Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৬

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৬

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৬
বন্যা সিকদার

​মৌ আর মেহের দুজনেই ক্লাস শেষে গুটি গুটি পায়ে করিডোর দিয়ে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণে মৌ হুট করেই মেহে’রের হাত ছেড়ে দিয়ে সামনের দিকে দৌড় দিল।
​মেহের মৌ’কে ওভাবে হঠাৎ ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে দেখে নিজের জায়গায় পুরো স্তব্ধ ও হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কিছুতেই মাথায় খাটিয়ে বুঝতে পারছিল না এই ভর দুপুরে মৌ হঠাৎ কেন এভাবে ‘ভৌ দৌড়’ দিল। মেয়েটা আসলে হুটহাট কখন যে কী করে বসে‚ তা মেহেরের সাধারণ বুদ্ধির একেবারেই বাইরে। তার মনটা তো ওই ডানপিটে চাতক পাখির মতোই চঞ্চল; এই এখানে আছে তো পরক্ষণেই আবার অন্য কোথাও হারিয়ে যায়। ​মৌ কেন অমন পাগলের মতো চলে গেল তার পেছনের আসল কারণটা বুঝতে মেহেরের অবশ্য খুব বেশি সময় লাগল না। পরক্ষণেই যখন সে করিডোর পেরিয়ে কিছুটা দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে সাব্বিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল‚ ওমনি মেহেরে’র নিজের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে মিষ্টি হাসি আপনা আপনি ফুটে উঠল। এখন আর তার বুঝতে বাকি রইল না যে মৌ আসলে কেন ওভাবে উধাও হয়েছিল। মেহেরও নিজের মনের ভেতরের চেনা কাঁপনটা লুকিয়ে ধীরপায়ে মৌয়ের পিছু নিল।

​ততক্ষণে মৌ এক লাফে গিয়ে সরাসরি সাব্বিরে’র চওড়া বুকে আছড়ে পড়েছে! সে নিজের দুই হাত দিয়ে সাব্বির’কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসতে লাগল। সাব্বির প্রথমে আচমকা এমন ধাক্কায় বেশ ভড়কে গেলেও‚ পরক্ষণেই নিজের বুকের মাঝে পুৃচকে বোন মৌ’য়ের চিরচেনা উপস্থিতি টের পেয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। এই পাগল মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন সব কাণ্ডকারখানা করে বসে যে ভয়ে তার আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়! ​সাব্বির নিজের দু-হাত দিয়ে মৌ’কে পরম মায়ায় আগলে নিল। তারপর বোনের এমন শক্ত বাঁধনে হাসপাস করতে করতে আদুরে গলায় বলে উঠে,‚
“একটু তো ছাড় পাখি। ভাইটাকে একটু নিশ্বাস তো নিতে দিবি নাকি এখানেই মেরে ফেলবি?
​মৌ ভাইয়ের কথায় কান তো দিলই না বরং আরও বেশি জেদ ধরে তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে শক্ত করে জড়িয়ে রাখল। ক্যাম্পাসের মাঝে দাঁড়িয়ে ভাই-বোনের এই চরম পাগলামি আর মিষ্টি আল্লাদ দেখে মেহেরসহ তাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের বাকি সবাই হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। কিন্তু এই হাসাহাসিতে মৌ’য়ের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই! সে এবার সাব্বিরে’র বুক থেকে নিজের মুখটা সামান্য সরিয়ে ঠোঁট উল্টে একরাশ অভিমানী ও কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠল‚

