Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৩৪

নিবৃতা পর্ব ৩৪

নিবৃতা পর্ব ৩৪
নেহার ছায়ালিপি

দীপ্তিময় সেই অটল চোখের দৃষ্টি, যেন কত শত না বলা অনুভূতি কথন জমা সেথায়। তীক্ষ্ণ চোয়ালে তার স্থবির মুখশ্রী। অভিব্যক্তিতে অদ্ভুত দৃপ্ততা। অপর পক্ষকে দুর্বল করে দিতে বাধ্য। নতুন রূপে জেগে ওঠা এই তেজস্মিতার জ্বলজ্বলে আঁখি যুগলে নিজের জীর্ণ নয়ন দুটো বেশিক্ষণ মিলিয়ে রাখতে ব্যর্থ হলো তাবিব। সেই ক্ষুরধার নজরের অম্লান তেজ ওর অন্তঃদাহকে যেন আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দিলো। দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করলো তাবিবের নরম হৃদয় খানি। আবার কোন ভয়াল অভিযোগের ভার বহন করতে ওলো আজ জর্জরিত হতে হবে? এই হৃদয়ে পরম যত্নে লালন করা তাবিবের ব্যক্তিগত কোমল পুষ্পও কি ওকে আজ কণ্টকাকীর্ণ আঘাত উপহার দেবে? কে জানে? ভাগ্য তো কখনও তাবিবের ইচ্ছে মোতাবেক ফলে নি আজ পর্যন্ত।
দৃষ্টি মিলন ভঙ্গ করে মাথা নোয়ালো তাবিব। পরপর তড়িৎ সরে এলো দু’কদম পিছনে। ক্লিষ্ট এক ঢোক গলাধঃকরণ করে, অথচ কন্ঠতালু পর্যন্ত ওর গ্রীষ্মের উত্তপ্ত বালি রাশির ন্যায় শুকিয়ে আছে।

– কি প্রশ্ন?
বড্ড দুর্বল শোনালো সেই কন্ঠস্বর। নিবৃতার চোয়াল গুটিয়ে আসে। মানুষটা জানে, নিবৃতার পক্ষে এরূপ মুখোমুখি সংলাপ ঠিক কতটা কষ্টের, জড়তা পূর্ণ। অস্বস্তিতে ওর সম্পূর্ণ সত্তা গাট গয়ে আসে। ভয়ে বুক অবদি কাঁপে। এজন্যই তো তাবিব নিজ থেকে এগিয়ে আসতো। অথচ আজ? উল্টো পিছিয়ে যাচ্ছে। নিবৃতাকে সামলানোর পরিবর্তে ওর সংশয়কে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে। কেন? কেন এমনটা করবে সে? এতোদিন তো বলতো, তানহার জন্য তারা সংসারে বাধলেও, এখন তাবিবের কাছে নিবৃতার মূল্য ভিন্ন পর্যায়ে। নিবৃতা তাকে এখন না ভালোবাসলেও ও যত খুশি চায় সময় নিবে। কোন সমস্যা নেই। তবে দিনশেষে তাদের একসাথে থাকতেই হবে! সেই পুরনো সব কথা এবং প্রতিশ্রুতি, তাবিবের এখনকার কর্মের সাথে মিলছে না কেন? নিবৃতার খুশি কি তবে এক অযুহাত মাত্র? সে কি ক্লান্ত এই অসামাজিক, অস্বাভাবিক ও নানান সমস্যায় জড়িত নিবৃতার সাথে? নিবৃতার সমস্ত শক্তি, বল কেমন এক নিমিষেই গুঁড়িয়ে গেলো। নিজেকে খুবই ছোট ও হেয় অনুভূত হলো। ইচ্ছে করলো কোথাও লুকিয়ে পরতে। এই জঘন্য চেহারাটা আর কাওকে না দেখাতে, জীবনে আর কখনও তাবিবের মুখোমুখি না হতে। নিজের অভ্যন্তরীণ সত্তাকে বড্ড ভঙ্গুর অবস্থায় আবিষ্কার করলেও, নিবৃতা আজ পিছু হটলো না। বরঞ্চ তাবিবের সৃষ্টি করা মাঝের দুরত্ব টুকুন দ্বিগুণ ভারি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মিটিয়ে দিলো। এই শিক্ষাটা তো তাবিব থেকেই পাওয়া। কোন কিছুর স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত হাল না ছাড়া। আর নিবৃতা সর্বদাই তাবিবের বাধ্যগত ছাত্রী। যা শিখেছে তার প্রয়োগ তো করে ছাড়তেই হবে।

নিজ সম্মুখে, অস্তিত্বের অতি সন্নিকটে, নিশ্বাসের জোড়লো স্পন্দনে তাকে অনুভব করতে পারছে তাবিব। দু’জনের মাঝে থাকা ফারাকটা বিলুপ্তপ্রায়। নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে প্রিয় নারীর সেই মোহনীয়, মায়াজালে ঘেরা সুবাস। যা মনের অন্দর মহলে গড়ে তোলা সকল প্রকার প্রতিরোধের দেয়ালকে এক লহমায় চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিতে যথেষ্ট। শ্বাস রোধ হয়ে এলো তাবিবের। চোখ বুজে কোনমতে নিজেকে সামলে সম্মুখে তাকায় তাবিব। নিবৃতা তখনও নিশ্চল দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর পানে, মুখের আদল কেমন নিথর। কিন্তু ও যখন কথা বললো তখন একটি আগের সেই দৃঢ়তা হারিয়ে গিয়েছে কন্ঠস্বর থেকে। বরঞ্চ ওকে তখন শোনালো ভীষন অসহায়।
– দিবেন না আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর? আমার না সেগুলো জানা খুবই জুরুরি। একটু সাহায্য করুন।
গলার সুরে সেই সরল, নিষ্পাপ টান। তাবিব উদ্বিগ্ন হলো। কি হয়েছে মেয়েটার আবার? এমন কি-ই বা হয়েছে যে এতো রাতে এখানে ছুটে এসেছে? ওর হাত কাঁপলো। সহসা উঠে এসে ছুঁতে চাইলো স্ত্রীর নরম গাল দুটো। কিন্তু বরাবরে মতোই এক অদৃশ্য বল সেই গতিকে রোধ করে দিলো। ইতস্তত ভঙ্গিতে হাত নামিয়ে তাবিব যত্নশীল গলায় বললো,

