Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত শেষ পর্ব

প্রণয়ের ঘোর রাত শেষ পর্ব

প্রণয়ের ঘোর রাত শেষ পর্ব
আরাফাত আদনান সামি

​“আচ্ছা ব্রো এর পেছনে তোর পুরোনো শত্রু ‘লতিফ শিকদার’ এর হাত নেই তো?”
​‘লতিফ শিকদার’ নামটা শুনতেই কৌশিকের হাতটা ফাইলের ওপর থমকে গেল। ওর চোখের মনিতে এক তীব্র ক্রুরতা আর হিংস্রতা ফুটে উঠল। লতিফ শিকদার হলো এই শহরের পুরোনো ড্রাগ লর্ড, যে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কৌশিকের চৌধুরী সাম্রাজ্যের কারণে কোণঠাসা হয়ে আছে। ও দীর্ঘদিন ধরে সুযোগ খুঁজছিল কৌশিককে আঘাত করার।

​“লতিফ…”
কৌশিক নিছু, বিপজ্জনক গলায় হাসল।
“বুড়ো শকুনের ডানা বড্ড বেশি গজিয়েছে দেখছি। ও ভেবেছে আমার বোনকে হাত দিয়ে ও বেঁচে যাবে? আর মায়া… মায়ার ওপর যে গুলিটা চলেছিল, ওটাও কি লতিফের লোকই চালিয়েছিল?”
রোহিত মাথা নাড়ল,
​“হয়তো হ্যাঁ ভাইয়া। কারণ এই দেখো বন্দুকের উপর ‘রেড ডট’ চিহ্ন। আমার জানা মতে এই চিহ্ন ওর সব চেলাদের বন্দুকে থাকে নিজের লোকদের সহজে চেনার জন্য। এইবার বুঝতে পারলাম। লতিফের প্ল্যান ছিল তিয়াশাকে ব্যবহার করে আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া। লোক সমাজে আমাদের বংশের উপর কলঙ্ক লেপ্টে দেওয়া। কিন্তু ভাবি মাঝখানে চলে আসায় প্ল্যানটা ভেস্তে যায়। আর হ্যাঁ ভাইয়া আমি জানতে পেরেছি ওকে কিছুদিন ধরে শহরের দেখা যাচ্ছে না। তার মানে স্পষ্ট ওই এই কাজ করেছে। ও জানে তুমি একবার জানতে পারলে তুমি ওকে ছাড়বে না তাই আগে আগেই শহর ছেড়েছে।”
​কৌশিক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ও জানালার কাছে গিয়ে বাইরের বিশাল বাগানের দিকে তাকাল, যেখানে মায়া,তিয়াশা আর নিধি তিনজনে মিলে হাঁটছে। মায়ার সেই শাড়ির আঁচলটা বাতাসের দোলায় উড়ছে। মায়াকে দেখলেই কৌশিকের ভেতরের হিংস্রতা একটু শান্ত হয়, কিন্তু একই সাথে ওর মনে হয়, যে লতিফ মায়ার শরীরে রক্ত ঝরিয়েছে, তাকে ও এত সহজে মরতে দিতে পারে না। কৌশিক না ঘুরেই হুকুমের স্বরে বলল,
​“রোহিত, আজ রাতের মধ্যে লতিফ শিকদারের যতগুলো ড্রাগের গোডাউন এই শহরে আছে, সবকটা জ্বালিয়ে ছারখার করে দে। একটা ইটের ওপর যেন আরেকটা ইট আস্ত না থাকে। আর লতিফের ডান হাত ‘কাদের’-কে জ্যান্ত তুলে নিয়ে আয় আমার টর্চার সেলে। আমি নিজে ওর চামড়া ছাড়িয়ে জিজ্ঞেস করব, লতিফ কোথায় লুকিয়ে আছে।”

​“হয়ে যাবে ভাইয়া।”
রোহিত নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করল।
“আজ রাতেই শহরে চৌধুরী বংশের আসল তাণ্ডব দেখবে সবাই। লতিফ শিকদার বুঝতে পারবে, বাঘের খাঁচায় হাত দেওয়ার পরিণতি কী হয়।”
​“আর একটা কথা…”
কৌশিক ঘুরল। ওর চোখ দুটো বড্ড তীক্ষ্ণ।
“বাড়ির নিরাপত্তা দ্বিগুণ কর। বিশেষ করে মায়া আর তিয়াশার চারপাশে যেন ২৪ ঘণ্টা বডিগার্ড থাকে। লতিফ কোণঠাসা হয়ে আবার কোনো মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আমি আমার জীবনের এই একমাত্র অক্সিজেনকে আর কোনো বিপদের মুখে ফেলতে পারব না।”
​“তুমি চিন্তা করো না ভাইয়া। বাড়ির সবার সুরক্ষার দায়িত্ব আমার নিজের। এক ফোঁটা খারাপ বাতাসও ওদের ছুঁতে পারবে না।”
কথাটি বলে রোহিত স্টাডি রুম থেকে বের হয়ে গেল।

​বিকেল ৫টা। চৌধুরী ভিলার পেছনের বড় বাগানের ফোয়ারার পাশে নিধি একা দাঁড়িয়ে ছিল। বিকেলের ঠান্ডা হাওয়া ওর চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল। ও নিজের মনের ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই কমাতে পারছিল না। এই চৌধুরী ভিলার রাজকীয়তা, অস্ত্র, মাফিয়া লাইফস্টাইল সবকিছু ওর সাধারণ মধ্যবিত্ত মানসিকতার সাথে খাপ খাচ্ছিল না। ও এখানে বড্ড দমবন্ধ অনুভব করছিল।
​“একা একা দাঁড়িয়ে কার কথা ভাবা হচ্ছে, নিধি পাখি? আমার নাকি অন্য কারো?”
​পেছন থেকে সেই চেনা, ড্যাশিং আর কিছুটা অহংকারী গলাটা শুনতেই নিধির পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। ও ঘুরে তাকাতেই দেখল রোহিত ওর থেকে মাত্র দু-পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর পরনে এখন একটা কালো শার্ট, চোখের চশমাটা ও শার্টের কলারে ঝুলিয়ে রেখেছে। ওর এই লুকে আক্ষরিক অর্থেই এক রাজপুত্র মনে হচ্ছিল ওকে। নিধি দুই পা পিছিয়ে গিয়ে রাগী গলায় বলল,

“আপনাকে কতবার বলেছি মিস্টার রোহিত চৌধুরী, আমার পার্সোনাল স্পেসে এভাবে বারবার ঢুকবেন না। আপনার কি কোনো কাজ নেই? সারাদিন শুধু আমার পেছনে কেন ঘুরঘুর করেন?”
​রোহিত হাসল। ও নিজের পকেটে হাত গুঁজে নিধির আরও এক পা কাছে এগিয়ে এল।
“এই বিকেলটা আমি শুধু তোমার জন্যই বরাদ্দ রেখেছি।”
​“আমার আপনার বরাদ্দের কোনো দরকার নেই।”
নিধি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু রোহিত এক ঝটকায় নিধির নরম হাতটার কবজি ধরে আটকে দিল। ওর হাতের গ্রিপটা এত শক্ত ছিল যে নিধি এক নিমেষে বুঝতে পারল, এই লোকটা শুধু ইয়ার্কি-ফাজলামিই করে না, এর ভেতরের মাফিয়া রক্তটাও বড্ড বিপজ্জনক।
​“ছাড়ুন আমার হাত! ব্যথা পাচ্ছি আমি!”
নিধি চিৎকার করে উঠল। ​রোহিত নিধিকে নিজের দিকে টেনে এনে একদম ওর চোখের মুখোমুখি দাঁড় করাল। ওর চোখের মনিতে তখন এক তীব্র জেদ আর গভীর অধিকারবোধ দাউদাউ করে জ্বলছিল।
​“ব্যথা পাচ্ছো? এই ব্যথার অভ্যাস করে নাও নিধি। কারণ এই হাত আমি একবার যখন ধরেছি, ছাড়ার জন্য ধরিনি। তুমি নিজেকে যত বড় এটম বোমই মনে করো না কেন, মনে রেখো, আমি সেই ডিনামাইট যে তোমাকে এক নিমিষে নিজের ভালোবাসায় ব্লাস্ট করে দিতে পারে।”
​নিধি নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে রোহিতের দিকে তাকাল। ওর বুকটা রাগে আর এক অজানা শিউরে ওঠায় দ্রুত কাঁপছিল।