​”কেন ছাড়বো? আমি তোমাকে কেন ছাড়বো শুনি? নিজের বোনটাকে বিয়ে দিয়ে মাথা থেকে মস্ত বড় একটা বোঝা ঝেড়ে ফেলেছো তাই না ? এখন আর এই বোনকে একটুও ভালো লাগে না তোমার। সে শ্বশুরবাড়িতে কেমন আছে‚ না আছে তা একটু চোখ মেলে দেখতে যেতেও তোমার ইচ্ছে হয় না। সে বেঁচে আছে নাকি মরে ভূত হয়ে গেছে‚ তা নিয়েও তোমাদের কারো কোনো চিন্তা নেই। তোমরা সবাই খুব খারাপ।
​সাব্বির মৌ’য়ের এমন অনর্গল অভিমানের বাণ শুনে শব্দ করে হেসে উঠল। সে মৌ’কে একহাতে আগলে নিয়ে পাশের একটা ফাঁকা বেঞ্চে এনে বসাল। তারপর নিজে খানিকটা নিচু হয়ে মৌ’য়ের গাল দুটো টেনে দিয়ে বলতে লাগল। “কে বলল তোকে আমি ভুলে গেছি? ভাই কি কখনো নিজের জানের টুকরো বোনদের ভুলে থাকতে পারে? আমি আমার এই মিষ্টি বোনদের একটা মুহূর্তের জন্যও ভুলিনি‚ সত্যি বলছি।
​”তাহলে তুমি এতদিন আমাকে একটা বারও দেখতে গেলে না কেন? বিয়ের পর আজ এতগুলো দিন কেটে গেল অথচ তোমাদের কাউকেই আমি একটা দিনের জন্যও চোখে দেখলাম না। ফুপি আর ফুপা কেমন আছে বলো?
​“আলহামদুলিল্লাহ্ সবাই অনেক অনেক ভালো আছে। তবে আম্মু সারাদিন তোর জন্যই মন খারাপ করে বসে থাকে। আম্মু তো বলেছিল তোকে দেখতে তোদের বাসায় যাবে।

​”আমি রোজ আশায় আশায় বাসার গেটের দিকে তাকিয়ে থাকি যে এই বুঝি সবাই আসবে কিন্তু কেউ আসে না। তোমরা সবাই বড্ড স্বার্থপর‚ কেউ আমাকে একটুও ভালোবাসো না। এমনকি আব্বু-আম্মুও একটা দিন এলো না আমাকে দেখতে। শুধু ওই ফোনে টুকটাক কথা বললে কি আমার মন ভরে বলো?
​সাব্বির বোনের চোখের কোণে জল চিকচিক করতে দেখে মনটা খারাপ করে ফেলল। সে আলতো করে মৌ’য়ের চোখের জল মুছে দিলো। “একদম কাঁদিস না পাখি। তোর এই ভাইটা কিন্তু নিজের বোনদের চোখের অশ্রু এক ফোঁটাও সহ্য করতে পারে না। আর মেহের তুই ওখানে ওভাবে দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আয়‚ আমাদের পাশে এসে বোস।

​মেহের মুচকি হেসে নিজের ওড়নাটা সামলে নিয়ে ধীরপায়ে এসে সাব্বিরে’র ঠিক পাশের খালি জায়গাটায় বসল। বর্তমান যুগে যেখানে নিজের আপন ভাই-বোনদের মধ্যেই বিন্দুমাত্র মিল থাকে না‚ সেখানে তারা ফুপাতো-মামাতো ভাইবোন হওয়া সত্ত্বেও আপনের চেয়েও অনেক বেশি আপন। ​মৌ এবার হুট করেই নিজের কান্নার পর্ব শেষ করে‚ চোখ দুটো বড় বড় করে মাথা উঁচিয়ে বলে উঠল। “ভাইয়া আমার চকলেট কোথায়?
​মৌ’য়ের মুখে ‘চকলেট’ শব্দটা শোনা মাত্রই সাব্বির একদম থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেল! সে নিজের পকেটে হাত দিয়ে শুকনো ঢোক গিলতে গিলতে অত্যন্ত মিনমিন স্বরে বলল„ “আই অ্যাম রিয়েলি সরি রে পাখি। তাড়াহুড়ো করে আসার সময় চকলেটের কথা আমার একদম মাথাতেই ছিল না।
​ভাইয়ের মুখ থেকে এমন জবাব শোনা মাত্রই কথাটা যেন কোনো এক বিশাল বজ্রপাতের মতো মৌ’য়ের মাথায় এসে আছড়ে পড়ল। তার ফর্সা মুখখানা মুহূর্তের মধ্যে বেলুনের মতো চট করে চুপসে গেল। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে পুরো বেঞ্চ কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚

