প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৮
ইনান হাওলাদার
প্রতিদিন তূর্য প্রথমে ঘুম থেকে উঠলেও আজকে আহি আগে উঠেছে। সে ওঠার পরপরই তূর্য উঠেছে। প্রতি সপ্তাহের সোমবার সকাল আটটায় চেম্বার থেকে ওর।যার দরুন ঘুম থেকে উঠেই একেবারে গোসলে ঢুকেছে। আহি চুপচাপ কাবার্ড হতে স্বামীর ফরমাল শার্ট, প্যান্ট বের করে সুন্দর করে বিছানার উপর সাজিয়ে রেখেছে।আর পাশে বসে আছে ও। কিছুক্ষণ বাদে কোমরে টাওয়াল পেঁচিয়ে বের হলো তূর্য।এসেই কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল ও।শার্ট বের করে পরার জন্য ভাঁজ খুলতেই আহি বলে উঠলো,
” শার্ট-প্যান্ট তো বের করে রেখেছিলাম ”
তূর্য ওর কথায় কান না দিয়ে শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিলো।আহি গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে।বোতাম লাগাতে থাকা হাত জোড়া থমকালো তূর্যের।
মেয়েটা পিঠে মাঠে রেখে আদুরে গলায় বলল,
” স্যরি বলেছি তো তূর্য ভাই। এবারে অন্তত মাফ করে দিন ”
কিছুটা সময় পার হওয়ার পর গম্ভীর গলায় তূর্য বলল,
” লেইট হচ্ছে আমার, ছাড় ”
” স্যরি এ্যাকসেপ্ট না করলে ছাড়বো না ” বলে আরো বল প্রয়োগ করে কোমর জড়িয়ে ধরলো মেয়েটা। তূর্য ওকে জোর করে নিজের হতে ছাড়ালো। উল্টো দিকে ঘুরে স্ত্রীর মায়াবী চোখে চোখ রাখলো। রাশভারী কন্ঠে বলল,
” তোর কোনো ভুল তো আমি দেখছি না।তাহলে কিসের স্যরি? আর কিসেরই বা এ্যাকসেপ্ট করা !”
তূর্যের ধারণা ছিল এই কথায় হয়তো মুখ ফুলাবে আহি। তারপর অভিমান নিয়ে রুম হতে বেরিয়ে যাবে।কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। মেয়েটা কিছুক্ষণ ভাবুক হয়ে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে ।তারপর তূর্যকে টেনে নিয়ে বিছানায় বসালো।লোমহীন বুকে আঁকি-বুঁকি করতে শুরু করলো। তূর্য মাথা নুইয়ে কিছুক্ষণ ওর হাতের দিকে তাঁকিয়ে রইলো পরপর মুখের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কখন কি মাথায় চলে কে জানে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে রইলো সে।আহি পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে আরম্ভ করলো,
” রাগ-অভিমান করবে স্ত্রীলোক।আপনি স্বামী মানুষ হয়ে এত রাগ করবেন কেন?আপনার কাজ আপনাকে রাগিয়ে দেওয়া।আর আপনার দায়িত্ব আমার রাগ ভাঙানো। সেটা না করে উল্টে মহিলা মানুষের মতো রাগ করে আছেন। এত রাগ মোটেও ভালো না।বলুন ঠিক না বেঠিক? ”
কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তূর্য।তারপর ভাবলেশহীন কণ্ঠে জবাব দিলো,
” বেঠিক! মোবাইল দেখা কমা ”
এমন উত্তরে অসহায় হয়ে এলো মেয়েটার মুখ।তার হাত এখনো তূর্যের বুকে ব্যস্ত।মেয়েটা ঠোঁট উল্টে বলল,
” মামা রাগ করলেন? ”
ভাই থেকে বরে আসতে পারছে না ডিরেক্ট মামাতে চলে গিয়েছে। জা’নোয়ার একটা !
