প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৫
বন্যা সিকদার
অর্ধ নগ্ন হয়ে উজান বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। তার পরনে কেবল একটা ট্রাউজার‚ উন্মুক্ত সুঠাম পিঠ আর চওড়া বুক বিছানার চাদরের সাথে লেপ্টে আছে। ঠিক তখনই এক ক্ষীণ গোঙানির শব্দে তার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। আধো-ঘুমে স্পষ্ট কান্নার আওয়াজ পেয়ে উজান অভ্যাসবশত নিজের পাশে হাত বাড়াল কিন্তু সেখানে মৌ’য়ের কোনো অস্তিত্ব মিলল না। ধড়ফড় করে চোখ মেলে আড়চোখে পাশে তাকাতেই উজানে’র ঘুম এক নিমেষে উধাও। সে তড়িঘড়ি করে বিছানায় উঠে বসল। দেখল‚ মৌ বিছানার একদম পায়ের কাছে জড়োসড়ো হয়ে বসে নিচু স্বরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বউয়ের এই অবস্থা দেখে উজান আর স্থির থাকতে পারল না। সে বিছানা বেয়ে উদগ্রীব হয়ে মৌয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
“পিচ্চি কী হয়েছে তোমার? খুব কষ্ট হচ্ছে?
উজান অত্যন্ত চিন্তিত মুখে মৌ’য়ের কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা চেক করল। না‚ জ্বর এখন অনেকটাই কম‚ গা আগের মতো পুড়ছে না। জ্বর কমার কারণে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল বটে কিন্তু মৌ এই ভোরে কেন এভাবে কাঁদছে‚ তা সে কিছুতেই মেলাতে পারল না। উজান যেই না সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আবার হাত বাড়াতে গেল‚ অমনি মৌ এক ঝামটায় তার হাত সরিয়ে দিল। ভেজা চোখে এক তীব্র রাগী দৃষ্টি হেনে কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল‚
”টাচ করবেন না আমায়‚ অসভ্য পুরুষ !
মৌ’য়ের মুখে হুট করে এমন তকমা শুনে উজান খানিকটা ঘাবড়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই গতকাল রাতের সমস্ত উন্মাদনার কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সে কিছুটা মৌ’য়ের দিকে ঝুঁকে এসে তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“ওকে সভ্য হয়েই না হয় টাচ করব!
তার এই রসিকতা শুনে মৌ’য়ের ভেতরের রাগ যেন এক লহমায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে উজানে’র শক্ত বুকে ধুমধাম কিল বসাতে শুরু করল। উজান সেই কিলে বাধা দিল না বরং পরম শান্ত কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল‚ “রিলাক্স পিচ্চি‚ প্লিজ বলো না কেন কাঁদছো এই ভোরে? আই গেস‚ তুমি আমাকে আবার পাওয়ার জন্য কাঁদছো। আই অ্যাম রাইট? আচ্ছা‚ এর জন্য কেউ কাঁদে নাকি? আমাকে একটা ডাক দিলেই তো সব প্রবলেম সলভ হয়ে যেত।
মৌ দাঁতে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠল‚ “চুপ করুন বেহায়া পুরুষ। শুধুমাত্র আপনার জন্য…আপনার ওই পৈশাচিক কান্ডের জন্য আমি এখন ঠিকঠাক মতো উঠে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছি না। এই নিয়ে পাঁচ-পাঁচবার চেষ্টা করলাম আর প্রতিবারই পা কেঁপে বিছানায় পড়ে যাচ্ছি। শরীরে বিন্দুমাত্র জোর পাচ্ছি না আমি।
মৌ’য়ের এই স্বীকারোক্তি শোনামাত্রই উজান এক লাফে বিছানা থেকে নিচে নেমে এলো। কোনো কিছু না ভেবেই সে খুশিতে নিজের মনেই “ধুম্মা চলে‚ ধুম্মা চলে” বলতে বলতে কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করে দিল।
উজানে’র এই পাগলামি দেখে মৌ’য়ের মুখের রঙ মুহূর্তে পাল্টে গেল। রাগে আর লজ্জায় সে স্তব্ধ হয়ে ভাবল। মেয়েটা তার বিপদের কথা বলছে আর এই লোকটা খুশিতে ড্যান্স করছে। কিছুক্ষণ কোমর দুলিয়ে নাচার পর উজান আবার মৌ’য়ের একদম কাছাকাছি ঝুঁকে এলো। তার দুই গালে হাত রেখে গাঢ় স্বরে বলল‚
“লাভ ইউ বউ‚ উম্মাহ। কী যে একখানা গুড নিউজ দিলে তুমি আমায়।
”এটা আপনার কাছে গুড নিউজ মনে হচ্ছে? —মৌ নিজের কোমরে দু-হাত চেপে ধরে ঝামটা দিল।
“আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না আর আপনি খুশিতে নাচছেন?
