নীতিহীন রাজ পর্ব ১৭
আশিকা আক্তার সোহাগী
“No one dies Virgin. Life f*uck us all””
জিয়ানা রাফিনের বিয়ের স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজি এই প্রবাদটা এই মুহূর্তে চরম সত্য মনে হলো।কমপ্লিট সেট পড়াতে রাফিনকে আজ চমৎকার সুদর্শন লাগছে। আজ প্রথম জিয়ানার কাছে রাফিনের হেয়ার কাট ঠিকঠাক লাগলো। কি দরকার ছিলো চারমাসের এই প্রহসনের। জিয়ানা ওইসব মেয়েদের দলে না ,যারা কেঁদেকেদে প্রেম ভিক্ষা চাইবে। কেউ তারদিক থেকে এক পা দূরে গেলে সে লা*ত্থি দিয়ে দুই পা আরও বেশি দূরে পাঠিয়ে দিবে।
লাল টুকটুকে বেনারসি পড়া একটা চমৎকার বউ স্টেজে উঠেলো। রাফিন একপলক সেদিকে তাকিয়ে আবার সামনে ঘুরে গেছে।জিয়ানার মনটা হঠাৎ বিষিয়ে যাচ্ছে যেনো।এমন অদ্ভুত অনুভূতির সাথে তার পরিচয় নেই।গলার কাছটাতে কেমন তীব্র হাসফাস লাগছে। রাফিনের দিক থেকে নজর হাটালো। এইসব ফালতু অনুভূতি জিয়ানা থুরাই কেয়ার করে। লাইফ জিংজ্ঞা লালা। খাও দাও ফুর্তি করো ,দুনিয়াটা মস্ত বড়। এইখানে একমাত্র নিজেকে আর সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসা যায়।
নাহ আজ শান্তনা কাজে দিচ্ছে না। কষ্টটা বড্ড বেড়ে চলেছে। টিন এইজের নিব্বিদের মতো তারও রাফিনের কলার ধরে বলতে ইচ্ছা হচ্ছে
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-কিউ কিয়া? কিসলিয়ে কিয়া। আব মেরা কেয়া হোগা কালিয়া?
কালিয়া? ফিক করে হেঁসে দিলো জিয়ানা।বিরহ থেকে সোজা গাব্বার সিংয়ে চলে গেছে। নাহ তার ধারা শোকটাও ঠিকঠাক পালন করা সম্ভব না। ধ্যান ভাঙ্গলো রাব্বির ডাকে।
-ওস্তাদ।জীবনে এমন বিয়ার দাওয়াতে কোনদিন আসা তো দূরের থাক চোক্ষেও দেখি নাই।
জিয়ানা ফিরে রাব্বিকে দেখলো। একটা ঢুলঢুলে পাঞ্জাবি পড়ে এসেছে। মাথা ভর্তি তেল দিয়ে বাকা সিঁথি করে কম্ব করা।
-এটা কি তোর বাপের পাঞ্জাবি?
জিয়ানার প্রশ্নে রাব্বি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালো। জিয়ানা রাব্বির হাতটা নিজের দিকে নিয়ে পাঞ্জাবি পোর্ট করতে করতে জিজ্ঞেস করে ,
-আম্মু যে তোকে একটা শার্ট আর প্যান্ট কিনে দিয়েছে ওইটা পড়ে আসতি।
-ওইডা চুরি হয়ে গেছে ওস্তাদ। ঘরের তালা নাই তাই কিচ্ছু থাকে না।
-তালা নাই কেন?আগেরটা কই?
-তালাও চুরি হয়ে গেছে। মাইরি আমারই কপাল।
জিয়ানা আর রাব্বি একসাথে খিলখিলিয়ে হাঁসা শুরু করলো। তাদের হাঁসার শব্দে অনেকেই দেখছে ভ্রু কুঁচকে। হইতো ভাবছে চারপাশে ঝকমকে পোশাকের মানুষের ভিড়ে এই দুইটা ল্যাংটি ইঁদুর কোত্থেকে এলো।আজও জিয়ানা তার পরিচিত রুপেই এসেছে।কালো ওভার সাইজ হুডি আর কালো হাইটপ ডেনিম প্যান্ট। সান ক্যাপ আর মাস্ক।
সাইড দিয়ে তখন মামুন ইসলাম আর তার সেক্রেটারি যাচ্ছিলো জিয়ানা হাক ছেড়ে ডাক দিলো ,
-আরেহ চেয়ারম্যান সাব। আসসাল্লামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতু। কেমন আছেন?
