Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৭

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৭

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৭
রূপন্তী সরকার

বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে হনহন করে উপরে চলে গেলো। বাহিরে যদিও অনেক ঠান্ডা কিন্তু ঋশের পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পাতলা টি-শার্ট টা একটানে খুলে ফেললো। এরপর ইয়াশফার রুমে ডুকলো। ঘরে কেউ নেই। ইয়াশফা ঘুমিয়ে আছে ঋষভ গিয়ে ওর মাথার কাছে চালতা গুলো রেখে আলতো করে ইয়াশফার মাথায় হাত রেখে বললো “এই মেয়ে উঠো”
ইয়াশফা কোনো সাড়া শব্দ করলো না। ঋষভ আবারো বললো “এই ক্যাকটাস কথা কানে যাচ্ছে না?”
কথাটা একটু ধমকের সুরে বলায় ইয়াশফা ধরপরিয়ে ওঠে গেলো ঋষভ তাড়াতাড়ি করে বললো ” ভয় পেও না আমি আছি”

ইয়াশফা চোখ ডলতে ডলতে বললো “কি হয়েছে? এতোরাতে কেনো ডাকছেন?”
ঋষভের খুব রাগ হলো। ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো “আচার খাবে না?”
ইয়াশফা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। ঋষভ আচারের প্যাকেট খুলে ইয়াশফার হাতে দিলো। ইয়াশফা এক টুকরো চালতা মুখে দিয়েই ওয়াক করে উঠলো। ঋষভ ওর হাত ইয়াশফার মুখের কাছে নিয়ে বললো “এইখানে ফেলো। কি হয়েছে খেতে ভালো লাগছে না?”
ইয়াশফা মাথা নাড়িয়ে বললো “না ভালো না এটা। আমি আমার বাড়ির গাছের চালতা খাবো”

ঋষভ রাগি চোখে ইয়াশফার দিকে তাকালো৷ এই মেয়েকে কি করতে মন চাইবে? এতো কষ্ট করে এতো রাতে ডাকাতি করে আচার নিয়ে আনলো অথচ এই মেয়ের নাকি এটা ভালো লাগছে না। এতো রাতে ওই গ্রামে গিয়ে আচার আনা সম্ভব? রাত বাজে প্রায় ২:৫৫। মেয়েটা ওকে জ্বালিয়ে খাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতেই ঋষভের মনে হলো। এই মেয়ের জন্য ওর এতো কিসের দরদ? ও পারবে না এসব করতে। এই মেয়ে কি ওকে চাকর পেয়েছে?
ঋষভ ইয়াশফাকে বললো “আমি তোমার চাকর না। এটা খেলে খাও না খেলে ঘুমিয়ে পড়ো।”
কথাটা বলেই হনহন করে চলে গেলো। ইয়াশফা ঋষভের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ইয়াশফা কখন বললো ঋষভ ওর চাকর? ও শুধু বলেছে এই আচার ভালো না। ওর গাছের কাঁচা চালতা ভালো। এই কথাটা বলাও কি দোষ? ইয়াশফা কি এই লোকটাকে বলেছিলো আচার আনতে? ইয়াশফা মুখ ভার করে ঋশের আনা আচার গুলো খেতে লাগলো৷

এরমধ্যেই দরজা খুলে মিহি রুমে আসলো। মিহির চোখে ঘুম নেই। একটু পরপর এসে ইয়াশফাকে দেখে যাচ্ছে। রিদ মিহিকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এই কারনে মিহি ওর রুমে চলে যাচ্ছে নাহলে ইয়াশফার কাছেই থাকতো। যদিও মিহি ইয়াশফার কাছে থাকলে রিদ কিছুই বলবে না। কিন্তু তবুও মিহি থাকলো না। একবার নিজের রুমে যাচ্ছে আরেকবার ইয়াশফার রুমে আসছে৷ বার বার এসে ইয়াশফার জ্বর চেক করে যাচ্ছে। মিহি এসে দেখে ইয়াশফা আচার খাচ্ছে। মিহি অবাক হলো। মেয়েটা এতো রাতে আচার কই পেলো? মিহি গিয়ে জিজ্ঞেস করলো
“তোমাকে কে আচার দিলো মা?”
ইয়াশফা মিনমিন করে বললো “আপনার ছেলে এনে দিয়েছে”
মিহি অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো। এটা কিভাবে সম্ভব? মিহি কি সপ্ন দেখছে? মিহি নিজের হাতে নিজে একটা থাপ্পড় দিয়ে দেখলো যে না এটা সপ্ন না এটা বাস্তব। ঋষভের এই পরিবর্তন মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ঋষভ কি তাহলে ইয়াশফাকে মেনে নিলো? হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মিহির মনে। মিহি ইয়াশফাকে বললো “কখন এনে দিলো?”

