নীতিহীন রাজ পর্ব ২৫
আশিকা আক্তার সোহাগী
গ্রীকের সোলির (বর্তামানের তুর্কির কোন প্রদেশ) একজন দার্শনিক ছিলেন ত্রিসিপ্পাস। তিনি পেশায় ছিলেন পদার্থবিদ। কিন্তু হঠাৎ করে তার মন চাইলো রম্যরচনা লেখার। এইজন্য নিজের গাধাকে বেছে নেন।সে তার গাধাকে ডুমুর খেতে দেন। তারপর কি মনে করে বিশুদ্ধ মদও খেতে দেন।সেটা নিয়ে খুবই কৌতুক করেন এবং সেই রেফারেন্সে গাধাকে নিয়ে জোকস লিখেও ফেলেন।এমন ভাবে জোকস লিখলেন যেটা পড়ে নিজেই হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে মারা যান ।
তাই যার যেটা কাজ না সেটা না করাই ভালো । রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করবে।তারা যখন খুনোখুনি করে সস্তা নাটক সাজাবে তখন সেটা হয়ে উঠবে উপরোক্ত ঘটনার মতো।চারপাশে সুনাম কুড়ানো মামুন ইসলামের নামে রটে গেলো অসংখ্য দুর্নাম।নিজের পুত্রকে ছোটঘরে বিয়ে করানোর জন্য এক্সিডেন্টের নামে একটা পরিবারকে শেষ করে দিলো।দুইটা বাচ্চাসহ আটজন মানুষের হাড্ডি পর্যন্ত ছাই হয়ে গেছে।আহা ক্ষমতা। ছিঃ ছিঃ গুঞ্জন উঠলো বাতাসে।ভোর সকাল হওয়াই ফায়ারসার্ভিস এখনো এসে পৌঁছায়নি।হইতো ঘুমই কাটেনি তাদের।
ঘুম কাটলেও কি এ পোড়া দেশে ,ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মরিয়া যায়। আর ফায়ার ফায়টার আসিবার পূর্বে সব ছাই হইয়া যায়।তারপর সে ছাই দিয়ে ভালো দাঁত পরিস্কার হয়। মারহাবা।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নিবিড়রা এসে পৌঁছালো যতক্ষণে ,ততক্ষণেও ফায়ারসার্ভিস আসেনি।পাশের ঘর থেকে সবাই বের হয়ে গেছে। তাদের ঘর সম্বল হারানোর আহাজারিতে বাতাসে আগুনের শিখা যেনো তীব্রতর হচ্ছে।বাতাসে চির ধরে যাচ্ছে এক একটা চিৎকারে।
নিবিড় আর আশেপাশের কিছু ছেলেপেলে মিলে যতটুকু সম্ভব ঘর গুলোর মূল্যবান জিনিসপত্র বের করা শুরু করলো। আর স্থানীয়দের বালি আর পানির ব্যাবস্থা করার নির্দেশ দিলো।আগুনে পানির বিকল্প হলো বালু।বালু ছিটিয়ে দিলে আগুন কাবু হয়।
জিয়ানা আর জেনিও সাইকেলে করে রওনা দিলো কলোনির দিকে। ঘুমহীন শরীর চলতে চাইছে না।তবুও আনিস মামার কথা শুনে নিবিড়দের পেছন পেছন বের হয়ে গেছে।নিবিড় কি বলেছে সেসব তার মাথায় ঢুকেনি।শুধু এইটুকু বুঝেছে আনিস মামার ঘরে সর্ট সার্কিটে কিছু একটা হয়েছে।জেনি পেছন থেকে বলে উঠলো ,
-নিবিড় ভাইকে একদম প্রেডিক্ট করা যায় না। জানিস জিয়ু?
-হুম।
অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিলো জিয়ানা।
-তুই তো চলে এসেছিলি।ওই বেয়াদব মেয়েটা কি যেনো নাম বিড়াল না মিরালকে নিবিড় ভাই কষিয়ে দুইটা এমন থা*প্পড়
দিয়েছে। থা*প্পড়ে মা মেয়ে দুইজনই ভয়ে কেঁদে কেটে অস্থির।
থা*প্পড়ের কথা শুনে জিয়ানা হার্ডব্রেক করে জিজ্ঞেস করে ,
-কিহ?