মামুন ইসলাম দাঁড়িয়ে স্বভাবতই চমৎকার হাঁসি দিয়ে সালামের উত্তর নিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-অনেকদিন পর দেখা। তা মেয়ে তোমাকে না আড্ডার দাওয়াত দিয়েছিলাম। এলে না যে? তোমার পরিবারের বাকিরা কোথায়?সহ পরিবার তো দাওয়াত করেছিলাম।
-আসেনি। সবাই ব্যাস্ত আমি ছাড়া। আর আড্ড দিতে আসিনি কারণ…
শেষ করার আগেই সংসদ সদস্য রেজাউল সরকার এসে উপস্থিত হলো সেখানে। মামুন ইসলাম অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলো। তারপর জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
-অন্য একসময় কথা হবে হ্যাঁ। এসো একদিন।
পাশ কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছিলো কিন্তু জিয়ানার কথায় সবাই থেমে গেলো স্বস্থানেই।
-আপনার সাথে আমার আড্ডা জমবে না কারণ আপনারা বুর্জোয়া পলিটিক্সে বিশ্বাস করেন। আর নির্বাচন ছাড়া জনগনকে এড়িয়ে চলেন।
মামুন ইসলামের কথাটা একদম পছন্দ হলো না। ঘুরে জিয়ানার সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো ,
-আমরা জনগনকে দলবদ্ধ করি। সবাই জোট হয়ে আমাদের কাছে এলে আমরা তাদেরকে শুনি। এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য করি। ব্যক্তিবিশেষ আলাদা প্রায়োরিটি দেয়া সম্ভব না তারমানে এই না যে আমরা অসমতা করি। আমাদের দলের কর্মীদেরকেও আমরা ছাড় দেই না।
-সাহায্য করবেন কেনো? এটা আপনাদের ডিউটি। জনসেভায় নেমে সাহায্য বিলানোর নামে মাথা কিনে নেয়ার রাজনীতি এইদেশে যতদিন থাকবে ,আমি অনন্ত ততদিন কোন পলিটিশিয়ানকে এপ্রিশিয়েট করবো না। আর আপনাদের দলের কারো নামের মামলা হলে প্রশাসন নামকা ওয়াস্তে নিজেদের খোমা দেখিয়ে যায়। সেটাও তো একপ্রকার প্রহসন স্যার?
রেজাউল সরকার এগিয়ে এসে জিয়ানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-নাইস টু মিট ইউ ইয়াং লেডি। হো আর ইউ? এমন ধারালো জিহবার কেউ আমার এলাকায় আছে অথচ আমি জানি না?আশ্চর্যের কথা না মামুন?
কোত্থেকে নিবিড় হন্তদন্ত করে এগিয়ে এসে রেজাউল সরকার আর জিয়ানার মাঝখানে এসে উত্তর দেয় ,
-শী ইজ আ ক্রেজি গার্ল।তার কথায় কান দেয়ার দরকার নেই। আপনি আমার সাথে আসুন।
একপ্রকার জোর করেই সবাইকে স্টেজের দিকে নিয়ে গেলো। জিয়ানা চোখ ছোট ছোট করে সেদিকে তাকিয়ে ভাবে,ভণ্ড নেতাটা হঠাৎ তার পেছনে পড়লো কেন। আজ আবার কাবলি পড়েছে।সেটাও ব্রাউন। এই লোক পাক প্রেমি নাকি? পাঞ্জাবি রেখে কাবলিতে দখলদারি?
রাব্বি আক্কাস দুইজনই জিয়ানার পেছন পেছন গার্ডের মতো চক্কর কাটছে। তারা আছে ভয়ে। কখন না কেউ এসে বের করে দেয় টোকাই বলে। রাব্বির হিস্যু চেপেছে তবুও দাঁতে দাঁতে কামর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
-ওস্তাদ! খামু কখন? খেয়ে দেয়ে ঝটপট ফুটে যেতাম। এত বড়লোকের মাঝে নিজেরে আজ সত্যি ছোটলোক লাগতাছে আমার।
আক্কাস আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো।
-পোশাক কোন ব্যাপারই না রে বাচ্চা।মারা গেলে সবাইকে একই পোশাক দেয়া হয় আর জন্মের সময়ও ল্যাংটু হয়ে একই অবস্থায় এন্টি হয়। অহেতুক মিথ্যা একটা পর্দা মানুষের মতো শ্রেষ্ট প্রাণীর পরিচয় বহণ করতে পারে না।মাথা উঁচু ,সিনা টান করে সত্যের সাথে বেঁচে থাকায় বড়লোকি।
ওরা এত ভারি কথা যে বুঝেনি জিয়ানাও বুঝতে পারলো। মাঝেমধ্যে তার মাঝে যে জিয়াউলের আত্মা ভর করে আজ তা হাতেনাতে প্রমাণ পেলো। ব্যাকপ্যাকটা আবার নড়াচড়া করছে। তাই রাব্বি আর আক্কাসকে সেই স্থানেই দাড় করিয়া সে এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে।
-আসসালামু আলাইকুম স্যার। এবং অভিনন্দন।
বলে ব্যাকপ্যাক ঘুরিয়ে অর্ধ খোলা ব্যাগ আনজিপ করে দুইহাত দিয়ে ধরে একটা ছোট পার্সিয়ান ক্যাট বের করলো। কিছুক্ষণ আদর করলো তারপর সেটাকে রাফিনের স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে বলে ,
-আমার পক্ষ হতে স্যাসিকে আপনাদের দুইজনের জন্য গিফট। ইজ ইট টু মাচ এডোর্যাবেল?
রাফিন এতক্ষণ প্রায় অবাক নেত্রেই তাকিয়ে ছিলো জিয়ানার দিকে। সালামের উত্তর পর্যন্ত দেয়নি।তার ধ্যান ছুটে পাশে তার স্ত্রী রুপে মেয়েটার চিৎকারে। জিয়ানা স্যাসিকে আবার নিয়ে কোলে নিয়ে আদর করছে।
সাফা মানে রাফিনের স্ত্রী বিড়াল দেখে ভয় পেয়ে স্টেজ থেকে নেমে গেছে। এটা দেখে জিয়ানা হেঁসে কুটোকুটি হয়ে বলে,
-স্যার জিতেছেন। ভাবি এত আদুরে বিড়াল দেখে যেহেতু ভয় পাচ্ছে তাহলে নিশ্চিত তেলাপোকা দেখেও ভয় পাবে।আর ভয় পেয়ে আপনার কাছে ছুটে আসবে। তারপর চরম রোমান্টিক একটা সিন ক্রিয়েট হবে।আবার বজ্রপাত হলেও ভয় পেয়ে যাবে। উফ আপানাদের সংসার জীবন একদম মাখোমাখো একটা ব্যাপার থাকবে। যাই হোক ভাবি মাশাল্লাহ সুন্দর আছে। জিতছেন। বয়সও কম। তাই না স্যাসি?