খিটখিটে মেজাজে বলল,
” হ্যাঁ ” তারপর মেয়েটার হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে।
একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো আহি।তবে হাল ছাড়লো না। ফের অসহায় মুখ করে বললো,
” আর কত রাগ করবেন তূর্য ভাই ? আমি এবার সত্যিই ম’রে যাব।বলুন না কি করলে আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন? আগের মতো স্বাভাবিক হবেন?আমি তাই করবো। দয়া করে একবার বলুন ”
” এত কিছু বলতে পারছিস। তবু একবার ভালোবাসি বলতে পারছিস না । আমি তুই নই যে ভালোবাসি শোনার জন্যে ছেলে মানুষী করব।দেখি কবে তোর মনে হয় ভালোবাসি বলি !” প্রেয়সীর অসহায় চোখে চেয়ে আনমনে ভাবলো সে।অতঃপর তৈরি হয়ে একেবারে নিচে নামানো।পিছনে ফেলে রেখে গেল অসহায় মানবীকে।টলমলে চোখে লোকটার চলে যাওয়া দেখছে যে।অতঃপর কিছু মনে করার ভান করে বিছানার পাশ থেকে নিজের মোবাইলটা তুললো। চার্জ নেই মোটেও ,একদম লাল হয়ে আছে।দ্রুত সেটাকে চার্জে লাগিয়ে নিচে নামলো।
তূর্য নিচে নামতেই তাহি কাঁন্না করতে করতে দৌঁড়ে এসে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরেছে।পিছন পিছন পারভিন বেগম বেলন হাতে তেঁড়ে আসছেন। তূর্য আগলে নিলো বোনকে। মায়ের এভাবে তেঁড়ে আসা আর বোনের কাঁন্নার কারণ মিলিয়ে তূর্য গম্ভীর গলায় বলল,
” হোয়াট হ্যাপেন্ড আম্মু? তুমিও মেজো মায়ের মতো শুরু করেছ? মা’রছ কেন ওকে?”
” তোর বোনকে মে’রেছি? খালি খালি নাকে কাঁন্না করা কোথা থেকে শিখেছে আজকে দেখে ছাড়বো আমি ” রেগে আগুন হয়ে আছেন পারভিন বেগম।
মাকে অতিক্রম করে বোনকে নিয়ে ডাইনিংয়ে বসলো তূর্য। ঊরুর উপর বসিয়ে আদুরে কন্ঠে জানতে চাইলো,
” কি হয়েছে,ভাইয়া? আম্মু যে বলল মা’রেনি তাহলে কাঁন্না করছ কেন? ”
” কিন্তু ব’কেছে তো ” বলে দুই হাতে চোখের পানি মুছলো তাহি।
তূর্য নিজেও সাহায্য করলো বোনের চোখের জল মুছতে।অতঃপর বলল,
” দুষ্টুমি না করলে তো বকতো না ”
” আমি দুষ্টুমি করিনি ভাইয়া।” ঘোর আপত্তি জানালো তাহি। তূর্য জানতে চাইলো,
” তাহলে?”
” রাতে সবাই খাওয়ার পর দুই পিস ইলিশ মাছ বাড়তি ছিল।আম্মুকে বলেছিলাম তুমি না খেলে আমার জন্যে রেখে দিতে। তুমি নাকি খাওনি।কিন্তু এখন সেই মাছও নেই। শান্ত ভাইয়া নাহলে প্রান্ত ভাইয়া খেয়ে ফেলেছে মনে হয়।সকাল সকাল খেয়েই কোচিংয়ে পালিয়েছে মনে হচ্ছে। ”
” আচ্ছা ,তো কি হয়েছে? যে খেয়েছে খেয়েছে।তোকে আবার রান্না করে দিলেই তো হলো নাকি? আমি আম্মুকে বলে দিচ্ছি ”
তারপর মাকে ডাকলো সে,
