নিবৃতা পর্ব ২
নেহার ছায়ালিপি
চমকিত হয়ে তাকিয়েছে সে। সম্মুখে অচেনা, অজানা পুরুষ মানুষ দেখে শরীরটা কেঁপে উঠেছে আকস্মিক। অভিব্যক্তিতে জড়ো হয়েছে নিদারুণ জড়তা। কেমন চুপসানো মুখশ্রী নিয়ে আরেকটু সেঁটে গেলো জানালার দিকে। একদম দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে। তাবিব ভ্রু কুঁচকায়। এরকম প্রতিক্রিয়া দেখানোর কি আছে? ওর নিজেরও অস্বস্তি হলো। একজন প্রাপ্তবয়স্কা যদি অন্য আরেকজন মানুষকে দেখে এমন গুটিয়ে যায় তাহলে কি কুন্ঠিত বোধ করা স্বাভাবিক নয়? রত্না নামের মেয়েটার উচিত ছিলো ভেতরে এসে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে যাওয়া, তাহলে হয়তো এরূপ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হতো না। কেমন নির্বোধের মতন দরজার সামনে ফেলে রেখে চলে গেলো। মুহুর্ত গড়ায়, কিন্তু নিবৃতা তখনও মাথা নিচু করে, দু-হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জড়সড় হয়ে আছে। তাবিবের বিরক্তি ধরে গেলো। ও মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
– আমি, ডাক্তার তানজিব সারোয়ার তাবিব। তানহার বাবা!
নিবৃতা প্রাণপণ চেষ্টা চালালো নিজেকে স্বাভাবিক করতে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না৷ নিজেকে শক্ত করতে চাইলো। মুখ ফুটে কিছু বলতে গিয়ে অনুভব করলো ওর কন্ঠতালু সাহারা মরুভূমির মতো শুকিয়ে খা খা করছে। ও এক অক্লিষ্ট ঢোক গলাধঃকরণ করলো। টেনেটুনে গায়ের ওড়না আরেকটু ঠিক করে নিলো। এই সবটাই নীরব চোখে পর্যবেক্ষণ করলো তাবিব। ওর নাক-মুখের অবস্থা বড়ই বিকৃত। ইচ্ছে করছে চেঁচিয়ে উঠতে। এখানে কি মস্করা হচ্ছে? ও আবারও কিছু বলবে তার আগেই একদম সরু, লহু লয়ের এক আওয়াজ কানে আসলো। ঠিকমতো বোঝাও যায় না। এতো ধীরেও কেও কথা বলে? অথচ ও জানলোও না এটাই সর্বোচ্চ গলার জোর তার!
– দুঃখিত, আপনি ভেতরে আসুন।
বোধশক্তি বোধহয় এ যাত্রায় ফিরেছে৷ তিক্ত মন নিয়ে তাবিব ঘরে ঢুকলো। মাঝারি আকৃতির ছিমছাম ঘর। বাহিরের সাজসজ্জা যতটাই শৌখিন, এই ঘরটা ঠিক তার চেয়েও বেশি মলিন। একটি বিছানা, পড়ার টেবিল, দুটো চেয়ার ও একটি দু পাল্লার আলমারি ছাড়া আর কিছুই নেই ঘর জুড়ে। সামান্য একটি আয়না মাত্রও নেই। আজকালকার যুগের মেয়ে মানুষ এতো সাদাসিধাও হয়? তাবিবের মনটা তাচ্ছিল্য করে উঠলো। প্রেমে প্রতারিত হওয়ার শোকে হয়তো সকল স্বাদ আহ্লাদ মিটে গিয়েছে। মানুষের মনে যতটা না দুঃখ না থাকে, মাঝে মাঝে তার বাহিরি দুনিয়ায় সেটার প্রতিফলণ ঘটাতে তার চেয়েও বেশি পছন্দ করে।
– বসুন।
একটি চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাবিব কোন কথা ছাড়াই বসে পরলো। তবে নিবৃতা এখনও এক নীরব যুদ্ধে মশগুল। নিজেকে একটু ধাতস্থ করার অভিপ্রায়ে। টেবিলের উপর একটি পানির বোতল ছিল। সেটাই কম্পিত হাতে তুলে নিলো ও। নিবৃতা পেছন ফিরে থাকলেও তাবিব বুঝলো সে পানি খাচ্ছে। আশ্চর্য এতোটা ভীত হওয়ায় কি আছে? কোনভাবে কি তাবিবকে কোন দানবীয় মানুষের মতো লাগছে? ওর চেহারায় কি বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট? ও ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়লো। বার কয়েক পলক ঝাপটে নিজেকে শান্ত করে নিলো। মুখের অভিব্যক্তি ধীর ও স্বাভাবিকে এনে রাখলো। এদিকে গলা ভিজতেই নিবৃতা একটু স্বস্তি পেলো। ডানহাতটা এখনও থেকে থেকে কাঁপছে। সেটি সন্তর্পনে ওড়ানার ভাজে লুকিয়ে নিলো। অতঃপর পিল পিল কদমে, নিঃশব্দে গিয়ে বসলো খাটের কিনারে। তাবিবের পুরোপুরি মুখোমুখি না হলেও কিঞ্চিৎ ডানদিক বলা যায়। তাবিব একজন স্পষ্টবাদী মানুষ। মানুষের চোখে চোখ রেখে তার কথা বলার অভ্যাস। ও যতটাই নির্ভীক ও দৃঢ়, এই মেয়ে দেখা যায় তার সম্পূর্ণ উল্টো। ব্যক্তিত্ব বোধ বলতে আদোও কিছু আছে কি না, সন্দেহ! এর জন্যই তো জীবনের এরূপ বেহাল দশা হয়েছে।
– দেখুন এতো অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আমি সোজাসাপ্টা কিছু কথা বলবো, যার সবগুলো আমার মেয়েকে ঘিরেই। আশা করি আপনার কোন আপত্তি নেই।