– কি হয়েছে নিবেদিতা? তুমি এমন করছো কেন? এতো অস্থির কেন লাগছে তোমাকে? আমাকে বলো কি সমস্যা।
এতো নম্র সেই আচরণ। নিবৃতার অক্ষিকোল ভিজে আসলো হঠাৎই। ডাগর ডাগর চোখের কিনারা ঘেষে মোটা মোটা অশ্রুরা জায়গা করে নিলো। ঘরে জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল আলোর প্রতিফলনে তাদের চকচকে রত্নের মতো লাগলো দেখতে। তাবিব অস্থির হয়। প্রকম্পিত কন্ঠে বলে,
– তুমি না আমকে বিশ্বাস করো? তাহলে কিছু বলছো না কেন?
রক্তিম পেলব ওষ্ঠদ্বয় তিরতিরিয়ে কাঁপলো। চিবুক হলো নত।
– কারণ আপনি আমাকে ঘৃণা করেন।
‘ঘৃণা! এই এক শব্দটি বড্ড অবলীলায় উচ্চারণ করে ফেললো নিবৃতা, অথচ তাবিবের পুরো অবয়ব তখন বিস্ময়ে ঘেরা। এরূপ কিছু কখনও ওকে শুনতে হবে সেটা ও কস্মিনকালেও ধারনায় আনে নি। অবিশ্বাস নিয়ে বললো,

– কি বললে?
– আপনি আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না। ভালোবাসা তো দূরের কথা!
এই মেয়ে কিসব বলছে? তাবিব খানিকটা শক্ত গলায় বললো,
– একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছো না?
নিবৃতা নাছোরবান্দার ন্যায় মাথা নাড়িয়ে বলে,
– সত্যিই তো বলছি। আপনি আমাকে ঘৃণা করেন।
এই আরোপ সহ্য হলো না তাবিবের। যেই মেয়েকে ভালোবাসে, তাবিব কি না সারাজীবনের জন্য সংসার ছেড়ে একাকিত্বকে বেছে নেওয়ার মতো ভয়াল সিদ্ধান্ত নিতেও একবার ভাবে নি, সে-ই এখন তাবিবকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায়? ওর মনে আঘাত লাগলো। না পারতে কিছুটা চেচিয়ে উঠলো এবার।

– বেশিই বুঝো তুমি। হয়তো অতিরিক্ত বুঝো না হলে একেবারে কিছুই বুঝো না। ভালো লাগে না কিন্তু সবসময়!!!
আচমকা তাবিবের ভারি রাগান্বিত কন্ঠস্বরে নিবৃতা হকচকিয়ে গেলো। কেঁপে উঠলো অন্তঃকরণ। হতবাক নয়ন সেই কঠিন হয়ে আসা মুখশ্রীতে পরতেই, ভেজা চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো। মুহুর্তে অশ্রুসিক্ত হলো কপোল জোড়া। আতংকিত মন নিয়ে দূরে সরে গেলো ও। কিছুক্ষণ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় অস্থির মনি জোড়া চারপাশে নজর বোলালো। অতঃপর চপল পায়ে ছুটলো বিছানার কাছে। একদম এর গা ঘেষে বসে পরলো নিচে৷ দু’হাটু জড়ো করে তাতে ক্রন্দনরত মুখ দাবিয়ে, জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলো। প্রবল কান্নার তোরে শীর্ণকায় শরীরটা কাঁপছিলো ভীষন করে। তাবিব এতক্ষণ মুক বনে সবটা দেখলেও এবারে বেশ অসহায় বোধ করলো। কাতর নয়নে তাকিয়ে দেখলো অবুঝ স্ত্রীর করুন, বিরূপ অবস্থা। ও বার কয়েক লম্বা লম্বা শ্বাস ছাড়লো। কপালে আঙুল ঘষে নিজের ক্রোধকে সামাল দিলো। কেন যে না চাইতেও অসময়ে বাজে ভাবে নিজের মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে! জোড়ালো নিশ্বাস টেনে ও এগিয়ে গেলো। বড্ড ধীরে, সাবধানতার সহিত জায়গা করে নিলো দুঃখ বিলাসে মত্ত রমনীর ঠিক পাশটায়। মায়া নিয়ে তাকিয়ে আদুরে গলায় বললো,

– বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি? আচ্ছা আর হবে না। এই যে ওয়াদা করলাম, এরপর থেকে আর কখনও, তোমার সাথে জোরে কথা বলবো না। তুমি শত ভুল করলেও বকবো না কখনো। একদম মুখ বন্ধ করে রাখবো, ঠিক আছে? দয়া করে এবারের মতো এই অধমকে ক্ষমা করুন।
তাবিবের স্বান্তনাবানী, আগুনে ঠান্ডা পানির বদলে ঘি’য়ের কাজ করলো। নিবৃতা চট করে মাথা তুলে তাকালো। অশ্রসিক্ত, ফুলো ফুলো চোখে তাকিয়ে রেগে গিয়ে বললো,
– আমি তো ভুল বলিনি। আপনি সত্যিই আমাকে পছন্দ করেন না। এখন সঠিক কথা বললেও বকা শুনতে হয়। কেন? কারণ আপনার আসলেই আর ভালো লাগে না আমাকে।
আবারও ঘুরেফিরে একই প্রলাপ বকে যাওয়া। তাবিবের দেয়ালে আপন কপাল ঠুকতে মন চাইলো। তবুও যেহেতু ওয়াদা করেছে তাই নিজেকে বাগে রাখলো। শান্ত কন্ঠে বলার চেষ্টা করলো,
– বারবার একই কথা কেন বলছো? আমি তোমাকে ঘৃণা করবো কেন? কেন বলছো এসব?
নিবৃতা মুখ ফিরিয়ে নাক টানলো। শাড়ির আঁচল টেনে টুনে সিক্ত মুখটা কোনমতে মুছে বললো,
– আপনি তো আমার সাথে থাকতে চান না। সংসার করবেন না আর। এরজন্যই তো। তাই না?
তাবিব যেন কথা বলতেও ভুলে গেলো। চমকিত নয়নে তাকিয়ে থেকে বলে,

– কে বলেছে এসব তোমাকে?
– কেউ বলে নি। আমার খুব বেশি বুদ্ধি না-ই থাকতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই না যে আমি এতোটুকুও বুঝবো না।
– তোমাকে বেশি ভাবতে মানা করেছি না? আমি আছি কিসের জন্য?
নিবৃতা ব্যাকুল হয়ে উঠে। ভারাক্রান্ত স্বরে বলে,
– কিন্ত এখন তো আর থাকতে চাইছেন না।
– তুমি আমাকে পরিষ্কার করে বলবে সবটা?
নিবৃতা গুটিয়ে গেলো আরও। নজর চুরি করে বললো,
– আপনি চান আমি যেন ঝিলমিলকে নিয়ে বিদেশ চলে যাই।
তাবিব মনোযোগ দিয়ে তাকালো এবার নিবৃতার দিকে। কি হচ্ছে সেটা আগে বোঝা উচিত।
– নিভান ভাইয়া বলেছেন আমি এটা চাই?
নিঃশব্দে নেতিবাচকভাবে মাথা নাড়ায় সে৷ তাবিব আবারও বলে,

– তাহলে?
– আপনি চান আমি যেন খুশি থাকি।
– তাহলে তুমিই বলো, আমার চাওয়া কি ভুল?
গোল গোল চোখ দুটো আবারও দৃষ্টি মেলায়। স্বচ্ছ সুরে বলে,
– ভুল নয়, বলছেন? আপনি বলেছিলেন, যাই হয়ে যাক না কেন, তানহার জন্য আমাদের সবসময় একসাথেই থাকতে হবে৷ তাই আপনি আমাকে সময় দেবেন, আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। সব তো ঠিক করাই ছিল। তাহলে হঠাৎ করে এমন কথা কেন বলবেন আপনি?
তাবিব নিরবিচ্ছিন্ন নজর নিপতিত রেখে বলে,
– কি মনে হয়? কেন বলেছি আমি এরকম?
বোকা সে অপরাধী মুখ বানিয়ে ছোট্ট কন্ঠে বলে,
– আমাকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন, এরজন্য।

হঠাৎই তাবিবের মাঝে কোথা থেকে যেন অসীম ধৈর্য চলে এলো। নিজেকে আর দিশেহারা লাগলো না। মনে হলো, সময় নিয়ে নিবৃতাকে সবটা বোঝানো উচিত। নিভান তার বোনের ভালো চাইলেও, তাদের মাঝে এক দীর্ঘ সময় ধরে সংযোগ এবং যোগাযোগের ঘাটতি ছিল। নিভান হয়তো বুঝে না, জানে না যে নিবৃতাকে কিভাবে সামলানো উচিত। ও হয়তো বলেছে এক আর বোকা নিবৃতা বুঝেছে আরেক। এখন এই সরল মানবীর ভালোর জন্য হলেও তাবিবকে সবটা পরিষ্কার করে বলতে হবে। এক দীর্ঘশ্বাস বের হলো অন্তঃস্থল চিরে। বিছানার ধারে পীঠ ঠেকিয়ে, মাথা ঘুরিয়ে ও তাকালো পাশে৷ নিবৃতা মাথা নিচু করে কেমন এক পথ হারা পথিকের ন্যায় সর্বশান্ত হয়ে বসে আছে।
– আমি কিছু কথা বলবো। সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
নিবৃতা একাই একাই বিড়বিড় করলো,

– এমন করে বলছে যেন আমি তাকে কথা বলার সময় খুব জ্বালাতন করি।
বিয়ের আগে মনে ভীতি ছিল যে, নিবৃতার এই নিচু কন্ঠ তাবিব শুনবে কিভাবে। অথচ আজ? নিবৃতা কথা না বললেও যেন ওকে স্পষ্ট শুনতে পায় তাবিব৷ অনুভব করতে পারে ওকে। তাইতো এই কথাটা শুনতেই নিঃশব্দে হেসে ফেললো তাবিব। তার মিসেস আজ একটু বেশিই ক্ষিপ্ত। কিন্তু কেন? তাবিব তাকে অপছন্দ করলে কি-ই বা এসে যায় তার? এতো পীড়িত কেন সে এ বিষয়ে?
– আমি তোমার অতীত সম্পর্কে অবগত ছিলাম না৷ আমাকে ইচ্ছে করে, তোমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। যদি আমি শুরু থেকেই সত্যটা জানতাম, তাহলে আজ আমাদের বর্তমানটা হয়তো ভিন্ন হতো। কিন্তু ভাগ্যে যেহেতু ছিল তাই এমনটাই হয়েছে। সবকিছু এক পাশে রেখে বলি, তোমাকে এই ক্ষুদ্র জীবনে যেসব নৃশংসতার শিকার হতে হয়েছে, যা যা কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, সে হিসেবে তোমার সকল আচার আচরণ স্বাভাবিক। একটুও বাড়াবাড়ি নেই সেখানে। তুমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। বরঞ্চ আমি তো তোমার উপর গর্বিত। অন্য কেউ হলে, এতোটা লড়াই করতে পারতো না। বেঁচে থাকার সংগ্রামে কবেই হেরে যেতো। নিবেদিতা তুমি এক অনন্যা। এই যে আজ তুমি ভাবছো যে আমি তোমার উপর ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি, এটা সম্পূর্ণই তোমার ভুল ধারনা। এটা মোটেও ঠিক নয়।
নিবৃতা চুপচাপ শুনলো সবটা। তাবিব থামতেই বললো,

