Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৪

নিবৃতা পর্ব ৪

নিবৃতা পর্ব ৪
নেহার ছায়ালিপি

সময়টা কেমন থমকে গিয়েছে। মস্তিষ্ক এক অজানা ঘোরের মাঝে ডুবে আছে। অনুভূতিগুলো সব কুণ্ডলী পাকিয়ে দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে আচমকাই। চারপাশে দৃষ্টি বুলালে, শুধু সকলের হাসিখুশি মুখটাই দেখা যাচ্ছে। এখানকার সমীরণে এক পবিত্র আভা। তাবিব ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েকে দেখল। চোখমুখ তার রীতিমতো ঝলমল করছে। সরু ঠোট ছড়িয়ে হাসার দরুন শুভ্র দাঁতগুলো মুক্তোর ন্যায় চিকচিক করছে! কেমন স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না সে! পিতৃ হৃদয় শীতল করার মতো এক দৃশ্য! মেয়ের হাসিটা এতো সুন্দর! তাবিব যত্ন সহকারে তানহার একটি হাত তুলে তার তালুতে পরম স্নেহ ঢেলে চুমু খায়! অকৃত্রিম হেসে বলে,

– আমার মা’টা এখন খুশি তো?
বাবাকে আঁকড়ে ধরে তানহা! মিষ্টি স্বরে লম্বা করে বলে,
– অনেক বেশিই খুশি! না না! সবচেয়ে বেশি খুশি!
তাবিবের হারিয়ে যাওয়া চেতনা একটু একটু করে ফিরতে শুরু করে! যাকে কেন্দ্র করে ওর গোটা জীবনটা ঘুরে, সে খুশি থাকলেই সই। তাবিবের আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। ও এতেই সন্তুষ্ট। ওর ঠোঁটেও এবারে সুক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠে।
তাবিবদের নিয়ে আসা সামগ্রীর সাথে তানহার অনেক যত্নে সাজানো একটি বিশেষ বস্তুও ছিল। সেটা নিতেই ও ডাইনিং টেবিলের দিকে ছুটলো। ওটা সেখানেই রাখা হয়েছে। ছাই রঙা একটি র‍্যাপিং কাগজে সেটি মোড়ানো। আকার তার গোল। একটু ভারিই বটে। ওর জন্য তোলা একটু কষ্টসাধ্য! তবুও দু হাতে সেটি তুলে নিয়ে এসে বলল,
– বাবা চলো। ম্যামের সাথে গিয়ে বসি।
আচমকা এরুপ কথায় তাবিব বিব্রত দৃষ্টি নিয়ে চায়। তার শ্বশুরবাড়ির কেউ এখনও সেই কথা তুলে নি অথচ তার মেয়ে সময় না গড়াতেই অস্থির হয়ে গিয়েছে। ও না পারতে মৃদু হেসে কিছু বলবে তার আগেই রত্না এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলে,

– জি ভাইয়া চলুন! ভেতরে যাওয়া যাক।
তাবিব স্বস্তি পায় এতে। এরই মাঝে তানহা বলে,
– আমি যখন ভেতরে আসতে বলবো, তখনই আসবে। এর আগে না। বুঝেছ?
বলার ভঙ্গিমায় তার নিদারুণ গাম্ভীর্যতা! যেন অতীব জরুরি কোন তলব। তাবিব মাথা দোলায়।
– ঠিক আছে আমার মা!
– হুম!
ভারি গোলাকৃতির বস্তুটি নিয়ে তানহা হিমশিম খেতে খেতে চলে গেলো তৎক্ষনাৎ।

নির্জীব কোন এক প্রাণীর ন্যায়ই বসেছিল নিবৃতা। চোখের দৃষ্টি কেমন মৃত। এক ধ্যানে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ এই নজরে কোন অনুভূতি নেই! নিস্পন্দ, নীরব। তখনই সেই বরফ খণ্ড গলাতে উত্তাপ বনে, উষ্ণতা নিয়ে এলো তানহা।!
– ম্যাম!
সেই চঞ্চল ডাক! নিবৃতা তৎক্ষণাৎ চায়! মনের ভেতরটা সম্পূর্ণ, শুন্য, রিক্ত হলেও ও মিষ্টি করে হাসে! নিজের প্রতিজ্ঞা পালনে সে বদ্ধ পরিকর! যা পারবে, তার সবটাই করবে ও, এই প্রাণোচ্ছল বাচ্চাটার জন্য।
– ঝিলমিল!
মৃদু স্বরে ও ডেকে উঠতেই তানহা এসে বসলো ওর পাশে। হাঁপিয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
– এতো ভারি!

