Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৫

নিবৃতা পর্ব ৫

নিবৃতা পর্ব ৫
নেহার ছায়ালিপি

ছিমছাম, গোছালো, আড়ম্বরহীন একটি ফ্ল্যাট। বড় একটি মাস্টার বেডরুমসহ ও দুটি মাঝারি আকৃতির ঘর, আলাদাভাবে সাজানো ড্রইং ও ডাইনিং স্পেইস, তিনটি ওয়াশরুম, তিনটি বারান্দা ও একটি রান্নাঘর নিয়েই এই সাধারণ বাসাটি তৈরি। দুই বাবা, মেয়ের সংসারে অবশ্য এতটুকুই প্রয়োজনের বেশি ছিল এতেদিম। তাছাড়া অন্যান্য ঘরে কারও তেমন একটা বিচরণ ঘটে না সচারাচর। নিবৃতার হাত আঁকড়ে ধরে তাকে পুরো বাসাটি অত্যাধিক আগ্রহ নিয়েই দেখিয়ে চলেছে তানহা। কোথায় খুটিনাটি কি আছে বা কি নেই, সবটাই তার নখদর্পনে। সেটাগুলোই এখন নিবৃতার মাঝে হস্তান্তরের পরিকল্পনা তার। এই সংসারে যে এবার কর্ত্রীর আগমণ ঘটেছে। অতচ নিবৃতার কদমগুলো তানহার সাথে মিললেও চোখের দৃষ্টি কিংবা অজানাকে জানার কৌতুহল, চাওয়া, কোনটাই উঠলো না। শুধু নীরবে শুনে যাচ্ছে সবকিছু। সে আদোতে করবেই বা কি? সংসার সামলানোর তরিকা, বা সংসারের ছোট থেকে বড়, কোন ধরনের কাজ সম্পর্কেই তার কোনরূপ ধারনা নেই। এ ক্ষেত্রে তার জ্ঞানের ভান্ডার পুরোই ফাঁকা, রিক্ত। মনোযোগ তো আসছেই না বরঞ্চ তানহার একের পর এক বলে চলা চঞ্চল বাণীগুলো ওর মাথার ভেতরে আরও জটিলতা পাকিয়ে দিলো। বুঝতে পারছে না প্রত্যুত্তরে কি বলা উচিত। কেমন অসহায় লাগলো খুব করে।

– এটা হচ্ছে বাবার ঘর।
মাস্টার বেডরুমটা তুলনামূলক বড়। অন্যান্য ঘর যাও সে একটু দেখেছিলো, কিন্তু এটা? এখানে এসেই ওর মাঝে সীমাহীন দ্বিধা ও সংশয় জড়ো হলো। কেমন অস্বস্তিকর অনুভূতি!
– বাবার ঘরটা একদম অন্যরকম না?
তানহার গলায় ভীষন করে জানার স্পৃহা। ওর আশাভঙ্গ করতে চাইলো না নিবৃতা। চারপাশে চোখ বুলাতেই ওর নজর আটকে গেলো। ঘরটাকে মানুষের ঘর কম বই, খাতার আবাসস্থল বেশি লাগছে। কক্ষটির একদম মাঝ বরাবর একটি বড় খাট, এক দিকে পাশাপাশি একটি তিন পাল্লার আলমারি ও ড্রেসিং টেবিল রয়েছে। এরপর এই ঘরে যাদের অস্তিত্ব রয়েছে তারা হলো শুধুই বই। একদম বিপরীত পাশে পরপর চারটি বুক শেল্ফ রাখা। যেগুলো মোটা, স্ফীত বাঁধাইয়ের বইয়ে ভর্তি। এমনকি পড়ার টেবিলটায় পর্যন্ত এলেমেলো বইয়ের স্তুপ। এক কথায় যেন লাইব্রেরী! নিবৃতার এমন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে তানহা শব্দ করে হাসলো। ওর হাত ছেড়ে দিয়ে বিছানায় বসে পা দুলাতে দুলাতে বললো,