” আম্মু, তাহিকে ইলিশ মাছ রান্না করে দেও । ” পরপর আবার বোনের দিকে চাইলো।জিজ্ঞেস করলো,
” হয়েছে? ”
” অনেক গুলো দিতে বলো ভাইয়া ”
” আচ্ছা “বোনের কথায় সম্মতি জানিয়ে পুনরায় মাকে ডাকলো তূর্য।বলল ,
” আর অনেকগুলো আম্মু ”
খুশিতে সবগুলো দাঁত বের করে হেসে দিল তাহি। তূর্যও ঠোঁট কিছুটা প্রসারিত করলো। তাহি নেমে দাঁড়ালো ওর কোল থেকে।ভাইয়ার মুখ টেনে বাম গালে একটা চু’মু খেল।খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
” তুমি বেস্ট ভাইয়া ” তূর্য দুই হাতে বোনের গাল টেনে দিলো। ওর ঠোঁটে নজর পড়ল তাহির।একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
” তোমার ঠোঁটে কি হয়েছে ভাইয়া? ”
ওর কথায় তূর্য প্রথমে অবাক হলেও মুহূর্তেই আহির করা কান্ড মাথায় এলো। কিছু না জানার নাটক করে বলল,
” কই? ”
” ঐযে নিচের ঠোঁটের বা পাশে ” খুব চিন্তিত মেয়েটার মুখ।
” ফেঁটে গিয়েছে মনে হয়।তোর স্কুল নেই? “কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলো তূর্য।
” দশটায় স্কুল ” কোনো রকমে কথাটা বলে তাহি হাসতে শুরু করলো।তূর্য বুঝলো না বোনের হাসির কারণ।আর জিজ্ঞেসও করলো না ।আবার যদি ঠোঁট নিয়ে পড়ে আরেক জ্বালা।
ইতোমধ্যে আহি এসে পৌঁছেছে।সে তাহিকে ওভাবে হাসতে দেখে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” কিরে? এত হাসছিস কেন তাহি ?”
” মানুষের শীতকালে ঠোঁট ফাঁটে আর ভাইয়ার নাকি গরমকালে ফেঁটেছে ” বলে আবার হাসতে শুরু করলো মেয়েটা। লতা বেগম তূর্যের খাবার নিয়ে ডাইনিংয়ে আসলেন। ছেলেটার সামনে খাবার রাখতে রাখতে পরামর্শ দিলেন তিনি,
” রাতে শোয়ার আগে একটু ভ্যাসলিন লাগিয়ে রাখবি তাহলে আর ফাঁটবে না ”
” মিথ্যুকবাজ!” লতা বেগম যেতেই বিড়বিড় করলো আহি।ওর কথা শুনে খেতে খেতে থামলো তূর্য। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তার দিকে। বিরক্ত গলায় বলল,
” সত্যবাদী, সত্যকবাজ সত্য বল ”
” ঠোঁট আপনার , ফেঁটেছে কি করে আমি কিভাবে জানবো? ” মিনমিন করলো ও। তাহি বিরক্ত হলো ওদের উপর। বলল,
” বিয়ের পরেও তোমরা এভাবে কথা বলছো কেন?আর ভাইয়া মিথ্যা বলে না তুমি জানো কিন্তু ভাবিপু ”
” শোন তোর ভাইয়ের কাছে মিথ্যা বলেছে কিনা ” বলে মিটিমিটি হাসলো আহি। তাহি তূর্যের মুখের দিকে তাকালো।অর্থাৎ সে সত্যি জানতে চায়। তূর্য বলল,
” কাঁমড়েছে , পোকা কাঁমড়েছে ”
” তোমাদের রুমে এত পোকা ভাইয়া? আহিপুকে কাঁমড়ায় ,তোঁমাকে কামড়ায়। দাঁড়াও আমি পোকা মেরে আসি ” বলে পোকা মা’রতে ওদের রুমে দৌঁড়ালো তাহি। অথচ ঘরের দুই পোকা-ই এখানে। ও যেতেই আহি কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