বলে চোখ টিপ দিলো একটা। রাফিন নিষ্পল চেয়ে জিয়ানার দিকে। মাস্ক খোলে রেখেছে বিধায় মুখের মুচকি হাঁসি দৃশ্যমান ।
রাফিন খুবই দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে আস্তে করে মুখ খুললো,
-আ’ম সরি জিয়ু। আমি পরিস্থিতির শিকার।তোমার সাথে কথা আছে কিছু। আমি জানি তুমি বুঝতে পারবে সব শুনলে।
-আরেহ স্যার। চিল। ভালো করেছেন। এত দ্বিধাদ্বন্দে না থেকে আগানো ভালো।আমাদের মাঝে তেমন কিছু ছিলো না।যেটা ছিলো কমপ্লিট সিচুয়েশনশিপ।আপনি বিয়ে করেছেন দেখুন আমি দিব্বি আছি। দেয়ার ওয়াজ নো লাভ। ভাবি উপরে আসুন। এটা একটা বেবি।ভয়ের কিচ্ছু নাই।
একটু থেমে আবার বলে উঠলো ,
-সংসার আর সামাজিকতা আপার লেভেলের জিনিস ওইসব আমার পোষাবে না স্যার। সুখে শান্তিতে সংসার করতে ঘরকুনো লক্ষ্মীমন্ত বঙ্গললনা হতে হয়। আমি ওইসবের ধারে কাছেও নেই।আপনারা সুখী হবেন।শুভকামনা। এটা ধরুন। মাসখানেক থেকে পালছিলাম। সামনে আপনার বার্থডে সেই হিসেবে এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে এনেছি।ওর নাম স্যাসি। খুব ওবিডেয়েন্ট বাচ্চা।
এখানেও কোত্থেকে নিবিড় এসে বাগড়া দিলো। জিয়ানার হাত থেকে স্যাসিকে কেড়ে নিয়ে নিজের কোলে নিয়ে আদর করে বলে উঠলো ,
-এটা আমার বিড়ালের সন্তান। ওর মা আমার মার্কের সাথে প্রেম করেছে তারপর ডিচ করে চলে গেছে। এই যে মাথার পেছনে ব্রাউন মার্ক এটাই এর প্রমাণ। সো যার জিনিস তার কাছে থাকবে।
বলে স্যাসিকে নিয়ে চলে গেলো। আর জিয়ানা ব্রু কুচকে আগামাথা কিছুই না বুঝে নিবিড়ের পেছন পেছন গেলো।
রাফিন এতক্ষণ থেকে খেয়াল করলো জিয়ানা একবারও তার দিকে তাকালো না।রাফিনের জন্মদিনের কথাও মাথায় ছিলো। বুকের বা পাশটাই চিনচিনে যে ব্যাথা ,সেটা থামাবে কি?কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আর কি কোন পথ ছিলো না?নাকি সে নিজে সত্যিই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো।
জিয়ানা নেমে গেলে সাফা এসে জিজ্ঞেস করলো ,
-আপনার এক্স?
রাফিন উত্তর দিলো না। এক্স হবে কেনো। সেতো পাষ্ট ,প্রেজেন্ট এন্ড…. আর ভাবতে পারলো না কিছু। ভবিষ্যৎ নেই কোন। মনের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড় চলছে তার।
রাব্বি আর আক্কাস দেদারসে গিলছে শুধু। খাবার বুফে সিস্টেম। সেল্ফ সার্ভিস। যার যা ইচ্ছা খাবার প্লেটে নিয়ে বসার জায়গায় বসে খাচ্ছে। বেশিরভাগ ফ্যাশইন্না খাওয়া খাচ্ছে। অল্প একটু খাবার প্লেটে নিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে আর কালেভদ্রে একবার চামচের টুংটাং আওয়াজ করে মুখে তুলছে।জিয়ানাও খেয়ে চলেছে একমনে।কিন্তু খুবই আফসোস হচ্ছে আহারে ফ্যাশনের চক্করে এরা এত ভালো খাবার গুলা উপভোগই করতে পারছে না।
-ওস্তাদ। জীবনে এত ভালো খাবার কখনো খাই না।আফনারে থাংকু।
-ম্যানশন নট বাচ্চারা। এরপর এই বাড়ির যত বিয়ে সব দাওয়াতে তোরা পার্মানেন্ট গেষ্ট।
-কেমনে?
-ওমনেই। এরা এত খাবার খেতে পারে না।দেখ সবাই কি রকম নাখরাবাজি করে খাচ্ছে। আসলে এখানে একমাত্র আমরাই খেতে এসেছি। বাকিরা দেখাতে এসেছে।কে কত সুন্দর ড্রেসাপ করেছে।তাড়াতাড়ি এগুলা খেয়ে শেষ কর। ডেজার্ট আছে।
-ওইটা আবার কি? রাব্বি জিজ্ঞেস করলো
-মিষ্টি জাতীয় খাবার। ওই পরশনে সব ডেজার্ট।
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।
বাড়ির সামনে অহেতুক এতটুকু জায়গা এরা এমনি এমনি খালি রাখে না।এইসব প্রোগ্রাম করার জন্য এমন ফাঁকা জায়গায় উপযুক্ত।
-ওস্তাদ। পুলের ওইপাশে গান বাজনা হইতাছে। খাইয়া ওইখানে একটু যামুনি?