“অবভিয়াসলি মাই লাভ। কাল রাতে তো আপনাকে বারবার বললাম যে মিসেস চৌধুরী‚ আপনার এই শরীর এত স্ট্রেস নিতে পারবে না। কিন্তু আপনি কি আমার কথা শুনলেন? উল্টো পেত্নীদের খোঁটা দিয়ে আমায় উসকানি দিলেন। তা যা-ই হোক‚ শেষমেশ তো আমারই লাভ হলো। আগে তবুও আপনি বারণ করলে আমি একটু-আধটু শুনতাম‚ এখন থেকে আর কোনো এক্সকিউজ দিলে কাজ হবে না। উজান চৌধুরী যখন-তখন তার এই স্পেশাল ডিশ টেস্ট করবেই করবে।
মৌ আর সহ্য করতে না পেরে বিছানা থেকে বালিশটা তুলে সজোরে ছুড়ে মারল উজানে’র দিকে। কিন্তু উজানে’র তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হাসিমুখে বালিশটা লুফে নিল। মৌ এবার নিজেই রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াল উজান’কে দুটো থাপ্পড় মারার জন্য। কিন্তু বিছানা থেকে পা বাড়াতেই তার অবশ পা দুটো আবার মচকে গেল। সে যেই না ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যেতে যাবে‚ অমনি উজান তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে নিজের চওড়া দু-হাতে তাকে আগলে নিল। সে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মৌ’কে আবারও বিছানার কিনারে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের হাত দুটো মৌ’য়ের মুখের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে সশব্দে হেসে উঠল।
“নিন ম্যাডাম এবার এই হাত দুটো কামড়ে আপনার সব রাগ মিটিয়ে নিন। শরীরে তো শক্তির ‘শ’-ও অবশিষ্ট নেই‚ তবুও আমার সাথে লাগতে আসবেন। এই জন্যই তো বারবার বলেছিলাম আগে সুস্থ হয়ে নিন। এখন দেখলেন তো‚ বড়দের কথা না শুনলে কী অবর্ণনীয় দশা হয়?
”চুপ করুন নির্লজ্জ পুরুষ। আপনার জন্য আমার আজ এই অবস্থা।
“রাতে আকাম করার জন্য উসকানি দিলে তুমি আর এখন আমার দিকে আগুল তুলছো? বদ মেয়ে, কাছে আসো দুইটা চুম্মা দিয়ে বুঝিয়ে দেয় আমি কতটা দয়াল সরি লয়াল।
উজানে’র মুখে এমন খোলামেলা কথা শুনে মৌ’য়ের কান দিয়ে যেন সত্যি সত্যিই রাগে ধোঁয়া বের হতে লাগল। লোকটার মুখে একটুও আটকায় না। সে রাগে-দুঃখে আবারও বিছানা থেকে জোর করে উঠে দাঁড়াল। এই ইবলিশটার সাথে সে আর এক বিন্দুও কথা বলবে না।
সে অনেক কষ্টে নিজের কাঁপতে থাকা পায়ে গুটি গুটি পদক্ষেপে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল। উজান পেছন থেকে তাকিয়ে চিল চিৎকার করে উঠল‚
“শাশুড়ির মেয়ে শাওয়ার নেওয়ার জন্য অন্তত জামা গুলো তো সাথে নিয়ে যাও? নাকি পিছু পিছু আমাকেও ওয়াশরুমে যেতে বলছো?