“আপনি একটা পাগল! আপনি জানেন আপনার বয়স কত? পঁচিশ বছর! আর আমি মাত্র সতেরো বছরের একটা মেয়ে। আপনার লজ্জা করে না আমার মতো একটা বাচ্চার পেছনে এভাবে মাফিয়াগিরি দেখাতে?”
​রোহিত নিচু গলায় হো হো করে হেসে উঠল। ওর এই হাসিতে এক অদ্ভুত মাদকতা ছিল। ও নিধির কানের কাছে মুখ নামিয়ে বড্ড গম্ভীর আর ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল,
“বয়স তো মাত্র একটা সংখ্যা, নিধি পাখি। আর তুমি বাচ্চা নও, তুমি আস্ত একটা ধারালো ছুরি, যা আমার এই ছন্নধারা হৃদয়ের মাঝখানে এসে বিধে গেছে। চৌধুরী বংশের ছেলেদের রক্তে একটা নিয়ম আছে আমরা যা একবার পছন্দ করি, তা দুনিয়া উল্টে গেলেও নিজের করেই ছাড়ি। কৌশিক ভাইয়া মায়াকে নিজের করে নিয়েছে, আর আমি তোমাকে আমার এই অন্ধকার জীবনের রানি বানিয়ে ছাড়ব। আজ রাতটা পার হতে দাও, কাল সকাল থেকে তুমি বুঝতে পারবে রোহিত চৌধুরীর আসল ঘোর কাকে বলে।”
​নিধি রোহিতের চোখ থেকে নিজের চোখ সরাতে পারছিল না। ও বুঝতে পারছিল, এই লোকটার মায়াবী কথার আড়ালে এক ভয়ানক জেদ লুকিয়ে আছে, যা মায়ার বরফশীতল স্বামী কৌশিকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। নিধি নিজের হাতটা এক ঝটকায় মুক্ত করে নিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে ওখান থেকে দৌড়ে চলে গেল। রোহিত নিধির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসল। ও পকেট থেকে ফোনটা বের করে নিজের এসিস্ট্যান্ট ‘সুমন’-কে কল দিল।
“সুমন, রাতের অপারেশনের সব রেডি তো? আজ লতিফ শিকদারের পুরো রাজত্ব গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আজ কোনো ভুল যেন না হয়।”
ওপাশ থেকে সুমন বলল,
“ঠিক আছে বস।”

​সন্ধ্যা ৭টা। ঘরের ভেতরে ডিম লাইটের হালকা নীলচে আলো জ্বলছে। মায়া বিছানায় বসে একটা বই পড়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ওর মন কিছুতেই বইয়ের পাতায় বসছিল না। টেবিলের ওপর রাখা ঘড়ির টিকটিক শব্দটা ওর ভেতরের ভয়টাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ও শুনেছে যে কৌশিক আর রোহিত আজ রাতে কোনো এক জরুরি ‘অপারেশনে’ বের হবে। ​‘অপারেশন’ শব্দটা শুনলেই মায়ার চোখের সামনে সেই হসপিটালের রক্তাক্ত দৃশ্য, গুলির আওয়াজ আর সেই তীব্র যন্ত্রণার স্মৃতি ভেসে ওঠে। ও জানে কৌশিক একজন মাফিয়া লিডার, ওর জীবনটা সাধারণ নয়। কিন্তু এখন, যখন ও কৌশিককে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে, তখন কৌশিকের সামান্য কোনো বিপদের কথা ভাবলেই ওর বুকটা ফেটে যায়।
ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে কৌশিক ভেতরে ঢুকল। ওর পরনে এখন সম্পূর্ণ কালো পোশাক একটা কালো ট্যাকটিক্যাল টি-শার্ট এবং কালো কার্গো প্যান্ট। কোমরের হোলস্টারে একটা চকচকে ৯এমএম পিস্তল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওর মুখের সেই চিরচেনা গম্ভীর, নিষ্ঠুর মাফিয়া ভাবটা এখন পুরোপুরি ফিরে এসেছে। ​কৌশিককে এই লুকে দেখেই মায়া বিছানা থেকে নেমে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে ছলছল করে উঠল।

​“আপনি আবার যাচ্ছেন?”
মায়ার গলার স্বর কাঁপছিল।
“আবার সেই রক্তের খেলা? আবার সেই গুলির লড়াই? আপনি কি এই জীবনটা কোনোদিন ছাড়তে পারবেন না?”
​কৌশিক মায়ার এই ছলছল চোখ দেখে নিজের ভেতরের সমস্ত কঠোরতা হারিয়ে ফেলল। ও টেবিলের ওপর নিজের পিস্তলটা রাখল এবং মায়ার দুই কাঁধ ধরে ওকে নিজের কাছে টেনে নিল। ও নিজের কপালটা মায়ার কপালে ঠেকাল।কৌশিক বড্ড নরম গলায় বলল,
​“ভয় পাচ্ছিস, হার্টবিট?”
​“পাব না?”
মায়া কৌশিকের বুকে নিজের ছোট হাত দুটো রেখে ওর শার্ট খামচে ধরল।
“যে মানুষটা কাল রাতে আমাকে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে রেখে মরার মতো ভালোবাসল, সেই মানুষটা আজ রাতে অন্য কারো রক্ত ঝরাতে যাচ্ছে এটা ভাবলে আমার কতটা কষ্ট হয়, তা কি আপনি বুঝবেন না? এইসবের মধ্যে যদি আপনার কিছু হয়ে যায়? যদি ওরা আবার কোনো…”
​মায়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই কৌশিক মায়ার ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুলটা চেপে ধরল। ওর চোখে এক পরম আদর আর অন্ধ ভালোবাসার গভীরতা।
​“চুপ! একদম চুপ! তোকে বলেছি না, অশুভ কিছু মুখে আনবি না? কৌশিক নীর চৌধুরী এত সহজে মরার জন্য জন্মায়নি মায়া। লতিফ শিকদার আমাদের বাড়ির মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে, আর সবচেয়ে বড় অপরাধ ও আমার প্রাণ,আমার জান, আমার মায়ার শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়েছে। যে হাত আমার মায়ার ক্ষতি করেছে, সেই হাত এই দুনিয়ায় আস্ত থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি আজ লতিফকে এটা বোঝাতে যাচ্ছি যে, চৌধুরী সাম্রাজ্যের রানির দিকে তাকালে তার পরিণতি কী হয়।”

​মায়া কৌশিকের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
“আমি আপনার কোনো সাম্রাজ্য চাই না, কোনো চৌধুরীর বংশের বড় বউয়ের সম্মান চাই না। আমি শুধু আপনাকে সুস্থ দেখতে চাই। আমার বড্ড ভয় করছে,.. বড্ড ভয় করছে। এইসবের কোন দরকার নেই প্লিজ থেকে যান না আমার কাছে।”
​কৌশিক মায়াকে নিজের দুই বাহুর মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ও মায়ার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে ওর চুলে একটা গভীর চুমু খেল।

​“তোর এই ভয়টাই আমার শক্তির উৎস, সুইটহার্ট। তুই ঘরে বসে শুধু আমার জন্য দোয়া কর। আমি তোকে কথা দিচ্ছি, কাল সকালের সূর্য ওঠার আগেই আমি অক্ষত শরীরে আবার তোর এই বুকে ফিরে আসব। আর কাল পুরো দিনটা আমি শুধু তোর এই ঘরের ভেতরেই কাটাব, যেমনটা আমি সকালে কথা দিয়েছিলাম।”
​কৌশিক মায়ার মুখটা সামান্য তুলল। ও মায়ার চোখের জল নিজের ঠোঁট দিয়ে আলতো করে শুষে নিল। অতঃপর মায়ার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর এক সংক্ষিপ্ত অথচ বড্ড গভীর, বিদায়ী চুম্বন এঁকে দিল। এই চুম্বনে কোনো কামনার উগ্রতা ছিল না, ছিল এক পরম দায়িত্ব আর ফিরে আসার দৃঢ় অঙ্গীকার। কৌশিক মায়াকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নিজের পিস্তলটা কোমরে গুঁজে নিল। ও ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো ঘুরে তাকাল।
​“নিজের খেয়াল রাখিস, হার্টবিট। দরজা ভেতর থেকে ভালো করে লক করে রাখবি।”
​কথাটি বলেই কৌশিক ঘরের লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারের মাঝে বিলীন হয়ে গেল। মায়া বিছানার চাদরটা শক্ত করে ধরে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে রাতের কালো অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছিল। ও মনে মনে আল্লাহর কাছে শুধু একটা প্রার্থনাই করতে লাগল,
“হে আল্লাহ, আমার এই অসভ্য, পাগল মানুষটাকে তুমি সহিহ-সালামতে আমার বুকে ফিরিয়ে দিও।”

​রাত তখন ১টা বেজে ৩০ মিনিট। শহরের উপকণ্ঠে লতিফ শিকদারের সবচেয়ে বড় ড্রাগ গোডাউনটি এখন চারদিক থেকে চৌধুরী বংশের কালো রঙের এসইউভি (SUV) গাড়িগুলো দিয়ে অবরুদ্ধ। চারদিকের পরিবেশ বড্ড নিঝুম, শুধু মাঝে মাঝে দূর থেকে কুকুরের ডাক শোনা হচ্ছিল। ​গাড়ির দরজা খুলে নিচে নামল কৌশিক এবং রোহিত। দুজনের হাতেই এখন কড়া লেভেলের অটোমেটিক rifle। ওদের পেছনে প্রায় ৫০ জন সশস্ত্র বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে, যাদের চোখে শুধু মৃত্যুর পরোয়ানা।
​“রোহিত…”
কৌশিক নিজের রাইফেলের সেফটি লকটা অন করল।
“ভেটারে লতিফের প্রায় ৩০ জন লোক আছে। কোনো ওয়ার্নিং দেওয়া হবে না। যে সামনে আসবে, সরাসরি মাথার মাঝখানে গুলি করবি। আজ লতিফকে একটা মেসেজ দিতে হবে, যা দেখে ও যেন নিজের আস্তানার ভেতরেই ভয়ে মূর্ছা যায়।”
​“বুঝে গেছি ব্রো। ধামাকা শুরু করা যাক!”

