নিবৃতা পর্ব ৩
নেহার ছায়ালিপি
বাতাবরণে ভারিক্কি স্বরের আর্ত্মনাদ ছড়িয়ে পরেছে। থেমে থেমে জোরালো নিশ্বাসের শব্দ প্রকট হচ্ছে। ঘরের মেঝেতে পরে একজন ভীষন করে তড়পাচ্ছে! পা দুটো ছটফট করছে অসহনীয় পীড়ায়। থেমে থেমে মুখ নিয়ে গোঙানির মতো শব্দ হচ্ছে। সফেদ টাইলস্ এর মেঝে নিষ্ঠুরভাবে লাল তরলে ছেয়ে গিয়েছে। নিচে পরে কাতরানো মানুষটার দিকে হিস্রাত্তক মনোভাবে তাকিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে একজন ব্যক্তি! চোখদুটো তার আরক্তিম, চোয়াল পাথুরে শক্ত। হাতে বড় একটি ব/টি পাকড়াও করে রাখা। সেটি চুইয়ে চুইয়ে তাজা গরম র/ক্ত বিন্দু বিন্দু আকারে গড়িয়ে পরছে। চোখের পলকে অবিশ্বাস্যকর একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে এখানে। আর এই ভয়াল দৃশ্যটির সাক্ষী এমন একজন ধারণ করলো যার এরুপ কিছু দেখা মোটেও উচিত হয় নি। দরজার আড়াল থেকে এক জোড়া হতবিহ্বল, অচল চোখ দেখে নিয়েছে পুরোটা। পরপর প্রবল মানসিক ধাক্কায় নিজের শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সেখানেই হাঁটু গেরে বসে পড়লো ও। কম্পিত হাতটি এগিয়ে দিয়ে দুর্বল কণ্ঠে ডেকে উঠতে চাইলো কাওকে, কিন্তু সম্ভব হল না। সবেগে চলা হৃদপিণ্ডটি খেই হারিয়ে ফেলল সহসা! ধপ করে মুখের ওপর পরে গেলো শরীরটি! মস্তিষ্ক অস্থির হলেও চোখ দুটো বন্ধ হল না। অনবরত গড়িয়ে পরা অশ্রুর ঝাটে দৃষ্টি ঝাপ্সা হয়ে গেলো। চেতনা না লোপ পাওয়ায় সে দেখে গেলো একের পর ঘটতে থাকা সব অশুভ, মর্মান্তিক দৃশ্যাবলী!
ঘুমের মধ্যেই ছটফট করছে সে। বিড়বিড় করে অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বলে চলেছে অনবরত। ফর্সা মুখটা আতংকে লাল হয়ে আছে। ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে পুরো শরীর। থরথর করে কাঁপছে সর্বাঙ্গ!
– নিবু! এই নিবু!
ডাকটা কানে বাজছে, কিন্তু সে চাইলেও জবাব দিতে পারছে না। চোখের পাতা আরও এঁটে যাচ্ছে। ঠোট ফুরে অস্ফুটে কান্নার শব্দ গলিয়ে আসে এক প্রকার। মেয়ের অবস্থার সাথে অপরিচিত নন শিউলি, তবুও প্রতিবারই তিনি ভয় পেয়ে যান। মায়ের মনটা এখনও শক্ত হয়ে উঠতে পারে নি! হাতে বল আসে না। গুমট অনুভূতিতে তার চোখে অবাধ জলেরা এসে ভিড় জমায়। উনি আবারো কিছু বলবেন তার পূর্বেই একটি জোরালো হাত টেনে বসায় ঘুমন্ত নিবৃতাকে। সাথে সাথেই ঝটকা দিয়ে উঠে তার সমস্ত সত্তা! বল হারিয়ে শরীর পুনরায় ছেড়ে দিতেই শক্ত করে ধরে রাখে রত্না।
– নিজেকে সামলাও নিবু।
নিভু নিভু চোখে তাকায় সে। বুঝে উঠতে পারছে না কিছু। রত্না ওর ভেজা গাল মুছিয়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে। শিউলি আর কিছু বলেন না। এখন কথা ওঠালেই কথা বাড়বে! আজকের দিনটায় অন্তত পুরনো কোন প্রসঙ্গ না টানাই ভালো। এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাট থেকে উঠে পরেন তিনি। রত্নাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
