Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৭

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৭

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৭
insia isha chowdhury

রাফির চিৎকার আর হইচইয়ে মুহূর্তেই সিকদার বাড়ির শান্ত পরিবেশে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্যের ঢেউ বয়ে গেল। কে এভাবে বাড়ির ভেতর এত জোরে ডাকাডাকি করছে কৌতূহল আর বিস্ময়ে একে একে সবাই ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হলো। নাফিম সাহেব ভ্রু কুঁচকে একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। বাড়ির ভেতরে উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা চিৎকার-চেঁচামেচি তিনি কোনোদিনই পছন্দ করেন না। তার উপর রাফি যে এত বছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরেই সোজা এখানে চলে এসেছে, সে খবরও কেউ আগে জানত না। বিষয়টা তাকে বেশ অবাক করে দিয়েছে।
অন্যদিকে রোকসানা খাতুনও বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছেন। হৃদয়ের কোলে বসে থাকা ছোট্ট রোহিত নিষ্পাপ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“বাবা, এই আংকেলটা এমন চিৎকার করছে কেন?”
এদিকে রাফির কোনো হুঁশ নেই। হাতে থাকা প্রায় সব উপহারের ব্যাগ সোফার উপর রেখে সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল নিজের ফুফুর কাছে। রোকসানা খাতুনের দু’হাত নিজের হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“কেমন আছেন, ফুপুজান?”
নিজের ভাইয়ের একমাত্র ছেলেকে এতদিন পর সামনে দেখে রোকসানা খাতুনের চোখ-মুখও আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। স্নেহভরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“আমি তো ভালোই আছি। কিন্তু তুই এমন অস্থির হয়ে আছিস কেন? কী হয়েছে?”
রাফি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
“ও কিছু না।”
কথাটা বলেই সে চলে গেল নাফিম সাহেবের কাছে।
“ফুপা, আপনার শরীর কেমন এখন? ভালো আছেন তো?”
এরই মাঝে হৃদয় এগিয়ে এসে সজোরে রাফির পিঠে চাপড় মারল।
“ব্যাটা! দেশে এসেছিস, আর একটা খবরও দিলি না? একদম আকাশ থেকে পড়ার মতো এসে হাজির হয়েছিস! আমি তো তোকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছি।”
রাফি হেসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

“আর বলিস না! সবকিছু হঠাৎ করেই প্ল্যান হয়ে গেল।”
“ও আচ্ছা!”
হৃদয় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তামান্নার দিকে ইশারা করে বলল,
“এটা আমার বউ, তোর ভাবি।”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রভাবে সালাম জানিয়ে বলল,
“কেমন আছেন ভাবি? আশা করি ভালো আছেন।”
তামান্না হেসে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালোভাবেই পৌঁছেছি। তার মানে আমিও ভালো আছি।”
কথাটা বলেই রাফি আবার অস্থির দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাতে শুরু করল। যেন কাউকে খুঁজছে।কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়িতে তো সবাইকে দেখছি… কিন্তু সুজি কোথায়? ও কি বাইরে গেছে?”
তামান্না বিস্মিত হয়ে বললেন,

“সুজি? সুজি কে?”
তামান্না কিছু বুঝে ওঠার আগেই হৃদয় হেসে ফেলল।
“আরে, তুমি বুঝতে পারোনি? ও সূচনার কথা বলছে। ছোটবেলা থেকে ওকে সুজি বলে ডাকে।”
এরপর রাফির দিকে তাকিয়ে খানিকটা সতর্কতার সুরে বলল,
“তোর এই অভ্যাসটা এখনো গেল না? সূচনা আর ছোট নেই। এখন আর ওকে সুজি বলে ডাকিস না।”
রাফি মাথা চুলকে বিব্রত হাসল।
“আরে, ছোটবেলার অভ্যাস তো! জন্ম থেকেই ওকে এই নামে ডেকে আসছি। এত সহজে কি অভ্যাস বদলানো যায়?”
হৃদয় এবার গম্ভীর স্বরে বলল,
“অভ্যাস বদলানো কঠিন ঠিকই, কিন্তু সূচনা এখন বড় হয়েছে। ওকে আর সুজি বলে ডাকা যাবে না।”
তামান্নাও হেসে যোগ করল,
“হ্যাঁ, শুধু বড়ই হয়নি, সূচনার তো এখন একটা—