-হ্যাঁ। শুধু তাই না এমন শাসিয়েছে বাপ রে বাপ চিন্তার বাহিরে।তার নতুন বউয়ের সামনে এমন সিনক্রিয়েট করার জন্য তাদের নামে পাঁচকোটি টাকার মানহানি মামলা করবে।
-এ্যা?
-হ্যাঁ।
-উনার মানের দাম মাত্র পাঁচকোটি?
জেনি পিঠে ছোট ছোট দুইটা চর দিয়ে বলে,
-তুই কোনদিন সিরিয়াস হবি না?
-জিন্দাগি মাজাক বানাকে ছুড় দি আর সিরিয়াস।
-অনেক গুলো মোটামুটি জিনিস পাওয়ার চেয়ে একটা কোয়ালিটিফুল জিনিস পাওয়া ঢের ভালো।নিবিড় ভাই অনেক হাজবেন্ড ম্যাটারিয়াল।
-হ্যাঁ কথায় কথায় টুটি চেপে ধরা জামাই আবার হাজবেন্ড ম্যাটারিয়াল? ডমেস্টিক ভায়োলেন্সে মামলা ঠুকে দিবো দেখিয়ো।
বলে আবার প্যাডলে চালানো শুরু করলো জিয়ানা।আবার বলে উঠলো ,
-তবে দুনিয়া মাঝেমধ্যে বারাবাড়ি রকমের আনফেয়ার লাগে।সুশ্রী ,পঞ্চগুনে গুনানিত এমনকি বিনয়ী হয়েও তোমার ভাগ্য দেখো আর আমার ভাগ্য দেখো।আমারটা নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ কিংবা আশাভরসা নাই কিন্তু তোমার….
চুপ হয়ে গেলো।
-আমারও নেই জিয়ু।যা পাবো আমি আগলিয়ে নিবো দুই হাতে।আমার দিকে কেউ না আগালেও শুধু মুখ তুলে তাকালে আমি তার কাছে দৌঁড়ে যাবো।
-আত্মসম্মান বলেও তো একটা ব্যাপার আছে মেরি বেহনা?
-কিছু সম্পর্কে উদার হইতে হয় ,ছাড় দিতে হয় , ভুল দেখেও অন্ধ সাজতে হয়। না হলে সেই সম্পর্ক গুলা একদমই আগাবে না।সেখানে আত্মসম্মান নামের কোন জিনিস গ্রহনযোগ্যতা পাবে না।
-হুম আমি আগাই আর ভন্ড নেতা আমার নিতম্বে লাত্থি দিয়ে বলুল চাল হাট। তোর প্রতি আমার ইন্টারেস্ট নাই।
-আমার মনে হচ্ছে এমনটা তুই নিজেই করবি।আই থিংক নিবিড় ভাই পজেসিভ তোর উপর। কিছু মানুষ আছে না একটু বেশি ব্যাটাগিরী ওয়ালা।মেল ইগো অনেক বেশি।তারা ভাঙ্গবে কিন্তু মচকাবে না।সে এই ক্যাটাগরির। ভালোবেসে গোপনে গোমড়ে মরবে কিন্তু মুখে প্রকাশ করবে না।
-ব্যাংকে কোটি টাকা রেখে ভিক্ষা করে খাওয়ার মাঝে কিছু আনন্দ আছে না লাভ?