” আমাকে পোকা বললেন তূর্য ভাই ? ”
” ই’ডিয়ট ”
রাত দশটার বেশি বাজে । প্রতিদিন সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফেরে তূর্য।কোনোদিন কোনো কারণে যদি দশটা মিনিটও দেরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বাড়িতে জানিয়ে রাখে সে। এটা তার বরাবরের অভ্যাস । সেখানে দেড় ঘন্টার বেশি হয়ে যাচ্ছে তাও তার খোঁজ নেই। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত আহি। কল করার সাহসও পাচ্ছে না।এমনিতেই রে’গে আছে লোকটা কল করলে নির্ঘাত শক্ত কথা বলবে।আর ইদানিং তূর্যের একটু গম্ভীর কন্ঠের কথাও সহ্য হয় না মেয়েটার।ভেতর থেকে হুঁ হুঁ করে কাঁন্না তেঁড়ে আসে। সে দোমোনা করতে করতে কল করলো। অপরাধ যখন করেই ফেলেছে একটু তো কঠিন কথা শুনতেই হবে। তাছাড়া রাগ ভাঙার হাতুড়ি তো সে পেয়েই গিয়েছে।তাহলে আর অপেক্ষা কিসের? তাই খুশি খুশি মনে মোবাইল কানে ধরে রাখলো সে।বেশ কয়েকবার কল করার পর রিসিভ হলো।সাথে সাথে আদুরে গলায় ডাক ছাড়লো মেয়েটা,
” তূর্য ভাইইইই ”
” বল ” তেঁতোর থেকেও তেঁতো কন্ঠের কন্ঠ তূর্যের।
” কখন থেকে কল করে যাচ্ছি।কোথায় আপনি ? ” অভিযোগ দায়ের করল সে।
তূর্য প্রথমে চাইলো একটা কড়া কথা শোনাতে। পরে আবার নিজের জ্বিভ সামলে নিল।অভিমান না হয় আছে অভিমানের জায়গা। স্ত্রী হিসাবে ওর সম্পূর্ণ অধিকার আছে তার স্বামী কোথায় আছে জানার।তাছাড়া এখনের ব্যবহার তো সম্পূর্ণ নাটক।শুধু ‘ ভালোবাসি ‘ শব্দটা শোনার পাঁয়তারা। সে গম্ভীর গলায় বলল,
” নাবিলদের বাসায়। ”
” কখন ফিরবেন? ”
” তোমার যখন দরকার ” পাশ থেকে ফোঁড়ন কাটলো নাবিল। তূর্য ওর দিকে একবার বিরক্ত চোখে তাঁকালো।গোপনে মোবাইলের সাইড বাটন চেপে সাউন্ড খানিকটা কমিয়ে নিলো।
অতঃপর রাশভারী গলায় বলল,
” কি দরকার তোর ? ”
” আপনাকে ”
” আচ্ছা ”
” শুধু আচ্ছা ? আসবেন কখন ? ”
” একটু পর । রাখ এখন ”
” আচ্ছা ! কিন্তু ভালোবাসি ”
মোবাইল কান থেকে নামিয়ে নিচ্ছিল তূর্য। ‘ ভালোবাসি ‘ শব্দটা শুনে থমকাল ও। তবে পুরোপুরি স্যিওর হতে পারলো না।সত্যিই চার অক্ষরের ঐ কথাটা বলল আহি? ও মোবাইল কানে নিয়ে দ্রুত প্রশ্ন করলো,
” কিছু বললি তুই? ”
” হ্যাঁ বললাম তো ” উদাসীন গলা আহির ।
” কি বললি জাআআআ ” বলতে গিয়ে থামলো তূর্য।পাশেই শকুনের দৃষ্টি মেলে তাঁকিয়ে আছে নাবিল। নিজেকে শুধরে বলল,
” কি বললি? ”
” বললামমমম ” একটু থামলো আহি।তারপর উল্টে নিজে প্রশ্ন করলো,
” কেন আপনি শুনতে পাননি?”