-ওক্কে।
জিয়ানারা খেয়ে একদম হাউজফুল।আক্কাসের খাওয়া দেখে জিয়ানা অবাক। প্রায় এক কেজির মতো মাটন খেয়েছে। কোন রাইস নেয়নি সে।বাধ্য হয়ে জিয়ানা প্লেট সরিয়ে নিয়ে বলেছে,
-আর খাস না ভাই। মরে যাবি।
-ওস্তাদ। মনে হইতাছে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করে সব বের করে ,আবার নতুন করে নিয়ে খাই।
জিয়ানার চোখ হালকা ভিজে উঠলো। মানুষের জীবনট কত রকমের অদ্ভুত হয়।এখানে হাজার হাজার মানুষ দাওয়াতে এসেছে। কারোরই খাওয়ার প্রতি কোন বিশেষ নজর নেই। অথচ এই বাচ্চা ছেলেটির কাছে এ যেনো জ্যাকপট। পেটের ক্ষুধা মিটলেও মন আর চোখের ক্ষুধা মিটছে না তার। জিয়ানা আক্কাসের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-আমার হাতে যখন টাকা হবে তোদের তখনই বুফে নিয়ে খাওয়াবো।যত ইচ্ছা তত খেতে পারবি।আর শোন সবুর করা শিখবি। আজ যা পেলি সেটাই আলহামদুলিল্লাহ মনে করে শুকরিয়া আদায় করবি।কাল না পেলেও শুকরিয়া। আর কখনো ওই বড়লোকদের দেখে নিজেদের ছোট মনে করবি না। জানিস আফ্রিকায় মানুষ দিনের পর দিন পানি পর্যন্ত পায় না।তোরা সে হিসেবে ভালো আছিস।চল গান শুনে আসি।
জিয়ানা তার দুই বডিগার্ডকে নিয়ে সামনে হাটা ধরে আর পেছনে দাঁড়িয়ে নিবিড় তাদের সেদিকে যাওয়া দেখলো।এই মেয়ের বাহিরটা শক্ত হলেও ভেতর খুবই ফ্লাপি।একদম তার ফু-আম্মুর মতো। কিন্তু ডিএন এ রিপোর্ট যে আনম্যাচ আসলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললো নিবিড়।
ডিজে পার্টির জায়গায় এসে জিয়ানা হা হয়ে গেছে। পুরো সুইমিংপুল এত চমৎকার লাইটিং করা হয়েছে। সাথে মন্দিরাছাও গাছ গুলো বিভিন্ন ধরনের সেইপের সাথে অদ্ভুত আলোকসজ্জায় সাজানো।মাথার উপরেও লন্ঠন টাইপ কিছু ঝুলছে।আহা কত টাকা এদের। যা ইচ্ছা করতে পারে।অথচ গ্রামে একটা বিয়েতে গিয়ে জিয়ানা দেখেছিলো ,বিশজন মানুষ বরযাত্রী বেশি আসায় খাওয়াতে পারেনি বলে বিয়েটা ভেঙে গেছে।এত ভেদাভেদ কেনো এই সমাজে? কেনো এত উঁচুনিচু।জিয়ানারা মধ্যবিত্ত পরিবারে বিলংক্স করে। প্রতিদিন না হোক সপ্তাহে দুইদিন তাদের ঘরে মাংস হয়। মাছ থাকে। দুধ ডিম রেগুলার। জীবনের যেকোন এক বা দুইটা অনুষ্ঠান মোটামুটি ভাবে আয়োজন করতে পারে। কিন্তু যারা জন্মগত গরীব।তাদেরকে তো গরিবী ভাগ্য পালটাতেও বছর বিশেক সময় লাগেই।তাহলে এই লম্বা সময়টা মানুষ গুলো শুধু মাত্র জন্মগত গরীব বলেই এত দূর্দশা ভোগ করে।নাহ জিয়ানার কাছে খুবই বেইনসাফি লাগছে ব্যাপারটা।
বেখালে হাটার জন্য কারো সাথে বেশ জোরেশোরেই ধাক্কা খেলো।খাবারের পর পর আবার মাস্ক ,ক্যাপ পড়ে নিয়েছে।ধাক্কা খেয়ে জিয়ানার কিছু হয়নি কিন্তু অপজিটের নারীটি ছিটকে পড়ে গেছে নিচে।পড়েই চিৎকার করে কান্না শুরু করলো। জিয়ানা এবার সত্যি ঘাবড়ে যায়।।তাই এগিয়ে গিয়ে সরি বলে হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মেয়েটা জিয়ানার হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে চেচামেচি করেই যাচ্ছে।
গান আর মিউজিক সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেলো মেয়েটির চিৎকারে।অনেকেই জড়ো হয়ে গেছে সেখানে।আরেকজন মহিলা এসেই জিয়ানাকে ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করে ,
-হো আর ইউ? কোন সাইডের গেস্ট? নাকি চোর টোর কেউ? এমন অদ্ভুত গেটাপে ঢুকে চুরি করতে এসেছো? ছোটলোক কোথাকার। দিলে তো ওর ড্রেসটা নষ্ট করে।
বলে অপেক্ষা না করে টান দিয়ে জিয়ানার ক্যাপ খুলে পানিতে ঢিল মারলো।