ইয়াশফা আস্তে করে বললো “একটু আগে”
মিহি মুচকি হেসে বললো “কেমন লাগছে খেতে? এখন একটু ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দেই?”
ইয়াশফা মুখ কালো করে বললো “এই আচারটা মজা না। আমি আমার বাড়ির গাছের কাঁচা চালতা খেতে চাই”
মিহি ঠান্ডা গলায় বললো “আচ্ছা কালকে সকালে শুভ্র বা অদ্রীতকে দিয়ে আনাবো। ঠিক আছে মা? এখন একটু ভাত মাখিয়ে আনি? অল্প করে খেয়ে নাও?”
মিহির এতো মায়া মাখা কন্ঠ শুনে ইয়াশফা না করতে পারলো না। ও জানে খেলে হয়তো বমি হয়ে যাবে তারপরেও মিহিকে না করার মতো সাহস হলো না। ও তো কখনো মায়ের আদর পায় নি। তাই মায়ের আদরের প্রতি ওর খুব লোভ। ইয়াশফা মাথা নাড়িয়ে বললো “আচ্ছা”
মিহি ইয়াশফার মাথায় একটা হালকা চুমু দিয়ে খাবার আনতে গেলো।

এইদিকে ঋষভ ইয়াশফার রুমে ওর বাইকের চাবিটা ফেলে গেছে সেটাই নেওয়ার জন্য এসেছিলো। এমন সময় মিহির মুখে শুনলো সকালে শুভ্র বা অদ্রীত কে ইয়াশফার গ্রামে পাঠাবে চালতা আনতে। কথাটা শুনে কেনো জানি মেজাজ গরম হয়ে গেলো। ওরা কেনো যাবে? একটুপর ওর মনে হলো শুভ্র আর অদ্রিত গেলে ওর কি? ওর তো কিছু যায় আসে না। ঋষভ রুমে ডুকে দেখলো ইয়াশফা ওর দেওয়া আচার গুলো খাচ্ছে। ঋষভ টেবিলের উপর থেকে বাইকের চাবি নিয়ে ইয়াশফার কাছে গিয়ে দাড়ালো। এরপর গম্ভীর গলায় বললো “এই আচার নাকি ভালো না তাহলে খাচ্ছো কেনো? দাও খেতে হবে না”
কথাটা বলেই ইয়াশফার মুখে হাত ডুকিয়ে সব আচার বের করে নিলো। এরপর হনহন করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। ইয়াশফা মগার মতো ঋষভের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।
একটু পর মিহি খাবার হাতে নিয়ে রুমে আসলো। ইয়াশফাকে হা করে বসে থাকতে দেখে মিহি জিজ্ঞেস করলো “কি হয়েছে মা?”

ইয়াশফা বললো “আচ্ছা আন্টি জলহস্তী গুলো এতো খারাপ কেনো হয়?”
মিহি ইয়াশফার কথার মানে বুঝলো না। তারপরেও হালকা হেসে বললো “তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও নাহলে জলহস্তীর কাছে পাঠিয়ে দিবো”
ইয়াশফা একটা ঢোক গিললো। দরকার পড়লে সারারাত খাবে তবুও এইরকম জলহস্তির কাছে যাবে না। মিহি বড়ো বড়ো লোকমা ইয়াশফার মুখে দিলো ইয়াশফা খাবার মুখে নিয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে দিন দুনিয়ায় সব কিছু ভুলে গেছে।
একটুপর নিচ থেকে বাইকের শব্দ কানে আসতেই মিহি বেলকুনিতে গেলো। দেখলো ঋষভ এতো রাতে বাইক নিয়ে কোথাও একটা গেলো। মিহি দাড়িয়ে থেকে দেখলো। এতো রাতে ছেলেটা কোথায় গেলো? মিহির টেনশন হচ্ছে। ইয়াশফা রুম থেকে বললো “কে বাহিরে গেলো আন্টি?”

মিহি বেলকুনির দরজা লাগিয়ে দিয়ে বললো “ঋশ”
ইয়াশফা বললো “এতো রাতে কোথায় গেলো?”
মিহি গম্ভীর গলায় বললো “জানিনা তো। ছেলেটাকে নিয়ে আমি আর পারছি না।”
মিহি চোখ মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এইদিকে….
ঋষভ জোড়ে জোড়ে গাড়ি চালাচ্ছে। পুরো রাস্তা ফাঁকা। ইয়াশফার গ্রামে যেতে ২০ মিনিট লাগে। ঋষভ এর আগে গেছে তাই গ্রামটা চিনে। কিন্তু ইয়াশফার বাড়ি তো চিনে না। ওর বাড়ি কি করে খুঁজবে এতোরাতে? এসব ভাবতে ভাবতেই গেয়ে উঠলো
“এই ভাঙাচোরা বুক নিয়ে, অবাধ্য অসুখ নিয়ে,
সপ্নে রাখা মুখ চলছে খুঁজে…
ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা ভরা রাস্তাতে নেমেছে রাজপাখি খালি হাতে
কানামাছি খেলে যায় কার সাথে মুখ বুজে…
দুই পৃথিবী কিসের চাহিদায় ঘরছাড়া…