– তুমিই একটু দেখো। আমি রান্নাঘরে যাই।
রত্না মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই শিউলি চলে গেলেন। রত্না এবারে নিবৃতার স্থবির মুখটা আড়চোখে দেখে সরে এলো। ততক্ষণে কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে নিবৃতা। সামনেই একটি লাগেজ নামানো। নিবৃতার প্রয়োজনীয় বিষয়াদি, জিনিসপত্র তোলা হচ্ছে সেখানে। রাতে পুরোটা করে শেষ করতে পারে নি রত্না। এখন সেটার কাজ করতেই লেগে পরলো, তবে থামলো না ওর মুখ।
– নতুন জীবনে আজ পা রাখতে যাচ্ছো নিবু। নতুন মানে বুঝো তো? একদম আলাদা কিছু। অতীতের কোন স্পর্শ সেখানে থাকে না। যদি থাকতো তাহলে সেটাকে নতুন বলতো না কেউ। এই ধরো, তুমি একটা চকচকে, নতুন কাপড় কিনে আনলে। অথচ তোমার কাছে হুবহু দেখতে ওরকমই একটা জামা আছে। আগে পরেছ। এখন ওই জামার পরিবর্তে যদি নতুনটা পরে ঘুরে বেরাও, কেউ কি কোন পার্থক্য বের করতে পারবে? কাপড়টা কি তার কোন মূল্যায়ন পাবে? স্বাভাবিক উত্তর হচ্ছে ‘ না’। কোন পরিবর্তন লক্ষিত হবে না। তোমার ক্ষেত্রেও সেটা। আজ থেকে মা কিংবা আমাকে, কাউকেই তুমি কাছে পাবে না। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মানুষের সাথে তোমার জীবন জড়িয়ে যাবে। তাদের সাথেই তোমার সমস্ত সময়টা কাটবে। এখন সেখানেও যদি একই ব্যবহার করো তাহলে হবে? তোমায় কে সামলাবে? কে বুঝবে? এই দেখো আমাকেই। তোমার ভাই কিংবা মা যেমনভাবে তোমাকে আগলে রাখে, বোঝে, সেটা কি আমি পারি? পারি না। কারণ এর গভীরতা আমাকে ছুঁতে পারে না, কারণ আমি ছিলাম না তখন। তোমার ওই নতুন দুটো মানুষও তোমায় পারবে না বুঝতে। তার মাঝে তানহা হলো ছোট। ওতো জটিল কিছু ও বোঝে না।
তোমার এমন অস্বাভাবিক আচরণ যদি ও দেখে, তাহলে কি কিছু করতে পারবে? উলটো তোমার প্রতি ওর বিতৃষ্ণা না এসে যায়। আর তাবিবের কথা বললে, সে একজন পুরুষ মানুষ। দু একদিন বুঝলেও, পরে যখন স্বার্থে টান লাগবে তখন তারও ভালো লাগবে না। অযথা ঝামেলা কে চায়? তোমাদের পছন্দের বিয়ে হলে এক কথা ছিল, এখানে তো পুরো সমঝোতা চলছে। এভাবে তোমার নতুন জীবনে কোন ভালো পরিবর্তন তো আসবে না বরং তোমার জন্য সবকিছু আরও কঠিন হয়ে পরবে। এখন বলতে পারো, বিয়ে করার প্রয়োজন কি ছিল? তাহলে বলি, সারাজীবন কি একই ভাবে কাটিয়ে দিবে তুমি? আচ্ছা তোমার কথা নাহয় বাদই দিলাম। বয়স কম। সময় আছে। কিন্তু তোমার মা? উনি বার্ধক্যে চলে এসেছেন। আগে বাবাকে নিয়ে চিন্তা ছিল। এখন উনি না থাকলেও তুমি আছো। বাবার মতোন করে উনি তোমাকে সামলাতে পারেন না। মা তো, তাই খারাপ লাগে। মনে মনে প্রচণ্ড চিন্তা করেন। রক্তচাপ বেশি হয়। রাতে ঠিকমত ঘুম হয় না। নিজের আরাম বাদ দিয়ে দেখেন মেয়ে তার ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে কি না। এগুলো ঠিক কতদিন করা যায়? এরপর যখন মা না থাকবেন। তখন? তোমাকে কে দেখবে? কে বুঝবে? তাই সময় থাকতেই নিজেকে সামলে নাও। শুরু থেকে আবার সবকিছু শুরু করো।