রোহিত এক ক্রুর হাসি হাসল। কৌশিকের এক ইশারায় চৌধুরী বংশের শার্পশুটাররা গোডাউনের মেইন গেটটা এক শক্তিশালী ব্লাস্ট দিয়ে উড়িয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা কেঁপে উঠল এক বিকট শব্দে। ধোঁয়ার কুন্ডলী ভেদ করে কৌশিক আর রোহিত ভেতরে ঢুকল। ​ভেতরে থাকা লতিফ শিকদারের লোকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেল চৌধুরী বংশের রক্তের হোলি খেলা। কৌশিকের রাইফেল থেকে অনবরত গুলি বের হতে লাগল। প্রতিটা গুলির সাথে সাথে লতিফের এক একজন লোক মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। কৌশিকের চোখের সেই বরফশীতল ক্রুরতা আজ আক্ষরিক অর্থেই এক যমদূতের মতো লাগছিল। ওর গায়ের কালো শার্টে ছিটকে আসছিল শত্রুদের রক্ত, কিন্তু সেদিকে ওর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ওর মাথায় শুধু মায়ার সেই ছলছল চোখের ছবি ঘুরছিল। রোহিত অন্য পাশ থেকে নিজের ডিনামাইট স্টাইল দেখাচ্ছিল। ও ডাইভিং দিয়ে এক পিলারের আড়ালে গিয়ে তিনজনকে এক সাথে ব্রাশফায়ার করে উড়িয়ে দিল। ওর মুখে সেই ড্যাশিং মাফিয়া হাসিটা তখনো ছিল, তবে চোখের মনিতে ছিল নিখাদ হিংস্রতা। ​মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পুরো গোডাউনটি লতিফ শিকদারের লোকদের লাশে পরিণত হলো। চারদিকে শুধু তাজা রক্তের গন্ধ আর বারুদের ধোঁয়া। গোডাউনের এক কোণে লতিফের ডান হাত ‘কাদের’ পায়ে গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। ও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পেছনের দিকে সরার চেষ্টা করছিল। কৌশিক ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কাদেরের বুকের ওপর নিজের ভারী বুট জুতোটা রাখল। বুটের চাপে কাদেরের মুখ থেকে এক রক্তাক্ত আর্তনাদ বেরিয়ে এল।

​“ক-কৌশিক ভাই, আমাকে মাফ করে দেন,আমি শুধু লতিফ ভাইয়ের হুকুম তামিল করছিলাম…”
কাদের অনুনয় করতে লাগল। কৌশিক একটু ঝুঁকে নিজের রাইফেলের নলটা সরাসরি কাদেরের কপালে ঠেকাল। ওর গলার স্বর এত নিচু আর ভয়ানক শোনাল যে কাদেরের পুরো শরীর ভয়ে অবশ হয়ে গেল।
​“লতিফ কোথায় লুকিয়ে আছে, কাদের? আমি মাত্র একবার জিজ্ঞেস করব। যদি সঠিক উত্তর পাই, তবে এক গুলিতে মারব যাতে কষ্ট কম হয়। আর যদি মিথ্যা বলিস, তবে তোর শরীরের প্রতিটা জয়েন্ট আমি জীবন্ত কেটে কুচি কুচি করব।”
​কাদের মৃত্যুর এই ভয়ানক রূপ দেখে আর এক সেকেন্ডও সময় নিল না। ও কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“লতিফ ভাই… লতিফ ভাই নারায়ণগঞ্জের ওই পুরোনো টেক্সটাইল মিলের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে লুকিয়ে আছে। আল্লাহর কসম ভাই, আমি সত্যি বলছি, ওখানেই আছে ও!”
​কৌশিক এক বাঁকা হাসি হাসল। ও নিজের বুটটা কাদেরের বুক থেকে সরাল।
“ধন্যবাদ, কাদের। তুই সঠিক উত্তর দিয়েছিস।”
​‘ধাঁই’ একটা তীব্র গুলির শব্দ হলো এবং কাদেরের কপাল ভেদ করে গুলিটা ওপারে চলে গেল। কাদেরের ছটফটে শরীরটা এক নিমিষে শান্ত হয়ে গেল। ​কৌশিক নিজের শার্টের হাতা দিয়ে মুখের ওপর লাগা রক্তের দাগটা মুছল। ও রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“রোহিত, লতিফের লোকেশন পেয়ে গেছি। পুরো গোডাউনটা পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দে। আজ রাতের এই আগুন যেন পুরো শহর থেকে দেখা যায়।”
​রোহিত একটা লাইটার জ্বালিয়ে তেলের ড্রামের ওপর ছুঁড়ে মারল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো গোডাউনটি দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা এক বিশাল আগুনের কুন্ডলীতে পরিণত হলো। সেই আগুনের লালচে আলো কৌশিক আর রোহিতের মুখে এসে পড়ছিল, যা ওদের চৌধুরী বংশের সেই আদিম এবং নিষ্ঠুর ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ফুটিয়ে তুলছিল।

​পরদিন সকাল ৭টা বেজে ৩০ মিনিট। চৌধুরী ভিলার চারদিকের পরিবেশ বড্ড শান্ত। ভোরের কুয়াশা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। মায়া সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারেনি। ও সারা রাত জানালার পাশে বসে তসবিহ জপেছে আর ছটফট করেছে। প্রতিটা সেকেন্ড ওর কাছে এক একটি বছরের মতো মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই ঘরের দরজার লকটা বাইরে থেকে খোলার শব্দ হলো। মায়া এক ঝটকায় খাট থেকে নেমে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। ​দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল কৌশিক। ওর গায়ের কালো শার্টটি এখনো রক্ত আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে আছে, ওর চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো, চোখে তীব্র ক্লান্তি। কিন্তু মায়াকে অক্ষত শরীরে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ওর চোখের সেই সমস্ত মাফিয়া ক্লান্তি এক নিমিষে উধাও হয়ে গেল। মায়া কৌশিকের এই রক্তমাখা রূপ দেখেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও কোনো কথা না বলে, কোনো লজ্জা বা অভিমানের তোয়াক্কা না করে সরাসরি কৌশিকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ও নিজের দুই হাত দিয়ে কৌশিকের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওখানেই শব্দ করে কেঁদে উঠল।

​কৌশিক মায়ার এই আকুলতা দেখে নিজের rifle-টা একপাশে ফেলে দিল। ও নিজের রক্তমাখা হাত দুটো মায়ার শরীর থেকে একটু দূরে রাখল, যতে মায়ার এই পবিত্র শাড়িতে কোনো শত্রুর নোংরা রক্ত না লেগে যায়। ও মায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে পরম শান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে বলল,
“এই যে, দেখ হার্টবিট,তোর মিস্টার চৌধুরী অক্ষত শরীরে তোর কাছে ফিরে এসেছে। এই ছেমরি কাঁদছিস কেন? কেঁদিস না, সুইটহার্ট… আমি ঠিক আছি।”
​মায়া কৌশিকের বুক থেকে মুখ তুলে ওর গালে, কপালে নিজের হাত বোলাতে লাগল।
“আপনি ঠিক আছেন তো? কোথাও কোনো আঘাত লাগেনি তো? আপনার এই শার্টে এত রক্ত কেন? উফ্… আমি সারা রাত মরে যাচ্ছিলাম, কৌশিক…”
​কৌশিক তার হাতটা তার শার্ট এ ভালোমতো মুছে মায়ার মুখটা দুহাতে ধরে ওর ঠোঁটের ওপর এক গভীর, তৃপ্তির চুম্বন এঁকে দিল। এবারের চুম্বনে রাতের সেই রক্তের তাণ্ডব আর বারুদের গন্ধ যেন মায়ার ঠোঁটের মিষ্টি স্বাদে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। ও মায়াকে এক ঝটকায় নিজের কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। মায়া কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে বলল,