– তাহলে কোনটা ঠিক?
তাবিব তাকালো ওর পানে। বিষাদময় হাসি ঠোঁটের এক প্রান্তে টেনে বললো,
– আমাদের বিয়েটা হয়েছিল তানহার জন্য। কিন্তু ঐ যে বললাম তুমি এক অসাধারণ নারী। কিভাবে যেন না চাইতেও তোমার মায়ায় জরিয়ে গেলাম। আমাদের মেয়েটা ভাগ্যের জোরে আমাদের এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। আর এর গিট হলো ও নিজেই। আমি ভেবেছিলাম এই গিটটা খুলে গেলে তানহা নিজেই অস্তিত্বহীন হয়ে পরবে। ওর মা’য়ের আদর পাওয়ার হাহাকার, এক সুস্থ স্বাভাবিক পরিবার পাওয়ার স্বপ্ন, সবটাই ভেঙে যাবে। তাইতো যখন, তুমি বললে তোমার সময়ের প্রয়োজন, তখন আমি খুব সহজেই নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম, নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছেকে সরিয়ে মেয়ের জন্য ভাবছিলাম। ও যেন কষ্ট না পায় সে চিন্তাই আমার মাথায় ঘুরছিলো। সেজন্যই তোমাকে বলেছিলাম যে আমাদের একসাথেই থাকতে হবে আজীবন। তোমার যত সময় প্রয়োজন। তুমি নাও।
নিবৃতা উদগ্রীব হয়ে স্বামীর কথা শুনছিলো। তাই যখন সে থামলো তখনই অস্থির হয়ে বললো,

– তাহলে এখন কি সমস্যা হয়েছে? আপনি মত পরিবর্তন করে ফেললেন কেন?
তাবিবকে এ প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এক প্রলম্বিত শ্বাস টানতে দেখা গেলো। পরপর বিষন্ন স্বরে বললো,
– নিভান ভাইয়ার সাথে কথা বলে আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে এতোদিন আমি স্বার্থপরের ন্যায় আচরণ করছিলাম। প্রথমে মেয়ের চিন্তা করলেও ধীরে ধীরে এটা আমাকেও গ্রাস করে নিলো। তুমি নামক মানুষটা আমার অস্তিত্বে এমনভাবে মিশে গেলো যে তোমাকে আর নিজ থেকে আলাদা করার কথা আমি কল্পনাতেও আনতে পারি নি। কিন্তু নিভান ভাইয়া? উনি ঠিকই বুঝে নিলেন তার বোনের কি প্রয়োজন।
নিবৃতা শান্ত স্বরে বললো,
– ভাইয়া জানে আমার কি প্রয়োজন। আপনি বুঝেন আমার কিসে ভালো হবে। অথচ এই আমিটা নিজেই কিছু জানি না৷ আমার আসলে কি দরকার?
তাবিব মায়াময় গলায় বললো,

– তুমি এক সুখময় জীবনের দাবিদার। এক নির্ঝঞ্ঝাট, স্বস্তিকর পরিবেশের যোগ্য। উন্নত চিকিৎসার প্রাপ্য তুমি। নিজ অতীতের ট্রমাগুলো কাটিয়ে ওঠার পথ খুজে বেড়ানোর কথা। প্রজাপতির ন্যায় ডানা মেলে ঘুরে বেড়ানোর মতো স্বাধীনতা দরকার। কোন পিছুটান ছাড়া মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করা প্রয়োজন।
– আর এগুলো আপনি সাথে থাকলে সম্ভব হবে না?
এই প্রশ্নটা তাবিবকে দেহে প্রতি লোমকূপে ধারালো কণ্টকের ন্যায় বিধলো। অন্তঃকরণের মধ্যভাগে নিদারুণ পীড়া জমলো। তবুও মুখে দারুণ এক হাসি টেনে বললো,
– কারণ তোমার জীবনে আমি থাকলে তুমি কখনও সুস্থ, স্বাভাবিক হতে পারবে না। আমার কারনে বারংবার তোমার সেই ঘৃণ্য অতীত তোমাকে হানা দিবে। আমার উপস্থিতি তোমাকে সবসময় অস্বস্তিতে ফেলে। তুমি এখনও আমার সাথে সহজ হতে পারো নি। তাছাড়া আর কতো মানিয়ে নেওয়ার এই সংসারটা বয়ে বেড়াবে তুমি? নিভান ভাইয়া ঠিকই বলেছেন, এবার একটু ভালো থাকা তোমার প্রাপ্য। অন্যের স্বার্থে নিজের জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করার কোন অর্থ নেই।
তাবিব কথা থামাতেই খেয়াল করলো নিবৃতা রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। পরপর অবুঝের ন্যায় মাথা দুলিয়ে বললো,