জিয়ানা শাান্ত চোখে নারীটাকে দেখে চলেছে।বউয়ের চেয়ে উক্ত ব্যাক্তিটি বেশি সাজ সজ্জা করেছে।উনার ওজন যদি হয় ৬০কেজি তা এক মুহুর্ত মেকাপের জন্য হয়েছে ৬৫কেজি। আর গলার স্বরটাও ফ্যাসফ্যাসে হাঁসের গলার মতো।জিয়ানাকে চুপ থাকতে দেখে এগিয়ে এসে মাস্কে হাত বাড়িয়েছে যখনই জিয়ানা নিজেই তখন দুই পা পিছিয়ে গেলো।
-কি চেহারা দেখাতে লজ্জা লাগছে? আরেহ সবাই চেইক করুন তো কিছু হারায়ি গেছে কিনা। এইসব পাবলিক কিভাবে ঢুকে পড়ে? এই স্টাফবয় গার্ড সব কোথায়? এদিকে আসো তো কুইক।
ফ্যাসফ্যাসে গলায় উঁচু আওয়াজে বলায় জিয়ানার রাগের পরিবর্তে প্রচুর হাঁসি পেলো।একটানে মাস্ক খুলে পকেটে ঢুকিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো ,
-এই যে ফুলবানু?লবনপানি দিয়ে গড়গড় করবেন তিনবেলা।তাহলে অর্ধেক কথা আর বাতাসে মিলিয়ে যাবে না।আর নিজে তো ফুলের বাগান হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাথে ৫কেজির মেকাপ। সার্কাসের ক্রাউন ভেবে গার্ডরা এলাও করেছে কি? আমি চেয়ারম্যানের দাওয়াতের রেফারেন্সে এসেছি।তা আপনাদের প্রোগ্রামে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানোর পর বুঝি এভাবে অপমান করা হয়?
এইবার হাঁস মহিলা একটু দমে গেলেন যেনো। তবুও ভিড় জমে গেছে এখানে উনি ছোট হতে চাইলেন না।হাত উঁচিয়ে চর মারবে সেখানে হাজির হলো আভিজাত্যে মোড়ানো এক পৌঢ় নারী। অফ হোয়াইট জামদানী বৃদ্ধ কুচকানো ফর্সা শরীরে সুবিন্যস্ত ভাবে জড়ানো। সাদা ঝলমলে মুক্তার মালা যেনো উনার ব্যাক্তিত্বকে আরও মেলে ধরেছে।সোনালী ফ্রেমের চশমার ফাঁকে একবার জিয়ানাকে দেখে বলে উঠলো ,
-ফারহানা সব জায়গায় তোমার ছোটলোকি আচরণ না করলে হয় না? নাহ?
-দাদুন এই মেয়ে ফাইজাকে ধাক্কা দিয়েছে আবার আমাকে অপমান করেছে।
বৃদ্ধা একপলক ফাইজাকে দেখে আবার বলে উঠলো ,
-দেড় ফুটের মেয়ে হয়ে দুইফুটের হিল তোমার বোনকে পড়তে নিষেধ করো। তাহলে আর যেখানে সেখানে পড়বে না। আর তুমি মেয়ে এমন অদ্ভুত পোশাকে কে দাওয়াতে আসে? কার মেয়ে তুমি?
জিয়ানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন পৌঢ়া মহিলা।
-আমি এইসবেই কমফোর্টেবল হার মেজিষ্ট্রি।
জিয়ানা একহাত সামনে আরেক হাত পেছনে নিয়ে রাজকীয় সম্ভাষণ দেয়ার মত হাটু বাকিয়ে বলে উঠায়। বৃদ্ধা অট্টহাসি দিয়ে জিয়ানাকে কাছে ডাকলেন।তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো ,
-বললে নাতো কার মেয়ে?
জিয়ানা কাছে এসে দাঁড়ানোর সাথে সাথে সাইড হাগ করলেন।
-আমি নীলুফা ইয়াসমিন চাচির ভাশুর জিয়াউল হকের কন্যা।
বৃদ্ধা এবার ফট করে ছেড়ে দিলেন জিয়ানাকে। তারপর উল্টো ঘুরে যেদিক দিয়ে এসেছেন সেদিকে হাটা ধরলো।
জিয়ানা এসব বড়লোকদের আগামাথা কিচ্ছু বুঝে না। এদের মনে হয় মুডসুইয়ং পৈত্রিক সম্পত্তি। যে যেরকম পাচ্ছে ব্যবহার করে ছেড়ে দিচ্ছে।
ফাইজা কুনুই দিয়ে গুতো দিয়ে ফারহানাকে ইশারা করে বলে,
-আপা এই মেয়েটার সাথেই নিবিড়ের হাত ধরা ছবি আমি সোসালসাইডে দেখেছে।আজ আবার দাওয়াতেও এসেছে।নিবিড় মনে হয় এইবার সিরিয়াস হয়ে গেছে। আমার কি হবে? আমার দিকে তো তাকায়ও না। একবার কথা বলতে গিয়েছি ধমক দিয়ে শাসানি দিয়েছে উল্টো।
ফাইজার ঘ্যানঘ্যানাতি ফারহানার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো।এতগুলো মানুষের সামনে বুড়ি তাকে ছোটলোক বললো।আজ যদি মেহেদি দেশে থাকতো তাহলে তাকে এত অবহেলা কেউ করতে পারতো না।মেজাজ খারাপ নিয়েই একটা ধমক দিয়ে বলে,
-নিজের কাজ নিজে কর যা। আমার মাথা খাবি না।খুব শখ তার এই বাড়ির বউ হওয়ার। কি যোগ্যতা আছে তোর? নিবিড় মেয়ে মানুষ সহ্য করতে পারে না কিন্তু বিছানায় নিতে পারে। যা একদিনের জন্য তোর শখ মিটিয়ে আয়।