নিবৃতা একবার কাগজে মোড়ানো বস্তুটি দেখে চোখ সরিয়ে নিলো। ওর মাঝে কোন কৌতূহল কাজ করে না। আগে করতো কি না সেটাও মনে নেই এখন আর! শুধু যতটুকু ওর মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিলো ততটুকুই চোখের পাতায় ছেপে আছে। চেয়েও এর থেকে মুক্তি মেলে না। ও মায়া নিয়ে তানহার দিকে তাকাল। হাত উঠিয়ে ওর কপালে পরে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সুন্দরমতন গুছিয়ে দিলো সে। সাথে সাথেই হাতের চুড়িগুলো রিনরিন শব্দ করে উঠলো। বিষয়টা বেশ উপভোগ করলো তানহা। কিছুটা শব্দ করে হেসে চুড়িগুলো ছুঁইয়ে দিলো বড্ড অবলীলায়।
– অনেক সুন্দর!
নিবৃতা কি বুঝল কে জানে! ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে বলে,
– তুমি নিবে? আমি খুলে দেই?

এরকম করে কেউ বলে কি? তানহার জানা নেই! শুধু মনে পরে, ছোট্ট ওর, একবার ফুপাতো বোনের একটি পায়েল খুব পছন্দ হয়েছিলো। এতো সুন্দর ছিল দেখতে! রঙ বেরঙের পাথরগুলো চিকচিক করছিলো! ঝুনঝুনিগুলো শব্দ করছিলো। বাবা তখন হাসপাতালে, ও ছিল ফুপির বাসায়। বোনটার কাছে শুধু পায়েলটা একবার হাতে নিয়ল দেখতে চেয়েছিল একটু, কিন্তু এর বদলে কি থেকে কি হয়ে গেলো! উল্টো বিচার পরলো ফুপি ও বাবার কাছে! তানহা না কি ওটা কেড়ে নিতে চেয়েছে! বোনটার সে কি কান্না! অথচ তানহা কিছুই করে নি। সেদিন ফুপি ওর হয়ে কথা বলে নি, নিজের মেয়েকে সামলিয়েছিলেন। তানহা ছোট হলেও বুঝেছিল, আপন যতই হওয়া যাক, কিন্তু মা হওয়া যায় না, মায়ের মতন আপন কেউ হয় না। আজ এই মুহূর্তে, নিবৃতা যখন কিছু না ভেবেই এই কথাটা বলল, তখন ওর শুধুই মনে হল, তাহলে কি এবারে ও সত্যি সত্যিই মা পেতে চলেছে? তবে বুঝদার তানহা তার চেহারায় কোন মলিনতা আসতে দিলো না। সুন্দর মতন হেসে বলল,

– আমার হাতে মানাবে না, আমি না ছোট?
নিবৃতা মাথা নাড়িয়ে সরল গলায় বলে,
– আচ্ছা, তাহলে আমি এগুলো যত্ন করে রেখে দিবো। তুমি যখন বড় হবে, তখন পরবে। ঠিক আছে?
তানহার ছোট্ট মনটা বিগলিত হয়ে পরলো। চট করে গিয়ে নিবৃতাকে জাপটে ধরল। একদম শক্ত করে! কিছুই বলল না। বোকা, সহজ নিবৃতা এতকিছু বুঝে না। স্নেহ স্বরূপ শুধু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় চুপটি করে।