​“কী করছেন? আপনার শার্টে রক্ত লেগে আছে,আগে ফ্রেশ হন…”
​কৌশিক মায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের গায়ের সেই রক্তমাখা কালো শার্টটা এক টানে খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। ওর সেই সুগঠিত, উদোম বুকটা এখন মায়ার চোখের সামনে উন্মুক্ত। ও মায়ার ওপর নিজের শরীরের পুরো ভর ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকে এল। ওর চোখ দুটোতে আবার সেই কামনার নীল আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
​“শার্টের রক্ত ধুয়ে গেছে মায়া। কিন্তু সারা রাতের এই রক্তের খেলার পর আমার ভেতরের তৃষ্ণাটা এখন আরও হাজার গুণ বেড়ে গেছে। তুই সকালে বলেছিলি না, এই ঘরের ভেতরেই আজ পুরো দিন কাটাবি? এখন কোনো ওজর-আপত্তি আমি শুনব না, মায়াবতী। আজ পুরো দিন শুধু এই কৌশিক নীর চৌধুরী তার হার্টবিটকে নিজের ভালোবাসার চাদরে বন্দি করে রাখবে।”
মায়া এক ধাক্কা দিয়ে কৌশিককে সরিয়ে দিল। অতঃপর বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়াল।
“ অসভ্য লোক একটা আগে ফ্রেশ হয়ে কিছু খাওয়া দাওয়া করে নিন।”
কৌশিক বিছানা ছেড়ে উঠে বলল,
“ঠিক আছে। আমার ম্যাডামের যা ইচ্ছা।”
বলেই কৌশিক ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

​নারায়ণগঞ্জের সেই পুরনো টেক্সটাইল মিলের চারপাশটা তখন কুয়াশা আর নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৩টা বেজে ২০ মিনিট। কাদেরের দেওয়া তথ্য শতভাগ নির্ভুল ছিল। এই মিলের মাটির তলায় যে একটি বিশাল কংক্রিটের বাঙ্কার রয়েছে, তা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। কৌশিক এবং রোহিত তাদের বাছাই করা তিরিশজন দুর্ধর্ষ শুটার নিয়ে মিলের পেছনের জঙ্গল দিয়ে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল। কৌশিকের হাতের সিগন্যাল পেয়ে সুমন আর চারজন বডিগার্ড মিলের মেইন পাওয়ার গ্রিডটা কেটে দিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেল। বাঙ্কারের ভেতরে থাকা লতিফ শিকদারের প্রহরীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কৌশিকের সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল থেকে ‘ফিসফিস’ শব্দে বুলেট ছুটে গেল। নিখুঁত নিশানায় দুজন গার্ড মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কোনো শব্দ না করেই।
​“রোহিত, তুই ডানদিকের উইংটা হোল্ড কর। লতিফ যেন কোনোভাবেই পেছনের সিক্রেট টানেল দিয়ে বের হতে না পারে।”

কৌশিক বড্ড ঠান্ডা এবং গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল। আন্ডারওয়ার্ল্ডে অপারেশন পরিচালনার সময় কৌশিক কোনো মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে এক নিখুঁত কম্পিউটারের মতো হিংস্র। ​রোহিত একটা ক্রুর হাসি হেসে মাথা নাড়ল। ও নিজের সাব-মেশিন গানটা কক করে ডানদিকের করিডোরের দিকে চলে গেল। ​কৌশিক ধীর পায়ে বাঙ্কারের ভারী লোহার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সে জানত, লতিফ ভেতরেই আছে। সে নিজের পকেট থেকে একটি বিশেষ রিমোট কন্ট্রোলড থার্মাইট চার্জ বের করে দরজার কব্জায় লাগিয়ে দিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের তীব্র নীল আলো আর হিসহিস শব্দে লোহার দরজার লকটা গলে পানি হয়ে গেল। ​কৌশিক বুট জুতো দিয়ে সজোরে ধাক্কা মেরে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। বাঙ্কারের ভেতরে তখন ইমার্জেন্সি লাল আলো জ্বলছিল। টেবিলের ওপাশে লতিফ শিকদার একা বসে ছিল, তার পাশে একটি শর্টগান রাখা। কৌশিককে ভেতরে ঢুকতে দেখেই সে পাগলের মতো শর্টগানটা তুলতে গেল, কিন্তু কৌশিক তার চেয়েও দশ গুণ দ্রুতগতিতে নিজের পিস্তল থেকে গুলি চালাল। ​বুলেটটি সরাসরি লতিফের ডান হাতের কবজি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। লতিফ ব্যথায় এক বন্য চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। শর্টগানটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। ​কৌশিক শান্ত পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেল। লতিফ মাটিতে শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছিল আর তার কাটা হাত চেপে ধরেছিল। কৌশিক নিজের ভারী বুট জুতোটা লতিফের সেই রক্তাক্ত হাতের ওপর চেপে ধরল। হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দে বাঙ্কারের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

​“ক-কৌশিক,আমাকে মেরো না। আমি তোকে আমার অর্ধেক প্রোপার্টি দিয়ে দেব। আমার সব ড্রাগের রুট তোর নামে লিখে দেব…”
লতিফ বুড়ো বয়সে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কুকুরের মতো অনুনয় করতে লাগল। ​কৌশিক একটু ঝুঁকে লতিফের চুলের মুঠি ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। কৌশিকের চোখ দুটো তখন যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“শহর? প্রোপার্টি? ড্রাগ রুট? ওগুলো তো এমনিতেও এখন আমার, লতিফ। তুই কোন সাহসে আমার বোন তিয়াশার দিকে হাত বাড়িয়েছিলি? আর সবচেয়ে বড় ভুল যেটা করেছিস,তুই আমার মায়ার শরীরে আঘাত করেছিস। ওর শরীর থেকে যতটুকু ফোঁটা রক্ত ঝরেছে, তার বদলে তোর পুরো বংশের রক্ত দিয়েও সেই ঋণ শোধ হবে না।”
​লতিফ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কৌশিক লতিফকে ঝটকা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল এবং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রোহিতকে ডাকল।
“রোহিত, একে আমাদের পার্সোনাল টর্চার সেলে নিয়ে যা। লতিফ শিকদার এত সহজে মরবে না। মায়া হসপিটালে যত দিন ছিল, এই বুড়ো শকুনকে তত দিন জ্যান্ত চামড়া ছাড়িয়ে নুন দেওয়া হবে। ও যেন প্রতি সেকেন্ডে মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করে।”
​রোহিত এগিয়ে এসে লতিফের চুল ধরে টেনে তুলতে তুলতে বলল,
“বুঝে গেছি ভাইয়া। এবার ওর বাকি জীবনটা তো গেলো ”
​কৌশিক বাঙ্কার থেকে বের হয়ে আসার সময় সুমনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“পুরো টেক্সটাইল মিলটা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দে। আজ রাতের মধ্যেই যেন এই শহরে লতিফ শিকদারের নাম নিশানা সবকিছু যেন মুছে যায়।”

​পরদিন সকাল ৯টা। লতিফ শিকদারের পুরো আস্তানা ধ্বংস করে, তার রাজত্ব গুঁড়িয়ে দিয়ে কৌশিক আর রোহিত যখন চৌধুরী ভিলারে ফিরে এল, তখন ভোরের সূর্য মেঘের আড়ালে ঢাকা। কৌশিক সোজা নিজের রুমে গিয়ে মায়ার সাথে দেখা করে তার মনের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নিয়েছিল। মায়াকে বিছানায় পরম শান্তিতে ঘুমোতে দেখে সে নিচে নেমে এল ফ্রেশ হয়ে। ​ডাইনিং টেবিলে তখন এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। আসিফ চৌধুরী এবং আশরাফ চৌধুরী দুজনেই গম্ভীর মুখে বসে আছেন। আজ চৌধুরী ভিলার পুরুষদের চোখে এক অন্যরকম তৃপ্তি, কারণ তাদের চিরশত্রু লতিফ শিকদার এখন তাদের পায়ের নিচে। ​মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে একের পর এক গরম নাস্তা এনে টেবিলে সাজাচ্ছেন। তিয়াশা আর নিধি দুজনে মিলে টেবিলের এক কোণে বসে নিচু গলায় কথা বলছিল। নিধিকে আজ বড্ড ফ্যাকাশে লাগছিল। সে কাল রাত থেকে এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারেনি। রোহিতের সেই বিকেলের হুমকি আর গভীর রাতের অস্ত্রের আওয়াজ ওর মাথায় অনবরত ঘুরছিল। ​রোহিত ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। ওর পরনে একটা হালকা খয়েরি রঙের শার্ট, চুলগুলো ভেজা। সে টেবিলে বসেই নিধির দিকে এক অপলক দৃষ্টিতে তাকাল। নিধি রোহিতের চোখ দেখেই নিজের নজর সরিয়ে প্লেটের দিকে দিল।
​“বড় আব্বু, আব্বু,লতিফ শিকদারের চ্যাপ্টার সারাজীবনের জন্য একদম ক্লোজ।”