তারপর হনহন করে সেখান থেকে চলে গেলো ফারহানা।এত খারাপ কথা শুনে ফাইজার এইবার সত্যি কান্না পেলো। সাথে হিংসাও হচ্ছে দূরে জিয়ানাকে দেখে।স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিবিড়ের পার্টির ছেলেদের সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। পাশে নিবিড় দাঁড়িয়ে।
-জিয়ানা কিন্তু হেব্বি সুন্দর গান গায়। ওর গান গুলো জীবন থেকে নেয়া।
মক্কু ওয়ারলেস স্পিকারটা হাতে নিয়ে টেস্ট করে বলে।
-এইবার আমাদের জীবনমুখী গান শুনাবে জিয়ানা হক।
আকাশ বদী সবাই হইহই করে উঠলো।
কোন প্রকার দ্বিধা ছাড়াই স্পিকার নিয়ে জিয়ানা গান ধরলো,
“আমি খায় দায় ঘুমাই সারাদিন
আমার অলসতা বাড়ে দিন দিন
রাতে ঘুম নাই
হাতে কাম নাই
কিছু টাকা আমায় ধার দিন(২)
জিয়ানার গান শোনে সবাই হাততালি সহ হেঁসে ফেটে যাচ্ছে। তখন ফাইজা কোন কিছু না ভেবে থমথম করে হেঁটে এসে জিয়ানার দিকে তেড়ে গেলো। আর সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলো। জিয়ানা একদম অপ্রস্তুত থাকায় ডান হাত বাড়িয়ে ফাইজাকেও টেনে একসাথে ঝপাৎ করে পানি ভর্তি নীল পুলে পড়লো।
কোত্থেকে কি হলো কেউ কিছুই বুঝতে পারলো না।জিয়ানা ডুব দিয়েই চুলের উইগটা টেনে ঠিক করার চেষ্টা করলো। কিন্তু পানির তোপে নিচের ম্যাস ক্যাপটা ঢিলা হয়ে গেছে।
এদিকে ফাইজা উঠে গেছে কিন্তু তার মেকাপ মেল্ট হয়ে ভুতের মতো দেখাচ্ছা। মক্কুরা হাসাহাসি করছে তাকে নিয়ে। তাই দৌঁড়ে সেখান থেকে পালিয়েছে।
জিয়ানা এখনো উঠছে না দেখে নিবিড় নিজেও জাম্প দেয় পানিতে।চিল্লাচিল্লি আর হটকারিতায় মোটামুটি সবাই পুল সাইডে চলে এসেছে। রাফিন জিয়ানার কথা শুনে একপ্রকার দৌঁড়ে এলো।
অপরদিকে নিবিড় জিয়ানাকে হাতরে খুঁজে খুঁজে যখন একসাইডে ছায়ার দিকে পেলো ,একসেকেন্ড দেরি না করে একটান দিয়ে দাঁড়িয়ে যায় দুইজনই।জিয়ানা পানির কারণে ক্যাপ আর উইগ পড়তে পারেনি। হাতেই ছিলো। নিবিড় চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে এক ভিন্ন জিয়ানাকে। একজন টম বয় থেকে হঠাৎ একজন রমনীকে। আসল চুল কোমড় ছেড়ে ভিজে লেপ্টে আছে শরীরে।পানিতে মোহনীয় রুপে একেবারে সামনা সামনি এই রমনীকে দেখলে জীবনানন্দ দাশ কি বলতো ঠিক এই মুহুর্তে নিবিড়ের মাথায় এলো না। ফাঁকা মাথা কাজ শুরু করলো রাফিনের ডাকে।
-জিয়ু আর ইউ ওকে?
নিবিড় জিয়ানার হুডির দিকে ইশারা দিয়ে উল্টো ঘুরে গেলো। তারপর একজন ওয়েটার বয়কে টাওয়াল আনতে পাঠালো।নিবিড় নিজের শরীর দিয়ে জিয়ানাকে আড়াল করে রেখেছে।আজ মিললো তার হিসেব। পর পর দুইবার সে জিয়ানার মাথা থেকে চুল নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করিয়েছে। এইজন্যই নেগেটিভ এসেছে রেজাল্ট। কারণ এই মেয়ে পরচুলা পড়ে থাকে। কেনো এই বেশ ধরে থাকে।
-কাবলিওয়ালা। হেল্প মি প্লিজ। আব্বুর ভয়ে উইগ পড়ে থাকি। নাহলে এই বয়সেও আমাকে বেল মাথা হতে হবে।
নিবিড় ঘুরে তাকিয়ে বলে,
-টাওয়াল আনলে সেটা মুড়িয়ে ওয়াশরুমে চলে যেয়ো। সমস্যা হবে না।
জিয়ানা ম্যাশ ক্যাপ আর ইউগ প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিলো।আগের দিনের জ্বর আবার না উল্টা মারে। টাওয়াল দিয়ে শরীর পেচিয়ে জিয়ানা ওয়াশরুমে না গিয়ে ,ছুটলো তার সাইকেলের দিকে। এখান থেকে যতদ্রুত সম্ভব বের হতে হবে।
রাফিন পেছন পেছন ছুটেও ধরতে পারলো না।আর সদ্য বউ হওয়া একজন দেখলো ,তিন কবুল বলা স্বামীর চোখে মুখে অন্যের জন্য উদ্বেগ ,উৎকন্ঠা।