-আমার ভুল হয়েছে। তোর সাথে তর্কে আমি পারবো না।তবে একটা রিকুয়েষ্ট বিয়ে যেহেতু হয়েই গেছে একটু আকড়ে ধরার চেষ্টা করিস।
-যারা কচুরিপানা। তারা তো আকড়ে ধরতে পারে না।তাদের মূলে সেই শক্তি নেই।বরং তাদের জন্য লাগবে একটা দিঘী আর জল। দিঘীর জল হয়ে এলে জিয়ানা নামের কচুরিপানা সেই জলে ভেসে ,হেঁসে ,খেলে বেড়াবে।
-এত হেয়ালি কথা তুই বলতে পারিস জিয়ু। জীবন এত ফিলোসোফি দিয়ে চলে না।
-আই এগ্রি উইথ ইউ। তবে আমার জীবন ফিলোসোফি দিয়েই চলে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো জেনি।জিয়ানার এত বাস্তববাদীতা তার পছন্দ না।মানুষকে কখনো কখনো নত হতে হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছে সম্পর্কের খাতিরে নত হওয়া ভালো। তবে সেটা বারবার না।কে বুঝাবে এই মাথাছাটা মেয়েকে।
জিয়ানা আর জেনি হাজির হলো মিনিট দশেক পড়ে।সাইকেল ফেলে একপ্রকার দৌঁড়ে গিয়ে দাঁড়ালো আনিসের পোড়াঘরের সামনে। কয়েকটা ভাঙ্গা আর কালচে টিন ছাড়া কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। হট্টগোল আর ঘর হারানো দুই পরিবারের আহাজারিতে জিয়ানার হৃদয় যেনো চৌচির হয়ে যাচ্ছে।ভেবেছে অল্প আগুন লেগেছে।কিন্তু এতো একেবারে সর্বস্ব শেষ করা আগুন।
আশেপাশে অনেকেই একে অপরকে ধরে গলা ফাটিয়ে কান্না করছে। কেউ মাটিতে গড়াগড়ি করে আহাজারি করছে। একজন মহিলা মাটিতে হাত দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে করতে বেহেড হয়ে গেলেন।জেনি দৌঁড়ে উনার কাছে গেলো।আশেপাশে মানুষের ভিড়ে জিয়ানা নিবিড়কে খোঁজে চলেছে।
বেলা গড়িয়েছে অল্প সকাল সাতটার কাছাকাছি হইতো।কিন্তু মানুষের সমাগমে মনে হচ্ছে দিপ্রহর চলছে।কারেন্টের ভয়ে পাশাপাশি সব ঘরের মানুষ এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সবাই ভীত হয়ে আছে।কলোনি ঘর হওয়াই গাদাগাদি করে উঠানো সব ঘর।স্থানীয় কয়েকজন মিলে ট্রান্সমিটারের সাথে লাইন ডিসকানেক্ট করে দিয়েছে।
জিয়ানা আশেপাশে নজর ঘুরালো নিবিড় কোথায়।তার চ্যালাপেলাদেরও দেখছে না।
এরমাঝে একজন মধ্যবয়স্ক লোক আহাজারি শুরু করলো। জিয়ানা সেদিকে গেলো।লোকটা বারবার বলছে,
-আমার আম্মা।আমার আম্মাডা হাডবার পারে না।সেই এখন পুইড়া কয়লা হয়ে যাবো গো।
জিয়ানা বার কয়েক জিজ্ঞেস করলো উনার ঘর কোনটা। কিন্তু লোকটা কান্নায় এতটা ব্যস্ত কারো কথায় শুনছে না দেখে , জিয়ানা চিল্লায়ে বলে উঠলো ,
-এই লোকের ঘরে উনার বয়স্ক মা আছেন। কেউ কি জানেন উনার ঘর কোনটা?
ভিরের মাঝে কেউ আগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো একটা দোতলা ঘর। জিয়ানা কোনকিছু না ভেবে সেদিকেই দ্রুত হাটা শুরু করলো। লোকজন চিল্লিয়ে উঠলো। কেউ কেউ বলল,
-আরেহ মাথা খারাপ নাকি।
-আরে আরেহ করছে কি? নিচতলায় আগুন ধরা শুরু হয়েছে। এই মেয়েটাও মরবে নির্ঘাত।
কেউ কেউ ফোনের ক্যামেরা বের করে ভিডিও করা শুরু করেছে।
অথচ এতগুলো মানুষ যদি একসাথে ফু দিলেও আগুন নিভে যেতো।এই দেশের কালচার এমন হয়েছে বিপদে এগিয়ে এসে কোনকিছু করার থেকে ,ফোনের ভিডিও না হয় ছবি তুলা সহজ।
সেই আগুন লাগা ঘরের একেবারে কাছে যাওয়ার সাথে সাথেই জিয়ানার হাতে টান পড়লো। পেছনে ফিরে দেখে নিবিড়।কথাবার্তা ছাড়া ঠাস করে একটা থাপ্পড় মেরে দিলো জিয়ানার ডান গালে। রাগে রি রি করে বলে উঠলো ,
-তোমার আক্কেল কবে হবে? বলেছি না নিজেকে নিয়ে এত বেশি সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগবে না? কি এমন রত্ন আছে এই ঘরে যে মরে হলেও সেটা উদ্ধার করতে যাচ্ছো?