রোহিত কফির কাপে চুমুক দিয়ে বড্ড স্বাভাবিক গলায় বলল, যেন সে কোনো মাফিয়া গ্যাং ধ্বংস করে আসেনি, জাস্ট সকালের মর্নিং ওয়াক করে এসেছে। ​আসিফ চৌধুরী নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই কাজটা তোরা দুইজনে ভালো করেছিস বাবা। এই লতিফ আমাদের পরিবারের ওপর বড্ড বড় নজর দিয়েছিল। তিয়াশা আর মায়ার যে ক্ষতি ও করতে চেয়েছিল, তার শাস্তি তো ওকে পেতেই হতো।”
​কৌশিক ঠিক তখনই ডাইনিং হলে প্রবেশ করল। ওর পরনে একটা পুরো সাদা শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। ও এসে নিজের প্রধান চেয়ারটায় বসল। মায়া তখনো নিচে নামেনি, সে রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে। কৌশিক সায়েরা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাকী, মায়ার জন্য সুপটা একটু ওপরে পাঠিয়ে দিও। ও এখনো বড্ড দুর্বল।”
​সায়েরা চৌধুরী হাসিমুখে বললেন,
“হ্যাঁ বাবা, আমি এখনই নিধিকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
​নিধি নিজের নাম শুনতেই চমকে উঠল। সে সায়েরা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আন্টি, আমি নিয়ে যাব?”
​“হ্যাঁ মা, তুমি নিয়ে যাও। মায়ার সাথে একটু গল্প করলে ওর মনটাও ভালো লাগবে।”

মাহিমা চৌধুরী পাশ থেকে কথাটা বললেন। নিধি সাথে সাথে ট্রে-তে সুপের বাটি আর কিছু ফল নিয়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সে এই ডাইনিং টেবিলের দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে বাঁচতে চাইছিল, বিশেষ করে রোহিতের ওই তীক্ষ্ণ আর কামুক চাহনি থেকে। ​নিধি যখন সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছেছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে বুট জুতোর শব্দ শোনা গেল। নিধি না ঘুরেই বুঝতে পারল এটা কে। সে নিজের হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল।
​“এত তাড়াহুড়ো কিসের নিধি পাখি? সুপ পড়ে গেলে কিন্তু বড় আম্মু রাগ করবে।”
রোহিতের নিচু, ড্যাশিং গলাটা নিধির কানের ঠিক পেছনে ভেসে উঠল। নিধি সিঁড়ির ওপরে উঠে এক কোণে দাঁড়িয়ে রাগী চোখে রোহিতের দিকে তাকাল।
“আপনি কি আমার পিছু নেওয়া ছাড়বেন না? চৌধুরী বাড়ির ছেলেরা কি মেয়েদের সম্মান করতে জানে না?”
​রোহিত নিধির একদম কাছে এসে দাঁড়াল, মাঝখানে শুধু সুপের ট্রে-টা ব্যবধান হিসেবে ছিল। রোহিত নিজের চশমাটা এক হাত দিয়ে ঠিক করে নিচু গলায় বলল,

“চৌধুরী বংশের ছেলেরা নিজের সম্পত্তি আর নিজের ভালোবাসাকে চোখের আড়াল করতে জানে না, নিধি পাখি। তুমি নাকি তিয়াশাকে কাল বলছ তুমি নাকি আজ তোমার বাড়ি ফিরে যাবে?”
“হ্যাঁ যাবো আপনার কোন সমস্যা? এখানে আসাটাই আমার উচিত হয়নি।”
রোহিত মুচকি হাসল। নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“থাক আর কষ্ট করে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। আমি কিন্তু অলরেডি তোমার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে ফেলেছি। আগামী সপ্তাহে আমাদের বাগদান।”
​নিধির হাত থেকে ট্রে-টা প্রায় কেঁপেই পড়ে যাচ্ছিল। সে অবিশ্বাস্য চোখে রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হোয়াট?! আপনি আমার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেছেন? আপনি একজন মাফিয়া, আমার বাবা একজন সাধারণ মানুষ, আপনি আবার উনাকে হুমকি দেন নি তো?”
​রোহিত মৃদু হাসল, সেই হাসিতে এক অদ্ভুত মায়াবী টান ছিল।
“হুমকি? আরে না নিধি পাখি। আমি তো বড্ড ভদ্র ছেলের মতো উনার কাছে উনার একমাত্র মেয়ের হাত চেয়েছি। আর হ্যাঁ, আমি উনাকে এটাও বলেছি যে উনার মেয়েকে আমি এই দুনিয়ার সমস্ত সুখ দেব। তোমার বাবা বড্ড খুশি মনেই রাজি হয়েছেন। তাই এখন নিজের বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বন্ধ করো আর চৌধুরী ভিলার ছোট বউ হওয়ার প্রস্তুতি নাও।”

রোহিতের কথা শুনে ​নিধি রাগে আর অপমানে ফুঁপিয়ে উঠল। কী বলছে এই ছেলে? নিধি বলল,
“আপনার ফালতু বকবক গুলো বন্ধ করুন কারণ আমি আপনাকে কোনোদিনও বিয়ে করবো না। আর যদি সত্যিই আমার বাবা-মা রাজিও হয়ে থাকে আমি হবো না। আপনি জোর করে আমাকে পেতে পারেন, কিন্তু আমার মন কোনোদিন পাবেন না।”
​রোহিত নিধির কানের কাছে মুখ নামিয়ে বড্ড গম্ভীর আর নেশাতুর কণ্ঠে বলল,
“মন জয় করতে চৌধুরী বংশের ছেলেদের কতক্ষণ লাগে, তা কৌশিক ভাইয়া আর ভাবিকে দেখলেই বুঝতে পারবে। তুমি শুধু সময়ের অপেক্ষা করো, নিধি পাখি।”
​নিধি আর কোনো কথা না বলে রাগে হনহন করে মায়ার রুমের দিকে চলে গেল। রোহিত পেছন থেকে ওর চলে যাওয়া দেখে নিজের ঠোঁট কামড়ে এক চিলতে শয়তানি হাসি হাসল। ​মায়ার রুমের দরজাটা হালকা খোলাই ছিল। নিধি ভেতরে ঢুকে দেখল মায়া বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। ওর পরনে একটা সুতির হালকা শাড়ি, মুখটা কিছুটা ক্লান্ত কিন্তু এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরা। কৌশিক ফিরে আসার পর মায়ার ভেতরের সমস্ত ভয় যেন এক নিমিষে উধাও হয়ে গেছে।

​“ভাবি… তোমার সুপ।”
নিধি ট্রে-টা সাইড টেবিলে রেখে বসল। ওর গলার স্বরে এক স্পষ্ট অস্থিরতা ছিল। মায়া নিধির মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। সে নিধির হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বড্ড নরম গলায় বলল,
“কী হয়েছে নিধি? তোর মুখটা এত শুকনো কেন? রোহিত ভাইয়া আবার কিছু বলেছে তোমাকে?”
​নিধি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে মায়ার বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল।
“ভাবি, এই লোকটা একটা আস্ত রাক্ষস। জানি না, ও আমার বাবা-মাকে কীভাবে রাজি করিয়ে ফেলেছে আমাদের বিয়ের জন্য। ও জোর করে আমাকে এই বাড়িতে আটকে রাখতে চায়। আমি একজন সাধারণ মেয়ে ভাবি, আমি এই মাফিয়া লাইফস্টাইল, এই বন্দুকের লড়াই এসবের মধ্যে বাঁচতে পারব না। আমি বড্ড সাহসী কিন্তু আমার বড্ড ভয় করে।”
​মায়া নিধির পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজের এক বছর আগের জীবনের কথা ভাবল, যখন সেও কৌশিককে দেখে এভাবেই ভয় পেত, পালিয়ে যেতে চাইত।
​“নিধি, আমার দিকে তাকাও।”
মায়া নিধির মুখটা ওপরে তুলল। ওর চোখে এক পরম বড় বোনের মতো আশ্বাস।
“কৌশিক আমার মামাতো ভাই এটা তো তুমি জানোই?”
“হ্যাঁ।”

“আগে কৌশিককে দেখে আমারও তোমার মতোই মনে হতো। ওকে নিয়ে যাতা মনে হতো। ওর কোনো মন নেই। কিন্তু বিশ্বাস করো নিধি, চৌধুরী বংশের ছেলেদের একটা মস্ত বড় গুণ আছে ওরা বাইরের দুনিয়ার জন্য যতই নিষ্ঠুর মাফিয়া হোক না কেন, নিজের স্ত্রীর জন্য ওরা এক একজন খাঁটি প্রেমিক।”
​নিধি চোখ মুছে বলল,
“কিন্তু ভাবি, তোমার দেবর, ও বড্ড জোর খাটায়। ওর অহংকার বড্ড বেশি।”
​মায়া মুচকি হাসে বলল,
“রোহিত ভাইয়া একটু চঞ্চল, একটু ড্যাশিং স্টাইলে চলে। কিন্তু ওর মনে কোনো পাপ নেই। ও তিয়াশাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিল, সেটা তুমি নিজেও দেখেছো। ও তোকে সত্যি ভালোবাসে নিধি, আর সেই ভালোবাসার জেদ থেকেই ও এমন করছে। তুমি একটু সময় নিয়ে ওকে বোঝার চেষ্টা করো। দেখবে, এই ভেতরের সাধারণ মানুষটাকে তুমিও ভালোবেসে ফেলেছো।”