নিবৃতা চোখ তুলে তাকায় নি পর্যন্ত। সামনে বসা পুরুষটি দেখতে কেমন সেটাও ও বলতে পারবে না। শুধু দৃশ্যমান রূপে সায় জানাতে ক্ষীণ গতিতে ডানে বায়ে মাথা নাড়ালো। যার অর্থ দাঁড়ায়, তার কোন প্রকারের সমস্যা নেই। এহেন ভাবমূর্তি দেখে তাবিবের বিরক্তি চরম পর্যায়ে পৌছালেও ও চুপ থাকলো। ডাক্তারদের এতো সহজে ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটে না। ও মেয়েটার থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। এভাবে যদি তার স্বস্তি মিলে তাহলে তাতেই সই। ও গলার স্বর যথেষ্ট নরম করার চেষ্টা করে বললো,
– তানহার বায়োলজিকাল মায়ের সাথে আমার দশ বছর পূর্বেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে। স্পষ্ট কারণ যদি বলতে হয় তাহলে বলবো মতের অমিল ও জীবনধারার মধ্যে থাকা বিস্তর পার্থক্য। আমি তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলাম। জীবনে সংগ্রাম চলছিলো। সেটার সাথেই উনি ঠিকঠাক ভাবে মানিয়ে নিতে পারেন নি বলতে গেলে।
কথার তালে তাবিবের নমনীয়তা হারিয়ে গেলো। চোখের সম্মুখে পুরনো সেই কষাটে স্মৃতিগুলো মানসপটে ভেসে উঠতেই হাত দু’টো মুষ্টিযুদ্ধ হয়ে এলো। মাথা নত থাকায় সেটা স্পষ্ট খেয়াল করলো নিবৃতা। লোকটার এতোই যদি সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে সে বলছে কেন এসব? নিবৃতা কি শুনতে চেয়েছে কিছু?
– আপনি কি আরও গভীরতায় যেতে চান?
তাবিব জিজ্ঞাসা করতেই নিবৃতা আবারও চুপ থেকে মাথা নাড়ালো। সে শুনতে চায় না। কখনোই চায় না।
– এবার তাহলে, আমার বিয়ে করতে চাওয়ার কারণটা আপনাকে বলি। তাহলে হয়তো সিদ্ধান্তে এগোতে সুবিধা হবে।
আড়চোখে চাইলো তাবিব। আশা ছিল এবার হয়তো কোন জবাব আসবে। কিন্তু নাহ! তাকে আবারও হতাশ হতে হলো। তার তানহার মতো প্রাণোচ্ছল, হাসিখুশি মেয়েটা কিভাবে এই জড়বস্তুর ন্যায় একজনকে এতোটা পছন্দ করে বসলো? তাবিবের বুঝে আসে না। ও গোপনে এক শ্বাস ছেড়ে বলে,
– আমার এমবিবিএস শেষ হওয়া পর্যন্ত আমার বড় আপা দেশেই ছিলেন। তাই তানহাকে রাখতে অসুবিধা হয় নি তেমন একটা। দিনের বেলায় ফুপির কাছে আর রাতে বাবা। এরপর উনি আমেরিকা পাড়ি জমালে, তানহা একা হয়ে গেলো, কিন্তু তখন আমি ছিলাম ওর সাথে। যেখানে যেতাম সাথে সাথেই রাখতাম। সেজন্যই ওকে দেরীতে স্কুলে দিয়েছি আমি। এখন সমস্যা হচ্ছে, আমার অস্ট্রেলিয়াতে ফেলোশিপের সুযোগ এসেছে। দু থেকে তিন বছর লাগতে পারে। বরাবরের মতোই ইচ্ছে ছিল তানহাকে নিয়েই যাবো। কিন্তু ও কেন যেন এবার বেঁকে বসলো। দেশ ছেড়ে যাবে না। ও কখনই এমন করে না। একদম শান্ত ও৷ কিন্তু এবারে, ওর জেদ সব মাত্রা ছাড়ালো। ঠিক করলাম যাবো না অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু চেনাজানা সবাই খুব জোরাজোরি করলো। অনকোলজি(ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট) নিয়ে ফেলোশিপ। খুবই ভালো একটা সুযোগ। হাতছাড়া করা যাবে না। আমি তবুও তানহাকে রাজি করাতে পারি না। এই সময়ে আপা বললেন, বিয়ে করে নিতে। বাসায় অন্তত একজন থাকবে। উপরন্তু তানহা বড় হচ্ছে। এসময়ে একজন মায়ের খুব দরকার। আমার মন মান ছিলো না। তবুও উপায় না পেয়ে রাজি হয়ে গেলাম। এরপরই আসল কথা বের হলো। তানহা মুলত আপনার জন্যই দেশ ছাড়তে চাচ্ছে না।
কথাটা শুনতেই গোল গোল নয়ন দুটো মেলে এবারে তাকালো নিবৃতা। তাবিব ওকে উপেক্ষা করে বললো,
– আপনার সাথে ও এতোটাই এটাচ হয়ে গিয়েছে যে কোথাও যেতে রাজি নয়। এমনকি আমাকে ছাড়াও ও থাকতে পারবে। ভাবা যায়! ও জেদ ধরে বললো, বিয়ে করলে নিবেদিতা ম্যামকে করো। কখনো সামান্য মন খারাপ অবদি না করা আমারা মেয়েটা সেদিন কেঁদে ভাসালো। আমার সহ্য হয় নি সেটা। তাই কথা শুরু করতে বাধ্য হয়েছি আমি।
তাবিব থামলো। পুনরায় যখন কোন উত্তর পেলো না তখন বললো,
– আপনি কি আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছেন?