চর খেয়ে জিয়ানার গাল থেকে কান ঝি ঝি লেগে গেছে।রাগে চোখের পানি একফোঁটা পড়ে গেলো।সেই অবস্থায় নিবিড়ের কলার ধরে ঝাকিয়ে বলে উঠলো ,
-তোর হাত এত চলে কেন? অসভ্য জানোয়ার। এই ঘরে এক বৃদ্ধা আছেন। না শুনে না বুঝে কথায় কথায় মারিস কেন? আমি কি তোর বিয়ে করা বউ?
নিজের কথায় নিজেই বেক্কেল হয়ে গেলো জিয়ানা।বারবার ভুলে যায় এই ভন্ড নেতার সাথে তার কাল বিয়ে হয়েছে।
অপরদিকে নিবিড় আবার চোয়াল চেপে ধরে বলে ,
-আল্লাহর কসম জিয়ানা।আজ এই মুহূর্তে তোমাকে পুতে ফেলতাম যদি আনিস মামার ত্যাগটার গুরুত্ব আমার কাছে না থাকতো। তোমাকে পাওয়ার জন্য যদি এরচেয়ে কোন সহজ উপায় পেতাম তবে আজ আনিস মামা আর তার পরিবার বেঁচে থাকতো।
বলে জিয়ানাকে ঝটকা মেরে দূরে সরিয়ে নিজেই ঢুকে গেলো সেই ঘরে।অপর দিকে জিয়ানা বিমূর্ত কংক্রিটের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পরমুহূর্তেই চিৎকার করে উঠলো,
সুখ বলে। জেনি জিয়ানার চিৎকারে তারদিকে দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরে আগুনের আচেঁর থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু জিয়ানার সাথে পারলো না।
জিয়ানা তড়পাতে লাগলো যখন আগুন বেড়ে গেলো।লোকজন সব এখন এই ঘরের সামনে।জিয়ানার অস্থির হয়ে মাটিতে বসে পড়লো।
আল্লাহ কেনো তার সাথে এমন করে।কেউ কাছে এলেই তাকে কেড়ে নেয়ার এত পায়তারা কেনো? এই ভন্ড লোকের জন্য তার কলিজা ফেটে যাচ্ছে কেনো।এই লোক তো তার কেউ না।গলার দিকে হাত বুলালো শান্ত ভাবে। এইখানে মনে হচ্ছে কিছু আটকে আছে।জোরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করলো। শুধু টানের একটা শব্দ হলো।
মক্কু আকাশ আরও দশ বারোজন ছেলে এসে হাজির হলো সাথে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও। সবাই মিলে পানির পাইপ ধরাধরি করে নিবিড়ের ঢুকে যাওয়া ঘরের কাছে এনে পানি দেয়া শুরু করলো।
নিবিড় ঢুকেছে প্রায় দশমিনিট।জিয়ানা এবার শরীর ছেড়ে দিলো।একদিনে তার মস্তিষ্ক সত্যি আর লোড নিতে পারছে না।জেনি জিয়ানাকে বুকে আগলিয়ে রাখে ছোট্ট বাচ্চাটির মতো।
পনের মিনিট পর নিচতলার আগুন পানির সাহায্যে কাবু হলে নিবিড় বের হয়ে এলো কোলে একজন বৃদ্ধা নিয়ে। নিবিড়ের জামার হাতা সহ পিঠের দিকে জামা পোড়া। ফায়ার ফায়টার একজন এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধাকে নিয়ে ছুটলেন এম্বুলেন্সের দিকে।
অপরদিকে জিয়ানা দৌঁড়ে গিয়ে নিবিড়ের বুকে কিল দেয়া শুরু করলো। কেঁদে চোখের জল ,নাকের জল এক করে এলোপাথাড়ি কিল দিতে দিতে বসে পড়লো মাটিতে। এতগুলো কিল খেয়েও নিবিড়ের মুখে একটা মুচকি হাঁসি ছিলো। যেটা জেনি সহ উপস্থিত অনেকেই লক্ষ্য করলো।
কিছু বিপদ আসে আরশের মালিকের কাছ থেকে। মানুষের জীবনে যত মুসকিল ঠিক তত আহসান। নিবিড়ের বিপদে জিয়ানা এতটা উদ্বিগ্ন ,এত বিচলিত হয়ে পড়বে সেটা কেউ আশা করেনি। তিন কবুলের যে একটা অদৃশ্য বাঁধন আছে। সেই বাধঁনের গিট ঠিক কোন কোন অংশে জোড়া লাগে সেটা মানব চিন্তার বাহিরে।তাই তো বলা হয় তিনটি জিনিস সম্পুর্ন খোদাতালার নিকট থেকেই নির্দিষ্ট ,জন্ম ,মৃত্যু আর বিয়ে।