​নিধি মায়ার কথা শুনে চুপ হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, সত্যিই কি সে রোহিতকে ঘৃণা করে? নাকি রোহিতের ওই তীব্র অধিকারবোধ ওর মনের ভেতরেও এক অজানা তোলপাড় সৃষ্টি করেছে? ​ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। কৌশিক ভেতরে ঢুকল। ও নিধিকে দেখে একটু মুচকি হেসে বলল,
“নিধি, নিচে তোর মা ফোন করেছে। রোহিত তোমাকে ডাকছে নিচে যাওয়ার জন্য।”
​নিধি মায়ার দিকে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। কৌশিক দরজাটা বন্ধ করে মায়ার দিকে এগিয়ে এল। ও বিছানার ধারে বসে মায়ার কপালে নিজের হাতটা রাখল।
“সুপটা খেয়েছিস, হার্টবিট?”
​মায়া কৌশিকের হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল,

“আপনার এই ভাইটা দিন দিন বড্ড বেশি দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে। নিধিকে বড্ড জ্বালাতন করছে ও।”
​কৌশিক এক বাঁকা হাসি হেসে মায়াকে নিজের বুকের সাথে টেনে নিল।
“চৌধুরী বংশের ছেলেদের রক্তটাই এমন মায়া। ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য আমরা পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে পারি। রোহিতও সেটাই করছে। তুই ওসব বাদ দে… এখন বল, আমার সকালের সেই পেন্ডিং আদরটার রিভিশন কখন দিবি?”
​মায়া কৌশিকের বুকে মুখ লুকিয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
“আপনার মাথায় কি দিনরাত শুধু এইসব অসভ্যতামি ঘোরে?”
​কৌশিক মায়ার চিবুকটা আলতো করে তুলে বলল,
“কী আর করার? সারাদিন অফিসের কাজ, মিটিং, ঝামেলা… এগুলোর মাঝে একমাত্র তোর সাথেই তো একটু শান্তি পাই।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

“শান্তি পান? আপনার মতো ঝামেলার কারখানার মুখে এই কথা মানায়?”
“অবশ্যই মানায়। আমি ঝামেলা হলে তুই কী?”
“আমি?”
“তুই সেই ঝামেলার সিইও।”
“বাহ! নিজের দোষও আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন?”
“কারণ আমার জীবনের সবকিছুর মালিকানা তো তোর।”
“আহা! ডায়লগবাজি বন্ধ করেন।”
“ডায়লগবাজি না, সত্যি কথা।”
“সত্যি কথা হলে আজ সকালে আমার জন্য যে চকলেট আনার কথা ছিল, সেটা কোথায়?”
কৌশিক কাশির ভান করল। বলল,
“ওইটা একটা জাতীয় দুর্ঘটনা ছিল।”
“মানে?”

“দোকান থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ মনে হলো আমি একটু টেস্ট করে দেখি।”
“তারপর?”
“তারপর আর কিছু বাকি ছিল না।”
মায়া চোখ বড় বড় করে তাকাল।বলল,
“আপনি আমার পুরো চকলেট খেয়ে ফেলেছেন?”
“দেশের স্বার্থে আত্মত্যাগ করেছি।”
“কোন দেশের?”
“চৌধুরী সাম্রাজ্যের।”
মায়া বালিশ তুলে মারার ভান করতেই কৌশিক দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করল।
“বিচার চাই! নিরীহ মানুষের উপর হামলা হচ্ছে!”
“নিরীহ মানুষ? চকলেট চোর কোথাকার!”
“আচ্ছা আচ্ছা, কালকে দুইটা এনে দিব।”
“তিনটা।”
“ না দুইটা।”
“না না তিনটা।”
“আড়াইটা?”
“চকলেট আবার আড়াইটা হয় নাকি?”
“আমি অর্ধেক খেয়ে দিব।”
মায়া এবার হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলল,
“আপনার সাথে তর্ক করে পারা যাবে না।”
কৌশিক মুচকি হেসে বলল,
“অবশেষে বুদ্ধিমানের মতো একটা কথা বললি।”

“বেশি খুশি হবেন না। আমি শুধু ভাবছি, এত বড় মানুষ হয়ে আপনি কীভাবে এত বাচ্চাদের মতো আচরণ করেন!”
“কারণ তোর সামনে আমি সিরিয়াস থাকতে পারি না।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“জানেন, আপনার এই পাগলামোগুলোই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।”
কৌশিক ভান করে বুক ফুলিয়ে বলল,
“আমি জানতাম। আমি তো এমনিতেই অসাধারণ।”
“স্বপ্ন দেখা কমান।”
“স্বপ্ন না, বাস্তবতা।”
“আচ্ছা, তাহলে বাস্তবতার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে আনেন দেখি।”
“এই যে! এতক্ষণে আসল উদ্দেশ্য বের হলো!”
অতঃপর ঘরজুড়ে দুজনের হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।

​নিধি যখন নিচে ড্রয়িংরুমে এল, তখন দেখল রোহিত একা সোফায় বসে ফোন কানে দিয়ে কথা বলছে। নিধিকে আসতে দেখেই সে ফোনটা কেটে দিল এবং সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমে তখন আর কেউ ছিল না।
​“তোমার মা ফোন করেছিলেন নিধি পাখি। আমি উনাকে বলেছি যে তুমি এখানে বড্ড ভালো আছো এবং আগামী পরশুই আমরা তোমাদের বাড়ি আসছি অফিশিয়াল কথাবার্তা বলতে।”
রোহিত নিজের পকেটে হাত গুঁজে বড্ড শান্ত গলায় কথাটা বলল। ​নিধি রোহিতের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
“আপনি নিজেকে কী ভাবেন মিস্টার রোহিত চৌধুরী? আপনার এই মাফিয়াগিরি আন্ডারওয়ার্ল্ডে অন্য কোথাও দেখাবেন, আমার পরিবারের ওপর নয়। আমি এই বিয়েতে মত দেব না।”
​রোহিত নিধির আরও এক পা কাছে এগিয়ে এল। ওদের দুজনের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। রোহিত নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে নিধির গালের একপাশে আলতো করে স্পর্শ করল। ওর হাতের ছোঁয়াটা কাল বিকেলের মতো শক্ত ছিল না, বড্ড নরম আর মায়াবী ছিল। ​নিধি শিউরে উঠল কিন্তু সরে গেল না। রোহিতের চোখ দুটোতে আজ কোনো অহংকার ছিল না, ছিল এক গভীর, নীরব আকুলতা।

​“নিধি,আমি জানি আমি বড্ড ছন্নছাড়া, বড্ড বিপজ্জনক এক জীবনের মধ্যে বাঁচি। কিন্তু বিশ্বাস করো, যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিনই আমার এই অন্ধকার বুকে এক চিলতে আলো এসে পড়েছিল। আমি তোমাকে কোনোদিন জোর করব না নিধি। তুই যদি সত্যিই আমাকে একসেপ্ট না করো, তবে আমি তোমার জীবন থেকে চিরকালের জন্য সরে যাব। কিন্তু একবার, মাত্র একবার আমার এই ভালোবাসাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখো। আমি তোমাকে এই দুনিয়ার সমস্ত সুখ এনে দিবো।”
​রোহিতের গলার স্বরের এই আকস্মিক পরিবর্তন নিধির মনের ভেতরের সমস্ত দেয়াল এক নিমিষে ভেঙে চুরমার করে দিল। সে কোনোদিন ভাবেনি এই ড্যাশিং, অহংকারী মাফিয়া ডন ওর সামনে এভাবে নিজের মন উজার করে দিতে পারে। নিধির চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ​সে নিচু গলায় বলল,
“আপনি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন? নাকি এটা শুধু আপনার জেদ?”