ভোরের আলো ফোটার কিছুটা বাকি। নূর ম্যানসনের সবাই ঘুমে যখন কাদা তখন সদর দরজা হা করে খুলে গেলো। আর ঘরে ঢুকলো টকটকে লাল বস্ত্র পরিধেয় চারজন অদ্ভুত দেখতে মানুষ। সবার হাতে একটা করে মোটা বই। একজন সামনে এগিয়ে এলো টোপলার মতো ব্যাগ থেকে পাউডার বিশেষ এক প্রকার গুড়ো বের করে কিছুক্ষন বিড়বিড় করে ছিটিয়ে দিলো বাতাসে । তারপর বাড়ির সবাই শুধু মাত্র নীলুফা আর বৃদ্ধা উম্মে কুলসুম ছাড়া পিলপিল পায়ে বেড়িয়ে এলো বসার ঘরে। পুরুষ আর মহিলা ভিন্ন ভিন্ন দুইটা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে গেলো। আধোঘুম আধো জাগরণে প্রত্যেকের মস্তিস্ক সচল। কিন্তু কোন ইন্দ্রের তাড়নায় তারা যেনো কাঠপুতলির মতো আচরণ করছে।
চারজন অদ্ভুত মানুষ এগিয়ে এসে প্রত্যেকের হাতে একটা করে ধারালো গর্ব আকৃতির দা ধরিয়ে দিলো।
এইবার চারজন অজ্ঞাত ব্যাক্তি একাধারে কাপতে কাপতে কি যেনো জপে যাচ্ছিলো। একপর্যায়ে তাদের মন্ত্র থেমে যায় আর মুখোমুখি প্রতিটা মানুষ প্রত্যেকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ধারালো সেই অস্ত্র হাতে।সবার অস্ত্র গুলো যখন একেবারে গলা ছুইছুই তখন দোতলার সিঁড়ি থেকে কারো আর্তচিৎকারে সবার ধ্যান ছুটে যায়।
ঘেমে নেয়ে উঠে বসে হাপাতে লাগলো নিবিড়। রিমোট চেপে লাইট অন করে দিলো। বীভৎস সেই স্বপ্ন তার পিছু ছাড়ে না।সেদিন কুলসুম মানে মামুন ইসলামের মায়ের জন্য তাদের উপর করা কালো জাদু কাজ করেনি ঠিকই কিন্তু বেইমানি কাজ করেছিলো সেন্ট পার্সেন্ট। না সুখ স্বপ্ন আসে আর না দুঃস্বপ্ন পিছু ছাড়ে। লাইট অন করেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। সময়টা ঠিক সেদিনের মতো না। তবে নিগুঢ় কালো অন্ধকার। তারারা সব মেলা বসিয়েছে অম্বরে । চাঁদটাও ক্লান্ত।পুল থেলে উঠে একটা স্টিম শাওয়ার নিয়ে শর্ট ন্যাপ নিয়েছিলো নূর ম্যানসনে। আজ প্রায় পাঁচ বছর পর এই বাড়ির ভেতরে আবার ঢুকেছিলো। সুখস্মৃতি না থাক ,তবুও বেড়ে উঠা এই বাড়িতে। নিজের কক্ষটাকে এখনো তার জন্যই সাজানো। মুচকি হেঁসে শুয়েছিলো কিছুক্ষণ। তারপর চোখ লেগে আসে।আর দুঃস্বপ্ন গুলাও হানা দেয়।
হঠাৎ জিয়ানার ভেজা ঘন চোখের পাপড়ি চুয়ে পানি পড়ার দৃশ্য মস্তিস্কের বিচরণ করছে।জিয়ানাকে একটা কড়া শেল্টার দিতে হবে।তাই তো নিজের টিমের নাম দিয়ে কাছাকাছি রাখার প্ল্যান।এই মেয়ে কোথায় হাত দিয়েছে নিজেও জানে না। এমন এক চক্র যাদের কাছে সবাইকে একপ্রকার ব্যাটারি চালিত পুতুল বানাতে কয়েক মিনিট লাগে।
সেদিনের সেই ভয়ংকর শয়তানি জাদুর খপ্পরে পড়ার পর বাড়িতে একজন মাওলানা আনানো হয়। উনি পুরোবাড়ি রুকাইয়া করে দিয়ে যান। এবং সবাইকে সতর্ক করে যান। নামাজ রোজা পড়ে সবসময় পাক পবিত্র থাকতে হবে। সাথে করতে হবে বিশেষ আমল। বড়রা সেটা পালন করে ছোটদের ফু দিলেই কাজ হবে।
কিন্তু নূর ম্যানসনের মালকিন উম্মে কুলসুম শুধু মাত্র একজন মাওলানা দিয়ে সন্তুষ্ট হলেন না। নানা কবিরাজ আর হুজুরদের প্রতিনিয়ত আসা যাওয়া লেগেই থাকতো।
নিবিড়ের সেই ঘটনা মনে হলে এখনো হাঁসি পায়।কবিরাজ বাড়ির সব বাচ্চাকে একটা মাদুরে শুইয়ে দিলেন পাশাপাশি। উনার মতে সবার পেটে কালুজাদু আছে। মানে খাওয়ানোর মাধ্যমে তাদের জাদু করা হয়েছে। কে করেছে কেনো করেছে কেউ জানে না। সব দ্বায় যায় বিরোধীপক্ষের ঝুলিতে।
মাদুরে শোয়ানোর পর সবার পেটের কাপড় সরিয়ে নাভি বের করা হলো। তারপর একটা বাটিতে সরিসার তেল নিয়ে আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কবিরাজ কিছুক্ষণ বিড়বিড় করলেন। তারপর সেই তেলে ময়দা বা আটা টাইপ কিছু একটা নিয়ে থামি বানালেন।সেখান থেকে অল্প থামি নিয়ে নাভিতে ঘষা হলো। নিবিড় পায়ের আঙুল চেপে কাতুকুতু সহ্য করে নেয় সেই পর্যায়ে। কিন্তু সবার ময়দার থামি সাদা থাকলেও , মেহেদী ময়দার থামি কালো হয়ে উঠলো যখন তখনই নিবিড় হেঁসে কুটোকুটি হলো।
