Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৫

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৫

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৫
নাজনীন নেছা নাবিলা

কয়েকবার আপ্রাণ চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হয়ে অবশেষে নীলাকে নিজের জেদ বিসর্জন দিতে হলো। নিজের মাথাটা সম্পূর্ণ ঠান্ডা করে অত্যন্ত নরম ও ধীর কণ্ঠে সে বলল,
“আচ্ছা, আমাকে একটা বোতল দিন, আমি পানি খাবো।”
নীলার মুখ থেকে এই হার মানার শব্দটুকু শোনা মাত্রই মিহাল তার হাতের সেই বজ্রকঠিন বাঁধন এক নিমেষে আলতো করে দিল। নীলা আর কোনো উপায় না পেয়ে মিহালের হাত থেকে একটা বোতল নিয়ে সামান্য কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিজের তৃষ্ণা মেটাল। তারপর মিহালের অবশ হয়ে যাওয়া হাত থেকে দুটো বোতলই নিজের দায়িত্বে কেড়ে নিয়ে, সেগুলোর মুখ শক্ত করে আটকে ফ্রিজের ভেতর রেখে দিল। ফ্রিজের দরজাটা বন্ধ করতেই নীলার ভেতরের চেপে রাখা সবটুকু ক্ষোভ আবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে মিহালের দিকে ফিরে চোখ রাঙিয়ে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বলতে শুরু করল,

“মাথা নষ্ট নাকি আপনার? গত দুটো দিন ধরে আপনি কী শুরু করেছেন বলুন তো? আর এই সারারাত এখানে এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকার মানেটা কী, হ্যাঁ? আমার রাগ করাটা কি স্বাভাবিক না? আপনি কাজই তো করেছেন এমন! আমি না হয় জানতাম না যে আপনি প্রিন্সিপালের সাথে চুক্তি করেছিলেন যে চাকরি পাওয়ার তিন বছরের ভেতর বিয়ে করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি তো এ বিষয়ে খুব ভালো করেই জানতেন। তারপরও কেন সেই চুক্তির খেলাপ করে আমাকে তড়িঘড়ি করে বিয়ে করতে গেলেন? চুক্তির মেয়াদটা শেষ হলে করতেন আমায় বিয়ে‌ আমি কি কোথাও চলে যেতাম? নাকি মরে,,”
“নাহ্!”

শেষের শব্দটা নীলার ঠোঁট গলে বের হওয়ার আগেই মিহালের ভেতরের সমস্ত সংযমের বাঁধ এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বজ্রবিদ্যুতের গতিতে মিহাল তার এক হাত দিয়ে নীলার নরম ঘাড়টা শক্ত করে চেপে ধরল, আর অন্য হাতটা সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরল তার কোমর। এক তীব্র টানে সে নীলাকে নিজের তপ্ত বুকের সাথে মিশিয়ে সোজা ফ্রিজের শক্ত গায়ের সাথে লেপ্টে দিল। ঘটনাটি এত আকস্মিক আর ঝড়ের বেগে ঘটে গেল যে নীলা না পারল কোনো প্রতিবাদ করতে, আর না পারল নিজের অবশ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্ক দিয়ে কিছু বুঝতে। ফ্রিজের ঠান্ডা দেয়াল আর মিহালের শরীরের জ্বলন্ত উত্তাপের মাঝে সে যেন পুরোপুরি বন্দি হয়ে গেল। মিহাল আর একটা মুহূর্তের জন্যও তাদের মাঝের দূরত্ব রাখল না, অবাধ্য নীলার সেই কথা বলা ঠোঁট দুটোকে নিজের ঠোঁটের গভীর বাঁধনে স্তব্ধ করে দিল। মিহাল কোনো দ্বিধা না রেখে, এক বুক আজন্ম তৃষ্ণা আর তীব্র অধিকারবোধ নিয়ে নীলার ঠোঁটের মদির স্বাদ নিতে মত্ত হয়ে উঠল। তার এই গভীর, পাগলাটে স্পর্শে সারারাতের ক্লান্তি কিংবা ক্ষোভের কোনো চিহ্ন ছিল না, ছিল কেবল নীলাঞ্জনাকে হারানোর এক প্রচ্ছন্ন ভয় আর তাকে নিজের করে আগলে রাখার তীব্র আকুতি।