​”কীহহহহ? তোমার চকলেটের কথা মনে নেই? আজ চকলেটের কথা মনে নেই‚ কালকে এই বোনের কথা মনে থাকবে না‚ দুদিন পর আমার যে বাচ্চা-কাচ্চা হবে তাদের কথাও তোমার মনে থাকবে না। আর এই নিয়ে তুমি নিজেকে আমার ‘বেস্ট ভাইয়া’ বলে সারাদিন চিল্লাও হ্যাঁ? আমার লাগবে না এমন ফালতু ভাই। যে ভাই নিজের বোনের জন্য পকেটে সামান্য একটা চকলেট রাখতে পারে না‚ সে আমার ভাই হতেই পারে না।
​মৌ নিজের দুটো গাল ফুলিয়ে একদমে কথাগুলো বলে রাগে গজগজ করতে করতে বেঞ্চ ছেড়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে যেই না রাগ দেখিয়ে বড় বড় পা ফেলে ওখান থেকে চলে যেতে চাইল। ঠিক তখনই সাব্বির পেছন থেকে খপ করে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। মৌ এক মস্ত বড় ঝামটা দিয়ে ভাইয়ের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। সে রাগে মুখ ফুলিয়ে আরও দুই পা এগিয়ে যেতেই আচমকা তার কানের কাছে সাব্বিরে’র চিরচেনা সেই হাসিমুখের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

​“পাখি তোর চকলেট।
​চকলেটের নাম শোনা মাত্রই মৌ’য়ের পায়ের গতি ওখানেই একদম ব্রেক কষার মতো থেমে গেল। সে ঝট করে পেছনে ফিরে সাব্বিরে’র হাতে চকলেটের প্যাকেট দেখে খুশিতে একদম উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সে আর কোনো রাগ না দেখিয়ে এক দৌড়ে এসে সাব্বিরে’র পাশে ধপাস করে বসে তার হাত আঁকড়ে ধরে চকলেটটা ছিনিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু সাব্বির এবার দুষ্টুমি করে চকলেটটা ওপরে উঁচিয়ে ধরল‚ কিছুতেই দিল না।
​তা দেখে মৌ আবারও নিজের মুখখানা ছোট করে বলল‚
“তুমি না আমার পৃথিবীর সবচেয়ে হ্যান্ডসাম আর লক্ষ্মী ভাইয়া? তাহলে আমার চকলেটটা আমায় দিয়ে দাও না প্লিজ।

​“উঁহু দেব না। একটু আগেই না তুই বললি আমি নাকি তোর কোনো ভাই-ই হই না? তাহলে এখন কোন অধিকারে চকলেট চাচ্ছিস শুনি?
​”দাও না ভাইয়া।
​“বললাম তো দেবই না।
​মৌ এবার কোনো উপায় না পেয়ে পাশে বসা মেহেরে’র হাত নাড়িয়ে বলল‚ “মেহের তুই একটু ভাইয়াকে দিতে বল না। আচ্ছা ভাইয়া তুমি যদি আজ আমাকে এই চকলেটটা ভালোয় ভালোয় দিয়ে দাও তবে তোমায় আমি এক্কেবারে আসমানের পরীর মতো লাল টুকটুকে একটা কিউট বউ এনে দেব।
​সাব্বির নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল‚ “তা তোর সেই আসমানের পরী বউ কবে আসবে শুনি?
​মৌ এবার নিজের সব কটা দাঁত কেলিয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলে‚ “যেদিন আমার পুঁচকে পুঁচকে বাচ্চাগুলো তোমায় ‘মামা মামা’ বলে ডাকতে পারবে ঠিক সেদিনই তোমায় আমি বউ এনে দেব।