– আপনি মিথ্যে বলছেন। এগুলো সব আপনার অযুহাত।
নিজ বুকে পাথর রেখে এই কঠিন সত্যগুলো বললো তাবিব, অথচ কি হলো? মিথ্যেবাদীর তকমা পেতে হলো? ওর ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে আসে৷ অসন্তোষ গলায় বলে,
– মিথ্যে বলবো কেন?
– যেন আমার খারাপ না লাগে। আমি যেন কষ্ট না পাই।
– কি বলতে চাচ্ছো?
– আপনি বিয়ের আগে আমার অতীত সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা ছিল না, এজন্যই আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছিল পরে। কিন্তু যেদিন থেকে আপনি জানতে পারলেন যে আমি একজন ধ/র্ষিতা সেদিন থেকে আপনি আমাকে মনের ভুলেও একটিবার ছুঁয়ে দেখেন নি৷ আমার থেকে নজর চুরি করছেন। কেন? কারণ আপনার কাছে আমি অত্যন্ত নোংরা কেউ! আমি দূষিত, নিচ!
– নিবেদিতা!

অবিশ্বাস নিয়ে অস্ফুটে তাবিব বলে উঠলো। নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল ওর।
এদিকে নিবৃতা তখন কেমন অস্থির আচরণ শুরু করে দিয়েছে। নিচু কন্ঠে বলে যাচ্ছে নিজের মতো করে। তাবিবের বিরোধ সে মানে নি। নাই-বা মানবে! এ কয়দিন যাবত মনের ভেতরে এই চাপা ব্যথাটা লুকিয়ে রেখেছিলো ও। নিজেকে যে কতোটা নিচু লেগেছে তাবিবের সম্মুখে সেটা মুখে বলে প্রকাশ করার মতো নয়।
– আমি সমাজ বুঝি না, ঠিক আছে। কিন্তু বাস্তব জ্ঞান থেকে সরাসরি বিচ্ছিন্নও নই। একজন ধ/র্ষিতাকে এখানকার সবাই ঠিক কি নজরে দেখে, সেটা আমার একটু হলেও জানা আছে। আপনি অনেক অনেক অনেক ভালো একজন মানুষ। খুবই সুন্দর মন আপনার। কিন্তু তাই বলে যে আপনাকে তাদের থেকে আলাদা হতে হবে, সেরকমটা নয়। আপনার যা ইচ্ছে আপনি ভাবতে পারেন, আমি কিচ্ছু বলবো না। আপনি শুধু একবার বলে দিন, যে আপনি আমায় আর ভালোবাসেন না। আমাকে দেখলে গা ঘিনঘিন করে। ঘৃণা করেন এক কথায়। এতেই হবে। উত্তরটা শুনে নিতে পারলে, আমি এখনই চলে যাবো এখান থেকে। আর কখনও এই নোংরা মুখ আপনাকে দেখাবো না। আপনি…..
নিবৃতাকে ওর কথা শেষ করতে দেওয়া হলো না। তাবিব এক প্রকার হামলে পরলো ওর উপর। রোগাটে শরীরটা পুরোপুরি আগলে নিলো নিজের মাঝে। সম্পূর্ণ ঘুচে গেলো মাঝে থাকা দুরত্ব খানি। পরপর কোমল গালে পোক্ত দু হাত বুলিয়ে হতবাক ডাগর ডাগর নয়নে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলায়। সময় নিয়ে পরম আদরে নরম স্পর্শ দিলো নিবৃতার ললাট মাঝে। আবেশে চোখের পাতা নেমে আসতেই আসন্ন প্রলয় ছুঁতে শুরু করলো নিবৃতাকে। পুরুষালী ওষ্ঠ ছুঁয়ে দিতে লাগলো মুখশ্রীর প্রতিটি কোণ। মসৃন কোপলের প্রত্যেকটি অংশ, তিরতিরে করে কাঁপতে থাকা অক্ষী পল্লব, নিচে নেমে গিয়ে চিবুক পর্যন্ত। কোনকিছুই বাদ পরলো না। ক্রমাগত প্রেম বর্ষনে সিক্ত হলো বিস্মিত নিবৃতা। পুরোপুরি নাজেহাল করে ছাড়া হলো তাকে। এরপর যখন নিশ্বাসে নিশ্বাস মিললো, তারপর গিয়ে তাবিবের থেকে রেহাই পেলো ও। এরূপ কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিল না নির্বোধ নিবৃতা। হাঁপিয়ে ওঠা তাবিব তখন দুজনের ললাট সংযোগে আশ্রয় নিয়েছে। ওভাবেই শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললো,

– আমি ভালো মানুষ। কিন্তু তুমি আমার হিংস্র রূপের সাথে এখনও পরিচিত হও নি মেয়ে। এরপর থেকে যদি কখনও এসব আজেবাজে কথা মুখ থেকে উচ্চারন করো, তাহলে দেখবে এই আমি ঠিক কতটা খারাপ হতে পারি। একদম খবর করে ছাড়বো!
গভীর কন্ঠের হুমকিতে নিবৃতা থরথর করে কেঁপে উঠলো। প্রকম্পিত হলো ওর লতালো চিকন হাত দুটোও। তাবিব ধীর গতিতে নিবৃতার হাতের আঙুলে নিজের আঙুল মিলিয়ে শক্ত করে পাকড়াও করলো। ভারি স্বরে আবার বললো,
– আমি চাইতাম তুমি অনেক কথা বলো, নিজের ভালো মন্দ বুঝতে শিখো। মনের প্রশ্ন জাহির করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো। কিন্তু আজকের পর থেকে আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। দোহাই লাগে, তোমার এসব কিছুই পারার দরকার নেই। কারণ এই একটি দিনেই তুমি আমার অন্তরটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আঙ্গার করে ছেড়েছো। নির্বোধ কোথাকার!
তাবিবের কথা থামতেই নিবৃতার দু গাল আবারও অশ্রু বন্যায় ভেসে গেলো। হতাশায় নিজ কপাল চাপড়াতে মন চাইলো তাবিবের।
– আবার কেন কাঁদছো?
নিবৃতা নাক টেনে বললো,
– আপনি একটু আগেই ওয়াদা করেছিলেন যে আমাকে আর কখনও বকবেন না। যদি ভুলটা আমারও হয়, তা-ও না।
ঠোঁটের মাঝে জেগে ওঠা হাসিটা কোনমতে আটকালো তাবিব। গম্ভীর ভাব বজায় রেখে বললো,
– বোকা! এটা কি বকা ছিল না-কি!
– তাহলে কি ছিল?
– এটাকে বলে হুমকি! নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম না করার সাবধানী বাণী।
কি বলে লোকটা! নিবৃতা বুঝে না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে তাবিব সামান্য দূরে সরে এলো। এক হাতের বন্ধন ছাড়িয়ে, নম্র স্পর্শে নিবৃতার ভেজা গাল মুছে দিতে দিতে বললো,