নীলা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেলেও, মিহালের ঠোঁটের তীব্র ভালোবাসার পরশ তার সমস্ত শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত অবশ অনুভূতি ছড়িয়ে দিল। তার চোখ দুটো নিজে থেকেই আলতো করে বুজে এলো। মিহালের বুকে এলোপাথাড়ি কিল ছুঁড়ে মারা সেই তেজী মেয়েটি কেন জানি এই মুহূর্তে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল। মিহালকে থামানোর মতো কোনো শক্তি বা ইচ্ছে কোনোটিই আর তার অবশিষ্ট রইল না। এক অদৃশ্য জাদুবলে দুই ওষ্ঠাধরের এই মিলন যেন তাদের মাঝের সমস্ত অভিমান আর দূরত্বকে এক নিমেষে গলিয়ে জল করে দিল। দীর্ঘ এক গভীর আলিঙ্গন এবং চুমুর শেষে যখন মিহাল তার ওষ্ঠাধর আলগা করল, তখনও তাদের মাঝে কোনো দূরত্ব তৈরি হলো না। একজনের উত্তপ্ত বুক আর একজনের বুকের সাথে লেপ্টে রইল। ড্রয়িংরুমের সেই নিস্তব্ধতায় শুধু দুজনের দ্রুত ও ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। নীলা তখনও মিহালের বুকে নিজের হাত দুটো রেখে হাপরের মতো হাঁপাচ্ছিল। মিহাল তার এক হাতের তালুতে নীলার নরম গাল দুটো আগলে ধরল। তার স্পর্শে তীব্র এক আধিপত্য আর ব্যাকুলতা স্পষ্ট। নীলার চোখের দিকে নিজের জ্বলন্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মিহাল ফিসফিসিয়ে, অথচ এক অনড় শাসনে বলে উঠল,

“ইউ আর মাইন। ডোন্ট এভার টক অ্যাবাউট লিভিং মি। খুব মরার ইচ্ছে তোমার? যদি মরতেই হয়, আমাকে বলবে, আমি মারবো তোমাকে। তাও নিজের আদর দিয়ে, সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে। তোমাকে এত আদর আর ভালোবাসায় ডুবিয়ে দেব যে তুমি সহ্য করতে পারবে না। তবুও ভুলেও কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাওয়া কিংবা মরে যাওয়ার কথা মুখে আনবে না।”

নীলার গলা দিয়ে কোনো শব্দ সরল না, সে শুধু বড় বড় শ্বাস নিয়ে মিহালের চোখের সেই গভীরতা মেপে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মিহাল আর কোনো সুযোগ না দিয়ে আবারও নীলার অধর জোড়া নিজের ঠোঁটের বন্ধনে জড়িয়ে নিল। তবে এইবারের স্পর্শে আগের সেই উন্মাদনা ছিল না, ছিল এক চিলতে প্রশান্তি আর অসম্ভব রকমের আলতো এক টান। যেন সে চায় তার নীলাঞ্জনা প্রতিটি সেকেন্ডের এই তীব্র অনুভূতি নিজের সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে অনুভব করুক। মিহালের এই নরম, ভালোবাসার পরশে নীলার ভেতরের সবটুকু জেদ আর অভিমানের বাঁধ এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। সে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। সব জড়তা ভেঙে সে নিজের এক হাত দিয়ে মিহালের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল, আর অন্য হাতটা গলিয়ে দিল মিহালের সিল্কি চুলের মাঝে। এক বুক আকুলতা নিয়ে সে মিহালের সেই গভীর চুম্বনের প্রত্যুত্তর দিতে শুরু করল। বাইরের পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল, অতীতের সব কলঙ্ক আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ভুলে গিয়ে, ভোরের সেই মিষ্টি আলোয় দুজনেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল একে অপরের চিরচেনা ভালোবাসার অতল সাগরে।

