নূর ই মহব্বত পর্ব ১৮
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
নওমির কথায় আমজাদ সিকদারের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল। অনুশোচনায় দ’গ্ধ হলো মন। তার ভুল ছিলো দ্বিতীয় স্ত্রীকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা! যে মানুষটাকে তিনি বিশ্বাস করে নিজের সংসার তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সে-ই কি না ওনার সাথে এমন জঘন্য প্রতারণা করল? তার মেয়েটা কতগুলো বছর ধরে কষ্ট পেয়েছে অথচ তিনি কিছু জানতেই পারলেন না! কেমন বাবা তিনি!
তিনি নওমির দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
– নওমি! মা আমার, আমায় ভুল বুঝিস না আমি ভাবতে পারি নি আমার আড়ালে এত কিছু হয়ে গেল। তুই ও কোনদিন অভিযোগ করিস নি আমায় তাই…
নওমি হেসে ফেলল। সে আর অভিযোগ? সে হেসেই বললো,
– আমি অভিযোগ করলে তুমি বিশ্বাস করতে? বুঝতে আমায়? আমি চেষ্টা করিনি তোমায় বলার? কিন্তু ততদিনে তোমার মাথায় গেঁথে দেওয়া হয়েছে, “নওমি তার সৎ মাকে মানতে পারছে না!”
আমজাদ সিকদার আঁতকে উঠে বললেন,
– আমি কখনোই এমন ভাবি নাই রে মা! আমি তো দেখতাম শেফালি তোকে কত আদর করে ভালোবাসে। ও তো তোর কত গুণগান করতো! তুইও কিছু বলতিস না তাই আমি ভেবেছি…
– তোমার সামনে তো আদর সবাই করতো! কেউ তো কখনো তোমার সামনে কটু কথা শুনায় নি! সকলের ভাব দেখে মনে হতো তাদের মতো বোধহয় কেউ ভালোবাসে না! কিন্তু তোমার আড়ালে ওদের ভয়ংকর রূপ আমি দেখেছি। তুমি কখনোই বিশ্বাস করতে না এখন যতই বলো। তোমাকে আমি একবার বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেদিন তুমি রাগ দেখিয়ে বলেছিলে আমি মেনে নিতে পারছি না। কারণ তোমাকে কেউ একজন বুঝিয়েছিল আমি তাকে মানতে পারছি না তাই আমি ওনার সাথে বাজে ব্যবহার করছি অথচ এত কিছুর পরও আমি কারো সাথে বাজে ব্যবহার করিনি! যা বানিয়ে বলতো তুমি তাই বিশ্বাস করতে। আমাকে একটা বার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করা যেতো না বাবা? যে আমার কি হয়েছে? যদি করেও থাকি কিছু তাহলে কেন করেছি? কিন্তু তুমি আমাকে দেখলেই রাগ দেখাতে নাহয় মুখ গম্ভীর করে ফেলতে। ওইটুকু বয়সে কেউ জিজ্ঞেস করতো না খেয়েছি কি না! তুমিও না!
নওমির কন্ঠ বুজে আসছে। চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বারবার পলক ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টায় নওমি। এখন কোথাও দুর্বল হলে চলবে না! উপস্থিত আযলানের খুব খারাপ লাগলো। মেয়েটা কম কষ্ট পায়নি ছোট বেলা থেকেই! নওমির বাবা নওমির হাত ধরে বললো,
– আমাকে মাফ কইরা দে মা! আমি অন্ধ হইয়া গেছিলাম বুঝবার পারি নাই! খোদা আমারে এই অন্ধত্বের বিচার করছে মা তোরে হারাইয়া আমি কত কষ্টে ছিলাম মা! আমি কাউরে বুঝাইতে পরিনাই। তোর মতো কইরা কেউ আমারে দেখে রাখে নাই!
নওমি স্মিত হাসল।
– তাই বুঝি দরজায় আমাকে দেখেই চলে যেতে বলছিলে?