​“হোয়াটটটটট? ততদিনে তো আমি বুড়ো হয়ে ইহলোক ত্যাগ করে এক্কেবারে ইন্তেকাল করে ফেলব রে শয়তান মেয়ে। মাবুদ এমন স্বার্থপর আর শয়তান মার্কা বউ সরি বোন যেন তুমি দুনিয়ার আর কোনো ভাইকে না দাও! ছিঃ ছিঃ এমন একটা আস্ত ডাইনি আমার কপালে বউ সরি বোন হিসেবে জুটল?
​সাব্বিরে’র এই ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার মাঝেই মৌ এক ঝটকায় ভাইয়ের হাত থেকে চকলেটের প্যাকেটটা কেড়ে নিল। তারপর সেটা ছিঁড়ে মুখে পুরতে পুরতে বলল‚ “তোমার ওই ‘সরি’র খাতায় আমার প্রফেসর সাহেব এক্কেবারে গুলি মারবে ভাইয়া। যদি সে জানতে পারে তুমি ভুল করেও আমাকে নিজের ‘বউ’ বলে সম্বোধন করেছ৷
“সিরিয়াসলি?
​মৌ মাথা নাড়ালো।​সাব্বির এবার একটু গম্ভীর হয়ে আওরায়‚ “আচ্ছা এসব কথা রাখ পাখি। আগে বল তোর সামনের পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন চলছে? মিনিমাম পাস নম্বরটুকু তুলতে পারবি তো‚ নাকি চৌধুরী বাড়ির নাক কাটবি?

​”ধূর ভাইয়া পাস করে আমার কী লাভ হবে শুনি? সেই তো বাচ্চা-কাচ্চাই সামলাতে হবে তাই না? তাছাড়া পরীক্ষা দিতে গেলে কি আর সারাদিন গাধার মতো পড়তে হয় নাকি? আমার ওই কিউটের ডিব্বা দুলহাজান’কে পরীক্ষার আগে গাল বরাবর কয়েকটা মিষ্টি করে ‘কিসস’ করে দেব আর সে আমাকে ভালোবেসে ১০০-এর মধ্যে এক্কেবারে ১০০০ নম্বর খাতার ওপর বসিয়ে দেবে। কী যে কিউট আমার দুলহাজানটা।
​মৌ’য়ের মুখে এমন অদ্ভুত আর রোমান্টিক কায়দার পড়াশোনার স্ট্র্যাটেজি শুনে সাব্বির নিজের কপালে চড় মারলো। “তোকে এক হাজার নম্বর দেওয়া তো দূর তোর ওই প্রফেসর বর তোকে খাতা ভরে আস্ত একটা রসগোল্লা দেবে রসগোল্লা।

​”দেখা যাবে কে কাকে রসগোল্লা দেয় হুহ।
মৌ’য়ের কথা শেষ হতেই সবাই আবারও এক সাথে হেঁসে উঠলো। ​এদিকে কিছুটা দূর থেকে মৌ’য়ের প্রতিটা গতিবিধি তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করছিল উজান। মাঝের দূরত্বের কারণে তাদের কথাবার্তা স্পষ্ট শুনতে না পেলেও মৌ আর ওই সাব্বির নামের ছেলেটার এত কাছাকাছি থাকা‚ হেসে গড়িয়ে পড়া সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারল না। আর সবকিছুর চেয়েও বড় আঘাত যেটা উজানেঃর বুকে তীরের মতো বিঁধল তা হলো মৌ নিজে গিয়ে ওভাবে দৌড়ে ওই ছেলেটার বুকে আছড়ে পড়েছে। তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসছে। ​মুহূর্তের মধ্যে এক আদিম ও হিংস্র ঈর্ষা এসে গ্রাস করল উজান’কে।
রাগের তীব্রতায় উজান নিজের ডান হাতটা নিয়ে পাশের শক্ত দেওয়ালে সজোরে এক ঘুষি মারল। ​মুহূর্তেই তার শান্ত চোখ-মুখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। অতিরিক্ত রক্তচাপের কারণে তার হাত আর ফর্সা কপালের নীল শিরাগুলো দপদপ করে ফুলে উঠল‚ চোখ দুটো রাগে ও ক্ষোভে একদম টকটকে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেল। সে আর একটা মুহূর্তও ওই ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি বা ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। নিজের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসটাকে সবার আড়ালে লুকাতে সে গটগট করে পা ফেলে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির দিকে ছুটে গেল।