এতো রাতে পুরো গ্রাম অন্ধকার তবে গ্রামের ডুকার পথে একটা মোড় পড়ে সেখানে হালকা আলো জ্বলছে। ঋষভ বাইক নিয়ে সোজা মিহির মামার বাড়িতে চলে গেলো। মিহির মামার বাড়ি চিনতে ঋষভের ভুল হলো না। ঋষভ গিয়ে দরজা ঠকঠক করলো। ভেতর থেকে ঘুমন্ত কন্ঠে মিহির ভাই রাজ বলে উঠলো ” কে রে এতো রাতে”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো “আমি”
রাজ হাই তুলতে তুলতে বলল “আমি কে? কোন আমি?”
ঋষভ একটু জোড়ে বললো “ঋষভ রায়ান চৌধুরী”
রাজ হুরমুর করে দরজা খুললো। এতো রাতে ঋষভকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। রাজ ভিতু কন্ঠে বললো “বাবা এতো রাতে তুমি? কারো কিছু হয় নি তো?”
ঋষভ ঠান্ডা গলায় বললো “নো। আমার একটা হেল্প লাগবে”
রাজ বললো “কি বলো?”

ঋষভ গম্ভীর ভাবে বললো “ওর বাড়িটা চিনিয়ে দিন”
রাজ অবাক হয়ে জানতে চাইলো “ও কে?”
ঋষভ বললো “ওই যে ওই মেয়েটা”
রাজ অবাকের পর অবাক হচ্ছে। কোন মেয়ের কথা বলছে এই ছেলে? রাজ মিনমিন করে বললো
“কোন মেয়েটা বাবা?”
ঋষভ বিরক্ত নিয়ে বললো “আরে ক্যাকটাসের বাড়ি কোনটা?”
রাজের চিক্কুর দিয়া কান্না করতে ইচ্ছে করলো। এই ক্যাকটাসটা আবার কে? রাজ কাঁদো কাঁদো গলায় বললো “বাবা তুমি কার কথা বলছো?”
ঋষভের আসলে ইয়াশফার নামটা মনে নেই। ও তো কখনো ইয়াশফার নাম ধরে ডাকে নি। এতো বড়ো নাম কি মনে রাখা যায়? শুধু নামের শুরু টুকু মনে আছে। ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো
“ইয়াশের বাড়িটা চিনিয়ে দিন”

রাজ কিছুক্ষণ ভাবার পর আন্দাজ করে বললো “ইয়াশ মানে ইয়াশফার কথা বলছো বাবা?”
ঋষভ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। রাজ ঋষভকে নিয়ে ইয়াশফার বাড়িতে নিয়ে গেলো। রাজ গিয়ে ইয়াশফারদের দরজায় নক করবে এমন সময় ঋষভ বললো “ওদের ডাকার দরকার নেই। আমাকে শুধু চালতা গাছটা চিনিয়ে দিন। আমি চালতা নিয়ে চলে যাবো”
রাজ অবাকের শেষ সীমাই পৌঁছে গেলো। রাত বাজে ৩:৪৫ এতো রাতে কেউ চালতা নিতে শশুড় বাড়ি আসে? রাজ ঋষভকে প্রশ্ন করার সাহস পেলো না। চুপচাপ চালতা গাছ চিনিয়ে দিলো। ঋষভ একটা লাঠি নিয়ে চালতার গাছে বারি দিতেই দুইটা বড়ো বড়ো চালতা নিচে পড়লো। ঋষভের পায়ের কাছে কিছু একটা বাধতেই দেখতে পেলো একটা হরিণ। ঋষভ অনেক অবাক হলো। এই গ্রামে হরিণ কই থেকে আসলো? হরিণটা সিং দিয়ে ঋষভের পায়ে গুতা দিচ্ছে। ঋষভ হরিণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। এরপর আরো কয়েকটা চালতা পেরে বাইকে উঠে গেলো। মাথায় হেলনেট পড়ে নিলো। রাজ এক সাইডে দাড়িয়ে ছিলো। রাজকে ইশারায় ডেকে নিজের কাছে ডাকলো। এরপর বললো

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৬

“আমার শশুর ঘুম থেকে উঠলে বলবেন তার জামাই কয়েকটা চালতা নিয়ে গেছে। কারণ আমার বউ এই গাছের চালতা খেতে চেয়েছে। এই টাকা গুলো উনাকে দিয়ে দিবেন। ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিলাম”
রাজ কিছু বলার আগেই ঋষভ বাইক নিয়ে চলে গেলো। এইদিকে রাজ ভাবতে লাগলো এই ছেলেকে কি কোনো জ্বিনে ধরেছে নাকি?

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১৮

1 COMMENT

Comments are closed.