আমজাদ সিকদার এর মুখ ছোট হয়ে গেল।
– ওইটা তো রাগ কইরা বলছিলাম আম্মা! আমি তোরে দেখে অনেক খুশি হইছিলাম কিন্তু রাগের জন্যে এমন কইছি। আমারে মাফ কর মা।
নওমি আলতো করে নিজের হাতটা বাবার হাতের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল। ওনার এই কান্নায় আজ নওমির চোখে জল এলেও ভেতরের সেই জমে থাকা পাথরটা সরল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিল। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
– মাফ চাওয়ার কিছু নেই বাবা। আমি এখানে তোমার অনুশোচনা দেখতে আসিনি। তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই। যে দুনিয়াতে এনেছে তাকে কিভাবে রাগ দেখায়? শুধু এটুকুই দেখাতে এসেছি যে, যাকে তুমি তোমার ঘরের রানী ভেবে আগলে রেখেছিলে, সে আসলে একটা বি’ষধর সাপ। যে সাপটা তোমার নিজের মেয়ের আস্ত একটা জীবন বি’ষাক্ত করে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে। আমি কোনো বিচার চাই না। আল্লাহ করবে ওনার বিচার। আমার শুধু প্রশ্ন ওনার কি লাভটা হলো এখানে? শুধুই পৈশাচিক শান্তি? নাকি অন্য কিছু? উত্তর কি আছে?
নওমির এই শান্ত অবহেলার চাদরটা আমজাদ সিকদারের বুকে তীরের মতো গিয়ে বিঁ’ধল। মেয়ে যে এখন নিজ থেকে দুরুত্ব বড়াচ্ছে এটা ওনাকে আরও বেশি ভে’ঙে চুরমার করে দিল। মেয়েটা ছোট থেকে সত্যিই আদরের ছিলো কিন্তু নাজমিন অর্থাৎ নওমির আপন মা মা রা যাওয়ার পর থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করলেও তিনি ব্যর্থ! তিনি পারেন নি মেয়েকে আদর যত্নে বড় করতে। অর্থ বিত্তের কোনো কমতি না থাকলেও মেয়েটাকে অনেক ভুগতে হয়েছে এমনকি এতগুলো বছর কিভাবে কাটিয়েছে সেটাও জানেন না তিনি। তিনি জ্বলন্ত চোখে তাকালেন শেফালির দিকে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে থা’বা দিয়ে চুলের মুঠি ধরলো। তারপর উন্মত্ত পশুর ন্যায় টেনে ওনাকে বারান্দা থেকে উঠোনের মাঝখানে এনে আ’ছাড় মা’রলেন। শেফালি মাটিতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন। তিনি ভয় পেলেও ওনার ভেতরের ধূর্ত স্বভাবটা চট করে গেল না বরং সেভাবেই দ্বিগুণ স্বরে চেঁচিয়ে বললো,
– কার না কার কি কথায় আপনি আমারে মা’রতাছেন? এত বছর ধইরা আপনার সংসার আমি বাঁচাইয়া রাখছি! এই মাইয়ার মা তো কবেই ম’ইরা আমার ঘাড়ে মাইয়া চাপায় দিয়া গেছে!
আমজাদ সিকদার গর্জে উঠলো,
– খবরদার নওমির মা-রে লইয়া কিছু কইবা তো! জিভ টাইন্না ছিঁ’ড়া ফেলমু!
– এখন ওদের লাইগ্যা দরদ বাড়ছে না? এতদিন আমি খাটলাম আর এহন এরা বেশি আপন তাই না? এই কালনা’গিনীর কথায় আমারে অপমান করতাছেন! এই মাইয়া যে অন্য পোলার লগে গেছিল আপনি শুনেন নাই? ওর তো চরিৎ…
আমজাদ সিকদার শেফালির চুল আবার টেনে দাঁড় করিয়ে গালে থাপ্পড় দিয়ে বললো,
– মুখ বন্ধ কর শয়’তানের ঢি’পি! আর একটা মিছা কথা কইলে তোরে আমি জ্যা’ন্ত মাটির তলে পুঁই’তালামু! আমার মাইয়ারে লইয়া একটা বাজে কথা কইলেই খবর আছে। তোর সাহস তো কম না এখনো মুখ চলে! তোর এত বড় সাহস! তুই আমার মায়ডারে আমার থেইকা পর করছিস? তারপরও তুই মাফ পাবি ভাবছস? তোরে আমি আর এই বাড়িতে রাখুম না। বাইর হইয়া যাবি এহান থেইকা। তোর লগে সংসার কইরা এক ভুল করছি এইবার এই বাড়িতে রাইখা কোনো ভুল করমু না। বাইর হবি তুই আইজকাই!