কিন্তু কে শোনে কার কথা। মৌ পেছনে আর এক মুহূর্তের জন্যও না তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গটগট করে রুমে থেকে চলে গেল। মনে মনে শুধু উজানে’র চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগল। এই মানুষটা কেন সবসময় তাকে এমন চরম লজ্জার সাগরে ফেলে দেয়‚ কে জানে।
বিকেলের হালকা রোদে বাড়ির উঠানে ছায়াযুক্ত একটা বড় গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে আছে উজান আর তন্ময়। দুজনের সামনে ল্যাপটপ‚ অতি গম্ভীর মুখে তারা কেসের কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে কাজ করছে। আর তাদের ঠিক পাশেই মাদুর পেতে বসে আছেন বাড়ির বাকি সবাই মৌ‚ মেহের‚ ইফাত‚ দাদি রোকেয়া বেগম‚ মৌ’য়ের মা এবং চাচি। মা আর চাচি মিলে অত্যন্ত যত্নে মৌ আর মেহেরে’র মাথায় তেল দিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছেন। আর সেই দৃশ্য একদম চোখের পলক না ফেলে অধীর আগ্রহে গিলছে ইফাত। আসলে সামনে বসা নিজের নতুন বউ মেহেরে’র এই সেবা পাওয়ার মুহূর্তটি দেখাই তার মূল লক্ষ্য। উজান কাজের ফাঁকে দুই-তিনবার ইফাত’কে ডাক দিয়ে তাদের পাশে বসতে বলেছিল কিন্তু সে কানেই তোলেনি। এই নিয়ে বাড়ির বড়রা তাকে কম খোঁচায়নি কিন্তু ইফাত তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তার ধ্যান-জ্ঞান সব এখন মেহেরে’ই আটকে আছে।
হঠাৎ করেই উঠানের সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে মৌ’য়ের মুখটা খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল। দূর থেকে তাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে সাব্বির‚ তার দুই হাত বোঝাই হরেক রকমের বাহারি জিনিসপত্র। তাকে দেখামাত্রই মৌ মাথার তেল মাখা অবস্থাতেই এক দৌড়ে তার দিকে ছুটে গেল। বউকে ওমন হুট করে ছুটে যেতে দেখে উজান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল। সামনে সাব্বির’কে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ল‚ চোখের কোণে ফুটে উঠল এক ঈর্ষাকাতর অগ্নিদৃষ্টি। কিন্তু মৌ’য়ের ওসব দিকে খেয়ালই নেই। সে দৌড়ে গিয়ে সাব্বির’কে জড়িয়ে ধরল। সাব্বির যখনই দেখল ওদিক থেকে উজান তার রুদ্ধমূর্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে‚ অমনি ভয়ে তার শুকনো ঢোক গিলার উপক্রম হলো। তার মুখের চওড়া হাসিটা মুহূর্তেই হাওয়া ফুরানো বেলুনের মতো চুপসে গেল। সে কোনো মতে হাতের জিনিসপত্র গুলো উঠানের এক পাশে রেখেই এক ধাক্কায় মৌ’কে সরিয়ে দিল এবং দৌড়ে গিয়ে দাদি রোকেয়া বেগমের পেছনে লুকিয়ে পড়ল।
সাব্বিরে’র এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মৌ ঠোঁট ফুলিয়ে অত্যন্ত অভিমানী সুরে বলল‚ ”ভাইয়া তুমি আমাকে এভাবে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারলে?
সাব্বির দাদির পেছন থেকে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ “তুই চুপ কর খাটাস মেয়ে একটা। সেইবার আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলি বলে তোর ওই রাক্ষস বর আমাকে মেরে আধমরা করেছিল৷ আর আজকে তো আমায় মেরেই ফেলবে। জানো নানি‚ তোমার এই ঢংগী নাতনির জন্য ওর বর আমাকে কী ক্যালানিটাই না দিয়েছিল। আল্লাহ জানে সেদিন কত কষ্টে নিজের জীবনটা বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। আজকেও এই ডাইনি মহিলা একই অপরাধে আমায় ফাঁঁসাতে চাচ্ছিল।
“সাব্বির একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না‚ হুম?