– বাবা পড়ালেখা ছাড়া কিছুই বুঝে না। যতক্ষণ বাসায় থাকবে হয়ত আমাকে সময় দিবে নাহলে বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকবে৷ অবশ্য এখন তার আরও লাভ! আপনি এসেছেন। তার ভার কমলো। এখন আমার সময়য়ের কিছু অংশ সে তার প্রাণের বইগুলোকে দিতে পারবে।
নিবৃতা গোল গোল চোখে চাইলো। কেন যেন, আজ প্রশ্ন করার ইচ্ছে জাগলো। ইতস্তত করে তানহার পাশে, বিছানায় বসে, কৌতুহলী কন্ঠে বললো,
– উনি এখনও পড়ালেখা করেন? আমি তো শুনেছিলাম উনি ডাক্তার!
একদমই সরল তার গলার স্বর! তানহা কিয়ৎক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থেকে পরপর শব্দ করে হেসে ফেললো! তার ম্যামটা একটু বেশিই ভালো মানুষ। ওর নিষ্পাপ মনে বোকা কিংবা নির্বোধ ধরনের শব্দ এক মুহুর্তের জন্যও এলো না। শুধু মনে হলো, এই মানুষটা অনেক সহজ, নরম। ও নিবৃতার বাহু জড়িয়ে বললো,
– বাবা তো ডাক্তারই। কিন্তু পাশাপাশি পড়াশোনাও করে। কতগুলো ডিগ্রি নিয়েছে, আরও ভালো ডাক্তার হওয়ার জন্য। বাবার পড়াশোনা বোধহয় কখনও শেষ হবে না।
আচ্ছা, এবারে কিছুটা হলেও বুঝলো সে৷ বাবা বলেছিলো নিবৃতাকে মাস্টার্স করাবে। সেরকমই কিছু একটা হয়তো। যদিও সেটা আর সম্ভব হয় নি। তাই নিবৃতা সম্মতি জানাতে মাথা দোলালো। মৃদু করে বললো,

– আচ্ছা।
– সাপ্তাহিক ছুটিতে, এগুলো বসে বসে পরিষ্কার করে বাবা। এক সপ্তাহের মাঝেই কেমন ধুলো পরে যায়। আর না পরলেও বা কি? এগুলো তার অনেক যত্নের। কিন্তু বাবার সময় না হলে আমি করে দেই।
– এখন থেকে আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
কাজটা সহজই লাগলো। তাই নির্দ্বিধায় নিবৃতা আগ বাড়িয়ে দায়িত্ব বুঝে নিতে চাইলো। তানহা মাথা দুলিয়ে বললো,
– ঠিক আছে। এখন চলুন আমার ঘরটা দেখাই!
– চলো।
তানহার মাঝামাঝি পরিধির ঘরটাই এ বাসার সবচাইতে আরামদায়ক একটি কক্ষ। গোছানো, পরিপাটি, মনোরম অনুভূতি সম্পন্ন। ঘরে ঢোকার সময়ই দরজার উপর কতগুলো কি যেন টুংটাং শব্দ করে উঠলো। নিবৃতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেখানে। লম্বা লম্বা কয়েকটি সোনালি রঙের ধাতব বস্তু, ছোট ছোট কৃত্রিম পাখি ও অনেক কিছু। আঙুল তাক করে বললো,

– এটা কি?
– এটাকে ডোর চাইম বলে। সুন্দর না?
নিঃশব্দে মাথা দোলায় নিবৃতা। জিনিসটা অদ্ভুত লাগলেও সুন্দর। তানহার ঘরের দেয়াল জুড়ে জল রঙে আকা সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। গাছপালা, ঘরবাড়ি, পাহাড় – পর্বত, ঝরনা, সমুদ্র থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। সিলিং জুড়ে তুচ্ছ আকারের তারকারাজি, যেন কৃত্রিম আসমান সেটা। এগুলো রাতের অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। পর্দাগুলোর উপর মরিচ বাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নাইটস্ট্যান্ডের উপর ফেইরি লাইটে সাজানো একটি কৃত্রিম গাছ, বিছানার ওপর পাশে থাকা লম্বাটে ল্যাম্পটি অনেকগুলো উইশ বল দিয়ে পরতে পরতে পেঁচিয়ে সাজানো। খাটে গোলাপি রঙের চাদর, ড্রেসিং টেবিলে নানান বাতির উপস্থিতি। এ যেন এক অঢেল প্রাণের সঞ্চার। তানহার মতোই তার সবকিছু জীবন্ত, রঙিন, ঝলমলে। নিবৃতা, যে আঁধারে অভ্যস্ত, তার জন্য এতো আলো সহ্য করা কঠিন হয়ে এলো। কেমন যেন চোখ দুটো জ্বলে উঠলো। তানহা ওকে চোখ পিটপিট করতে দেখে দ্রুতই সফেদ আলো বাদে সব নিভিয়ে দিলো।