নিবৃতা নীবে সায় জানানোর আগেই এবার তাবিব দৃঢ় গলায় বললো,
– আপনার মৌখিক স্বীকারোক্তি শুনতে চাই। আমি স্পষ্টতা পছন্দ করি।
নিবৃতার অন্তঃস্থল সহসাই কাঁপলো। লোকটা এতো শক্ত কন্ঠে কথা বলে কেন? ওর যে একটুও অভ্যাস নেই! কিন্তু এক না একদিন সেই গন্ডী থেকে তো ওকে বের হতেই হবে। বরঞ্চ বিয়ে করার মতো অসম্ভব একটা সিদ্ধান্ত ও নিজেই নিয়েছে। এখন এর ভার সয়ে নেওয়াও শিখতে হবে। ও গলা ভিজিয়ে বললো,
– বুঝতে পেরেছি।
মেয়েটার গলার স্বর এতো নিচু! বেশি দূরে বসে নেই ও তবুও যেন কান খাঁড়া না করে রাখলে শোনা দুষ্কর! কসবার সাথেই কি কি এভাবে কথা বলে না তাবিবের সাথেই এমন আচরণ করছে?
– এই যে আমি বললাম, বিয়ে করে স্ত্রী নিয়ে আসা ছাড়া তানহার দায়িত্বে কাওকে দেওয়া যাবে না। এতে আপনার মনে প্রশ্ন জাগে নি যে আমার পরিবারের বাকি সদস্যেরা কোথায়?
– বিয়েটা যেহেতু তানহার জন্যই হচ্ছে, সেহেতু ওর বিষয় ছাড়া অন্য কোন কিছুর প্রতিই আমার আগ্রহ নেই।
লঘু আঁচের কথাগুলো কানে এলো তাবিবের। না চাইতেও কেন যেন কথাটা ভালো লাগলো না, যদিও ভুল কিছু বলে নি সে।
– তানহার সাথে আপনার এতো গাঢ় বন্ধন, নিশ্চয়ই কম বেশি জানা হয়েছে।
ও নিজের স্থান অনড় রাখতে খুঁচিয়ে কথাটি বললো, তবে এবার ওকে আশ্চর্য করে দিয়ে নিবৃতা তৎক্ষনাৎ জবাব দিয়েছে।
– একজন শিক্ষিকা হিসেবে আমার সীমাবদ্ধতা ঠিক কতটুকু, সেটা আমার আয়ত্তে আছে।
সাবলীল বলার ধরন, তবুও মনে হলো তাবিবের মুখের উপর উচিত জবাব ছুঁড়েছে সে! অথচ তার মা বললো, মেয়েটা কথাবার্তায় তেমন পটু নয়৷ তাবিবও পাল্টা আঘাত দিয়ে বললো,
– তাহলে আমাদের দুজনের জন্যই এ কথা স্পষ্ট রইলো যে, এই সম্পর্কে তানহার অগ্রাধিকার সবচেয়ে বেশি থাকবে। বাকি সব সময়ের উপর ছেড়ে দেওয়া হবে। আশা করি এর বাহিরে আপনি আমার থেকে কিংবা এই সম্পর্ক সম্বন্ধে কোনরূপ ভ্রান্ত ধারণা ও এর থেকে প্রত্যাশা রাখবেন না।।
নিবৃতার মনে জমে থাকা ভয় ও সংশয় কিছুটা হলেও লাঘব হলো। দুরুদুরু করতে থাকা বুকের ভেতরটা শান্ত হলো। ছোট্ট করে বললো,
– আমার তরফ থেকে আপনিও আশ্বস্ত থাকুন।
কোন জড়তা নেই, তাবিবের কথাগুলো শুনে তার মাঝে কিঞ্চিৎ উদ্বেগ, প্রশ্ন কিংবা মন খারাপের সামান্য লক্ষণ পর্যন্তও নেই। তার কি সত্যিই তাবিবের থেকে কোন চাওয়া পাওয়া নেই? সব তাহলে শুধুমাত্র তানহার জন্যই? এতোটা গভীর মমত্ববোধ এক পরের মেয়ের জন্য যে, কেবলমাত্র নামের জন্য বিয়ে করতে রাজি? ভবিষ্যৎের কথা তাবিব জানে না তবে ও এতটুকু বুঝলো, এ মুহুর্তে নিবেদিতা ও তানহার মাঝে গড়ে ওঠা বন্ধনের গভীরত্ব ও স্পর্শ করে, মাপতে পারবে না। এরজন্য সময় চাই। অনেকটা সময়। নিবেদিতা ফারুকী নিবৃতা নামক মেয়েটিকে কাছ থেকে জেনে, পরোখ করে তবেই ও কিছু বলতে পারবে।
আর ঠওক গুনে গুনে এগারো দিন পরই তাবিবের যাওয়ায় দিন তারিখ ধার্য করা হয়েছে। হাতে মোটেও সময় নেই। তাই সব আয়োজন দ্রুতই চলছে। আগত শুক্রবার বিয়ে এবং সেটা আগামীকালই। তাবিব যখন রাতে তার হবু শাশুড়ীকে কল করলো তখন রাত দশটা বাজে।
– আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
– ওয়া আলাই কুমুসসালাম বাবা। কি অবস্থা?