” আরেকবার বল তো ”
” আচ্ছা ”
মোবাইল কানে নিয়ে অপেক্ষা করলো তূর্য। অজান্তেই বুকের ভিতরটা ধুপধাপ করছে। সম্পর্কে পূর্ণতা পাওয়ার পরেও এতোকুতু একটা শব্দ শুনতে মানুষের এতটা উতলা কি ঠিক? কিন্তু মেয়েটা এত সময় কেন নিচ্ছে কে জানে।ইচ্ছা করছে এখনই মোবাইল ফুঁটো করে তার কাছে চলে যেতে।অধৈর্য হয়ে তাঁড়া দিলো সে।বললো,
” কি হলো বল ”
” বললাম তো! ‘ আচ্ছা ‘ বলেছিলাম ”
” আচ্ছা বলার পর কিছু একটা বললি না? ”
” কই? কি বললাম? ”
আহির দুষ্টুমি বুঝলো না তূর্য।হয়তো সে ভুল শুনেছে। কেমন টিনেজদের মতো করছে। শুধু শুধু কানে ‘ ভালোবাসি ‘ বাজছে । বিরক্তিকর ব্যাপার একটা। নিজের উপর হাসলো সে। মেয়েটা ওকে ভালোবাসে সেটা সে জানে ,বুঝে। তবুও একটাবার ওর মুখে শোনার এত ইচ্ছা কেন? কেন এত বাসনা ? দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। বলল,
” আচ্ছা! রাখ তাহলে ”
” আচ্ছা! ভালোবাসি ”
বলে পুপ করে কল কেঁটে দিল আহি।পরপর মুচকি হাসলো।অবশ্য পুরোটা সময়ই মুখে দুষ্টু হাসি লেপ্টে ছিল।
কিন্তু এবারে চমকালো তূর্য। দুই দুই বার ভুল শুনলো সে ? মানতে পারলো না ও। নিশ্চয় দুষ্টুমি করছে ই’ডিয়টটা। বাড়ি ফিরলে বোঝা যাবে পাগলের মনে কি চলছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে এই জায়গা প্রচন্ড বোরিং লাগছে ওর। ভিতরটা ছটফট করছে বাড়ি ফেরার জন্য।
সময়ের সাথে সাথে নিজের ভিতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকলো তূর্যের। সেই অস্থিরতাকে আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিলো আহি।ছোট্ট করে ম্যাসেজ লিখলো,
‘ যেটা বলেছি ।বাড়ি ফিরলে আবার বলবো ‘
ম্যাসেজটা দেখে এবারে পুরোপুরি নিশ্চিত হলো তূর্য। আর এক সেকেন্ড এখানে থাকার ইচ্ছা নেই ওর।এদিকে পিংকি জোর গলায় বলে গিয়েছে ডিনার এখানে করতে।মেয়েটা অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্নার জোগাড় করছে। রান্না প্রায় হয়েও এসেছে।কি করবে না করবে দিক-দিশা খুঁজে পাচ্ছে না সে। ম্যাসেজটা পড়ে আর এক মুহূর্ত দেরি সহ্য হচ্ছে না ওর।অতঃপর নাবিলকে বলে দিশেহারা হয়ে বেরিয়ে পড়ল।এটাকে কেমন পাগলামি বলে? নাবিল ওর পিছু ছুটলো। উতলা হয়ে জানতে চাইলো,
” কি হইলো বা’ড়া।ওমনে ছুটোস ক্যান?”
ততক্ষণে গাড়িতে উঠে পড়েছে তূর্য। স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
” নাথিং। কাল দেখা করব তোর সাথে।পিংকিকে মন খারাপ করতে না করিস। একটু ইমারজেন্সি।”
” আরে আমার বউডা যে কষ্ট করে রান্না করলো তার কি হইব? কিসের এত ইমারজেন্সি বা’ড়া? ”
দৃষ্টি সীমানার বাইরে তূর্যের গাড়ি।কি ইমারজেন্সি একবার যদি এদের কানে যায় তাহলে আর মনে হয় না ছেলেটার রক্ষে থাকবে।
নাবিলদের ফ্ল্যাট থেকে চৌধুরী বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়। রাস্তায় যানজট না থাকে পনে এক ঘন্টা লাগে হয়তো। সৌভাগ্যবশত আজ রাস্তায় কোনো যানজট ছিলও না। চৌধুরী বাড়ির গেইটে পৌঁছাতে প্রায় আধ ঘন্টার মতো সময় লেগেছে তূর্যের।আসিফ চৌধুরীও মাত্র গেইট পেরিয়ে ঢুকলেন।সাথে ড্রাইভার রহিম মিয়া আছেন। ওনাদের পর গাড়ি পার্কিং এরিয়াতে রাখতে হবে।এইমুহূর্তে এতটা সময় নষ্ট করতে চাইলো না ছেলেটা। গেইট দিয়ে কোনোরকমে গাড়িটা ঢুকিয়ে নেমে পড়ল। রহিম মিয়াকে ডেকে বলল,