– ভালো লাগে নি ম্যাম?
নিজের সমস্যা এক পাশে রেখে নিবৃতা ক্ষীণ হাসলো।
– তোমার মতো তোমার রুমও ঠিক ঝলমলে।
তানহা যেন প্রশ্রয় পেয়ে বসলো। দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠলো,
– আমার আলো খুব পছন্দ! আমি যেখানে থাকবো সেখানে সবকিছু চকচক করবে, সেটা আমার অনেক ভালো লাগে। আমার না চুপ করে থাকতে ভালো লাগে না। অবশ্য এটা আপনি জানেনই। আর বাবা যতক্ষণ বাসায় থাকে আমি সারাক্ষণ তার পাশে বসে বকবক করি। বাবা পড়ালেখা করে আবার আমার কথাও শুনে।
হঠাৎ করেই ওর মুখের হাসি মুছে গেলো। উদাস গলায় বলে উঠলো,
– কিন্তু বাবা খুব কম সময়ই বাসায় থাকে৷
নিবৃতা দেখছিলো তানহাকে। নিজের সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের মেয়েটাকে খুব মনোনিবেশ দিয়ে শুনছিলো। নিবৃতার ঠিক যা যা অপছন্দ, অসহনীয়, তানহার কাছে ওগুলো সবই পছন্দের! নিজের সাচ্ছন্দ্যের গন্ডী পারি দিয়ে এই মেয়েটার সাথে ওকে মানিয়ে নিতে হবে। তবে এতে খারাপ লাগছে না নিবৃতার। বরঞ্চ সে তো জানে, এতদিন যে জীবনে ও অভ্যস্ত ছিল, যে তমসায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলো, সেগুলো ধীরে ধীরে ওকে ভঙ্গুর সত্তায় পরিণত করেছে। অস্বাভাবিক করে ছেড়েছে। এখন যদি এই স্বচ্ছ, নিষ্পাপ মনের বাচ্চাটার হাত ধরে ও একটু স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারে তাহলে ক্ষতি কি? ওর মরিচা পরা জীবনে আলোর ছটা হয়ে এসেছে তানহা। তার ঝিলমিল। ও উঠে দাঁড়ালো। তানহার নরম হাতটা পাকড়াও করে বললো,

– এখন থেকে আমি সারাক্ষণ তোমার সাথে থাকবো। দুজনে মিলে খুব কথা বলবো, অনেক মজা করবো!
স্নিগ্ধ মুখটা দেখে তানহার মুখেও হাসি ফুটলো। খুশির স্পষ্ট প্রতিফলন সেই ভাসা ভাসা চোখ দুটোতে দেখা গেলো। নিবৃতা গভীর নিবেশে সেটি লক্ষ্য করে বললো,
– আমাকে তুমি করে বলবে।
সহসা তানহার মাঝে কিছুটা বিস্ময় দেখা গেলো এবারে। মুখ ফুটে বললো,
– ম্যামকে কেউ তুমি বলে?
– তাহলে ম্যাম ডাকবে না।
সহজভাবেই কথাটা বলে সরে এলো নিবৃতা। এই ভারি শাড়ি পরিবর্তন করা উচিত এখন। ভালো লাগছে না। অনুসন্ধানী দৃষ্টি বুলায় চারপাশে। ওর লাগেজটা কোথায়? মনে পরে বসার ঘরে রাখা হয়েছিল তখন। ও হাটা ধরলো সেখানে। তানহাও মৌন বনে ওকে অনুসরণ করতে করতে বললো,
– তাহলে কি বলে ডাকবো?
– তোমার ইচ্ছে।