হঠাৎ এক গম্ভীর‚ ভারী কণ্ঠস্বর বজ্রপাতের মতো সাব্বিরে’র কানে গিয়ে বাজল। উজান নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে তার দিকে চেয়ে কথাটি বলতেই সাব্বিরে’র মুখ একদম বন্ধ হয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু করে এক জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল‚ “সরি‚ সরি ভাইয়া! আমার বোন তো একটা মিষ্টি‚ হিরের টুকরো! পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বোন ও। আমি আসলে মুখ ফসকে সত্যি কথাটা বলে ফেলেছি এই আর কি।
সাব্বিরে’র এমন ভোল পাল্টানো আর তটস্থ অবস্থা দেখে উঠানে’র সবাই হো হো করে হেসে উঠল। ঠিক তখনই উঠানের মেইন গেট দিয়ে ভেতরে এসে প্রবেশ করল গ্রামের প্রতিবেশী দুজন মধ্যবয়সী মহিলা। তাদের দেখামাত্রই মেহেরে’র হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই কুঁকড়ে গেল‚ সে নিজের শরীরটা আরও গুটিয়ে নিল। এই মানুষ গুলো মোটেও ভালো নয়। মেহের যখনই ঢাকা থেকে গ্রামে বেড়াতে আসে‚ তখনই এই দুজন তাকে কোনো না কোনো ছুতোয় খোঁচাতে চলে আসে। অতীত নিয়ে নোংরা কথা বলতে তাদের বুক কাঁপে না।
মহিলা দুটোর আকস্মিক উপস্থিতিতে বাড়ির কেউই তেমন একটা খুশি হতে পারল না। তবুও তারা এসে মেহেরে’র একদম মুখোমুখি হয়ে বসল। তাদের মধ্যে একজন মহিলা মুখে এক কুৎসিত ও তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন‚
”হুনলাম তোর নাকি বিয়া হইয়া গেছে মেহের? তা কে বিয়া করলো রে তোর মতো একটা ন*ষ্ট আর অপয়া মাইয়ারে?
কথাগুলো যেন বিষাক্ত তীরের মতো মেহেরে’র সোজাসুজি বুকে গিয়ে বিঁধল। মানুষগুলো যে কতটা নিচু মনের আর নিকৃষ্ট হতে পারে‚ তা সে এই পরিস্থিতিতে না পড়লে কোনোদিন জানতেই পারত না। একটা মেয়ের জীবনের দুর্ঘটনা ও দুর্বলতাকে কীভাবে সমাজের সামনে এভাবে নোংরা করে তুলে ধরা যায়? মেহেরে’র দুচোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল‚ মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পাশে বসে থাকা ইফাত অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও জ্বলন্ত দৃষ্টিতে মেহেরে’র সেই যন্ত্রণাকাতর মুখখানার দিকে চেয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
এরই মধ্যে দ্বিতীয় মহিলাটি আরও এক কাঠি বাড়িয়ে টিপ্পনী কাটলেন‚
”কিরে মাইয়া চুপ কইরা আছোস কেন? তুই যে একটা ন*ষ্টা মেয়ে এডা কি তোর সোয়ামী জানে? নাকি শহরে গিয়া বড় বড় মিছা কথা কইয়া কোনো বোকা পোলারে ফাঁঁদ ফেলাইয়া বিয়া করছোত? কিগো মৌয়ের মা‚ তোমরা কি জামাইরে সব হাছা কথা কইছিলা?
তার এমন নোংরা কথা শোনা মাত্রই মৌ’য়ের মা নিজের রাগ সামলাতে না পেরে তেড়ে উঠলেন‚ ”চাচি আম্মা! মুখটা একটু সামলে কথা বলুন। মুরুব্বি মানুষ হয়ে এত অশিক্ষিত আর ছোটলোকের মতো কেন কথা বলছেন আপনারা?
”পড়ালেখা করি নাই দেইখা আমাগো মুখের কথা এহন তোমাগো তিতা লাগবই গো সেজো বউ। মাইয়া জামাইয়ের হাতে তুল্যা দেওয়ার সময় তো আমাগো কথা মনে আছিল না? নাকি নিজেরা পড়ালেখা জানো বইলা গ্রামের কাউরে মানুষ মনে করো না?