– জি আন্টি ভালো। আপনি?
– এই তো বাবা।
– আসলে একটি কাজেই কল করা হয়েছে।
– আরে ইতস্তত করছো কেন? বলো।
– আসলে মিস নিবেদিতার জন্য যা যা লাগবে সেগুলো বলে তানহাই পছন্দ করে কিনবে।
শিউলি হেসে বললেন,
– হ্যা। সেটা তে সমস্যা কোথায়?
– ও চাচ্ছিলো যে উনিও যেন আমাদের সাথে যোগ দেন।
শিউলি বেগমের মুখের হাসি মুছে গেলো। সে যদি এখন বলে, মেয়ে তার কখনোই বাহিয়ে যায় না তাহলে কি ছেলেটা বিশ্বাস করবে? স্কুলে যাওয়া আসার কাজে, নিবৃতার জন্য রিকশা নির্ধারিত করা আছে। প্রতিদিন সময় মতো বাসা থেকে নিয়ে গিয়ে আবার ফেরত দিয়ে যায়। এ ছাড়া সে কোথাও যায় না। লোকসমাগমে যে মেয়েটার বড্ড ভয়। এখন উনি মানা করবেন কিভাবে?
– আসলো বাবা, ও তো তেমন একটা বাহিরে যায় না। এসব সম্পর্কে ওর কোন ধারণাই নেই। তোমরাই ভালো বুঝবে।
মেয়ের সব বিষয়ে ভদ্র মহিলার একটা করে পিছুডাক রয়েছে। সমস্যাটা ঠিক কোথায়? তানহা উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে ছিল। তাবিব নিরাশ হয়ে মাথা নাড়িয়ে মানা করতেই ওর ঝলমলে হাসি দপ করে নিভে যায়। গোমড়ামুখে বলে,
– আমাকে দাও।
তাবিব ইশারায় মানা করলেও ও শুনলো না। অগত্যা মোবাইল বাড়িয়ে দিতেই তানহা বলে,
– নানুমনি এটা কিন্তু ঠিক না!
আচমকা এই সম্বোধনে শিউলি নির্বাক বনে গেলে। এর আগে তানহার সাথে কখনো দেখা হয় নি৷ তবুও মেয়েটা সম্পর্ক বদল কিংবা তৈরি এতো জলদি করে নিলো? উনার মনটা উষ্ণ হয়ে উঠলো। আদুরে স্বরে বললেন,
– হ্যা নানুমনি, কোনটা ঠিক না?
– আপনিই বলেন, এখনকার দিনে কেউ কি নিজের বিয়ের শপিংয়ে অনুপস্থিত থাকে? সবাই- ই তো যায়।
– সবাই যায়?
শিউলি হাস্যরস স্বরে জানতে চাইলেন।
– হ্যা। তাহলে ম্যাম কেন যাবেন না?
তাদের কথার মাঝেই ঘরে রত্না চলে এসেছে৷ চুপ থেকে যতটুকু বুঝলো, তাতেই শাশুড়ীকে ইশারায় রাজি হয়ে যেতে বললো। শিউলি মাথা নাড়িয়ে না বোঝাতেই রত্না মুখটা অসন্তুষ্ট করে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকেন। শিউলি মাঝে থেকে বিপাকে পরে গেলেন। ওদিকে তানহা এখনও অনুরোধ করে চলেছেন। শিউলি এক শ্বাস ছেড়ে বললেন,
– আচ্ছা। তোমার ম্যাম যাবেন। এবার খুশি তো?
তানহা লাফিয়ে উঠে। তাবিব ওকে হাতের ইঙ্গিতে শান্ত হতে বলতেই ও কোনরকম বলে,
– অনেক খুশি। আমি আর বাবা সকাল সকাল ম্যামকে নিতে চলে আসবো।
– আচ্ছা, চলে এসো।
কল কাটতেই বিরস মুঝে বসে থাকেন শিউলি। মাথায় তার নানান চিন্তাভাবনা। ভয় লাগছে কেমন। রত্না পাশে বসে বলে,
– এতো ভয় পেলে হবে মা?