মাথা নত করে ভাবির কথাগুলো শুনে যাচ্ছিলো নিবৃতা। ভাবি কি মনে করে? নিবৃতা এগুলো ভেবে দেখে নি? নিজের মনটা তো সেই কবেই ম/রে গিয়েছে। তবুও সবকিছু বিবেচনা করেই বিয়েতে রাজি হয়েছিলো ও। বাবা তো ওকে বলেছিলেন, মেয়েকে কখনও বিয়ে দিবেন না তিনি। সেই আশা ও ভরসায় নিবৃতা একটু হলেও ভালো ছিল। কিন্তু সেই ভালো থাকাটুকুও বাবা নিজের সাথে নিয়ে চলে গিয়েছেন। এরপর থেকেই নিবৃতা বুঝে গিয়েছে ও বেশিদিন আর নিজের মতো করে থাকতে পারবে না। হলও তাই। ও প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে চলেছে। কেউ কি চায় এরকম অভিশপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে? কতবার ভেবেছে সবাইকে শান্তি দিয়ে চিরদনের জন্য চলে যাবে। ওর শরীরের প্রতিটি কোন জানে, ওর একেক যন্ত্রণার খবর। কিন্তু সেই কাজটা যে মহাপাপ! এই জীবনে নিবৃতা এক ফোঁটা শান্তি পেলো না। সুখ কাকে বলে বুঝলো না। এখন সেই দুনিয়াতেও যদি নিজের জন্য আগে থেকে জাহান্নাম বানিয়ে নেয় তাহলে ও যাবে কোথায়? সেই ভয় থেকেই ও নিরুপায় হয়ে থেকেছে। অন্তঃস্থল চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বের হয়। মুখ ফুটে কোন শব্দ উচ্চারিত হয় না। রত্না কাজ শেষ করে এসে নিবৃতার থুতনি ছুঁয়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,
– কিছু মনে করো না। ভাবির তোমাকে নিয়ে চিন্তা হয়। তাই এভাবে বলে।
হঠাৎ চোখ যায় নিবৃতার হাতে। রত্না সেটা দেখে হেসে উঠে।
– কি রঙ হয়েছে তোমার মেহেদীর! ইশ! স্বামীর অঢেল সোহাগ পাবে বলে রাখলাম।
নিবৃতার চোখ সহসাই চলে গেলো তার হাত জোড়ার দিকে। টকটকে খয়েরি রঙে রাঙ্গা হয়ে উঠেছে শুভ্র ত্বক। গতকাল রাতে শিউলি ওকে স্বাভাবিক করে ঘরের বাহিরে নিশে আসার পড রত্না এক প্রকার জোর করেই ওর শীর্ণ হাতদুটোতে মেহেদী পরিয়ে দিয়েছে। বিয়ের কণের হাত ফাঁকা থাকলে মানায়?
– হাত মুখ ধুয়ে নাও। নাশতা করে তৈরি হতে হবে তোমাকে। একদমই সময় নেই হাতে।
রত্না চলে গেলো। নিবৃতা তখনও নির্নিমেষ দেখে চলেছে নিজের হাত দুটোকে। স্বামী সোহাগ? হয়তো স্বাভাবিক জীবনে, মেয়েদের সবচাইতে চাওয়া একটি জিনিস! অথচ অস্বাভাবিক নিবৃতা চায় ঠিক তার উলটো! কোনভাবে যদি তাবিব ওকে ঘৃণা করতো তাহলে কতই না ভালো হত! আচ্ছা সে যখন নিবৃতার বিষয়ের শুনলো, তখন কি এটা ভেবে নাক সিটকায় নি যে একজন ভাঙ্গাচোরা মেয়ে তার স্ত্রী হবে? একটা মৃতপ্রায় মন নিয়ে সংসার করতে হবে। লোকটা কি ভেবেছিলো? নাকি মেয়ের জন্য সবটা মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে?