”দেখুন চাচি আম্মা আপনাদের এই বাজে কথা আমাদের আর সহ্য হচ্ছে না। আমার এই মেয়েটার সাথে অতীতে যা কিছু খারাপ হয়েছে‚ সেটা একটা দুর্ঘটনা ছিল। আর এতে তো আমার মেয়ের কোনো দোষ ছিল না। তবে ওকে কেন বারবার এভাবে টেনে এনে অপমান করছেন? যার দোষ‚ তাকে গিয়ে বলুন না।
তখনই দ্বিতীয় মহিলাটি আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল‚ “তাগো কইয়া আমাগো কী লাভ? দোষ তো তোমাগো ওই অসতী মাইয়ারই আছিল. আর বারবার ‘আমার মাইয়া, আমার মাইয়া’ করো কেন শুনি? এই মেহের তো তোমার নিজের পেটের জন্ম দেওয়া মাইয়া না. অরে লইয়া এত দরদ দেখাইয়ো না সেজো বউ‚ নাইলে দেখবা তোমার নিজের পেটের যে মাইয়া আছে তার সংসারটাও এই অলক্ষ্মীর কারণে ভাইঙা যাইব। শহরের বড় ঘরের পোলা দেইখা ভাইবো না যে ওরে চিরকাল মাথায় তুল্যা রাখব। আমার তো মনে হয় এই ন*ষ্টা মাইয়ারে ওর স্বামী জামাইবাড়ি থাইকা লাথি মারিয়া খেদাইয়া দিছে। তাই মুখ কালা কইরা বাপের বাড়ি আইসা পইড়া রইছে।
এতগুলো মানুষের সামনে নিজের চরিত্রের ওপর এমন কদর্য কাদা ছেটানো আর সহ্য করতে পারল না মেহের। তার ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে ছটফট করে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে চাইল কিন্তু সে সামনে এক পা ফেলার আগেই পাশ থেকে ইফাত এক শক্ত টানে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। মেহের কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইফাত তাকে এক হ্যাঁচকা টানে সোজা নিজের কোলে বসিয়ে নিল। এমনিতেই মনের ভেতর চরম অপমান ও কষ্ট‚ তার ওপর সবার সামনে ইফাতের এমন কাণ্ড দেখে মেহেরের প্রচণ্ড রাগে মাথা কাটা যাওয়ার দশা হলো। কিন্তু ইফাত আজ কারও পরোয়া করার মুডে নেই। সে মেহেরে’র চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে মুছে দিল। তারপর পরম যত্নে মেহেরে’র মাথায় বিলি কেটে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে লাগল। তাদের এই কাণ্ড দেখে প্রথম মহিলাটি দাঁত কেলিয়ে বিশ্রি সুরে বলল‚
”বাব্বাহ্ মাইয়ার দেহি বিয়ার পরেও নাগর পালার স্বভাব যায় নাই। ভা*তার ঘরে রাইখাই কি গ্রামের মধ্যে নতুন নাগর পালতাছোস নাকি মাইয়া?
এই নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটি শোনামাত্রই ইফাতে’র মুখের আলতো হাসি উধাও হয়ে গেল। সে মেহের’কে অত্যন্ত যত্ন সহকারে নিজের পাশের বসিয়ে দিল। তারপর সবার সামনে ঝুঁকে পড়ে মেহেরে’র কপালে এক পরম ভালোবাসার গভীর পরশ এঁকে দিল। নিজের স্ত্রীর কপালে চুমু খেয়ে সে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের চৌধুরী বংশের রক্ত আর ক্ষিপ্রতা তখন টগবগ করে ফুটছে। সে অত্যন্ত ধীর ভারী পদক্ষেপে হেঁটে ওই দুই প্রতিবেশী মহিলার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখে এক ভদ্রতার হাসি ঝুলিয়ে মৃদুস্বরে আওড়াল‚
“আসসালামু আলাইকুম দাদিজানেরা! কেমন আছেন আপনারা? অবশ্য আপনাদের শরীর-মন ভালো থাকার কথাও নয়। সকাল থেকে পুরো পাড়া হন্যে হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের ঘরের বদনাম আর পরনিন্দা করতে করতে নিশ্চয়ই বড্ড হাঁপিয়ে গেছেন। শাশুড়ি আম্মাজান এই দাদিদের জন্য তাড়াতাড়ি দুই গ্লাস ঠান্ডা শরবত এনে দিন তো। ওনাদের শুকনো গলাটা একটু ভিজিয়ে নিক‚ তারপর না হয় ওনারা শান্ত হয়ে বাকি কথা বলবেন।