– বাবা এসো!
মেয়ের ডাক পরেছে। সারা না দিয়ে উপায় নেই! তাবিব উঠে এলো। ঘরের সম্মুখে আসতেই সেদিনের ঘটনা মনে পরে গেলো। অস্বাভাবিকভাবে অস্বস্তিতে পড়েছিলো নিবেদিতা ফারুকী নিবৃতা নামক মেয়েটি! কেমন জড়তায় ঠাসা তার অভিব্যক্তি! অন্যকেও দ্বিধায় ফেলতে সক্ষম। ও একটু উঁচু শব্দে গলা খাঁকারি দিলো। অতঃপর কয়েক পল অপেক্ষা করে ভেতরে প্রবেশ করলো। সম্মুখেই তার কন্যা দাড়িয়ে। মুখে ওর দন্ত কপাটি মেলে রাখা হাসি। এর অর্থ বুঝে তাবিব। নিশ্চয়ই কোন আবদার নিয়ে বসেছে। ও বুকে দু হাত বেধে তাকিয়ে থাকে। তানহা সামনে দেখে চট করে সরে যেতেই দৃষ্টিগোচর হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মানবীকে! খাটের মধ্যিখানে বসে আছে। মুখটি তার ইচ্ছে করেই আড়াল করে রাখা। লাল চুনরি একদম কোল অব্দি নামিয়ে রাখা। আর তার ঠিক সম্মুখেই একটি বৃত্তাকার দর্পণ! ফুল, পাথর, ফিতা, রঙ নানান মিশেলে অত্যন্ত সুন্দর কারুকাজে সাজানো হয়েছে সেটি। যেই শিল্পের শিল্পকার হচ্ছে তানহা সারোয়ার! তাবিব তৎক্ষণাৎ বুঝে যায় মেয়ে তার ঠিক চাইছেটা কি। ও ঘার ঘুরিয়ে তানহার দিকে তাকিয়ে বলে,

– এসব কি তানহা!
গম্ভীর গলার আওয়াজ তার! তানহা বুঝলো সাধারণ কথায় তার বাবাকে এবার টলানো যাবে না। তাই প্রথমবারেই জায়গা মতন তীর ছুড়ে দিলো ও!
– ম্যামকে রাজি করিয়ে ফেললাম অথচ তুমি মানা করবে? ভালোই! এখন তো এগুলোই হবে! একজন শুনবে তো আরেকজন না। এভাবেই আমার দিন কাটবে!
কেমন হতাশ তার কণ্ঠ! তাবিব ভ্রু কুঁচকে চায়! বিয়ে করার মতো এতো বড় একটা কাজ সেরে ফেলল মেয়ের জন্য অথচ ও বলে, তাবিব না কি কিছু শুনেই না! এরজন্যই বাচ্চাদের এতো মাথায় তুলতে নেই! ও আর কোন কথা না বলে চোখের পলকে খাটে গিয়ে বসলো! একদম নিবৃতার পাশে। শব্দ হলে বেশ। নিজের পাশে একজন পুরুষের উপস্থিতিতে নিবৃতার অন্তঃস্থল থরথরিয়ে কাঁপলো। ইচ্ছে করলো এখনই উঠে গিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতে! কিন্তু সে নিজেই এই জীবন বেছে নিয়েছে! তাকে যে সহ্য করতেই হবে!
তানহা ছোট্ট করে তালি বাজিয়ে তাবিবের ফোনটা গিয়ে রত্নাকে ধরিয়ে দিলো। সে এই মুহূর্তটি সংরক্ষণ করে রাখবে। শিউলি একবার দরজার ফাঁক গলিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলেন ভেতরে কি চলছে, পরপর সরেও এলেন। তার মেয়ের জামাইটা একটু বেশিই গম্ভীর ও অভিজাত প্রকৃতির । তাকে দেখলে হয়ত বিব্রত বোধ করবে। এদিকে তানহা গিয়ে বসলো নব দম্পতির সম্মুখে। প্রথমে নিবৃতার ঘোমটা উপরে তুলে দিয়ে তার একাংশ ছড়িয়ে দিলো তাবিবের মাথায়। সাথে সাথেই মিষ্টি এক সুবাস নাকে ঠেকলো তাবিবের। দুজনে চুনরির আড়ালে চলে এলো। এরপর আয়নাটি তাদের সম্মুখে উঁচিয়ে ধরলো তানহা।