– তুমিতো জানোই নিবুর অবস্থা।
– এই এক কথা বলে বলেই আজ নিবুর অবস্থা আরও নাজুক হয়ে গিয়েছে। অথচ ওর উচিত ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর।
শিউলি একবার মৃত দৃষ্টি মেলে দেখলেন রত্নাকে। অতঃপর মুখ ভার করে বলেন,
– চোখের সামনে না ঘটলে গায়ে লাগে না বৌমা। তোমার শশুর কম চেষ্টা করেন নি৷
রত্মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
– এখন অন্তত নিবুকে শক্ত হতে হবে৷ ও নিজেই এই পথ বেছে নিয়েছে। ওকে তো কেউ জোর করে নি।
রত্ম উঠে চলো গেলো। যখন থেকে বিয়ে করে এই সংসারে এসেছে, তখন থেকেই ওর মনে হয়, নিবৃতাকে নিয়ে একটু অতিরিক্তই করা হয় এই পরিবারে। ছোট ছোট বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা হয়। এতো বছর হয়ে গেলো, এখনও সেই মেয়ে স্বাভাবিক হয় না কেন? এতদিনে তো সব ভুলেও যাওয়ার কথা। এদিকে শিউলির বুকটা হাহাকার করে উঠে। ওনার মেয়ে যে কেন ঠিক হয় না, এটা যদি তিনি কাওকে বলে বোঝাতে পারতেন! অনন্ত যে শুনতে চায় তার মনটা যদি সংবেদনশীল না হয় তাহলে কিভাবে বলবেন তিনি?
সম্পূর্ণ অবগুণ্ঠিত অবস্থায় খাটের উপর বসে আছে নিবৃতা। ভাবমূর্তি বড্ড নিস্পৃহ, যেমনটা সবসময় হয়ে থাকে। শিউলি পাশে চিন্তিত মুখে বসে আছেন। একটু পরপর ছোট ছোট নির্দেশনা দিয়ে চলেছেন,
– তানহার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখবি সবসময়। এদিক ওদিক যাবি না। খারাপ লাগলে ওয়াশরুমে যাবি। খবরদার অন্য কোন চিন্তাভাবনা মাথায় আনবি না। আসেপাশে বেশি তাকানোর দরকার নেই। ঠিক আছে? মায়ের কথা মনে থাকবে তো?
নিবৃতা আলতো করে মাথা নাড়ায়৷ শিউলির তবুও মন মানে না। তানহাদের সকাল সকাল আসার কথা থাকলেও মাত্র আসছে তারা। সন্ধ্যা পার হয়ে গিয়েছে। ধরনীতে পুরোপুরি আঁধার নেমে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কি করার! তাবিব একজন ডাক্তার মানুষ। কখন কোন প্রয়োজন পরে যায়!
অতঃপর অপেক্ষার অবসান ঘটাতে তাবিবের কল চলে এলো। নিচে আছে তারা। তানহা পইপই করে বলে দিয়েছে, একেবারে বিয়ের দিনই সে বাসায় আসবে, তাই এখন নিবৃতাকেই একা বেরিয়ে যেতে হবে। শিউলি অস্পষ্ট স্বরে কিছু দোয়া পরে মেয়ের মাথায় ফু দিলেন।
– সাবধানে থাকিস মা।
– চিন্তা করো না।
নিজের মাঝে ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলেও মাকে স্বান্তনা দিতে সে ভুললো না। অতঃপর শ্বাস আটকে নিচে নেমে আসতেই দেখা হয় তানহার সাথে। লম্বা সবুজ রঙের ফতুয়া, ঢিলেঢালা প্লাজো ও মাথা হিজাব বেঁধে এসেছে তানহা। গোলগাল শ্যাম মুখটা ভীষন মায়াবী দেখাচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে নিবৃতার অপেক্ষায়ই অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করছিলোও। যেই দেখলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটি এসেছে ওমনি ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলো। গলার স্বর টেনে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠলো,
– ম্যাম!
নিবৃতার রোগাটে, পাতলা শরীরটা ওর ভার না বইতে পেরে পিছনের দিকে হেলে পরতে নিলো, তবুও মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিলো ও৷ আগে হলে অবশ্য পারতো না। মনে আছে, প্রথম যেদিন ও এভাবে ছুটে এসেছিল সেদিন নিবৃতা টাল সামলাতে না পেরে, পরেই গিয়েছিল ছিল নিচে। তবে হাত দিয়ে ঠেকিয়ে তানহাকে বাচিয়ে দিয়েছিলো। সরল মনা বাচ্চাটার সেদিন ঠোট ভেঙে কান্না উগলে আসতে চেয়েছিলো। কিভাবে যে নিবৃতা সামলালো! কিন্তু আজ এতোদিন পর এসে সেই অভ্যাসটা এখনও জারি আছে আর নিবৃতাও মানিয়ে নিয়েছে। তানহার থুতনি ছুঁয়ে দিয়ে নিবৃতা বলে,
– আমার ঝিলমিলকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে!