কথাটা আর শেষ করা হলো না। ঠিক সেই মুহূর্তে সূচনার হালকা গলার আওয়াজ ভেসে আসলো। নিজের নাম এত জোরে, এত আপন ভঙ্গিতে কে ডাকছে সেই কৌতূহলই তাকে ঘর থেকে বের করে এনেছে। অবশ্য নিচে আসার আগে সে অনেক ভেবেছে। কোনো ভুলভাল কাজ করেছে কি না, কেউ তার নামে নালিশ নিয়ে এসেছে কি না? এমন অদ্ভুত সব চিন্তাও মাথায় এসেছিল। পরে নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছে, গত কয়েকদিনে তো এমন কিছু করেনি যে কেউ বিচার দিতে চলে আসবে!
কিন্তু উপরতলা থেকে নিচে তাকিয়ে যখন সে ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটিকে দেখল, তখনও চিনতে পারল না। অফ-হোয়াইট রঙের শার্ট, নীল জিন্স, লম্বা সুঠাম গড়ন চেনা চেনা লাগলেও পরিচয়টা ধরা দিল না। সূচনার ঠিক পেছনেই নেমে আসছিল প্রণয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে রাফির দৃষ্টি আর কোথাও আটকে রইল না। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সূচনার দিকে। সময় যেন আচমকা থেমে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো সেই ছোট্ট, চঞ্চল মেয়েটার মুখ। অথচ আজ…আজ সে আর সেই ছোট্ট সুজি নেই।

ঘর থেকে অমন ডাক শুনে সূচনা ওভাবেই বের হয়ে আসছিল কিন্তু প্রণয়ের ধমক খেয়ে তাড়াহুড়ো করে মাথায় ওড়নাটা গুছিয়ে নিয়েছিল সূচনা। গোলাপি রঙের সেই ওড়নাটা তার মুখটাকে আরও কোমল করে তুলেছে। কানে ছোট্ট সোনালি ঝুমকা, নাকে হীরের নাকফুল। সব মিলিয়ে তাকে আজ যেন একেবারে নববধূর মতো লাগছে। রাফির বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। তার মনে হলো, চারপাশের সমস্ত শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত মানুষের কথাবার্তা, হাসি, কোলাহল কিছুই আর তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। পুরো পৃথিবীটা যেন হঠাৎ সাদা-কালো হয়ে গেছে। শুধু একজন মানুষ রঙিন। শুধু সূচনাই স্পষ্ট। শুধু সূচনাই জীবন্ত।
আর সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে থাকা রাফির কাছে মনে হলো, তার বহুদিনের যত অপেক্ষা, যত কল্পনা, যত না-বলা স্বপ্ন— সবকিছুর রূপ যেন আজ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ সূচনা এখনো ভীষণ বিভ্রান্ত। সে বুঝতেই পারছে না এই মানুষটা আসলে কে? আর কেন তার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে?

রাফির ভেতরে তখন যেন অনুভূতির এক প্রবল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বহু বছরের অপেক্ষা, হাজারো‌ স্মৃতি, শৈশবের অসংখ্য মুহূর্ত আর অদেখা ভবিষ্যতের কতশত কল্পনা একসঙ্গে এসে তার হৃদয়কে এমনভাবে আলোড়িত করছিল যে সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সূচনাকে দেখেই তার সমস্ত হুঁশ-জ্ঞান যেন উধাও হয়ে গেল। সে আর আশপাশের কাউকে দেখল না। কোন কিছুই আর ভাবলো না। শুধু দ্রুত পায়ে সূচনার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল।
সূচনা তখন তার থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে। আচমকা একজন অচেনা যুবককে নিজের দিকে এত দ্রুত এগিয়ে আসতে দেখে সে হতভম্ব হয়ে গেল। কিন্তু প্রণয় বুঝতে পেরেছিল। এক মুহূর্তের জন্যও তার দৃষ্টি এড়ায়নি রাফির চোখ থেকে।