সাবলীলভাবেই প্রত্যুত্তর করলো নিবৃতা। লাগেজটা টেনে নিয়ে পুনরায় তানহার ঘরে চলে এলো। মেঝেতে বসে সেটি খুলতে শুরু করলো। ফাঁকা মস্তিষ্ক নিয়ে তানহাও ওর একদম পাশ ঘেঁষে বসে পরলো। ও খুবই সহজ ও প্রাণখোলা স্বভাবের হলেও এ বিষয়ে ওর খুবই দোটানা কাজ করলো। তার বাবা ওকে সবসময়ই আপন সীমা বুঝে চলা শিখিয়েছে। তাই ওর মনে হলো যদি আগ বাড়িয়ে স্বদিচ্ছার কথা জানায় তাহলে যদি অনধিকার চর্চা করে ফেলে? তাহলে ওর একটুও ভালো লাগবে না। সারাজীবন সেই ডাকে কাওকে ডাকার সুযোগ মিলে নি ওর। অথচ সেই ডাকটাই প্রত্যেক মানুষের জীবনের সবচাইতে আপন ও মূল্যবান ডাক। পবিত্র ও গভীর একটি সম্পর্ক! ওর চোখ ভিজে আসতে চাইলো। মনে দ্বিধা নিয়ে নিস্তেজ স্বরে বললো,

– আমার মাথায় তো কোন ডাক আসছে না। আপনিই বলে দিন।
লাগেজের ভেতরে এতো এতো শাড়ি দেখে নিবৃতার কপালে ভাজ পরলো। ভাবি কি জানে না যে ও শাড়ি পরতে পারে না? একটু তো নরম হওয়াই যেতো ওর প্রতি। শাড়িগুলো একটা একটা করে নামিয়ে ভেতরে খুজতে লাগলো ও, যদি কোন জামা পাওয়া যায়। মনোযোগ সরে এসেছে এদিকে। তবুও তানহার কথায় বললো,
– তুমি করে না ডাকতে বললাম?
তানহা ঠোঁট ভেজালো। কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরপর বললো,
– তু – তুমিই বলো, কি নামে ডাকি তোমায়।
অন্যমনস্ক নিবৃতার গলা। তবুও এতো গুরুতর কিছু বড্ড অবলীলায় বলে বসলো ও।
– মা, আম্মা, মাম্মা, মামনি, আম্মু। কতো ভাবে ডাকা যায় আজকাল। তোমার কোনটা ভালো লাগে?
সরল, স্নিগ্ধ, পছন্দের মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে তানহা ধীর স্বরে বললো,

– আম্মু।
– তাহলে আজ থেকে আমি তোমার আম্মু।
অবশেষে কামিজ মিলেছে। স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে নিবৃতা। লাগেজের চেইন টেনে লাগিয়ে, সেটা তুলে, উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
– ঝিলমিল, তুমি একটু বসো হ্যা? আমি একটু কাপড়টা বদলে আসি। যাবো আর আসবো। পারবে না একা থাকতে?
এ যাবতকাল তো একাই থেকে এসেছে তানহা। আর আজ? এক দিনে কেমন সব বদলে গেলো। ও মৃদু লয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো,
– পারবো।
– আচ্ছা।
তানহার চুলগুলো ঝাঁকিয়ে দিয়ে ওর ওয়াশরুমে চলে গেলো নিবৃতা। জটিলতা, গভীরতা কিংবা অনুভূতির দোলাচল সম্পর্কে অজ্ঞাত নিবৃতা বুঝলোই না, এই মাত্র, তাকে একটি নামে ডাকার অনুমতি দেওয়ায় তানহা নামক ছোট মেয়েটার মনে সে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে এলো। নিজের অজান্তেই কাওকে তার সব না পাওয়াটা এক পলকে বুঝিয়ে দিলো, হয়ে উঠলো তার সবচেয়ে আপন কেউ, তার আম্মু! এ যেন সাধারণ কোন সম্বোধন নয়, হৃদয়ের মাঝে গেঁথে যাওয়া নতুন এক সম্পর্কের সূচনা!