– আমি সেদিন রাতের কথা এখনও ভুলতে পারি না। কনকনে শীতের গভীর রজনীতে তুমি মেঝেতে বসে কাঁদছিলে, অথচ আমি একটু আগেই তোমার সাহচর্যে পরিতৃপ্ত হয়ে সুখ নিদ্রায় বিভোর ছিলাম। দু’জন মানুষ কিন্তু অনুভূতিতে কতটা পার্থক্য! আমি মানতে পারি নি। এরপর যখন সবটা জানতে পারলাম, তখন তোমার পাওয়া সেই কষ্টের কারণটা উপলব্ধি করতে পারলাম। আমার ছোঁয়ায় তোমার সেই অমানুষটাকে মনে পরতো। এজন্য আমার সাহস হয় নি তোমাকে স্পর্শ করার। আমি বিশুদ্ধ, মায়াময় আবেগ নিয়ে তোমায় প্রতিবার ছুই, অথচ সেই ছোঁয়ায় তুমি ভয় পাও, এটা আমি মানতে পারছিলাম না। তাই তোমাকে আর কষ্ট দিতে চাই নি। নিজেকে আরেক অমানুষ মনে….
তাবিব আর বলার সুযোগ পায় না। নরম হাত আবৃত করে নেয় ওর ওষ্ঠদ্বয়। নিবৃতা মাথা নাড়িয়ে বলে,
– এভাবে বলবেন না। আপনি কিভাবে তার সাথে নিজেকে তুলনা করলেন? কিভাবে? আপনি তো আমার স্বামী। দয়া করে, আমার জন্য হলেও নিজেকে একটু সম্মান করুন। আমি সেরকম কিছুই ভাবি নি। সত্যি বলছি! হ্যা আমি মানি যে আমার কষ্ট হতো। ভালো লাগতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি কাটিয়ে উঠছিলাম সেসব। আমার বিশ্বাস, আপনি আমায় তখন আগলে নিলে, আজ হয়তো সবটা ঠিক হয়েও যেতো।
তাবিবের চোখ ভিজে আসতে চাইলো। এতোদিন অন্তঃস্থলে প্রতিনিয়ত খোঁচাতে থাকা সেই ব্যাথার অবসান ঘটলো তবে। ও হাতের তালুতে চুমু খেয়ে সেটি সরিয়ে দিয়ে বললো,

– আচ্ছা। আমাকে ক্ষমা করে দাও। ভুল হয়ে গিয়েছে আমার।
নিবৃতা ঠোঁট ফুলিয়ে নীরবে মাথা নাড়ালো। তাবিব ওর মনোযোগ সরাতে বলে,
– তাহলে এখন বলো। কি মনে হয়? আমি তোমাকে অপছন্দ করি?
লোকটার কোন হায়া নেই। কিসব প্রশ্ন করে! স্থির মনি জোড়া বেগতিক হারে ছুটোছুটি করে। লাজে নিবৃতার গাল দুটো উষ্ণ হয়ে উঠলো সহসা। যা নিজ হাতে ছুঁয়ে দিতে পেরে তাবিব শব্দ করে হেসে উঠলো। তবে বাহু বন্ধনে আবদ্ধ রমনীকে ছাড় দেয় না কোন। মুখটা নামিয়ে ফের একই প্রশ্ন করে।
– বলো। আমি কি তোমায় অপছন্দ করি?
এই মানুষটার থেকে কখনও রেহাই পাওয়ার রাস্তা থাকে না। নিবৃতা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য। নিচু স্বরে মিনমিন করে বলে,

– না।
– তাহলে কি করি?
বোকাসোকা হলেও বুদ্ধিমান স্বামীর সাহচর্যে একটু তো কান্ড জ্ঞান অর্জন করেছে নিবৃতা। তাই নিজে পাল্টা প্রশ্ন করে বললো,
– আপনার অনুভূতি। আপনি বলুন। আমি কিভাবে জানবো?
তাবিব মুচকি হাসি সমেত সেই উজ্জ্বল মুখটি দেখে। কেমন রাঙা হয়ে আছে সেটি! তাবিবের এতোটুকু অনুভূতি প্রকাশে এতো খুশি? আজ তাদের মনের মিলটা দ্বিপাক্ষিক হলে দুজনের বন্ধনে সুখের কোন কমতি থাকতো না তাহলে।