আর সেই চোখের ভাষা তার মোটেও পছন্দ হলো না।
রাফি যখন প্রায় ছুটে এসে সূচনাকে জড়িয়ে ধরার মতো দূরত্বে পৌঁছে গেছে, ঠিক তখনই প্রণয় দ্রুত সূচনার বাহু ধরে তাকে নিজের দিকে সরিয়ে নিল।
আর সেই মুহূর্তেই রাফির ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এল বহু বছরের চেনা একটি ডাক– সুজি!
কিন্তু পরের মুহূর্তেই ঘটল বিপত্তি। অতিরিক্ত উত্তেজনায় নিজের গতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল রাফি। সামনে সূচনাকে না পেয়ে ভারসাম্য রাখতে না পেরে সে সোজা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। শব্দটা ড্রয়িংরুমজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে উপস্থিত সবাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন বুঝতেই পারল না ঠিক কী হলো। রোকসানা খাতুন আঁতকে উঠলেন। তামান্না বিস্ময়ে মুখ ঢেকে ফেললেন।
নাফিম সাহেব কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন।
ছোট্ট রোহিত তো পুরো বিষয়টাকেই এক ধরনের বিনোদন ভেবে বিস্ফারিত চোখে দেখছে।
কেবল একজন মানুষ ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার।
প্রণয়। তার মুখে কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো বিচলিত ভাবও নেই। যেন যা হওয়ার ছিল, ঠিক তাই হয়েছে। এদিকে সূচনাও তখন অবাক হয়ে গেছে।

“সুজি” নামটা সে বহু বছর ধরে কারও মুখে শোনেনি।
আর এই ডাকটা শুনেই হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল।
রাফি! তার মামাতো ভাই। শৈশবে যে তাকে সবসময় এই নামেই ডাকত। সবার আগে হৃদয় এগিয়ে গেল।
সে রাফির হাত ধরে টেনে উঠিয়ে বলল,
“ব্যাটা, তুই এখনও আগের মতোই আছিস দেখছি!”
রাফি কোনো মতে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার আগেই সূচনার ঠোঁট থেকে আস্তে করে বেরিয়ে এল,
“রাফি…”
শুধুমাত্র একটি শব্দ । তবুও সেই শব্দটা প্রণয়ের কানে মোটেও ভালো লাগল না। তার ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকে উঠল। দৃষ্টি ধীরে ধীরে সূচনার দিকে ঘুরে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার। সে নিজে কতবার চেয়েছে সূচনা তার নাম ধরে ডাকুক। কিন্তু মেয়েটা কখনো সেভাবে ডাকেনি। গতকাল রাতে শুধু ভয়ে তাকে ডেকেছিল। আর আজ? একজন ছেলেকে দেখে এত সহজে নাম ধরে ডেকে ফেলল! কারণটা যুক্তিসঙ্গত হলেও প্রণয়ের ভালো লাগল না।
একদমই না। এদিকে রাফিকে সোফায় বসিয়ে দেওয়া হলো।সে বসে কিছুক্ষণ নিজের হাঁটুতে হাত বুলিয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করল।
তারপর মুখ তুলে আবার সূচনার দিকে তাকাল।
ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,

“হ্যালো, সুজি।”
সূচনা কী উত্তর দেবে ভেবে উঠতে পারল না।
কিন্তু তার আগেই ভেসে এলো একটি ভারী, দৃঢ় এবং স্পষ্ট কণ্ঠস্বর।
“স্টপ কলিং হার সুজি।”
মুহূর্তেই রাফির মুখের হাসি থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে কণ্ঠস্বরের উৎসের দিকে তাকাল।
এবার প্রথমবারের মতো সে পুরো মনোযোগ দিয়ে প্রণয়কে দেখল। লম্বা গড়ন। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ।
পরনে ক্রিম রঙের শার্ট। চোখে এক ধরনের অদ্ভুত স্থিরতা। রাফি এই মানুষটিকে চেনে না। জীবনে কখনো দেখেওনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর কয়েক পা এগিয়ে এসে প্রণয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“হু আর ইউ টু গিভ মি অর্ডার্স? আর আপনি কে?”
প্রশ্নটা শুনে প্রণয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
প্রথম থেকেই ছেলেটার ব্যবহার তার ভালো লাগছিল না। প্রথমে তার স্ত্রীর দিকে ওভাবে ছুটে যাওয়া। তারপর বারবার