​উজান তার পার্সোনাল বাংলোবাড়িতে এসে পৌঁছাল। ভেতরে ঢোকা মাত্রই তার ভেতরের সেই বদ্ধ উন্মাদ রূপটা বেরিয়ে এলো। সে একাই পুরো ড্রয়িং রুম আর নিজের বেডরুম তছনছ করে ফেলতে লাগল। রুমের কাঁচের শোপিস‚ ল্যাপটপ‚ টেবিল ল্যাম্প কিছুই আর আস্ত রইল না। সবকিছু লাথি আর হাতের আঘাতে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে পুরো রুমটাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করল সে। ​কিন্তু এতেও তার ভেতরের সেই বিষাক্ত জ্বালা একটুও কমল না। উজান টেবিলের ওপর রাখা তার ল্যাবের তীব্র ক্ষতিকারক নাইট্রিক অ্যাসিডের (Nitric Acid) বোতলটা হাতে নিল।
নিজের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছাড়াই এক ভয়ংকর পাগলামিতে সে নিজের ডান হাতের ওপর সরাসরি সেই গনগনে অ্যাসিড ঢেলে দিল! তীব্র অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় চামড়া পুড়তে শুরু করল‚ মাংস কামড়ে ধরার মতো অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগল। তবুও সে উন্মাদের মতো দাঁড়িয়ে রইল‚ একটুও কুঁকড়ে গেল না এমনকি যন্ত্রণায় চেঁচাল না। ​তার ওপর অন্য হাত দিয়ে সে একের পর এক কড়া অ্যালকোহলের ড্রিংকসের বোতল মুখে ঢেলে শেষ করতে লাগল। শরীর আর মন দুটোকেই অবশ করে দেওয়ার এক অদ্ভুত নেশা চেপে বসেছে তার মাথায়। ​উজান শুধু এইটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি। তার চোখের সামনে বারবার ভাসছিল মৌ’য়ের ওই অন্য পুরুষকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য।

সে ব্ল্যাক হুডি বের করে গায়ে জড়িয়ে মুখে কালো মাস্ক লাগিয়ে এক হাতে লোহার রড নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল সেই সাব্বিরে’র কাছে। কলেজ থেকে ফেরার পথে নির্জন রাস্তায় সাব্বির’কে একা পেয়ে উজান নিজের চেনা রূপ লুকিয়ে উন্মাদের মতো ইচ্ছেমতো ধোলাই দিয়ে এসেছে তাকে। লোহার রডের উপর্যুপরি আঘাতে ছেলেটাকে এক্কেবারে রক্তাক্ত, আধমরা করে রাস্তায় ফেলে এসেছে। ​ইচ্ছে করছিল ওই রডটা দিয়ে ওখানেই তাকে খুন করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে। কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে হলো এই ঘটনায় ছেলেটার চেয়েও তো তার নিজের ঘরের ওই জেদি পুৃচকে বিড়ালের বাচ্চার ভুল অনেক বেশি। মন চাচ্ছিল ছুটে গিয়ে এখনই মৌ’কেও ঠিক সেম টু সেম আঘাতে রক্তাক্ত করে শিক্ষা দিতে। কিন্তু উজান খুব ভালো করেই জানে‚ মৌ’য়ের ওই শরীরে সামান্য একটা ফুলের টোকা দেওয়ার মতো কলিজা বা ক্ষমতা এই উজান চৌধুরীর নেই! আর ঠিক সেই কারণেই মৌ’কে আঘাত করতে না পারার সেই চরম ব্যর্থতা আর ক্ষোভ উজান নিজের শরীরের ওপর মেটাচ্ছে‚ নিজেকেই নিজে এভাবে পুড়িয়ে শেষ করছে।