দ্রুত ফিরতে চাইলেও তাবিবের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ন’টা বেজে গেলো। কাজের চাপে, ক্লান্তিতে সাদা পাঞ্জাবির মসৃণতা ছুটে গিয়ে স্পষ্ট ভাজ পরেছে। পরিপাটি করে রাখা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে এসেছে৷ সেগুলোই হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে কলিং বেল বাজালো সে৷ অতিরিক্ত চাবি থাকলেও কখনও তাবিব সেটা ব্যবহার করে না। প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রয়োজন। কিন্ত দরজা খুলতে যদি বেশি দেরি হয়ে যায় তাহলে চিন্তা হয়। তখন হয়তো কালেভদ্রে ব্যবহার করতে হয়। তবে আজ সেরকমটা হবে বলে মনে হচ্ছে না। মেয়ে তো কলিং বেলের আওয়াজ পেলে এক মুহুর্তে দৌড়ে চলে আসে। অতঃপর দরজা খুলে বিস্তর হেসে ওর কাঁধ থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে ঘরে ছুটবে। অথচ আজ, কয়েক মুহুর্ত পার হলেও কোন সাড়াশব্দ মিললো না। ভ্রু গুটিয়ে আবারও বেল দেয় তাবিব। এবারও অপেক্ষার অবসান ঘটে না। কি হলো? মানিব্যাগের জন্য প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই দরজার অপার থেকে করাঘাতের শব্দ মিলে। তাবিবের হাত থেমে যায়। কি হচ্ছে? ও দরজার কাছে আরেকটু এগিয়ে যেতেই কানে বাজে অতি চিকন, সূক্ষ্ণ এক কন্ঠস্বর।

– কে?
দরজার পিপ হোলটা ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে। কোন কাজের না। তাহলে কি এতোক্ষণ যাবত সেই নতুন মানুষটা কে, কে, করেই চলেছে? নিজের উপর দুঃখ হলো তাবিবের সাথে ওর উপরও। সে সত্যিই শুনতে পায় নি। হাফ ছেড়ে বললো,
– আমি, তাবিব।
কয়েক পলের মাঝে দরজা খুলে গিয়েছে। খুবই ধীর গতিতে সেটি প্রসারিত হতেই তাবিব মৃদু গলা খাঁকারি দেয়। অতঃপর ভেতরে ঢুকতেই বুঝে দরজার পেছনো নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে। ও সরে যেতেই দরজাটি আস্তে ধীরে লাগিয়ে দিলো সে। শাড়ি বদলে নীল রঙের একটি সালোয়ার কামিজ পরেছে। মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টানা কিন্তু সিক্ত, দীঘল কেশরাশি পেছনে কোমর ছুঁয়ে অনেকটাই নিচে নেমে এসেছে। যতক্ষণ না নিবৃতা এ পাশে ফিরলো ততক্ষণ তাবিব ওকে কেন যেন দেখেই চললো। কারণ না অকারণে, কে জানে! তবে বুদ্ধিমান সে কায়দা করে চোখ সরিয়ে নিলো শেষ মুহুর্তে। নিচে তাকিয়ে জুতো খুলতে খুলতে বললো,
– আপনি যে, তানহা কোথায়?
কিছুক্ষণের মৌনতার পর কানে বাজলো উত্তর।

– ওয়াশরুমে।
এতোটুকু একটা জবাবে এতোটা সময় লাগায় কেন? তাবিব নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে এক পল তাকালো রমনীর দিকে, যে এই মুহুর্তে তাবিবের পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘোমটায় কপাল অবদি ঢাকা। তাবিবের হাসি পেলো। মেয়েটা কি এমনই? না অভিনয় করছে? যতটুকুই তার সম্পর্কে শুনেছে, সে হিসেবে এতোটা লাজুক, রক্ষণশীল হওয়ার তো কথা ছিল না। নাকি পরে গিয়ে, হোচট খেয়ে শিক্ষা পেয়েছে। ও ঠিক জানে না এসব। এখন আর জানতেও চায় না। দু’পক্ষেরই কিছু না কিছু তথাকথিত খুঁত বা খামতি রয়েছে, ও চাইছে সবটা ভুলতে। যদি মেয়েটা তার বিশ্বাসের যোগ্য হয়ে উঠে, তাহলে অযথা জটিলতা বাড়াতে ওর কোনও ইচ্ছে নেই।
তাবিব জানতে চেয়ে বললো,
– কোন অসুবিধা হয় নি তো?
নিবৃতা চুপ থেকে ডানে বায়ে মাথা নাড়ালো ক্ষীণ গতিতে। তাবিব ওর দিকে গভীর নয়নে তাকিয়ে থেকে বলে,
– আপনার কি মুখে কথা বলতে কষ্ট হয়?