সেই গভীর চুম্বনের মাঝে তীব্র এক ব্যাকুলতায় শ্বাস নেওয়ার জন্য মিহাল সামান্য একটু থামল। নীলার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ওষ্ঠাধর রেখে সে মদির কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আই’ম নট গেটিং ইনাফ অফ ইউ।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই সে আবারও এক আজন্ম তৃষ্ণা নিয়ে নীলার ওষ্ঠ জোড়া নিজের দখলে নিল। মিহালের এই অবাধ্য ও অবিনাশী ভালোবাসার টানে নীলা যেন এক মায়াবী ঘোরে তলিয়ে গেল। সে নিজের আঙুলগুলো দিয়ে আরও শক্ত করে খামচে ধরল মিহালের চুলের গোড়ায়। মিহালের একটা হাত তখন নীলার পুরো পিঠ জুড়ে এক তীব্র ভালোলাগার ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই, সমস্ত ব্যাকুলতাকে এক চূড়ান্ত রূপ দিয়ে মিহাল আচমকা নীলাকে এক হেঁচকায় নিজের কোলে তুলে নিল। আকস্মিক এই উড্ডয়নে নীলা অবশ শরীরে নিজের পা দুটো শক্ত করে জড়িয়ে নিল মিহালের কোমরের দুপাশে। মিহাল কিন্তু তখনও নীলার ঠোঁট থেকে নিজের মনোযোগ এক বিন্দুও সরাল না। ওই অবস্থাতেই, নীলার ঠোঁটের সুধা পান করতে করতে সে ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে। টেবিলের একদম কাছে এসে, মিহাল নিজের এক হাত দিয়ে নীলার কোমর শক্ত করে ধরে রাখল, যাতে সে পড়ে না যায়। আর অন্য হাত দিয়ে চোখের পলকে ডাইনিং টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা জলের গ্লাস আর টুকিটাকি জিনিসপত্র এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে জিনিসগুলো মেঝেতে আছড়ে পড়লেও, সেই শব্দের দিকে তাদের কারোরই কোনো খেয়াল ছিল না। মিহাল পরম আবেশে নীলাকে তুলে বসিয়ে দিল সেই ডাইনিং টেবিলের ওপর। এবং ধীরে ধীরে নীলাকে টেবিলের উপর শুইয়ে দিল এবং নিজেও নীলার উপর ঝুঁকে পরল। এখনো দুজনের ঠোঁটের আলদা হয়নি। মিহাল নিজের ঘাড়ে এবং চুলের মাঝে থাকা নীলার হাত দুটো ধীরে ধীরে সামনে দিকে আনল এবং নীলার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে ভারী ভারী নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,

“নীলা সুইটহার্ট, টেক অফ মাই শার্ট।”
নীলা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত রেখে ডমিনেট স্বরে বলল,
“স্ক্রিম অ্যান্ড বেগ টু মি। বেগ মি ফর ইট। স্ক্রিম অ্যান্ড বেগ মি।
মিহাল ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর চিৎকার করে বলল,
“আই’ম বেগিং ইউ, প্লিজ আনবাটন মাই শার্ট, সুইটহার্ট।”
নীলার ঠোঁটের কোণে এবার এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সব রকম দ্বিধা আর বাধা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে নিজের কাঁপতে থাকা নরম আঙুলগুলো দিয়ে ধীরে ধীরে মিহালের শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে আলগা করতে লাগল। অন্যদিকে মিহাল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নীলার ওষ্ঠাধর ছেড়ে সে নিজের মুখ গুঁজে দিল নীলার গলার ভাঁজে। মিহালের সেই তীব্র ও অনায়াস পরশে নীলা আলতো করে গোঙাতে লাগল, তার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত ভালোলাগার শিহরণ খেলে গেল। তার হাত দুটো তখনও অবিরাম কাজ করে যাচ্ছিল মিহালের শার্টের বোতাম খোলার। শার্টের প্রায় সবকটি বোতামই খোলা শেষ, এখন আর মাত্র দুটি বোতাম খোলা বাকি। মিহালের ঠোঁট নীলার গলার খাঁজে গভীর এক ভালোবাসার দাগ এঁকে দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে তীব্র শব্দে বেজে উঠল সদর দরজার কলিং বেল!