– আমি তোমায় ভালোবাসি নিবেদিতা। প্রচন্ড ভালোবাসি। আমার ভালোবাসাকে কখনও প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। তুমি মনে করো, তোমার অতীতের জন্য আমি তোমায় হেয় করেছি, অথচ তুমি যদি জানতে তোমাকে কিভাবে আমার সামনে তুলে ধরেছিল তোমার ভাবি! কিন্তু দেখো! তুমি তোমার স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বে আমাকে জিতে নিয়েছ। আমি সেই মিথ্যেকেই সত্য মেনে তোমাকে ভালোবেসেছি, আগলে নিয়েছি নিজের মাঝে। আমার চোখের তৃষ্ণা মেটায় তোমার এই সরল মুখটা, এই পেলব ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠা স্নিগ্ধ হাসি আমার হৃদয়ের প্রশান্তি। তোমার ডাগর চোখের বোকা চাহনি আমার মস্তিষ্কের শান্তি। তোমার পুরো অস্তিত্বই আমার ভালো থাকার এক কারণ। তোমার পবিত্রতা আমাকে শক্তি দেয়। যেখানে আমি তোমার পুরোটাকেই আপন করে নিয়েছি, সেখানে অতীতের আনাগোনা কেন থাকবে? তুমি তো আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ! আমার মন গহীনে রাজত্ব চালানো এক নির্বোধ নিবেদিতা!
এতো সহজ স্বীকারোক্তি! নেই কোন রাখঢাক কিংবা জড়তা। স্বচ্ছতায় ঘেরা অনুভূতির স্পষ্ট প্রকাশ। নিবৃতার দৃষ্টি আবারও ঝাপসা হয়ে এলো। অশ্রু সিক্ত আঁখি যুগল তুলে কম্পিত সুরে বললো,

– তাহলে কেন যেতে দিতে চাইছেন আমাকে?
আবারও সেই প্রশ্ন! তাবিবের এক অনন্য ব্যর্থতার প্রমান! ও নিবৃতাকে ছেড়ে দেয়। সরে আসে দূরে।
– আমি তোমাকে কখনও আমার অতীত জীবনের কথা জানাই নি৷ কেন যেন প্রয়োজন বোধই করি নি। কিন্তু আমি জানি, আমার হয়ে তাকরিমা আপা তোমাকে সবটা জানিয়েছেন। কারণ তিনি চান, তার ভাইয়ের কষ্টটা কেও বুঝুক, জানুক। তাহলে আশা করছি তুমি জানো, কিভাবে আমার প্রথম সংসার ভেঙেছিল। জানো না?
নিবৃতা ছোট করে বলে,
– জানি।
– সে যখন আমার কাছে বিচ্ছেদ চাইলো তখন, আমি পারলে তাকে আটকাতে পারতাম। নানান কারন দেখিয়ে, যুক্তি খাটিয়ে তার যাওয়ার রাস্তা আমি চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তেমনটা করি নি।
নিবৃতা কৌতুহলী কন্ঠে বলে,
– কেন?

– কারণ তার সাথে ঘর বাঁধার একটাই কারণ ছিল যে সে আমাকে ভালোবাসে। আমি না বাসলেও সে বাসতো। কিন্তু তখন ঐ মূল কারণটারই আর অস্তিত্ব ছিল না। তার সমস্ত ভালোবাসাধুলো মাখা ছাইতে পরিণত হয়েছিল। এবং আমি সেই মানিয়ে নেওয়া জোরজবরদস্তির সংসার চাই নি। তাই তাকে মুক্ত করে দিয়েছি।
তাবিব থামে। পরপর এক শ্বাস ছেড়ে বলে,
– তোমার সাথে বিয়েটা ভালোবাসার কারণে ছিল না। তবুও না চাইতেও আমি আমার জীবনে প্রথমবার প্রেমে পরেই গেলাম। ভালোবাসে ফেললাম তোমাকে। যদি তোমায় না চাইতাম, তাহলে হয়তো তোমাকে যেতো দিতাম না। কিন্তু এখন আমি তোমায় মুক্ত করতে বাধ্য। তুমি আমায় ভালোবাসো না। আর আমি এমন সম্পর্ক চাই না যেটা জোরের উপরে, অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকে। অবশ্যই আমার মেয়ে অন্য কেও নয়। কিন্তু ও এখন বড় হয়েছে। তাছাড়া তোমার সঙ্গে সবচেয়ে ভালো থাকে। তাই আমি আর আপন স্বার্থে তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না নিবেদিতা।

– আপনি আমাকে ছেড়ে দিচ্ছেন, কারন আমি আপনাকে ভালোবাসি না?
– ছেড়ে দিচ্ছি না। তোমার খুশির রাস্তায় শুধু বাঁধা হতে চাচ্ছি না। তোমাকে ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার পুরোটা জুড়ে সবসময় তুমিই থাকবে।
নিবৃতা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কেমন যেন এক গুমোট নীরবতা নেমে এলো তাদের মাঝে। এরপর হঠাৎই নিবৃতাকে বলতে শোনা যায়,
– ভালোবাসার সংজ্ঞা কি সবক্ষেত্রে একই হয়?
তাবিবের মনোযোগ ছিল না৷ আচমকা এই প্রশ্নে ও কিছুটা হতবাক হলো। তবুও সময় নিলো না প্রত্যুত্তর করতে।
– নাহ। ভালোবাসার নানান রূপ আছে। একেকজনের কাছে একেক রূপে ধরা দেয়। কেন বলো তো?
নিবৃতা এবার নিজ থেকেই কাছে এগিয়ে এলো। তাবিবের ভারি হাত দুটো নিজের জীর্ণ হাতের মাঝে নিয়ে বলে,