এই প্রসঙ্গ কেন উঠলো? বিভ্রান্ত নজরে নিবৃতা চোখ তুলে চাইতেই তাবিব মুচকি হেসে বললো,
– উত্তরটা ছোট হলেও মুখে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আমার বুঝতে সুবিধা হয়। আপনার মা’কে কথা দিয়ে এসেছি, তার মেয়েকে ভালো রাখবো। তাই সেজন্য, একটু হলেও, দয়া করে সহযোগিতা করার চেষ্টা করবেন।
তাবিবের সম্মুখে তার অপার জড়তা। মুখ ফুটে কথা বেরোতে চায় না। তাই তাবিব সরাসরি একটা সমাধানে আসার চেষ্টা করলো। তবে নিবৃতা কি বুঝলো কে জানে, প্রত্যুত্তরে আবারও মাথা নাড়ালো। তৎক্ষনাৎ তাবিবের চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে আসে। কি সমস্যা? ও পীঠ টানটান করে। বুকে দু-হাত গুঁজে দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। জহুরি নজর সরাসরি সামনে দাঁড়ানো ছিপছিপে গড়নের মেয়েটার উপর। তার পায়ের আঙুলগুলো গুটিয়ে এমন শক্তভাবে মেঝে আঁকড়ে রাখা যেন খানিকটা বল ছাড়ালেই নির্ঘাত মুখ থুবড়ে পরবে। হাত দুটে মুষ্টিবদ্ধ করে দু পাশের কামিজ পাকড়াও করে রাখা। এলোমেলো দৃষ্টি ঘুরপাক খাচ্ছে মেঝে জুড়ে। ইতিমধ্যে নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। আশ্চর্য সে কি ভয় পাচ্ছে তাবিবকে?

নিজের উপর এরূপ নিরন্তর, নিরবিচ্ছিন্ন গভীর আপতিত দৃষ্টি অনুভব করতে পেরে নিবৃতার সমস্ত কায়া এক অজানা ভীতিতে জমে উঠে। বুকের ভেতর তীব্র ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছে। গলায় শ্বাস এসে আটকা পরেছে যেন। ভদ্র, সভ্য জানা মতন মানুষটা এমন ভয়ংকর আচরণ করছে কেন আজ? মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসছে, কিন্তু ও চাইছে কারণটা খুঁজে বের করতে।
পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে এগোচ্ছে। দৃশ্যমানভাবে কাঁপছে মেয়েটা। এ যাত্রায় তাবিবের মায়া হলো তবে একটা বিষয়ও বুঝলো যে, মেয়েটার মানসিক অবস্থার চরম অবক্ষয় ঘটেছে। আত্ম বিশ্বাস কিংবা দৃঢ় ব্যাক্তিত্ব কোনটাই নেই তার৷
– এর আগেও আমি বলেছি, আমার কথার উত্তর আপনি সশব্দে জানাবেন। ইশারা ইঙ্গিত আমি তেমন একটা বুঝি না।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাথা ঝাকালো নিবৃতা। পরপর বুঝলো আবারও ভুল করেছে। তাই পুনরায় মাথা নাড়িয়ে কথা বলতে বুঝলো একই কান্ড আবারও ঘটেছে। নিজের নির্বুদ্ধিতায় এবার গাট হয়ে গেলো ও। শক্ত করে চোখ বুজে ফেললো।
এই অদ্ভুতুরে দৃশ্য এতক্ষণ কপালে ভাজ ফেলে দেখলেও এবার হাসি পেলো তাবিবের। ঠোঁট গুটিয়ে হাসি আটকাইতেই শুনলো কাঙ্ক্ষিত জবাব।

– জ্বি, বুঝতে পেরেছি।
তবে তাবিবের কি যে হলো, এতো অল্পতেই বিষয়টাকে ও ছাড়লো না। ডান ভ্রু উচিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
– কি বুঝেছেন?
কি বুঝেছে নিবৃতা? ওর নিজের মনেও প্রশ্ন জাগলো। মুহুর্তেই মুখটা কেমন কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠলো। পুরো বদন আইঢাই করে উঠলো। বুদ্ধিমান তাবিব সেটুকু বুঝলো। নিবৃতার মায়ের কথাটুকুও ওর মনে আছে। নিবৃতাকে বোঝা কিংবা বোঝানো, দুটোই একটু সময় নিয়ে করতে হবে।
– এখন থেকে আমি কোন কথা বললে, তার প্রত্যুত্তর মুখে করবেন। মাথা নাড়াবেন না।
– আচ্ছা।
ঝটপট জবাব, যেন এই পরিস্থিতি থেকে সে কোনমতে রেহাই পেতে চাইছে। কিন্ত তাবিবের দয়া এবারেও হলো না ফের বললো,
– আমার যা প্রশ্ন ছিল। এতক্ষণে কোন সমস্যা বা অসুবিধা হয়েছিল আপনার?
– জ্বি না।
আর কিছু বললো না তাবিব। কোনমতে হাসি নিবারন করে, চললো নিজের ঘর অভিমুখে। পেছনে রেখে গেলো হয়রান নিবৃতাকে। যে এবারে বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করতে নেমেছে। ও দেখলো লোকটা চলে গেলো, নিজের মতো। কেমন একরোখা স্বভাবের। কঠিন ব্যাক্তি! নিজেরটাই বোঝে শুধু। নিবৃতা ভেবে রাখলো, আর যতদিন সে দেশে আছে, চেষ্টা করবে যেন লোকটার সম্মুখে কোন কারণ ছাড়া না পরতে। আড়ালে আবডালে থাকতে হবে।