“সুজি” বলে ডাকা।
প্রণয় এক মুহূর্তও দেরি করল না। ধীরে ধীরে সূচনার এক বাহুতে হাত রাখল। তারপর তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আই অ্যাম হার হাজব্যান্ড।”
এক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,
“আবরার প্রণয় মির্জা। আশা করি এখন বুঝতে পেরেছেন।”
কথাগুলো বলার সময় প্রণয়ের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও রাফির মুখ থেকে সরেনি। কিন্তু রাফি যেন শুনেও বিশ্বাস করতে পারল না।
তার মুখের রং ধীরে ধীরে বদলে গেল। অতিরিক্ত ক্রোধে ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল।ৎসে একবার প্রণয়ের দিকে তাকাল। আবার সূচনার দিকে।
তারপর আবার প্রণয়ের দিকে। মানে রাফি কথাগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো সমীকরণই মেলাতে পারছে না।

হঠাৎ করেই রাফি জোরে হেসে উঠল। এমনভাবে হাসল যেন কেউ পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত কৌতুকটা বলেছে। প্রণয়ের ভ্রু আরও কুঁচকে উঠল। তার কাছে ব্যাপারটা মোটেও হাসির নয়।
বরং অপমানজনক। কোনো মতে হাসি সামলে রাফি বলল,
“ফালতু একটা মজা ছিল!”
তারপর সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা কি কোনো প্র্যাঙ্ক হচ্ছে?”
এবার নাফিম সাহেবের ধৈর্যের বাঁধে সত্যিই চিড় ধরল। তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। প্রণয় এই পরিবারের নতুন সদস্য। এই বাড়ির একমাত্র জামাই। আর সেই মানুষটার সঙ্গে এমন অবিবেচকের মতো আচরণ তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না। তার উপর রাফি বারবার এমন আচরণ করছে যেন সূচনার বিয়ের খবরটা সে জানেই না।
হৃদয় রাফিকে খুব ভালো করেই চিনত। রাফির স্বভাব, আচার আচরণ সবকিছুই হৃদয়ের অজানা ছিল না। তাই এই মুহূর্তে রাফির মুখের অভিব্যক্তি দেখে সে বুঝতে পারল, ছেলেটা একটুও মজা করছে না। বরং তার চোখেমুখে এমন এক বিস্ময় আর অস্থিরতা ফুটে উঠেছে। কিছুটা অবাক হয়েই হৃদয় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কেন রাফি, তুই সূচনার বিয়ের কথা জানিস না?”

কথাটা শুনেই রাফি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মানুষের মতো তড়িৎ গতিতে মাথা তুলে হৃদয়ের দিকে তাকাল। চোখে অবিশ্বাস স্পষ্ট। যেন সে ঠিকমতো শুনতে পায়নি। রাফিকে চুপ করে থাকতে দেখে হৃদয় নিজেই আবার বলতে শুরু করল,
“হ্যাঁ, আমরা তোকে ফোন করেছিলাম। তোকে ইনভাইট করার জন্যই। কিন্তু তখন মামি বললেন, তিনি নাকি তোকে সবকিছু জানিয়ে দেবেন। আমিও পরে কয়েকবার ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু নম্বরটা বন্ধ পাই। পরে শুনলাম তুই নাকি নম্বর বদলে ফেলেছিস। আর মামি তো বললেন, তুই খুব করে বিয়েতে আসতে চেয়েছিলি, কিন্তু ছুটি না পাওয়ায় আসতে পারিসনি। তাই আমরাও আর কিছু ভাবিনি। কিন্তু এখন তোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তুই সত্যিই কিছুই জানিস না। আর বল তো, সূচনার বিয়ে নিয়ে আমরা প্র্যাঙ্কই বা কেন করব?”
হৃদয়ের প্রতিটি শব্দ ধারালো ছুরির মতো এসে রাফির বুকের ভেতর বিঁধতে লাগল। মনে হলো কেউ তার হৃদপিণ্ড টা খামছে ধরে রেখেছে। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ করেই দূরে সরে গেল। কিছুই আর কানে আসছে না। শুধু একটা কথাই মস্তিষ্কের ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল,