– বাবা তাকাও!
বড্ড অনীহা নিয়েই আরশিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো তাবিব! কিন্তু মুহূর্তেই সে থমকে গেলো! জীবনে সেই এক নারী ছাড়া, যে তার সন্তানের মা হয়েছিলো, কখনো বিনা প্রয়োজনে, কিংবা কোনরূপ ভিন্ন, বিরূপ মনোভাব নিয়ে অন্য রমনীর দিকে তাকায় নি সে! নিজেকে সম্পূর্ণ সংযত রেখেছে ও। অথচ আজ যখন কাওকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেখলো তখন আবারো তার স্ত্রীকেই দেখল। হয়তো মানুষ দুটির মধ্যে বিস্তর ফারাক, তবুও তাদের প্রতি তাবিবের দায়িত্ব, কর্তব্য কিংবা সম্পর্ক সবটাই এক! সেদিন নিবৃতার কুণ্ঠিত আচরণের জন্য ও চোখ তুলে দেখে নি মেয়েটিকে। তবে আজ দেখলো। একটু বেশি বেশিই দেখল! এবং কেন এরুপ হলো ও নিজেও জানে না! শুধু বুঝলো, সেই নত দৃষ্টির মুখটিতে কেমন যেন এক প্রশান্তি বিরাজ করছে। অদ্ভুত উষ্ণতা জাগালো মনে। ঐ তিরতির করে কাপতে থাকা ঘন, সুদীর্ঘ পত্রপল্লব গুলো পাল্লা দিয়ে তার হৃদ স্পন্দনের সাথেই কাঁপছে! ইচ্ছে করলো আগ বাড়িয়ে লাল হয়ে থাকা নাকটি একটু ছুঁয়ে দিতে! কেমন আচ্ছন্ন লাগলো নিজেকে। হঠাৎ মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠলো তাবিব! এরকম কিছু নিজের দিকে আশা করে নি ও। কেন যেন মুহূর্তে, অপার দ্বিধা, ও আত্ম নিয়ন্ত্রণের বাহিরে এমন কিছু অনুভব করা ওর মনটাকে বিষিয়ে দিল। নিবৃতার মতো একটি মেয়ের জন্য এমন কিছু ভাবতে চায় নি ও। অন্তত এখনই নয়! সহসা ওর চোখ দুটো শক্ত হয়ে এলো।

– বাবা, আয়নায় কাকে দেখতে পাচ্ছ?
তানহা বড্ড আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেও তাবিবের ইচ্ছে করলো না জবাব দিতে! কিন্তু কিছু না বললে, আরও অপেক্ষা করতে হবে। তাই নিজেকে সামলে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
– তানহার ম্যামকে!
এ কেমন উত্তর? তানহার হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেলো। নাক কুঁচকে বললো,
– ভেরি ব্যাড আন্সার! ইউ ফেইলড্!
তাবিব নিরুত্তর!
– ম্যাম আপনি কাকে দেখতে পাচ্ছেন?
নিবৃতা চুপ করে শুনছিল। লোকটা ওকে নিয়ে কি বলল না বলল, সে বিষয়ে ওর বিন্দুমাত্র কোন মনোযোগ নেই। ও তানহার কণ্ঠস্বরকেই অনুসরণ করছিলো। যখন ওকে প্রশ্ন করা হল, তখন ও মনের কথাই বলল। কবুল বলার সময় যে অনুভূতি ওকে গ্রাস করে নিয়েছিলো সেটাই স্বীকার করলো।
– আমার মেয়ের বাবাকে!
ক্ষীণ একটি আওয়াজ, তবুও তাবিব স্পষ্ট শুনলো! এরকম কিছু ও আশা করে নি। ও চট করে ফের আয়নায় চাইলো। কিন্তু নিবৃতা তখনও চোখ তুলে তাকায় নি। যার অর্থ দাড়ায় মেয়েটা তাবিবকে দেখারও প্রয়োজন বোধ করে নি। এতোটা অবহেলা! এতোটা অসম্মান! প্রশ্নের উত্তরে যতটা ভালো লেগেছে, সেই ভালো লাগা মুহূর্তে উবে গেল। কিছু না বলে উঠে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে! তবে আশ্চর্য! ওর রাগ কেন হচ্ছে?