এবার আমজাদ সিকদারের শক্ত গর্জনে ভয় পেল শেফালি। এই মেয়ে লোকটার জান প্রাণ। এতদিন অনেক কসরত করে দূরে সরিয়ে রেখেছিলো এখন তো সব ফাঁ’স হয়ে গিয়েছে না জানি কি করবে!
নওমি একটুও নড়ল না। নিজের সৎ মায়ের এই নির্মম দশা দেখেও তার চোখ দুটো পাথরের মতোই স্থির রইল। কোনো সহানুভূতি বা আনন্দের রেখা ওনার মুখে ফুটল না। যে কষ্ট সে একা একটা কোলের বাচ্চাকে নিয়ে সহ্য করেছে, তার সামনে এই শাস্তি বড্ড সামান্য তবুও সে তো শাস্তি চাইতে আসে নি। সে শুধু চেয়েছিলো সত্যিটা প্রকাশ পাক। কেউ তাকে ভুল বুঝে অপবাদ না দিক। নওমি চোখ সরিয়ে আদনানের দিকে তাকালো যে কি না এখন আযলানের কোলে বসে তার কাঁধে মাথা রেখে আরাম করে সব কিছু দেখছে। ওদের দেখে নওমির বুকের ভেতর কেমন যেন প্রশান্তিতে ভরে গেল। ছেলেটা যে বাবার আদরও পেতে পারে এটা তার কল্পনায় আসে নি। আজকে আযলানই ওদের নিয়ে এসেছে। আদনানকে নিয়েই আগে আসতে চেয়েছিলো কিন্তু আযলান বলেছে ও সামলে রাখবে আগে নওমিকে যেতে। নওমি চিন্তায় ছিলো আদনান থাকবে কি না কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আদনান টু শব্দটুকুও করে নি। এখানে এসেছে পর্যন্ত ওর কোলে আসার জন্যও বায়না করেনি। নওমি একটু হাসলো নিকাবের ভেতরেই। সে এগিয়ে গিয়ে আদনানকে কোলে নিলো। আদনান এতক্ষণ পর মায়ের কোল পেয়ে দুই হাত বাড়িয়ে নওমির গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে মায়ের হিজাব খামচে ধরে ও নিজের চেনা আশ্রয়ে মুখ লুকাল। এতক্ষণের হট্টগোল, চিৎকার আর অপরিচিত পরিবেশ ওকে ভেতরে ভেতরে যেটুকু দুলিয়ে দিয়েছিল, মায়ের বুকে আসতেই সেই ভয়টুকু কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও আড়চোখে একবার পেছনের আযলানের দিকে তাকাল, যে এখনো পরম মমতায় ওর দিকেই চেয়ে আছে। আযলান খালি হয়ে যাওয়া হাত দুটোর দিকে একবার তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমজাদ সিকদার এবং অন্যান্যরা এতক্ষণে খেয়াল করল এখানে একটা বাচ্চা আছে। আমজাদ সিকদার এগিয়ে এসে বললো,
– এইটা কে মা?
নওমি হেসে বললো,
– আমার ছেলে।
সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকালো আদনানের দিকে। এই ছেলে নওমির? তাদের হিসাব যেন মিলছে না! একবার নওমির দিকে আবার আযলানের দিকে তাকাচ্ছে। আযলান হেসে বললো,
– আমাদের ছেলে! আদনান আজওয়াদ।
মুহূর্তেই বিস্ময়ের সীমায় পৌঁছে গেল শেফালি। এতো কষ্ট করলো ওদের আলাদা করতে ওরা এক হয়েই কি না ওকে বাজিমাত দিল!
আমজাদ সিকদার অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বললো,
– এটা তোর ছেলে? আমার নাতি? একটু ছুঁইতে দিবি মা?