মুহূর্তের মধ্যে যেন এক লহমায় জাদুর ঘোর কেটে গেল। দুজনেই এক ঝটকায় থমকে গেল এবং সম্বিত ফিরে পেয়ে নিজেদের বর্তমান অবস্থানটা টের পেল। নীলা চরম এক অস্বস্তি আর লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত দুটো মিহালের শার্ট থেকে সরিয়ে নিল। লজ্জায় তার মনে হতে লাগল এই বুঝি বুক চিরে প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। মিহালও একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে নীলার ওপর থেকে সরে দাঁড়াল। তার মুখে তখন কোনো ভাষা নেই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কী থেকে যে কী হয়ে গেল, সে নিজেও যেন পুরোপুরি মেলাতে পারছিল না। এখন নিজের ওপরই এক চরম অপরাধবোধ আর রাগ হতে লাগল তার। নীলা তাকে কতটা বিশ্বাস করে, অথচ সে আবেগের বশে এত বড় একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। নীলা তখনও ডাইনিং টেবিলের ওপর শুয়ে আছে, লজ্জায় মিহালের দিকে চোখ তুলে তাকানোর শক্তিটুকুও তার নেই।ৎমিহাল নীলাকে সান্ত্বনা দিতে বা কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই আবার অধৈর্য হয়ে কলিং বেলটা বেজে উঠল। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকে কিছুটা স্বাভাবিক করার জন্য এবং নীলাকে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার কিছুটা সময় দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিহাল আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে নিজের খোলা শার্টটা কোনোমতে সামলে নিয়ে সদর দরজা খোলার জন্য ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। মিহাল চোখের আড়াল হতেই নীলা ডাইনিং টেবিলের ওপর ধীরে ধীরে উঠে বসল। মিহালের সেই জাদুকরী ও তীব্র স্পর্শের কারণে তার সম্পূর্ণ শরীর কেমন যেন এখনও অবশ আর ভারী হয়ে আছে। তবুও সেখানে আর একটা সেকেন্ডও বসে থাকা ঠিক নয় ভেবে, সে টেবিল থেকে নেমে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেল।

মিহাল দরজা খুলে দেখল বাইরে একজন লোক বড় একটি পার্সেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তীব্র বিরক্তি আর অস্বস্তি চেপে সে দ্রুত অফিশিয়াল ফর্মালিটি পূরণ করল এবং লোকটির কাছ থেকে পার্সেলটি বুঝে নিয়ে তাকে বিদায় করল। দরজা আটকে মিহাল যখন ড্রয়িংরুমের ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল, দেখল সেখানে নীলা নেই। পুরো জায়গাটা ফাঁকা। মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে হলো নীলা নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়েছে, তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েই এখান থেকে চলে গেছে। মিহালের মনে এক তীব্র ভয়ের জন্ম হলো। কারণ, তাদের বিয়ের পর দুজনের মাঝে একটা চুক্তি হয়েছিল সে নীলার স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনোদিনও তাকে ওভাবে স্পর্শ করবে না। যদিও এর আগে চুম্বনের জন্য সে কোনোমতে নীলার মৌন সায় বা অনুমতি পেয়েছিল, কিন্তু আজ আবেগের স্রোতে ভেসে সে বড্ড বেশি করে ফেলেছে। এখন যদি নীলা তাকে আবার ভুল বোঝে? যদি তাকে চিরতরে অবিশ্বাস করে বসে? ভয়ে আর অপরাধবোধে মিহালের হাত কাঁপতে লাগল। সে হাতের পার্সেলটি সোফার ওপর ছুঁড়ে মেরে এক দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে নিজের রুমের দিকে যেতে লাগল। যেভাবেই হোক, নীলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাকে এই ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতেই হবে। সে মনে মনে খুব ভালো করেই জানে,স্বামী হিসেবে নীলাকে ছোঁয়ার সম্পূর্ণ অধিকার তার আছে। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত সে নীলার মনের গহীনের সেই চূড়ান্ত পারমিশন বা ভালোবাসা পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত জোর করে নিজের অধিকার খাটানোর কোনো মানেই হয় না। নীলার বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়াটাই তার কাছে সবচেয়ে বড়।