তানহা চমৎকার করে হাসলো প্রত্যুত্তরে। সদা হাসিখুশি ও প্রানবন্ত থাকায়, তানহাকে এই নামটি দিয়েছে নিবৃতা। কোন বিষন্নতায় ভোগা মানুষও যদি তানহার সাথে দুটো ক্ষণ কথা বলে, তাহলে তার মনটাও ভালো হতে বাধ্য। সেজন্যই বোধহয় নিবৃতা এতেটা মিশে গিয়েছে ওর সাথে!
– চলুন ম্যাম! দেরী হয়ে যাচ্ছে।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে এতোক্ষণ লুকিং গ্লাসে সবটাই খেয়াল করেছে তাবিব। তানহার কথা শুনতে পেলেও সেই মানবীর গলার স্বর কানে আসে নি। অবশ্য যেভাবে কথা বলে, আসার কথাও নয়। ওরা দুজন গিয়ে পেছনে বসতেই তাবিব বলে উঠে,
– এটা কি হলো? বাবাকে তো তুমি ড্রাইভার বানিয়ে দিলে মা!
তানহা হেসে বলে,
– এখন থেকে তুমি আমার আর ম্যামের পার্সোনাল ড্রাইভার বাবা! একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট ট্রাস্টেড!
পরপর বুড়ো আঙ্গুল উঁচিয়ে ইঙ্গিতে জানালো তানহা৷ তাবিব হেসে ফেলে।
– ওকে ম্যাডাম। আপনি যা বলেন।
শপিং মল পৌছানোর পুরোটা রাস্তা অনর্গল কথা বলে গেলো তানহা। সে কি কথা জমেছে তার! থামার শেষ নেই। নিবৃতা মাঝেমধ্যে উত্তর দিয়ে চলেছে। তবে সবই তাবিবের শ্রবণসীমার নিম্নে! ওর কেন যেন হতাশায় মাথা ব্যাথা করে উঠে। তানহাদের ক্লাসরুম বড় হওয়ায় মাইক ব্যবহার করতে হয়। সেজন্য রক্ষা। শিক্ষার্থীরা নিবৃতাকে শুনতে পায়। কিন্তু তাবিব? ও কি করবে? বিয়ের পর কি নিবৃতার উপর একটি ছোট মাইক লাগিয়ে দিয়ে, ঘরের প্রতি কোনে স্পিকার বসাবে? এরূপ উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসতে নিজের প্রতিই বিরক্তি ধরে গেলো ওর।
গাড়ি থেকে নামার পর থেকে তানহার সরু হাতটা নিজের বা হাতে শক্ত করে ধরে আছে নিবৃতা। আসেপাশে যথেষ্ট মানুষের আনাগোনা। চোখ তুলে তাকাতেই কেমন দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। মাথার মাঝে কেমন যেন করে! মনে হয় শত শত পোকারা কিলবিল করছে! শুধু ও আর ওর রবই জানে, প্রথম প্রথম স্কুলের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে ওর কি পরিমান কষ্ট হয়েছে। নিজের সাথেই নীরব এক যুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই করছিলো ও। বাবার ছায়া মাথার উপর থেকে হারিয়ে গেলে প্রত্যেক সন্তানকে এভাবেই জীবন সংগ্রামের সাথে অভ্যস্ততা গড়ে তুলতে হয়। চারপাশে এতো মানুষের উপস্থিতি, তাদের উঁচু গলায় কথা বলা, সবই কানে বাজছে! ইচ্ছে করছে এক ছুটে এখান থেকে পালিয়ে যেতে! পাশেই তানহা চপল পায়ে চলছে। তার চঞ্চল চোখ অস্থির ভঙ্গিতে চারপাশে ঘুরছে। আর তাবিব? সে এক হাত দূরে দাড়িয়ে মেয়ের দিক নির্দেশনা মেনে চলে এগোচ্ছে। নেভু ব্লু রঙের শার্ট ও কালো প্যান্ট পরনে। রিমলেস চশমার আড়ালে তীক্ষ্ণ জ্বলজ্বলে চোখ। শু পরিহিত পায়ে সে দৃপ্ত গতিতে হাঁটছে। দেখতে সত্যিই নজরকাড়া! তবে তাবিবকে যার একবার হলেও নজর চুরি করে দেখার কথা ছিল, সে ভুলেও চোখ তুলে তাকায় নি। এক বারও না। দু’দিন আগেও যার জীবনের একটি সত্য সম্পর্কে জেনে তাবিবের রুচি উঠে গিয়েছিল, আজ সেই মানুষটার উপরই ঘুরেফিরে তার ভাবনারা এসে থামছে! আশ্চর্য! ও আড়চোখে তাকায়। মেয়েটা কেমন মাথা নিচু করে হাটছে। দেখে মনে হচ্ছে তানহার কদম যে দিকে এগোচ্ছে, সেটা অনুসরণ করেই সে পা আগে বাড়াচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে আসে। এমন অদ্ভুত আচরণ করার কি অর্থ?