“সূচনার বিয়ে হয়ে গেছে…”
তার সুজি তার ভালোবাসার মানুষ অপেক্ষার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা এখন অন্য কারও স্ত্রী হয়ে গেছে। আর সে? সে কিছুই জানল না।
নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটার খবরটুকুও তার কাছে পৌঁছায়নি। শুকনো ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল রাফির। গলা দিয়ে শব্দ বের করতেও কষ্ট হচ্ছিল। তবুও কোনোমতে নিজেকে সামলে সে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সুজির… বিয়ে হয়েছে কবে?”
হৃদয় এক মুহূর্ত ভেবে হাতে হিসাব করে বলল,
“আজকে দিয়ে চার দিন।”
এইকয়েকটি শব্দই রাফির সমগ্র পৃথিবীটাকে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
চার দিন আগে তার সুজি কারও হাত ধরে নতুন জীবনে পা রেখেছে। চার দিন আগে সে চিরতরে হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। আর সে কিছুই জানেনি। মুহূর্তের মধ্যেই রাফির মনে পড়ে গেল গত সপ্তাহের ঘটনাগুলো। তার মা বারবার তাকে নম্বর পরিবর্তন করার কথা বলছিলেন। অদ্ভুতভাবে জোর করেই বলছিলেন। রাফি কখনোই মায়ের কথা অমান্য করত না। ছোটবেলা থেকে মায়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সে চোখ বন্ধ করে মেনে এসেছে। তাই কোনো প্রশ্ন না করেই নম্বর বদলে ফেলেছিল।
কিন্তু আজ সবকিছু একসুতোয় গাঁথা মনে হচ্ছে।
ধীরে ধীরে সত্যিটা তার সামনে স্পষ্ট হতে লাগল।
তাহলে কি ইচ্ছে করেই তাকে কিছু জানতে দেওয়া হয়নি? তার বুকের ভেতর হঠাৎ করেই এক অসহনীয় যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল। কেউ জানত না সে সূচনাকে ভালোবাসে। সবার কাছে বিষয়টা গোপন ছিল। কিন্তু একজন মানুষ তো জানতেন। তার মা।

তিনি খুব ভালো করেই জানতেন সূচনা তার কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জানতেন, বছরের পর বছর ধরে সে মেয়েটিকে নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর জায়গায় আগলে রেখেছে।
তবুও তার মা কিভাবে এটা হতে দিলেন? কীভাবে তিনি সূচনার বিয়ের খবরটা নিজের ছেলের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারলেন? কেন তাকে একবারও জানালো না?
রাফির মুখের বিষণ্নতা আর অস্থিরতা দেখে সূচনার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে সে রাফিকে হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মানুষ হিসেবেই দেখে এসেছে। কয়েক পা এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে সে বলল,
“ভাইয়া, তুমি প্লিজ মন খারাপ করো না। তুমি আমার বিয়েতে অ্যাটেন্ড করতে পারোনি বলে তোমার খারাপ লাগছে, আমি সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু তুমি একদম চিন্তা করো না। আমরা সবাই একসাথে অনেক ঘুরতে যাব, অনেক সময় কাটাব। দেখবে, তখন আর তোমার মন খারাপ লাগবে না।”
কথাগুলো বলতে বলতে সূচনার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসি রাফির বুকের ভেতরের ঝড়টাকে একটুও শান্ত করতে পারল না।
রাফি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সূচনার দিকে।ইশ…যদি মেয়েটা একবার বুঝতে পারত তার মন খারাপের প্রকৃত কারণটা!