অদৃশ্যের লেখন খণ্ডানোর ক্ষমতা ক্ষুদ্র মানব সম্প্রদায়ের নেই।
জিয়ানা হুট করে দাঁড়িয়ে নিবিড়কে ভালোভাবে ঘুরিয়ে দেখে মক্কুদের দিকে তাকিয়ে থমকের সুরে বলে উঠলো ,
-আপনারা কি সবগুলা ব্লাইন্ড? উনার হাত আর পিঠে পুড়ে গেছে অনেকটা ,চোক্ষে দেখেন না।উনাকে নিয়ে এম্বুলেন্সে উঠান।
পেছন থেকে নিবিড় সবাইকে শান্ত থাকার ইশারা করলো।কেউ নড়ছে না দেখে জিয়ানা নিজেই নিবিড়ের কম ক্ষত হওয়া হাতটা ধরে টেনে হাটা শুরু করলো। আর গজগজ করে বলে উঠলো ,
-দেখেছেন কেমন কু*ত্তা মার্কা রাজনীতি করেন আপনারা? এদের চেয়ে রাস্তার কু*ত্তা বিলাই পালা ভালো।একদিন খাওয়ালে সারা জীবন মনে রাখে।বিপদে জান দিয়ে দিবে।
সারারাত জিয়াউল হক ঘরের দরজার কাছে বসে ছটফট করেছে।নিদ্রা উড়ে গেছে জিয়ানা আর জেনি বের হওয়ার সাথে সাথেই।জেনিরা পৌঁছানোর পর বার কয়েক ফোনে কথাও বলেছে।তবুও মনে শান্তি পাচ্ছে না।হুট করে বিয়ে। সেটাও রাস্তায় গুন্ডামী মাস্তানী করা দুইটা ছেলের সাথে।
বুকের ভেতর কেমন দলা পাকানো কষ্ট। পুরুষ মানুষের বুক ফাটে তবুও মুখ ফুটে না। আঞ্জুমান দরজা থেকে দেখে গেছে কয়েকবার।অপরাধবোধে চোখে চোখ রাখতেও পারছে না সে।সারাদিন সেবা করে রাতে ঘর থেকে বের করে দেয়ার মতো হয়ে গেছে আঞ্জুমানের ব্যাপারটা।
তিনটা বাচ্চা আর সংসার একহাতে সামলিয়ে চাকরি করেছে দিনের পর দিন।জিয়াউলের চাকরির সুবাদে থাকতে হতো দূরে দূরে। ভালো পরিবারের মেয়ে হয়েও জিয়াউলদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে বউ হয়ে এসেছিলো শুধু মানুষটাকেই দেখে।তাই তো নিজের চাহিদাকে প্রায়োরিটি লিষ্টের সবার শেষে রেখে এসেছে।
নীলুফাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো মাত্র কয়েকমাস।সে এত চনমনে আর মনজয়ী ছিলো আঞ্জুমান নিজেও অনেক ভালোবেসে ফেলেছিলো। চমৎকার হাঁসি খুশী সবার সাথেই প্রচন্ড মিশুক। আর সবচেয়ে বড় দিক ছিলো উপকারী মানুষ। চোখের সামনে যে কোন অসহায় কাউকে দেখলেই সাহায্য করতো। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে মোটামুটি গা ভর্তি ছোটখাটো গহনা সহ।জেনিকে নিজের হাতের ব্রেসলেট দিয়েছিলো।
গলার চেইনটা আঞ্জুমানকে দেয়।আর বাকি তিন চারটা আংটি ,কানের দুল থেকে পায়ের নুপুর সব একে ওকে দিয়েছে। পারিবারিক এক্সিডেন্টের পর নীলুফার কোন একজন ভাবি গোপনে যোগাযোগ রেখেছিলো।তবে নীলুফার মা তাকে মেনে নেয়নি।এমনকি উনি এটাও মনে করেন নীলুই তার পরিবারের এই ধ্বংসের কারণ।
তাদের নিতে যখন জিয়াউল রাঙামাটি পৌঁছে দেখলো ,নীলুফা নামের কোন প্যাসেন্টই ভর্তি হয়নি।আশেপাশে খোজাখুজি করে দুইদিন পর বাড়ি ফিরে আসে।আর এসেই আশ্চর্য হয়।কারণ একজন এম্বুলেন্সের ড্রাইভারের মাধ্যমে জিয়ানাকে দিয়ে তাদের এড্রেসে পাঠিয়েছিলো সাগর আর নীলুফা।
