যা নেই। আমরা মা মেয়ে মিলে করে ফেলবো। নো ইশুজ।
নিবৃতা এক কোনে দাঁড়িয়ে বাবা মেয়ের কথোপকথন শুনে চুপচাপ। মাঝে মাঝে স্মিত হাসেও। মেয়েটা তার বাবাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। মাঝে মাঝে কি মন খারাপ করে বসে থাকে। তখন নিবৃতাই তো ওকে সামলায়। এভাবেই প্রায় ঘন্টা খানিক বাদে তানহা ও তাবিবের কথা শেষ হয়।
– আমি আসছি।
বলেই ঘরে ছুট লাগালো তানহা। নিবৃতা জানে সাধারণ একটি অযুহাত। এমনটাই হয়ে আসছে গত কয়েক সপ্তাহ যাবত। মেয়েটা প্রাঞ্জল হলেও ভীষন বুঝদার। এক পল গড়াতেই নিবৃতার মোবাইল বাজে। ও সন্তর্পণে সেটি হাতে নিয়ে চলে যায় তাবিবের ঘরে।
মহাশয়ের নির্দেশ। তানহার সাথে কথা বলার পর, সে নিবৃতাকে আলাদা করে কল করবে। তখন সে যেন তার ঘরে চলে যায়। নিবৃতাও বিনা বাক্য তক্কে তক্কে সকল আদেশ পালন করে। কল রিসিভ হতেই শুভ্র, স্নিগ্ধ মুখটি দৃষ্টিগোচর হয় তাবিবের চক্ষু শীতল করতে। তাদের মাঝে কথার চাইতেও নীবতা বেশি স্পষ্ট। নিবৃতা কি বলবে বুঝে পায় না, আর তাবিব যা জানার তানহার সাথে কথা বলে জেনে নেয়। তবুও দু একটা যা বলে, এরপর বাকিটা সময় ও শুধু দেখেই চলে ওপারে থাকা মানবীকে। কেন যেন যতই দেখে ততই তৃষ্ণা বাড়ে। সময় গড়ায়। এরপর হঠাৎ করেই তাবিব বলে,
– আমাকে কি কখনও মনে পরে নিবেদিতা?
এর উত্তর কি? নিবৃতার নিজেরও সঠিক জানা নেই। মাঝে মাঝে খুব স্বস্তি লাগে এই ভেবে যে ঘরে কোন পুরুষের উপস্থিতি নেই। আবার মাঝেমধ্যে মনে হয়, কেন নেই? থাকলে বোধহয় কোন ক্ষতি ছিল না। তার মনটা দোলাচলে ডুবন্ত। তাবিব নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থেকে আচমকাই কল কেটে দেয়। এমন নয় যে, ও রাগ করেছে। বরঞ্চ ওর ভয় হয়, যদি নিজের মনের নাজেহাল অবস্থাটা একটু বেশিই ব্যক্ত করে বসে ও? এখনই উপযুক্ত সময় নয় এটা। এক হতাশা, ক্লান্তি মিশ্রিত শ্বাস চিরে আসে বক্ষ ভেদ করে।
বিকেল দিকে কাজ থেকে একটু বিরতি নেওয়ার জন্য কলিগরা মিলে পাশেরই এক কফিশপে ভিড় জমানোর উদ্দেশ্যে সকলে বেরিয়ে পরলো। এক, একজন ডাক্তারের চোখে এক এক স্বপ্ন। তারা প্রত্যেকেই আপন দেশ ও মানুষের জন্য সবটা করতে রাজি। উন্নত মানসিকতার মানুষেদর সাথে থাকলে নিজের মস্তিষ্কেরও বিকাশ ঘটে। অনেক কিছু শিখা যায়। ওরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো তাবিব। কফিশপের কাঁচের দরজা চেপে যখন ওরা ঢুকছিলো তখন আশেপাশে ওর নজর ছিল না। তাই যখন হঠাৎ করে পেছন থেকে একটি ডাক ভেসে এলো তখন বিস্ময় জেঁকে ধরলো তাবিবকে।
নিবৃতা পর্ব ৯
– তাবিব না?
সহসা পিছু ঘুরতেই দেখা মিললো এক পরিচিত চেহারার মানুষের। প্রশস্ত হেসে তাকিয়ে আছে সে!
– মেলবোর্নে কি করছো তুমি?
তাবিব মুক বনে চেয়ে রইলো খানিকটা সময়। কে জানে জবাব দিতে ওর এতোটা সময় লাগছে কেন!