​সে তো বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলে‚ সে নাকি এই মেয়েটাকে একটুও ভালোবাসে না। তবে কেন‚ কোন অধিকারবোধ থেকে সে মৌ’কে অন্য কোনো পুরুষের ছায়াতেও সহ্য করতে পারছে না? এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর উজান চৌধুরী নিজেও জানে না। ​ঠিক তখনই দরজাটা সজোরে ঠেলে ঝড়ের গতিতে ভেতরে প্রবেশ করল ইফাত আর তন্ময়। তন্ময়ও উজানে’র স্কুল লাইফের ক্লোজ ফ্রেন্ড। কলেজ থেকে উজান’’কে ওভাবে উন্মাদের মতো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে কেউ একজন খবর দেওয়ায় ইফাত কোনো এক বড় বিপদের আভাস পেয়ে তন্ময়’কে সাথে নিয়ে সোজা এখানে ছুটে এসেছে। ​ভেতরে ঢুকে রুমের এই ধ্বংসাবশেষ আর উজানে’র এই জঘন্য বেপরোয়া অবস্থা দেখা মাত্রই দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল। ইফাত আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে দৌড়ে এসে উজানে’র হাত থেকে সেই ড্রিংকসের বোতলটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। আর তন্ময় দ্রুত ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা বরফ আর পানির বোতল এনে উজানে’র অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া‚ পুড়তে থাকা হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
​কিন্তু উজান এক তীব্র ঝটকায় তন্ময়ে’র হাত থেকে নিজের পোড়া হাতটা সরিয়ে নিল। যন্ত্রণায় তার পুরো শরীর কাঁপছে। ততক্ষণে ইফাত এই আত্মঘাতী রূপ দেখে চরম রেগে গিয়ে তার দুই কাঁধ খপ করে ধরে সজোরে একটা ঝাঁকুনি দিল। অত্যন্ত ধমকের সুরে চেঁচিয়ে উঠলো।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৫

​”উজান তুই কিন্তু এবার বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। লিমিট ক্রস করে যাচ্ছিস তুই। কেন নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস? তুই তো নিজেই বলিস‚ তুই নাকি ওই মৌ নামের মেয়েটাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসিস না। তাহলে কেন….
​‘মৌ’ শব্দটা শোনা মাত্রই উজানে’র মদ্যপ ও রক্তাক্ত মস্তিস্কে যেন ১০০০ ভোল্টের কারেন্ট শক লাগল! সে আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। বাঘের মতো এক হিংস্র হুঙ্কার ছেড়ে সে ঝাপিয়ে পড়ে ইফাতে’র শার্টের কলারটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। ​অতিরিক্ত ড্রিংকস আর এসিডের যন্ত্রণার কারণে উজান এই মুহূর্তে নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও প্রায় হারিয়ে ফেলেছে‚ তার শরীর টলছে। তবুও নিজের ভেতরের সমস্ত পুরুষালি জেদ আর হিংস্রতা এক জায়গায় এনে ইফাতে’র মুখের ওপর দাঁড়িয়ে সিংহসুলভ হুঙ্কার ছেড়ে গর্জে উঠল।
​“মৌ? কাকে মৌ বলে ডাকছিস হ্যাঁ? তাসফিয়া মৌ চৌধুরী শুধুমাত্র এই…..

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here