” চাচা গাড়ি পার্কিং এরিয়াতে রেখে দিয়েন। চাবি রেখে যাচ্ছি ”
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হেঁটে ভিতরে ঢুকল সে। ড্রয়িং রুমের বড় লাইট অফ করা।অর্থাৎ গিয়ে রুমেই পাবে।বিরাট বড় টেনশন গেল। তবে কক্ষে প্রবেশের আগে নিজেকে একদম স্বাভাবিক করে নিল। যতটা ব্যস্ততা দেখিয়ে বাড়িতে ফিরেছে এখন ঠিক ততটাই শান্ত হয়ে রুমে ঢুকলো।আহি পড়তে বসেছিল। ও রুমে ঢুকতেই আহি বলল,
” এসেছেন ? ”
” হু ” বলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তূর্য।হাতের ঘড়ি খুলে রাখতে রাখতে আহিকে একবার দেখে নিল। সে বই-খাতা গোছাতে ব্যস্ত। বিছানা থেকে সেগুলোকে তুলে টেবিলে গুছিয়ে রেখে বলল,
” খাবেন না ? ”
সে প্রসঙ্গে গেল না তূর্য। বলল,
” কিছু বলবি বলেছিলি ” একদম স্বাভাবিক কন্ঠস্বর তার।না আছে বিগত দেড় ঘণ্টা যাবত করা তাড়াহুড়ো ,না আছে কোনো অস্থিরতা। আহি ভোলাভালা মুখ করে বলল,
” কই? ”
এত নাটক আর নিতে পারছে না তূর্য। তার ধৈর্য বরাবরই কম। মেয়েটার দিকে ফিরে কড়া গলায় বলল,
” টেক্সট দিসনি আমাকে? ”
” দিয়েছি ? ” যেন আকাশ থেকে পড়ল সে। তূর্য দ্বিতীয় কোনো শব্দ ব্যয় করল না। কয়েক সেকেন্ড রুষ্ট চোখে তাকিয়ে থেকে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল।আহি অতি কষ্টে হাসি চেপে ওয়াশরুমে ঢুকলো। তূর্য রাগে রাগে কোনো রকমে ট্রাউজার পরে উদাম শরীরে ল্যাপটপ নিয়ে কাউচে বসলো। তার আগে লাইট একটা অফ করে এসেছে। এত আলো খুব চোখে লাগছে।এখন ঘরটায় নিভুনিভু আলো। একটা নির্মল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এই মুহূর্তে নিজের ভিতরের রাগ কিবোর্ডের উপর দেখাচ্ছে সে।ও ভালো করে খেয়াল করেছে সুযোগ পেলেই আহি ওর দুর্বলতা নিয়ে টানা-হেঁচড়া করে। এটা বরাবরের স্বভাব মেয়েটার। মনে মনে যখন রাগের স্তূপ গড়ছিল সে ,সেই মুহূর্তে একটা কালো ছায়া এসে লম্বালম্বি ভাবে ল্যাপটপ আর ওর মুখের উপর এসে পড়লো। ছায়ার উৎস খুঁজতে সামনে তাঁকালো ও।যদিও জানে আহি ছাড়া আর কে-ই বা হবে। সে একপলক তাকিয়ে আবার ল্যাপটপে চোখ দিলো।সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার চোখ তুলে তাকালো সামনে।
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৭
ও ঠিক দেখলো? শাড়ি পরেছে আহি? হ্যাঁ,সত্যিই তো পরেছে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার স্ক্যান করে নিল সে। কি চাইছে স্টু’পিডটা? এত রাতে শাড়ি পরে ফায়দা কি? কি ভেবেছে শাড়ি পরে সব ভুলিয়ে দিবে? নিজের উপর সম্পূর্ণ কন্ট্রোল আছে তার। শুধু মাত্র শাড়ি পরাতেই গলবে না সে। একদম গলবে না ! ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে গেলেও না।