মিহাল রুমে পা রাখতেই দেখল পুরো ঘরের মেঝে আর বিছানায় নীলার জামাকাপড় এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আলমারির সব কাপড় টেনে বের করে হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজে চলেছে নীলা। তার এই রূপ দেখে মিহালের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। সে ভাবল নীলা হয়তো রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে হন্তদন্ত হয়ে নীলাকে আটকানোর জন্য যেই না তার দিকে এগিয়ে গেল, ঠিক তখনই নীলা কাপড়ের ভাঁজ থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কাগজটা দেখামাত্রই মিহালের চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। এই সেই চুক্তিপত্র, যেখানে লেখা ছিল নীলার অনুমতি ছাড়া সে তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। বিয়ের পর থেকে সে যতবারই নীলার কাছাকাছি আসতে চেয়েছে, ততবারই এই অভিশপ্ত কাগজটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে এবং এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে তাকে নীলার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গেলেও এই একটা কাগজ সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে, মাত্র কয়েক মিনিট আগের সেই গভীর ঘনিষ্ঠতার পর, নীলা কেন নতুন করে এই কাগজটা বের করল তা মিহাল কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারল না। তার মনে হলো, নীলা হয়তো আজ তাকে এই কাগজের দোহাই দিয়ে চিরতরে নিজের জীবন থেকে তাড়িয়ে দেবে। এক বুক যন্ত্রণা আর তীব্র আহত চোখে সে শুধু নীলার দিকে তাকিয়ে রইল। নীলা কি তবে তাকে আর কোনোদিনও ক্ষমা করবে না? সে কি কখনোই তার এই নীলাঞ্জনাকে সম্পূর্ণ নিজের করে আপন মায়ায় পাবে না?

অপরাধবোধ আর ভালোবাসার চরম টানাপোড়েনে, না চাইতেও মিহালের এক জোড়া চোখ নোনা জলে ছলছল করে উঠল। নীলা সোজা মিহালের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। হাতের সেই চুক্তিপত্রটি দুজনের চোখের সমান উঁচুতে তুলে ধরল সে। তারপর এক বিন্দু সময় অপচয় না করে কাগজটা মাঝখান থেকে কুড়মুড় করে ছিঁড়ে দুই ভাগ করে ফেলল। মিহাল পলকহীন চোখে স্তব্ধ হয়ে দেখল সেই দৃশ্য। বুকের ভেতর ধক করে ওঠা এক তীব্র আনন্দের জোয়ারে সে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই তো তার আজন্মের লালিত স্বপ্ন। সেই কবে থেকে সে এই অভিশপ্ত কাগজের টুকরোটাকে নিজের হাত দিয়ে ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলতে চেয়েছিল। যে কাগজের একটা মাত্র শর্ত তাকে প্রতিটা রাতে তার ভালোবাসার নীলাঞ্জনা থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে রাখত, তা তো তার কাছে বিষাক্ত এক দেয়াল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আজ তার সেই অধরা স্বপ্ন পূরণ হলো, তাও আবার খোদ তার নীলাঞ্জনার নিজের হাত ধরে। খুশিতে আর চরম স্বস্তিতে মিহালের এক জোড়া চোখ চকচক করে উঠল। নীলা সেখানেই থামল না, সে কাগজের টুকরোগুলোকে হাতের মুঠোয় নিয়ে একদম কুচি কুচি করে ঘরের বাতাসে উড়িয়ে দিল।