সাথে ছিলো একটা চিরকুট ,
স্নেহের জিয়া ,
তোদের সবার সাথে জীবনের লম্বা সময় পাড় করার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু সেই ইচ্ছা মনে হয় আমার ভাগ্যের লেখা নেই।আমার টুইন বেবি হয়েছে। ছেলে বাচ্চাটার অবস্থা খারাপ সে বিশেষ পরিসেবায় হাসপাতালে ভর্তি আছে।আল্লাহ জানেন সার্ভাইব করতে পারবে কিনা।আর মেয়েটাকে তোদের কাছে পাঠালাম।নিজের পরিচয় দিয়ে বড় করিস।পারলে শক্তপোক্ত করে বাস্তবতা শিখাস।যেনো বড় হয়ে নিজের বাবা মায়ের অসহায় জীবনের গল্প শুনে ভেঙে না পড়ে। সবসময় সত্যের পথে চলে।আমি চাই আমার মেয়ে জার্নালিস্ট হোক। তার প্রতিটা আর্টিকেলে যেনো এই দেশের প্রতিটা দূর্নীতিবাজদের কলিজার কাপন ধরায়।
নীলুর অবস্থা ভালো না।তাকে নিয়ে আমি আত্মগোপনে গেলাম।বাচ্চার নসীবে যদি ভালো কিছু থাকে কিংবা আমাদের যদি হায়াত থাকে তবে আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।
তোর নামে একটা এফডিআর(ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট ) পঠিয়েছি। আশা করি কাজে আসবে।আমার আমানতকে দেখে রাখিস।পারলে তাকে বলিস বাবা মাকে ক্ষমা করে দিতে। আমি আমার মেয়েটাকে একটুও আদর করতে পারিনি।ভালো মতো দেখতেও পারিনি।তোর চোখ দিয়ে দেখবো আর তোর মাধ্যমেই আমার ভালোবাসা তার কাছে পৌঁছে যাবে আশা করি।সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো ভাই।আঞ্জুমানকে স্নেহ জানাস।তার কষ্টের জীবনে আমি আরও একটা কষ্ট যোগ করে দিলাম। এইজন্য আমরা আন্তরিক দুঃখিত।
আর একটা কথা মামুন ইসলামকে নিয়ে নীলুফা অনেক গুলা গোপন কথা আমাকে বলেছে। তার কোন প্রমাণ নেই বিধায় আমি আপাতত বললাম না কিছুই।আবার তোর সাথে যোগাযোগ করবো।
তোর ভাই
সাগর হক
ভাইয়ের আমানত সে কতটুকুই রক্ষা করতে পারলো? নিজের জিনিস খোয়া গেলে কষ্ট হয়। তবে জবাবদিহির ব্যাপার থাকে না।কিন্তু অন্যের আমানতের খেয়ানত কারি যে মোনাফেক। জিয়াউলও কি সে লিষ্টের একজন।
ভাবতে পারলো না আর।বুকে কেমন চাপ লাগছে যেনো।হাত দিয়ে বার কয়েক ঘষা দিলো। আঞ্জুমান একপ্রকার দৌঁড়ে এলো কাছে।দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন স্বামীর ব্যাকুলতা দেখে। নিরেট সিগ্ধ ভালোবাসা দিয়ে এসেছে জিয়াউল।অথচ আঞ্জুমান সেই ভালোবাসার দাম রাখলো কই।
কাছে এসে পা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো আঞ্জুমান।অনুতাপের আগুনের চেয়ে শক্ত আগুন দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টি যে নেই।যে পুড়েছে এই আগুনে সেই একমাত্র বুঝবে।আর এই অনুতাপের আগুনই এমন আগুন যেটা একজন মানুষকে খাটি মানুষে পরিনত করে।
যার অনুতাপ যত বেশি ,মানুষ হিসেবে সে ঠিক ততটাই খাটি।
এম্বুলেন্স থেমে আছে প্রায় দশ মিনিট।শেষে অধৈর্য হয়ে জিয়ানা আর নিবিড় নেমে গেলো।এত সকাল সকাল তো জ্যাম থাকার কথা না। তবে কেনো গাড়ি সব আটকিয়ে রেখেছে?