গোসল শেষ করে তয়লা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বের হতেই বরাবরের মতো একই দৃশ্যের দেখা মিললো। মেয়ে তার বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে। অস্থির, চঞ্চল তার পা দুটো ক্রমাগত নেড়ে চলেছে। বাবাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো। তাবিব গিয়ে টেবিল থেকে চশমাটি চোখে তুললো। তখনই তানহা গাল ফুলিয়ে বললো,
– ব্যাগ নিয়ে আসো নি। তাহলে তোমার প্যান্টের পকেট আজ খালি কেন?
তাবিব মুচকি হেসে বারান্দার দিকে যেতে যেতে বললো,
– কেউ আজ ভুলে গিয়েছে যে আমি পাঞ্জাবি পরেছিলাম।
তৎক্ষনাৎ লাফিয়ে উঠলো সে। হ্যাঙ্গারে ঝুলতে থাকা শুভ্র পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিতেই মিললো কতগুলো চকোলেট। এরকমটাই হয়ে আসছে সবসময়। বাহির থেকে কখনও খালি হাতে ফেরে না তাবিব। কিছু না কিছু একটা সে নিয়ে আসবেই মেয়ের জন্য। আর আহ্লাদি মেয়ে তার সেটা লুফে নিবে দু হাতে। প্রশস্ত হেসে ও গিয়ে বাবার বাহু জড়িয়ে ধরলো। তাবিব মৃদু হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

– তোমার পেশেন্ট এর কি অবস্থা এখন?
– একটু ভালো।
– একটু কেন? পুরো ভালো কবে হবে?
তানহার প্রশ্নে তাবিবের মনে আঁধার জমে। ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া এক প্রকার স্বপ্নই বটে। তবে ও চেষ্টা করে চলেছে। নিজের সর্বোচ্চটাই দিচ্ছে।
– যেদিন রব চাইবেন।
তানহার বুঝে আসলো পরিস্থিতি জটিল। তাই প্রসঙ্গ বদলাতে ডাগর ডাগর চোখে চেয়ে বললো,
– ক্ষুধা পেয়েছে।
তাবিবকে এবারে ত্রস্ত দেখালো।
– কি খাবে? বলো।
তানহা কিছুক্ষণ ভেবে বললো,
– রুটি!
– চলো তাহলে বানাই।
একা বসায় তানহার চুলোর কাছে যাওয়া নিষিদ্ধ। দিনের বেলা কাজের খালা রেঁধে দিয়ে যান। তবে বাবা বাসায় থাকলে তানহা ও সে মিলে প্রায়শই রান্নাবান্না করে। তাবিবের সবটাই আয়ত্তে রয়েছে। হাতের রান্না চমকপ্রদ স্বাদের না হলেও মেয়ের কাছে সেই সেরা। আর এটাই ওর কাছে যথেষ্ট। ঘর থেকে বের হতে গিয়েই তাবিব খেয়াল করলো, যে মেয়ে চকোলেট দেখলে হামলে পরে সে আজ না খেয়ে সেগুলো মুঠো পাকিয়ে ধরে রেখেছে। ও জানতে চেয়ে বললো,