বিয়েতে কোন আড়ম্বরতা নেই। একদম সাদাসিধে সব আয়োজন। কোন এক কারণে তাবিবের পরিবার থেকেও নেই আর নিবৃতা? তারা কোন এক সময়ে চেনাজানা সকলের থেকে দূরে সরে এসেছিলো।
বাদ জুম্মা, বরযাত্রী হিসেবে তাবিব তার মেয়েকে নিয়েই এসেছে। সাথে আছেন কাজী সাহেব। শিউলি ও রত্না বেশ সমাদর করছেন তাদের। তবে এই বিয়েতে সবচেয়ে বেশি খুশি যে, সে হল ছোট সদস্য তানহা। মেয়েটার মুখ থেকে হাসি সরছেই না। নিবৃতার সাথে মিল করে ভারি কাজের মেজেন্টা রঙ্গা কামিজ পরেছে সে। আর তাবিব পরেছে সাদা পাঞ্জাবি। ক্লিন শেভ করা চোয়াল, জেল দিয়ে একদম পরিপাটি করা চুল। বরাবরের মত চোখে রিমলেস চশমা এঁটে রাখা। মুখবয়ব গম্ভীর। বিশেষ ভাবাবেগ নেই! দ্বিতীয় বিয়ে! দ্বিতীয় বারের মতো এই বত্রিশ বছরের জীবনে আরেক নারীর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে সে! ভাবতেই যেন কেমন লাগছে! তেঁতো এক অনুভূতি। ওর মনে পরে যায় পুরনো দিনের কথা।
সদ্য মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়া তরুণ তাবিব। সর্বদা মুখে চওড়া এক হাসি নিয়ে ঘোড়া প্রাণোচ্ছ্বল ছেলে। প্রাণবন্ত তার চোখদুটো ঝলমল করতো বেশ। জীবনে দুঃখ কষ্টের উপস্থিতি থাকলেও তাদের তেমন একটা তোয়াক্কা করতো না ও। নিজের মতো করে বাঁচতো, হাসি খুশি থাকতো। অতঃপর একদিন এলো জীবন মরণের সময়! সেই অপরিপক্ব বয়সে ঠিক সেরকমটাই মনে হয়েছিলো তাবিবের। বর্তমানে এর কথা ভাবলে নিজেকে কোষে কয়েকটা লাগাতে মন চায়। সবে মাত্র বয়স বিশ। আইনানুযায়ী বিয়ের বয়স হয় নি। তবুও বন্ধহদের সাথে মিলে টাকা খরচ করে কাজ সেরেছিল। বুকের মাঝে কি যে উথাল পাতাল করা অনুভূতি! তখনও পরিপূর্ণ গোঁফ গজায় নি ঠোঁটের উপর! অথচ নিজের কাঁধে সম্পূর্ণ আরেকজনের দায়িত্ব বহন করে নিলো, যার জন্য তখনও ও তৈরি ছিল না। তাই তো ভার সইতে না পেরে একসময় করুণভাবে মুখ থুবড়ে পরলো! একদম সর্বস্ব গুড়িয়ে গেলো। এরপর আর সোজা হতে পারে নি। ছুটে গেলো সব। কিন্তু আজ, আবারো সময়ের দাবীতে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তবুও সব কেমন আলাদা! তাবিবের অনুভূতি কেমন অসার হয়ে এসেছে। কিছু বুঝতে পারছে না। ও শুধু জানে, তার মেয়েটার জন্য সুখ নিতে এসেছে ও আজ! এখন এই সুখের ভার সইতে যা যা করার, তাবিব নাহয় ঠিক তাই তাই করবে! এবার ও ব্যর্থ হলে, নিজের সাথে সাথে মেয়েটাকেও অবর্ণনীয় কষ্ট দিয়ে ফেলবে, যেটা এক বাবা হয়ে ওর পক্ষে অসম্ভব!