– বাবা! এ দোকানে যাবো।
– আচ্ছা।
বড়সড় একটি দোকান। তাবিবদের দেখেই কর্মচারীগণ ব্যস্ত হয়ে পরেছেন। চেয়ার এগিয়ে দিচ্ছেন, অত্যাধিক আগ্রহ প্রকাশ করে নিজেদের পণ্যগুলো প্রদর্শন করছেন।
তাবিব ওদের দুজনকে দেখিয়ে বলে,
– যেটা ভালে লাগে সেটাই দেখাবেন।
সেলসম্যান বিস্তর হেসে বলেন,
– আচ্ছা স্যার।
তানহা বিস্ময় নিয়ে সব দেখছে। ছোট মানুষ সে যা দেখে তাই ভালো লাগে ওর। ও বলে উঠে,
– ম্যাম কোনটা ভালো লাগছে আপনার?
তানহার তখনও আঁকড়ে ধরে নিবৃতা। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
– তোমার যা ভালো লাগে!
– তাই বলে, আপনি কিছু পছন্দ করবেন না?
– আমি এগুলো বুঝি না ঝিলমিল।
– আমারটা ভালো না লাগলে?
– তোমার সব কিছুই আমার ভালো লাগে এবং লাগবে।
তানহার কি আর কিছু শোনার প্রয়োজন পরে? ও নেমে পরে কাজে। একের পর এক কাপড় ও শাড়ি নামাতেই থাকে। সম্মতির আশায় যেটাই নিবৃতাকে দেখায়, নিবৃতা নির্দ্বিধায় মাথা কাত করে সায় জানায়। এতক্ষণ চুপটি করে মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকলেও নীরবে সবটাই লক্ষ্য করে গিয়েছে তাবিব। ও বুঝলো এভাবে রাত পোহাবে। তার মেয়েটা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না আর তার হবু মা? সেও এক নির্বোধ! নয়তো তাবিবের কোন পরোয়াই সে করে না। তাই বিয়েতে সে কি পরলো, কিভাবে সাজলো, এ নিয়ে তার কিঞ্চিৎ পরিমাণও মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু তাবিব তো বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, তার দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে। ও এড়িয়ে যেতে পারবে না। তাই এক তেঁতো শ্বাস ছেড়ে উঠে এলো। দোকানী তখনই একটি মেরুন রঙের লাল কাতান বের করছিলো। তাবিবের চোখে সেটাই বিধলো। আঙুল তাক করে বললো,
– এটাই!
বাবা সাহায্য করতে এসেছে দেখে তানহা খুশি হলো। শাড়িটা দেখে তার নিজেরও পছন্দ হয়েছে। এরপর আর কি? বোধশক্তিহীন নিবৃতা, দায়িত্ব পরায়ণ তাবিব ও ঝিলমিলে তানহা মিলে বিয়ের প্রায় সব কেনাকাটাই ঘুরেফিরে শেষ করলো। তাবিব সব পছন্দ করেছে, তানহা সবটাতে সায় জানিয়েছে আর নিবৃতা? ও কেবল নামমাত্রই উপস্থিত ছিল। অবশেষে ওরা গিয়ে ঢুকলো গয়নার দোকানে। এ সমাজে, নববধূকে স্বর্ণ দেওয়া কেমন বাধ্যতা মূলকই। সেটা পূরণ করতেই এখন এখানে। প্রথমে ওরা আংটি দেখছিলো। তাবিবের পছন্দ করা একটি আংটি এগিয়ে দিলো নিবৃতার দিকে।
– সাইজটা একটু দেখুন।
তাবিব অন্যপাশে চলে যেতেই জড়তা কাটিয়ে ডান হাতটা উঁচু করে কাঁচের টেবিলের উপর রাখলো নিবৃতা। আংটিটা ঠিকমতোই আঙুলে সেটে গেলো। সোনার মাঝে কয়েকটি হিরের পাথরও রয়েছে। এরকম ধরনের আংটি খুব কমই দেখা যায়।
এদিকে তাবিব বালা পছন্দ করছিলো। ছোটবেলায় মাকে সবসময় দেখতো হাতে বালা পরে থাকতে। প্রথম বিয়ের সময় সামর্থ্য ছিল না। এবার যেহেতু আছে তাহলে মায়ের পছন্দও কিছুটা অনুসরণ করা যাক। ও নিশ্চিত, আজ মা থাকলে নিবৃতাকে নিজের হাতেরটাই বোধহয় খুলে পরিয়ে দিতেন। এক জোড়া পছন্দ হতেই ও সেলসম্যানকে বলে,
– উনার জন্য ঠিক সাইজটা বের করুন।