এই আবদার মানা করতে পারলো না নওমি। যতই হোক বাবা তো! আদনানকে আমজাদ সিকদারের কোলে দিলো। বেশখানিকক্ষণ ওকে আদর করলো। সময় পেরোল অনেকটা। নওমি সবার দিকে একবার তাকিয়ে বললো,
– এবার আমাদের যেতে হবে।
আমজাদ সিকদার অবাক হয়ে বললো,
– থাকবি না তুই? এত বছর পর এসে থাকবি না আমার কাছে?
নওমি হেসে বললো,
– কোথায় থাকবো আমি? কার কাছে থাকবো? কে আছে আমার?
– এমন কইছ না মা! তুই আমার কাছে থাকবি! এটা তোর বাড়ি আমি তোর বাপ। আমি মাফ চাইতেছি তো! এই বাপে তোরে কত বড় অপবাদ দিছে রে মা! তুই আমারে ক্ষমা না করলে আমি ম’ইরাও শান্তি পামু না!
– আমি তো বলেছি বাবা, তোমার ওপর আমার কোনো রাগ নেই। তুমি শান্ত হও। কিন্তু এই বাড়িতে থাকার মতো মানসিকতা আমার আর কোনোদিন হবে না। থাকতে পারবো না আমি। আমি আমার সত্যটা প্রমাণ করতে এসেছিলাম, তা করা শেষ। এবার যাওয়ার পালা।
আদনানকে আমজাদ সিকদার থেকে নিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি আর আসবো না তোমাদের জ্বা’লাতে। এই মেয়ের দায়িত্ব নেওয়ার ভয়ও তোমাদের পেতে হবে না আর না চরিত্রহীন ট্যাগ পাওয়া মেয়ের ক’লঙ্ক টানার ভয়! ভালো থেকো তোমরা। বাবা, নিজের খেয়াল রেখো। আর হয়তো দেখা হবে না। আমি চাই না আর দেখা হোক! তোমাকে আর “বাবা” ডেকে কষ্ট দিবো না।
আর কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে এক জোড়া পা ছুটে এলো।
– আপু তুমি আবার চলে যাচ্ছ? আমাদের ভুলে যাবে?
নওমি ফটকের কাছে গিয়ে একবার থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে সাইফের অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো একটু। অত্যন্ত স্নেহ জড়ানো গলায় বলল,
– যোগাযোগ রাখিস ভাই। তোর আপু তো ম’রে যায়নি, বেঁচে আছে। কখনো আমার কথা মনে পড়লে ফোন দিস আমার নম্বরে।
সাইফকে নম্বর দিয়ে হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– ভালো থাকিস।
আযলান এতক্ষণ সবটা অবলোকন করছিল। এবার তার যাওয়ার পালা। সে মাটিতে পড়ে থাকা শেফালির দিকে একপলক তাকাল, এরপর আমজাদ সিকদারের দিকে। তিনি যে নিজের হাতে এই বি’ষধর সা পকে তাড়িয়ে ওনার পা’পের শাস্তি নিশ্চিত করবেন, তা ওনার শক্ত চোয়াল দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
আযলান আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পায়ে নওমির পিছু পিছু বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো।
গাড়ি চলছে আপন গতিতে। গাড়ির ভেতর শান্ত সব। নওমি সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে আর আদনান নওমির কোলে ঘুম। আযলান গাড়ি চালাতে চালাতে একবার তাকালো নওমির ক্লান্ত মুখের দিকে। ফ্যাকাশে হয়ে আছে। অনেক কষ্টে যে আপন মানুষগুলোর সাথে শক্ত কথা বলেছে সেটা আযলান ভালো করে জানে! আযলান চোখ সরিয়ে সামনে তাকিয়ে মনে মনে বললো,
নূর ই মহব্বত পর্ব ১৭
– তোমার জীবনের সব অন্ধকার দূর করার একটা ধাপ আজ শেষ হলো। এবার আমাদের পালা, ভালো থাকার! তোমার, আমার আর আমাদের আদনানের এই শূন্য জীবনে সেই হারিয়ে যাওয়া বসন্ত নতুন করে আবার ফিরে পাওয়ার!