মাথার ওপরে বনবন করে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের বাতাসে সেই সাদা কাগজের টুকরোগুলো ঠিক যেন বরফকুচির মতো তাদের দুজনের মাথার ওপর দিয়ে চক্কর কেটে মেঝেতে ঝরে পড়তে লাগল। কাগজের সেই শুভ্র বৃষ্টির মাঝেই মিহাল আর এক সেকেন্ডের দূরত্ব সইল না। এক লহমায় নিজের বলিষ্ঠ হাত দুটো দিয়ে নীলার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের তপ্ত বুকের ভেতর টেনে নিল। নীলা এইবার আর লজ্জা বা ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল না। বরং সব আড়াল ভেঙে সে মিহালের জলভরা চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখাল। সে যেন নিজের সমস্ত অধিকার মিহালের চোখের মনিতে সঁপে দিল। যেন সে মিহালকে এক সুবর্ণ সুযোগ দিল তার চোখের গভীর ভাষাটা পড়ে নেওয়ার জন্য। যে গভীর ভালোবাসার কথা সে মুখে কোনোদিনও বলতে পারেনি, আর হয়তো কোনোদিনও মুখে উচ্চারণ করার সাহস পেত না, কারণ ভালোবাসার এই অমোঘ স্বীকারোক্তিকে সে বড্ড বেশি ভয় পায়। আজ তা তার চোখের তারায় স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল।

মিহাল তার নীলাঞ্জনার চোখের সেই না-বলা আকুতি আর ভালোবাসার ভাষা এক পলকেই বুঝে ফেলল। বুকের ভেতরের সমস্ত সংশয় আর মেঘ এক নিমেষে কেটে গেল তার। সে পরম তৃপ্তিতে, এক বুক গভীর অধিকার আর ভালোবাসা নিয়ে আবারও নীলার ওষ্ঠাধরের সাথে নিজের ঠোঁটের মিলন ঘটাল। এইবারের চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, কোনো ভয় ছিল না। ছিল কেবল একে অপরকে আজীবনের জন্য নিজের করে নেওয়ার এক অলিখিত, পবিত্র অঙ্গীকার।

ধীরে ধীরে মিহালের স্পর্শ গভীর হতে লাগলো। নীলাও এবার সকল লজ্জা শরম ছেড়ে মিহালের শার্টের অবশিষ্ট দুটি বোতাম খুলে ফেলল। এবং মিহালের শরীর থেকে শার্ট খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলবো। মিহালও কম যায় কিসে? সে নীলাও ওড়না খুলে মাটিতে ছুড়ে ফেললো। ঠোঁট ছেড়ে নীলার গলায় নামতে লাগলে। ধীরে ধীরে নীলার শরীরের উপর তার আধিপত্য বাড়তে লাগলো। নীলা নিজের সম্পূর্ণ শরীরের ভার মিহালের উপর ছেড়ে দিল। মিহাল নীলাকে পাজা কোলে তুলে ধীরে ধীরে বিছানার উপর শুইয়ে দিল। সেখানে নীলার কাপড়-চোপড় ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল। মিহাল সেগুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল। নীলার বুকের ওঠানামা তখন তীব্র। প্রতিটি নিঃশ্বাসে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে তখন এক ঘোর লাগা আবেশে আচ্ছন্ন। কোনোমতে চোখের পাতা সামান্য মেলে, কাঁপতি কণ্ঠে সে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“লাইটটা অফ করে পর্দাটা টেনে দিন না, রুমে বড্ড আলো।”
তার এই লাজুক আকুতিতে মিহালের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মায়াবী হাসি। নীলার দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে, তার অধরকোণে আলতো কামড় কেটে মিহাল উত্তর দিল,
“আমার সারাটা জীবনের অন্ধকার দূর করে যে আলো তুমি নিয়ে এসেছ, আজ তোমাকে নিজের করে পাওয়ার এই পরম ক্ষণে সেই আলো আমি কীভাবে নিভিয়ে দিই, বলো? অন্ধকার নয়, আজ এই সকালের সমস্ত আলো সাক্ষী থাকুক আমাদের এক হওয়ার। আজ কোনো আড়াল থাকবে না নীলা, আলোর এই উৎসবে তোমাকে আমি সম্পূর্ণভাবে দেখতে চাই।”