তখনই হঠাৎ করে মোবাইলে মেসেজের শব্দ হলো। সেটার উত্তর দেওয়ায় ও ব্যস্ত হয়ে পরলো তাবিব। সেটা দেখে সেলসম্যান নিজেই বালা জোড়া নিয়ে চললো নিবৃতার দিকে। নিবৃতা তখন কোন খেয়ালে যেন ডুবে ছিল। মস্তিষ্ক তখন এলোমেলো। তখন হঠাৎ করেই হাতে স্পর্শ পেতেই ও চমকে গিয়ে আতংক নিয়ে চাইলো৷ সম্মুখে একটি অচেনা লোক দাঁড়ানো। ওর হাতটা কেমন শক্ত করে ধরে আছে। দ্বিতীয় কোন ভাবনা এলো না মাথায়। তৎক্ষনাৎ নিবৃতা প্রবল বেগে হাতটা ছাড়িয়ে কয়েক পা পিছু সরে গেলো। আচমকা এরকমটা হওয়াতে উপস্থিত সকলেই অবাক হয়ে তাকালো এদিকে। সেলসম্যান লোকটা এরূপ আচরণে হতবিহ্বল হয়ে চাইলো। কি হলো? সে তো তার কাজটাই করছিলো। তানহা দ্রুত গিয়ে নিবৃতাকে ধরলো। তাবিব এখানে আসার পথেই ছিল। সমস্তটা ওর চোখে পরেছে। লোকটার হাত ধরা ওর নিজেরও পছন্দ হয় নি। উচিত হয় নি তার। নিবৃতাকে দেখে বোঝা উচিত ছিল, সে একজন রক্ষণশীল মানুষ। কিন্তু নিবৃতা? এতোটা জোড়ালো প্রতিক্রিয়া? ও মনোযোগ দিয়ে দেখলো মেয়েটাকে। কেমন মাথা নিচু করে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে৷ রোগাটে শরীরটা থেকে থেকে কাপছে।
– সরি ম্যাডাম। কিছু মনে করবেন না। আমি আমার কাজই করছিলাম।
লোকটা বারংবার দুঃখিত বললেও নিবৃতা নিরুত্তর রইলো। তাবিব পরিস্থিতি সামলাতে এসে বললো,
– আমার জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল আপনার।
– সরি স্যার।
তাবিব মাথা ঘুরিয়ে তানহার দিকে তাকিয়ে বললো,
– তোমরা গাড়িয়ে গিয়ে বসো। বাবা আসছি।
– আচ্ছা।
নিবৃতাকে ধরে নিয়ে তানহা বেরিয়ে গেলো। আর সেদিকেই নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো তাবিব। মেয়েটা কেমন যেন!
বাকি গয়নাটুকু ও কিছু খাবার কিনেই চলে এসেছিল তাবিব। এখন তারা নিবৃতাদের বাসার নিচে। সবাই গাড়ি থেকে নেমে আসতেই তাবিব ব্যাগগুলো বের করে। সেগুলো নিবৃতার দিকে এগিয়ে দেওয়ার আগেই তানহা বাবার কাছে ফিসফিস করে বলে,
– তুমি ব্যাগগুলো উপরে দিয়ে আসো বাবা। ম্যামের ভারি জিনিস তুললে পীঠে ব্যাথা হয়।
এতটুকুন মেয়ে তার এখন অন্যের সুবিধা অসুবিধাও বোঝে? তাবিবের গর্ব হলো। ও স্মিত হেসে মাথা নাড়ায়। তানহা গিয়ে বিদায় জানাতেই নিবৃতা বলে,
– উপরে আসো।
ও হাসতে হাসতে বলে,
– কাল এসে একেবারে আমার কাছে নিয়ে যাবো।
উত্তরে নিবৃতা চুপ করে রয়।
– গাড়িতে চুপটি করে বসে থাকো। বাবা আসছি।
ফ্ল্যাট পর্যন্ত আসার রাস্তা অসহ্য নীরবতায় ডুবন্ত ছিলো। শিউলি বাসার দরজা খুলতেই নিবৃতা আর কোনকিছুরই তোয়াক্কা না করে এক ছুটে ঘরে চলে যায়। এখন ভদ্রতা দেখানোর অবস্থায় সে নেই। কোনমতে কক্ষের দরজা লাগিয়েই ও টেনেটুনে বোরকা খুললো। বক্ষ কেমন সবেগে উঠানামা করছে। শব্দ করে এক একটা শ্বাস পরছে। কম্পিত ডান হাতটা ও তুললো সম্মুখে। কিয়ৎক্ষণ এক দৃষ্টিতে শূন্য অনুভূতিতে চেয়ে থেকে চপল পায়ে ওয়াশরুমে গেলো। হাতে সাবান মেখে বেসিন থেকে স্ক্রাবার নিয়ে বিরতিহীন ঘষে গেলো জায়গাটি৷ যেন কোন লেগে যাওয়া অতীব নোংরা কিছু সে পরিষ্কার করছে। চোখমুখের অবস্থা উন্মাদ, উদভ্রান্তের ন্যায়!
নিবৃতা পর্ব ১
অতঃপর যখন চামড়া উঠে র/ক্ত বেরোলো তখন গিয়ে থামলো ও। থরথর করে উঠা হাতে এলোমেলো চুলগুলো বাধলো। ঘর্মাক্ত, লাল হয়ে আসা মুখে বড় বড় কয়েকটা পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এলো। পায়ে যেন বল নেই এক বিন্দু পরিমাণ। শরীর কেমন অসার হয়ে আসছে। কোনমতে বিছানার কাছে পৌঁছেই তার কিনার ঘেঁষে বসে পরলো মেঝেতে। দু হাঁটু জড়ো করে মুখ গুঁজে দিলো সেথায়। একসময় বিড়বিড় করে এলোমেলোভাবে এক চিত্তে বলতে থাকলো,
– ঘৃণা করি আমি। ঘৃণা করি। অসহ্য অসহ্য। নোংরা!