ইফাতে’র এই বাঁকা টোনের কথা শুনে উঠানের সবাই মনে মনে মিটমিট করে হাসতে লাগল। উজান আর তন্ময়ও ল্যাপটপের কাজ ফেলে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ইফাতে’র কথা শোনার জন্য কান খাড়া করল। ইফাত এবার আর দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা গিয়ে ওই দুই মহিলার একদম মাঝখানের খালি জায়গাটায় বসল। তারপর আবার এক টানে মেহের’কে এনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। মেহের লজ্জায় আর কথা বলতে না পেরে ইফাতে’র চওড়া বুকে নিজের মুখটা পুরোপুরি লুকিয়ে রাখল।
ইফাত এবার তার বজ্রকণ্ঠে বলল‚
“শুনুন দাদিজানেরা। এতক্ষণ ধরে যাকে আপনারা অত্যন্ত নোংরা নোংরা বিশেষণে ডাকলেন‚ সে হলো আমার নিজের বিবাহিতা ওয়াইফ‚ আমার অর্ধাঙ্গিনী‚ মিসেস ইফাত চৌধুরী। যাকে এই ইফাত চৌধুরী সবার সামনে তিন কবুল বলে নিজের ঘরের রানী করে নিয়ে এসেছে। এই মেয়েটার স্বামী‚ নাগর‚ ভা*তার যা-ই বলুন না কেন তার সবটুকুই কেবল আমি নিজেই। ওর লাইফে অতীতে যে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটেছিল‚ সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। আর তার জন্য দায়ী কোন কোন কুলাঙ্গার‚সেটাও আমার খুব ভালো করে জানা আছে। এখানে বসা আমার বউটা যে একটি পবিত্র ফুলের মতো নিষ্পাপ‚ এটাও আমি বিশ্বাস করি।
কিন্তু দাদিজান…আপনি মনে হয় একটা বিষয় ভুলে গেছেন। আপনার নিজের যে আদরের ১৫ বছরের নাতনিটি আছে‚ সে এই অল্প বয়সেই পাড়ার ছেলেদের সাথে একে একে চার-চারবার আপত্তিকর অবস্থায় ধরা খেয়েছে। একেক সময় একেক নতুন পুরুষের সাথে ওর নোংরামি হাতেনাতে ধরা পড়েছে। এমনকি গতকাল রাতেও তো শুনলাম কোন এক ছেলের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা খেয়ে আপনার নাতনিটি বেদম মার খেয়েছে। নিজের ঘরের নাতনি পরপুরুষের সাথে রাত-বিরেতে কেলেঙ্কারি করে মার খাচ্ছে‚ আর আপনি সেই মুখ নিয়ে এখানে এসে আমার ফুলের মতো পবিত্র বউকে জাজ করতে এসেছেন? ভেরি সুইট দাদিজান‚ ভেরি সুইট!
ইফাতে’র এই নিখুঁত ও তিরের মতো ধারালো কথা শুনে প্রথম মহিলার মুখটা মুহূর্তেই চুন হয়ে গেল। সে থতমত খেয়ে পাশে বসা দ্বিতীয় মহিলার দিকে তাকাল। ইফাত এবার তার ধারালো দৃষ্টিটা দ্বিতীয় মহিলার দিকে ফিরিয়ে আনল। সেই চাউনি দেখেই দ্বিতীয় মহিলাটি ভয়ে নিজের শুকনো ঢোক গিলল। কিন্তু ইফাত তাকেও ছাড়ার পাত্র নয়।
“আর আপনি দাদিজান! আপনার ব্যাপারেও কিন্তু পাড়ার মানুষ কম কথা বলে না। শুনলাম আপনার নিজের গুণধর ছেলের বউ নাকি রাত-বিরেতে ঘরের ভেতর অন্য পরপুরুষদের ডেকে এনে রাখে। কারণ আপনার নিজের ছেলে নাকি ঠিক মতো***। আচ্ছা‚ থাক গে ওসব ব্যক্তিগত নোংরা কথা। এমনকি আপনার ঘরে যে ছোট নাতিটা হয়েছে। পাড়ার মানুষ কিন্তু বলাবলি করে তার আসল বাবা নাকি আপনার নিজের ছেলে নয় বরং অন্য কেউ। আর সেই অন্য কেউটা কে‚ সেটা যদি আমি এখন সবার সামনে ফাঁস করে…..