যেই ছোট ছোট হাত পা-কে বুকে জড়িয়ে বাবা মা নামক দুটো মানুষ জীবনের নতুন আলো খুঁজে পায়, সময়ের ফেরে সেই আলোকে অন্যের ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেদের অন্ধকারে ঠেলে দিতে হয়। বিয়েতে কনে বিদায়ের মতো হৃদয়বিদারক অনুভূতি বোধহয় আর দুটো হয় না। সেই যে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে এক নাগারে কেঁদে চলেছেন শিউলি, হাজার চাইলেও নিজেকে সামলাতে পারছেন না। রত্নারও আজ চোখ ভেজা। ও বাস্তববাদী মনোভাবের হলেও নিবৃতাকে অপছন্দ করে না। কিন্তু নিবৃতা! সে যেন আজ অনুভুতিশুন্য। ও কাঁদছে না। মূলত কান্না ওর আসছে না। ও শুধু জানে, এখান থেকে চলে গিয়ে, নতুন জীবন সাজালেই তার এই পরিবারের মানুষগুলো ভালো থাকবে। তাইতো মুখ বুজে চুপ করে আছে। কিছু বলতে পারছে না ও। রত্না এসে শিউলিকে আগলে ধরে বলে,
– অনেক হয়েছে মা। এবার নিজেকে সামলান।

কান্না ছলকে বেরিয়ে এলো আবার। ওড়নায় মুখ চেপে সরে এলেন শিউলি। পাশেই তাবিব ও তানহা মাথা নামিয়ে দাড়িয়ে ছিল। তিনি গিয়ে তাবিবের সম্মুখে দাড়িয়ে বলেন,
– বাবা, তোমাকে আর কি বলবো। তুমি বুদ্ধিমান ছেলে, তারউপর বৌমার সাথে কথা হয়েছে তোমার। একটু হলেও হয়ত বুঝতে পেরেছ, আমার মেয়েটা পুরোপুরি স্বাভাবিক না। তোমার শ্বশুর বেঁচে থাকতে মেয়েকে সামলে রেখেছিলেন। আমি সেভাবে পারি না। তাই ওর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না যে ওর জন্য তোমার কিংবা তোমার মেয়ের কোন সমস্যা হবে। কিন্তু যা হবে, আমার মেয়েটা নিজের কোন সমস্যা, প্রয়োজন, অপ্রয়োজন মুখ ফুটে বলতে পারবে না। অনেক অবুঝ! জটিলতা ওর আয়ত্তের বাহিরে। কঠিন বিষয়গুলো তুমি না বুঝিয়ে বললে হয়ত ও তোমাকেও বুঝবে না। তুমি ওর এই দিকটা একটু সামলে নিয়ো বাবা। সবাই তো আর সবদিক দিয়ে পূর্ণ হয় না। আমার মেয়ের খামতিগুলো একটু সহনশীল চোখে দেখো।
তাবিব নরম চোখে তাকায়। আন্তরিক স্বরে বলে,
– এভাবে বলবেন না আন্টি! আমার নিজেরও তো একটা মেয়ে আছে। আমি একটু হলেও বুঝতে পারছি আপনার মানসিক অবস্থা। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সব সামলে নেওয়ার চেষ্টা করবো।
– তোমার উপর বিশ্বাস করেই মেয়ে দিলাম।
– এই বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ থাকবে!
নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রত্যুত্তর করলো তাবিব। ওর যে নিবৃতাকে ভালো রাখতেই হবে। কিন্তু এই সম্পর্কটার ভালো থাকা যে ঠিক কোন পথে হবে, সেটাই আপাতত জানা নেই ওর!

রাজধানীর একটি আভিজাত আবাসিক এলাকায় এসে তাবিবদের গাড়িটি থামলো। সম্মুখে সদর্পে দাঁড়ানো ষোল তলা এপার্টম্যান্ট দালানের নবম তলায় তাবিবের কেনা ফ্ল্যাটটির অবস্থান। তাবিব ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে যেতেই সিকিউরিটি গার্ড এগিয়ে এলেন। তাবিব ধন্যবাদ জানালো। তার সত্যিই সাহায্য লাগবে। ওরা গাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নামাতেই নিবৃতার হাত আঁকড়ে ধরে তানহা বেড়িয়ে এলো। নতুন জায়গায় এলে সাধারণত মানুষ চারপাশে চোখ বুলিয়ে অন্তত একবার হলেও সবটা পরোখ করে নেয়। অথচ নিবৃতা ভ্রুক্ষেপই করলো না। তানহা যেদিকে পা বাড়ালো সেদিকেই ও এগোল। কোন প্রশ্ন নেই ওর মাঝে। লিফট এসে নবম তলায় থামতেই ওরা চলে এলো। এখানে মোট তিনটি ফ্ল্যাট। আর তাবিবরা যাবে ঠিক ডান দিকে।
– তোমরা দাড়াও! আমি যখন বলবো তখন আসবে।
আবারো কি করে রেখেছে মেয়েটা কে জানে! তাবিব বিরক্তিতে কপালে আঙ্গুল ঘষলো। আড়চোখে পাশে তাকিয়ে দেখল নিবৃতা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাড়িয়ে। কোন নড়চড় নেই। কেমনমন স্থির সর্বদাই!