– কি হয়েছে? চকলেটটা পছন্দ হয় নি? এই ফ্লেভারটা তো মজার!
নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে তানহা আবার হাসলো। কন্ঠে এক রাশ আশা নিয়ে বললো,
– আম্মুর সাথে মিলে খাবো।
কথাটা কানে যেতেই তাবিব থমকানো দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। আশ্বস্ত হওয়ার জন্য বললো,
– কার সাথে?
তানহা এবার বাবার দিকে নয়ন তুলে চাইলো। ছলছলে তার চোখের তারা! ভেজা গলায় বললো,
– আম্মু!
মেয়ের চোখ দেখে তাবিবের বুকে মোচর দিয়ে উঠলো। ক্ষীণ গলায় বললো,
– কে বলেছে?
– আম্মুই বলেছে।
বিস্তর হাসির রেখায় প্রাপ্তি ছড়িয়ে পরেছে। তাবিব আর কিছু বলতে পারলো না। শুধু মেয়ের কপালে চুমু খেলো। মনটা কেমন নরম হয়ে এসেছে। ইচ্ছে করলো নিবৃতাকে গিয়ে একবার ধন্যবাদ জানাতে। তার মেয়েটাকে জীবনের সবচাইতে বড় উপহার দিয়েছে সে আজ। আজীবনের এক আফসোস মিটিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এখন না বললেও, পরে গিয়ে ঠিকই সময় বুঝে বলবে ও।

– তাকে তার যথাযথ প্রাপ্য সম্মানটা কিন্তু সবসময়ই দিবে। কখনও জবান দ্বারা তাকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না। তবে তার কোনকিছুতে, ব্যবহারে যদি তুমি কষ্ট পাও তাহলে সবুর করবে। সে বুঝতে পারে কি না, তার অপেক্ষায় থাকবে, নতুবা একটু মানিয়ে নিবে। আর যদি মনে হয়, কোন কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না, তাহলে তখন গিয়ে বাবাকে বলবে। বাবার শিক্ষা নিশ্চয়ই মনে আছে?
মেয়েকে আদর, আহ্লাদে বড় করলেও সুশিক্ষা ও জ্ঞান দিতে কখনও ভুলে না তাবিব। তানহা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
– মনে আছে। তুমি চিন্তা করো না।
– আই নো, মাই ডটার ইজ দ্যা বেস্ট!
তাবিব সগর্বে বলতেই তানহা খিলখিলিয়ে হাসলো। যেই হাসির ঝঙ্কারে পুরো ডাইনিং এরিয়া মুখরিত হয়ে উঠলো। নিবৃতা এতক্ষণ চুপটি করে বসে থাকলেও এবার ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পর্দার আড়ালে দাঁড়ালো। হাসোজ্জল তানহাকে দেখে দু’নয়ন জুড়ালো।

– আরে আম্মু!
এই ডাকটাতে এখনও অভ্যস্ত হচ্ছে নিবৃতা। তবুও যতবার শুনছে, ততবারই মনে হচ্ছে মধুর একটা শব্দ! আচমকা তানহা এগিয়ে এসে ওকে আগলে ধরতেই নিজেকে সামলালো ও। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই অকস্মাৎ মুখে চকোলেট পুরে দিলো তানহা।
– মজা! খেয়ে দেখো!
নিবৃতা আর কি বলবে? চুপটি করে রইলো আর চকোলেটের স্বাা আস্বাদন করতে লাগলো। এরই মাঝে তাবিবকে রান্নাঘরে যেতে দেখে তানহা বললো,

নিবৃতা পর্ব ৪

– চলো, আমরা বাবাকে রুটি বানাতে হেল্প করি।
তার কথার মাঝে কোন অনুমতি নেই। সোজা অধিকারবোধ ফলাও! অপেক্ষা না করেই নিবৃতার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো সেখানে। এদিকে নিবৃতার মাঝে ভয় ও চিন্তা দুটোই। ভীতি আবারও সেই কঠোর লোকটার সম্মুখে যাওয়ার, আর চিন্তা, কারণ সে রুটি বানাতে জানে না। কেবল রুটি নয়, সে তো কিছুই রাঁধতে জানে না। এতোদিন মাথায় প্রশ্ন না জাগলেও আজ মনে হলো, আচ্ছা, চুলোটা ঠিক কিভাবে জ্বালায়? নাকি একা একাই জ্বলে সেটা?

নিবৃতা পর্ব ৬

1 COMMENT

  1. দেবী
    মৃগাঙ্ক
    পরগাছা
    আমান
    সমাপ্তি ও পারে
    ভালোবাসা সময় রঙ্গ এই গুলো দেন

Comments are closed.