মিহালের গভীর ভালোবাসার বাণী শুনে নীলার বুকের স্পন্দন যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। তার ওষ্ঠাধর কেঁপে উঠল এক অবাধ্য উষ্ণতায়। একে একে সমস্ত দ্বিধা আর আবরণের দেয়াল ভেঙে মিহাল তাকে জড়িয়ে নিল এক অপার্থিব ভালোবাসার বন্ধনে। সমস্ত জড়তা মুক্ত হয়ে নীলা তখন যেন এক পবিত্র রূপসী। মিহাল অপলক চোখে চেয়ে রইল তার পরম আরাধ্য ‘নীলাঞ্জনা’র দিকে। চোখের পলক না ফেলে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রতিটি ভাঁজে সে অবলোকন করল প্রকৃতির এক শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে। গভীর মুগ্ধতায় নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে সে ফিসফিসিয়ে বলল,

“মা শা আল্লাহ, নীলাঞ্জনা, তুমি বড্ড সুন্দর। এত সৌন্দর্য আমি কোথায় রাখব?”
মিহালের এই তৃষ্ণার্ত প্রশংসায় নীলার ফর্সা মুখমণ্ডল লজ্জার রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে উঠল। সে চোখ দুটি বুজে ফেলল আবেশে। মিহাল আর নিজের আবেগকে বেঁধে রাখতে পারল না। সমস্ত মায়া ও ব্যাকুলতা উজাড় করে সে নীলাকে ভালোবাসার সাগরে ভাসিয়ে দিল। বাইরের মধ্যাহ্নের প্রখর আলো সাক্ষী হয়ে রইল দুই মনের পাশাপাশি দুটি তৃষ্ণার্ত দেহের একাত্মতার। একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার এই খেলায় তারা যেন জাগতিক সবকিছু ভুলে গেল। মিহালের মনে হতে লাগল, যদি সম্ভব হতো, তবে নীলাকে চামড়ার এই দেয়াল ভেঙে নিজের একদম মনের গহীনে আজীবন লুকিয়ে রাখত। তীব্র সুখ আর আবেগের আতিশয্যে নীলার চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল বিছানায়। মিহাল যতবারই তাকে ভালোবাসার অতল গভীরে নিয়ে যাচ্ছিল, ততবারই তার ভালোবাসার তীব্রতার মাঝেও ফুটে উঠছিল এক পরম যত্ন। সে বারবার নীলার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করছিল,

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৪

“ব্যথা পাচ্ছো, নীলাঞ্জনা? তুমি শুধু একবার বলো, আমি আর এক কদমও এগোব না, জান।”
এই পুরুষটিই আজ তাকে নারীত্বের এক পরম পূর্ণতা দিল। সময়ের হিসাব হারিয়ে বহুক্ষণ ধরে চলতে লাগল তাদের এই প্রণয় পর্ব। মিহাল যেন আজ কোনো ক্লান্তির পরোয়া না করে, তার নীলাঞ্জনাকে ভালোবাসার চাদরে মুড়ে দিতেই ব্যস্ত রইল।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here