​রোহিত নিজের শার্টের পকেট থেকে একটি ছোট মখমলের বক্স বের করল। বক্সটি খুলে নিধির সামনে ধরতেই ভেতরের হিরের আংটিটা ডিম লাইটের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল।
​“জেদ দিয়ে শরীর জেতা যায় নিধি, মন নয়। আমি তোমার মনটা জিততে চাই। এই আংটিটা আমি স্পেশালি তোমার জন্য বানিয়েছি। তুমি যদি আগামী সপ্তাহের বাগদানে এটা নিজের আঙুলে পরো, তবেই আমি জানব তুই আমাকে একসেপ্ট করেছো।”
রোহিত আংটিটা নিধির হাতের তালুর ওপর রেখে বড্ড মিষ্টি করে হাসল। ​নিধি আংটিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মনের ভেতরের সমস্ত কষ্ট আর দ্বিধা যেন এক নিমিষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সেও কোনো এক অজান্তে এই বিপজ্জনক মানুষটার প্রেমে পড়ে গেছে। সে আংটিটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে নিয়ে রোহিতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। রোহিত নিধির সেই হাসি দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। ও এক ঝটকায় নিধিকে জড়িয়ে ধরতে গেল, কিন্তু নিধি দুই পা পিছিয়ে গিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,

“একদম না! বিয়ের আগে কোনো টাচ করা যাবে না।”
​রোহিত হো হো করে হেসে উঠল।
“ওকে বাবা, সারেন্ডার! বিয়ের পরেই না হয় সব হিসাব চুকিয়ে নেওয়া যাবে।”
✨🌷__​দীর্ঘ এক বছর পর__🌷✨
​সময় তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে একটি পুরো বছর।চৌধুরী ভিলার পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই অন্ধকার, রক্তের খেলা আর অস্ত্রের ঝনঝনানি এখন অতীত। কৌশিক নীর চৌধুরী এখন নিজের সমস্ত অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করে চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মেইনস্ট্রিম লিগ্যাল বিজনেসের হাল ধরেছে। ও এখন একজন সফল, সম্মানীয় বিজনেসম্যান। লতিফ শিকদারের পতনের পর এই শহরে আর কোনো শত্রুর অস্তিত্ব নেই। চৌধুরী বংশ এখন শান্তির এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত। ​আজ চৌধুরী ভিলা বড্ড বেশি সাজানো হয়েছে। বাড়ির বিশাল বাগানে চমৎকার লাইটিং করা হয়েছে, কারণ আজ এই পরিবারের দুটি বড় খুশির দিন। প্রথমত রোহিত ও নিধির আনুষ্ঠানিক বিয়ের রিসেপশন, এবং দ্বিতীয়ত মায়া ও কৌশিকের দাম্পত্য জীবনের এক বছর পূর্তি এবং এই পরিবারে এক নতুন অতিথির আগমনের সুখবর।
​বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল রোহিত এবং নিধি। রোহিতের পরনে একটা অফ-হোয়াইট রাজকীয় শেরওয়ানি, আর নিধির পরনে এক গাঢ় লাল বেনারসি লেহেঙ্গা। নিধিকে আজ আক্ষরিক অর্থেই এক অপ্সরার মতো লাগছিল। রোহিত নিধির দিকে তাকিয়ে ওর সেই ড্যাশিং হাসি হেসে বলল,

“কী নিধি পাখি? এক বছর আগে যে মাফিয়াকে দেখে দৌড়ে পালাতে, আজ তাকেই নিজের জীবনের রাজা বানিয়ে কেমন লাগছে?”
​নিধি এবার আর রাগ করল না। ও রোহিতের শেরওয়ানির কলারটা একটু ঠিক করে দিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“আপনি একটা আস্ত পাগল, মিস্টার রোহিত চৌধুরী। তবে হ্যাঁ, এই পাগলের ভালোবাসার ডিনামাইটে ব্লাস্ট হতে আমার বড্ড ভালো লেগেছে। আই লাভ ইউ, মাই ড্যাশিং হাজব্যান্ড।”
​রোহিত নিধির এই স্বীকারোক্তি শুনে ওকে নিজের কাছে টেনে নিতেই পাশ থেকে তিয়াশা হেসে উঠল,
“ভাইয়া! সবার সামনে অন্তত রোমান্সটা বন্ধ করো! নিচে কাকা আর আব্বু ডাকছেন তোমাদের।”
সবাই একসাথে হেসে উঠল। এদিকে দোতলার সেই রাজকীয় ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল কৌশিক এবং মায়া। মায়ার পরনে আজ একটা হালকা মেরুন রঙের মসলিন শাড়ি, পেটে ওর হালকা একটু মাতৃত্বের ছোঁয়া স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ও বিকেলের ঠান্ডা বাতাসে নিজের চুলগুলো সামলাচ্ছিল। কৌশিক ধীর পায়ে পেছন থেকে এসে মায়ার কোমরে নিজের শক্ত হাত দুটো জড়িয়ে ধরল। ও মায়ার কাঁধের ওপর নিজের চিবুক রেখে নিচু, গম্ভীর অথচ পরম ভালোবাসার গলায় বলল,

“এখানে একা একা দাঁড়িয়ে কী ভাবা হচ্ছে, হার্টবিট?”
​মায়া কৌশিকের হাতের ওপর নিজের হাতটা রেখে ওর দিকে ঘুরে তাকাল। ওর চোখে তখন এক পরম তৃপ্তি আর অন্ধ ভালোবাসার গভীরতা। ও কৌশিকের খালি বুকে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে মৃদু ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি সারাজীবন আপনার এই প্রণয়ের ঘোরের মধ্যেই বন্দি থাকতে চাই। হে আল্লাহ… আমার এই অসভ্য, পাগল মানুষটাকে তুমি চিরকাল আমার বুকে এভাবেই রেখো।”
​কৌশিক মায়ার চিবুকটা ধরে ওর ঠোঁটের ওপর এক গভীর, পবিত্র এবং শান্তিময় চুম্বন এঁকে দিল। এই চুম্বনে কোনো পুরোনো অন্ধকার ছিল না, ছিল এক নতুন ভোরের আলোর প্রতিশ্রুতি। ​চুম্বন শেষে কৌশিক মায়াকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতেই মায়া একটু আদুরে ভঙ্গিতে মুখটা বাঁকাল। ও কৌশিকের ডান হাতটা টেনে এনে আলতো করে রাখল নিজের স্ফীত উদরের ওপর। পরম আবেশে চোখ দুটো বুজে ও বলল,
“এই দেখুন… আপনার আরেকটা ‘অস্থিরতা’ আমার এই গর্ভে বড় হচ্ছে। ভেতরে থেকে বড্ড জ্বালাচ্ছে আজ সারাটা দিন। একদম বাপের মতো হয়েছে, শরীরে এক ফোঁটা ধৈর্য নেই। শুধু ছটফট করছে।”

​কৌশিক চমকে উঠল। মায়ার পেটে ওর শক্ত হাতের তালুটা ছোঁয়াতেই ভেতর থেকে ছোট্ট একটা অস্তিত্বের নাড়াচাড়া ও স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। কৌশিকের সারা শরীরে যেন এক অদ্ভুত বিদ্যুত তরঙ্গ বয়ে গেল। ও এক মুহূর্ত দেরি না করে মায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝেতেই বসে পড়ল। নিজের কানটা আলতো করে রাখল মায়ার পেটের ওপর। ​মায়ার পেটে কান পেতে, চোখ দুটো বন্ধ করে এক পরম শান্তি অনুভব করল কৌশিক। ও পেটের ওপর আলতো করে আঙুল বুলাতে বুলাতে দুষ্টুমির সুরে বলল,
“কী রে চ্যাম্পিয়ন? ভেতরে থেকে তোমার মাম্মিকে এত জালাতন করো না তোমার পাপার কষ্ট হয় বুঝলে? আর এত ছটফটানি কিসের শুনি? মাকে বড্ড জ্বালাচ্ছো দেখছি! আসো তুমি একবার বাইরে আসো, তোমার এই দুষ্টুমির শাস্তি তোমার পাপা কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করবে। তখন কিন্তু তোমার মম্মি তোমাকে বাঁচাতে আসবে না হ্যাঁ!”

​মায়া কৌশিকের চুলে নিজের আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিয়ে হেসে উঠল,
“ওরে বাবা! এখনই বাচ্চার সাথে ধমকাধমকি শুরু হয়ে গেল? ও তো আপনার ওপরই গেছে। সারাদিন যেমন আপনি আমাকে জ্বালান, ও-ও ভেতর থেকে ঠিক তেমনি করছে।”
​কৌশিক মাথা তুলে মায়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। তারপর আবার পেটের দিকে মুখ নামিয়ে নরম গলায় বলল,
“ধমকাচ্ছি না তো মায়াবতী, ওর সাথে ডিল করছি। শোনো ছোট বাবু, বড় হয়ে কিন্তু একদম পাপার মতো হতে হবে, বুঝলে? এই যেমন জেদি, তেমনি একগুঁয়ে আর… তোমার এই মম্মির ভালোবাসায় একদম অন্ধ! কোনো উল্টোসিধো চলা চলবে না কিন্তু।”
​মায়া লজ্জায় রাঙা হয়ে কৌশিকের কাঁধে আলতো চাপড় মেরে বলল,
“উফ! একদম আপনার মতো যেন না হয়। আমি চাই ও শান্ত হোক, আপনার মতো এত অসভ্য আর পাগল যেন না হয়। একটা পরিবারে একটা পাগলই যথেষ্ট!”
​কৌশিক মায়ার পেটেই ছোট্ট একটা আলতো কামড় দেওয়ার ভং করল। মায়া ওহ্ করে উঠতেই কৌশিক হেসে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়াল। মায়ার কোমরে আবার হাত জড়িয়ে ওকে নিজের আরও কাছে টেনে এনে গভীর চোখে তাকাল। ওর সেই চোখের তীব্রতায় মায়া বরাবরের মতোই কেঁপে উঠল। কৌশিক মায়ার নাকটা নিজের আঙুল দিয়ে টেনে দিয়ে অভিমানী স্বরে ফুল ফুলিয়ে বলল,
“কী বললে? আমি অসভ্য? আমি পাগল? উমম, ভুল তো কিছু বলোনি। তবে এই পাগলটাকে সামলানোর দায়িত্ব কিন্তু সারাজীবন তোমারই, হার্টবিট। আর আমাদের এই ছোট ভার্সনটা যখন আসবে, তখন তো আমার পাগলপনমি আরও বেড়ে যাবে। তখন কিন্তু আমি খুব হিংসে করবো আমাদের এই ছোট ভার্সনকে।”