-আপনি গাড়িতেই বসুন। আমি দেখছি।
বলে জিয়ানা আবার নিবিড়কে গাড়িতে বসিয়ে দিলো।ড্রাইভারের কাছ থেকে পানির বোতল চেয়ে নিয়ে নিজের গলার ওড়নাটা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিবিড়ের হাত আর পিঠে ভেজা সেঁক দিলো বার কয়েকবার।
পুরাটা সময় নিবিড়ের মুখে একপ্রকার তৃপ্তির জোত্যি জ্বলছিলো যেনো।জিয়ানার প্রতিটা কাজ আড়চোখে দেখে গেছে এমন ভাবে ,যেনো জিয়ানার দিকে তার বিশেষ নজর নেই।
সেঁক দিয়ে জিয়ানা নিবিড়কে বলল,
-ওড়নাটা চেপে ধরে থাকুন।
-তোমার টপসটা বেশ ফিটিং। ওড়না নিজের গায়ে জড়াও।আমার লাগবে না।
বলে ওড়নাটা জিয়ানার দিকে ঠেলে দিলো।জিয়ানার মাঝে এতে কোন জড়তা এলো না বরং নিজের চুলের বানটা একটানে খুলে দুইপাশে চুল ভাগ করে দিয়ে বলে,
-ওড়নার অল্টারনেট চুল দিয়ে হয়ে যাবে।আপনি এটা ধরে থাকুন। জ্বলছে নিশ্চয়?
নিবিড় হ্যাঁ না কিচ্ছু বলল না।তবে জিয়ানার কথাটা মানলো।
রাস্তার মাথায় এগিয়ে গিয়ে সার্জনের সাথে আলাপ করে ,জিয়ানার মাথা গরম হয়ে উঠলো।ভিআইপি পাস। তাই রাস্তা বন্ধ। জিয়ানা বুঝানোর চেষ্টা করছে ,এম্বুলেন্সে আগুনে পোড়া রুগী আছে দুইজন।কিন্তু তাদের করার কিচ্ছু নেই।যতক্ষন না ভিআইপি যাচ্ছে ততক্ষণ রাস্তা ছেড়ে দেয়া যাবে না।হেড কোয়াটার থেকে নিষেধ।
এরমাঝে নিবিড় হন্তদন্ত করে বের হয়ে এসে জানালা ,বৃদ্ধার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। এম্বুলেন্সে অক্সিজেন সিলিন্ডারে অক্সিজেন নেই।
নিবিড়কে সার্জন দুইজনই সালাম দিলো। নিবিড় তাদের রিকুয়েষ্ট করলো ,এই ব্লকটা শুধু খুলে দেয়ার জন্য।
-ভাই আমাদের হাতে কিচ্ছু নেই।ভিআইপি চলে যাওয়া না পর্যন্ত আমরা যদি ব্লক খুলে দেই তাহলে চাকরি থাকবে না।
নিবিড় একটু এগিয়ে গিয়ে সার্জনের ইউনিফর্মের কলার ঠিক করতে করতে খুবই আস্তে করে বলল,
-বেঁচেই যদি না থাকিস চাকরি দিয়ে কি করবি?