– চলে এসো।
ডাক পরতেই তাবিব বলে,
– একসাথেই যেতে হবে। তানহা এটাই চায়! আসুন!
তানহার কথা শুনে আর দাড়িয়ে থাকলো না নিবৃত। পাশাপাশি দুজন হাটা ধরতেই গায়ে আচমকা নরম কিছুর ছোঁয়া মিলল। তাবিব দেখল এগুলো গোলাপের পাপড়ি! দু হাত ভর্তি করে তাদের উপর এগুলো ছিটিয়ে চলেছে তানহা!
– ওয়েলকাম হোম মাই ডিয়ারেস্ট ম্যাম!
নিবৃতা গিয়ে তানহার গালে হাত বুলিয়ে দিলো প্রত্যুত্তরে! সিকিউরিটি গার্ড সব ঘরে দিয়ে চলে যেতেই তাবিবের মোবাইল কল আসে। ভ্রু কুঁচকে সেটি রিসিভ করতেই মুখের ভঙ্গিমা বদলে যায়। ছোট্ট করে বলে,
– আসছি!
সেই কথাটা শুনতেই তানহা আঁধারিয়া মুখে বলে,
– আজকেও? একটু ম্যানেজ করতে পারলে না?
তানহার মাথায় হাত বুলিয়ে তাবিব বলে,
– প্যাশেন্টটা আমার আন্ডারে আছে। ইট’স্ মাই ডিউটি। অবস্থা ভালো নয়। একটু বুঝো?
ও মুখ ফুলিয়ে চুপ করে থাকে। তাবিব আবার পায়ে জুতো পরতে পরতে বলে,
– তোমার ম্যামকে বাসা দেখাও। ফ্রেশ হতে হেল্প করো। আমি দ্রুত চলে আসবো। আর হ্যা, সাবধানে থাকবে।
দরজার দিকে ফিরেও থেমে যায় তাবিব। তার দায়িত্ব আজ থেকে বেড়েছে। ও সহসা ঘুরে তাকায় নিবৃতার দিকে, যে বরাবরই তাবিবকে দেখেও যেন দেখে না।
– মেইক ইউরসেলফ্ এট হোম নিবেদিতা।

নিজের কেবিনে বসে ফাইল দেখছিলো তাবিব। মুখাবয়ব বড্ড থমথমে। নিগুঢ় মনোযোগ আবদ্ধ প্রতিটি পৃষ্ঠায়। তার একজন ক্যান্সার পেশেন্ট। কেমোথেরাপি চলছে। আজ হঠাৎ করেই অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে উঠেছিল। রোগীকে নিয়ে পুরো পরিবার ছুটে এসেছে। মেয়েটার বয়স মাত্র সতেরো। যে বয়সে অজস্র স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার কথা, সে বয়সে এসে ও শুধুমাত্র আরও কয়েক মুহুর্ত নিশ্বাস নেওয়ার আশায় বাঁচছে। তাবিব দেখে এসেছে ওকে। এখন কিছুটা স্থির হয়েছে সে। তবে সমস্যাটা কি ঘটেছিলো সেটাই দেখছে তাবিব। এরই মাঝে কেবিনের দরজায় করাঘাতের আওয়াজ হয়। কাজের মাঝে বিঘ্ন ঘটতেই কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয় ও। তবুও সেটা চেপে গিয়ে ভেতরে আসার অনুমতি প্রদান করে।
সিনিয়র ডাক্তার এনাম মাহমুদ এসেছেন। তাকে এ অসময়ে দেখে অবাক হয় তাবিব। তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে সালাম জানায়। এনাম বেশ খোশমেজাজে আছেন। প্রত্যুত্তর করে তিনি হেসে এগিয়ে এলেন।