– আমি কি আপনাকে সম্মান করি না?
– হ্যা। করো তো।
– আমি কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে সবার আগে কার শরণাপন্ন হই?
তাবিব ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তবে জবাব দিতে ভুলে না।
– আমাকে।
– আমি সবচেয়ে বেশি কাকে বিশ্বাস করি?
মৌখিক স্বীকারোক্তি ইতোপূর্বে না মিললেও তাবিব এর উত্তর জানে।
– আমাকে।
– আপনার ছোট থেকে ছোট বিষয়ের খেয়াল কে রাখে?
– তুমি।
– আপনার পছন্দ মোতাবেক কে চলে?
তাবিব হেসে উঠে এবারে।
– অবশ্যই তুমি।
– আপনার একান্ত বাধ্যগত কে?
তানহা? সেটা কখনও নয়। মেয়ের তো আবদারের শেষ নেই এবং তাবিব সেগুলো খুশি মনেই পুরন করে।

– তানজিবের মিসেস।
– আমি অবুঝ৷ কিন্তু বোধ জ্ঞানে কখনও আপনাকে কষ্ট দিয়েছি?
– কখনোই না।
– আপনাকে খুশি করতে আপনার পছন্দের খাবারগুলো কে রান্না করে?
তাবিব প্রশস্ত হাসে।
– আমার নিবেদিতা।
– কথা দিচ্ছি, ভবিষ্যতে অন্য কিছু পারলেও সেটা আপনার জন্য করবো।
– আচ্ছা।
– আপনাকে বলি নি, কিন্তু আপনার মন খারাপ দেখলে আমি একটুও স্বস্তি পাই না। বিশ্বাস করেন তো?
তাবিব ওদের হাত বন্ধনীতে মৃদু বল প্রয়োগ করে আশ্বাস দিয়ে বলে,
– অবশ্যই করি।
– আপনাকে আমি বলি না কারন আমার লজ্জা করে, কিন্তু আপনার থেকে দূরে থাকতে আমার ভালো লাগে না এখন আর। আমি কিন্তু সেদিন রাতে এসেছিলামও নিজ থেকে কিন্তু আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তাবিব মুচকি হেসে বলে,

– এটাও বিশ্বাস করলাম।
নিবৃতা এবারে লম্বা শ্বাস টানে। তাবিবের চোখে চোখ রেখে বলে,
– এটা সত্য যে আমাদের বিয়ে তানহার জন্যই হয়েছে। এটাও সত্য আমি আপনার থেকে পালিয়ে বাঁচতাম। কিন্তু এখন তো আর সেরকম নয়। সময় পরিবর্তন হয়েছে তার সাথে মনের অবস্থারও। কিন্তু সেই ফারাক টুকু আমি প্রকাশ করতে পারছি না। আমি তো একটু ওরকমই। কেমন অদ্ভুতুরে। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে ব্যর্থ। কিন্তু আপনি তো আমাকে বুঝেন তাই না? তাহলে বলুন তো। আমি এগুলো কেন করি? কেন এতো মায়া কাজ করে। শুধুমাত্র তানহার বাবা হওয়ার জন্য কি আমার এতোকিছু করার প্রয়োজন ছিল? তাহলে কেন? কোন অনুভূতির টানে আমি এতো দ্বায়? এটা কি শুধুই পছন্দ? তাহলে আমাকে যখন বলা হলো, আমাদের সংসার আর থাকবে না তখন কেন নিজেকে দিশেহারা লাগছিলো? এই অসময়ে কেন ছুটে এলাম আমি? আপনিই বলুন৷ আমার এই প্রশ্নের জবাব দিন আপনি। এই অনুভূতির নাম কি?

তাবিব নির্বাক বনে শুনে গেলো স্ত্রীর বলা প্রতিটি শব্দে। কি বলবে ভেবে পেলো না। শুধু অনুভব করলো এক অমোঘ প্রাপ্তির তোরে ওর দু চোখ ভিজে আসছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সহসা মাথা নামিয়ে অস্ফুটে হেসে ফেললো তাবিব। সাথে চোখ দিয়ে ক্রমাগত গড়িয়ে পরতে লাগলো সুখাশ্রু!
নিবৃতা যখন বুঝলো এই সুন্দর মনে মানুষটা ওর জন্য কাঁদছে তখন ওর নিজের মনটাও ভেঙে গেলো। ওর মনে হলো, আবারও মানুষটাকে ভীষন কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। ধিক্কার করলো নিজেকে৷ ক্রন্দনরত স্বরে বললো,
– আমি আপনাকে আর কষ্ট দিবো না। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর কোন অযথা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না।
নিবৃতা সেখান থেকে উঠে যেতে চাইলো। কিন্তু ঠিক তখনই এক শক্ত হাত ওকে হ্যাচকা টানে নিজের সাথে বেঁধে নিলো৷ নিবৃতা হুমড়ি খেয়ে পরলো তাবিবের বক্ষ মাঝে। পরপর অনুভব করলো, তাবিব ওকে সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে নিজের সাথে।

– এটাকে ভালোবাসা বলে নিবেদিতা। বোকা মেয়ে! তুমি তো খুব বাজেভাবে ফেঁসে গিয়েছ। এই তানজিবের কাছ থেকে আর রেহাই নেই তোমার৷ এই আমাকে ছাড়া তোমার এখন আর চলবে না যে!
ভরসা সম্পন্ন সেই বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে হেসে ফেললো নিবৃতা। ওভাবেই বিড়বিড় করে বললো,
– আমি আপনাকে ভালোবাসি।

নিবৃতা পর্ব ৩৩

আমোদে তাবিবের দু’চোখের পাতা বুঁজে এলো। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পরলো সুখময় বারিধারা! এতোদিনে তাবিবের শূন্য ঝুলি পূর্ণ হলো। ঘুচলো করুন নিঃসঙ্গতা। মন জমিনে সৃষ্ট হওয়া চৈত্র খরায় প্রেমের বৃষ্টি ঝরালো নিবৃতা। ভালেবাসার রঙ বেরঙের প্রজাপতিরা উড়লো মুক্ত ডানা মেলে।

নিবৃতা পর্ব ৩৫