এইবার সার্জনের চেহারার রং উবে গেলো যেনো।খামছি দিয়ে নিবিড়ের হাত ধরে বলল,
-ভাই ভাই!!! আপনি তো সব জানেনই আমরা সরকারের গোলাম। আমি অন্য ব্যবস্থা করছি।রোগীকে শুধু পাড় করে দিতে পারবো।এম্বুলেন্স এখানে আটকা থাক।
নিবিড় আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবার ফেরত গেলো এম্বুলেন্সের দিকে।
পায়ে হেটে নিবিড় বৃদ্ধাকে নিয়ে দ্রুত পার হলো ব্লক রোডটুকু। জিয়ানা বারকয়েক চেয়ে। সে ক্যারি করতে পারবে বলেও লাভ হয়নি।নিজের ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়েই শক্তমুখে হেঁটে চলেছে নিবিড়।বেশ অনেকটা যাওয়ার পর রিক্সায় উঠে। তারপর কাছের এক ক্লিনিকে নিয়ে যায় দ্রুত। বৃদ্ধাকে নার্সদের কাছে দিয়েই নিবিড় বসে পড়ে রিসিপশনের সামনে চেয়ারের। জিয়ানা একপ্রকার ধরে তাকেও ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়।
নার্সদের দ্রুত ইন্সট্রাকশন দেয় ট্রিটমেন্ট করার।একজন নার্স ইনফেকশন রোধের একটা ইঞ্জেকশন আনলে নিবিড় সেটা শক্তমুখে রিজেক্ট করে। প্লাস কড়া একটা ধমক দেয়।নার্স ভয়ে জুবুথুবু হয়ে সরে যায়।
-সব জায়গায় নেতাগিরী দেখাবেন না তো।
বলে উল্টো ধমক দিয়ে জিয়ানা নার্সকে ইশারা করে ইঞ্জেকশন দেয়ার জন্য।
নিবিড় ‘জিয়ানা ‘বলে গর্জে উঠলে জিয়ানা কাছে গিয়ে মুখ চেপে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেয়।তারপর নার্সকে বলে,
-মোটা সুই আনোন। গরুর মতোভমোটা। এই নেতার নেতাগিরী ছুটিয়ে দেন।একটার জায়গায় দশটা ইনজেকশন দেন।
নার্স অভয় পেয়ে এগিয়ে এসে মেডিসিন ভরে নেয় সিরিসে। কাছে যাওয়ার সাথে সাথে জিয়ানা বলে ,
-ওয়েট আগে আমি চোখ বন্ধ করি।
নিবিড় ফট করে মাথা তুলে দেখে জিয়ানাকে। এই মেয়ে নিজের বেলায় একটুও ভয় পায়নি। অথচ তার বেলায় চোখ বন্ধ করতে চাচ্ছে।এই তো একদম তার ফু-আম্মুর ফটো কপি।
নিবিড়ের চাউনি দেখে জিয়ানা মাথা দিয়ে ইশারা করে কি হয়েছে। তাদের চাওয়াচাওয়ির মাঝেই নার্স তার কাজকর্ম শেষ করে।
ড্রেসিং প্লাস বেসিক ট্রিটমেন্ট করে নিবিড় হাসপাতালের ক্যান্টিনে বসে। জিয়ানা ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়। ঘুমহীন একটা দীর্ঘরাত যেনো ছিলো এক শতাব্দীর মতো।ফ্রেশ হয়ে এসে জিয়ানা বসার পর পরই সকালের নাস্তা টাইপ অনেক খাবার এলো সামনে।নিবিড় সব সাইডে রেখে পানির বোতল খুলে ডগডগ করে পুরো হাফ লিটার বোতল একমিনিটে সাবাড় করে জিয়ানাকে ইশারা করলো খেতে।
জিয়ানা খাবারের দিকে না গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো ,
-বলির পাঠা বানানোর জন্য আনিস মামাকে বেছে নেয়ার কি খুব বেশি দরকার ছিলো?আমাকে যদি এসে বলতেন সম্পত্তির দলিলে এমনিতেই সাইন করে দিতাম। বিয়ের নাটকের দরকার ছিলো না।মাঝখান থেকে কতগুলো মানুষের প্রাণ গেলো।
নিবিড় শান্ত চোখে চেয়ে পুরুষালি ভরাট গলায় বলে উঠলো ,
-আমার সামনে পেছনে প্লাস একশো হাত সীমানায় তোমাকে যেনো আর না দেখি।
-জিয়ানা খাবারে হাত দিয়ে বলে। ওকে আগে খেয়ে নেই।
নিবিড় চেয়ারে পেছনে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আবৃত্তি করলো,
নীতিহীন রাজ পর্ব ২৪
এ সব শূন্যতা ছাড়া কোনদিকে আজ
কিছু নেই সময়ের তীরে
তবু ব্যার্থ মানুষের গ্লানি ভুল চিন্তা সংকল্পের
অবিরল মরুভূমির ঘিরে
বিচিত বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ
এই পৃথিবী ,এই প্রেম ,জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ।
-জীবনানন্দ দাস