“কেনো কেনো?”
“ও যদি আমার আদরে ভাগ বাসায় তাহলে।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে কৌশিকের দিকে তাকাল। বলল,
“আচ্ছা! নিজের সন্তানকে নিয়ে কেউ এইভাবে হিংসে করে নাকি?”
কৌশিক গম্ভীর মুখ করে মাথা নেড়ে বলল,
“অবশ্যই করে। তুমি বুঝবে না। এতদিন এই মায়াবতীটা শুধু আমার ছিল। এখন দেখি তোমার আদর, তোমার সময়, তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমানো সবকিছুর ভাগ বসাতে একটা ছোট্ট প্রতিদ্বন্দ্বী খুব শীগ্রই চলে এসছে!”
মায়া হেসে বলল,
“তাহলে কী করবেন শুনি?”
কৌশিক আবার মায়ার পেটের ওপর হাত রেখে বলল,

“শোনো ছোট ভার্সন, চলো একটা চুক্তি করি? তুমি মম্মির আদরের সত্তর শতাংশ নিতে পারো, কিন্তু বাকি ত্রিশ শতাংশ আমার জন্য রেখে দেবে। ঠিক আছে?”
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
“উল্টো হবে। নব্বই শতাংশ ওর, দশ শতাংশ আপনার।”
“কী সর্বনাশ! আমি তাহলে পরিবারে সংখ্যালঘু হয়ে গেলাম!”
মায়া হেসে কৌশিকের বুকে মাথা রাখল। ঠিক তখনই মায়ার পেটের ভেতর আবার হালকা একটা নাড়াচাড়া অনুভূত হলো। কৌশিক চোখ বড় বড় করে বলল,
“এই দেখো! ও আমার প্রতিবাদ করছে। বলছে, ‘পাপা, আমি একশো শতাংশই নিবো!’”
“হুম, কারণ ও খুব বুদ্ধিমান হবে।”
“দেখো মায়া ও ওর পাপার সাথে বড্ড জেদ দেখাচ্ছে। দেখো ওর সাথে আমি কথা বলবো না হু।”
“বলো না।”
কৌশিক নিচু হয়ে পেটের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“শোনো ছোট্ট মানুষ, তুমি যখন পৃথিবীতে আসবে, তখন তোমার জন্য আমি সবচেয়ে সুন্দর একটা ঘর সাজাবো। তোমার ছোট ছোট জামা কিনবো। আর রাতে তুমি যদি ঘুমাতে না চাও, তাহলে আমি তোমাকে কোলে নিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াবো।”
মায়া নরম স্বরে বলল,

“আর যদি সারারাত কাঁদে?”
“তাহলেও কোলে রাখবো।”
“আর যদি ডায়াপার বদলাতে হয়?”
কৌশিকের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। সে বলল,
“না মানে ইয়ে…সেটা… সেটা আমরা পরে আলোচনা করবো।”
মায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল,
“দেখলেন? বাবা হওয়ার স্বপ্ন অনেক, কিন্তু ডায়াপারের কথা আসতেই হাওয়া!”
কৌশিক আবার পেটের ওপর আলতো হাত বুলিয়ে বলল,
“না রে চ্যাম্পিয়ন, ভয় পাইনি। তোমার জন্য সবই করবো। তুমি শুধু সুস্থভাবে পৃথিবীতে এসো। তোমার মম্মিকে খুব বেশি কষ্ট দিও না কেমন? কারণ তোমার মাম্মিটা আমার বড্ড শখের ওকে কষ্ট দিলে তোমার পাপা মরে যাবে বুঝলে ছোট্ট ভার্সন?”
মায়ার হাসিটা ধীরে ধীরে মায়াভরা নীরবতায় বদলে গেল। সে নিজের হাতটা কৌশিকের হাতের ওপর রেখে ফিসফিস করে বলল,
“আর তুমি আমাদের দুজনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।”

কৌশিক মৃদু হেসে মায়ার কপালে একটা আলতো চুমু এঁকে দিল। তারপর আবার পেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুনলে ছোট্ট ভার্সন? তোমার মাম্মি কিন্তু সাক্ষী। পৃথিবীতে আসার পর আমরা তিনজন মিলে একটা টিম হবো। আর সেই টিমের নাম হবে,‘মায়াবতীর দুই পাগল।’”
মায়া হেসে ফেলতেই যেন ভেতর থেকেও ছোট্ট একটা নাড়াচাড়া অনুভূত হলো। কৌশিক এমন কথা শুনে মায়া তার হাসি আর আটকে রাখতে পারল না সে একটু জোরেই হেঁসে উঠল। মায়া মুচকি হেসে কৌশিকের বুকে হাত রেখে বলল,
“আচ্ছা বাবা, মেনে নিলাম। কিন্তু একটা কথা বলুন তো, যদি ও মেয়ে হয়? তখনও কি তাকে আপনার মতোই জেদি বানাবেন?”
​কৌশিকের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত মায়ায় চকচক করে উঠল। ও মায়ার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“যদি ও তোমার মতো একটা ছোট্ট মায়াবতী হয়, তবে তো আমি ওর চরণে আমার এই পুরো সাম্রাজ্যটাই লিখে দেব। ও যা চাইবে, এই কৌশিক চৌধুরী তার পায়ের কাছে এনে হাজির করবে। সেটা ছেলে হলেও। যেই’ই হোক একদম তোমার মতোই জেদি আর মিষ্টি হবে ও।”
​মায়া কৌশিকের চওড়া বুকে মাথা রেখে এক গভীর তৃপ্তির শ্বাস নিল। এতদিনের ঝড়-ঝাপটা, ভুল-বোঝাবুঝি আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই বুকটাই এখন তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। ও কিছুটা আবেগঘন কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

“আমি ধন্য কৌশিক, আপনার এই ভালোবাসা পেয়ে আমি সত্যিই ধন্য।”
​কৌশিক মায়ার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, যেন এক পরম যত্নে আগলে রাখা কাঁচের পুতুল। মায়ার কাজলকালো চোখের দিকে তাকাতেই কৌশিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তৃপ্ত, সুন্দর আর বিজয়ী পুরুষের চিলতে হাসি। এই হাসি কোনো অহংকারের নয়, এ তো সেই বিজয়ের হাসি যা জানান দিচ্ছিল সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে চৌধুরী ভিলার এই রাজপুত্র আজ তার ভালোবাসার সাম্রাজ্যে একচ্ছত্র সম্রাট। ও মায়ার চোখের পাতায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে শেষবারের মতো ফিসফিসিয়ে বলল,

“ধন্য তো আমি মায়া, যে তোমার মতো একটা পরিচ্ছন্ন মনকে নিজের করে পেয়েছি। তুমি আমার অন্ধকার জীবনের সেই আলো, যা কখনো নিভবে না। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে শুধু তুমি আছো।”
​দূরের আকাশে তখন সন্ধ্যার প্রথম তারাটা জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রূপোলী থালার মতো চাঁদ মামা তার স্নিগ্ধ আলোর চাদর বিছিয়ে দিল ওদের ওপর। যেন জোছনার সেই মায়াবী আলোয় চাঁদ মামা নিজেই ওদের এই মিলনের সাক্ষী হতে নেমে এসেছে, আশীর্বাদ করছে ওদের নতুন পথচলাকে। গোধূলির আলো পেরিয়ে চারিপাশে নেমে এসেছে এক শান্ত, শীতল বাতাস। সেই বাতাসে মিশে আছে এক অদ্ভুত মাদকতা, যা কেবল দুটি প্রেমিক হৃদয়ই অনুভব করতে পারে। ​ঠিক এমন সময় চারপাশের এই মায়াবী পরিবেশকে সাক্ষী রেখে কৌশিক মায়াকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। মায়ার কানের কাছে মুখ নামিয়ে, গভীর অনুভূতির সুরে গেয়ে উঠল মনের সবটুকু আকুলতা দিয়ে:

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪১

​ ❝নেশা নেশা একি নেশা চোখে
ভুলে থাকতে পারি না তোকে
বেগানা ইচ্ছে গুলো তোকে কাছে চায়
জানি না, কীভাবে…
প্রেমেরই আবেশে স্বপ্ন যে ঘিরে আসে…
দিওয়ানা দিল যায় রে ভেসে
দিওয়ানা তোকে ভালোবেসে।
​ দিওয়ানা দিল যায় রে ভেসে
দিওয়ানা তোকে ভালোবেসে…❞

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here