কাজি তখন কাগজ পত্র ঠিক করছিলেন। পরিবেশ বেশ থমথমে। মানুষ নেই বেশি। কি কথা হবে? তবুও দায়িত্ববোধ থেকে তাবিব বলল,
– বড় ভাইয়া তো উপস্থিত নেই, তবে কি ভিডিও কলেও জয়েন করবেন না?
ছেলের কথা উঠায় শিউলির মুখটা চুপসে গেলো। কিভাবে বলবেন, তাবিবের সাথে বিয়ে হওয়ায় নিভান খুশি নয়। নিজের বোনকে বিয়ে যদি দিতেই হতো তাহলে ও সময় নিয়ে আরও ভালো সম্বন্ধ খুঁজে আনতো। কোন তালাকপ্রাপ্ত, এক বাচ্চার বাবা নয়। এ নিয়ে বেশ মনমালিন্য হচ্ছে। স্ত্রী রত্নার সাথেও কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে ও।
– আর বলবেন না ভাইয়া! ওর যেই কাজের চাপ! চেয়েও সময় বের করতে পারে নি। মিটিংয়ে আছে। ও বলেছে সময় করে আপনার সাথে কথা বলে নিবে।
কিছু কিছু বিষয় এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ হয় যে, কোন অজুহাতই এর বিপরীতে কাজে আসে না। এই বিষয়টাও ঠিক তেমন। তাবিব বুঝলো মুল ঘটনাটি ভিন্ন। তাই সে আর ঘাটাতে চাইলো না। আগ বাড়িয়ে কিছু জানার কৌতূহল, ওর সময়ের সাথে বেশ কমে এসেছে। তাই মৃদু মাথা নেড়ে বলে,
– নো প্রবলেম।
শাশুড়িকে উদ্ধার করতে মাঝ থেকে রত্না মিথ্যে বলে বসলো। তবে আর করারই বা কি আছে। এরই মাঝে কাজি জানালেন তার কাজ শেষ। কথাটি শুনতেই তানহা লাফিয়ে উঠলো।
– বাবা, আমি কবুল বলা দেখবো। ম্যামের কাছে যাই?
– আচ্ছা।
তাবিব অনুমতি দিতেই রত্নার সাথে অন্দরে ছুটল তানহা। নিবৃতা তখন খাটের মাঝখানে বসে। শিউলি যেভাবে বসিয়ে রেখে গিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই আছে ও। কিঞ্চিৎ নড়চড় অবদি করে নি। পরনে সেই মেজেন্টা রঙের শাড়ি। মুখে হাল্কা প্রসাধনীর ছোঁয়া। বড় বড় চোখদুটোতে কাজলের প্রলেপ। হাত ভর্তি চুড়ি, কানে ঝুমকো, নাকে ছোট একটা নথ ও গলায় সোনার হার! মাথায় লাল রঙের চুনরি! দেখতে অপূর্ব লাগছে তাকে! চেহারা থেকে প্রাণটা হারিয়ে গেলেও লাবণ্য কিছুটা হলেও সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে এখনও।
– ম্যাম!
তানহা উচু গলায় চেঁচিয়ে এগিয়ে এলো। হঠাৎ এভাবে ডাকায় নিবৃতার বুক খামছে উঠলো। কেঁপে উঠলো ভেতরটা। তবে বুঝতে দিল না কাওকে। আজ থেকে ঠিক এভাবেই, নিজের সমস্ত গ্লানি, ক্লেশ ওকে লুকিয়ে রাখতে হবে। অনেক তো হলো নিজের দুর্বলতা জাহির করা। এবার নাহয় নিজেই নিজেকে সামলানো যাক। ও মৃদু হেসে তাকানোর চেষ্টা করলো। তানহা ওকে জাপটে ধরে বলল,
– আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে ম্যাম!
– উহুম। আর আমার ঝিলমিলকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে!