– হ্যাভ আ সিট স্যার!
এনাম বসতেই বলে উঠেন,
– দুপুরে দেখলাম তোমার নামে মিষ্টি দেওয়া হচ্ছে সবাইকে। আমার সময় ছিল না বিধায় চলে এসেছিলাম। তা এর কারণ কি? ফেলোশিপ তাহলে কনফার্ম?
ভদ্রলোক হাসোজ্জল কন্ঠে বলতেই তাবিব স্মিত হাসলো। মাথা নাড়িয়ে বললো,
– ফেলোশিপ ইজ ডেফিনেটলি কনফার্ম স্যার। তবে মিষ্টির উপলক্ষ সেটা না।
– আমিও তা ভাবছিলাম অবশ্য। সো ইয়াং ম্যান! কি খবর? মেয়েকে রেখে না যাবে না বলেছিলে।
– মেয়েকে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে স্যার। সেজন্যই মিষ্টি মুখ করালাম সবাইকে।
তাবিবের কিছুটা লজ্জা লাগলো। সিনিয়র স্যারকে সরাসরি নিজের বিয়ের কথা বলতে। তবে ও স্পষ্টবাদী। এই যে বিয়ে করলো, সেটা লুকোনর প্রয়োজন বোধ করে নি, কিংবা সামান্য দ্বিধাও কাজ করে নি। জানিয়ে দিলো সবাইকে বিষয়টা। এনাম, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ। বুঝে গেলেন চট করেই! শব্দ করে হেসে বললেন,

– শুভ কাজটা তবে সেরেই ফেললে?
তাবিবও ক্ষীন হেসে বলে,
– জি স্যার।
– কবে?
– এই তো আজ দুপুরেই।
উনি অবাক হয়ে বললেন,
– কি বলো? তাহলে এখানে কি করছো এখন?
– একটা ইমার্জেন্সি ছিল স্যার।
ভদ্রলোক মাথা নাড়িয়ে বললেন,
– তা কোথায় বিয়ে থা করলে? তোমার শশুর কি করেন?
এনামের সাথে যথেষ্ট আন্তরিকতার সম্পর্ক তাবিবের। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তাকে পাশে পেয়েছে। তাই এতোটুকু জানার স্পৃহা উনি প্রকাশ করতেই পারেন। ও স্বাচ্ছন্দ্যে বললো,
– উনি এখন বেঁচে নেই। তবে শুনেছিলাম এক কালে ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিলেন।
এনাম আগ্রহ দেখালেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উনার বেশ চেনা জানা ছিল আগে। তাই আগ বাড়িয়ে বললেন,

– ভদ্রলোকের নাম কি ছিল?
নাম? তাবিব মনে করার চেষ্টা করে। অতঃপর খেয়ালে আসতেই বলে,
– নীরব ফারুকী।
নামটা শুনতেই এনামের খটকা লাগলো। নামটা পরিচিত মনে হচ্ছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য বললেন,
– এককালে? পরবর্তীতে কি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন?
– হ্যা। তাই-ই শুনেছি।
এনামের মুখাবয়ব গম্ভীর হয়ে গেলো। নীরব ফারুকী! যাকে জেল খাটতে হয়েছিল। ঠিক কতদিন সেটা জানা নেই, আর কখনো আদোও ছাড়া পেয়েছিলো কি না, সে সম্পর্কেও তিনি অজ্ঞ। তবে চাকরি তিনি ছাড়েন নি, বরঞ্চ তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এনামের বলার ইচ্ছে থাকা সত্বেও শেষে গিয়ে বিষয়টা তিনি চেপে গেলেন। বিয়ের আগে জানতে পারলে ভালো হতো, এখন যেহেতু আর কোন রাস্তা খোলা নেই, তাহলে চুপ থাকাই শ্রেয়। ছেলেটা দ্বিতীয়বার জীবনে কাওকে জড়ালো। এবার না ঠকে গেলেই হয়। উনি কাষ্ঠ হাসার চেষ্টা করে বললেন,

নিবৃতা পর্ব ৩

– উইশ ইউ আ ভেরি হ্যাপি ম্যারিড লাইফ, তাবিব।
– থ্যাঙ্কস্ আ লট স্যার।
এনাম উঠে এলেন। ভালো লাগছে না তার। তাবিবের জন্য চিন্তা হলো। ছেলেটার কপালে সুখ আসবে তো!?

নিবৃতা পর্ব ৫