ইফাত নিজের কথা শেষ করার আগেই ওই দুই মহিলা যেন ভূতের ভয় পাওয়ার মতো এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে নিজেদের কাপড়ের আঁচল চেপে গটগট করে বাড়ির দরজার দিকে রওনা দিল। তাদের এভাবে পালিয়ে যেতে দেখে ইফাত পেছন থেকে বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠল‚ “আরে ও দাদিজানেরা! বাকি সত্যি কথাগুলো তো শুনে যান। যাহ্ বাবা‚ আমি তো মাত্র মুখ খোলা শুরু করলাম। আর এরই মধ্যে মাঝপথে এভাবে রাগ করে চলে গেলে কেমন দেখায় বলুন তো?
মহিলা দুটো গেট দিয়ে বের হতেই মৌ আর সাব্বির দুজনে মিলে খিলখিল করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। বাড়ির বড়রাও ইফাতে’র এমন দাঁতভাঙা জবাব দেখে মনে মনে চরম তৃপ্ত হলেন। যে সমাজে মানুষ একটুখানি অতীতের কলঙ্ক বা রটনা শুনলেই নিজের বউকে অপয়া বা খারাপ বলে দূরে ঠেলে দেয়। সেখানে মেহেরে’র মতো একটা মেয়ের অতীতের বড় দুর্ঘটনা জানার পরেও ইফাত যেভাবে বুক চিতিয়ে তার সম্মানের জন্য লড়াই করল‚ তা দেখে মৌ’য়ের মা আর চাচির চোখে খুশির জল চলে এলো। এটা সত্যিই পরম গর্বের বিষয়। রোকেয়া বেগম মুখের পানটা চিবোতে চিবোতে হেসে জিজ্ঞেস করলেন‚
“ছোট নাতি তুই গ্রামের এত ভেতরের খবর কীভাবে জানলি রে?
ইফাত অত্যন্ত আদুরে গলায় মৌ’য়ের দিকে ইশারা করে বলল‚ “আমার এই সুইট আর মিষ্টি ভাবিজান আগে থেকেই সব খবর আমাকে দিয়েছে দাদিজান।
আর ওই শয়তান বুড়ি দুটো। ভাবখানা এমন দেখায় যেন নিজেরাই দুধ দিয়ে ধোয়া তুলসী পাতা। আমার সামনে এসে আমার বউয়ের দিকে আঙুল তোলে। এরপর যদি কেউ আমার বউয়ের দিকে একটি আঙুলও তোলে‚ তবে তার হাত ভেঙে আমি গুড়ো করে দেবো। আসুক না আরেকবার‚ এবার একদম চ্যালাকাঠ দিয়ে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ছাড়ব হুহ!
ইফাতে’র মতো দায়িত্বশীল মেহেরে’র বর হিসেবে দেখে বাড়ির সবাই স্বস্তির হাসি হাসলেন। মৌ’য়ের মা পরম মমতায় ইফাতে’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আর্দ্র গলায় বললেন‚ ”বাপজান আমার এই মেয়েটাকে তুমি এভাবেই সারাজীবন আগলে রেখো। ওর জীবনে এখন তুমিই সব‚ কখনো মেয়েটাকে কোনো কষ্ট দিও না বাবা।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪ (২)
“একদম টেনশন নেবেন না শাশুড়ি আম্মাজান। আপনার দুই মেয়েকেই সামলানোর দায়িত্ব আমার…..না মানে চৌধুরী মঞ্জিলের সবার। তবে আমি শুধু আমার নিজের বউটাকে দেখে রাখব‚ এর চেয়ে বেশি আর কোনো ঝামেলা আমি নিতে পারব না। উজানে’র বউ উজান দেখে রাখুক।
ইফাতে’র এই বাঁকা রসিকতা শুনে উজানও মৃদু হাসল। অতঃপর মেহেরে’র মুখের মেঘলা আকাশ কেটে খুশির হাসি ফুটল। সবাই মিলে আবার এক পরম স্বস্তিতে আড্ডায় মগ্ন হলো।