তুলতুলে গাল টেনে দিয়ে বলে উঠে নিবৃতা। তানহা প্রত্যুত্তরে মুচকি হাসে। এরপর চলে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দরজার ওপাশে কাজি সাহব উপস্থিত হতেই শিউলি মেয়েকে সঙ্গ দিতে চলে আসেন। এক হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে পাশে বসে থাকেন। যেন এক নীরব, স্পষ্ট ভরসা! মায়ের উষ্ণতা অনুভব করতে পেরে চোখ ভিজে আসতে চায় নিবৃতার। ঠিক তখনই অপর হাতে কোমল হাতের চাপ মিলে। নিবৃতা তাকায় সেখানে। তানহা বড্ড আবেগ নিয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে। দু চোখ কেমন জ্বলজ্বল করছে। ঠিক কতটা পছন্দ করলে অন্য একজনকে কেউ নিজের মা বানাতে চায়? নিবৃতার মনটা ভরে উঠে। ওর মতো অনুভূতিহীন, ঠান্ডা মানুষটার মাঝে কি দেখলো মেয়েটা যে এতোটা ভালবেসে ফেলল? উত্তর পায় না ও। তবে মনে মনে দৃঢ় ওয়াদাবদ্ধ হল যে, তানহাকে এখন থেকে নিজ জীবনের শীর্ষ অবস্থানে বসাবে ও। নিজের আগে তানহাকে গুরুত্ব দিবে। হয়ে উঠবে ওর সবচাইতে আপন কেউ! এরপর কাজি সাহেব ওকে যখন সম্মতি দিতে বললেন তখন ও তানহার চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসলো, অতঃপর শ্বাস আটকে খুবই মৃদু লয়ে বলল,
– আলহামদুলিল্লাহ!
কাজি সাহবে শুনতে পেলেন না একটুও। পুনরায় বলতে বললেন। পরিস্থিতি দেখে তাবিব মৃদু শ্বাস ছাড়ল। সে আসলেই চিন্তিত, নিবৃতাকে ও ঠিকঠাক শুনতে পাবে তো বিয়ের পর? ওদিকে গলায় জোর দিয়ে যত জোরে বলা যায় ততটাই চেষ্টা করল নিবৃতা। পুরোপুরি স্পষ্ট না শুনলেও কিছুটা কানে এসেছে। এতেই হাফ ছেড়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠেন কাজি সাহবে। এরপর পাঠানো হলো রেজিস্ট্রেশনের খাতা। তানহা নিজ থেকে বিশেষ একটি কলম নিয়ে এসেছিলো। তার ভাষ্যমতে এটি বিয়ের স্মৃতি বহন করবে। খুঁজে খুজে কতো ধরণ যে বের করেছে মেয়েটা! সেই কলম দিয়েই নিবৃতা স্বাক্ষর করে দিলো। কাজ শেষ হতেই কাজি সাহেব এবার তাবিবের কাছে চলে যান।
– আমি এখন বাবার কাছে যাই?
অনুমতি চাইছে তানহা। নিবৃতা মাথা নাড়াতেই ও বেরিয়ে গেলো। এদিকে শিউলি গিয়ে মেয়েকে পানি দিলেন। গলায় বেশ চাপ পরেছে ওর!
তাবিবও বেশি একটা সময় নেয় নি। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারো নিজের এক অপ্রকাশিত ভয়কে ও গ্রহণ করে নিয়েছে স্বীয় জীবনে। দৃঢ় গলায় তিনবার জানিয়েছে তার সম্মতি।
নিবৃতা পর্ব ২
– আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল।
অতঃপর সেই একই কলম এগিয়ে দেওয়া হলে, তাবিব নিজেও লিখে দিলো তার নাম।
তানহা নামক মিষ্টি মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে, দুই ভিন্ন অতীতের স্মৃতি ও এর নিদারুণ ব্যথায় জর্জরিত দুটো মানুষ একত্র হয়ে গেলো। এখন তাদের দাম্পত্যের সমীকরণ কিরূপ হয় সেটাই দেখার বিষয়। শুরুটা তানহাকে দিয়ে হলেও আদৌ কি এর প্রবাহ শুধু ওকে ঘিরেই হবে না এই দুজন একে অপরের মাঝে খুঁজে নিতে পারবে আপন সকল দুঃখের উপশম!