কারণ কবিরাজ বলেছে এই বাচ্চার মাধ্যমেই খাওয়ানো হয়েছে সব জাদুর জিনিস।কিন্তু নিবিড় তো জানে কিছুক্ষণ আগে পাড়ার একটা ছেলের সাথে খেলতে গিয়ে মারামারি করেছে।আর মারামারির সময় ধুলায় গড়াগড়ি খেয়ে এসেছে বলেই ময়লা লেগেছিলো নাভিতে। এই কবিরাজ যে ভন্ড সেটা নিবিড়ের ছোট্ট মস্তিষ্ক ধরে ফেলে আর বলেও ফেলে ওইটা জাদু না মাটির ময়লা। এতে জাদুঘরের আঁতে ঘা লাগে। আর মামুন ইসলামকে বলে এই ছেলে শয়তানের বশিভূত হয়ে গেছে। একে প্রহার করুন যতক্ষণ না শয়তান দেহ ত্যাগ করছে।
একবার নিবিড়কে বেধড়ক প্রহার করা হলো শুধু মাত্র কবিরাজের কাজে হাঁসার জন্য। আর প্রহার কারি স্বয়ং মামুন ইসলাম।
নিবিড় মুচকি হেঁসে আকাশের দিকে তাকালো। শয়তানের প্ররোচনায় শয়তান নিজেই কবিরাজ রুপি মানুষ ছিলো সেটা অন্যরা না বুঝলেও নিবিড় বুঝে গিয়েছিলো দ্রুতই। নীলুফা তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলো এক দোয়া ,
” বিসমিল্লাহিল্লাজি লা য়্যাদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামায়ি ওয়াহুওয়াস সামিউল আলিম। ”
এই দোয়া সন্ধ্যায় তিনবার যে ব্যাক্তি পাঠ করবে কোনকিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।
নিবিড় পাঠ করলো আপন মনে। তার প্রথম স্কুল ,প্রথম শিক্ষক আর একমাত্র আপনজন নীলুফা ইয়াসমিন।নীল নীলুফার সন্তান। রাঙামাটির এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নীলকে একপ্রকার ছিনিয়ে আনেন মামুন ইসলাম।নীলুফা আর তার স্বামী পালিয়ে যায় সে যাত্রায়। নীল আইসিউতে ছিলো বিধায় তাকে নিয়ে পালাতে পারেনি তারা। আঠারো বছর পর্যন্ত নীল নিবিড়ের স্নেহের ছায়া বেড়ে উঠলেও আঠারো হওয়ার পর থেকে বন্দী। কারণ মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকার শুধু সেই। এবং সব জানার পর মামুন ইসলামের চোখে চোখ রেখে বলেছিলো
-আমার মাকে খুঁজে এনে দেন তাবেই সম্পত্তির ভাগ পাবেন।
কিন্তু নিবিড়ের কেনো জানি মনে হয় সম্পত্তি না মামুন ইসলামের অন্যকিছু চায়।
আস্তে আস্তে সকালের আভা ফোটবে কিন্তু আরও একটা রাত নির্ঘুম কাটবে নিবিড়ের। মাঝেমধ্যে চিন্তা করে জিয়ানার কাছ থেকে টিপস নিবে এত চিল কিভাবে থাকে? এত সুখ মানুষের মনে কেমনে আসে? যাদের একটা চমৎকার পরিবার আছে। তাদের আসে বোধহয়।এইজন্যই তো এরিষ্টটল রুট ফ্যাক্টরের উপর এত জোর দিয়েছিলেন।যার একটা চমৎকার পরিবার আছে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
তাই তো নিবিড়ের সুখ গুলো নীল। নীলুফা ঠিক নামই রেখেছে তার। একদম সুখ যার নীল সেই তো সুখনীল।
নীতিহীন রাজ পর্ব ১৬
জিয়ানা দরজায় নক করার জন্য হাত বাড়িয়েছে কেবল কিন্তু দেখে দরজা অল্প ফাঁকা। আজ জেনিকে সজীবের আম্মা দেখতে আসার কথা। হইতো এসেছে। তাই দরজা খোলা। জিয়ানা হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে স্তব্ধ হয়ে গেছে। সারা বাসা লণ্ডভণ্ড। সবাই কোথায়। ড্রায়নিং টেবিলের কাচে সারা ফ্লোর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।টিভি গুড়োগুড়ো হয়ে এক সাইডে ফেলে রাখা। জিয়ানা সাবধানে একটা একটা জিনিস ডিঙ্গিয়ে প্রথমে জিয়াউলের রুমে উকি দিলো। তারপর তার রুম পাড় করে জেনির রুমে উঁকি দিয়ে ফ্রিজড হয়ে গেলো। কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর আপি বলে চিৎকার দিতে গিয়েও নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরে ছুটলো বিছানায় রক্তাক্ত অচেতন জেনির দিকে।