যদি বুঝতে পারত, সে কষ্ট পাচ্ছে কারণ তার বহু বছরের লালিত ভালোবাসা আজ অন্য কারও হয়ে গেছে। যে মেয়েটিকে ঘিরে সে অসংখ্য স্বপ্ন বুনেছিল, যার সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল, সেই মানুষটাকে আজ অন্য একজন নিজের করে পেয়েছে। এই সত্যটা সে কীভাবে মেনে নেবে? আরও বড় কথা, যাকে সে পৃথিবীর সবথেকে বেশি বিশ্বাস করত, যার কথায় কখনো প্রশ্ন তোলেনি, সেই মানুষটিই তাকে সবচেয়ে বড় আঘাতটা দিয়েছে। নিজের মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার।
এমন সময় সূচনার চোখ পড়ল সোফার উপর সাজিয়ে রাখা অসংখ্য গিফট বক্সের দিকে।
রঙিন মোড়কে মোড়ানো উপহারগুলো দেখে তার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এগুলো কি তুমি আমার জন্য এনেছো? আমার বিয়ের উপহার হিসেবে?”
প্রশ্নটা শুনে রাফি মুহূর্তের জন্য আরও বেশি নির্বাক হয়ে গেল। কী বলবে? কোন উত্তরটা দেবে? তারপর আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। রাফির নীরবতা দেখে সূচনা ভেবেছিল হয়তো এখনও তার মন খারাপ।

তাই তাকে একটু খুশি করার জন্য হাসিমুখে আবার বলল,
“তুমি যে উপহারগুলো এনেছো, এগুলো সত্যিই অনেক সুন্দর।”
কথাটা বলেই হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ার মতো করে সূচনা আবার বলল,
“আর আমি তোমার কাছে সরিও বলতে চাই।”
রাফি অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকাল সূচনার দিকে।
সূচনা কিছুটা সংকোচ নিয়ে বলল,
“সেদিন তুমি আমাকে ফোন দিয়েছিলে? আমি পরে কল লিস্টে তোমার নম্বর দেখেছিলাম। কিন্তু তখন আমি ফোনটা রিসিভ করতে পারিনি। কিছু কারণবশত। তাই আমি সত্যিই দুঃখিত, ভাইয়া।”
কথাগুলো শুনতেই রাফির বুকের ভেতরটা আবারও হাহাকার করে উঠল। তার স্পষ্ট মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। নম্বর পরিবর্তন করার পর অফিসের অসহনীয় ব্যস্ততা, একের পর এক মিটিং, কাজের চাপ সবকিছুর মধ্যে সে যেন দম ফেলার সুযোগও পাচ্ছিল না। অবশেষে যখন কিছুটা স্বস্তির সময় পেয়েছিল, তখন পৃথিবীর আর কারও কথা নয়, সবার আগে তার মনে পড়েছিল সূচনার কথা। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে সূচনার নম্বরে কল করেছিল। ভেবেছিল অনেকদিন পর কথা হবে। কিন্তু সেদিন ফোনটা আর রিসিভ হয়নি।
এদিকে সূচনা একের পর এক কথা বলেই চলেছে।

কিন্তু সেই কথাগুলো রাফির কাছে যেন দূর থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট শব্দের মতো লাগছিল।
আর প্রণয়? সে নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল।
একটি শব্দও বলছিল না। শুধু গভীর দৃষ্টিতে রাফির মুখের প্রতিটি পরিবর্তন লক্ষ্য করে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই রাফিকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রোকসানা খাতুনের মন নরম হয়ে গেল। মায়াভরা কণ্ঠে তিনি বললেন,
“আচ্ছা, এসব কথা পরে হবে। রাফি, তুই আগে একটু বিশ্রাম নে। এত দূর থেকে এসেছিস, নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছিস। আমি তোর জন্য খাবার নিয়ে আসছি।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৬

কথা শেষ করে তিনি ভেতরের দিকে এগোতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন নীলুফা খাতুন। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। ঘরে উপস্থিত সবার দিকে একবার তাকিয়ে তিনি কিছুটা উঁচু স্বরেই বললেন,
“এসবের কোনো প্রয়োজন নেই, রোকসানা। ও শুধু তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এখন ওর বাড়িতে ফিরে যাওয়াই প্রয়োজন।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here